সেই তুমি💐
পর্ব -৪৩+৪৪
Samira Afrin Samia
#Nipa
— একটা মানুষ কতটা ভালোবাসলে এতটা ভয়ংকর হয়।ভাবতে পারছো??ও তোমার জন্য দুনিয়া ছাড়তে রাজি তাহলে তুমি কেন পারবে না ওকে ভলোবাসতে। রিহার সাথে বরং আরো ভালো থাকবে তুমি।বিশ্বাস করো আমার কথাগুলো।রিহার মাঝেও মুগ্ধতা খোঁজার চেষ্টা করো দেখবে মুগ্ধ হবে তুমি।
সবটা মেনে নাও ইফান। আমি তোমাকে এখন শুধুমাত্র দেবরের চোখে দেখি। তুমিও আমায় তোমার ভাবী মনে করো। বড় ভাইয়ের বউ হিসেবে আমি তোমার বড়ই। আমাকে ভাবী মনে করে সেই সন্মান টা দেওয়ার চেষ্টা করো দেখবে আমাকে নিয়ে আর কোনো জড়তা থাকবে না। রিহাকে ভালোবাসতে পারবে।একটা সুযোগ দিয়েই দেখো মেয়েটাকে। বিশ্বাস করো ঠকবে না।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাতটা ছাড়িয়ে নেয় ইশিতা। ইফানের মাথায় হাত দিয়ে বলে
— এই যে ভাবী হয়ে মন থেকে দোয়া করে দিলাম সব থেকে সুখে থাকবে তুমি।রিহাকে চোখে হারাবে।একবার ভালো থাকার চেষ্টা করেই দেখো। ইনশাল্লাহ খারাপ হবে না।মানুষ চাইলে ই ভালো থাকতে পারে।সে যেই পরিস্থিতিতেই থাকুক না কেন।শুধু ভালো থাকার পন্থাটা খুজে নিতে হয়।
বলেই পিছনে ফিরে ঈশিতা।দেখে রিহা তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।আজ ইশিতার একটুও অপ্রস্তুত লাগছে না।বরং এক উজ্জ্বলতাময় হাসি হেসে রুম থেকে বেরিয়ে যায় ইশিতা।
ইয়াশ আড়াল হয়ে যায়।
ইশিতাকে ডাকতে বের হয়েছিল ইয়াশ তারপরই ওদের কথা শুনে দরজার পাশে দাড়িয়ে পড়ে ইয়াশ।আর রিহা সেই প্রথম থেকেই দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিলো।
ইশিতা বেরিয়ে আসতেই ইয়াশ পেছন থেকে কোলে তুলে নেয় ইশিতাকে।ইশিতা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে ইয়াশের দিকে।ইয়াশের আজ গর্ব হচ্ছে ইশিতার জন্য। এতটা ভালো হয় কি করে মানুষ??
রুমে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দেয় ইশিতাকে।তারপর পাশে বসে ইশিতাকে বুকে টেনে নেয়।ইশিতাও চুপ করে থাকে ইয়াশের বুকে।এ জায়গাটাই যেনো ওর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।ইয়াশ বুকে মাথা রেখে আবেশে চোখ বুজে নেয় ইশিতা।
ইশিতা চলে যেতেই আনমনা হয়ে চেয়ে থাকে ইফান।রিহা গুটিগুটি পায়ে ইফানের পাশে যেয়ে বসে।নিরবে কাঁদতে থাকে রিহা।তারপর চোখমুছে ইফানকে ঔষধ খায়িয়ে দেয়।বালিশটা ঠিক করে শুয়িয়ে দেয় ইফান কে।নিরবে চোখের পানি ফেলছে রিহা।আজ কিছু বলার মত খুঁজে পাচ্ছে না সে।
রাত বাড়তে থাকে তার সাথে পাল্লা দিয়ে মনের চাপা কষ্ট গুলোও।চারপাশের সবাই ভালো আছে ভালো নেই শুধু ইফান -রিহা!
