#তুমি_চেয়েছো_বলে
#নাজনীন_আক্তার
পর্ব-২
কিন্তু পেছনে তাকাতেই শরীর অবশ হয়ে এলো আমার। পা থমকে দাঁড়ালো। গ্রামের ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ তীব্রভাবে শরীরে অনুভূত হতে থাকলো। আমি অবশ হয়ে আসা শরীর নিয়েই তার চোখে চোখ রাখলাম। তিনি তখনও এক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছেন। যতক্ষণ আমাকে দেখা গেছে ততক্ষণই গভীর দৃষ্টিতে দেখেছেন। আর আমি! আমারও অবাধ্য চোখ শেষ পর্যন্ত নজর পরিবর্তন করতে পারেনি।ব্যস! এভাবেই শুরু হয়েছিল আমার সেই সর্বনাশা পথের যাত্রা!
গ্রামের দিনগুলো সাধারণত একটু ভোরবেলাতেই শুরু হয়। চারিদিকে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ, মক্তবে বাচ্চাদের সমস্বরে উচ্চারিত ধ্বনি, পুকুরপাড়ে বউদের হাসাহাসি, মেঠোপথে সকলের একসাথে কাজে যাওয়া। এসবকিছু মিলেই সুন্দর একটি দিনের সূচনা হয়। তারউপর আজ বাড়িতে অনুষ্ঠান আছে। বাজার করা, সবজি কাটা-বাছা, বাচ্চাদের হৈ-হুল্লোড়, সবকিছু মিলে এ বাড়ির দিন আরও আগে শুরু হয়েছে।
সকলের চেঁচামেচিই অবশ্য আমার কানে এসেছে। এ পরিবেশে ঘুমানো অসম্ভব হলেও আমি কানের উপর বালিশ চেপে তখনও বিছানায়। মা কয়েকবার ডেকে গেছেন ইতোমধ্যে। কিন্তু রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়াতে আমি কোনোভাবেই চোখ মেলে তাকাতে পারছি না। কী করেই বা ঘুম হবে! এত মানুষজন! এই এতটুকু বিছানাতেই কালকে আটজন ঘুমিয়েছি আমরা। এরমধ্যে কেউ আবার শরীরের উপর হাত তুলে দেয়, তো কেউ আবার পা তুলে দেয়! উফ! আর থাকবো না এখানে আমি। আজই বাড়ি যাব!
এসব চোখ বন্ধ করে চিন্তা করতে করতেই হঠাৎ কাঁথাতে টান পেলাম। আমি মুখ কুঁচকে আবার কাঁথা টান দিতেই আমার মামাতো ভাই আদরের গলা পেলাম। সে খুব তাড়াহুড়োর সুরেই বললো,
“এই আপু, উঠে পরো তাড়াতাড়ি। এত বেলা পর্যন্ত কেউ ঘুমায় নাকি! এত অলস হলে কিন্তু তোমার একদম বিয়ে হবে না। এমন চোখ-মুখ কুঁচকে পেত্নীর মতো মুখ না করে উঠে পরো।”
বছর আটেক ছেলের মুখে এমন কথা শুনে লাফ দিয়ে উঠলাম আমি। চোখ বড়বড় করে ওকে দেখছি। ওর মুখে তখন দাঁত বের করা ভোলাভালা হাসি।
“এসব কে বলেছে তোকে? আমার বিয়ে নিয়ে এত চিন্তা! কার এত্ত সাহস?”
“সৈকত ভাই বলেছে। ভাইয়ার অনেক সাহস। নদীর ধারের ইয়া বড় বড় তাল গাছে উঠে তাল পেরেছে। বলেছে নারকেল পেরেও খাওয়াবে আমাদের।”
“সৈকত ভাই কে?”
“আরে ওইযে চশমা পরা ভাইটা। যে বেশি পটি করে বলে ঢাকা থেকে এসেছে। আর বেশি বেশি পানি খাচ্ছে এখানে এসে।”
আদরের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালাম আমি। তার নাম তাহলে “সৈকত”! জানা ছিল না আমার। অবশ্য জানবো কীভাবে! শুধু সেই লম্বাটে, ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটাকে দেখেই তো আমার মাথা আঁওলে গেছে। বাকি কিছু জানার আর সুযোগ হয়নি। কিন্তু তার আমাকে নিয়ে এমন মন্তব্য!
