#বাবুইপাখির_অনুভূতি🕊️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম🕊️
— পর্বঃ৩৯
_________________
নিরাশা ভরা চোখে তাকিয়ে আছে আহি আদ্রিয়ানের মুখের দিকে। তাঁর ঠিক হজম হচ্ছে না আদ্রিয়ানের কথাটা। তারপরও বেশি না ভেবে বলে উঠল আহি,
‘ ঠিক আছে আমি আপনার জামাকাপড় ফেরত দিয়ে দিবো। এখন তো আমি হসপিটালে যাবো, হসপিটাল থেকে ফিরে এসে আপনায় দিয়ে যাবো আপনার অফিস কয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে।’
‘ হুম ১০ঃ০০ টা (নিলয়)
‘ ঠিক আছে আমি ৯ঃ৩০ টার সময় এসে দিয়ে যাবো। তাহলে আজ আসি পড়ে দেখা হবে।’
বলেই রুম থেকে বেরিয়ে যায় আহি। আর আদ্রিয়ান জাস্ট হাবলার মতো তাকিয়ে থাকে আহির দিকে। কিছুক্ষন আগে সে কি কি বললো সেসব ভাবতেই গিলটি ফিল হচ্ছে তাঁর। ছিঃ ছিঃ শেষে কিনা নিজের জামা কাপড় ফেরত চাইলো। ওইসময় অস্থিরতার কারনে ফট করেই ওসব বলে ফেলে আদ্রিয়ান। আহি যেতেই নিলয় এগিয়ে আসলো আদ্রিয়ানের দিকে তারপর বললো,
‘ তুই শালা জামাকাপড়গুলো এনে ইস্তিরি করে আলমারিতে গুছিয়ে রাখিস, পাগল কোথাকার?’
বলেই হন হন করে বেরিয়ে গেল নিলয়। আর আদ্রিয়ান সে একই ভঙ্গিতে বসে রইলো। আদ্রিয়ান নিজের কাজে নিজেই লজ্জিত কি বলে ফেললো সে?’
____
আদ্রিয়ানের অফিস থেকে বেরিয়ে আনমনেই হাঁটছে আহি। তাঁর এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আদ্রিয়ান তাঁর জামাকাপড় ফেরত চাওয়ার জন্য এইভাবে লোক দিয়ে তুলে আনলো। আনমনেই বলে উঠল সে ‘উদ্ভুত তো।’
ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় ৩টার কাছাকাছি বেজে গেছে। আহি আনমনেই এগিয়ে চললো তাঁর গন্তব্যের দিকে। এমন সময় তাঁরই সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল দুজন কলেজ পড়ুয়া মেয়ে। আর ওদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তিনজন বখাটে ছেলে একজন বিঁড়ি খাচ্ছিল আর দুজন পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎই সামনের ছেলেগুলো কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের দেখে বলে উঠল,
‘ হেই সুন্দরীরা একা একা যাচ্ছো কোথায় সঙ্গে আসবো নাকি?’
ছেলেগুলোর কথা শুনে ভয়ের চোটে মাথা নিচু করেই হেঁটে গেল মেয়েগুলো। আহির ভীষণ রাগ হলো ছেলেগুলোর কথা শুনে। কিন্তু আপাতত সেই রাগটাকে দমিয়ে রেখে চুপচাপ হেঁটে যেতে লাগলো সে ছেলেগুলোর পাশ দিয়ে। এমন সময় বিঁড়ি খাওয়া ছেলেটি আহিকে দেখে বলে উঠল,
‘ কি মাল দেখেছিস? ভাবছি এই মালটাকে বিয়ে করবো মোহন?’
ছেলেগুলোর মুখে নিজের সম্পর্কে এত বড় বাজে মন্তব্য শুনে গা জ্বলে উঠলো আহির। ভেবেছিলো কিছু না বলেই চলে যাবে কিন্তু ছেলেগুলো যা বললো তা শুনে আহির মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠলো। আহি দু’পা সামনে রেখেও আবার দাঁড়িয়ে পিছনে এগিয়ে আসলো তাঁরপর ছেলেগুলোর মুখোমুখি হয়ে বললো,
‘ কি বললেন আপনি?’
‘ কেন ভালো লেগেছে বুঝি তাই আবার শুনতে ইচ্ছে করছে?’
‘ লজ্জা করে না রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে এইসব অসভ্যপনা করতে।’
‘ না লজ্জা করে না বেবি?’
‘ একদম বাজে কথা বলবেন না তাহলে কিন্তু?’
‘ ও বাবা এ দেখি ভয় দেখাচ্ছে। দুলাল,মোহন আমি তো খুব ভয় পাইছি।’
বলেই হাসতে লাগলো তিনজন তারপর বললো,
‘ তা তুমি কি করবে শুনি মারবে নাকি আমায়?’
রাগ হচ্ছে আহির ভীষণ রাগ। আহি প্রচন্ড রাগ নিয়েই বলে উঠল,
‘ দরকার পড়লে তাই করবো।’
‘ ও বাবা তাই নাকি মারো মারো দেখি তো তোমার কত সাহস মারো আমায়।’
বলেই নিজের গালটা এগিয়ে দিল আহির দিকে। ছেলেটার কাজ দেখে আহির রাগ যেন সপ্তম আকাশে উঠে গেছে। আহিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবারো বলে উঠল ছেলেটি,
‘ কি হলো সুন্দরী মারছো না কেন, মারো তোমার সাহস থাকলে মারো আমায়?’