ইশিতাও তো বেশ আছে ইয়াশকে পেয়ে।তাহলে কেন ভালো থাকতে পারছে না ইফান।ইশিতার বলা কথাগুলো খুব করে ভাবাচ্ছে ইফানকে।খুব একটা ভুল বলে নি।তবে কঠোর বাস্তবতা এত সহজে কি ভোলা যায়?চাইলেই কি ভালো থাকা যায়?হয়ত যায় তাইতো ইশিতা আজ ভালো আছে।
রিহা ইফানের মুখের দিকে চেয়ে আছে।হালকা ড্রিম লাইটের আলোতে বেশ লাগছে।কিন্তু রিহার দুচোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। কোথাই ভেবে ছিলো ও নিজের ভালোবাসা দিয়ে ইফানকে ভালো রাখবে তা না বরং আরো কষ্টের দিকে ঠেলে দিয়েছে।রিহা কাঁদতে কাঁদতে বলল..
— একটা বার অন্তত একটা বার চেষ্টা টা করেই দেখো দেখবে খুব ভালো থাকবে তুমি।একটু স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করো একটু।আমি মানছি আমি অপরাধ করেছি খুব বড় অপরাধ কিন্তু শুধু তোমাকে ভালোবাসি বলেই।আমি যদি জানতাম তুমি এতটা পরিবর্তন হয়ে যাবে আমি কখনোই এত কিছু করতাম না আমি তো ভেবেছি তুমি ওকে ভুল বুঝে সরে আসবে আর আমায় ভালোবাসতে শুরু করবে।
কিন্তু তা আর হলো কই।পাপের শাস্তি তো পেয়েছি আরও হয়ত পাবো।দেখো ইফান আমি যদি চলেও যাই ইশিতা তো তোমার হবে না।তাহলে কেন এরকম করছো?
চোখ মুখ মুছে আবারও বলতে থাকে রিহা।
— সব শেষে আমি ভেবেছি সব ছেড়ে চলে যাবো।তোমার থেকে অনেক দূরে।হয়ত এতেই তুমি ভালো থাকবে।স্বাভাবিক হতে পারবে।আমায় ক্ষমা করে দিও ইফান ক্ষমা করে দিও।
কাঁদতে কাঁদতে ইফানের বুকে মাথা রাখে রিহা।
ইফান বা হাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরে রিহা কে।
— আমি ভালো থাকার চেষ্টা করবো।আরেকবার সুযোগ দিবো জীবনটাকে।
রিহা ইফানের জেগে যাওয়া দেখে চমকে যায়। ও ভেবেছিলো ইফান ঘুমিয়ে আছে।তাই এসব কথা বলছিলো হয়ত মুখোমুখি বলতে পারতো না।কাল চলে যাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেলো রিহা।কিন্তু ইফান জেগে আছে দেখে চমকে যায়। ইফান তাহলে সব শুনে নিয়েছে ??
মুখে কোনো কথা বলে না রিহা। নিরবে চোখের পানি ফেলতে থাকে দুজনেই।আস্তে আস্তে ঘুমের দেশে তলিয়ে যায় দুজনই।
খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় ইফানের।রিহা বুকের উপর ঘুমিয়ে আছে।এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে গুজে দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। অনেক মলিন হয়ে গেছে মুখটা।কত মার-ই না খেয়েছে??এ মুখ দেখে কেউ বলবে না এত অন্যায় করেছে মেয়েটা।একদম নিষ্পাপ দেখাচ্ছে।
রিহা কে পাশে শুয়িয়ে দেয় ইফান।আস্তে আস্তে বিছনা থেকে নেমে ওয়াশরুমে যায়।ফ্রেশ হয়ে এসে সাবধানে পা ফেলে আস্তে আস্তে মায়ের ঘরের দিকে যায়।
মা নামাজ পড়ে তজবি জপছিলেন।ইফানকে দেখে অবাক হয়।ইফান ম্লান হেসে মায়ের পাশে বসলো।
— কি হয়েছে বাবা কিছু বলবি?
— আসলে মা..
