“সেই তুমি💐 পর্ব -৪১+৪২

0
578

সেই তুমি💐
পর্ব -৪১+৪২
Samira Afrin Samia
#Nipa

রকিব ফোন রাখার পর রিহা ভাবতে লাগলো। এতদিন পর হঠাৎ রকিব কি মনে করে ফোন দিল। আর কি ই বা জরুরি কথা বলার আছে? কি এতো দরকারি কথা যার জন্য রকিব আলাদা করে রিহা কে দেখা করতে বলেছে?
রিহা কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। রকিব রিহার বাবার কাছে কাজ করে। রিহার খুব ভালো বন্ধু।
রকিবের কাজ হলো মারামারি চাঁদাবাজি আরও যা যা খারাপ কাজ গুলো আছে। রকিব তো মাঝে মাঝে রিহার কথায় ও কাজ করেছে। কিন্তু এখন তো রিহা আগের মত নেই। রিহা এখন নিজেকে শোধরে নেওয়ায় তার বাবার সাথে এমনকি রকিবের সাথে ও সম্পর্ক কিছুটা বদলে গেছে।

পরের দিন রিহা রকিবের সাথে দেখা করতে আসে। রকিব যে জায়গায় আসতে বলেছিল রিহা সেখানেই আসছে। রিহা একটু আগে এসে গেছে। এখনও রকিব আসেনি। রিহা রকিবের জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পর রকিব আসলো।
— হ্যাঁ রকিব বলো হঠাৎ এভাবে কেন দেখা করতে বললি?
— তোকে তো ফোনে বলেছিলাম তোর সাথে কিছু কথা আছে।
— ওই কথা গুলো কি তা শুনার জন্য ই তো আসছি। এখন সোজাসুজি বল কি কথা।
— কথা গুলো বললে তুই বিশ্বাস না ও করতে পারিস। তবে আমার মন বলছে তুই আমাকে অবিশ্বাস করবি না।
— কথা না পেঁচিয়ে সরাসরি বল। তুই জানিস আমি এতো কথা বলা পছন্দ করি না।
— আচ্ছা তাহলে শুন।
তোর বাবা তোর হাজবেন্ড মানে ইফান কে মার্ডার করতে চায়।
রিহা অবাক হয়ে
— কি?
কি বলছিস তুই এসব?
— আমি ঠিক ই বলছি। তোর বাবা ইফান কে মেরে ফেলতে চায়। তাও এমন ভাবে যেন মনে হয় ইফানের মৃত্যু একটা এক্সিডেন্ট। তোর বাবা জেনে বুঝে প্লেন করে মার্ডার করে তাকে এক্সিডেন্টের রূপ দিতে চায়।
— বাবা ইফান কে মারতে চায়!
কিন্তু কেন?
বাবা তো নিজেই আমার আর ইফানের বিয়ে দিয়েছে। তাহলে বাবা কেন ইফান কে মারতে চাইবে?
রকিব একটু হেসে
— তুই তোর বাবার মেয়ে ঠিকই। কিন্তু তুই এখন পর্যন্ত তোর বাবা কে চিনে উঠতে পারিস নি।
তুই যদি তোর বাবা কে চিনতি তাহলে আমার থেকে ভালো তুই জানতি কেন তোর বাবা ইফান কে মারতে চায়।
রিহা কিছু বুঝতে পারছে না তার নিজের বাবা কেন শুধু শুধু মেয়ের জামাই কে মারতে যাবে।
— রকিব আমি সত্যি ই কিছু বুঝতে পারছি না। তুই আমাকে সব কিছু একটু ক্লিয়ার করে বল প্লিজ।
— ইফান তোর বাবার কাছে বলেছিল ও তোকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে।
— হুম তারপর?
— তার পর আর কি তোর বাবা তোকে ইফানের সাথে কেন বিয়ে দিয়েছিল এটা তো তোর অজানা না তাই না।
