তুমি চেয়েছো বলে পর্ব-০৩

#তুমি_চেয়েছো_বলে
#নাজনীন_আক্তার
পর্ব-৩

শুনেছি কম বয়সের ভালোবাসা নাকি ভীষণ আঠালো হয়। আর সে আঠার জোরও মারাত্মক। কোনোভাবেই ছাড়ানো যায় না। পিরিতের আঠা বলে কথা! তেমনই আমার ক্ষেত্রেও সেই আঠার কার্যকারীতা ভয়ঙ্কর হলো। এক সুন্দর দিনের শেষ বেলায় যে পুরুষকে মনে গেঁথে নিয়েছিলাম, সে যেন আমার মনের মধ্যেই ভীষণভাবে জোড়া লেগে গেল। দিন যায়, মাস যায় কিন্তু সেই আঠার ক্ষমতা দুর্বল হয় না।

এভাবেই দিন যাচ্ছিলো। সেই উল্টোপাল্টা কথাবলা ছেলেটাকে ভেবে ভেবেই আমার মারাত্মক ব্যস্ততম দিনও যেন সুন্দর যেতে থাকলো। শুধু সুন্দর নয়, বরং মারাত্মক সুন্দর! বিদঘুটে গরমে বিশাল জ্যামের মধ্যে বসেও তার কথা ভেবে অদ্ভুত শীতলায় আমার মুখে হাসি বিরাজ করতো। তাকে ভেবেই যেন ম্যাথের মতো রসহীন ক্লাসও ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসে করে ফেলতাম।

তবুও তার ভাবনাগুলো কিন্তু আমার মস্তিষ্ক হতে এতটুকু ম্লান হতো না। যেন এইতো সেদিনই তাকে প্রথম দেখলাম। এইতো চোখ বন্ধ করলেই স্পষ্ট তার চেহারা ভেসে ওঠে। এইতো আমার সামনেই তিনি। যেন চাইলেই একটু ছুঁয়ে দিতে পারব।

তখন আমাদের এই যৌথ পরিবারে এত কম বয়সে ছেলেমেয়েদের হাতে ফোন দেওয়া হতো না। আমার কোনো ভাইবোনেরই ফোন নেই। সবাই তাদের বাবা-মায়ের ফোনই ব্যবহার করতো। আমিও মায়ের ফোনে টুকটাক গেইম খেলতাম আর খুবই গোপনে মাঝে মাঝে বাবার নামে খুলে রাখা ফেসবুক একাউন্টে লগইন করতাম। আমার বান্ধবীদের বেশিরভাগেরই তখন ফোন আছে। আর আছে ফেসবুক নামক এই আধুনিকতার ছোঁয়া। তাদের থেকে নানানগল্প শুনেই এ জিনিসে অদ্ভুত আকর্ষণ হতো আমার। কিন্তু কিছু করারও ছিল না। আমার পরিবারে এ ব্যপারে তো কঠোর নিষেধাজ্ঞা।

যদিও আগে নিজের নামে ফেসবুক খোলার এতোটা ইচ্ছা ছিল না আমার। বরাবরই ফেসবুকে লগইন করে টুকটাক সকলের ছবি দেখে বের হয়ে যেতাম। তাই নিজের নামে খোলার তেমন কারণ পাইনি। কিন্তু সেবারই প্রথম আমার নিজের নাম আর ছবি দিয়ে ফেসবুক খুলতে ইচ্ছা হলো। কিন্তু পরিবারের ভয়ে সাহস হলো না! আমি টানা কয়েকদিন নানা ভাবে “সৈকত” নামটা দিয়ে সার্চ করলাম। কিন্তু তার একাউন্টটা আর খুঁজে পেলাম না। অবশ্য শুধু ডাকনাম দিয়ে কী খুঁজে পাওয়া যায়! তার তো অন্য নামও থাকতে পারে।

তাই আমার সেবারই মনে হলো, ইশ! যদি আমার নিজের একটা একাউন্ট থাকতো। সে কি আমার মতো করে আমাকে খুঁজছে না? আমি না পেলেও সে তো আমাকে ঠিকই খুঁজে বের করতে পারতো! তাকে আবার এক নজর দেখার, একটু তার খবর জানার, তার জীবন সম্পর্কে জানার খুব ইচ্ছা হলো আমার। প্রতিনিয়ত যেন ছটফট করতে থাকলাম।

