তুমি চেয়েছো বলে পর্ব-০৫ এবং শেষ পর্ব

#তুমি_চেয়েছো_বলে
#নাজনীন_আক্তার
পর্ব-৫ এবং শেষ পর্ব!

এমনই এক দিনে আমার চেম্বারে এক মহিলা এলেন। দেখতে আর স্বভাবে ভীষণ মিষ্টি। পরিপাটি চেহারা। পোশাক-পরিচ্ছদেও উন্নত রুচির ছাপ। আমি হেসে তার নাম জানতে চাইলাম। তিনিও মিষ্টি হেসে আমাকে উত্তর দিলেন,

“মৌমিতা রহমান”

আমি নামটা শুনে হালকা হেসে কিছু বলতে নিলাম। কিন্তু আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি বলে উঠলেন,

“আমার স্বামীর নাম সৈকত শাহরিয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। বাসা কুষ্টিয়া। বহু বছর পূর্বে এক সুন্দর দিনের পড়ন্ত বিকেলের সোনালী রোদে তিনি এক গ্রামে গিয়েছিলেন।”

আমি চমকে তার দিকে চোখ তুলে তাকালাম। হাতে থাকা কলমটা মুহূর্তেই পরে গেলো। হাতের আঙুলগুলো কাঁপতে থাকলো। একটু এদিকওদিক চাহনি দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। ভদ্রমহিলা আমার এহেন অবস্থা দেখে মিষ্টি হাসলেন। সামনে থাকা আমার নোটপ্যাড নিয়ে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে দেখলেন। মনে হলো একটু চমকেই উঠলেন। তারপর চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমার পুরো ঘরটুকু দেখলেন।

আর আমি স্থির চোখে শুধু তাকে দেখলাম। মাঝে মাঝে চমকে উঠে যে তার মুখের রেখার পরিবর্তন হচ্ছে, তাও লক্ষ্য করলাম। আমার চোখ ভিজে আসলো। এইযে মৌমিতা নামক মেয়েটা! অসম্ভব সুন্দর মেয়েটা! সে কি জানে সে কতটা ভাগ্যবতী? সে কি জানে সে এক জীবনে কতকিছু পেয়ে গেছে? আমি যা বছরের পর বছর চেয়েও পাইনি তা সে বিনা পরিশ্রমে, বিনা চাওয়াতে অনায়াসে পেয়ে গেছে! কী অদ্ভুত পৃথিবীর নিয়ম!

“আমি কে বুঝতে পেরেছেন, বৃষ্টি? অবশ্য না বোঝার কথা না!”

আমার রাগ হলো, বিরক্ত লাগলো। আমার সামনে বসে থাকা মেয়েটাকে অসহ্য লাগলো আমার। তার রূপের ধার যেন সরাসরি আমার চোখ ভেদ করে হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে তুলতে লাগল। আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করলাম। তারপর কড়া সুরে উত্তর করলাম,

“আপনি কী সমস্যা নিয়ে এসেছেন দ্রুত বলুন। আমি বেশি সময় দিতে পারব না।”

মৌমিতা হাসলেন। নিজেকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে উত্তর করলেন।

“সমস্যা তো গুরুতর ডাক্তার সাহেবা। হৃদয়ের সমস্যা এযে! মনের সমস্যা!”

“আমি মনের চিকিৎসা করিনা। অন্য ডাক্তার দেখাবেন। এখন আসতে পারেন।”

“কিন্তু এই সমস্যার চিকিৎসা যে শুধু আপনার কাছেই আছে। আপনি ছাড়া আর কেউ সারাতে পারবে না এই রোগ। তাই একটুও নড়বো না আমি।”

আমি কপালে হাত দিয়ে চেয়ারে হেলান দিলাম। এই মেয়ে যাবে না বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু এত বছর পর আমার নিকট আসার কারণ কী? আমার জীবনের সবটুকু কেড়ে নিয়ে আবার আমার দ্বারেই কেন! মাথা ব্যথা করে উঠল আমার। শরীর দুর্বল লাগতে শুরু করলো।

“শরীর বেশি খারাপ লাগছে, বৃষ্টি? আমি কিন্তু জানি তুমি অসুস্থ। খোঁজ নিয়েই এসেছি। বেশি সময় নেব না। শুধু কিছু কথা বলতেই এসেছি। একটা মাত্র গল্প বলব ধরে নিতে পারো।”

আমি তার কথার উত্তর করলাম না। কী বলতে এসে়ছে তা অজানা আমার। কিন্তু যা বলার বলে বিদেয় হোক। আমি কপালে হাতটা আরেকটু জোরে ঘষে নিচের দিকে নজর দিলাম।