ছেলেটার এবারের কথা শুনে আহি যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। ঠাস করে ছেলেটার গালে থাপ্পড় দিয়ে বসলো। আহির কাজ দেখে মোহন,দুলাল যেন অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছে গেছে তাঁরা ভাবতেই পারে নি আহি সত্যি মাহিনের গালে থাপ্পড় দিয়ে বসবে। আর আহির কাজে মাহিনও বেশ চমকে উঠেছে। পরক্ষণেই রাগে মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো তার। অন্যদিকে আহি ছেলেটির গালে থাপ্পড় দিয়েই জোরে জোরে বলতে শুরু করলো,
‘ কি দেখেছিস সাহস আছে কিনা, রাস্তাঘাটে বের হলেই কি মেয়েদের তোর নিজের বাড়ির প্রোপার্টি মনে হয়। অসভ্য ছেলে বলেই আরেক গালে থাপ্পড় দিয়ে বসলো আহি। আহির কাজে ছেলেটি আহির দিকে তেড়ে আসবে যাবে তাঁর আগেই আহির চিল্লাচিল্লি শুনে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসতে লাগলো তাদের দিকে। আশেপাশে লোকজনকে আসতে দেখে দুলাল, মোহন ভয় পেয়ে মাহিনের হাত ধরে বললো,
‘ এখান থেকে চল না হলে পাবলিক ধরে মারবে মাহিন?’
ওদের কথা শুনে মাহিন রেগেমেগে বলে উঠল,
‘ তোকে আমি দেখে নিবো,শুধুমাত্র এই লোকগুলোর জন্য বেঁচে গেলি।’
বলেই মাহিন,দুলাল মোহন তিনজনই দৌড়ে পালালো। আর আহি নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। এরই মধ্যে সেখানে এসে জড়ো হলো আশেপাশের লোকজন আহির দিকে এগিয়ে এসে বললো তাঁরা,
‘ কিছু কি হয়েছে মেয়ে?’
উওরে আহি বললো,
‘ না না কিছু হয় নি।’
বলেই হাঁটা শুরু করলো আহি। রাগ হচ্ছে তাঁর ভীষণ রাগ দুটো চড় মেরেও যেন শান্তি মিলছে না আহির আরও কয়েকটা দিতে পারলে হয়তো ভালো লাগতো।’
_____
পরন্ত বিকেলে বেলায়, খোলা আকাশের নিচে বড় সবুজের ঘেরা মাঠের মাঝখানে একটা গাছের পাশ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুভ। তাঁর মূল উদ্দেশ্য হলো রিনিকে প্রপোজ করা। যা আছে ভাগ্যে তাই হবে, তবে প্রপোজ সে আজ করেই ছাড়বে। এইভাবে না বলে নিজের অনুভূতিগুলোকে আর নিজের মাঝে রাখতে পারছে না শুভ। রাতে রিনির চিন্তাতে ঘুম আসে না তাঁর। তাই ভেবে নিয়েছে শুভ আজ সে রিনিকে প্রপোজ করেই ছাড়বে। আর সেই জন্য সকালে সে ফোন করে বলেও দিয়েছে আজ যেন সময় করে বিকেলবেলা তাঁর সাথে দেখা করে রিনি। রিনিও শুভর কথা শুনে এক কথায় রাজি হয়ে যায়। সাধারণত রিনির নাম্বারটা নিয়েছিল শুভ হসপিটালে বসে। একরাশ অস্থিরতা নিয়ে মাঠের এপাশ ওপাশ পায়চারি করছে শুভ৷ কি করে কি বলবে সেটাই ভাবছে সে তবে আজ রিনিকে প্রপোজ করেই ছাড়বে তারপর যা হয় হবে। এই রকম আরো নানা কিছু ভাবছে শুভ আর পায়চারি করছে।’
এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলো রিনি পরনে তাঁর ওয়াইট টিশার্ট, সাথে এস কালার জিন্স,এস কালার লেডিস জ্যাকেট,চুলগুলো খোলা,হাতে কিছু ব্যাচ,পায়ে সু পড়ে অসাধারণ লাগছে তাঁকে। বেশ আগ্রহ নিয়েই এগিয়ে আসছে সে শুভর দিকে। আজ প্রায় একদিন পর শুভকে দেখবে রিনি। এই একদিন শুভকে না দেখে তাঁর যেন অবস্থা খারাপ। রিনি বুঝতে পেরেছে সেই ইনোসেন্ট মার্কা সহজ সরল পোলাডারে নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছে সে। প্রথম ভালোলাগা তাঁর সেদিন শুভর বাড়িতে বসেই হয়েছিল। জ্বরে ঘোরে শুভকে সেবার করার মুহূর্তগুলো, তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো আজও চোখে ভাসে তাঁর। রিনি ভেবেছিল নেক্সট যেদিন শুভর সাথে দেখা হবে তাঁদের তখনই প্রপোজ করে দিবে। আহির মতো মটেও সে ভিতু নয় এসব ব্যাপারে। যদিও শুভ তাঁর ফাস্ট লাভ। এসব ভাবতে ভাবতেই এগিয়ে চলছিল রিনি। হঠাৎ তাঁর চোখ যায় তাঁর থেকে কয়েককদম দূরে গাছের পাশে উল্টো দিক ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলের দিকে। রিনি বেশ বুঝতে পেরেছে ওটাই শুভ। রিনি মুচকি হেঁসেই এগিয়ে চললো সেদিকে।’
নার্ভাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুভ কি বলবে না বলবে কিছু বুঝতে পারছে না সে। এমন সময় পিছন থেকে বলে উঠল কেউ,
‘ আপনি আমায় আসতে বলেছিলেন?’
