তুমি চেয়েছো বলে পর্ব-০৪

#তুমি_চেয়েছো_বলে
#নাজনীন_আক্তার
পর্ব-৪

আমার এইযে অল্প বয়সের তীব্র অনুভূতি, দীর্ঘদিন ধরে মনের ভিতর বাঁচিয়ে রাখা একটা জগৎ, আমার সব স্বপ্ন, আমার ভালোবাসা! এ সবকিছুতে যে এভাবেই একদিন ঝোড়ো বাতাসের তান্ডব চলবে, তা কী বুঝেছিলাম আমি? নাকি আমার ছোট্ট দুনিয়াটা যে এমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে যাবে তার আভাস কি পেয়েছিলাম আমি? তবে তো কবেই সমস্ত আড়ষ্টতা, ভয়, লজ্জা কাটিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করতাম। শুধু সে চেয়েছে বলে বোকার মতো অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতাম না। হায়রে বোকা মন! শেষমেশ এক তুমুল ঝড়বৃষ্টির দিনেই আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়ের পূর্বাভাস পেলাম!

তখন আমার এসএসসি পরীক্ষা সামনে। স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই পড়াশোনাতে ব্যস্ত। আর আমি ব্যস্ত আমার জগত নিয়ে। রোজই একটু বই খুলে নাড়াচাড়া করি। তারপর আবার খাতার পৃষ্ঠাতে প্রেমপুরুষের অবয়ব আঁকানোর চেষ্টা করি। কখনোবা পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলি তার নাম লিখে। আবার কখনও শুধুমাত্র তার পুরোনো পোস্টগুলো পড়েই দিন কাটিয়ে দিই। এভাবেই দিনগুলো চলে যাচ্ছিল। বয়সটা যে অল্প ছিল। তাই খুব বেশি গভীরে চিন্তা করার মানসিক পরিপক্কতাও তখন ছিল না। এভাবেই তো দিন সুন্দর কেটে যাচ্ছে। অত ভেবে কাজ কী!

কিন্তু আমার এই সুন্দর দিনগুলোতেই হঠাৎ একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেল। আর যেই ঘটনার রেশ আমার পুরো জীবনটাই যেন উল্টেপাল্টে দিল! আমি আমার রোজকারের নিয়ম অনুযায়ী সেদিনও সৈকতের ফেসবুক পোস্টগুলো দেখছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কিছু ছবি চোখে পড়লো। মাত্রই এগুলো পোস্ট করা হয়েছে। সৈকতকে ট্যাগ করে তারই একটা বন্ধু পোস্ট করেছে। কিন্তু সমস্যা তো ছবিতে না বরং সমস্যাটা বাধলো ওই পোস্টে লেখা ক্যাপশনে। আমি একবার পড়ার পরই অজানা আশংকায় ঝাপসা দেখতে শুরু করলাম। হাত কাঁপতে শুরু হয়েছিল আমার। তারপরও বহু কষ্টে সেই অল্প কয়েকটা শব্দ বারবার পড়েছিলাম। আর তাতে লেখা ছিল,

“বন্ধু সৈকতের বিয়েতে আমাদের কুষ্টিয়া ভ্রমণ!”

ব্যস এতটুকুই! আমার প্রেমে পরা মনকে ভেঙে দিতে কী এতটুকুই যথেষ্ট না? সৈকতের বিয়ে? কীভাবে! আমাকে না অপেক্ষায় রেখে গেল সে? আমার কথা এভাবে ভুলে গেল? ভালোবাসা এভাবে ভুলে থাকা যায়? কই আমি তো তাকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলিনি। আমার মন থেকে তার ছবি তো একদিনের জন্য মুছে ফেলতে পারিনি! এসব ভেবেই পাগল পাগল লাগছিল আমার। কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সৈকতের কাছেই কি ছুটে যাব? তার কাছে অসংখ্য প্রশ্ন আছে আমার! কিন্তু তাকে কোথায় পাব? ঠিকানা? আমি প্রায় পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে সেদিন রিমি আপুর বাড়ি গিয়েছিলাম। তিনি তাকে চেনেন! আমার চোখের পানিও সেদিন আটকাতে পারিনি আমি।

চোখে পানি নিয়েই রিমি আপুকে সৈকতকে নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। আর রিমি আপু আমার এমন অবস্থা দেখে প্রথমে আঁতকে উঠেও পরে স্বাভাবিকভাবেই উত্তর করেছিল। উচ্ছ্বসিত গলায় বলেছিল,

