#বেনিফিট_অফ_লাভ -৫
Tahrim Muntahana
বউ নিয়ে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে শামউল। প্রায় দশ মিনিট হলো। বেনিফিট খাজার খবর নেই। শিতাব গিয়েছে বুঝাতে, এখনো নামেনি। চায়না বেগম সোফায় বসে গজগজ করছেন। ছেলের বউয়ের এমন ঢং তার মোটেও পছন্দ নয়। মনসুর হক উদাস ভঙ্গিমায় বসে আছেন। কাল রাত আর নিজের ঘরে জায়গা জুটে নি। সোফায় কোনো রকম শরীরটা চালিয়ে নিতে হয়েছে। সকাল সকাল যে বড় ছেলে বউ নিয়ে চলে আসবে, তাও বুঝতে পারেন নি। অপেক্ষা করছেন ছোট ছেলের, একমাত্র সেই চাটুকারিতার সহিত মম কে মানাতে পারে!
দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে শিতাব বেনিফিট খাজার অপেক্ষা করছে। টু শব্দ নেই, কথার জবাব নেই। তার কথা শুনছে কিনা তাও বুঝতে পারছে না শিতাব। ধৈর্য তার বিশাল হলেও এবার রাগ যেন তিরতির করে বাড়ছে। কিছুটা রেগেই বললো,
-“তুমি দরজা খুলবে না তো? আমি আজই বাড়ি ছাড়বো, একমাসের মধ্যে আসবো না।”
এতক্ষণ চুপ রইলেও ছেলের বাড়ি ছাড়ার কথায় চুপ থাকতে পারলেন না বেনিফিট খাজা। আবার সমস্ত রাগ ফুলে দরজাও খুললেন না। বললেন,
-“ইয়েস ইয়েস, নাউ তো মম কে দরকার নো। গো গো, চলে যাও, মাদার নো মোর হয়ে যাবে, তখন বুঝবে বেনিফিট খাজা কি ছিল!”
শিতাব নিজের রাগ কে নিয়ন্ত্রন করলো। আহ্লাদ কন্ঠে বললো,
-“তুমি জানো মম আমি তোমাকে কত ভালোবাসি। আমার কথাটা তো শুনো! ভাবী কে বরণ করে নাও, তারপর তুমি দেখাবে আসল খেল। কত অপমানিত হতে হয়েছে তোমাকে, ভুলে গেলে? আগে বাড়িতে তুলো, তারপর মন মতো অত্যাচার করবে, দরকার পড়লে ভাইয়া কে আবারো বিয়ে করাবো, পুরুষের চার বিয়ে জায়েজ আছে, ওই এসপি সিলভিয়া রেড ও তখন কিছু করতে পারবে না। আমার কথা বুঝতে পেরেছো মম?”
তখনই দরজা টা খুলে গেল। শিতাব স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে মুচকি হেসে তাকালো, বুকটা কেমন মুচড় দিয়ে উঠলো। একরাতেই কি অবস্থা করে ফেলেছেন। শিতাব এগিয়ে গিয়ে মা কে জড়িয়ে ধরলো। ছেলের সান্নিধ্য পেয়ে বেনিফিট খাজা ঝরঝর করে কেঁদে দিলেন। এ পর্যন্ত এমন কোনো রাত যায় নি ছেলে বাড়িতে নেই সে ঘুমিয়েছে। এমন ও দেখা গিয়েছে চাকরি সূত্রে কোথাও গেলে সেও ছেলের সাথে চলে গিয়েছে। এতে সবার রসিকতার সম্মুখীন হলেও তার কোনো যায় আসে না, নিজের মনের শান্তি ব্যতিত সমাজ কে সে কখনোই প্রাধান্য দেয়নি। মায়ের কান্নায় শিতাবের মনটাও খারাপ হয়ে গেল। চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বললো,
-“এসে গেছি তো মম, আর কেঁদো না। চলে বরণ করবে।”