“জানোতো আমার বিয়ের বেশ কিছু বছর হয়ে গেল। এইতো নয় বছর চলছে। আমার বিয়ের ঘটনা আবার একটু অদ্ভুত। আমি অনাথ। চাচার বাড়িতে মানুষ। খুব কষ্টেই মানুষ হয়েছি বলা যায়। কষ্টে আর শুধুমাত্র নিজের চেষ্টায় এরমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাৎ একদিন চান্স পেয়ে যাই। কিন্তু ভর্তি হওয়াটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। চাচা তখন আমার বিয়ে দিতে চান। অভাবের সংসারে কতইবা পড়াবেন! আর গ্রামে বিয়ে দিলে কেই-বা আমাকে ঢাকায় পড়ার সুযোগ দেবে?

ঠিক সেসময় এসবকিছু আমার শ্বশুড়মশাইয়ের কানে যায়। তার ভীষণ মায়া হয়। তারপর তিনিই পছন্দ করে আমাকে বাড়ির বউ করে আনেন। বউ নয়, মেয়ে করেই আনেন। কিন্তু জানোতো আমি সেই মেয়ে হয়েই থাকলাম। বউ আর কখনও হওয়া হলো না আমার। কারণ যার বউ হয়ে গেলাম, তিনিই তো মেনে নিলেন না আমাকে। আমার স্বামীও তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। প্রথম দু-এক বছর ভার্সিটির হলে থাকলেও পরবর্তীতে আমার শ্বশুরের উদ্যোগে আলাদা সংসার হয় আমার। ঢাকা শহরে ছোট্ট একটা সংসার। কিন্তু এটা বরাবর আমার সংসারই থেকে গেছে। আমাদের সংসার আর কখনও হয়নি। হবেইবা কীভাবে! আমার স্বামী যে বরাবরই বড্ড উদাসীন ছিলেন।

শুরুর দিকে তার এমন উদাসীনতা খুব ভাবাতো আমাকে। চেহারার দিক থেকে আমাকে ফেলে দেবার মতো নয়। আমি শিক্ষিতও বটে! তবে? তিনি কেন আমার দিকে একটু তাকিয়ে দেখেন না? কেন বহুদিন পর্যন্ত আমাদের শোবার ঘর আলাদা ছিল! কেন তিনি আমার পাশে বসে একটু কথা বলেন না? কী কারণ থাকতে পারে খুঁজতে লাগলাম। পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম, আমার স্বামীর অন্য পছন্দ ছিল। প্রেম নয়, শুধুই পছন্দ। কীংবা তাতে মিশে ছিল এক সমুদ্র পরিমাণ ভালোবাসা!

আমার স্বামী তাকে অপেক্ষায় থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু বাচ্চা একটা মেয়ে, অত ভালোবাসা বোঝার তো বয়স তার হয়নি। তাই পরিবারের কথায় আরেকজনকে বিয়ে করে নিল মেয়েটা। আমার স্বামী অবশ্য তা জানতেন না। বাবা বিয়ের কথা বলার পর খুব নাকি ঝামেলা করেছিলেন, বিয়ে না করার জন্য। ওই মেয়েকে ছাড়া কাউকেই বিয়ে করা সম্ভব না। কিন্তু পরে সব জেনে একজন এতিম মেয়েকে সাহায্য করতেই এগিয়ে যান।

পরে অবশ্য আমাদের সংসার একটু স্বাভাবিক হয়েছে। আমার শ্বশুড় মারা যাবার সময় আমার স্বামীর থেকে কথা নিয়েছিলেন। আমাকে সুখে রাখবার কথা, ভালো রাখবার কথা। তারপর সেই কথা রাখতেই আমার স্বামী আর আমার বিবাহিত জীবন একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে লাগলো। আমার সংসার থেকে আমাদের সংসার হতে লাগলো একটু একটু করে। যদিও পুরোপুরি সবটা স্বাভাবিক হয়েছে এটা বলতে পারব না। এখনও মাঝরাতে চোখ খুললে আমি আমার স্বামীকে পাশে পাই না। তাকে তখন বারান্দায় স্কেচবুক হাতে বসে থাকতে দেখি। আর তাতে অন্য নারীর স্কেচ। অন্য নারীর হাসির ঝলকানি। আর আমার স্বামীর চোখের কার্নিশে পানি। দৃষ্টিতে আফসোস মেশানো। কেন সে মেয়েটার বিয়ের আগে যোগাযোগ করেনি! কেন মেয়েটা তার অপেক্ষায় থাকেনি!