” হ্যাঁ! সৈকত ভাইয়ের বিয়ে তো। জানিস প্রেমের বিয়ে তাদের। দুই বছরের প্রেম। কত কষ্টে যে বাড়িতে মানিয়ে বিয়ে করেছে। কালকে তো বিয়ে হয়েও গেছে।”

আমি চমকে উঠে রিমি আপুর দিকে তাকালাম। “কালকে বিয়ে হয়ে গেছে!” কথাটায় বারবার আওড়াতে থাকলাম। যেন মস্তিষ্ক কথাটার অর্থ বের করতে পারছে না। বারেবারে সেখানে যেয়েই বাক্যটা আঘাত করতে লাগলো। মুহূর্তেই আমার চোখের সামনে সেদিনের নদীর পাড়ের দৃশ্য ভেসে উঠলো। “অপেক্ষা” শব্দটাও আমার মস্তিষ্কে বারেবারে আঘাত করতে থাকলো। আমার এইযে বছরের পর বছর তাকে নিয়ে সাজানো কল্পনার জগতটা! সব কেমন এলোমেলো হয়ে যেতে চাইলো। আমার সমস্ত নির্ঘুম রাতে দেখা স্বপ্নগুলো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকলো। আমার কিশোরী বয়সের আবেগ! যত্নে রাখা অনুভূতিগুলো আমার মস্তিষ্কে বারবার আনাগোনা করতে শুরু করলো। আমি এবার আর চোখ দিয়ে পানি ঝড়াতে পারলাম না। যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিলাম। পাথুরে দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ এদিকে ওদিক তাকিয়ে জোরে একটা চিৎকার করে উঠলাম। তারপর মুহূর্তেই জ্ঞান হারালাম।

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমি। হাতে ক্যানুলা দেওয়া। স্যালাইন চলছে। চোখ দুটো খুব কষ্টেই খুললাম। খুলতেই সামনে বাড়ির লোকজনকে দেখতে পেলাম। প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও পরক্ষণেই সবকিছু মনে পড়তে থাকলো। চোখ বন্ধ করে ফেললাম আমি। নিজেকে কেমন যেন ঠকে যাওয়া মানুষ মনে হতে লাগলো। এত অল্পেই সবকিছু শেষ হয়ে যেতে পারে! আমি কী করব এখন! তখন বয়সটাও এত কম ছিল যে আবেগ বাদ দিয়ে অন্য কোনোকিছুই আর সামনে আসছিল না।

পরে শুনেছিলাম, টানা তিনদিন পর নাকি আমার জ্ঞান ফিরেছিল। এর আগে বারেবারে জ্ঞান এসে আবার চলে যাচ্ছিল। ডাক্তার বলেছে, হঠাৎ মানসিক চাপে এমন অবস্থা। আর সাথে ছিল তীব্র জ্বর। আমার বাড়ির লোক ভেবেছিল হয়তো বোর্ড পরীক্ষার প্রেশারেই এমন অবস্থা। ফলস্বরূপ, তারা আমার প্রতি আরও যত্নবান হলেন। সব চিন্তাভাবনা থেকে দূরে রাখতে চাইলেন। কিন্তু চাইলেই কী আর সব থেকে দূরে রাখা যায়!

স্বেচ্ছায় একজনকে নিজের মধ্যে ধারণ করেছি আমি। তার সমস্ত ভালো অভ্যাস, খারাপ অভ্যাস সবটা নিজের করেছি। তার ভালো লাগাকে নিজের পছন্দ বানিয়েছি আর খারাপ লাগাকে ঘৃণা করেছি। এত সহজে তাকে আমি ভুলে যাব কীভাবে! কেমন করে নিজের অস্তিত্বের থেকে তাকে বাদ দেব? কীভাবে!

কিন্তু এই সব প্রশ্নের উত্তরে একটা বাক্যই বারংবার আমার মাথায় আসে। সব উত্তর যেন তাতেই! আমার কানে ভেসে আসে রিমি আপুর বলা কথাটা!