চোখমুখ কুঁচকে আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম,
” চোখমুখ কুঁচকে পেত্নীর মতো আছি, এটা কে বলেছে?”
“সৈকত ভাই।”
“তিনি কীভাবে জানলেন? এ ঘরে এসেছিলেন?”
“না তো। আমাকে এর আগে ছয়বার পাঠিয়েছেন তোমাকে ডাকতে। এসে দেখি তুমি চোখ একদম কুঁচকে ঠোঁটের কাছে নিয়ে গেছো। ওটাই যেয়ে বলেছি। তখন সৈকত ভাই তোমাকে পেত্নী বলেছে। কিন্তু কোন গাছের পেত্নী তুমি? আপু তুমি কি শেঁওড়া গাছের পেত্নী?”
কথাগুলো বলেই মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসতে লাগলো আদর। এদিকে আমার মাথায় হাত। একদিকে রাগে শরীর জ্বলছে, অন্যদিকে বুকের মাঝে চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। কিন্তু রাগটাকেই প্রাধান্য দিলাম। ভালোলাগা জলে যাক। বেঁচে থাকলে আরও অনেককে দেখেই ভালো লাগবে। অনেক সুপুরুষ আছে পৃথিবীতে। কী খারাপ! আমাকে কীনা পেত্নী বলেছে!
এসব মনে মনে ভেবেই রাগে গজগজ করতে করতে উঠলাম আমি। যে আমাকে পেত্নী বলেছে সে কী জানে, রোজ কতজন ছেলে পথের ধারে আমার জন্য অপেক্ষা করে! আমাকে একটু দেখতে! এখনই কত বিয়ের প্রস্তাব আমার বাসায় আসে! কতগুলো প্রেমপত্র এখনও পর্যন্ত পেয়েছি আমি! আমাকে নায়িকাদের মতো দেখতে বলে সবাই। আর সে কীনা আমাকে পেত্নী বলল! না বৃষ্টি! যে তোর কদর করতে পারলো না, তাকে আর মনের ভেতর রাখা যাবে না। সব ভালোলাগা বাদ! আর চিন্তা করা যাবে না তার কথা।
কিন্তু হায়রে বোকা কিশোরী মন! তা কি তখনও বুঝেছিল! যে এই ভালোলাগাকে সে ত্যাগ করতে পারবে না? বরং জীবনের প্রথম ভালোলাগা ভালোবাসা হয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্টে সারাজীবন অনুভূতির বাঁধনে বেঁধে রাখবে! এই মরনযন্ত্রণার অনুভূতি থেকে তার যে আর রেহাই নেই! বুঝেছিল তখন সেই বোকা মন?
আমি বিরক্তির চোখে তাকাতে তাকাতে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। বের হতেই প্রথম দেখা হলো সেই খারাপ লোকের সাথে। আমি মুখ ঘুরিয়ে উল্টোপথে যেতে নিলেও তিনি পিছু ডাকলেন। গলা উঁচিয়ে বললেন,
“এইযে খুকী, অনুষ্ঠান বাড়িতে সকাল নয়টা পর্যন্ত ঘুমাও কীভাবে? একটু হাতে হাতে কাজ করে দিলেও তো পারো। এমন অলস হলে কিন্তু তোমার বিয়ে দেওয়া কষ্টের হয়ে যাবে।”
তার কথা শুনে আমি দ্রুত এদিকওদিক চাইলাম। ভরা অনুষ্ঠান বাড়িতে কয়েকজনই তার কথা শুনে মুখ টিপে হাসছে। লজ্জা আর রাগে মাথা নত হয়ে এলো আমার। আমার বিয়ে নিয়ে এই ছেলের এত চিন্তা কেন! না হোক আমার বিয়ে, তাতে তার কী! এর মধ্যে আমার মা কোথাথেকে তাড়াহুড়োর সাথে এসে উত্তর করে আবার দ্রুত চলে গেলেন।
“হ্যাঁ, বাবা। এই মেয়েটা যে এমন হলো কীভাবে! এর বিয়ে নিয়েও আমার ভারী চিন্তা!”