ভয়েসটা রিনির বুঝতে পেরে শুভর যেন শরীর কাঁপছে শুরু করলো। নার্ভাস হয়েই পিছন ফিরে শুঁকনো হেঁসে বললো সে,
‘ হুম।’
‘ কি জানি বলবেন বলছিলেন বলে ফেলুন আপনার বলা শেষ হলে আমারও আপনাকে কিছু বলার আছে?’
রিনির কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে বললো শুভ,
‘ আপনিও কিছু বলবেন আমায়?’
উওরে লাজুক মাখা মুখ নিয়ে হাল্কা হেঁসে বললো রিনি,
‘ হুম আপনি আগে বলুন তাঁরপর আমি বলছি?’
রিনির কথা শুনে হাল্কা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল শুভ,
‘ আমিই আগে বলবো?’
‘ হুম বলুন কোনো সমস্যা নেই।’
‘ আসলে রিনি হয়েছে কি, কথাটা শোনার পর রাগ করবে না প্লিজ?’
‘ ঠিক আছে বলুন তো আগে।’
‘ শুধু হ্যাঁ না উওর দিলেই হবে।’
শুভর এবারের কথা শুনে হেঁসেই বলে উঠল রিনি,
‘ ঠিক আছে।’
‘ আসলে রিনি
বলেই আশেপাশে তাকালো শুভ, না তেমন কেউ নেই ধারে কাছে। শুভকে এদিক সেদিক তাকাতে দেখে বলে উঠল রিনি,
‘ কি হলো বলুন?’
‘ আসলে হয়েছে কি,
বলেই চোখ বন্ধ করে ফেলে শুভ তারপর ফটাফট বলে দেয় সে,
‘ আসলে রিনি আই লাভ ইউ। জানি না কখন কিভাবে তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি কিন্তু বাসি খুব বাসি। তুমি কি আমায় ভালোবাসবে?’
পুরো একশ্বাসে চোখ বন্ধ করে কথাগুলো বলে ফেললো শুভ রিনিকে। আর শুভর কথা শুনে রিনি চোখ বড় বড় করে বললো,
‘ কি?’
মুহূর্তের মধ্যে হাসি ফুটে উঠলো তাঁর। রিনি ভাবে সে কিছু বলার আগেই শুভ তাঁকে বলে দিবে। অন্যদিকে রিনির ‘কি’ শব্দটা শুনতেই বুকটা যেন কেঁপে উঠল শুভর। চোখ বন্ধ করেই আবার বলে উঠল সে,
‘ প্লিজ প্লিজ রাগ করবেন না, আপনি শুধু হ্যাঁ বা না বললেই হবে।’
শুভর ভয়ার্ত মাখা চেহারা দেখে মুচকি হাসলো রিনি। সে বুঝে উঠতে পারে না এই ছেলেটা এমন কেন? রিনি শুভ কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর গালে চুমু দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
‘ শুনন এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমিও ভালোবাসি আপনায়।’
হুট করেই গালে কিছুর স্পর্শ পেতেই সাথে রিনির বলা কথা শুনে শুভ চোখ খুলে তাকালো তারপর রিনির দিকে তাকিয়ে বললো সে,
‘ সত্যি আপনিও আমায় ভালোবাসেন।’
উওরে মুচকি হেঁসে মাথা নাড়ালো রিনি। রিনির জবাব শুনে খুশি হয়ে রিনিকে জড়িয়ে ধরতে নিয়েও আবার থেমে গেল শুভ। শুভর কাজে রিনি হেঁসেই গিয়ে জড়িয়ে ধরলো শুভকে তারপর বললো,
‘ এত ভয় পেলে আমার সাথে সারাজীবন কাটাবেন কি করে?’
