ফিরোজা
সূচনা পর্ব
নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এক মেয়ে।
নাম তার ফিরোজা নূর। তবে সকলের কাছে পরিচিত কুহূ নামে।
কুহূ তার স্মার্ট ওয়াচে সময়টা আবারও দেখে নিলো।
৫ টা বেজে ১৫ মিনিট।
সবে ফজরের আজান দিয়েছে। বেশ বিরক্তি নিয়েই বাড়ির দিকে যাচ্ছে সে। এত সকালে তাকে বাড়িতে আনার কোনো মানে হয় না।
এই সাধারণ কথাটা বোঝাতে ব্যর্থ সে তার মায়ের কাছে।
ভোর হওয়ায় গাড়ি ঘোড়া কিচ্ছু নেইর। ফলশ্রুতিতে ১৫ মিনিটের রাস্তা হেঁটে বাড়িতে প্রবেশ করলো কুহূ ।
রাস্তাঘাট নির্জন হলেও বাড়ি কিন্তু তার নির্জন নয়।
বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। রাতে কেউ ঘুমায়নি বললেই চলে ৷
কুহূকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে সকলে।
সকলে হাজারটা আদুরে কথা বললেও কুহূ কথা বলেছে সর্বোচ্চ দুই একটা।
এতে অবশ্য কেউ অবাক হয় নি রা কারো খারাপও লাগে নি।
কারণ তাদের আদুরে কুহূ বিগত ৫ বছর ধরেই এমন হয়ে গেছে। কারণটা অবশ্য সকলেরই অজানা। জানার চেষ্টা করে নি এমন কিন্তু নয়। বরং জানার চেষ্টা করলে কুহূ আরও চুপচাপ হয়ে যায় বিধায় এটা নিয়ে গবেষণা এখন বন্ধ হয়েছে ৷
কুহূকে দেখে জেমি দৌঁড়ে এলো। তারই আজ বিয়ে।
জেমি কুহূর একমাত্র মামাতো বোন। অবশ্য তার একটা বড় ভাই আছে। নাম জাইমুল।
জাইমুলের সাথে কুহূর বিয়ে ঠিক আছে সেই ১৫ বছর আগে থেকে। এই বিয়ে নিয়ে অবশ্য মাঝে মাঝে আলোচনা হয়।
তবে এ বাড়ির একটা প্রাণীরও মনে হয় না এ বিয়ে হবে বলে।
কারণ কুহূ ছেলেদের দুই চোখে কেন এক চোখেও দেখতে পারে না। বলতে গেলে ছেলেদের সাথে কুহূর এলার্জি আছে। খাঁটি বাংলা ভাষায় যাকে বলে খাওজানি।
সে যাইহোক। জেমি এসে কুহূকে জড়িয়ে ধরলো। মিষ্টি কন্ঠে বললো,
এত দেড়ি করে এলে কেন?
” এসেছি তাই কি অনেক নয়! ” কথাটা গলা পর্যন্ত এনেও গিলে ফেললো কুহূ।
বিয়ের দিন কাউকে কষ্ট দিতে দেওয়া ঠিক হবে না। বিশেষত কনেকে। তাই চুপ থাকায় শ্রেয় মনে করলো কুহূ।
_ আপি, তোমার হাতে মেহেদি কই?
বিয়ে বাড়িতে এসেছো মেহেদি দিবে না! ( জেমি )
_ এসব ফালতু জিনিস আমার ভালো লাগে না। ( কুহূ )
_ তা বললে তো চলবে না। দিতে হবে।
দাঁড়াও, আমিই দিয়ে দিচ্ছি। ( জেমি)
_ জেমি, বিরক্ত করিস না তো। ঘুমাবো আমি। ( কুহূ)
_ মানছি না, মানবো না, ঘুমানো যাবে না। ( জেমি )
ততক্ষণে কুহূ নিজের ঘরে ঢুকে গেছে। জেমির মুখের সামনে দরজা বন্ধ করতে গিয়েও করতে পারলো না।
ফলশ্রুতিতে তাকে জেমির অত্যাচার সহ্য করতে হলো।
বাম হাতের উপরে পাকিস্তানি স্টাইলে খুব সিম্পল কিন্তু গর্জিয়াজন মেহেদি দিয়ে দিলো।
কুহূর হাত আজ বহুদিন পর রাঙ্গা হলো।।
# বরযাত্রী আসার কথা ২ টার দিকে। এখন বাজে ১ টা ৫৬।
মা ও মামীর অনেক জোরাজুরিতে কুহূ ১ টার মধ্যে রেডি হয়েছে।
পরনে তার কালো রঙের চুড়িদার। খোলা চুল। মুখে কোনো সাজ নেই। শুধু ঠোঁটে লিপ জেল দেওয়া তাও আবার শীতের দিন বলে। অন্য দিন হলে সেটিও বোধহয় থাকতো না।
চোখে কাজলটা পর্যন্ত দেওয়া নেই।
তবে হাতটাকে আজ সাজিয়েছে কুহূ।
কালো চুড়ি পরেছে। কালো রংটা বুঝি ফর্সা মানুষদের জন্যই তৈরি। তাই হবে হয়তো। নাহয় তাকে এত মানাচ্ছে কেন!
