#এক_চিলতে_রোদ-২
#Writer_Nondini_Nila
৯.
আম্মু কে বুঝাতে খুব কষ্ট হবে না। কিন্তু আব্বুর জন্য ভয়ে আমার বুক ধুকপুক করতে শুরু করেছে। আব্বু এতো আগেই বাসায় চলে এসেছে আজ। ঢোক গিলে ভেতরে যায়। হাত পা কাঁপছে অনবরত। যতটা ভয় পেয়েছিলাম তার কিছু হলো না। আব্বু খুব সুন্দর করে কথা বললো। আর বললো কখনো যেন রাত না করি কোথাও গিয়ে। আমি মাথা নেড়ে রুমে চলে এলাম। ফ্রেশ হয়ে এসেই দেখি আম্মু বিছানায় বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাকাতেই আম্মু আমাকে যা বললো তাতে চমকে উঠলাম। আর আমার হাত থেকে তোয়ালে ফট করে নিচে পরে গেলো।
‘ তোমার সাথে ছেলেটা কে ছিলো?’
আমি ভয়ে আতকে উঠলাম। আম্মু ইহান কে দেখলো কি করে?এখন কি হবে? কি বলবো? আম্মু কি জেনে যাবে মিথ্যা কথা বলে আমি মেলায় গিয়েছিলাম। হায় আল্লাহ তাহলে তো খুব খারাপ হবে। আম্মু তেমন কিছুই না বললেও আব্বু তো খুব বকবে?
‘ কি হলো কথা বলছো না কেন? ওই ছেলেটা কে ছিলো যে তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে গেলো?’
‘আসলে আম্মু…
‘ সত্যি বলো। আমি কিছু বলবো না। ‘
মায়ের কথায় ভরসা পেয়ে সব বলে দিলাম। সব শুনে আম্মু খুশি হলেও পরে একটু চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘ তোমার কোন ক্ষতি হয়নি তো? ভয় পেয়েছিলে?’
‘ খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু সময় মতো ইহান না আসলে ক্ষতি হতে পারতো।’
‘ ছেলেটা তো খুব ভালো।’
‘ ভালো না ছাই। তার জন্য ই তো আমি বিপদে পরেছি তাই হেল্প করেছে এখানে ভালোর কি হলো?’
‘ কিছুনা আয় কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পর আজ।’
‘ হুম ‘
আম্মু চলে গেলো।
ফোনটা অনবরত বেজেই চলেছে হাতে নিয়ে দেখি তুলি রিসিভ করতেই চিন্তিত কন্ঠ ভেসে এলো। আমি ঠিক আছি আর বাসায় পৌঁছেছি বলেই কেটে দিলাম। তারপর খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পরলাম।
পরদিন স্কুলে এসে কারো কারো কথা বললাম না। ওদের ইগনোর করে আলাদা সিটে বসলাম। তুলি এখনো আসে নি। বাকিরা আমার কাছে এসে সরি বলেছে কারো সাথেই কথা বলিনি। আমি যথেষ্ট শান্ত লিষ্ঠ মেয়ে ওদের সাথে কখনো ঝগড়া বা উঁচু গলায় কথা বলিনি কিন্তু আজ বলেছি। ওদের কথা শুনেই ধমক দিয়েছি। আমার ওদের দেখলেই রাগে শরীর জ্বলে উঠছে। সবাই আমাকে কতো রিকোয়েস্ট করে নিয়ে গেলো আর ওরা আমার খবর না নিয়ে চলে এলো। এটা কোনো কথা এতোটা কান্ড জ্ঞান হীন। ওদের কথায় আমি রাজি হয়ে কতোটা ভুল করেছি তা হারে হারে টের পেলাম। ওরা আমাকে রাগতে দেখে আর কিছু বললো না। তুলি এসে আমার এমন রাগারাগীর কথা শুনে ঢোক গিললো। আমি ওকে দেখে ও না দেখার ভান করে আছি। ওর উপর আমার রাগ বেশি আছে । সবাই চলে গেলেও আমি কষ্ট পেতাম না ও কি করে আমাকে এভাবে ফেলে গেলো। আমার পাশে এসে বসলো আমি ফট করে উঠে দাঁড়িয়ে জায়গা পরিবর্তন করলাম। ও অসহায় মুখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। কান থেকে হাজার বার সরি বললো আমি কথা বললাম না। দুইদিন রাগ নিয়ে থাকলাম। সারা দিন কল করে আমি রিসিভ করি না। স্কুলে এসেও কথা বলিনা।