কিন্তু জানোতো আমার খারাপ লাগে না! আমি মাঝরাতে তাকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখলেও আবার হাসিমুখে চোখ বুজে ফেলি। কারণ একটু পরেই তো অনুভব করি আমাকে পেছন থেকে কেউ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে। একদম মিশিয়ে নিচ্ছে তার সাথে। আমি চোখ খুলি না। বরং ঘুমের ভান ধরে পরে থাকি। তারপর সারারাত একজনের মমতা মেশানো হাত আমার চুলের মাঝে অনুভব করি। সেই রাতগুলো আমার ভীষণ ভালো কাটে জানো! দারুণ ঘুম হয়।

হয়তো আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসেন না। আবার বাসতেও পারে! আমি ঠিক বুঝতে পারি না। ভালোবাসার জটিল সমীকরণগুলো আমার মাথায় ঢোকে না। আমি ম্যাথমেটিক্সের স্টুডেন্ট। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা অনায়াসে অঙ্ক কষে ফেলতে পারি আমি। কিন্তু এইযে ভালোবাসার এই সরলগুলো আমার মস্তিষ্কে ঢুকতে চায় না! আমার কাছে তো এটাই ভালোবাসা। আমার অসুস্থতার দিনগুলোতে আমার সেবা করা, আমার বাড়ি ফিরতে দেরি হলে একটু ফোন দিয়ে খোঁজ নেওয়া, মাঝেমাঝে আমাকে বন্ধের দিনে ঘুম থেকে না তুলে আমার সামনে নাস্তা বানিয়ে হাজির করা, আমার জন্মদিন পালন করা, আমার মন খারাপ থাকলে চুপচাপ আমার পছন্দের খাবার কিনে টেবিলের উপর রেখে দেওয়া। এগুলোই তো আমার কাছে ভালোবাসার সমীকরণ। আর এই সমীকরণগুলো আমি কীভাবে সমাধান করি জানো? এইযে বহু কষ্টে পাওয়া বিন্দু বিন্দু ভালোবাসাকে সহস্রগুণ বাড়িয়ে তাকে ফেরত দিয়ে। তাকে আরও আরও বেশি ভালোবেসে।”

ভদ্রমহিলা থামলেন। ভীষণ পরিপাটি হয়ে সেজে থাকা মহিলার কাজল লেপ্টে গেছে ততক্ষণে। চোখের কোণা দিয়ে পানি গড়িয়ে পরছে। আমি ততক্ষণে স্থির হয়ে পড়েছি। তার বলা কথাগুলো কানে বাজছে আমার। এরমধ্যে একটা বাক্য খুব করে কানে গিয়ে লেগেছে।

“বাচ্চা একটা মেয়ে, অত ভালোবাসা বোঝার তো বয়স তার হয়নি” – বারবার এই কথাটা কানে বাজতে লাগলো। হাসি এলো আমার। ভালোবাসা বোঝার বয়স হয়নি আমার! অথচ একজনের অপেক্ষায় তো আমার জীবনের কতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম। সেই যে সে অপেক্ষায় থাকতে বলেছিল। তারপর তো আমি অপেক্ষাতেই থেকে গেলাম। আমি চোখ বুজে ফেললাম। একই কষ্ট কীনা এভাবে আমরা দুজন মানুষ পেয়ে যাচ্ছি!

“জানোতো, কয়েকদিন আগে রিমি আপু আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। গিয়ে খুব করে ক্ষমা চাইলেন। তোমাকে নিয়ে বললেন৷ সেই যে বাচ্চা মেয়েটা! যে ভালোবাসা বোঝেনা ভেবেছিলাম। সে নাকি বছরের পর বছর শুধু ভালোবেসে অপেক্ষা করে গেছে! বিয়ে আর করেনি! কী মারাত্মক ভুল ভাঙল আমাদের। আমার স্বামী পরপর কয়েকদিন রাতে দুচোখের পাতা এক করতে পারলেন না। পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই। তাই তারা চোখের পানি আটকে রাখে। কিন্তু সেই কান্না আটকে মনে মনে তারা অঝোরে কাঁদতে থাকে। আর এতো ভালোবেসে সেই কান্না আমি বুঝবো না বলো?