এর কিছুদিন পরেই অবশ্য আমার সেই ছটফটানি কমলো। আমি তার খোঁজ পেলাম। তার ছবিগুলোই মন ভরে দেখার সুযোগ পেলাম। আমি সেই মানুষটাকে না জানলেও, না চিনলেও আমারই খুব কাছের একজন চিনতো। ওইযে রিমি আপু! রিমি আপু আমার আম্মুর মামাতো বোনের মেয়ে। তারা আমাদের এলাকাতেই থাকতো। একসাথেই আমাদের বড় হওয়া। তাই ছোট থেকেই আমাদের মাঝের সম্পর্কটা ভীষণ মধুর। তাদের বাড়িতেও আমার অবাধ যাতায়াত।

রিমি আপুর অনেক আগে থেকেই ফোন আছে। সাথে ফেসবুকে একাউন্ট। এর আগেও বহুবার আমি আর আপু মিলে ফেসবুকের নানান পোস্ট দেখে খুব হাসাহাসি করেছি। এমনই একদিন আপুদের বাসায় আপুরই বিছানায় আমরা দুজন মিলে ফেসবুকের বিভিন্ন জনের পোস্ট দেখছি। আপুর হাতেই ফোন। তিনি স্ক্রল করছেন আর আমি পাশ থেকে নানান মন্তব্য করছি।

কিন্তু হঠাৎ একটা পোস্ট দেখেই থমকে গেলাম আমি। চমকে উঠলাম। একটা ছবি! ভুল দেখলাম না তো! এটা ভেবেই কয়েকবার চোখ বন্ধ করে আবার খুললাম। আপু ততক্ষণে স্ক্রল করে নিচে নেমে এসেছেন। আমি দ্রুত স্ক্রল করে আবার উপরে নিলাম। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো হাস্যোজ্জ্বল এক পুরুষের মিষ্টি চেহারা। কালো শার্ট পরিহিত, চোখে চশমা, হাতে সুন্দর সিলভার ডায়ালের ঘড়ি। হাত উঠিয়ে চুল ঠিক করছেন তিনি।

আমার হাত নড়ে উঠলো। ভিতরটা একটু কেঁপে উঠলো। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। কতগুলো দিন পর দেখলাম! তবুও এতটুকু চিনতে ভুল হয়নি আমার। আমি দ্রুত উপরে নামের দিকে তাকালাম। চোখে পরলো “সৈকত শাহরিয়ার” নামটা! কয়েকবার আপনমনে শব্দ দুটো বিড়বিড়িয়েও উঠলাম।

রিমি আপু তখন পাশ থেকে ডেকে উঠলো। তার চোখে মুখে হালকা বিস্ময়। হয়তো হঠাৎ আমার এমন থেমে যাওয়ার কারণ বুঝতে পারছে না। আবার হয়তো অনেক কিছুই বুঝতে পেরেছিলো! আপু চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে প্রশ্ন করলেন,

“কী হয়েছে, বৃষ্টি?”

আমি ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছি। মুখের রেখা পুনরায় পরিবর্তন করে আগের রূপে নিয়েছি। তাই দ্রুত উত্তর করলাম,

“কই আপু! কিছুই তো হয়নি।”

“তাহলে এমন থেমে গেলি কেন! স্ক্রল করে আগে আনলি!”

“এইযে ছবিটা হঠাৎ চেনা চেনা লাগলো তো তাই। খুব পরিচিত মনে হচ্ছে!”

“ওহহো, তুই চিনতে পারিসনি! এটা তো সৈকত ভাই। ওইযে তোর নানুবাড়ির দাওয়াতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ভুলে গেলি এরমধ্যেই!”

“ওহ হ্যাঁ, মনে পরেছে!”