শুক্রবার ঘুম ভাঙলো তুলির চেঁচামেচি তে। ওর চিৎকার শুনেই ধরফরিয়ে উঠে বসলাম। আমার সামনে বসে আছে। ওকে দেখে এতো খুশি হলাম যে রাগের কথা ভুলে ওকে জরিয়ে ধরে কথা বলতে লাগলাম।
‘ ওই তুই আমার কল রিসিভ করিস না কেন? এতো রাগ কেনো রে বাবা সরি বলছি তো যা আর জীবনে তোর এইভাবে ফেলে আসমু না।ইহান ভাই আছে আমার কেনো জানি মনে হচ্ছিল উনি তোকে বিপদে পরতেই দিবে না ঠিক বাসায় পৌছে দিবে। আর তাছাড়া আমি আসতে চায়নি তোকে ফোনে পাচ্ছিলাম না তাই সবাই জোর করে আমাকে গাড়ি উঠয়েছিলো। তারপর কতো যে চিন্তা করেছি আমি জানিস। তোর সাথে কথা বলে আমি স্বস্তি পেয়েছি।
‘ এই আমি তোর সাথে কথা বলছি কেন? আমি তো তোর সাথে রাগ করেছি!
বলেই মুখ ঘুরিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তুলি আমাকে জাপ্টে ধরে বললো, ‘ প্লিজ ক্ষমা কর তুই যা বলবি আমি তাই শুনবো এবারের মতো মাফ কর প্লিজ।’
‘ আচ্ছা করতে পারি একটা শর্তে!’
‘ বল কি শর্ত?’
‘ আজ আমাদের বাসায় থাকতে হবে আর এখন কান রে উঠ বস কর!
‘ এ্য্যা কি সব বলছিস আমি কান ধরে উঠবস করবো?
‘ হুম।
তুলি থাকবে বলে রাজি হলো। আম্মুকে দিয়ে ওর বাসায় কথা বলানো হলো। কান ধরে দশবার উঠবস করালাম। সারাদিন দুজন অনেক আনন্দ করলাম। রাত জেগে মুভি দেখলাম। গল্প করে একটা পর্যন্ত জেগে ছিলাম পরদিন সকালেই চলে গেলো তুলি বাসায় গিয়ে স্কুলের জন্য রেডি হতে। স্কুলে গিয়ে সবার সাথে মিলমিশ করে নিলাম।
কয়েকদিন পর
একটা বাজে ঘটনা ঘটে গেলো আমার চোখের সামনে।স্কুলে থেকে বাসায় ফিরছিলাম। আমি জানালা খোলা রেখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করি। আজ ও ছিলাম। তখন একটা বাইক এর সাথে কার ধাক্কা লেগে কি বীভৎস অবস্থা। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি। হাত পা থরথরিয়ে কাঁপছে। আশেপাশের লোক জড়ো হয়ে গেল। সবাই ধরাধরি করে কার থেকে একটা আহত মেয়েকে বের করে আনল। আমাদের গাড়ি তাদের গাড়ির কিছুটা সামনে ছিলো। মেয়েটিকে হসপিটালে নিতে হবে ইমিডিয়েটলি না হলে তার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। সবাই বলাবলি করছে আর গাড়ি খুঁজছে কিন্তু গাড়ি পাচ্ছে না।আমি শুকনো মুখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছি। কি সুন্দর দেখতে। মেয়েটার কপালে আঘাত পেয়ে রক্ত পড়ে তার গাল বেয়ে পরছে। আকাশী কামিজ ডিজে একাকার। তখন মেয়েটিকে আমাদের দিকে আনা হলো আমি আতঙ্কে চোখ মুখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছি এদিকে আনছে কেন?
