নয়নতারা পর্ব ১১

‘নয়নতারা’

লিখা- ফারিয়া নোভা

(পর্ব-১১)

ভোর হয়ে এসেছে, নয়নতারার চোখও কিছুটা লেগে এসেছিলো।

কিন্তু সকালের মিষ্টি আলোয় ঘুম ভেঙ্গে গেলো ওর। আজকের দিনটা যেনো একটু বেশিই শুদ্ধতায় ভরপুর।

নয়নতারা খামটা খুলে-

ভেতরে একটা চেইনের মধ্যে একটা রিং ঝুলানো। রিং টা খুলে সে হাতে পড়তে চায়। একি এই রিং যে ওর একদম ই মাপমতো।
তারপর গলায় চেইন টা পড়ে নেয়।

নিজেকে প্রচণ্ড হালকা লাগছে নয়নতারার। মনে হচ্ছে চাইলেই পাখির মতো উড়ে যেতে পারবে। মনের বিষাদ টাও অনেকটা কমে এসেছে।
নয়নতারা নিজের হাতে পুরো বাড়িটা গুছিয়েছে। বাবা-মার বিয়ের ছবিটা বড় ফটোফ্রেমে লাগিয়ে হলরুমে টাঙ্গিয়ে দিয়েছে।
কুলসুম বানু ছবিটা দেখে কিছুক্ষণ হা হয়ে থাকে।
নয়নতারা তা দেখে মিটিমিটি হাসে।

নয়নতারা আজ হরেক রকমের রান্না করেছে। প্রত্যেক রান্নার স্বাদ ছিলো অতুলনীয়, সে নিজেও অবাক হয়েছে এটা দেখে । মনে হচ্ছে ওর হাতে যেনো জাদু আছে।

এতসব রান্নাবান্না সবই আশ্রমের বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য। আজ সেও তাদেরই মতো অনাথ।

নয়নতারাকে এতোটা প্রফুল্ল দেখে ফাদারের চোখে মুখেও চিন্তার ছাপ পড়ে।
কি এমন হলো এই কিছুদিনে?
যে মেয়েটা কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলো একদিন, সে আজ রান্নাবান্না করে নিয়ে এসেছে সবার জন্য।

নয়নতারা ভেতরের রুমে গিয়ে দেখে সবাই খেলছে, শুধু তিনু শুয়ে আছে। শরীরটা ওর আগের চেয়ে অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছে, চোখের নিচে কালি পড়েছে।
নয়নতারা তিনুকে পরম আদরে কোলে তুলে নেয়। বেশ কিছুক্ষণ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

সবার মতো তিনুও চকোলেট পেয়ে কোলাহলে মত্ত। তিনুর মধ্যে সেই প্রাণহীন ভাবটা আর নেই। ওর চোখে মুখে শুধু উচ্ছলতা।

ফাদার রুমে এসে কিছুটা গম্ভীর হয়ে যান।

নয়নতারা – ফাদার!

ফাদার- ইয়েস, মাই গার্ল।

নয়নতারা- বাবা মারা গেছে আজ ৪০ দিন পূর্ণ হলো। আমি আজ সবার জন্য রান্না করে নিয়ে এসেছি।

ফাদার- তুমি সত্যি প্রচণ্ড দায়িত্বশীল মেয়ে। আই এম প্রাউড অফ ইউ।

নয়নতারা- কিপ মি ইন উইর প্রেয়ার, প্লিজ।

ফাদার- ইয়াহ, অফকোর্স।

সবাই মিলে একত্রে খেতে বসে। খাওয়ার সময় ফাদার আরেকদফা চমকে যান। একবারে হুবহু নিয়তির হাতের স্বাদ। তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেন-

‘রান্নাটা খুব ভালো হয়েছে নিয়তি….’