ইফানের সম্পত্তি যেন তোর নামে হয়। এখন যখন তোর বাবা জানতে পারলো ইফান তোকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে, নিজের এত বছরের প্লেন কি করে চোখের সামনে মাটি হতে দিতে পারে?
তাই ইফান কে ই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্লেন করছে।
তুই ইফানের ওয়াইফ। এখন কোন ভাবে ইফান মারা গেলে ওর সব সম্পত্তির মালিক হবি তুই। কারণ ইফানের বাবা আগে থেকেই ওদের দুই ভাইয়ের মধ্যে সব কিছু ভাগাভাগি করে দিয়ে গেছে।
এসব কথা শুনে রিহার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। শেষে কিনা ওর বাবা ইফান কে মারতে চায়। নিজের মেয়েকে সামান্য সম্পত্তির লোভে বিধবা করতে চায়। এটা সত্যি ই রিহা বিশ্বাস করতে পারছে না। একজন বাবা কি করে নিজের মেয়ের সাথে এমনটা করার কথা চিন্তা করতে পারে?
— ইফান মারা গেলে ওর সম্পত্তি হবে তোর নামে। কিন্তু ইফান যদি তোকে ডিভোর্স দেয় তাহলে তুই ওর কিছু পাবি না তাই তোর বাবা ইফান কে মারার কথা ভাবছে।
আমি তোর বন্ধু। আমি জানি তুই ইফান কে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসিস। ইফানের কিছু হয়ে গেলে তুই বাঁচতে পারবি না।কেউ না জানুক আমি তো জানি তুই ইফানের জন্য কি কি করেছিস।
তাই যখন তোর বাবা ইফান কে মারার দায়িত্ব আমার উপর দিল। তখন আমি আর তোকে না জানিয়ে থাকতে পারলাম না।
রিহা নিজেকে সামলে নিয়ে রকিব কে জিঙ্গেস করলো
— বাবা কিভাবে ইফান কে মারার প্লেন করেছে?
— এখনও কোন প্লেন হয়নি। তবে আজ কালের মধ্যেই কিছু একটা করতে পারে ইফানের সাথে। খুব খারাপ কিছু একটা হতে চলছে ইফানের জন্য।
— রকিব তুই আমাকে ফ্রেন্ড মনে করে যখন এতকিছু বললি তাহলে আমার জন্য আর একটু কষ্ট করবি দোস্ত?
— বল কি করতে হবে। মন থেকে তোকে ফ্রেন্ড মনে করেছি। তোর জন্য যা করতে পারবো তাতেই নিজেকে ধন্য মনে করবো।
— বাবা ইফান কে মারার জন্য কখন, কিভাবে, কি প্লেন করে তা একটু কষ্ট করে আমাকে জানাবি।
— অবশ্যই তুই না বললেও আমি তোকে জানাতাম।
— ধন্যবাদ রকিব তোর এই উপকারের জন্য আমি সারা জীবন তোর কাছে ঋণী হয়ে থাকবো। তুই আমার অনেক বড় একটা উপকার করলি দোস্ত। আমি তোর এই উপকারের কথা কোন দিন ও ভুলবো না।
— আরে এভাবে বলিস না। তুই ও আমাকে অনেক সাহায্য করেছিস আমি তা ভুলিনি।
— আচ্ছা তাহলে আজ আসি। আর হ্যাঁ পারলে এই পথ ছেড়ে দিয়ে স্ত্রী সন্তান নিয়ে ভালো ভাবে জীব কাটা।
রকিব রিহার কথা শুনে হেসে দিয়ে
— সত্যিই তুই অনেক টা পাল্টে গেছিস রিহা। তোকে এমন ভাবে দেখে অনেক ভালো লাগছে।