— কি হয়েছে বল।
— ভাইয়ের আর ইশিতার বিয়ের সাথে আমাদেরটারও ব্যবস্থা করো।
নাজমা চৌধুরী ইফানের মুখে এই কথা শুনে অবাক হয়ে ইফানের দিকে তাকালো।
— ঠিকই বলছি।
নাজমা চৌধুরী ইফানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
ইফানের চোখে পানি। মায়ের হাত ধরে বলে
— ক্ষমা করে দিও মা।অনেক অন্যায় করে ফেলেছি।
নাজমা চৌধুরী ইফানের কপালে চুমু খায়।
ইফানের চোখের পানি মুছে দিয়ে বুকে টেনে নেয়।
বিকেলে ঘরে বসে ফোন টিপছে ইফান।রিহা এসে পাশে বসল।ইফানের কোলে মাথা রেখে বলল
— মাথাটা টিপে দাও তো।
ইফান ফোন রেখে রিহার মাথা টিপে দিচ্ছে। কিন্তু কেন যেন সবটা মেনে নিতে পারছে না।কোথাও একটা বাঁধা কাজ করছে।ইফানকে আনমনে চেয়ে থাকতে দেখে রিহা ইফানকে টেনে বুকে জড়িয়ে নেয়।ইফান চুপ করে চোখ বন্ধ করে থাকে।কিছু বলার শক্তি পাচ্ছে না ও।
— ইফান?
ইফান কিছু বলছে না।
— ইফান?
— হুম।
— চলো কোথাও ঘুরে আসি।
— কোথায়??
রিহা কিছু বলতে নিবে তার আগেই ফোন বেজে উঠল ইফানের।
— হ্যালো।
— স্যার মনির চৌধুরী অফিসে কাগজপত্র নিয়ে খুব ঝামেলা করছে।বলছে আপনি নাকি কোম্পানি তার নামে লিখে দিয়েছেন।ইয়াশ স্যারকে জানিয়েছি উনি আসছেন আপনিও আসুন।
— হোয়াট?
— জ্বি স্যার।
— ওকে রাখো আমি আসছি।
— কি হয়েছে ইফান?
— তোমার বাবা…
— কি করেছে বাবা?
রিহার কাছে সব খুলে বলল ইফান
— ইফান তুমি অফিস যাও আমি আসছি।
— তুমি যাবে?
— হুম সময় মতো যাবো তুমি যাও।চলো দিয়ে আসি গাড়ি অব্দি।
ইফানকে রিহা গাড়িতে বসিয়ে দেয়।ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। এদিকে ইফান বেরিয়ে যাওয়ার পরই মাকে বলে বাড়ি থেকে বের হয় রিহা।
অফিসে খুব জোর চিৎকার চেচাঁমেচি করছে মনির চৌধুরী।পাশে তিনজন গার্ড নিয়ে এসেছেন। হাতে দলিল। ইয়াশ ওনাকে থামাতে চেয়েও পারছে না।থামছেই না উনি।অফিসের সব স্টাফ জড়ো হয়ে গেছে।ইফান অফিসে ডুকেই চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেলো।আস্তে আস্তে উপরে গেলো।
— কি হয়েছে আংকেল কি সমস্যা আপনার?ইফানের কথায় সবাই ওর দিকে ফিরল।
শয়তানি হাসি হাসল মনির চৌধুরী।
— মি.ইফান এই দলিলে তুমি তোমার সব কিছু আমার নামে করেছো স্বীকার করো।
ইফানের দিকে একটা দলিল এগিয়ে দিয়ে বললো। ইফান দলিল টা হাতে নিয়ে দেখে
— কিন্তু এটা তো আমি করি নি।
হা হা হা হা করে হাসলো মনির চৌধুরী।
— দলিল কথা বলবে তোমার মুখের কথায় তো আর হবে না।
— দেখুন আপনি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছেন।বেরিয়ে যান এখনি।
হাসল মনির চৌধুরী।
— ইফান রেগে কলার চেপে ধরেছে মনির চৌধুরীর।ইয়াশ ছাড়াতে চেষ্টা করছে।মনির চৌধুরী গার্ডদের ইশারা করতেই তারা ইফানকে ঘুষি দেয়।ইয়াশ চিৎকার করে ওঠে।
এমন সময় পেছন থেকে কেউ বলে উঠে থামুন আপ্নারা।
সবাই পেছনে তাকায়।রিহা সাথে পুলিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
পুলিশসহ এগিয়ে আসে।হাত কাগজ পত্র গুলো পুলিশ অফিসারের কাছে দিয়ে বলে
— ইন্সপেক্টর এই হলো মনির চৌধুরীর সকল জাল টাকা সম্পত্তির ডকুমেন্টস।
ইন্সপেক্টর কাগজে চোখ বুলিয়ে বলল
— মনির সাহেব আমরা আপনাকে এ্যারেস্ট করতে বাধ্য হচ্ছি।
মনির চৌধুরী চিৎকার করে বলে ওঠে..