লোক গুলো আমাদের গাড়ির সামনে এসে ড্রাইভার আঙ্কেলকে বলছে আমাদের গাড়িতে মেয়েটিকে হসপিটালে নিতে চান। কিন্তু ড্রাইভার আঙ্কেল রাজি হতে পারছে না। কারণ তিনি ভয় পাচ্ছেন। তিনি ভাবছেন যদি আমি কিছু বলি কারণ আমি এই সবে খুব ভয় পায়। এখন ও আমি ভয় পাচ্ছি। আমার হাত-পা কাঁপছে। অসম্ভবরকম কাঁপছে। কিন্তু শুধুমাত্র নিজের ভয়ে জন্য একজন মানুষের প্রাণ চলে যাবে। না এটা হতে পারে না। আমার যত ভয় করুক না কেন! আমাদের সাহায্য করতে হবে। আমি সাহস করে এবার কাঁপা গলায় ড্রাইভার আঙ্কেলকে রাজি হতে বললাম। আর মেয়েটিকে ধরে আমার পাশে শুইয়ে দেওয়া হলো। রক্ত দেখে আমার হাত কাপছে। আমার মাথা ঘুরছে তবু আমি নিজেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম নিজেকে ঠিক রাখার। আমাদের সাথে আর কেউ আসলো না কারণ এখানে যে কয়টা পুরুষ ছিল সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত। আমাকে আর ড্রাইভার আংকেলকে বলে গেল আমরা যেন ওনাকে হসপিটালে ভর্তি করে দেই আর ওনার ফোনটা আমার হাতে দিয়ে বলল। পরিবারের কাউকে কল করার জন্য। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা হাতে নিলাম। ২৫ মিনিট পর আমরা সিটি হসপিটাল এসে গাড়ি থামালো।
ফোন লক করা আমি কিভাবে কাউকে কল করবো। তাই কাউকে কল করা হলো না। কিন্তু হসপিটালে এসে দেখলাম রোগীকে সবাই চিনে। তিনি নাকি ডক্টর। তার নাম ডক্টর ইমা।হসপিটাল থেকে তার বাড়িতে খবর দিয়ে দিয়েছে কিন্তু তার আগেই ডাক্তার জানালো ইমিডিয়েটলি ও পজেটিভ রক্ত লাগবে। দরকারের সময় সবসময়ই সবকিছু ফুরিয়ে যায়। হসপিটালে ও পজেটিভ রক্ত নাই এখন বাইরে থেকে আনতে হবে। হাসপাতাল থেকে লোক পাঠানো হয়েছে কিন্তু তারা রক্ত পাচ্ছে না। কারন মাথায় আঘাত পেয়েছে গুরুতুর। ওখান থেকে রক্ত ব্লিডিং হচ্ছে তারা রক্ত বের হাওয়া থামিয়েছে। কিন্তু এখনই রক্ত দিতে না পারলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে এমনকি তার প্রাণ ও চলে যেতে পারে।
কিন্তু কারো রক্তের সাথে তার রক্ত মিলছে না। কি ঝামেলা? তখন আমার মাথায় এলো ও পজেটিভ তো আমার রক্তের গ্রুপ। আমি সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারকে সেটা জানিয়ে দিলাম। কিন্তু ডাক্তার আমার শরীর থেকে রক্ত নেবে না এত কম বয়সী কারো শরীর থেকে রক্ত নিবে না। এজন্য 18 বয়স লাগবে। আর আমার কেবল ষোলো। হায় আল্লাহ। আব্বুর অফিসে এখান থেকে কাছেই। আমি আব্বু কে ডেকে নিলাম কারণ আব্বুর রক্তের গ্রুপ ও পজেটিভ। আব্বু এলো ১০ মিনিটে এসেই রক্ত দিয়ে চলে গেল ততক্ষণে মেয়েটির মানে ইমা আপুর বাসা থেকে কেউ আসেনি। আমাকে এখানে থাকতে বলে চলে গেল। আমিও যেতাম না আপুটার খবর নিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি যাব। তখন ইহানকে দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে এই দিকে আসছে।ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে চুলগুলো এলোমেলো ছুটে ছুটে আসছে আমাকে হয়তো খেয়ালই করেনি ডাক্তারের কাছে গেল একটু পরে জানতে পারলাম ইমা আপু উনার বড় বোন। কডিটরি সামনে এসে আমাকে দেখে কপাল কুঁচকালো।
আমি কিছু বলবো তার আগে আরো তিনজন একজন মহিলা দুইজন পুরুষ কান্না করতে করতে এলো।এসেই সেই মহিলা ইহান কে জরিয়ে ইমা ইমা বলে কাঁদতে লাগলো। উনি হয়তো আপুর মা তাই এতো কাঁদছে। আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আছি।
#এক_চিলতে_রোদ-২
#Writer_Nondini_Nila
১০.