উওরে শুভও রিনিকে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘ ভালোবাসা দিয়ে।’
শুভর কথা শুনে মুচকি হাসে রিনি।’
আকাশটা পুরোই ধবধবে সাদা হয়ে আছে।
মুক্ত আকাশের মাঝখান দিয়ে উড়ে চললো এক ঝাঁক পাখি। সাথে তাদের পাশে থাকা গাছের পাতাগুলো নড়ছে ভীষণ হয়তো তাঁরাও দুজন প্রকাশিত ভালোবাসার মানুষের খুশিতে আনন্দ পেয়ে নেচে উঠেছে।’
______
রাত নয়টা বেজে চল্লিশ মিনিট।’
অফিসে বসে আছে আদ্রিয়ান। মাথা ভরা টেনশন কাজ করছে তাঁর। এখানে বসে থাকার মূল কারণ হলো আহি। আহি বলেছিল এমন সময় সে আসবে। আদ্রিয়ান ভেবে নিয়েছে দুপুরে যেটা বলতে পারে নি সেটা এখন বলে দিবে। আর দেরি করবে না সে। সাথে এটাও বলবে দুপুরে জামাকাপড় ফেরত চাওয়ার জন্য আহিকে তুলে আনে নি নিলয়। অফিস প্রায় ফাঁকা নিলয়ও চলে গেছে কিছুক্ষন আগে। অল্পকিছুক্ষন বসে থেকে আদ্রিয়ানও উঠে দাঁড়ালো হয়তো আহি আজ আসবে না। আদ্রিয়ান ছোট্ট দীর্ঘ শ্বাস ফেলে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। বাহিরে বেরিয়েই সবার আগে আকাশটার দিকে তাকালো সে হাল্কা মেঘাছন্ন হয়ে গেছে। সাথে কিছুক্ষন পর পর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে হয়তো আজও মুষল ধারে বৃষ্টি নামবে। এই বৃষ্টিই যেন আহি আর আদ্রিয়ানকে খুব কাছে নিয়ে আসে। কিন্তু আজ, ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে আদ্রিয়ান তারপর আর বেশি না কিছু ভেবে গিয়ে বসতে নিলো গাড়িতে এমন সময় হাতে ব্যাগ নিয়ে এক প্রকার দৌড়ে আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো আহি আর বললে লাগলো,
‘ যাবেন না আমার জন্য দাঁড়ান?’
হঠাৎই আহির কন্ঠ কানে আসতেই গাড়ির দরজার কাছে হাত দিয়েও আবার সরিয়ে রেখে চোখ ঘুরে ডান দিকে তাকালো সে, সত্যি সত্যি আহিকে তাঁর দিকে আসতে দেখে ঠিক কেমন রিয়েকশন দিবে আদ্রিয়ান ভুলে গেছে। ততক্ষণে আহিও দৌড়ে এসে আদ্রিয়ানের ঠিক সামনে তারপর তাঁর হাতে থাকা ব্যাগটাকে আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
‘ এই নিন আপনার জামা কাপড়, সরি একটু লেট হয়ে গেল।’
আহিকে দেখে যতটা না খুশি হয়েছিল আদ্রিয়ান কিন্তু মুহূর্তেই আহির মুখের কথা শুনে চলে গেল তাঁর। আদ্রিয়ান আহির হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বলে উঠল,
‘ তোমায় আমি বাড়ি পৌঁছে দেই,আহি?’
উওরে আহিও বেশি না ভেবে বলে উঠল,
‘ ঠিক আছে।’
____
রাতের ঝাপসালো অন্ধকারের মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলছে আদ্রিয়ান আর আহি। আগের তুলনায় আরো বেশি বিদুৎ চমকাচ্ছে হয়তো মিনিট পাঁচেকের মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হবে। আদ্রিয়ানরাও প্রায় চলে এসেছে আহিদের বাড়ির কাছাকাছি। হঠাৎ আদ্রিয়ান বলে উঠল,
‘ আহি,
আদ্রিয়ানের কথা শুনে আহিও বলে উঠল,
‘ হুম বলুন।’
‘ তুমি কি রাগ করেছো?’
‘ ওমা রাগ করবো কেন।’
‘ না আসলে আমি তোমায় কিছু বলতে চাই আহি?’
‘ হুম বলুন।’
‘ হয়েছে কি সত্যি বলতে দুপুরে আমি তোমায় ওই জামাকাপড়ের জন্য..
আর কিছু বলার আগেই আহি বলে উঠল,
‘ হয়েছে হয়েছে এখানে থামুন আর যেতে হবে না। এখান থেকে আমি একাই যেতে পারবো।’
বলেই আহি বেরিয়ে পড়লো। আহিকে বের হতে দেখে আদ্রিয়ানও গাড়ি থেকে বেরিয়ে বললো,
‘ আহি,তোমায় কিছু বলতে চাই আমি?’
আদ্রিয়ানের কথা শুনে আহিও আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে এসে বললো,
‘ কাল শুনলে হবে না আসলে দেখছেন তো আকাশের কি অবস্থা, যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি হতে পারে।’
‘ আমার জাস্ট এক মিনিটের কথা।’
‘ ওহ ঠিক আছে বলুন।’
এমন সময় সেই রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে হেঁটে এদিকে আসছিল মাহিন,দুলাল আর মোহন। মাহিন তো আহিকে দেখেই বলে উঠল,
‘ দুপুরের ওই মেয়েটা না এইবার বাগে পেয়েছি?’