— রিহা! তুই তোর বাবাকে….
আর কিছু বলার আগেই রিহা বলল
— বলেছিলাম না আমার স্বামীর গায়ে হাত তুললে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।আমাকে খারাপ হতে বাধ্য করলেন আপনি।
মনির চৌধুরীকে আর কিছু বলতে না দিয়ে পুলিশ গার্ডসহ এ্যারেস্ট করে নিয়ে গেলো।
সবাই মিলে বাড়ি ফিরল।ড্রয়িং রুমে ইশিতা নাজমা বেগম বসে ছিলো। ইয়াশ কাউকে কিছু বললো না রিহাকে বললো রিহা ওকে ঘরে নিয়ে যাও।
রিহা ইফানকে ধরে ঘরে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিলো।ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে কাটা ঠোঁটের রক্ত মুছে দিলো।
ইফান এক ধ্যানে তাকিয়ে দেখলো রিহাকে। ইফানের চোখের দিকে তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিলো রিহা।
দুপুরে সবাই অনেকদিনপর একসাথে খেতে বসলো।
বিকেলে সবাই শপিং করলো।ইয়াশ ইশিতা খুব এক্সাইটেড।
রিহা এক মুহুর্তের জন্যও ইফানের হাত ছাড়ে নি।ইফান একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। আগের ইফান সে মোটেও নেই।প্রয়োজনে হাসে নয়ত চুপ করে একে-ওকে চেয়ে চেয়ে দেখে।
সবাই প্রচুর শপিং করল।মায়ের জন্য ও করলো।তারপর ডিনার করতে গেলো রেস্টুরেন্টে। ইশিতা -ইয়াশ পাশাপাশি বসেছে আর ইফান -রিহা আরেকপাশে।
ইফানের হাতের আঙুলের পাশের চোট এখনো আছে।ইফান চামচ হাতে তুলতেই রিহা ইফানের মুখে খাবার তুলে দিলো।ইফান রিহার দিকে তাকিয়ে খাবার তুলে নিলো মুখে।
ইশিতা ইয়াশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো।ইফান ব্যাপারটা খেয়াল করে নিচে তাকিয়ে রইলো।বাকিসময়টা নিচের দিকে তাকিয়ে রিহার হাতেই খাওয়া শেষ করলো ইফান।
মায়ের জন্য খাবার নিয়ে বিল চুকিয়ে বেরিয়ে পড়লো সবাই।
বাড়ি এসে যে যার মত ঘরে চলে গেলো।বাড়িতে
পিনপতন নীরবতা চললেও সবার মনেই আনন্দ নতুন দিনের উল্লাস উঁকি দিচ্ছে।
সকাল হতেই ডেকোরেশন শুরু হয়ে গেছে। পুরো বাড়িতে ফুল-লাইটিংয়ের কাজ চলছে।ইয়াশ সব কিছু দেখছে।আস্তে আস্তে মেহমানরা এসে যাচ্ছে। পুরো বাড়িতে হৈ হৈ ভাব চলে আসছে।
ইফানের ঘুম ভাঙল বাহিরের শব্দে।দেয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে প্রায় পনে দশটা।হঠাৎ ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে সেদিকে ফিরলো ইফান।
চুল পেঁচাতে পেঁচাতে বেরিয়ে আসছে রিহা।লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি পরা।
খুব সিগ্ধ দেখাচ্ছে রিহাকে।ইফানের দিকে একবার তাকিয়ে ড্রেসিংটেবিলের সামনে টুলে বসলো রিহা।
হাত উল্টিয়ে পেছন থেকে ব্লাউজের হুক লাগাতে চেষ্টা করতে শুরু করল।ইফান চোখ সরিয়ে নিয়ে বাথরুমে চলে গেলো।
রিহা এখনো জানে না আজ শুধু ইয়াশ-ইশিতার নয় তাদেরও গায়ে হলুদ…!