“দুই বছরের প্রেম। কত কষ্টে যে বাড়িতে মানিয়ে বিয়ে করেছে।”

প্রত্যেকবার এই বাক্যগুলি মনে করতেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে আমার। শরীর কাঁপতে শুরু করে। আমার কিশোরী বয়সের ভালোবাসার কীনা এই পরিণতি! তবে সে কেন আমায় অপেক্ষা করতে বলে গেল? সবটা কি শুধুই কথার কথা ছিল? তবে কি তার মনে কখনও স্থান হয়নি আমার? যাকে কীনা নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসলাম আমি, তার মনেই কীনা আরেকজনের বসবাস! আমি বারেবারে কেঁদে উঠতাম। মাথা থেকে কিছুতেই এসব বের করতে পারতাম না।

এসব ভাবনা শেষে আমি সেবার একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমার টানা তিন বছর ধরে সার্চলিস্টের প্রথমে থাকা “সৈকত শাহরিয়ার” নামটা আমি একদিন ডিলিট করে দিলাম। তাও ডিলিট করলাম ছাদে বসে। এক পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলো গায়ে মাখতে মাখতে। তারপর যতক্ষণ আলো ছিল ততক্ষণই ঠাঁই বসে ছিলাম আমি। আর পুরোটা সময় মাথায় বারবার কিছু শব্দই ঘুরছিলো। ঘুরপাক খাচ্ছিলো কিছু বাক্য!

“সে এখন অন্য কারো বর, অন্য কারো ঘর! অন্য কারও জীবনসঙ্গী, অন্য কারও সাথী! অন্য কারো প্রেমিক, অন্য কারো স্বামী!”

আমার আবেগের অধ্যায়টা বোধহয় সেবারই শেষ হলো। তারপর আর কখনও “সৈকত শাহরিয়ার” নামটা আমি খোঁজ করিনি। নিজের দুনিয়া পুরো বদলে ফেলেছিলাম। নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ব্যস্ত করে ফেলেছিলাম। নিজের সমস্ত অভ্যাস পরিবর্তন করতে চাইলাম। কিছুটা হয়তো পারলামও। নিজের সমস্ত রাগ, অভিমান, জেদগুলো পড়াশোনায় দেখাতে শুরু করলাম। যখনই কোনো নির্ঘুম রাতে তার কথা মাথায় আসতো, সেসময়ই ঘন্টার পর ঘন্টা অনুভূতিহীন হয়ে অঙ্কে সময় কাটাতাম। তার উপর জেদ কাজ করলে রসায়নের কঠিন কঠিন সমীকরণের বিশ্লেষণ করতে থাকলাম। রাগ থেকে শুরু করলাম পদার্থবিজ্ঞানের সব জটিল সমস্যাগুলো। শুনতে অন্যরকম লাগলেও এটাই শুরু করেছিলাম।

আর আমার এই অনুভূতিহীন মানুষের মতো কাজকর্মে অন্যকিছু না হলেও পড়াশোনা আমার দুর্দান্ত এগোতে লাগলো। ফলস্বরূপ এসএসসি, এইচএসসি তে দুর্দান্ত রেজাল্ট করে মেডিকেলে পড়ার সুযোগ হলো। মেডিকেলের রেজাল্টও ভীষণ ভালো হলো। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝে আমার আর কাউকে ভালোবাসা হলো না। মন দেওয়া নেওয়া হলো না আর কারও সাথে! আমার একটা সংসারও আর হয়ে উঠলো না।

যদিও এটা তো অসম্ভবই ছিল। কেউ যে ভালোবাসা চাইতে আসেনি এমন নয়। পাণিপ্রার্থীও কম ছিল না! কিন্তু নিজের সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত চেষ্টা, সকল ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়ে ততদিনে নিঃস্ব আমি। আমার তো নতুন করে দেবার কিছুই ছিল না। নতুন করে ভাবার ইচ্ছাটাও কখনও হয়নি। দিনশেষে কেমন ক্লান্ত অনুভব হতো। নিজেকে বড্ড অগোছালো মনে হতো। আমি আর কাউকে কীভাবে নিজের সাথে জড়াব!