উত্তর করেই থামলাম আমি। ভাঙা ভাঙা বুলিতে আর কীইবা বলব! যদি আপু কিছুটা বুঝে ফেলে! আমি তাই খুব কষ্টেই আপুর সাথে স্বাভাবিক থাকলাম। কিন্তু আমার এই প্রচেষ্টা হয়তো খুব একটা সফল হলো না। তাইতো একটু পরেই আপু আবার চিন্তিত চেহারাতে আমাকে প্রশ্ন করলো,

“শুধু কি চেনা চেনা লাগলো বলেই থামলি বৃষ্টি?”

আমি প্রশ্নটা শুনে চমকে উঠলেও ধীরে ধীরে ভাঙা কণ্ঠে উত্তর করলাম,

“হ্যাঁ আপু! এছাড়া আর কেন থামবো!”

ব্যস! এভাবেই “সৈকত শাহরিয়ার” নামক উল্টোপাল্টা পুরুষের একটা খোঁজ পেয়েছিলাম আমি। তারপর রোজ যে গোপনে কতবার তার ফেসবুক একাউন্টটা ঘেটেছি! তার সমস্ত তথ্য এখনও আমার মুখস্ত। তিনি ফেসবুকে ভীষণ একটিভ। রোজই নানান কিছু তিনি ফেসবুকে জানান। আর আমি খুব যত্ন করেই তার জীবনের যাবতীয় ঘটনার বর্ণনা পড়ি।

এইতো সেদিন তিনি একটা কফিশপে যেয়ে একা এক কাপ কফি খেলেন। হয়তো তার মন খারাপ ছিল। আমিও ঠিক তার পরেরদিন বেশ সময় নিয়ে একটা কফিশপে একা কফি খেলাম। তার কিছুদিন পরেই তিনি বন্ধুদের নিয়ে বান্দরবান ঘুরতে গেলেন। আমিও আমার বন্ধুদের সাথে প্ল্যান করে পাশেই একটা পার্কে ঘুরতে গেলাম।

তার বোধহয় কালো রঙ পছন্দের। প্রত্যেক শুক্রবার তিনি কালো রঙের একেকটা পাঞ্জাবি পরে ছবি তুলেন। আমিও তাই প্রতি শুক্রবার কালোকেই নিজের শরীরে জড়াতাম।তিনি মাঝরাতে বই পড়তেন। হুমায়ুন তার পছন্দের। আমি আমার বইয়ের আলমারিটা হুমায়ুনে ভরিয়ে ফেললাম। তার বিকেল বেলার আকাশ পছন্দ। আমি তাই আমার সমস্ত বিকেলগুলো ছাদে কাটিয়ে দিতে লাগলাম। ওইযে দূর আকাশে তাকিয়েই নিজের সমস্ত কথা তাকে চোখ বন্ধ করে বলতে থাকলাম।

সৈকত শাহরিয়ার নামক ছেলেটাকে নিজের সাথে যেন সম্পূর্ণ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেললাম। এরকম করে চললো বেশ কয়েকটা বছর। তিনটে বছরতো হবেই। এখন আর তার ফেসবুকের পোস্ট দেখে আমাকে কিছু করতে হয়না। বরং কখন তিনি কী করবেন সে সবটাই আমি আন্দাজ করতে পারি। এইতো আজ তিনি একা কাপ কফি খাবেন। রাতের বেলা তার মেসের পাঙ্গাশ মাছের তরকারিতে নাক সিটকিয়ে তিনি বিরিয়ানি কিনে খাবেন। একটু অবাক করা বিষয় হলেও, তার রোজকার জীবনের এই ছোটোখাটো ঘটনাগুলোও আমার জানা!