ইফান ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে বিছানার উপর বসল।রিহা উঠে এসে ইফানের সামনে বসে বলল
— একটু হুকটা লাগিয়ে দিবে??পারবে লাগাতে.??
বিনীত প্রশ্ন!
ইফান আস্তে করে ব্লাউজে হাত দিলো।হুক লাগাতে গিয়ে চোখ পড়লো লাল তিলটায়।এই প্রথম লাল তিল দেখলো ইফান।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই অস্বস্তি হলো রিহার।
— কি হলো পারছো না?আচ্ছা ছাড়ো আমি চেষ্টা করছি।
ইফান ঘোর থেকে বেরিয়ে কিছুসময় চেষ্টা করে হুকটা লাগিয়ে দিতে সক্ষম হলো।
রিহা ধন্যবাদ বলে হেসে আলমারি থেকে একটা হলুদ পাঞ্জাবি বের করে দিলো।
ইফান কিছু না বলে সাদা পাজামার সাথে হলুদ পাঞ্জাবিটা পরে বের হলো।হালকা সেজে নিলো রিহা।চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।আয়নার সামনে রিহাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইফান অস্ফুট স্বরে বলে উঠল রিহার মাঝে মুগ্ধতা খুঁজতে বলেছিলে না ইশিতা??মুগ্ধতা খুঁজে পাচ্ছি আমি।এবার আমিও ভালো থাকবো তোমার মতো।
দুজন একসাথে ঘর থেকে বের হয়ে নিচে নামল।দুদিকে মুখোমুখি দুটো স্টেজ করা হয়েছে।একটা স্টেজে লিখা আজ ইয়াশ-ইশিতার গায়ে হলুদ।আরেকটা স্টেজের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলো রিহা।চমকে ইফানের দিকে তাকালো।ম্লান হাসল ইফান।চোখে পানি চলে এলো রিহার।আজ রিহা-ইফানের গায়ে হলুদ…!এক বিশ্ব জয় করা হাসি হাসল রিহা।
চলবে_
সেই তুমি💐
পর্ব -৪৪
Samira Afrin Samia
#Nipa
আজ সন্ধ্যায় ইফান-রিহা আর ইয়াশ-ইশিতার এক সাথে হলুদ হবে। পুরো বাড়ি, বিয়ে বাড়ির সাজে সাজানো হলো। ইশিতার মামা মামী মামাতো দুই বোন সবাই এসেছে। রিহার বাড়ি থেকে কেউ আসে নি। রিহার পরিবারে তার বাবা ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু এখন রিহার বাবা জেলে আছে। আর যদিও বাসায় থাকতো তাহলেও আসতো না। তাই বলা যায় রিহার হলুদ সন্ধ্যায় রিহার আপন বলতে কেউ আসেনি। ইয়াশ দের কাছের দূরের যত আত্মীয় ছিল সবাই আসছে।
রিহা আর ইফান নিচে নামার সাথে সাথেই নাজমা চৌধুরী ইফানের কাছে এসে
— ইফান তোর আক্কেল জ্ঞান কিছু নেই তাই না?
জানিস আজ ইয়াশ ইশিতার সাথে সাথে তোদের ও হলুদ হবে। তারপর ও এতো লেট করে নিচে আসলি। যাও নিচে আসলি কিন্তু এসব কি পড়ে এসেছিস?