“আপনার চিন্তা বুঝতে পেরেছি ফুপু। এত অলস মেয়েকে বিয়ে দেওয়া কষ্টেরই হবে।”
ইশ! কী করুণ সুরেই না কথাটা বললো! যেন কী কষ্টটাই পাচ্ছে! হে আল্লাহ! জীবনে প্রথম একজনকে ভালোলেগেছিল, আর তার কীনা এই রূপ বের হলো! এত খারাপ! বিরক্তিতে কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে আমি ওখান থেকে সরে যেতে চাইলাম। কিন্তু তা কী আর হলো! সেই যে আমার প্রথম ভালো লাগা! সে তো ঠিকই যাওয়া আটকে দিল আমার। পেছন থেকে পুনরায় গলা উঁচিয়ে ডাকলো।
“কোথায় যাচ্ছো মেয়ে? যাও তো আমার জন্য টিউবওয়েল থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি আনো। দ্রুত!”
আমি তার এমন আদেশের সুর শুনে আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। কঠিন চোখে এবার তার দিকে তাকালাম। সে বোধহয় আমার শক্ত নজরেই থামলো। একটা ঢোক গিললো মনে হলো। তারপর মিনিমিনিয়ে উত্তর করলো,
“অসুস্থ তো আমি। ডাক্তার বেশি বেশি পানি খেতে বলেছে। এদিকে সকাল থেকে একটুও পানি খাইনি।”
আমি আর কিছু না বলে পানি আনতে গেলাম। যতই রেগে থাকি, তারপরও এই বোকা মন তো মুখ ঘুরিয়ে থাকতে পারল না। প্রথম ভালোলাগা বলে কথা! ঠিকই চটজলদি গ্লাস জোগাড় করে তাকে পানি দিলাম। ব্যস! তিনিও পেয়ে বসলেন। এরপর তার সেই ভোলাভালা চেহারাতে আমাকে ভুলিয়ে সেবার মোট আঠারো গ্লাস পানি নিয়েছিলেন তিনি। তাও মাত্র কয়েকঘন্টার মাথাতে! ওইযে সকাল থেকে দুপুরের মধ্যেই!
দুপুরের পরপরই বাড়ি ফাঁকা হতে শুরু করলো। সবাই দুপুরের বিশাল খাবার আয়োজন শেষ করেই যার যার নিজ গন্তব্যে ফেরত যাচ্ছে। আমরাও হয়তো তাড়াতাড়িই চলে যাব। কিন্তু এরমধ্যেই বাচ্চা পার্টি কীভাবে কীভাবে যেন তাদের সৈকত ভাইকে মানিয়ে গুছিয়ে নদীর পাড়ে নিয়ে গেছে। ওদিকে কিছু নারকেল গাছ আছে। তার থেকেই কিছু ডাব পেরে তাদের খাওয়াতে হবে।
আমি প্রথমে যাব না যাব না করেও পরে গিয়ে ঠিক হাজির হলাম। অবাধ্য মন তো আর মানতে চাই না! মানুষটা একটু পরেই চলে যাবে। ভাবলেই তো চোখ ভিজে আসছে। হৃদয়ের ভিতর একটু একটু করে ক্ষত তৈরি হচ্ছে। তাই রিমি আপাকে নিয়েই নদীর পাড়ে ছুটে গিয়েছিলাম। আড়চোখে দূর থেকে তাকে যতটুকু দেখা যায়! মন ভরে নাহয় একটু দেখেই নিই!
যাওয়ার সময় সাথে করে আবার পানির বোতলও নিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি নাকি যাওয়ার সময় পানি নিয়ে যেতে বলেছেন আমাকে। এটা শুনেই আমার মাথায় হাত দেওয়া অবস্থা! এখানেও পানি! পেয়েছেটা কী আমাকে! কিন্তু তারপরও নিজেকে শান্ত করে পানি নিয়ে নিলাম। চিন্তা হলো একটু! মানুষটা পানি না খেলে তো আবার অসুস্থ হয়ে পরবে। ডাক্তার বেশি বেশি পানি খেতে বলেছে কীনা!