ক্লান্ত লাগছে অনেক তাই বাসায় চলে এসেছি। জ্ঞান ফিরতেই কাঁচের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছি আপুটাকে। জ্ঞান ফিরেছে দের ঘন্টা পর। একজনের উপরে দেখ করতে দিবে না। ইমা আপুর মা দেখা করতে গিয়েছেন। তখন আমি চলে এসেছি। আশার আগে একটু কথা ইহান এর সাথে হয়েছে।
বাসায় আসতেই আম্মু জিজ্ঞেস করল কি অবস্থা এখন। আমি জ্ঞান ফিরেছে বললাম। আব্বু ও জিজ্ঞেস করলো। আমি ফোন ঘেঁটে ইহানের নাম্বার খোঁজে বের করলাম। তারপর ভাবলাম একবার কল করে জিজ্ঞেস করে নিবো খবর? যেই ভাবা সেই কাজ।
সেদিন কল দিয়েছিল মিসকল লিস্টে আছে। খোঁজে নাম্বার পেয়ে গেলাম আর কল করলাম। প্রথমবার রিসিভ করলো না দ্বিতীয় বার করলো।
‘হ্যালো আসসালামু আলাইকুম!’
‘ ওয়ালাইকুম আসসালাম।’
‘ আমাকে চিনতে পেরেছেন?’
‘হুম ঊষা থ্যাংক ইউ সো মাচ। কালকে তুমি না থাকলে কি যে হত।’
‘আমি না থাকলেও কেউ নাই কেউ আপুকে ঠিক হসপিটালে নিয়ে যেতো। তাই চিন্তা করবেন না। আপু এখন কেমন আছে?’
‘আগের থেকে বেটার। ডক্টর বলেছে বিপদমুক্ত এখন।’
‘ও আচ্ছা। তখন তো দেখা করতে পারলাম না। আর জ্ঞান ফিরেছে শুনে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল তাই চলে এসেছি।হসপিটালে থাকবে আপু?’
‘কয়দিন থাকতে হবে!’
‘ওহ।’
‘হুম। আমাকে দোকানে যেতে হবে রাখছি।’
‘ আপনি কি এখনো হাসপাতালে?’
‘ হুম!’
‘আপনি কী হাসপাতালে থাকবেন?’
‘ না মা থাকবে আমি একটু পর চলে যাব।’
‘ ওহ আচ্ছা রাখছি।’
ফোন রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। খুব টেনশন হচ্ছিল। ফোন রেখে দিলাম। এখনো চোখ বন্ধ করলে আমার সেই রক্তাক্ত দৃশ্যটা মনে পড়ে আর শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। রক্ত দেখলে আমার ভয় লাগে। আর আজকে তো আপুটা রক্তাক্ত অবস্থায় আমার পাশে ছিলো। আমি যে কিভাবে নিজেকে কন্ট্রোলে করেছিলাম আল্লাহ জানে। খুব ভয় পেয়েছিলাম। আপুটা সুস্থ আছে শুনে এখন ভালো লাগছে। কিন্তু আমি বোধহয় আজকে একা রুমে ঘুমাতে পারবো না। কেমন জানি লাগছে। আমি আম্মুকে ডেকে নিলাম। আজ আম্মুর সাথে ঘুমাবো। তাই হলো আম্মু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। আর আমি আম্মুকে জরিয়ে ধরে চোখ বন্ধ করলাম।
হালকা পাতলা জ্বর দেখা দিলো ভয় থেকে।পরদিন বাসা থেকে বের হতে দিলো না। কিন্তু আমি বিকেলে একবার ইমা আপুকে দেখতে যাওয়ার বায়না করলাম।
‘আম্মু প্লিজ যেতে দাও না। এখন আমার শরীর একদম ঠান্ডা দেখো তুমি।’
‘তুই তো হসপিটাল সহ্য করিস না। ভয় পাচ্ছ তাও কেন যেতে চাইছিস আবার অসুখ বাধাবি নাকি।’
‘আম্মু বিলিভ মি আমার কিছু হবে না। কালকে তো ছিলাম দেখো আমি বেশি ভয় পাইনি। আমার আসলেই এক্সিডেন্টের কথা মনে পড়ে ওই ভয় থেকে রাতে জ্বর এসেছিল। কিন্তু এখন আমি একদম ঠিক আছি।’
‘তোকে নিয়ে পারি না চারটা বেজে গেছে সন্ধ্যা হয়ে যাবে তো!’