কখনও কি দেখছিস এসব ড্রেস পড়ে কারো হলুদ হয়েছে?
কয়েক জন মহিলা এসে নাজমা চৌধুরী কে কিসের কাজের কথা বলে নিয়ে গেল।
নাজমা চৌধুরী চলে গেলে রিহা কোমরে হাত দিয়ে চোখ দু’টো ছোট ছোট করে কপাল কুঁচকিয়ে ইফানের দিকে তাকায়।
ইফান রিহার দিকে তাকিয়ে
— কি হলো আমাকে এভাবে দেখছ কেন?
— এভাবে দেখবো না তো কোন ভাবে দেখবো আমাকে একটু বলে দিবেন মিস্টার?
ইফান চুল ঠিক করার ভাব নিয়ে। অন্য দিকে তাকিয়ে এটা সেটা দেখছে। রিহা ইফানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে
— এই যে মিস্টার আমি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আর তুমি অন্য দিকে তাকিয়ে কি দেখে যাচ্ছো?
— কই কি দেখছি?
— কিছু দেখছো না তাহলে আমার দিকে না তাকিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছো কেন?
— আমি তো আমার বউ টা কে ই দেখছি।
হঠাৎ করে ইফান রিহা কে এভাবে বউ বলে উঠলে রিহা একটু অপ্রস্তুত পরিস্থিতি তে পড়ে যায়। রিহা লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে নেয়। ইফান রিহা কে এই অবস্থায় দেখে একটু হাসে।
আশেপাশে অনেক লোক আছে কিন্তু কেউ কারো দিকে নজর দিচ্ছে না। যে যার মত ব্যস্ত আছে।ইফান একটু চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে রিহার কোমরে ধরে এক টান দিয়ে রিহা কে নিজের কাছে নিয়ে আসে। ইফান কে হঠাৎ এমন করতে দেখে রিহা অবাক হচ্ছে সাথে লজ্জা ও পাচ্ছে।
— কি করছো কি ইফান?
আশেপাশে কত লোক খেয়াল করেছো?
কেউ দেখলে কি ভাববে?
— আমি আমার বউয়ের সাথে একটু রোমান্স করবো এতে লোকের কি?
দেখুক লোক। আমি অন্য কারো বউয়ের কোমরে হাত রাখিনি। নিজের বউয়ের কোমরে ই ত হাত রেখেছি। লোকের যা ভাবার ভাবুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না।রিহা আর কিছু বললো না।
— আচ্ছা তুমি আগে থেকেই জানতে আজ ওদের সাথে আমাদেরও হলুদ হবে?
— হুম। আমি ই মা’কে বলেছিলাম ভাই ভাবীর সাথে যেন আমাদের বিয়ে টা ও হয়ে যায়। এমনিতে ও আমাদের তেমন ভাবে বিয়ে হয়নি যেমনটা সবার হয়ে থাকে।
— তাহলে আমাকে জানাও নি কেন?
— আগে থেকে জানিয়ে দিলে তোমাকে সারপ্রাইজ দিতাম কিভাবে?
আর তোমার এই খুশি ভরা মুখ টা নিজের চোখে দেখতাম কিভাবে?
রিহা ইফানের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ ঝলঝল করছে। ইফান এতটা বদলে গেছে। রিহার কপালে কি সত্যি ই ইফানের এতটা ভালোবাসা পাওয়া লিখা ছিল?
ইফান রিহার কপালে হালকা করে একটা চুমু খেলো।
পাশ থেকে ইফানের কাজিন রা হেসে উঠলো। রিহা ওদের দিকে তাকিয়ে ইফান কে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইলে ইফান রিহা কে আরো শক্ত করে ধরে রাখে।
রিহা ইফানের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে
— ছাড়ো।
ইফান মাথা নাড়িয়ে
— না।
— না মানে? দেখছো তো ও’রা কিভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
— ওদের কাজ ই সারাক্ষণ আনতাজি হাসাহাসি করা। ওদের কথা তুমি বাদ দাও তো।
রিহা কিছু বলার আগেই ইফানের এক চাচাতো বোন এগিয়ে এসে
— ভাইয়া মানছি তুমি ভাবী কে অনেক ভালোবাসো। তোমাদের রোমান্স কখনও শেষ হবে না। তাই বলে কোথাই রোমান্স করবে তা ও তো একটু দেখে নিবে। এটা পাবলিক প্লেস এখানে কিন্তু এসব চলবে না।
— কে বললো এখানে এসব চলবে না?