বিয়েতে কালো পরতে নেই। কুহূ ব্যতীত সকলে রঙিন। তবে যার মনে রং নেই সে পোশাকে কীভাবে রং আনবে!
দীর্ঘ চার বছরে কুহূর একমাত্র সঙ্গী কালো রং। যা সে এখনও বহন করছে।
এত আগে তৈরি হয়েও কোনো লাভ হয় নি। কেননা সে তো নিচে যেতে পারছেই না।
বরকে বরণ করার দায়িত্ব তার উপর পড়েছে। সে দায়িত্ব পালন করতে বোধহয় ব্যর্থ হবে সে ৷ কারণ জেমি তার বামহাতের নিচে মান্দালা আর্ট করছে মেহেদি দিয়ে। হাত নাকি ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। শেষ ফোঁটা দিয়ে মেহেদির ইতি টানলো জেমি ৷
কুহূ বোধহয় হাফ ছেড়ে বাঁচলো। মেহেদির দিকে একবার তাকিয়ে বললো,
এখন তোর বরকে বরণ কীভাবে করবো বলতো জেমি! আমি যে বাঁহাতি।
_ তুমি আমার বরকে বরণ করবে, আপি?
জেমি বিস্মিত হয়ে বললো।
_ ভেবেছিলাম করবো। তবে এখন আর মনে হচ্ছে না করতে পারবো। যাকগে ৫৮ বাজে। নিচে যাই। নাহয় আমাকে খোঁজার হৈ-হুল্লোড় পড়ে যাবে।
কুহূ আশেপাশে তাকালো না। উত্তরের অপেক্ষাও করলো না। সোজা চলে গেল নিচে।
দুতলা বাড়ির এই এক সুবিধা। নামতে উঠতে সময় লাগে না।
কুহূর জামার রংয়ের মতোই কুহূর মা মুখ করে আছে। এর কারণ খুবই স্বাভাবিক। এ বাড়ির চতুর্থ বড় মেয়ে কুহূ। কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে বাকি পাঁচ বোনের বিয়ে হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। তার আরও একজন ছোট চাচাতো বোন আছে। তারও বিয়ে ঠিক হয়ে আছে কিন্তু কুহূ এখনও অবিবাহিত।
এটা কুহূর মা না পারছে বলতে আর না পারছে সইতে।।
# বরযাত্রী এলো ২ টা বেজে ১ মিনিটে।
কুহূর বিষয়টা বেশ লাগলো। সময়ের গুরত্ব জানে তবে এরা।
কুহূকে সকলের সামনে দাঁড় করানো হলো। একে একে সকলে গাড়ি থেকে নামলো। সবশেষে নামলো বর।
কুহূ এখনও বরযাত্রীর কাউকে দেখে নি। সে চোখ বন্ধ করে ভাবছে কীভাবে রাগ কন্ট্রোলে রাখবে। কারণ বরপক্ষ তো অবশ্যই রসিকতা করবে । যা হয়তো কুহূর পছন্দ হবে না আর সে জায়গা ত্যাগ করবে। যা সকলের দৃষ্টিকটু লাগবে নিশ্চয় ।
কুহূ নিজেকে বুঝিয়ে চোখ খুললো। ভূত দেখার মতো চমকালো সে। এগুলো তার অতি পরিচিত তবে কাছে মানুষ নয়।
তার পরিবার হয়তো তাদের চিনে না কিন্তু এরা তো তার পরিবারকে চিনে তবে কেন এরা বেছে বেছে তার পরিবারের সাথে আত্মীয় করছে!