রিহা রকিবের সাথে দেখা করে বাসায় না ফিরে সোজা ওর বাবার কাছে গেল।

রিহার বাবা মনির চৌধুরী হলরুমে বসে ছিল। হঠাৎ রিহা কে দেখে মনির চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে
— আরে মামনি যে। এই সময়ে আমাকে ফোন করে বলতে তুমি আজ আসবে তাহলে আমি ড্রাইভার পাঠিয়ে দিতাম।
— তুমি ঠিক কি করতে চাইছো বাবা?
— কি করতে চাইছি?
তুমি কি বলছো মামনি?
— প্লিজ বাবা আমার সাথে ড্রামা করার দরকার নেই।
আমি খুব ভালো করে জানি তুমি কি করতে চাইছো। তুমি যদি এটা ভেবে থাকো তুমি ইফানের হ্মতি করে ওর প্রপার্টি তোমার করে নিবে তাহলে এটা তোমার শুধু মাত্র একটি ভুল ধারণা। আমি বেঁচে থাকতে তুমি ইফানের কোন হ্মতি করতে পারবে না। তুমি কেমন বাবা?
নিজের মেয়ের এতো বড় হ্মতি করতে চাইছো?
মনির চৌধুরী বুঝতে পারলো রিহা সব কিছু জেনে গেছে।
তাই আর এক্টিং না করে রিহা কে সব সত্যি বলে দেওয়া ই ভালো হবে।
— দেখো মামনি আমি যা করছি সব তোমার জন্য ই করছি। তোমার ফিউচারের কথা ভেবে করছি। ইফান তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলে তুমি ওর প্রপার্টির এক অংশ ও পাবে না। কিন্তু ইফান যদি কোন ভাবে মারা যায় তাহলে সব কিছুই তোমার হবে।
রিহা তার বাবার কথা শুনে চিৎকার দিয়ে উঠে
— তুমি মানুষ?
সামান্য একটু প্রপার্টির জন্য নিজের মেয়েকে বিধবা করার কথা চিন্তা করছো।
ইফান আমাকে ডিভোর্স দিবে বলেছে এখনও দেয়নি।
তুমি ভাবলে কি করে তুমি এমন একটা নোংরা প্লেন করতে আর আমি তা জানার পর কিছু না করে চুপচাপ থাকবো।
— রিহা তুমি বুঝতে পারছো না। আমি তো তোমার জন্য ই
— চুপ করো বাবা। তোমার কথা শুনতে আমার জাস্ট অসহ্য লাগছে।
আমার কথা তোমার ভাবতে হবে না। ইফান আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলেও আমি ওর কোন হ্মতি হতে দিব না।
আমি ইফান কে প্রপার্টির জন্য ভালোবাসিনি। আমি প্রথম থেকেই জানতাম তুমি আমাকে ব্যবহার করছো ইফানের সম্পত্তি পাওয়ার জন্য। তবুও এতদিন আমি চুপ ছিলাম।
আমি ভাবতেই পারিনি। তুমি শেষ পর্যন্ত কাউকে মার্ডার করতে চাইবে।
— রিহা মামনি মাথা ঠান্ডা করে একবার আমার কথা শুনো।
— আমি তোমার কোন কথা শুনতে চাই না। তুমি একদম আমাকে মামনি বলে ডাকবে না। তোমাকে নিজের বাবা বলে মানতে আমার ঘৃণা হচ্ছে।
তুমি ইফানের কোন হ্মতি করবে না। আমি তোমাকে ভালো করে বলে যাচ্ছি বাবা। যদি তুমি ইফানের কোন হ্মতি করো তাহলে আমি ও বাধ্য হবো তোমার সাথে অতি নিচু মানের কোন কাজ করতে। ভুলে যেও না বাবা আমি তোমার ই মেয়ে। তুমি যদি নিজের সার্থের জন্য নিজের মেয়ে জামাই কে মারার কথা ভাবতে পারো। তাহলে আমি তোমার মেয়ে হয়ে নিজের স্বামী কে বাঁচানোর জন্য কি কি করতে পারবো তা একবার ভেবে দেখো।
আর এর আগে আমি ইফানের জন্য কি কি করেছি তা তোমার অজানা নয়। তুমি আমার সব অপরাধে আমাকে সার্পোট করেছো।

রিহা কথা গুলো বলে এক সেকেন্ড ও দেরি না করে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। মনির চৌধুরী রিহার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। আর ভাবছে রিহা কি সত্যি ই বদলে গেছে? আর রিহা ইফান কে সত্যি সত্যি ভালোবাসে?
মনির চৌধুরী তো ভেবেছিল রিহা ইফান কে ভালোবেসে নয় সম্পত্তির জন্য বিয়ে করতে চায়।