— কে বললো মানে তোমরা কি এখন এই সব গুলো মানুষ কে দেখিয়ে দেখিয়ে রোমান্স করবে?
— হুম করলে সমস্যা কি?
ইফান এখনও রিহা কে ঠিক আগের মতই ধরে রেখেছে। রিহা লজ্জায় লাল নীল বেগুনী হয়ে চোখ বুঁজে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
— ছিঃ ভাইয়া তোমাদের লজ্জা না থাকতে পারে তাই বলে কি পাবলিকের ও লজ্জা নেই। আমরা সাধারণ পাবলিক দিনে দুপুরে নিজের চোখের সামনে এসব দেখতে পারবো না।
— তোর দেখতে ইচ্ছে না হলে চোখ বন্ধ করে নে।
— ভাইয়া!
ইফান এবার রিহা কে ছেড়ে দিয়ে কাজলের (কাজল ইফানের কাজিনের নাম) চুল ধরে টান দিয়ে
— খুব পাকনা হয়ে গেছিস তাই না?
দাঁড়া আজ তোর চুল ছিঁড়ব। এখন তো ভাই ও এখানে নেই। তোকে আজ আমার থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।
কাজল রিহার পিছনে গিয়ে লুকিয়ে
— ভাবী দেখো না তোমার হাজবেন্ড নাকি আমার চুল ছিড়ে ফেলবে। আমি এতো বড় হয়ে গেছি এখনও তোমার হাজবেন্ড কথায় কথায় আমাকে মারার ধমক দেয়। ওর নামে আমি একদিন সত্যি সত্যি ই থানায় মামলা করবো। তখন কিন্তু তোমার কথা ও শুনবো না।
ইফান কাজল কে তাড়া করতে এসে
— তবে রে। দাঁড়া আজ তোর তেরোটা বাজাবো আমি।
— ভাবী!
ইফান কাজলের পেছনে দৌড়াচ্ছে আর কাজল ও রিহা কে ঘিরে গোল করে দৌড়াচ্ছে।
— ভাবী তুমি ভাইকে কে কিছু বলো। নাহলে এই ভাল্লুক টা সত্যি ই আমাকে মেরে ফেলবে।
রিহা ইফান আর কাজলের এসব কাহিনী দেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে।
— কি শুরু করলে তোমরা দু’জন?
এবার থামো।
ইফান ও আজ অনেক দিন পর মন খোলে হাসছে। আজ অনেক দিন হয়ে গিয়েছিল ইফান এভাবে হাসে নি।কাজল কে দৌড়তে দৌড়াতে এক সময় ইফান হাঁপিয়ে গেল।
ইফান হাঁটুয় ভর দিয়ে নিচু হয়ে
— থাম থাম হয়েছে। আর পারবো না তোর সাথে দৌড়াতে।
কাজল ও রিহা কে ধরে হাঁপাতে লাগলো।
— তোমার সব মারের প্রতিশোধ তোমার বউয়ের উপর দিয়ে নিবো দেখে নিও।
— আচ্ছা!