নয়নতারা ফাদারের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

যাবার সময় তিনু নয়নতারাকে জড়িয়ে ধরে-

তিনু- তুমি যায়ো না আপু, তুমি গেলেই আমি আবার অসুস্থ হয়ে যাবো।

নয়নতারা- বোকা মেয়ে, তোর কিচ্ছু হবে না আপু আছি তো।

এই বলে নয়নতারা হনহন করে বেড়িয়ে যায়। ফাদারের আজ বারবার মনে হচ্ছিলো এতোক্ষন তার সামনে নিয়তি ছিলো, নয়নতারা নয়।
তিনি নিজের রুমে গিয়ে দরজায় খিল দিলেন।

এদিকে সন্ধ্যালগ্নে নয়নতারা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে , অনেকক্ষণ যাবত দুটো তারাকে কাছাকাছি দেখছে। ওর চোখের পলক যেনো পড়ছে না।
মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে, নয়নতারার নাকে এসে পরিচিত সেই ঘ্রাণ বারবার ধাক্কা দিচ্ছে।
অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ছে।
নয়নতারা স্পষ্ট দেখতে পায়, দুটো তারা একত্রে এসে মিশে গেছে।
ও তখন ফিসফিস করে বলে-

‘বাবা-মা…’

এতোকিছুর ঝামেলায় নয়নতারার অনেকদিন বই নিয়ে বসা হয় না।
আজ সে পড়তে বসেছে।
নয়নতারার এই অমোঘ পরিবর্তনে কুলসুম বানু ও সন্তুষ্টি পান।

পড়তে পড়তে ওর সেই বইটার দিকে চোখ পড়ে,
মুহূর্তেই সকল স্মৃতি তাজা হয়ে উঠে,
রিকভিয়া, স্পার্কি এবং সেই ভয়ানক নগরী।

আনমনে সে বইটা উল্টাচ্ছে, হঠাৎ ই চোখ পড়ে এককোণে ছোট করে কিছু লেখা।

বহুপুরোনো বই। অনেক কষ্টে সে লিখাটা পড়তে পারে, সেখানে লিখা ছিলো-

‘ টগর হাসান….’

নয়নতারা বুঝতে পারে বেঁচে থাকাকালীন বইটা টগরের ছিলো।
বেশ আগ্রহ নিয়ে বইটা আরো ঘাটতে শুরু করে নয়নতারা।

এবং প্রতীক্ষিত এক ছবি পেয়ে যায়। ধুলোবালি মুছে সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটার চোখে কি অসম্ভব মায়া ছিলো।
ছবিটা দেখতে দেখতে হঠাৎ নয়নতারার চোখ পড়ে টগরের জোড়া ভুরুয়ের উপর….

নয়নতারা হতবাক। মা কি তাহলে টগরের জোড়া ভুরুর কথাই বলেছিলো?
টগরের সাথে নিয়তি আর নয়নতারার জীবনই কোন সুতোয় বাঁধা তা এখনো তার জানা নেই।

শুধু জানে এখন টগরই তার বেঁচে থাকার প্রেরণা, হয়তো ভালোবাসাও।
এসব ভাবতে ভাবতে নয়নতারা ছবিটা রাখতে যাবে তখনি পেছনে লেখা দেখতে পায়-

(RNTN)

নয়নতারা নিজের ডাইরিতে অক্ষরগুলো পাশাপাশি লিখে ভাবছে কি হতে পারে,

ইয়েস!

রোদিক- নিয়তি- টগর – নয়নতারা

নয়নতারার মুখটা আবারো চুপসে যায়। আজ টগর কে জিজ্ঞেস করতেই হবে ও কে আসলে?
টগর আসার সময় এখনো হয় নি।
নয়নতারা জানে টগরের উপস্থিতি শুধু রাতের অন্ধকারেই টের পাওয়া যায়।

সে রাতের খাবার খেয়ে অধীর আগ্রহে নিজের বিছানায় ছটপট করছে কখন টগর আসবে…..

টগরের উপস্থিতিতে নয়নতারার প্রথম প্রথম প্রচণ্ড ভয় লাগতো, এখন টগর কে ছাড়া ওর প্রচণ্ড কষ্ট হয়। টগর ই ওর কথা বলা সঙ্গী।

‘এতো কি ভাবছো, তরী?’

নয়নতারা আনমনে বলে-
‘তুমি দেখতে অনেক সুন্দর….. ‘

টগর – কি বললে তুমি?

নয়নতারা নিজের মাথা চাপড়াচ্ছে, এটা কি বলে ফেললো সে। এদিকে টগর খিলখিল করে হাসছে। ছেলেটার হাসির শব্দ শুনতে ভালোই লাগছে।

টগর – এতোদিনে ছবিটা তাহলে চোখে পড়েছে।

নয়নতারা – জ্বী, এবার ঝেড়ে কাশুন তো রহস্যময় মানব। কে আপনি?

টগর – তোমার মন কে প্রশ্ন করো, আমি কে?