কয়েক দিন হয়ে গেল।
রিহা খুব টেনশনে থাকে ইফান কে নিয়ে। ওর বাবা যদি সত্যি ই ইফান কে মারার চেষ্টা করে?
ইফান কে রিহা অনেক ভাবে বুঝিয়েছে রাতে লেট করে না ফিরতে কিন্তু ইফান রিহার কোন কথা শুনলে তো।
এদিকে ইয়াশ আর ইশিতার বিয়ের আয়োজন খুব তাড়াতাড়ি ও দুমদাম সহকারে করা হচ্ছে।
ইফান এখনও ইয়াশ আর ইশিতার বিয়ের কথা কিছুই জানে না। জানলেও অবশ্য আর আগের মত রিয়েক্ট করবে না।

নাজমা চৌধুরী হলরুমের সোফায় বসে সবাই কে নিজের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। কখন কিভাবে কাকে কি করতে হবে।
এমন সময় ইফান বাসার ভেতর ঢুকে হঠাৎ করে বাসায় এতো মানুষ দেখে ইফান কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও কাউকে কিছু জিঙ্গেস না করে নিজের রুমে চলে যায়। আজ ইফান তাড়াতাড়ি বাসায় চলে এসেছে এটা দেখে রিহার খুশির বাঁধ মানছে না।
ইফান ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে দেখে এখনও বাসায় অনেক মানুষ।
ইফান নাজমা চৌধুরীর পাশে বসে
— বাসায় এতো লোক কেন?
নাজমা চৌধুরী সবাই কে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার ফাঁকে ইফানের কথার উত্তর দিলো
— তুই তো জানিস ই না।
আমি ইয়াশ আর ইশিতার আবার বিয়ে দিতে চাইছি। ওর জন্য ই এতো আয়োজন করা হচ্ছে।
— ভাইয়ের বিয়ে?
— হুম।
নাজমা চৌধুরী আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।
ইফান কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। ইয়াশ আর ইশিতার আবার বিয়ে হবে একথা শুনে ইফান একটু ও রিয়েক্ট করলো না। এখন ইশিতার কাছে ইফানের কোন চাওয়া নেই কোন অভিযোগ ও নেই। ও ইশিতার সাথে যা করেছে তার পর ইশিতা ইফান কে ভালোবাসবে না এটা স্বাভাবিক। তবে রিহার উপর ইফানের অনেক রাগ।

ইফান গন্তব্যহীন পথে কার ড্রাইভ করে যাচ্ছে। অনেক কষ্ট হচ্ছে। ইফান নিজের ভুলের জন্য সব কিছু হারিয়েছে। এরজন্য ইফান কাউকে দোষী করতে পারবে না। রিহার কথায় ইফানের ওসব করা ঠিক হয়নি এটা ইফান আজ বুঝতে পারে।
— আমি তো কোন ছোট বাচ্চা ছিলাম না। যে যা বুঝাবে তা বুঝেই ইশিতার উপর প্রতিশোধ নিয়েছি। দিনের পর দিন ইশিতার সাথে অন্যায় করেছি।
এখন ইশিতা আমাকে ভুলে গিয়ে ভাইয়ের সাথে নতুন করে সব কিছু শুরু করেছে। আমার দেওয়া সব কষ্ট ভুলে ভাইকে ভালোবাসে তার সাথে জীবনে সুখী হতে চাইছে। এখন আমার তো কোন অধিকার নেই ইশিতার খুশির পথে বাঁধা হওয়ার।
ইশিতা সব কিছু ভুলতে চাইলে আমি কেন জোর করে ইশিতা কে সব কিছু মনে রাখতে বাধ্য করবো।

রিহা পুরো বাসায় ইফান কে খুঁজছে।
— কোথায় গেল ইফান। আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে এখন আবার কোথায় চলে গেল?
ভয়ে ইশিতার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
— ইফানের কিছু হয়ে গেল না তো? ধুর! কি হবে ইফানের?
ইফান একদম ঠিক আছে।

চলবে…..