তাইতো তাকে সুযোগ করে দিলাম। তোমার কাছে ফেরত যাওয়ার সুযোগ। কিন্তু দেখো বোকাটা এখনও তোমার কাছেই আসেনি। একটুও যোগাযোগ করেনি। তবে তুমিই যোগাযোগ করো। দুদিন হলো বাড়ি ছেড়েছি আমি। কোথায় আছি সেটা ওর ধারণার বাইরে! যোগাযোগের সব পথ বন্ধ রেখেছি। ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ার যে কী যন্ত্রণা, তা আমি বুঝি। সেই কঠোর যন্ত্রণা তাকে কীভাবে দিই বলো? তুমিও কিন্তু তাকে সেই যন্ত্রণা দিও না। খুব যত্নে রেখো।”

আমি চমকে উঠলাম। কী বলছে মেয়েটা! মুহূর্তেই চিন্তাশক্তি লোপ পেলো আমার। আমি কাঁপতে শুরু করলাম। ভয়ংকর রূপবতী মেয়েটা তার রূপের মতোই ভয়ংকর কথাগুলো কী অবলীলায় বলে দিল। আমি চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গভীর নজরে তাকে দেখে নিলাম। এই মেয়েটার জায়গায় আজ আমি থাকলে কি এই কাজটাই করতে পারতাম? এভাবে নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দিতে পারতাম?

ভদ্রমহিলা এবার আমাকে অবাক করে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চোখের পানি তিনি ততক্ষণে মুছে নিয়েছেন। এখন মুখে তার সেই মিষ্টি হাসি।

“শোনো মেয়ে, তাকে ভালো রেখো কিন্তু। আমার খুব যত্নে রাখা এক সম্পদ তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি, আগলে রেখো। আর আমি জানি তুমি তা পারবে। এখানে এসে সে বিশ্বাস আমার আরও তীব্র হয়েছে। বারংবার অবাক হয়েছি আমি। তুমি তো সম্পূর্ণ তাকেই নিজের মধ্যে ধারণ করে ফেলেছো। একইরকম পছন্দ, একইরকম স্বভাব! যাই হোক আসি, আবার দূরে যেতে হবে। সেই কুষ্টিয়া। আমার নিজের বাড়ি, চাচার বাড়ি নয় কিন্তু! বাপের বাড়ি। শ্বশুরবাড়িতে তো আর যাওয়া যায় না এখন।”

ভদ্রমহিলা পুনরায় আমাকে অবাক করে দিয়ে সত্যিই বেরিয়ে গেলেন। ধীর পায়ে পেটের উপর হালকা হাত রেখে বেরিয়ে চললেন। যাওয়ার সময় অবশ্য ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে এক নজর মন ভরে দেখে নিলেন। আর আমি নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলাম।

হঠাৎ আমার নজরে টেবিলে রাখা একটা কাগজও পড়লো। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে সৈকতের নাম্বারটা লেখা। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা ধরলাম। আমার সারাজীবনের চাওয়া, আমার স্বপ্ন আমার হাতের মুঠোয়। আমার সেইযে কিশোরী বয়সের প্রেম! আজ তা ভীষণ নিকটে। কিন্তু… আমি চোখ বুজে মোবাইলটা হাতে নিলাম। তারপর নাম্বারটা পাতিয়ে তাতে বেশ সময় নিয়ে মেসেজটা লিখলাম,

” সৈকত সাহেব,
কুষ্টিয়ায় এক মেয়ে তার নিজের বাড়িতে আপনার জন্য পৃথিবীর সেরা সুখের সংবাদটা নিয়ে অপেক্ষা করছে। তার অপেক্ষার প্রহর কমিয়ে তাকে ভালোবাসার রাজ্যত্বে প্রবেশ করানোর জন্য আগাম অভিনন্দন!
ইতি,
আপনার কেউ না।”

আমার হাত কেঁপে উঠলো। ইতির পরের অংশটুকু লিখতে যেয়ে হাতের সাথে হৃদয়ও যে খানিকটা কেঁপে উঠলো। এই একই বার্তা আমি কয়েকমাস আগে লিখলেও কি এই একই পরিচয় দিতাম? নাকি অন্য কোনো পরিচয় দিতাম! নাকি লিখতাম তোমাকে ভীষণ ভালোবেসে যাওয়া এক নারী! এক সুন্দর দিনের পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলোয় প্রথম তোমার প্রেমে পরা এক নারী! নাকি লিখতাম, শুধু তুমি চেয়েছিলে বলেই তোমার অপেক্ষায় থেকে যাওয়া এক কিশোরী! শুধু তুমি চেয়েছো বলে!