নয়নতারা – প্লিজ, আমার জানাটা জরুরি।

টগর – শুনতে চাও সব, তাহলে এর আগে তোমাকে জানতে হবে নিয়তির অতীত। কারণ সবকিছুর শুরু ওর থেকেই।

নয়নতারা- তা কিভাবে সম্ভব?

টগর – রুপনগর!

নয়নতারার কুমোরপাড়ার সেই বৃদ্ধের কথা মনে পড়ে।

নয়নতারা- সেদিন যে রুপ দেখে এসেছি, আমার যে প্রচণ্ড ভয় লাগছে।

টগর – তুমি কি যে সে মানুষ নাকি? তুমি হচ্ছো শুভ শক্তির অধিকারীণি।
তোমার ভয় পেলে চলবে?

নয়নতারা – শুভ শক্তি?

টগর – তুমি নিজেও জানো না, তোমার মধ্যে কোন শক্তি লুকায়িত আছে। শুধু বিশ্বাস রাখো, তুমি পারবে।

নয়নতারা – কিন্তু, আমি একা এক অচেনা শহরে….

টগর – তুমি জানবে তোমার সাথে আমি আছি সবসময়।

নয়নতারা – এই আশ্বাসেই তো বেঁচে আছি , তুমি আছো পাশে।

টগর – শুনো তরী, এই লড়াই টা শুধুই তোমার। আমি শুধু তোমার মনোবল জোগাতে পারি।
রুপনগর এক মায়ার শহর, যেখানে আমার শক্তি নিষ্প্রাণ।
তুমি আমাকে অনুভব ও করতে পারবেনা।
কিন্তু আমি থাকবো প্রতি মুহূর্ত……

নয়নতারা ভয়ে কুঁকড়ে যায়, কিভাবে করবে সে মায়া শক্তির মোকাবেলা।

টগর – তুমি কি ভুলে যাচ্ছো তোমার হাতের ছোঁয়ায় তিনু সুস্থ হয়ে উঠেছে? তাহলে তুমি কেনো পারবেনা?

একথা শুনে নয়নতারা মায়ের দেয়ে রিং টার দিকে তাকায়। সত্যিই তো মায়ের দেয়া রিং আর চেইনটা পড়ার পর থেকে তার নিজের মধ্যে প্রাণসঞ্চার হয়েছে…

নয়নতারা নিজের ভয় কে জয় করতে চায়, এই জীবনে মা তার কাছে একটা জিনিস ই চেয়েছেন, তা নয়নতারাকে পূরণ করতেই হবে যেকোনো মূল্যে।

নয়নতারা- আমি যাবো, কাল ই যাবো।

টগর – তাহলে শুনো রুপনগরে প্রবেশের জন্য তোমাকে ৩ টা দ্বার অতিক্রম করতে হবে, নিজের বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে।
ভরসা রাখো তুমি পারবে….

নয়নতারা- আমাকে যে পারতেই হবে….

টগর – আমাকে যে যেতে হবে এখন। তোমার ও ঘুম প্রয়োজন।

নয়নতারার মন চাইছে টগর কে বলতে যেয়ো না কোথাও।
কিন্তু শেষমেশ আর বলে উঠতে পারেনি।
টগরের কন্ঠটাও ভারী হয়ে এসেছিল শেষ মুহূর্তে । মনে হয় বুঝতে পেরেছিলো নয়নতারার চোখের ভাষা…..

টগর চলে যাবার পর নয়নতারা রুপনগর কে নিয়ে বিষদ ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে তার খেয়াল নেই……

ভোর হয়ে এসেছে। নয়নতারা নিজের ব্যাগ টা শেষবারের মতো দেখে নিলো সব ঠিক আছে কিনা। এবার গন্তব্যের জন্য ছুটার পালা।

ট্রেন এগুচ্ছে মৃদু তালে, নয়নতারার হৃদস্পন্দন ও তালে তালে বেড়ে চলছে। প্রায় ২ ঘন্টা পর নয়নতারা স্টেশনে এসে নামে।

সে ছাড়া কেউ ই এ স্টেশনে নামে নি , এমন কি স্টেশনে নেমে নয়নতারা একটা কাক পক্ষী ও দেখতে পেলো না।

জায়গাটা দেখেই নয়নতারার ভয় ভয় লাগছে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বলে উঠে-

‘চলেন দিদিমণি….’