বেনিফিট খাজা শব্দ বিহীন ছোট ছেলের হাত ধরে এগিয়ে যান। সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতেই শাড়ি পরিহিতা নারীকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন, পরক্ষণেই শাশুড়ির দিকে তাকান। চায়না বেগম মুখ বেঁকিয়ে তাকিয়ে আছেন দেখে ভেংচি কেটে এগিয়ে যান দরজার দিকে। শামউলের দিকে ভুল করেও তাকান না। নিঃশব্দে মিষ্টি মুখ করিয়ে সোফায় বসেন। ছেলের মুখে অত্যাচারের কথা মনে হতেই বলেন,
-“এই যে ডেজি বেজি, ইউ কে খুব গুড করে বলে দিচ্ছি, মি’র মাউথের উপর কথা বললে একদম ফাদার হোমে পাঠিয়ে দিবো। মি বেনিফিট খাজা এই হোমের কর্ত্রী, এই চায়না কোম্পানী মিল্করাইস।”
একে তো নামের এমন বিকৃতি, তারউপর বাড়ির ভেতরে না ঢুকতেই বাপের বাড়ি পাঠানোর হুমকি, ডেজির মন কে ভেঙেচুরে খানখান করে দিল যেন। তার উপর রাগ ও এসে বাসা বাঁধলো। শান্ত, প্রখর দৃষ্টিতে শামউলের দিকে তাকাতেই শামউল মাথা নিচু করে নিল। মেয়েটি আসতে চায় নি, সিলভিয়া জোর করে পাঠিয়েছে। বিয়ের পর শশুড়বাড়িই মেয়েদের বাসস্থান। অভিমানে ডেজিও কথা বাড়ায় নি, চলে এসেছে। পরিস্থিতি অন্যদিকে যেতে দিল না শিতাব। ডেজির হাত ধরে উপরে চলে গেল। বড় ভাইয়ের রুমে এনে বুঝানোর সুরে বললো,
-“তোমাকে একটা কথা বলি ভাবী, দুটো দিন সময় নিয়ে আমাদের পরিবার কে একটু বুঝার চেষ্টা করো, তাহলে দেখবে তোমার এত এত অভিযোগ একটাও খুঁজে পাবে না।”
ডেজি অবাক হয়ে তাকায় শিতাবের দিকে। ছেলেটার মাঝে সবসময় একটা চোর চোর ভাব থাকে। বুকে দু হাত বেঁধে বলে,
-“তোমার মতলব টা কি বলোতো?”
মাথা চুলকায় শিতাব, বিছানায় এক পাশে শুয়ে পড়ে। ভূমিকাহীন বলে,
-“শুনো আমি অন্যান্য দেবর দের মতো এত রয়ে সয়ে চলতে পারবো না, আমার স্বভাবে এমন নেই ও। আমি বেপোরোয়া চলতে পছন্দ করি, আমার মর্জি মতো কিছু না হলে আমি ঠিক মানতে পারি না। এইচএসসির পর আব্বু বাইক কিনে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু খবর পায় এত এত এক্সিডেন্ট হয় তাই কিনে দেয় নি। সেই রাগে আমি ওই বছর অনার্স ভর্তির আবেদন ই করি নি! তাহলে ভাবো কতটা জেদি।”
শিতাব থেমে ডেজির অবাকতায় ঘেরা মুখশ্রীর দিকে তাকালো। ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে আবার বললো,
-“তারপর বাইক কিনে দেয়, পরের বছর অনার্স ভর্তি হই। আমি হলাম পরীক্ষার আগের দিন পড়তে বসার লোক, এমন ও পরীক্ষা গেছে ফোন দেখে টুকলি করে লিখে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি। কোনো স্যার ধরতে পেরে খাতা নিয়ে নিতে চাইলে উপর কর্মকর্তার এক একেক নাম জেনে রাখতাম সেগুলো ব্যবহার করে চুপ করিয়ে রাখতাম। অবশ্য বন্ধু রা ছাড়া পসিবল ছিল না। এমন করতে করতে আমি এখন ফাইনাল ইয়ার।”
-“আমাকে এসব বলার মানে?”