পরিশিষ্টঃ

আমি জানতাম সেই বার্তার বিপরীতে আর কোনো বার্তা আসবে না। আর না কখনও এই পিছনের মানুষটা আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। আমি চিনেছিলাম আমার ভালোবাসার মানুষকে। মৌমিতার বর্ণনা শুনেই বুঝেছিলাম, এই অসাধারণ মেয়েকে সে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু সে ভালোবাসা আর দীর্ঘদিনের চাওয়ার সাথে গুলিয়ে ফেলেছে।

আমাকে না পাওয়ার আফসোস প্রতিনিয়ত তাকে কষ্ট দিয়েছে। তাইতো এই মেয়েটার প্রতি ভালোবাসা সে কখনও বুঝতে পারেনি। কিন্তু সে বুঝেছিল। সৈকতও সেদিন ছুটে গিয়েছিল সেই মেয়েটার কাছে। যেই মেয়েটা শুধুমাত্র ভালোবাসার মানুষকে ভালো রাখতে নিজের ঘর ছেড়েছে, সংসার ছেড়েছে, নিজের স্বামীকে ছেড়েছে, এমনকি নিজের বাচ্চার কথাও লুকিয়ে গেছে। আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম।

ভালোবাসা নামক অনুভূতিটা কী ভীষণ অদ্ভুত! তা মানুষকে ধ্বংস করে আবার গড়েও তোলে! মানুষকে ত্যাগ শেখায়। শুধু ভালোবেসে অপেক্ষা করা শেখায়। ভালোবাসার মানুষের সুখেই নিজের সুখ খুঁজে নিতে শেখায়। এইতো আগে আমার ভীষণ অভিমান হতো! আফসোস হতো! কেন আমি সৈকতকে পেলাম না! সৈকতও আমাকে চেয়েছিলো। তার জন্য এতগুলো বছর আমি অপেক্ষায় কাটিয়ে দিলাম। তবে কেন পেলাম না! কিন্তু সেই এখন আমি চাই, সে মৌমিতা নামক অসাধারণ মেয়েটার সাথে ভীষণ ভালো থাকুক। তাদের সুন্দর একটা সংসার হোক! কিন্তু আজ এই চাওয়া কেন আমার? সৈকত চেয়েছে বলেই তো! আমি চোখ বন্ধ করে বিড়বিড়িয়ে উঠলাম,

“শুধু তুমি চেয়েছো বলেই!
নয়তো তো ছিনিয়ে নিতাম তোমায়।
শুধু তুমি চেয়েছো বলেই!
তাইতো ভালোবাসার বলিদান দিলাম!”

সে চেয়েছে তাই আজও শুধু তার অপেক্ষাতেই! এখন আমি মাঝবয়সী। জীবন এভাবেই যাচ্ছে। সৈকতকে ভুলে নয় কিন্তু! বরং নিজের অস্তিত্বে সৈকতকে আরও বেশি মিশিয়ে। কিন্তু তার মুখোমুখি আর কোনোদিন হওয়া হয়নি আমার। হতেও মন চাইনি। সৈকতও কখনও আসেনি। আমার সেই আকাশ সমান ভালোবাসা বরাবরই আকাশসম দূরত্বেই থেকে গেছে।

এরই মাঝে এক দিন হঠাৎ এক অল্পবয়সী মেয়ে আমার চেম্বারে এলো। কী প্রাণবন্ত তার চেহারা! মুখে মিষ্টি হাসি! কাট কাট চেহারা। এসেই ঝটপট বলতে শুরু করলো,

“আমার নাম কী বলুন তো? বৃষ্টি! আমার মায়ের নাম মৌমিতা। মা কিন্তু আমার নামটা আপনার থেকেই নিয়েছে। শুধু নাম নয়। আপনার পুরোটাই নিয়েছে। আমি ডাক্তারি পড়ছি। আমিও হুমায়ুন পছন্দ করি। রেগে গেলে আমিও কপালে হাত ঘষতে থাকি। লাল রঙ আমারও পছন্দ নয়। হুটহাট আপনার মতো পাহাড়ে যাই। আপনার মতো বিকেলে আকাশের নিচে বসে থাকি। আমার কলমদানীতে এই একই লেখা। আমিও সুতী শাড়ি পড়তে পছন্দ করি। আমি পুরোটা আপনার মতোই।”

হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটি এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে গেল। আর আমি চমকে উঠে তার দিকে তাকালাম। মেয়েটা এরপর কণ্ঠ একটু নামিয়ে মোহিত গলায় বললো,

“এবার আমি আপনার মতোই একজনকে ভীষণ ভালোবাসতে চাই। নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে তাকে ভালোবাসতে চাই। এক সুন্দর দিনের পড়ন্ত বিকেলের সোনালী রোদে তার প্রেমে পড়তে চাই। তাকে সম্পূর্ণরূপে নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে ফেলতে চাই। তারপন শুধু সে চেয়েছে বলেই আজন্ম তার অপেক্ষায় থেকে যেতে চাই।”

(সমাপ্ত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here