নয়নতারা ভুত দেখার মতো চমকে উঠে লোকটাকে দেখে।

নয়নতারা – আপনি? কোথা থেকে এলেন? কে আপনি?

লোকটি- এতো কথা পরে বইলেন, সময় বেশি নাই। আর দেরি হলে রুপনগরের দাঁড় আজকের মতো বন্ধ হয়ে যাবে।

নয়নতারা হকচকিয়ে যায়, লোকটা এও জানে যে গন্তব্য রুপনগর! কিন্তু হাতে আর কোনো রাস্তা নেই তার সাথে যাওয়া ছাড়া।

স্টেশন ছেড়ে বের হতেই নয়নতারা দেখতে পায় একটা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, লোকটা ইশারায় ওকে গাড়িতে বসতে বলে।

লোকটা ঘোড়ার গাড়িটাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে , পুরো রাস্তা জুড়ে কোনো জনমানুষের চিহ্ন নেই।
চারপাশটা যেনো অদ্ভুত সৌন্দর্যমন্ডিত।

সবকিছু যেনো রুপকথার মতো মনে হচ্ছিলো নয়নতারার।
তখনি গাড়িচালক বলে উঠে-

‘রুপকথাই বটে…..’

নয়নতারা শিরদাঁড়া বেয়ে জলস্রোত নেমে যায়, চোখের সামনে ধুলিঝড় শুরু হয়, তারপর আর কিছু মনে নেই।

যখন চোখ খুলে তখন দেখে এক আলিশান রাজপ্রাসাদের বহিঃফটকের সামনে সে পড়ে আছে।
বুঝতে পারে এই সেই প্রথম দ্বার, রুপনগরে যাবার ফটক।

সে ফটকে ধাক্কা দিতে গিয়ে নিজে পড়ে যায়, সারাশরীর বেয়ে কারেন্টের প্রবাহ বয়ে গেছে মনে হয়।

তখনি দৈবাৎ এক কণ্ঠস্বর ভেসে উঠে-

‘চলে যা, এক্ষুণি, নাহলে মারা পড়বি। ‘

নয়নতারা বেশ ভয় পায়। তখনি টগরের কথাগুলো মাথায় আসে, সে পারবে। সেই শক্তি তার আছে।

– যাবার জন্য তো আসি নি এখানে এতোপথ।

তাহলে তোর প্রথম প্রশ্ন, যদি পারিস এই দ্বার খুলবে, নাহলে এখানেই মুন্ডু কেটে ঝুলিয়ে রাখবো ( অট্টহাসি)

নয়নতারা ভয়ে ককিয়ে যায়।

– আমি রাজি।

আলোয় দেখে মেলে, আঁধারে মৃত্যু,
সবার সাথে আছে সে আমৃত্যু ।

এ কেমন প্রশ্ন হলো, নয়নতারা ভেবে পায় না। মাথা কাজ করতে চাইছে না। কি হবে এর উত্তর?

নিজের মাথায় আঘাত করতে মন চাইছে নয়নতারার।
কাকফাটা রোদ্দুরে নয়নতারা প্রচন্ড ঘামছে। মনে হচ্ছে এখনি ঢলে পড়বে। তাহলে কি আজ তার মৃত্যু? মায়ের কথা আর রাখতে পারলো না….

মাটির দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে নয়নতারার মুখে হাসি ফুটে উঠে। সে চিৎকার করে বলে উঠে,

– ছায়া…..

বিকট শব্দে প্রবেশ দ্বার খুলে যায়। নয়নতারা সুড়কি বিছানো পথ ধরে হেঁটে যায়। মনে মনে বলে –
‘ টগর আমি পেরেছি….’

সামনে তারজন্য আরো এক দ্বার অপেক্ষা করছে। নয়নতারা দৃপ্তভঙ্গিতে এগিয়ে যায়….