সেই তুমি💐
পর্ব -৪২
Samira Afrin Samia
#Nipa

কিছুক্ষণ ড্রাইভ করার পর ইফান বুঝতে পারলো তার গাড়ি ব্রেক ফেল করেছে। ইফান গাড়ি ব্রেক করতে চাইলে ও ব্রেক হচ্ছে না। অফিস থেকে তো ইফান এই গাড়ি করেই বাসায় ফিরেছে তখন তো গাড়ি একদম ঠিক ছিল। তাহলে এখন গাড়ির ব্রেক নষ্ট হয়ে কি করে? ইফান কিছু বুঝতে না পেরে রাতের ফাঁকা রাস্তায় ফুল স্পিডে কার ড্রাইভ করে যাচ্ছে। হতে পারে এটা ইফানের জীবনের শেষ কিছু মুহূর্ত।

ইফান সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়েছে এখন প্রায় রাত নয়টা বাজে এখনও বাসায় ফিরে নি। রিহার তো এবার ইফানের চিন্তায় দম বন্ধ হয়ে আসছে।

নাজমা চৌধুরী আর ইশিতা এক সাথে বসে ইফান আর রিহা কে নিয়েই কথা বলছিল এমন সময় নাজমা চৌধুরীর ফোন বেঁজে উঠে। নাজমা চৌধুরী ফোন হাতে নিয়ে দেখে ইফান ফোন করেছে।
— হ্যাঁ ইফান।
ফোনের ওপাশ থেকে অন্য কেউ কথা বললো
— আন্টি আমি ইফান না।
আমি আরিফ। আমাকে চিনেছেন তো আন্টি?
আরিফ ইফানের বন্ধু। বয়সে ইফানের থেকে বড় হবে। পরেও এক সাথে সব সময় চলাফেরা করায় ইফানের বন্ধু হয়ে গেছে।
— আরিফ তুমি।
— হুম আন্টি।
— ইফানের ফোন থেকে তুমি। ইফান কোথায়?
— আন্টি আসলে ইফানের
আরিফ কথা শেষ করার আগেই নাজমা চৌধুরী ব্যস্ত হয়ে উঠলো
— কি হয়েছে ইফানের?
ইফান ঠিক আছে তো?
— হ্যাঁ আন্টি ইফান ঠিক আছে। তবে ইফানের ছোট একটা এক্সিডেন্ট হয়ে গেছে।
নাজমা চৌধুরী দাঁড়িয়ে উঠে
— এক্সিডেন্ট?
কিভাবে হলো। ইফান এখন কেমন আছে। কোথায় ইফান?
— আন্টি টেনশন নিবেন না।
তেমন কিছু হয়নি। ইফান ঠিক আছে।
— তোমরা কোথায় আমাকে বলো। আমি এখনই আসছি।
— আচ্ছা।
আরিফ ফোন কেটে দিলে ইশিতা নাজমা চৌধুরী কে জিঙ্গেস করলো।
— ইফানের কি হয়েছে মা?
— জানি না। ইফানের বন্ধু ফোন দিয়ে বললো ইফানের নাকি এক্সিডেন্ট হয়েছে।
ইফান হসপিটালের ক্যাবিনে বসে আছে। তেমন আঘাত লাগে নি। হাতে পায়ে একটু ছোলে আর ডান হাতে অনেক ব্যথা পেয়েছে তবে হাত ভাঙেনি। দুই তিন দিনের ভেতর ই ঠিক হয়ে যাবে। ভাগ্য ভালো রোড একদম ফাঁকা ছিল। ইফান চলন্ত কার থেকে লাফিয়ে নেমে যায়। এবারের মত কোন মতে জীবন বেঁচে যায়। কিন্তু কি ভাবে কারের ব্রেক ফেল হলো ইফান তাই ভাবছে। কেউ ইচ্ছে করে ইফান কে মারতে চাইছে না তো?
ইফানের সাথে কার এমন শত্রুতা যার জন্য ইফান কে জানে মেরে ফেলতে চাইছে?
ইফানের কপালে ও হাতে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়েছে।
আরিফ ইফানের কাছে এসে।
— কি করে হলো?
— আমি কি জানি?
— তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে না তুই এখন ড্রাংক অবস্থায় আছিস তাহলে এক্সিডেন্ট টা হলো কি করে?
— তোর কি মনে হয় আমি ড্রিঙ্ক করে ড্রাইভ করলে এক্সিডেন্ট হবে?
অসম্ভব। আরে কারের ব্রেক ফেল করছিল তাই জীবন বাঁচাতে চলন্ত কার থেকে লাফ দিতে হয়েছে।
— আচ্ছা বুঝলাম।
ইফান উঠে যেতে নিলে
— কোথায় যাচ্ছিস?
— বাসায় যাবো না?
— তোর কোথাও যেতে হবে না। আমি আন্টি কে ফোন করেছিলাম। আন্টি আসছে।
— কি করলি তুই শুধু শুধু বাসায় জানালি কেন?
মা এমনিতেই আমাকে নিয়ে টেনশন করে।
— শুধু শুধু বলছিস?
আজ কত বড় একটা দূর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেলি তুই।

