ফিরোজা পর্ব-০৩

ফিরোজা
পর্ব ৩

ক্রাচ দুটিতে ভর দিয়ে কুহূ সিএমএস এ ডাক্তার দেখাতে এসেছে। খাতা জমা দেওয়ার জন্য কাউন্টারে যাচ্ছিল ঠিক সে সময়ে সংঘর্ষ হলো।
সংঘর্ষে কুহূর গতিবেগ কম হওয়ায় মিলিতবেগের পরিবর্তে বিপরীত বেগ কাজ করে কুহূ পড়ে গেল ৷
সামনের মানুষটি আর কেউ নয়। সাজিদ।
বিরক্তি ও রাগ পোষণ করার কথা ছিল কুহূর কিন্তু করছে সাজিদ। যা তার চাহনি ও প্রতিক্রিয়া বলে দিচ্ছে।
তাই কুহূ সারেন্ডার হয়ে বললো,
দেখেন, আগে দুইবার যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তাতে আমার দোষ আছে। আমি স্বীকার করছি। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিতও। তবে আজ আমার কোনো দোষ নেই। আপনার উচিত ছিল দেখে চলা। এটা সিএমএন তাই রোগীদের সাহায্য করা ।
সাজিদ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । ক্যান্টনমেন্টের মোটামুটি সকলেরই জানা সাজিদ খুবই কঠোর। তাই সকলে ভয়েই আছে।
তবে সকলকে ভুল প্রমাণিত করে সাজিদ বললো,
আমি খুবই দুঃখিত মিসেস।
_ আমি মিসেস নই। মিস আমি। ( কুহূ)
_ তো কি! অতি শীঘ্রই হবে মিসেস।
এই একটা হুইলচেয়ার দেন প্লিজ।
সাজিদ কোলে তুলে হুইলচেয়ারে বসালো তারপর ডাক্তার দেখালো তারপর বাসায় রেখে আসলো। তবে গাড়ি থেকে নামলো না।

এরপর থেকে শুরু হলো সাজিদের আসল পাগলামি। তার ধারণা ছিল পৃথিবীতে মানুষের সাথে মানুষের দেখা শুধু শুধু হয় না । এর পিছনে অবশ্যই একটা কারণ লুকায়িত আছে। আর তিনবার দেখা হওয়া মানে সে কোনো কাছের মানুষ।
সাজিদ তো ইচ্ছে করে কুহূর সাথে দেখা করে নি বা কুহূও ইচ্ছে করে সাজিদের সামনে পড়ে নি।
তারমানে আল্লাহ নিশ্চয় চায় তারা একসাথে থাকুক। বিয়ে করুক।
রংপুর ক্যান্টনমেন্টে আসার পর শুধু কুহূর সাথেই তার তিনবার দেখা হয়েছে। তারমানে কুহূই তার জীবনসঙ্গিনী।
কিন্তু কুহূ তা মানতে নারাজ। তাই সাজিদ তার ফোন নম্বর যোগাড় করে ২৪ ঘণ্টার মাঝে ১৪ ঘণ্টায় বিরক্ত করে। বাকি ১০ ঘণ্টা সে দিয়েছে ঘুমানো, পড়ালেখা, খাওয়া-দাওয়া, নামাজ ও গোসলের জন্য।
সাজিদের দ্বিতীয় থিওরি হলো কেউ যদি কারো পিছে লেগে থাকে তবে সে বিরক্ত হয়ে হলেও রাজি হবে ৷
সে এ থিওরি অনুযায়ী চলে। কখনো কল করার পর যদি বুঝতে না পারে সে কি বলবে তখন শুধু দুইটি বাক্য বলে কেটে দেয়,
ও আমার ফিরোজা রং
কবে তুমি আমার হবে গো!
বহুদিন পর কুহূ বুঝতে পারলো মানুষটা তাকে সত্যিই ভালোবাসে ।
তখন রাজি হলে সাজিদের খুশি দেখার মতো ছিল। সে বলেছিল –
তুমি আমার হলে ৬ মাস ১৫ দিন ৭ ঘণ্টা পর ।
কুহূ মজা করে প্রশ্ন করেছিল,
তাহলে মিনিটটা মনে রাখলেন না কেন?
সাজিদ লজ্জিত হয়ে বলেছিল,
আনন্দে সময় দেখতে ভুলে গিয়েছিলাম।

কুহূর মনে মাঝে মাঝেই খুব অদ্ভুত প্রশ্ন জাগতো। যেমন –
আপনি জানলেন কীভাবে এফবনটা আমারই ছিল?
_ সকলে পড়েছিল শুধু তুমি ছিলে না।।