বলেই ওদিকে এগিয়ে যেতে নিলো মাহিন। মাহিনকে যেতে দেখে বলে উঠল দুলাল,
‘ কি করছিস কি মেয়েটার সাথে একটা ছেলে আছে দেখেছিস। ছেলেটা যেয়ে নিক।’
বলেই একটা বাড়ির পিছনে লুকিয়ে রইলো ওঁরা। আর দৃষ্টি রাখলো আহির দিকে।
অন্যদিকে আহি অতিআগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ানের কথা শোনার জন্য। আদ্রিয়ান এবার আর বেশি না ভেবে বলে উঠল,
‘ আমি জানি না আহি,তুুমি আমার কথাটা শুনে কেমন রিয়েকশন দিবে। বা তুমি উওর কেমন কি দিবে। কিন্তু আমি বলতে চাই, দুপুরে তোমাকে আমার ওই জামাকাপড় ফেরত চাওয়ার জন্য তুলে নেওয়া হয় নি আহি।
আদ্রিয়ানের কথা বেশ অবাক হয়েই বললো আহি,
‘ তাহলে?’
‘ আসলে আহি আই লাভ ইউ। আমি তোমায় ভালোবাসি আহি।’
মুহূর্তের মধ্যে আদ্রিয়ানের কথা শুনে থমকে গেল আহি। এটা কি বললো আদ্রিয়ান। আহির অবস্থা বুঝতে পেরে আদ্রিয়ান আহির হাত ধরে বলে উঠল,
‘ আমি জানি আহি তুমি হয়তো এমনটা আশা করো নি আমার থেকে। আমি এটাও জানি আহি তুমি নীরবকে কতটা ভালোবাসো। তুমি নীরবকে হয়তো এখনো ভুলতে পারো নি আর হয়তো পারবেও না।
এতটুকু বলে হাল্কা থেমে আবারো বললো আদ্রিয়ান,
‘ তোমাকে আমায় ভালোবাসতে হবে না আহি, আমি তোমায় ভালোবাসবো। তুমি শুধু আমার সাথে থাকবে আমি তোমায় বিয়ে করতে চাই। আই নিড ইউ?
আদ্রিয়ানের কথা শুনে আহি ছলছল চোখে আদ্রিয়ানের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে বললো,
‘ এটা সম্ভব নয় আদ্রিয়ান, এটা অন্যায়।’
বলেই একপ্রকার দৌড়ে সেখান থেকে চলে আহি। আর আদ্রিয়ান হতাশা ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইলো আহির যাওয়ার পানে। এরই মাঝে আকাশ ফেটে মুষল ধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে আদ্রিয়ান। কেন যেন আহির এভাবে চলে যাওয়াটা তাঁকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। আদ্রিয়ান নিরাশা ভরা চেহারা নিয়েই কিছুক্ষন আহির যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে গিয়ে বসলো গাড়িতে। গাড়ি ঘুরিয়ে কিছুদূর এগোতেই হঠাৎই লুকিং গ্লাসে আহির সামনে কিছু ছেলেকে ডিস্টার্ব করতে দেখে চটজলদি গাড়ি থামিয়ে বের হলো সে।’
অন্যদিকে আচমকাই দুপুরের সেই বখাটে ছেলেগুলোকে সামনে আসতে দেখে কিছুটা আঁতকে উঠল আহি। এমনিতেই আদ্রিয়ানের কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল, তাঁর ওপর এই ছেলেগুলো। আহি ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,
‘ আপনারা?’
‘ হুম আমরা বেবি কি ভেবেছিলে এত তাড়াতাড়ি তোমায় ভুলে যাবো,দুপুরের চড়গুলোর শোধ নিতে হবে তো নাকি?’
‘ দেখুন আমি কিন্তু চেঁচাবো?’
আহির কথা শুনে মাহিনও আহির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে উঠল,
‘ চেঁচাও তোমাকে কে বারন করেছে, এমনিতেও এই বৃষ্টির মধ্যে রাতের বেলা কেউ তোমার চেঁচানো শুনতে আসছে না।’
ছেলেটার কাজে হাল্কা ঘাবড়ে গিয়ে আহিও পিছিয়ে যেতে থাকে। কারন সত্যি এখন সে চেঁচালে কেউ শুনতে পারবে না। আহি উল্টোদিক ঘুুরে দিল দৌড়। আহিকে দৌড়াতে দেখে মাহিনও বলে উঠল,
‘ মেয়েটাকে ধর দুলাল, মোহন?’
বলে ওঁরাও তিনজন দিল দৌড় আহির পিছন পিছন। দুকদম এগোতে না এগোতেই মাহিন ধরে ফেললো আহির হাত। তারপর বললো,
‘ কি ভেবেছো এত তাড়াতাড়ি তোমায় ছেড়ে দিবো তা তো হচ্ছে না সুন্দরী?’
‘ প্লিজ আমায় যেতে দিন?’
‘ কেন দুপুরের সেই তেজ এখন হাওয়া হয়ে গেল নাকি?’
এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলো আদ্রিয়ান। বেশি কিছু না ভেবেই মাহিনের বুক বরাবরই পা দিয়ে দিলো এক লাথি সাথে সাথে মুখ থুবড়ে পড়লো সে নিচে। হুট করে এমনটা হওয়া আহি মাহিন দুজনেই চমকে উঠেছে। মাহিন তো আদ্রিয়ানকে দেখে বলে উঠল,
‘ শালারে মার দুলাল?’