নাজমা চৌধুরী আর ইশিতা হসপিটালে পৌঁছে গেল। ইফানের কাছে গিয়ে নাজমা চৌধুরী ইফান কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো।
— তোর কি হয়েছে বাবা?
— আমার কিছু হয়নি মা। তুমি শুধু শুধু কেঁদো না তো।
— কিছু না হলে তোর এই অবস্থা কেন?
নাজমা চৌধুরী আবারও কাঁদতে লাগলো। ইফান ইশিতা ইশারা করে
— মা কে একটু সামলাও প্লিজ।
ইশিতা নাজমা চৌধুরী কে ধরে
— মা কাঁদছো কেন?
ইফান তো ঠিক আছে। কিছু হয়নি ওর।

এদিকে রিহা একা বাসায় ইফানের জন্য চিন্তা করে পাগল হচ্ছে। ইফান কে বার বার কল করেও পাচ্ছে না। ইফান ফোন তুলছে না। নিচে এসে দেখে নাজমা চৌধুরী ইশিতা কেউ বাসায় নেই।
— মা আর ইশিতা কোথায় গেল?
কাউকে পাচ্ছি না। বাসা থেকে বের হলে বলে বের হবে তো। এমনিতেই ইফান কে নিয়ে টেনশন হচ্ছে তার উপর মা আর ইশিতা না বলে কোথায় চলে গেল।
রিহার ফোন বেঁজে উঠলে রিহা প্রথমে ভাবলো হয়ত ইফান ফোন করেছে কিন্তু ফোনের স্কিনের দিকে তাকিয়ে দেখে রকিব কল করেছে। রকিবের কল দেখে রিহার ভয় আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেল।
— এই সময় রকিব কেন কল করেছে। বাবা ইফানের সাথে কিছু করে দিলো না তো?
রিহা কল রিসিভ করে
— রকিব বাবা ইফানের কোন হ্মতি করে নি তো?
— রিহা আমার মনে হয় ইফান ঠিক নেই তোর বাবা ইফানের সাথে কিছু একটা করে ফেলেছে।
— কি বলছিস তুই?
আমি তোকে জানাতে বলছিলাম। বাবা যা যা তোকে করতে বলবে তুই আমাকে তা জানাবি।
— তোর বাবা কাজ টা আমাকে দিয়ে করায় নি।
তুই ওই দিন তোদের বাসায় গিয়ে তোর বাবা কে সব কিছু বলে এসেছিস তার পর থেকে তোর বাবা আমাকে কিছু জানায়নি।
তোর বাবা একজন কে একটু আগে অনেক গুলো টাকা দিলো তা থেকেই আমি আন্দাজ করতে পারলাম হয়ত ইফানের হ্মতি করার জন্য ই ওকে এতো গুলো টাকা দেওয়া হয়েছে।
রিহা সোফায় বসে পড়লো। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। রাগে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে কটমট করতে করতে বলতে লাগলো
— ইফানের কিছু হলে আমি বাবা কে এতো সহজে ছেড়ে দিব না।
আমি বাবা কে ভালো করে বলে এসেছিলাম তার পর ও বাবা আমার কথা শুনলো না।
বাবা ঠিকই ইফানের হ্মতি করতে চাইছে। আজ যদি ইফানের কিছু হয় তাহলে