এইচএসসিতে ভালো রেজাল্ট করার জন্য সাজিদ কুহূকে বেশ কিছু অ্যালবাম, উপন্যাসের বই ও শো-পিচ দিয়েছিল ।
কুহূ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ায় সাজিদ তার অতিব প্রিয় বাংলো ‘ আকন্দ ভিলা ‘ য় থাকতে দিয়েছিল কুহূকে ।
শুধু শর্ত একটায় সাজিদ যখন আসবে তখন শাড়ি পড়তে হবে। কুহূও তা আনন্দের সাথে গ্রহণ করেছিল।।

# না। আর ভাবা যাবে না। সেসব তো শুধু আনন্দের স্মৃতি। সেগুলো নিয়ে ভাবলে তো দুঃখের সাগরে ডুবতে হবে। তা কি করে হয়।
কুহূর হৃদ স্পন্দন বাড়ছে।
সমানতালে বাড়ছে ব্যথা।
এখনও এটা নিয়ে ডাক্তার দেখায় নি সে। হয়তো বড় কোনো এক রোগ বাসা বাঁধছে।
যার মুক্তি শুধুমাত্র মৃত্যু!
ওষুধ খাবে? কিন্তু কি ওষুধ খাবে?
শরীরটা নাহয় ওষুধ দিয়ে মানাবে তবে মন!
মনকে সে কি দিয়ে মানাবে?
বড্ড বড় ভুল কাজ করে ফেলেছে ডাইরিটা খুলে। পুড়িয়ে ফেলা প্রয়োজন ডাইরিটা। না হয় একসাথে নষ্ট হবে তিনটে জীবন। এটা ঠিক হবে না।
ডাইরিটা পুড়ানোই উত্তম।
কিন্তু তাকে তো ডাকছে। এখন পুড়ানো সম্ভব নয়। ফিরে এসে পুড়াবে।
তাই ডাইরিটা আবারও ব্যাগে রাখলো। তারপর আবারও নিচে গেল।
কুহূর মা সাজিদের সামনে কুহূকে নিয়ে বললো,
কুহূ, জামাইয়ের হাতটা ধুইয়ে দেও।
_ মা এই কাজটা শালিকা করে জেইঠাস না।
_ তুমি ব্যতিত কেউ তো অবিবাহিত নেই। তাই তুমিই নাহয় করো।
কুহূর সোজাসাপটা উত্তর,
পারবো না।
_ বাবা, তুমি কিছু মনে করো না। আমার মেয়েটা ছেলেদের সংঘর্ষে আসতেই পারে না।
সাজিদ শব্দ করে হাসলো।
কুহূর মা কিছুটা ভড়কে বললেন,
হাসছো কেন?
_ আপনার কথাটা খুবই ফানি আন্টি।
কুহূর মনে হতে লাগলো,
তোর হাত ধুওয়া প্রয়োজন তো। দাঁড়া। ধোয়াচ্ছি।
আম্মু গামলাটা দেও তো।
কুহূর মা গামলা দিলে কুহূ সেখানে থুথু ফেলে সাজিদের হাত ডুবালো।