তারপর শুরু হলো বৃষ্টির মধ্যে তিনজনের মধ্যে মারামারি। আহি প্রচন্ড ঘাবড়ে গেছে এদের কাজ দেখে। হঠাৎই মাহিনকে মারার সময় পিছন থেকে আদ্রিয়ানের মাথায় রাস্তায় পড়ে থাকা একটা মোটা লাঠি দিয়ে বারি মারলো দুলাল। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ধোঁয়াশা হয়ে গেল আদ্রিয়ানের। ধপাস করে নিচে পড়ে যেতে নিলো সে। আদ্রিয়ানকে পড়ে যেতে দেখে দুলাল ওরা দৌড়ে পালালো সেখান থেকে। অন্যদিকে হুট করে এমন কিছু হওয়াতে আহি দৌড়ে এসে কান্না ভেঁজা গলায় আদ্রিয়ানকে ধরে বলে উঠল,
‘ আপনি ঠিক আছেন আদ্রিয়ান?’
বলেই আদ্রিয়ানের মাথার নিচ থেকে হাত বের করতে নিজের হাতে রক্ত দেখে বুক কেঁপে উঠলো আহির। আহি ছলছল চোখে আদ্রিয়ান দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে বলল,
‘ আপনার মাথা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে আদ্রিয়ান, আমার জন্য আপনার,
উওরে আদ্রিয়ান আহিকে কিছু বলতে নিয়েও বলতে পারলো না। মুহূর্তে মধ্যে সব অন্ধকার হয়ে গেল তাঁর।’
!#বাবুইপাখির_অনুভূতি🕊️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম🕊️
— পর্বঃ৪০
_________________
ভেজালো শরীর নিয়ে হসপিটালের করিডোর দিয়ে আদ্রিয়ানকে নিয়ে যাচ্ছে আহিসহ আরো কিছু হসপিটালের লোকেরা। আহির চোখ বেয়ে পানি পড়ছে খুব। হুট করে কি থেকে কি হয়ে গেল ভাবতেই তাঁর কষ্ট হচ্ছে? নিলয়কে ফোন করে সব বলেছে সে। হয়তো আর কিছুক্ষনের মধ্যেই নিলয় এসে পৌঁছাবে এখানে। এমন সময় সেখান থেকে যাচ্ছিল শুভ। কারন আহি আদ্রিয়ানকে নিয়ে শুভর হসপিটালেই এসেছে।’
পেসেন্টের জায়গায় নিজের ভাইকে অচেতন অবস্থায় দেখে ভিশনভাবে অবাক হয় শুভ। সাথে বুকটাও কেঁপে উঠে তাঁর। শুভ আদ্রিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে ওর হাত ধরে হতভম্ব গলায় বলে উঠল,
‘ ভাইয়া তুমি,
বলেই আদ্রিয়ানের মাথার নিচ থেকে রক্ত বের হতে দেখে চমকে উঠে বললো সে,
‘ এসব কি করে হলো?’ ওনাকে কে নিয়ে এসেছে?’ (সামনের লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে)
শুভর কথা শুনে আহিকে দেখিয়ে বললো লোকগুলো,
‘ উনি..
উওরে শুভ পিছনে এক পলক তাকাতেই আহিকে দেখে আরো যেন অবাক। অবাক চোখেই বললো সে,
‘ তুমি। এসব কি করে হলো, ভাইয়ার কি এক্সিডেন্ট হয়ে ছিল?’
শুভর কথা শুনে আহি অবাক চোখে বলে উঠল,
‘ ভাই, উনি তোমার ভাই হয়?’
‘ হুম আমার বড় ভাই, এসব কি করে হলো?’
‘ সব পড়ে বলবো আগে আদ্রিয়ানকে দেখো,ওনাকে বাঁচাও প্লিজ আমার জন্যই আজ ওনার এমন অবস্থা হয়েছে প্লিজ ওনাকে বাঁচিয়ে তোলো।’
‘ বাঁচাতে তো আমাকে হবেই?’
বলেই আর দেরি না করে আদ্রিয়ানকে নিয়ে ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে চলে যায় শুভ। আদ্রিয়ানের ক্যান্ডিশন খুবই ক্রিটিকাল। মাথা দিয়ে অনেকখানি ব্লাড বের হয়ে গেছে। যার কারণে অবস্থা সত্যি খারাপ।’
এমন সময় আহির সামনে একজন নার্স এসে বললো,
‘ ম্যাম, আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে পেসেন্টের ভর্তির কিছু নিয়ম আছে যেগুলো আপনাকে পূরণ করতে হবে?’
উওরে আহিও বেশি কিছু না ভেবে তাড়াতাড়ি চলে গেল নার্সটির সাথে।’
কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আনুমানিক নাম, বয়স সবকিছুই বললো আহি সামনের একজন মেয়েকে। হঠাৎই মেয়েটি বলে উঠল,
‘ আপনি পেসেন্টের কি হন?’
মেয়েটির কথা শুনে আহি কি বলবে বুঝতে পারছে না। আহিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবারো বলে উঠল মেয়েটি,
‘ কি হলো কথা বলছেন না পেসেন্টর কি হন আপনি?’