নাজমা চৌধুরী আর ইশিতা ইফান কে নিয়ে বাসায় ঢুকে। রিহা ইফান কে দেখে হাত থেকে ফোন ফেলে দিয়ে দৌঁড়ে ইফানের কাছে যায়। ইফানের হাতে ও কপালে ব্যান্ডেজ দেখে রিহা শব্দ করে কেঁদে উঠে।
— ইফান কি হয়েছে তোমার?
তুমি ঠিক আছো তো?
ইফান কিছু বললো না। নাজমা চৌধুরী রিহা কে ইফান কে ধরতে বললো। রিহা ইফান কে নিজের কাঁধে ভর করে দাঁড় করায়।
— রিহা এখন ইফান কে রুমে নিয়ে যা। কি হয়েছে তা পরেও জানা যাবে।
রিহা আর কিছু না বলে ইফান কে রুমে নিয়ে যেতে লাগলো।
ইফান ভালো করে হাঁটতে পারছে না। পায়ে অনেক ব্যথা পেয়েছে। ইফান সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না হাঁটবে তো দূর।

প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেলো। ইফান এখন অনেকটা সুস্থ হলেও পুরোপুরি সুস্থ নয়।অফিস যেতে পারে না।সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে পারে না।রিহাকে সহ্য না করলেও রিহা সর্বদা ইফানের পাশে থেকেছে।রিহার জন্যই কিছুটা সুস্থ হয়েছে ইফান।
ইফান এখন আর আগের মত যখন তখন মারে না রিহাকে।প্রয়োজনে হু হা ছাড়া তেমন কথাও বলে না।
ইফানের অসুস্থতার জন্য ইশিতা ইয়াশের বিয়ে আরো কিছু দিন পেছানো হলো।
বিছানায় গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে ইফান।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেছে। কিছুই যেনো ভালোলাগছে না ওর।সব কিছু থেকেও নেই নেই মনে হচ্ছে।

রিহা ইফানের জন্য স্যুপ করছে।ইশিতা রান্না ঘরে ডুকতেই মুচকি হাসল রিহা।
— রিহা মায়ের শরীরটা একটু খারাপ লাগছে।তাই রাতের খাবার ঘরে দিয়ে আসবো।তুমি বরং তোমার আর ইফানের খাবার ঘরে নিয়ে যাও।
আচ্ছা..!
— হুম।
ইশিতা খাবার নিয়ে মায়ের ঘরে গেলো।তিনি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন তাই ইশিতা কিছু না বলে টেবিলে খাবার ঢেকে রেখে বেরিয়ে নিজের রুমে এলো।রুমে ডুকতেই পেছন থেকে কোমড় জড়িয়ে ধরে ইয়াশ।তারপর হাত থেকে ফলের প্লেটটা নিয়ে টেবিলের উপর রাখে।
— ইশিতা?
— হু
— আরো কত দিন?
— কিসের কত দিন??
— বিয়ের??
— বিয়ে তো হয়েছেই।
— আবার যে হবে।
— এই তো আর মাত্র কয়েকটা দিন।
হু এখনো অনেক দিন বাকী বলেই ইশিতাকে নিজের কোলে বসালো ইয়াশ।
— ইয়াশ আমি ভাবছি অন্য কিছু।
— কি?
— আমাদের সাথে যদি রিহা-ইফানের বিয়েটাও হয়ে যায় কেমন হয়??
— কি বলছো!
— হুমম
— ইফান কি রাজি হবে??
— ঠিক হবে।
— কিন্তু কি করে সম্ভব?
— আমি আর মা মিলে বোঝাবো।তাছাড়া ইফান ও এখন চুপচাপ হয়ে গেছে আগের মত চিল্লাপাল্লা করে না রিহার গায়ে হাত তুলে না।ঠিক সময় বাড়ি আসে।
— তারপর ও আমার মনে হয় না রাজী হবে।হলে তো ভালোই হতো।
— হুমম তা ঠিক বলেছো।আমার মনে হয় ইফান রিহার উপর দুর্বল হয়েছে কিছুটা।দেখো না আজকাল কত যত্ন করে রিহা ইফানের।
— হুমমম।
— কি হুমম হুমম করছো?
— ভালো লাগছে না।
— কেনো??কি হয়েছে??শরীর খারাপ লাগছে??
— উহু।
— তবে?
— চোখ বন্ধ করো।
— কেনো?
— করোই না।
— ওকে।
ইশিতা চোখ বন্ধ করতেই ইয়াশ আলতো করে ইশিতার ঠোঁটে ঠোঁট ছুয়ে দেয়।ইশিতা স্পর্শে কেপে ওঠে।সঙ্গে সঙ্গে মুখ লুকায় ইয়াশের বুকে।ইয়াশ আবেশে জড়িয়ে নেয় ইশিতাকে..!