দ্বিতীয় দ্বারের সামনে এসে নয়নতারা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কি অদ্ভুত সুন্দর এই ফটক, যা হৃদয় হিম করে দেয়ার মতোই ভয়ানক ও।

নয়নতারার মনে হচ্ছে ওর পা গুলো যেনো দঁড়ি দিয়ে বাঁধা, নিচে তাকাতেই দেখতে পায় এক বিরাট অজগর সাপ ওর পা প্যাচিয়ে আছে। নয়নতারার গা কাটা দিয়ে উঠছে।
তখনি সে বিভৎস কণ্ঠস্বর,

এবারের প্রশ্ন না পারলে মৃত্যু হবে আরো ভয়ানক।

নয়নতারা ভয়ে কাঁদছে, মনে মনে বলছে-
‘টগর তুমি আছো তো?’
কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছেনা। তখনি ও ওর শরীরে মৃদু কম্পন অনুভব করে। টগর তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

নয়নতারা শেষ ভরসাটুকু বাঁচিয়ে রেখে বলে

– আমি প্রস্তুত।

সাপটা তখন ওকে পেঁচিয়ে রেখেই খান্ত হয় নি বরং গা বেয়ে উপরে উঠছে।

‘নেশায় পড়েছিলো প্রথম দেখায়,
হরিণী কাজলরুপ সে মোহনায়…’

নয়নতারা আর কিছু ভাবতে পারছেনা। গা ঘিন ঘিন করছে, সাপটাকে তাকে ছোবল মারার জন্য যেনো সর্বাত্মক প্রস্তুত।
দম বন্ধ হয়ে আসছে।

প্রথম দেখার সাথে হরিনীর কি সম্পর্ক হতে পারে?
নাহ কিছুই মাথায় আসছে না, নয়নতারার প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে।
চিৎকার করে কাঁদতে গিয়েও পারছেনা। নীরবে চোখের জল মুছে নেয়।
তখনি তার মাথায় আসে উত্তরটা। সে দৃড় কন্ঠে বলে-

‘চোখ….’

চোখের পলকে ওকে পেঁচিয়ে থাকা সাপটা অদৃশ্য হয়ে যায়, সামনের ফটক খুলে যায়।

নয়নতারার ঠোঁটের কোণে আত্মবিশ্বাসের ছাপ। পারবে কি শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে?

মুহূর্তেই ওর সব আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। সামনের পথে অজস্র পোকা কিলবিল করছে। মানুষের শরীরের পচা অংশ বিভিন্ন জায়গায় পড়ে আছে, নয়নতারার গা গুলিয়ে উঠে।
বুঝতে পারে এই মৃত্যুপুরী পার হওয়া এতো সহজ হবে না।

শরীর বেয়ে ওর পোকা কিলবিল করছে। যেখানেই পা পড়ছে সেখানে পায়ের নিচে পোকা পড়ে মরছে, কি বিচ্ছিরি অবস্থা।
নয়নতারা শত চেষ্টা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এক পা এক পা করে।
ফটকে দুটো তলোয়ার উল্টোভাবে লাগানো।
যেগুলো মুহূর্তে হাজার হাজার পোকা মেরে সামনে ছিটিয়ে দিচ্ছে।

নয়নতারা ভয়ে পেছনে পা রাখতে যাবে তখনি সেই কণ্ঠস্বর –

‘ পিছু যাবার কোনো উপায় নেই তোর, এখানেই পচে গলে মরবি তুই। ‘

নয়নতারা চিৎকার দিয়ে বলে উঠে,

– তৃতীয় প্রশ্নের জন্য আমি প্রস্তুত।

তাহলে বল- ‘জীবন ছেড়ে বহু দূরে,
আজও আছে মনের কোঠরে,
রাত্রি নিশিতেই দেখা মেলে….’

কথাটা শুনেই নয়নতারার প্রচন্ড বাবার কথা মনে পড়ে, সত্যিই তো সে তার বাবাকে মনের মাঝেই বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু রাত্রি নিশিতে দেখা মেলে দ্বারা কি বুঝাচ্ছে?

তখন ও আরও তলিয়ে ভাবতে শুরু করে, তখনি ওর কাল রাতের কথা মনে পড়ে, সন্ধ্যাবেলায় আকাশ ভরা তারায় ও বাবা- মা কে খুঁজে নিয়েছিলো যে। সে চিৎকার দিয়ে বলে উঠে,

– ‘তারা…’

কিন্তু একি ফটক এখনো খুলছে না কেনো? তলোয়ারগুলো যেনো তার দিকে এগিয়ে আসছে ছিন্নভিন্ন করে দিতে, নয়নতারা চোখ বন্ধ করে ফেলে।

সময় ঘনিয়ে এসেছে, তলোয়ারগুলোর প্রলয়ংকারী শব্দ কানে ভেসে আসছে। এদিকে নয়নতারা শেষবারের মতো ভাবার চেষ্টা করছে কি হতে পারে। হঠাৎ ই ও ফিসফিস করে বলে,