নদীর পাড়ে যেয়েই দেখি হইহই অবস্থা। সবাই ডাব খাওয়াতে ব্যস্ত। বড়রাও যেন ছোটদের সাথে আজ শামিল হয়েছে। সবাই মাটিতে বসেই খাওয়া শুরু করেছে। এদিকটা একটু ফাঁকা। তেমন ঘরবাড়ি নেই। চারিদিকে তাকালে বেশ জায়গা জুড়ে শুধু গাছগাছালিই দেখা যাবে। আমি আর রিমি আপা সেখানেই বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। সবাই ততক্ষণে বাড়ির পথে যাওয়া শুরু করেছে। তখনই দূরে সৈকতকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। একজন বয়স্ক মানুষের সাথে কথা বলছে।
আমি তার দিকেই এগিয়ে গেলাম। পানির বোতলটা তো দেওয়া হয়নি। মানুষটা না জানি কতক্ষণ পানি না খেয়ে আছে! তার তো আবার একটু পর পর তেষ্টা পায়! এসব ভাবতেই পায়ের গতি বাড়ল আমার। দ্রুত পথ চলতে থাকলাম। ততক্ষণে রিমি আপা সহ বাকিরাও সে স্থান ত্যাগ করতে ব্যস্ত। আমি সৈকতকে পানি দিয়েই ওদের সাথে যোগ দেব ভাবলাম।
কিন্তু তাদের কাছে যেতেই বৃদ্ধা মহিলাটি আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন। তা দেখে সৈকতও আমার দিকে তাকালো। আমি অপ্রস্তুত হয়ে তাদের চোখেমুখে তাকাতে লাগলাম। বৃদ্ধার দৃষ্টিও কেমন অন্যরকম লাগছে! অদ্ভুত, অন্যরকম এক চাহনি! বৃদ্ধা পুনরায় হেসে সৈকতের উদ্দেশ্যে বললেন,
“তোমার বউ বুঝি? ভারী মিষ্টি দেখতে। দুজনের সুখের সংসার হোক। অনেক দোয়া থাকলো।”
কথাগুলো শুনতেই আমি চমকে উঠলাম। চোখ বড় বড় করে সৈকতের দিকে তাকালাম। তারও দেখি একই অবস্থা। কিন্তু আমি বোধহয় একটু বেশিই কথাগুলো হজম করতে পারলাম না। তাই তো তার ভুল ভাঙাতে বলে উঠলাম,
” না, না! একি বলছেন! আমরা স্বামী-স্ত্রী না।”
“ও তাই! একটু ভুল হয়ে গেল। কিছু মনে করো না, মা। তাহলে তোমরা সম্পর্কে কী হও?”
“ভাই-বোন।”
“আচ্ছা! তবে তোমাদের দুই ভাই-বোনের সুখের সংসার হোক।”
কথাটুকু শুনতেই চোখ বন্ধ করে ফেললাম আমি। শেষমেশ কীনা পছন্দের মানুষকে ভাই বলতে হলো। কিন্তু কী করতাম আর! গ্রামের মানুষ তিনি! ভাই-বোন না বললে অন্য রকম কিছু ভেবে নিতেন। গ্রাম জুড়ে অন্য কথা রটে যেত। তাই তো এই পরিচয় দিলাম। কিন্তু তবুও মানতে পারছি না। অসহ্য অনুভূতিতে চোখমুখ কুঁচকে এলো আমার।
হালকা করে চোখ খুলে সৈকতের দিকে তাকালাম। সেও তখনও আমার দিকেই তাকিয়ে। যেন চোখ দিয়েই আমাকে ভস্ম করে দেবে। তার মুখেও বিরক্তির আভা স্পষ্ট। দুজন চোখাচোখি করেই বেশ অনেক সময় কাটালাম। ভুলেই গেলাম একটু আগেই যাতে অন্যরকম সম্পর্ক ভেবে না নেই, এজন্যই এক বৃদ্ধাকে ভাইবোনের পরিচয় দিলাম। আর এখনই দুজন এই অবস্থায়! যখন মনে পরলো তখন চারিদিকে তাকিয়ে দেখি সেই বৃদ্ধা নেই।
আমি দ্রুত আশপাশটা ভালোমতো দেখে নিলাম। চারিদিকে খুঁজলাম নিজের অজান্তেই। কিন্তু বৃদ্ধা কোথাও নেই। আমার খোঁজাখুঁজি দেখে সৈকত এবার মুখ খুললো,
“তিনি চলে গেছেন হয়তো।”
“কীভাবে? আমরা তো এখানেই ছিলাম। চলে গেলে দেখতাম না?”