রিহা স্যুপ আর ফলের প্লেট নিয়ে ইফানের পাশে বসে।ইফান চোখ মেলে তাকিয়ে অন্য দিকে ফিরে।
— নাও খেয়ে নাও।
চামচে স্যুপ তুলে ইফানের সামনে ধরে রিহা।
— খিদে নেই।
— খেয়ে নাও ঔষধ খেতে হবে।
— বললাম তো খাবো না।
— ইফান প্লিজ…রাগ আমার উপর খাবারের সাথে নয়।খেয়ে নাও।
— খাবো না বললাম তো।
একটু জোরে বলে ইফান।
— খেয়ে নাও না।প্লিজ এরকম করো না।না খেলে আবার শরীর খারাপ করবে।
ইফান এবার চুপ করে থাকে।
— না খেলে সুস্থ হবে কি করে??সুস্থ না হলে আমার গায়ে হাত তুলবে কি করো বলোতো।আমাকে শাস্তি দিতে হলেও তো তোমাকে ফিট থাকতে হবে নাকি..?
ইফান অবাক চোখে তাকায় রিহার দিকে।ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে রিহা।এই বুঝি টুপ করে পানি পড়বে।চোখ সরিয়ে নেয় ইফান।
খেয়ে নাও বলেই চামচ এগিয়ে দেয়।
একটু স্যুপ আর ফল খেয়ে নেয় ইফান।
— আর খাবো না।
— আচ্ছা রেস্ট করো।আমি এসে ঔষধ খায়িয়ে দেবো।বলেই উঠে চলে গেলো রিহা।নিচে যাওয়ার আগে ওদের সব কথপোকথন শুনে নেয় ইশিতা।রিহা বেরিয়ে যেতেই ইফানের ঘরে ডুকে ইশিতা।ইফানের পাশে বসে।ইফান চোখ খুলে ইশিতাকে দেখে চমকে যায়।ঈশিতা ওর দুই হাতের মুঠোয় ইফানের বা হাত নেয়।এতে অনেক অবাক হয় ইফান।এক দৃষ্টিতে হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে।
— ইফান কিছু কথা বলবো শুনবে?
মাথা নাড়ায় ইফান।
— ইফান দেখো সময়ের সাথে সব পরিবর্তন হয়ে গেছে।সম্পর্কটা ও অন্যরকম সুন্দর হয়ে গেছে।দেখো ইফান কোনো কিছুই আমাদের হাতে নেই সবই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায়।তবে আমি বলবো যা করেছে অনেক ভালো করেছে উনি।তুমি যদি এরকম না করতে আমার সাথে তাহলে আমি ইয়াশকে পেতাম না।এত ভালোও হয়ত থাকতাম না আমি।এরকমটা না হলে হয়ত অনেকেই কষ্ট পেতাম।কারন তোমার ভাই সেই ছোট বেলা থেকে ভালোবাসে আমায়।ও আমাকে দেখে কষ্ট পেতো।আমি যখন জানতে পারতাম আমিও কষ্ট পেতাম।রিহা কষ্ট পেতো।তারচেয়ে যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। জানো ইয়াশ আমায় খুব ভালোবাসে।আর আমিও অনেক ভালোবেসে ফেলেছি ইয়াশকে।ওকে ছাড়া একটা দিনও আমি কল্পনা করতে পারি না।ওকে ছাড়া দম বন্ধ হয়ে আসে আমার।
আমি যদি সব ভুলে ভালো থাকতে পারি তুমি কেনো পারবে না??রিহা আমার থেকে কম কিসে??বরং আমার থেকেও ভালো।মানছি ও অন্যায় করেছে কিন্তু সব তোমাকে ভালোবাসে বলে করেছে।একবার ভাবো তো একটা মানুষ কতটা ভালোবাসলে এতটা ভয়ংকর হয়।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here