কুহূ এক ধ্যানে সাজিদের দিকে এসব কথা কল্পনা করছিল। এটা যদি জেমির বিয়ে না হয়ে কোনো বান্ধুবীর বিয়ে হতো তাহলে সে অবশ্যই এই কাজটা করতো।
সাজিদও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হয়তো বুঝতে পারছে কুহূ তাকে মনে মনে গালি দিচ্ছে।
তবে কুহূর এত পরিবর্তনে সাজিদ বেশ অবাক হচ্ছে। কারণ কুহূ মনের মধ্যে কিচ্ছু রাখে না। যা বলার দরকার মুখ ফসকে সবই বলে দেয়।
দুজনেরই ধ্যান ভাঙলো নন্দিনীর কথায়।
_ কি গো আপু, ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন, চোখ লাগবে তো!
কুহূ নন্দিনীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
কোথায় ননদিনী, তোমার দিকে তাকালাম চোখ তো লাগলো না!
তা এখনও রনির সাথে বিয়ে হয় নি? স্বামীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারো না?
_ ভাবি মানে আপু এসব কি বলছো?
নন্দিনীর সারা শরীর কাঁপছে। এই বুঝি সব সত্যি বলে দেয় কুহূ।
কুহূ মুচকি হেসে বললো,
তা তুমি এখনও মা হও নি?
নন্দিনী কিছু বলার পূর্বেই সাজিদ বললো,
এটা কেমন ধরনের কথা ফিরোজা!
আমার বোন অবিবাহিত। সে কীভাবে মা হবে! কিন্তু বিয়ে, মা এগুলো তো তোমার হওয়ার কথা। তুমি হও নি?
বেশ অবাক হচ্ছি আমি ।
কুহূ চিৎকার করে বললো,
Mind your language Mr. Sajid Akondo.
বয়সে আপনি বড় হলেও সম্পর্কে আমি বড়, ভুলে যাবেন না। সমাজে দুই ধরনের মানুষকে সম্মান দেওয়া হয়।
i) যার পজিশন ভালো এন্ড
ii) যে সম্পর্কে বড়।
আমি আপনার থেকে দুটাতেই এগিয়ে। So, talk with me with respect and if you can’t do that, don’t come here to talk. Okk ?
কুহূর মা একটু দূরে গিয়েছিলেন কথা বলার জন্য তবে মেয়ের চিৎকারে দৌঁড়ে আসলেন তিনি।
সাজিদের মুখ কালো হয়ে গেছে।
কুহূ নন্দিনীর দিকে মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো,
ভয় পেও না, সত্যিটা বলবো না। তবে ননদিনী অরপে নন্দিনী ভাবিটা আমি নয়। জেমি হলো ভাবি। ছোট এক মিষ্টি মেয়ে। আমার সাথে যা করেছো তা ওর সাথে করো না। করলে তার পরিনাম খুবই ভয়াবহ হবে।
কুহূ নিজের মায়ের দিকে তাকালো একবার।
_ মা, আমার জন্য একটু ভাত বেড়ে আনো তো। ডিম পুজ দিয়ে আনবে। শুধু ভাত আনবে অন্য কিছু না যেন। ডিম পুজটা তুমিই করো। আমার ঘরে তুমিই নিয়ে এসো। শেষবারের মতো খাইয়ে দিও।
যদি আর সে সুযোগ কখনো না পাও।
কুহূর মা কুহূকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলেন। কুহূ কি বুঝাতে চাচ্ছে?
ছোট এক ঝামেলার জন্য তার মেয়ে কি আবারও বাড়ি ছাড়বে!
কুহূর মা অঝোরে কেঁদে যাচ্ছেন।
সকলে তাকিয়ে দেখছে। তবে এতে কুহূর যায় আসছে না।
সে বোনদের ডেকে বললো,
দুলাভাইয়ের মুখ তিতা হয়ে গেছে। তোরা একটু যা না। গিয়ে রস ঢাল। তবেই না দুলাভাই তোদের বোনের কাছে গিয়ে রসিকতা করতে পারবে । মন খুলে কথা বলতে পারবে । তোরা প্রমাণ করে দে বাড়ির সব মেয়ে এক হয় না।
বলা শেষে কারো বাঁধা মানলো না কুহূ। হনহনিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।

এখন ডাইরিটা পুড়ানো দরকার। এখন অবশ্য পুড়ানো যায়।
কারণ অন্তত আধা ঘণ্টার মাঝে কেউ তার ঘরে আসার সাহস দেখাবে না। এমন কি তার মাও না।

ঘরের এক কোণা থেকে একটা স্টিলের বাস্কেট বের করলো। তারপর কেরোসিন ঢেলে আগুনটা ধরিয়ে দিলো। জিনিসপত্র পুড়ানোর, কাটার সরঞ্জাম সবসময় তার কাছে থেকে। তাই কোনো সমস্যায় হলো না।
এমন সময় ঘরে প্রবেশ করলো দীপ্তি।
ঢুকেই এমন পরিবেশ দেখে প্রশ্ন করলো,
কী পুড়াচ্ছিস তুই?
অকস্মাৎ এ প্রশ্নে আঁতকে পিছনে ঘুরলো কুহূ ৷ বললো,
অপ্রয়োজনীয় জিনিস।
_ অতিপ্রয়োজনীয় জিনিসও আজ অপ্রয়োজনীয়! যাকগে, ছেলেটা সাজিদ না?
_ হ্যাঁ।
_ তাহলে জেমি কেন? বিয়ে তো তোর সাথে হওয়ার কথা।
কুহূ চুপ রইলো। তা দেখে দীপ্তি বললো,
কাহিনী বল। পুরোটা খুলে বল আমায়।
_ এখন বলা যাবে না। মা আসবে।
_ এখন আসবে না। বল তুই। দাঁড়া আমি দোর দিয়ে আসি।
কুহূ ও দীপ্তি পাশাপাশি খাটে বসলো।
_ এখন বল।
_ আগে কসম দে। কাউকে কখনো বলবি না। শুধু আমার মৃত্যুর পর ব্যতীত।
এটা নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ তর্ক হলো। তারপর দীপ্তি রাজি হলে কুহূ বলা শুরু করলো,

চলবে.,.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here