– ‘নয়নতারা….. ‘

সবকিছু যেনো থমকে যায়, চারদিক নিস্তব্ধ। নয়নতারা চোখ খুলে এক পুরোতন রাজবাড়ি দেখতে পায়। সে ভীতু পদক্ষেপে এগিয়ে যায়।

নেইমপ্লেটের লেখাগুলো ধুলো জমে আর দেখা যাচ্ছে না, নয়নতারা নিজের ওড়না দিয়ে মুছে দিতেই দেখতে পায় লেখা-
‘ শেখ ভিলা…’

এই তো তার গন্তব্য। এখনো অনেক কাজ বাকী। তখন ও মায়ের দেয়া আংটির দিকে তাকায়,

‘মা তুমি সাহায্য করো আমায়…..’

বাড়ির সামনে যেতেই নয়নতারা দেখতে পায়, সদরদরজা টা হাট করে খোলা। সে মনে মনে হাসে, যে বাড়িতে প্রবেশের জন্য মৃত্যুর কাছাকাছি যেতে হয়, সে বাড়ির সদরদরজা এভাবে উন্মুক্ত থাকে।

আর কিছু না ভেবেই নয়নতারা বাড়ির চৌকাঠে পা রাখে।

‘তুই আসবি না আমার বাড়িতে, অভিশপ্ত নারী। ‘

নয়নতারা স্পষ্ট দেখতে পায় হুইল চেয়ারে একটা বৃদ্ধ বসে আছে ঘর অন্ধকার করে। চারদিকে ভ্যাপসা গন্ধ। সবকিছুকে ছাপিয়ে লোকটার কথাই বারবার কানে বাজছে নয়নতারার। সে এগিয়ে যায় লোকটার কাছে।

‘না করেছি তো, তোর উপস্থিতি আমার সহ্য হয় না, শরীর পুড়ে যায়, বের হয়ে যা….’

নয়নতারা কি ভেবে যেনো মৃদু হাসে, হুইল চেয়ারে বসে থাকা লোকটা চোখের সামনে বসে ছটপট করছে, মনে হচ্ছে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করছে।

নয়নতারা গিয়ে উনার মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। লোকটা শান্ত হয়। কর্কশ কন্ঠে বলে-

‘কেনো এসেছিস এখানে? ৩২ বছর আগে তোর মা কে আশ্রমের সামনে ফেলে এসেও রক্ষা পেলাম না, ঘুরে ঘুরে আমাকে মারতে তোরা আসবি কেন?

নয়নতারার মাথায় যেনো বাজ পড়ে। কি বলছেন এসব উনি?

নয়নতারা- কে আপনি?

ইব্রাহীম শেখ- আমি নিয়তির বাবা।

নয়নতারার চোখে ক্ষোভ, পরিবার থাকতেও তার মা কে আশ্রমে জীবন কাটাতে হয়েছে।

নয়নতারা – নিষ্ঠুর, পাপিষ্ঠ।

ইব্রাহীম শেখ- না জেনে কথা বলছিস কেন? আমি নিজ হাতে নিজের মেয়েকে বলি দিতে পারতাম না কখনোই। এছাড়া উপায় ছিলো না আমার (কাঁদছেন)

নয়নতারা- (হতবাক) আমি শুনতে চাই সব।

ইব্রাহীম শেখ- আমি তখন সবে বিয়ে করেছি। বাবার রেখে যাওয়া এতো অঢেল সম্পত্তি, আমার কোনো কিছুই করতে হতো না।
উলটো নিজের শখ পূরণে টাকা উড়াতাম।
মনে খেয়াল হলো জাদু শিখবো, আমি হবো সর্বক্ষমতার অধিকারী….

নয়নতারা- তারপর?

ইব্রাহীম শেখ- দেশ-বিদেশ থেকে নামীদামী জাদুকরদের আমন্ত্রণ করে আনি।

প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছিলাম, কারণ এসব জাদুকরদের জাদু ছিলো মুলত দর্শকদের চোখে ধুলো দেয়া।
কিছুই হাসিল করা যেতো না।
ছোটবেলা থেকেই একরুখো ছিলাম, মনে মনে ঠিক করেছিলাম, জাদু আমি শিখবোই তা যেকোনো মূল্যেই হোক।

বারবার হতাশা আমাকে ঘিরে ধরছিলো, তখন আশার আলো দেখায় এক প্রহরী……

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here