আমার যৌথ পরিবারে আমাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কম করেনি। কিন্তু সেটা বোধহয় আমার মায়ের জন্যই পারেনি। মা তো! মেয়ের মনের উঠানামা তিনি ঠিকই টের পেতেন। মাঝে মাঝেই তো শেষ রাতে যখন ঘুমাতে না পেরে আমি ছটফট করতাম, তখন মাথায় একটা নরম হাতের স্পর্শ পেতাম৷ খুব ধীরে ধীরে আমার চুলে বিলি কেটে দিতো হাতটা। তিনিই বাড়ির সবাইকে কড়া সুরে বলেছিলেন, আমি যতদিন না চাইব ততদিন বিয়ের জন্য জোর করা হবে না আমাকে। তাইতো এইযে ডাক্তারি পাশ করে চেম্বারও দিতে পেরেছি। আমার দিনগুলোকে আরও ব্যস্তময় করে তুলতে পেরেছি আমি।

কিন্তু এই ব্যস্তময় দিনগুলো যখন আমার পুরনো আঘাতের উপর প্রলেপ লাগাতে ব্যস্ত। ঠিক তখনই আমার জীবনে নতুন করে সেই আঘাত পুনরায় দগদগে হয়ে উঠলো। এক আফসোসের সাগরে আমাকে ঝাঁপ দিতে হলো সেসময়। আমি যে কত বোকা, তা আরও একবার প্রমাণ হলো। এক সন্ধ্যায় রিমি আপু আমার বাড়িতে এলেন। আপু ততদিনে বিয়ে করে পুরোদস্তুর সংসারী। বেশ কয়েকবছর হলো তার সংসারজীবনের।

তিনি হঠাৎ সেদিন সন্ধ্যায় এসে আমার ঘরে চুপটি করে বসলেন। আমি বেশ কয়েকবার নাস্তাপানি এনেও তাকে দিলাম। কিন্তু তিনি কিছুই খেলেন না। অবাক লাগলো আমার। তবু কিছু বললাম না। বরং তাকেই সময় দিলাম। তিনি উশখুশ করতে লাগলেন কিছু বলার জন্য। কিন্তু বলে উঠতে পারছিলেন না। শেষমেশ রাত বারোটা বাজিয়ে ফেললেন তিনি কথাগুলো বলতে বলতে। কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে তিনি বললেন,

“আমার জীবনে আমি জেনেশুনে কখনও কোনো অন্যায় করিনিরে, বৃষ্টি। তারপরও দেখ আমার সংসারটা টিকছে না। ভাঙনের একদম শেষ পথে। এত চেষ্টার পরও টিকিয়ে রাখতে পারছি না।”

কথাগুলো বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন আপু। আমি তাকে থামানোর চেষ্টা করলাম। সাথে অবাকও হলাম। এতদিন তো এসবের কিছু শুনিনি। তবে আপু আজ আমার কাছেই কেন এসব বলছেন! আপু নিজেকে আরেকটু সামলে পুনরায় বলে উঠলো,

“জানিস, সবসময় ভাবতাম আমি তো কারও কোনো ক্ষতি করিনি, তবে আমার সাথেই কেন এমন হচ্ছে! কিন্তু ইদানীং মাথায় কিছু জিনিস ঘুরপাক খায়। মনে হয়, অন্যায় তো করেছিই। আমি তো মিথ্যে কথা বলে একটা সংসার হতে দিইনি। তোর সংসার হতে দিইনি আমি, বৃষ্টি। তুই তো আজও বিয়ে করিসনি। কিন্তু বিশ্বাস কর বোন, আমি সেসময় বুঝতে পারিনি। তুই যে এত ছোট বয়সেই সৈকত ভাইকে এতটা ভালোবাসতি, তা বুঝিনি আমি।”

আমি চমকে উঠলাম। ছিটকে আপুর থেকে দূরে সরে গেলাম। এই এতগুলো বছর পর সেই পরিচিত নাম শুনে অস্থির হয়ে উঠলাম। এদিক ওদিক চাইতে লাগলাম। রিমি আপুর কোনো কথায় বুঝে উঠতে পারলাম না। প্রশ্নের চোখে শুধু আপুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। আপু তা দেখে নিজেকে সামলে আমার কাছে এসে আমার হাতদুটো আঁকড়ে ধরলেন। তারপর অশ্রুসিক্ত চোখে পুনরায় বলে উঠলো,

“আমি সেদিন তোকে মিথ্যে বলেছিলাম, বৃষ্টি। সৈকত ভাইয়ের প্রেমের বিয়ে ছিল না। তার বাবা বিয়ে ঠিক করেছিলেন। মেয়েটা অনাথ ছিল। তাই দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। আর বিয়েটা তখনও হয়েছিল না। তার পরের দিন ছিল।”