‘ জ্বী আমি ওনার বন্ধু,
এরই মধ্যে সেখানে একপ্রকার দৌড়ে এসে হাজির হলো নিলয়। আহিকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দৌড়ে এসে হতভম্ব হয়ে বললো সে,
‘ আদ্রিয়ান কোথায় আহি?’
‘ ওনাকে ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে শুভ দেখছে ওনাকে।’
উওরে নিলয় আর কিছু না বলেই চললো সামনে। আর আহিও ফরমটা নিয়ে চলে যায় নিলয়ের পিছু পিছু।’
_____
চিন্তিত মাখা মুখ নিয়ে বসে আছে আহি। আর তাঁর সামনেই পায়চারি করছে নিলয়। টেনশনে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে তাঁদের। বেশ অনেকক্ষণই হয়ে গেছে শুভ আদ্রিয়ানকে নিয়ে ইমারজেন্সির ওয়ার্ডের ভিতরে আছে। কি হবে না হবে ঠিক বুঝতে পারছে না আহি। বার বার নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে নিজেকে। আজ আদ্রিয়ানের কিছু হয়ে গেলে আহি কখনোই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। এমন সময় আহির ফোনটা বেজে উঠল উপরে রিনির নাম্বার দেখে ফোনটা তুলেই কান্না ভেঁজা কন্ঠ নিয়ে বললো,
‘ রিনি?’
সাধারণত রিনি এই সময় ফোন করেছিল তাঁর আর শুভর ভালোবাসার কথাটা বলার জন্য কিন্তু আহির এমন কান্নার স্বর শুনে চিন্তিত মাখা মুখ নিয়ে বললো সে,
‘ কি হয়েছে তুই কাঁদছিস কেন?’
উওরে আহি কাঁদতে কাঁদতেই আদ্রিয়ান আর তাঁর সাথে হয়ে যাওয়া ঘটনা খুলে বললো রিনিকে। রিনি তো চরম অবাক আহির কথা শুনে। অবাক হয়েই বললো রিনি,
‘ তুই কাঁদিস না আমি এক্ষুনি আসছি?’
উওরে আহি আর কিছু না বলে ফোন কেটে দেয়। এরই মাঝে ইমারজেন্সি ওয়ার্ড থেকে বের হয় শুভ। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ, আহি শুভকে দেখেই দৌড়ে চলে যায় তাঁর কাছে তারপর বলে,
‘ কেমন আছে উনি?’
উওরে শুভ মাথা নিচু করে বলে,
‘ মাথা থেকে প্রচুর রক্ত বের হয়েছে যার কারনে রক্ত শূন্যতা দেখা দিয়েছে। ইমারজেন্সি রক্ত লাগবে?’
শুভর কথা শুনে নিলয় বলে উঠল,
‘ তাহলে রক্ত দিচ্ছো না কেন?’
‘ ভাইয়ার জন্য (A+) পজিটিভ রক্ত লাগবে যেটা বর্তমানে আমাদের কাছে নেই। আরো কিছু জায়গায় খোজ করা হয়েছে রক্তের কিন্তু কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না বর্তমানে। আর ২ ঘন্টার মধ্যে রক্ত না পেলে ভাইয়াকে বাঁচানো খুবই টাফ।’
শুভর কথা শুনে আহির বুকটা যেন দক করে উঠলো এখন কি করবে সে। তাঁর নিজের ব্লাড গ্রুপও এ+ পজিটিভ নয়। ভীষণভাবে কান্না পাচ্ছে তাঁর। অন্যদিকে নিলয় সেও ব্যর্থ তাঁর ব্লাড গ্রুপও এ+ পজিটিভ নয়। নিলয় নিরাশ হয়ে বললো,
‘ আমি দেখছি খুঁজে তুইও দেখ?’
বলেই ফোনটা বের করে কল করলো নিলয়। আর শুভ সেও উল্টোদিকে হেঁটে চললো রক্তের খোঁজে। শুভর চোখ ছলছল করছে ভাইয়াটার কিছু হয়ে গেলে সে কি নিয়ে বাঁচবে সে তো একেবারেই অনাথ হয়ে যাবে। ভাবলেই কেমন একটা লাগছে শুভর। বেশি না ভেবে দ্রুত রক্তের খোঁজে এগিয়ে গেল সে।’
আর অন্যদিকে আহি বাকরুদ্ধ হয়ে বসে পড়লো সামনের চেয়ারে। কি করবে না করবে কিছুতেই মাথায় আসছে না তাঁর। এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলো রিনি আহিকে এভাবে বসে থাকতে দেখে দৌড়ে গিয়ে বললো সে,
‘ আহি, কেমন আছে আদ্রিয়ান ভাইয়া?’
উওরে ছলছল চোখে রিনির দিকে তাকিয়ে বললো আহি,
‘ ভালো না, শুভ বলেছে ইমারজেন্সি (এ+) পজিটিভ রক্ত লাগবে। কিন্তু কোথাও এই রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না। আর ২ ঘন্টার মধ্যে রক্ত না দিলে আদ্রিয়ানকে নাকি বাঁচানো যাবে না। ওনার কিছু হয়ে গেলে আমি নিজেকে কখনোই ক্ষমা করতে পারবো না রিনি। আমার নিজের ব্লাড গ্রুপও (এ+) পজিটিভ নয়। তোর কি গ্রুপ?’