-“মানে অবশ্যই আছে, শিতাব যাবী অহেতুক কাজ বা কথা কোনোটাই করে না, বলে না। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে উঠার একটা মেয়েকে ভালো লেগে যায়। বেপোরোয়া শিতাব তখন প্রেম শব্দের গভীরতা জানে না। মেয়েটা বুকের উপর এমন ভাবে জেঁকে বসলো মাসে একবার ভার্সিটি না যাওয়া ছেলেটা প্রতিদিন ভার্সিটি যাওয়া শুরু করলো, নিয়ম মাফিক ঘুম থেকে উঠতে শুরু করলো, হাতে বখাটে ব্যাচলেটের বদলে ঘড়ি রাখতে শিখলো, টাইম মেপে যেতে হবে তো মেয়েটির সামনে! একটা বছর মেয়েটির পেছনে আধা জল খেয়ে পড়েছিলাম, একশো আটত্রিশ টা চড় ছাড়া কিছুই পাই নি। আরো হারিয়েছি। কি কি হারিয়েছি জানো? মেয়েটি ভালো ভদ্র থাকলে কি হবে? বন্ধুরা ছিল ব’দের হাড্ডি। এক বছরে শালা রা আমার চব্বিশ হাজার তিনশত পঁয়ত্রিশ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে,ও সরি লাস্ট দিনের শেষ সময়ে মেয়ের এক সুন্দরী বান্ধবী আমার থেকে ত্রিশ টাকার গাড়ি ভাড়াও নিয়েছিল। তাহলে চব্বিশ হাজার তিনশত পঁয়ষট্টি টাকা। মানে একটা বছর চা’লাক, ধুর’ন্ধর, চাটুকা’রিতায় প্রথম থাকা শিতাব যাবীকে বল’দের মতো ব্যবহার করেছে এরা। শুধু মাত্র আমার ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে।
হাঁপিয়ে গেছে ছেলেটি। ডেজি এবার ফিক করে হেসে দিল। ছেলেটা কেমন অকপটে সব স্বীকার করছে। শীতাব আবার নিজের মতো বললো,
-“আরো আছে, মোট তিন বছরে ওই মেয়ের পেছনে আমার গাড়ি ভাড়ার জন্যই পঁয়তাল্লিশ হাজার ছয়শত বাইশ টাকা খরচ হয়েছে। তার উপর আব্বুর কাছে মিথ্যা বলে যখন টাকা নিতাম, বন্ধুরা সাক্ষী দিত ওই শালাদেরও কমিশন দিতে হতো। তিনবছরে কমিশন বাবদ তেরো হাজার এগারো টাকা খরচ হয়েছে। শপিং মলে গেলে মেয়েলি কিছু পছন্দ হলে মেয়ের কথা স্মরণ করে খালি হাতে ফিরতে পারি নি। জামা, জুতা, শাড়ি, শো পিস, লিপস্টিক, নেলপলিশ কিনতাম। নিজের আলমারি তে জায়গা হলো না মিথ্যা বলে আরেকটা আলমারি কিনলাম। এসব বাবদ আঠারো হাজার সাতাত্তর টাকা খরচ হয়েছে। এখানে মাল বহন খরচ ও আছে। তারপর আসি খাবারে। কোনো কিছু খেলে বুকটা মুচড় দিয়ে উঠতো, প্রাণপাখি থাকলে তো সেও আমার সাথে খেত। অবিচার করতে পারিনি, একটার বদল দুই টা কিনতাম। রেস্টুরেন্টে গেলে দুটো অর্ডার দিতাম, সিগারেট খেলেও দুটো একসাথে ধরাতাম। এখানে তিনবছরে মোট তেরো হাজার চার টাকা খরচ হয়েছে। তিনবছরে ছুটকি ছাটকি করে মোট খরচ হয়েছে এক লাখ চৌদ্দ হাজার সাতাত্তর টাকা।
শিতাব কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর আচমকা উঠে বসে পকেট থেকে ফোন বের করে কিছুক্ষণ ঘাটলো। তারপর বললো,
-“আরো আছে, ওই মেয়ের পরীক্ষায় যখন ফার্স্ট ক্লাস পেল তখনকার ট্রিট, চাকরি তে যখন টিকলো তখনকার ট্রিট দিয়ে মোট খরচ হয়েছে চার হাজার ঊননব্বই টাকা। সাথে তিন বছরে তিনবার বার্থডে তে কেক, বেলুন, খাবার বাবদ ছয় হাজার আটশো ষোল টাকা। এক লাখ চব্বিশ হাজার নয়শত বিরানব্বই টাকা আমার জলাঞ্জলি গিয়েছে। এখন তুমি বলো ওই মেয়েটাকে আমার ছেড়ে দেওয়া উচিত?”