আমি নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলাম না। কেমন অদ্ভুত লাগতে শুরু করলো সবটা। পুরো দুনিয়া যেন ঘুরতে থাকলো আমার কাছে। আমার দৃষ্টি তখন ঝাপসা হয়ে এসেছে। আমি নজর সরাতে পারলাম না। রিমি আপুর দিকেই চেয়ে রইলাম। আপু হয়তো আমার নজরের অর্থ বুঝতে পারলেন। তাই পুনরায় বলতে শুরু করলো।

“আমি সৈকত ভাইকে পছন্দ করতাম। কিন্তু কখনও বলা হয়নি। বরং আমি বুঝতাম তোরা দুজন দুজনকে পছন্দ করিস। সৈকত ভাই একবার আমার থেকে আমার বাসার ঠিকানা নিলেন। আমি ভেবেছিলাম হয়তো আমার জন্যই। মনে মনে তাকে নিয়ে আরও স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। কিন্তু একদিন দেখলাম, তিনি তোর স্কুলের সামনে। বুঝলাম তিনি শুধু তোকে দেখতেই ছুটে এসেছেন। আর তোর জন্যই ঠিকানা নিয়েছেন। আমার যে কী কষ্ট হয়েছিল! আমার পছন্দের মানুষ কীনা আমার ছোট বোনকেই পছন্দ করে। আমি মানতে পারতাম না।

সৈকত ভাইকে আমার বন্ধুবান্ধবরা চিনতো। আমিই আমার ক্রাশ হিসেবে চিনিয়েছিলাম। ওরাই আমাকে খবর দিতো, তাকে নাকি তোর স্কুলের সামনে মাঝেমাঝেই দেখা যেত। বুঝতাম ছুটি পেলেই তোকে দেখতে আসেন। আমার নিজেকে ছোট মনে হতো। লজ্জা লাগতো। বন্ধুদেরও কিছু বলতে পারতাম না।

তারপর হঠাৎ একদিন সৈকত ভাই আমাকে ফোন দিলেন। তার পরিস্থিতি বললেন। তার বাবা বিয়ের জন্য জোর করছেন। কিন্তু তিনি তোকে পছন্দ করেন। তাই তোর পরিবারে প্রস্তাব দিতে চাইলেন। তোর সাথে যোগাযোগের পথও জানতে চাইলেন। তার নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে যেয়ে হলেও তোকে বিয়ে করতে চান তিনি। কিন্তু ওইসময় নিজের পছন্দের মানুষকে আমার সামনেই আমার ছোট বোনের সাথে বিয়ে হতে দেখব, এ জিনিসটা আমি মানতে পারিনি। বন্ধুবান্ধবদের সামনেও লজ্জায় পড়তাম। তাই তাকে একটা মিথ্যে বলেছিলাম। বলেছিলাম,তোর পরিবার থেকে তোকে কাবিন করিয়ে রেখেছে আরেকজনের সাথে। অনেকদিন আগেই এটা হয়েছে। সৈকত ভাই এটা শুনে চুপ করে গেছিলেন। তারপর আর কোনোদিন আমার সাথে যোগাযোগ করেনি। পরে তো শুনলাম বিয়ে করে নিয়েছেন তিনি।

সৈকত ভাই আমার সাথে যোগাযোগের কিছুদিন পরেই তুই আমার কাছে ছুটে এলি। তোর চোখমুখ দেখেও বুঝলাম, তুইও তাকে অনেক পছন্দ করিস। আমি তারপর তোকেও কিছু মিথ্যা বললাম। কিন্তু বিশ্বাস কর, তুই যে তাকে এত পছন্দ করিস, তা আমি বুঝিনি। তুই আজও বিয়ে করলি না বৃষ্টি। তোর সংসারটা বোধহয় আমিই হতে দিলাম না। দুজন মানুষের ভালোবাসা আমি শেষ করে দিলাম। তুই আমাকে মাফ করে দে বৃষ্টি। এজন্যই বোধহয়, আমার সংসারটাও হচ্ছে না। আমাকে মাফ করে দে বৃষ্টি৷ মাফ করে দে বোন! তুই মাফ না করলে আমার সংসারটা বোধহয় আর টিকবে না।”