“হুম” বলে কাজল উঠে দৌড় দিলো।
ইফান এখনও হাঁপাচ্ছে আর হাসছে। রিহা এক দৃষ্টিতে ইফান কে দেখে যাচ্ছে। ইফান কে অনেক দিন পর এভাবে হাসতে দেখছে রিহা।
দূর থেকে ওদের দু’জনকেই দাঁড়িয়ে দেখছে ইশিতা। ইশিতা ই কাজল কে ইফানের কাছে পাঠিয়েছে। আর আগে থেকেই সব কিছু বলে দিয়েছিল কিভাবে কি করতে হবে। ইশিতা ও চাইছিল ইফান মন থেকে খুশি হোক। আগের মত চঞ্চল হয়ে উঠুক। দুষ্টুমি করে হেসে খেলে সবাই কে নিয়ে আগের মত খুশি থাকুক। ইফান তো কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে আরও অনেক সময় লাগতো। তাই ইশিতা কাজলের সাথে প্লেন করে এসব কিছু করেছে যাতে ইফান আজই আগের মত স্বাভাবিক হয়ে যায়। আর নিজের হলুদ সন্ধ্যা এনজয় করতে পারে।
কাজল ইশিতার কাছে এসে ভাবী কাজ হয়ে গেছে। ইফান ভাইয়া আগে যেমন ছিল এখন আবার ঠিক তেমন হয়ে গেছে। দেখো ভাইয়া আবার আগের মতই আমার পিছু লেগেছে।
ইশিতা কাজলের দিকে তাকিয়ে
— থেংক্স ননদিনী।
তোমার জন্য ই এই প্লেন টা কাজ করেছে। তুমি না থাকলে হয়ত আমি একা সব কিছু করতে পারতাম না।
— ধুর ভাবী। নিজের ভাইয়া কে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে একটু সাহায্য করেছি এর জন্য বদলে তোমার থেংক্স নিব নাকি?
আমি ইয়াশ আর ইফান ভাইয়ার নিজের বোন না। তারপরও ওরা দুজনেই আমাকে নিজের বোনের মত ভালোবাসে। ওদের জন্য আমি সব করতে পারবো।
— আচ্ছা ঠিক আছে থেংক্স নিতে হবে না। এখন গিয়ে তোমার আরেক ভাবী কে হলুদের জন্য রেডি করে নিয়ে এসো।
— হুম ভাবী।
কাজল রিহা কে রেডি করানোর জন্য চলে গেল।
ইশিতা দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ পেছন থেকে ইশিতা কে জড়িয়ে ধরে
— সব প্লেন ঠিকঠাক মত কাজ করেছে তো?
ইশিতা চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকালো
— তুমি?
— হুম।
— তুমি এখানে কি করছো?
এখনও তো রেডি হও নি। আজ কি তোমার হলুদ হবে না?
— ভেবেছিলাম তো হবে কিন্তু আমার বউ ই যদি আমার কাছাকাছি না থাকলে তাহলে হলুদ করে লাভ কি?
— হয়েছে এখন যাও। রুমে গিয়ে তুমি রেডি হতে থাকো আমি আসছি?
— কত পারো তুমি?
— কি পারি?
— এই যে ইফান রিহার জন্য কত কিছু করছো। কত প্লেন কত আয়োজন। রিহা ইফান কে খুশি রাখার জন্য এতো খাটাখাটুনি আর…
এই বলে ইয়াশ থেমে গেল।
— আর কি?
— আর নিজের হাজবেন্ডের জন্য কিছু ই না।
— আমি কি শুধু ওদের দুজনের জন্য এসব করছি। আমি সবার জন্যই করছি। ওরা ভালো না থাকলে কি আমার একা একা ভালো থাকতে পারবো?
— হুম বুঝলাম।
বউ আমার সবার কথাই ভাবে শুধু আমার কথাই মনে থাকে না। আমার জন্য কোন কিছু করার সময় পায় না।
— থাক মিস্টার হাজবেন্ড আপনার আর কষ্ট প্রকাশ করতে হবে না।
চলুন আমার ও নিজেরা গিয়ে রেডি হয়ে আসি৷ এমনিতেই মা একটু আগে আমার সাথে চেচাঁমেচি করে গেছে। এখন যদি এসে দেখে আমি আগের মতই এখনও এখানে আছি রেডি হয়নি তাহলে আমাকে মেরে ই ফেলবে।
— হুম চলো।
এটা বলেই ইয়াশ ইশিতা কে কোলে তুলে নিয়ে রুমের দিকে যেতে লাগলো।
চলবে…..