“দুজনের নজর যদি দুজোড়া চোখেই আবদ্ধ থাকে, তবে অন্যকিছু সে নজরে পরবে কীভাবে?”
কথাগুলো কানে আসতেই সৈকতের দিকে তাকালাম আমি। সে দূরে দৃষ্টি দিয়েছে। ঠোঁটে অদ্ভুত হাসির রেখা। বেশকিছুক্ষণ সেভাবে রেখেই এবার সে নজর সরিয়ে আমার চোখের সাথে চোখ মেলালো। শান্ত কিন্তু গভীর দৃষ্টি! আচ্ছা, এই পৃথিবীর সবকিছু নজর থেকে আড়াল করার জন্য এই চোখ দুটোই কী যথেষ্ট নয়? আমি তো সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম সেদিন। আমার সেই নীতিবাক্য মেনে বড় হওয়া, সেই আমার যৌথ পরিবারের নিয়মকানুন, এইযে এতটা বয়সের পার্থক্য। কিচ্ছু মাথায় ছিল না সেদিন।
সৈকত সেদিন আমার চোখে চোখ রেখেই ধীর গতিতে বলে উঠলো। যেন খুব যত্ন করেই শব্দগুলো উচ্চারণ করলো। নাহলে কাঠখোট্টা লোকের থেকে এমন কথা কী বের হওয়া সম্ভব? সে মায়ামাখা কণ্ঠেই বলে উঠলো,
“তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাও খুকী! যতটা বড় হলে তোমায় বিয়ে করে নেওয়া যাবে, ঠিক ততটা! আর আমার অপেক্ষা করো কিন্তু।”
কথাগুলো বলেই সৈকত পা বাড়ালো। আমার উত্তরের আশা করলো না। ধীরে গতিতে আমার দৃষ্টির আগাল হতে থাকলো। কিন্তু আমি নড়তে পারলাম না। ঝাপসা দৃষ্টিতে শুধু তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকলাম। আমাকে এভাবেই এখানে রেখে চলে গেল? এরকম নিঃসঙ্গ এক পথে! আচ্ছা, সে পেছন ফিরে কি একবারও তাকালো?
আমার সেই যে কিশোরী বয়সের আবেগ, প্রথম ভালোলাগা, প্রথম অচেনা অনুভূতি! এভাবেই সবটা চলে যাচ্ছে? আচ্ছা, সৈকতের চোখও কী আজ ঝাপসা হয়ে এসেছে? আমারই মতো? এত অল্প সময়েও কী কারও সাথে এতটা জড়িয়ে যাওয়া সম্ভব! আমি দ্রত চোখ বন্ধ করে ফেললাম। মনে মনে বারংবার উচ্চারিত করলাম,
“অপেক্ষা করব আমি। শুধু তোমারই অপেক্ষা! তোমার জন্য অপেক্ষা! তোমাকে আবার দুচোখ ভরে দেখবার অপেক্ষা।”
কিন্তু মনের কাছেই একটা প্রশ্ন ফিরে এলো। মনে হলো কেউ বারবার এই প্রশ্নটাই আমার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। শক্ত গলায় বলছে,
“কিন্তু কেন? কেন অপেক্ষা করবে তুমি?”
আমি টলমল করা চোখ আর ঠোঁটে হালকা হাসি জড়িয়ে বিরবিরিয়ে উঠলাম,
“কারণ শুধু তুমি চেয়েছ বলে!”
(চলবে)