রিমি আপু পুনরায় কান্নায় ভেঙে পরলেন। তিনি আমার কাছে বারবার মাফ চাইতে লাগলেন। আমার কানে আর কিছু ঢুকলো না। মস্তিষ্ক আর কিছু নিতে পারলো না। বারেবারে আপুর কথাগুলো মাথায় ঘুরতে থাকলো। তিনি আমাকে ভালোবাসতেন! আমার জন্য বারবার ছুটে আসতেন! তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলেন! সেদিন আমি কেন আপুর কথা মেনে নিলাম! কেন তার কাছে ছুটে গেলাম না! তবে তো আজ তিনি আমার থাকতেন! আমার হয়ে থাকতেন! শুধুই আমার! আমার একটা সংসার থাকতো।

আমি আর কিছু চিন্তা করতে পারলাম না। মস্তিষ্ক আর কাজ করতে চাইলো না। আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। আর মাঝরাতে আমার এই কান্নার স্বর চারিদিকে ঝনঝন করে উঠলো। রিমি আপুও ভয় পেয়ে গেল। আমার পুরো পরিবার ছুটে আসলেন৷ তারা কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না। তাদের বহুবছর ধরে হাসি-কান্না বন্ধ করে থাকা মেয়ের আজ এমন অঝোরে কান্নার হেতু তারা খুঁজে পেলেন না। কিন্তু মা হয়তো বুঝলেন। তাইতো সকলকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে তিনি আমাকে জরিয়ে নিলেন। একেবারে বুকের মাঝে মিশিয়ে নিলেন আমাকে।

আর আমি কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে মাকে বলতে থাকলাম,

“মা তিনি আমার খোঁজে এসেছিলেন। আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। আমি শুধু শুধু অপেক্ষা করিনি মা। আমার ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে যাইনি৷ রিমি আপু আমার সাথে এমন কেন করলো! আমাকে এভাবে শেষ করে দিল কেন! তার তো বিয়ে হয়ে গেল মা! সে তো অন্য কারো এখন! আমি এভাবে তাকে হারালাম! এভাবে ভুল বুঝলাম! কেন তার কথায় বিশ্বাস রেখে তার সাথে যোগাযোগ করিনি! তিনি কেন আমাকে বিশ্বাস করেনি! তবে তো আমাদের ভালোবাসাটা বেঁচে থাকতো!”

সেবারের মতো মা আমাকে সামলে নিলেন। তার মেয়ের না হওয়া ভালোবাসার গল্প তিনি শুনলেন। সারারাত নিজের বুকের মাঝে রেখে মেয়ের প্রলাপ শুনলেন। শেষ রাতে আমার শরীর কেঁপে জ্বর এলো। আমি জ্বরের ঘোরে শুধু আমার না হওয়া সংসারটায় দেখলাম। এত বছর ধরে একজনকে একটুও চোখের দেখা না দেখার পরও তার চেহারা স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তিনি সারাক্ষণ আমার চারপাশে ঘুরতে থাকলেন। আমার এমন ঘোরের অবস্থায় কাটলো পুরো দুমাস। মাঝেমাঝেই জ্বরে পরি, পাগলের প্রলাপ বকি। আমার না হওয়া ভালোবাসাকে দেখি। তারপর আবার জ্বর ছাড়ে। এভাবেই সময়টা চলে গেল।

তারপর নিজেকে ধীরে ধীরে সামলে নিলাম। অন্য কারও স্বামী হিসেবেই তাকে মেনে নিলাম। প্রায় দুমাস পর তখন আমি নিয়মিত চেম্বারে বসা শুরু করেছি। নিজেকে শক্ত করতে চাচ্ছি। খুবই টালমাটাল অবস্থা তখন আমার! এমনই এক দিনে আমার চেম্বারে এক মহিলা এলেন। দেখতে আর স্বভাবে ভীষণ মিষ্টি। পরিপাটি চেহারা। পোশাক-পরিচ্ছদেও উন্নত রুঁচির ছাপ। আমি হেসে তার নাম জানতে চাইলাম। তিনিও মিষ্টি হেসে আমাকে উত্তর দিলেন,

“মৌমিতা রহমান”

আমি নামটা শুনে হালকা হেসে কিছু বলতে নিলাম। কিন্তু আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি বলে উঠলেন,

“আমার স্বামীর নাম সৈকত শাহরিয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। বাসা কুষ্টিয়া। বহু বছর পূর্বে এক সুন্দর দিনের পড়ন্ত বিকেলের সোনালী রোদে তিনি এক গ্রামে গিয়েছিলেন।”

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here