শুধুই কি কুহূকে কষ্ট দেওয়ার জন্য! তার পুরোনো স্মৃতি আবারও সামনে আনার জন্য ! নাকি এরা জানে জেমি কুহূর জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তাই জেমিকে কষ্ট দিয়ে ইনডিরেক্টলি কুহূকে কষ্ট দিতে চায়?
কুহূর মনে দ্বিতীয় এবং বৃহত্তম ভয়ংকর এক যন্ত্রনাদায়ক প্রশ্ন এলো।
” সাজিদ কী জেমিকে ভালোবসে? ”
কুহূর চোখে অশ্রুরা উঁকি দিচ্ছে। না কাঁদলে হবে না। বহুদিন ধরে যে মেয়ে কাঁদে না সে ভরা মজলিশেও কাঁদতে পারে না। এটা খুবই অপমানজনক।
ভাগ্যিস সে কাজল দেয় নি। না হয় সকলে সেই কখন বুঝে যেতো তার কান্না পাচ্ছে ।
চুটকি বাজিয়ে ধ্যান ভাঙ্গালো রনি।
ছিঃ এতক্ষণ ধরে সে সাজিদের দিকে তাকিয়ে ছিল। সকলে কি ভাববে! এই চিন্তাটা কুহূর আসতেই নিচ্ছিলো তবে তার ভাবনায় বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো রনির কথায়।
_ বিয়াইন হিসেবে দেখি আমাদের কুহূ মণি দাঁড়িয়ে আছে!
রনি হেসে হেসে কথাটা বললো। যা আগুন ধরালো কুহূর শরীরে। এই অসভ্য, বেয়াদব ছেলেটাকে নিশ্চয় সাজিদ এনেছে তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যে।
না। হয়তো সাজিদের মা এনেছে।
কুহূর নিজের পউপর বিরক্ত ও রাগ উভয়ই বাড়লো। তার মন এক পাষাণ লোকের ছাফায় গাইছে। যে কিনা তার চরিত্রে দাগ লাগানোর অপবাদ দিয়েছে।।
রনি রশির নিচ দিয়ে এনে কুহূর দিকে এগিয়ে আসছে। কুহূর রাগ সব গিয়ে পড়লো রনির উপর। এরই সব দোষ। এর জন্যই নব হয়েছে।
রনি কুহূর গালে হাত দিচ্ছিলো বোধহয়। কুহূ তার সম্পূর্ণ রাগ হাতে ঢেলে মেহেদি পড়া হাতটা দিয়ে কষিয়ে এক থাপ্পড় বসালো রনির গালে। সাথে সাথে পাঁচ আঙুলের ছাপ তো পড়লোই এবং তা স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য মেহেদি তো আছেই।
কুহূর এমন কান্ডে বরপক্ষের কোনো ভাবান্তর হলো না। শুধু হলো কনেপক্ষের ৷
কুহূর মা কুহূর হাতটা ধরে বললেন,
এটা কি তুমি ঠিক করলে, কুহূ?
কুহূ কিছু বললো না। শুধু মায়ের দিকে তাকালো।
কুহূর মা বেশ বুঝতে পারছেন মেয়ের রাগ চরমে উঠেছে। যার প্রমাণ দিচ্ছে লাল রঙের এক জোড়া গাল ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির এক জোড়া ছোট চোখ।
তবে রাগার কারণটা বুঝতে পারলেন না।
সকলকে অবাক করে দিয়ে কুহূ আন্তরিকভাবে বলে উঠলো,
আমি খুবই দুঃখিত। কিছু বছর ধরে আমার এক সমস্যা হয়েছে – রাগ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আপনাদের বাড়ির ছেলের গায়ে হাত তোলার জন্য আমি মন থেকে ক্ষমা চাচ্ছি। এরজন্য আবার বিয়ে থেকেই চলে যাবেন না প্লিজ, লিজা আন্টি।
কথাগুলো বলার সময় বারকয়েক চোখাচোখি হলো তার সাজিদ অর্থাৎ বরের সাথে।
এতে অবশ্য কুহূর কোনো দোষ নেই। সাজিদই এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। হয়তো তার চিনতে সমস্যা হচ্ছে এই কুহূকে।
তবে লিজা অর্থাৎ সাজিদের মা বেশ ভড়কে গেছেন কুহূর কথায়। বাড়ির ছেলে শব্দটা দিয়ে কী বোঝাতে চাইলো কুহূ? রনি তো তার ছেলে না। তবে!
কুহূ আর দাঁড়ালো না। সোজা চলে গেল জেমির ঘরে।।
চলবে.,.