আমি নিশ্চিত তার কোনো কাছের কেউ আমাকে দেখলে, আমাকে স্বভাবে তার ফিমেল ভার্সন বলতে পারে। অবশ্য কেন বলবে না! এইযে আমার পড়ার টেবিলটা। উপরের তাকের একপাশে বই আর একপাশে খাতা। মাঝে কলমদানী। কলমদানীর মাঝে আবার কাগজ সাটা। আর তাতে লেখা, “Write your dreams!” আর নিচের তাকটা একদম ফাঁকা। কারণ সৈকত সাহেব মাঝেসাঝে এটা ওটা জিনিস ওই তাকে রেখে খেতে খেতে পড়াশোনা করেন। তার কলমদানিটাও কিন্তু এমন। তিনি ম্যাটাডোরের একটা কলম ছাড়া লিখতেও পারেন না। আমার কলমদানি জুড়েও এখন তাই এই কলম।

একবার সৈকত তার লেখা একটা পৃষ্ঠার ছবি আপলোড করেছিলেন। আমি তাই দেখে টানা তেরোদিন চেষ্টার পরে নিজের হাতের লেখা হুবহু তার মতো করেছি। তার হাতেলেখা আর আমার হাতের লেখা এখন তাই অনেকটা একরকম!

এখন এসব ভাবলে অবাক লাগে। আচ্ছা ভালোবাসা নামক অনুভূতিটাই কী এমন! এভাবে কি সম্পূর্ণ অন্য এক সত্ত্বাকে নিজের মাঝে ধারণ করা যায়? নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলা যায়? শুনতে ভীষণ অসম্ভব লাগলেও এটাই তো আমার ক্ষেত্রে হলো। এইযে আমি শুধুমাত্র ভালোবাসা নামক অনুভূতিতে নিজেকে ভাসিয়ে সম্পূর্ণ অন্য একজনকে নিজের মধ্যে ধারণ করে ফেললাম। নিজেকে তার মতো করে ফেললাম। অল্প বয়সের প্রেম বলেই হয়তো এটা সম্ভব হলো!

কিন্তু এই পাগলামিগুলো শেষে মাঝেমাঝে গভীর নির্ঘুম রাতগুলোতে মন ভার হয়ে আসতো আমার। দুঃখে ভীতরটা নীল হয়ে আসতো। ভীষণ ভয় হতো! সে তো আমাকে অপেক্ষায় রেখে চলে গেল। কিন্তু সে আবার ভুলে যাবে না তো? মনে থাকবে তার আমার কথা?

আচ্ছা! সে কি আমার মতোই আমাকে চিন্তা করছে? কই সে তো একবারও আমার খোঁজে আসছে না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে আবার প্রশ্ন আসতো। আসলেই কি সে আসছে না? এইযে মাঝে মাঝেই আমার আশেপাশে হুটহাট সেই চেনা অবয়বের একজনকে দেখতে পাই। আবার সেই অবয়বের কাছে যেতে নিলেই হুট করে ভীড়ের মাঝে তা মিলিয়ে যায়। এ কী শুধুই আমার ভ্রম! নাকি সত্যিই সে আমার কাছে আসে!

চিন্তায় আর অসহ্য যন্ত্রনায় চোখ বন্ধ হয়ে আসে আমার। মস্তিষ্ক কাজ করতে চায় না। তখন আমি আবার সেই আমার ছোট্ট দুনিয়াতে ফিরে যাই। নতুন করে তাকে আবার আমার ভিতরে ধারণ করতে থাকি। শুধুমাত্র সে চেয়েছে বলেই আমি অপেক্ষা করতে থাকি। তাকে নিয়েই আমার ছোট্ট দুনিয়াটা ভীষণ যত্নে সাজাতে থাকি। কিন্তু হায়রে বোকা মন!

আমার এইযে অল্প বয়সের তীব্র অনুভূতি, দীর্ঘদিন ধরে মনের ভিতর বাঁচিয়ে রাখা একটা জগৎ, আমার সব স্বপ্ন, আমার ভালোবাসা! এ সবকিছুতে যে এভাবেই একদিন ঝোড়ো বাতাসের তান্ডব চলবে, তা কী বুঝেছিলাম আমি? নাকি আমার ছোট্ট দুনিয়াটা যে এমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে যাবে তার আভাসও কী পেয়েছিলাম আমি? তবে তো কবেই সমস্ত আড়ষ্টতা, ভয়, লজ্জা কাটিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করতাম। শুধু সে চেয়েছে বলে বোকার মতো অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতাম না। হায়রে বোকা মন! শেষমেশ এক তুমুল ঝড়বৃষ্টির দিনেই আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়ের পূর্বাভাস পেলাম!

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here