‘ (Ab+)
হতাশ আহি। আহির চেহারা দেখে বলে উঠল রিনি,
‘ চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।’
উওরে আহি কিছু বললো না। হঠাৎই রিনি বলে উঠল,
‘ এ নীরব ভাইয়ার রক্তের গ্রুপও তো (এ+),
রিনির কথা শুনে আহিও বলে উঠল,
‘ হুম তাই তো আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।তাড়াতাড়ি ফোন কর।’
‘ কিন্তু ভাইয়া কি আসছে ঢাকায়?’
‘ সিওর জানি না সকালেই মার সাথে আন্টিকে বলতে শুনেছিলাম আজকে নাকি আসবে।’
‘ দাঁড়া ফোন করে দেখছি?’
বলেই ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে নীরবের নাম্বারে কল করলো সে।’
___
ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় রাত বারোটা ছাড়িয়ে গেছে। পুরো শহরটাই অন্ধকারে ঘেরা। যদিও বাহিরে ল্যামপোস্ট থাকায় অনেকটাই আলোকিত বাহিরটা। বৃষ্টির শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই, কিন্তু আকাশটা এখনো মেঘাচ্ছন্ন হয়ে আছে। চারপাশ বেয়ে হাল্কা বাতাস বইছে। এসবের মাঝেই মন খারাপ করে পড়ার টেবিলের সামনে চুপচাপ বসে আছে নীরব। মনটা আজ বড্ড বেশিই খারাপ তাঁর। অথৈর কাছ থেকে ফিরে আসার পর থেকেই কিছু ভালো লাগছে না নীরবের। কেমন যেন সবকিছু ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সাথে বুকের ভিতরও শূন্যতা কাজ করছে। এমন সময় নীরবের ভাবনাগুলোর মাঝেই তাঁর ফোনটা বেজে উঠল। উপরেই রিনির নাম্বার দেখে অবাক হয় সে। এত রাতে রিনি ফোন করেছে ভেবেই চটজলদি ফোনটা তুললো সে। পরক্ষণেই রিনির সব কথা শুনে সেও আর বেশি না ভেবে বলে উঠল,
‘ আসছি আমি কোন হসপিটালে?’
””
পাশাপাশি কিছুটা দুরত্ব রেখে দুই বেডে শুয়ে আছে নীরব আর আদ্রিয়ান। এই মুহূর্তে নীরবের শরীর থেকে সরাসরি আদ্রিয়ানের শরীরে রক্ত দেওয়া হচ্ছে। কয়েক মুহূর্তে আগেই নীরব এসেছে এখানে। নীরবকে পেয়ে প্রায় সবাই একটু চিন্তিত মুক্ত। নীরবকে আজ ঠিক টাইমে না পেলে যে কি হতো কে জানে?’
কয়েক ঘন্টা পর,,
ইমারজেন্সি ওয়ার্ড থেকে বের হলো নীরব। নীরবকে দেখেই এগিয়ে গেল আহি রিনিসহ সবাই। আহি কৃতজ্ঞতার স্বরে বললো,
‘ তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ভাইয়া। তুমি সময় মতো না আসলে না জানি কি হতো?’
‘ হয়েছে আর কিছু বলতে হবে না।’
এরই মাঝে শুভ নীরবের হাত ধরে বললো,
‘ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আপনি ঠিক টাইমে না আসলে হয়তো আমার ভাইয়াকে,, বলতে গিয়েও বলতে পারলো না শুভ। শুভর কথা শুনে নীরব নিজেও শুভর হাত ধরে বলে,
‘ ইট’স ওকে আর তাছাড়া আমি তেমন কিছুই করিনি যা করার সব তুমিই করেছো আমি জাস্ট একটুখানি রক্ত দিয়েছি।’
‘ এটাই তো অনেক আমি সারাজীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।’
এরই মাঝে একজন নার্স এসে বললো শুভকে,
‘ স্যার পেসেন্টকে কি ঘুমের ঔষধ পুস করে দিবো।’
উওরে শুভ কিছু না বলে চলে যায় ভিতরে তারপর আদ্রিয়ানকে দেখে সে নিজেই ইনজেকশন পুস করে দেয়। আপাতত আদ্রিয়ান বিপদ মুক্ত ভেবেই সস্থির নিশ্বাস ফেললো সে।’
____
করিডোরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আহি। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যতদিন না আদ্রিয়ান সুস্থ হবে ততদিন সে নিজেই আদ্রিয়ানের সেবাযত্ন করবে। এতে যদি তার নিজেকে অপরাধী মনে করার ভাবটা একটু কমে। আহি ভেবে নিয়েছে কিছুদিনের ছুটি নিবে সে হসপিটাল থেকে। কিন্তু ফেমেলিকে কি বলবে সে?’
এমন সময় তাঁর কাঁধে হাত রাখলো রিনি। হঠাৎই কিছু একটা ভেবে বলে উঠল আহি,
‘ তোর একটু হেল্প লাগবে রিনি?’
হুট করে আহির মুখে এমন কথা শুনে বেশ অবাক হয়েই বললো রিনি,
‘ মানে?’
!