ডেজি সাথে সাথে বললো,
-“একদম নয়, মেয়েটা রাজী হচ্ছে না কেন? এই যুগে বয়স কোনো ফ্যাক্ট হলো? মাত্র দু বছরের ডিফারেন্স।”
-“আমি ভাবী সেটাই বলি, মেয়ে প্রেম করে না, ভালোবাসার মানুষ নেই; তাহলে এই শিতাব যাবী কে মেনে নিতে সমস্যা কি? কালকেও আমাকে দু চড় মেরে একশত চল্লিশ মিল করেছে ভাবী। আমার কি উচিত নয়, এই চড় টাকে চুমু তে পরিণত করে ফেরত দেওয়া?”
-“অবশ্যই উচিত, তোমার এই নোবেল প্রাপ্ত ভালোবাসা কে কিভাবে জয়ী করতে হয় আমিও দেখবো, আমি তোমার সাথে আছি! কি করতে হবে বলো?”
মুখ হাত রেখে ভাবার ভঙ্গিমা করে হেসে উঠলো শিতাব। কাজে লেগেছে। ডেজি বুঝলো না, তাকিয়ে রইলো শিতাবের দিকে। শিতাব উঠে দাঁড়ালো। দরজার কাছে গিয়ে পিছু ফিরে বললো,
-“তোমাকে বর্তমানে কিছুই করতে হবে না ভাবী। শুধু মমের সাথে ঝগড়া টা চালিয়ে যাবে। মম যা করবে, বলবে সব তোমার বাড়িতে তোমার সরকারি পুলিশ বোনের কাছে বলে দিবে। এরপর যা করার আমিই করবো।”
ডেজি সন্দেহ চোখে তাকিয়ে পরক্ষণেই স্বাভাবিক করে নিলো। শিতাব তখন দরজার বাইরে চলে গেছে। কিছু একটা মনে হতেই ডেজি চেঁচিয়ে বললো,
-“এই তুমি আমাকে মিথ্যা বলছো না তো? এত এত কিছু, টাকার অঙ্ক তোমার মনে থাকলো?”
-“যার যায় তার ই পোড়ায় ভাবী। তোমার তো যায় নি, তোমার পোড়োবেও না। সকাল বিকাল খরচ করে যে লিস্ট করতাম তা আবার ঘন্টা পর পর দেখতাম, তিনবছরে মুখস্থ হবে না? আমার ভালোবাসা কে ছোটখাটো করে দেখ না, ওকে?
হতাশা নিয়ে কথাটা বলেই শিতাব প্রস্থান করলো।করিডরে গিয়ে চারপাশ দেখলো । পরক্ষণেই হাসতে হাসতে শিষ বাজিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়লো হাত পা ছড়িয়ে। আহা কি শান্তিই যে লাগছে। ঘরের ছাদের দিক তাকিয়ে বললো,
-“আমার সিলসিলা রানী, এবার দেখবে আমার মতো সাধারণ জনগণ কি করে তোমার মতো সরকারি পুলিশের বুক ঝাঁঝরা করে!”
আপন মনে কল্পনা করতে করতে শিতাবের হুট করেই মনে হলো কিছু একটা বলা বাকি থেকে গেছে। যা বলা আবশ্যিক। এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ডেজি তখন চুপচাপ ভাবছিল শিতাবের কথা। ছেলেটার ভালোবাসায় জোর আছে। তখনি তাকে আরো অবাক করে দিয়ে শিতাব দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে মাথা বের করে উঁকি দিয়ে বলে উঠলো,
-“তিনবছরে অপরিচিত সেজে ফোন দিয়ে জ্বালাতাম, ম্যাসেজে রোমান্টিক অনুভূতি গুলো লিখে সেন্ড করতাম এর জন্য টাকা খরচ হয়নি? মোট তিন হাজার নয়শত সত্তর টাকা খরচ হয়েছে!”
চলবে…?
(আপনাদের রিয়েক্ট দিতে এত অনাগ্রহ? মানে একবারে ৩০০+ রিয়েক্ট কমে গেল! কেন?)