‘কিছু হবে না এখান থেকে বেশি দূর না তোমাকে বললাম তো। সন্ধ্যার আগেই চলে আসবো।’
‘ ড্রাইভারও নাই তোর আব্বু গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছি তুই জানিস। ড্রাইভার থাকলে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারতাম।’
‘ প্লিজ।’
‘ আচ্ছা যা। রাজি না হওয়া পর্যন্ত তুই কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করতেই থাকবি। তার থেকে যা তাড়াতাড়ি ফিরে আসবি।’
‘ওকে থ্যাংক ইউ আম্মু।’
আম্মু রাজী হতেই ড্রেস চেঞ্জ করে নীল থ্রি-পিস বের করে পড়ে নিলাম ঝটপট। তারপর বেরিয়ে পড়লাম। রিকশা নিয়ে যেতে দশ মিনিট লাগবে। হসপিটালে ঢুকে সোজা ইমা আপুর কেবিনে চলে গেলাম। আশেপাশে কাউকে দেখলাম না। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। আমি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছি। বেডের উপর ইমা বসে আছে আর তার সামনে সেম টু সেম ইমা আপুর কার্বন কঁপি দাঁড়িয়ে তার সাথে কিছু কথা বলছে। আপু ও তার দুর্বল গলায় একটা দুইটা কথা বলছে। আমি রসগোল্লার মত বড় বড় চোখ করে হা হয়ে তাকিয়ে আছি। দুইটা ইমা আপু। এটা কি করে সম্ভব? আমি কি চোখে ভুল দেখছি নাকি সত্যি? নাকি ভূত? ইমা আপুর মতো আরেকটা ভূত কি দাঁড়িয়ে আছে নাকি। এটা সিউর আমি নিশ্চিত। হসপিটালের বেডে যে শুয়ে আছে সে ইমা আপু। কারণ তিনি অসুস্থ। আর সুস্থ স্বাভাবিক ইমা ভূত।
তখন পেছন থেকে একটা পুরুষালী গলার আওয়াজ পেয়ে পেছনে তাকালাম। দেখি ইহান আমার দিকে ব্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
‘আরে ঊষা! তুমি কখন এলে?’
আমি ঢোক গিলে বললাম,,”এইমাত্র।’
‘ও আপুর সাথে দেখা করতে এসেছ?’
‘ হুম।’
‘ভেতরে না গিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?’
‘ভেতরের আমি যাব না। আমি ভূত দেখেছি।’
‘ হোয়াট?’
‘ ভেতরে দুই টা ইমা আপু একটা ভূত আপুর সাথে কি যেন কথা বলছে। আমি ভেতরে যাবো না। আমি চলে যাই। আমি ফোন করে জেনে নেবো আপুর খবর।’
‘ঊষা, আর ইউ ম্যাড! কি সব আবোল তাবোল বকছো! ভূত আসবে কোথা থেকে! তাও আবার এই দিনের বেলা। আর ভূত বলতে কিছু নাই ওকে। আজেবাজে বকা অফ করো।’
‘ আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না কেন? দাঁড়ান আমি আপনাকে দেখাচ্ছি!
বলে ঊষা ইহানের ডান হাতের বাহু শক্ত করে ধরে টেনে দরজা থেকে উঁকি দিয়ে বলল,
‘ ওই দেখুন দাঁড়িয়ে আছে ভূতটা। একদম ইমা আপুর মতো দেখতে।’ তোতলানো কন্ঠে বলল ঊষা। ভয়ে ওর শরীর থরথর করে কাঁপছে।
ইহান ঊষার কথা ও ওর অবস্থা দেখে হো হো করে হেসে দিলো। ইহানের হাসির শব্দ শুনে ইমা ইলা দুজনে দরজার দিকে তাকালো চমকে।
ঊষা ভীতু মুখ করে একবার ভেতরে ইমা-ইলার দিকে তো একবার ইহানের দিকে তাকাচ্ছে।
‘কি হয়েছে আপনি পাগল ছাগলের মত হাসছেন কেন? আমি এখানে হাসির কি বললাম? এটা সিরিয়াস কথার মাঝে কেউ হাসে অদ্ভুত!’ রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলাম।
ইহান আমার হাত টেনে ইমা আপু ও ভূতের সামনে এনে দাড় করালো। আমি ভয়ে ইহানের হাতের শার্ট খামছে ধরলাম।
‘ ঊষা সি ইজ মাই সিস্টার ইলা।আর ইমা কে তো চিনোই। যাকে তুমি কালকে হসপিটালে ভর্তি করেছো।আর তোমার বাবা যাকে রক্ত দিয়েছিল। এরা দুজন টুইন। কোন ভুত-প্রেত না এত ভয় পাওয়ার কিছু নাই।’
বলেই আবার হেসে উঠলো। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে আছি। ইহানের হাত ধরেছিলাম দেখে আমি আরো লজ্জা পেয়ে দূরে সরে দাঁড়ালাম।ইলা মেয়েটা কপাল কুঁচকে আমাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। আমি তার যাওয়ার দিকে আড় চোখে তাকালাম।এরা টুইন। আমার টুইন বেবি খুব পছন্দ কিন্তু এরা তো বড়।একদম সেম টু সেম একটুও অমিল নাই। এদের তো আমি কখনোই চিনতে পারবোনা। দুজনকে গুলিয়ে ফেলতাম।
ইমা আপু তখন আমাকে ডেকে তার পাশে বসতে বলল আমি গুটি গুটি পায়ে তার পাশে গিয়ে বসলাম।ইমা আপুর সাথে অনেকক্ষণ গল্প করলাম কি অমায়িক ব্যবহার। আর কি মিষ্টি হাসি। অসুস্থতার মাঝেও তিনি হেসেছে। আমাকে তো ছোটবোন বানিয়ে ফেলেছে। এত সুন্দর ব্যবহার আমিও তার গল্প করতে করতে সন্ধ্যা বানিয়ে ফেললাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতে পেলাম বাইরে অন্ধকার হয়ে আসছে। তা দেখে আমি লাফিয়ে উঠলাম বসা থেকে।রুমে আমি আর ইমা আপু গল্প করছিলাম এতক্ষণ। কখন দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনাই।
‘আপু আজ আসি সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমাকে খুব বকা দিবে আম্মু। আম্মু সন্ধ্যার আগে ফিরতে বলেছিল। এখন আমি কিভাবে যাব। বাইরে তো অন্ধকার হয়ে আসছে। আযান কখন দিল আমিতো কিছুই শুনতে পেলাম না।’
‘আমি বুঝতে পারিনা! কিন্তু তুমি চিন্তা করো না দাড়াও আমি ইহান কে কল করছি।ও তোমাকে পৌছে দেবে।’
‘ তার দরকার নাই। আমি দেখি। একাই যেতে পারবো।’
‘না না তুমি একা গেলে আমার খুব চিন্তা লাগবে। তুমি বসো আমি ইহানকে কল করছি।’
আমার কথা শুনল না জোর করেই ইহান কে কল করে ডেকে আনলো। তারপর তার সাথেই যাওয়ার জন্য বললো।
#চলবে………
#চলবে…….