#অসময়ের_বৃষ্টি
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্বঃ০৪
মধ্যবিত্তের চিলেকোঠা।
মানুষের মনের ভেতরের একাকীত্ব আর ঘরের ভেতরের একাকীত্ব দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। ঘরের ভেতরের একাকীত্ব কাটানোর জন্য একটা টেলিভিশন ছেড়ে দেওয়া যায়, রেডিও অন করা যায় কিংবা বারান্দায় এসে রাস্তার গাড়িঘোড়া দেখা যায়। কিন্তু মনের ভেতরের একাকীত্ব যখন গ্রাস করে, তখন চারপাশের হাজারটা মানুষের কোলাহলও কানে পৌঁছায় না। মনে হয় পুরো পৃথিবীতে শুধু একজন মানুষই বেঁচে আছে, আর বাকি সবাই মোমের পুতুল।
ইশতিয়াকের মগবাজারের চিলেকোঠার ঘরটা এখন ঠিক সেইরকম এক নিরেট একাকীত্বের চাদরে ঢাকা। টেবিলের ওপর বইগুলো এলোমেলো পড়ে আছে। ল্যাপটপটা খোলা, কিন্তু স্ক্রিনটা স্লিপ মোডে গিয়ে অন্ধকার হয়ে আছে। ঘরের এক কোণে রেনুর দেওয়া সেই গাঢ় নীল রঙের নতুন ফোল্ডিং ছাতাটা খাড়া করে রাখা। ইশতিয়াক ওটার দিকে তাকাতে পারে না, আবার ওটা চোখ থেকে আড়ালও করতে পারে না।
সেদিন নিউমার্কেটের ফুচকার দোকান থেকে রেনু চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে পুরো তিনটা সপ্তাহ। এই তিন সপ্তাহে ইশতিয়াক একবারের জন্যও রেনুকে ফোন করেনি, কোনো মেসেজ পাঠায়নি। সে জানে, ক্ষতস্থানে বারবার আঙুল দিলে রক্তপাত কমে না, বরং বাড়ে। রেনু তার নিজের অংক মেলাতে গেছে, তাকে সেই অংক মেলাতে দেওয়াটাই ইশতিয়াকের জীবনের সবচেয়ে বড় এবং কঠিন ত্যাগ। ইশতিয়াক বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ছিল। ফ্যানটা একটা একঘেয়ে শব্দ করে ঘুরছে, খট খট খট খট শব্দ করে। ঠিক এই সময়েই তার ঘরের দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। ইশতিয়াক অবাক হলো। এত রাতে তার চিলেকোঠায় সাধারণত কেউ আসে না। সে উঠে গিয়ে দরজা খুলল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তার বন্ধু এবং প্রকাশনা সংস্থার মালিক আরিফ। আরিফের হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট আর মুখে চওড়া হাসি। “কী রে ইশতিয়াক? তুই তো দেখি একদম দেবদাস হয়ে গেছিস! ঘরে আলো জ্বলছে না কেন?” আরিফ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল।
“এমনিই, ভালো লাগছিল না। তুই এত রাতে?” ইশতিয়াক দরজাটা আটকে বলল।
“আরে ব্যাটা, একটা দারুণ খবর আছে! তোর সেই অনুবাদ বইটার সেকেন্ড এডিশন বের হচ্ছে। মেলা শেষ হয়ে গেছে তিন মাস, অথচ এখনো তোর বইয়ের ডিমান্ড কমেনি। এই নে, তোর রয়্যালটির একটা চেক নিয়ে এসেছি।” আরিফ পকেট থেকে একটা খাম বের করে টেবিলের ওপর রাখল। ইশতিয়াক চেকে তাকাল। টাকার অঙ্কটা মন্দ না, একটা মধ্যবিত্ত ছেলের কয়েক মাসের খরচ অনায়াসে চলে যাবে। কিন্তু এই টাকাটা দেখে আজ তার মনের ভেতর কোনো আনন্দ হলো না। সে একটা মলিন হেসে বলল, “ধন্যবাদ, আরিফ। টাকাটার খুব দরকার ছিল।”
“তোর মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন রে? কোনো ঝামেলা হয়েছে? সেই আজিমপুরের মেয়েটা… কী যেন নাম বলছিলি, রেনু? তার কোনো খবর আছে?” আরিফ খাটের কোণে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল।
ইশতিয়াক জানালার বাইরে তাকাল। রাতের ঢাকা শহরকে এখন আর মায়াময় মনে হয় না, মনে হয় একটা বিশাল পাথরের খাঁচা। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “তার বিয়ে, আরিফ। আগামী পরশু শুক্রবার। পাত্র খুব ভালো, গুলশানে বাড়ি আছে, ব্যাংকে বড় চাকরি করে।”
আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে ইশতিয়াকের স্বভাবটা জানে। ইশতিয়াক মুখে কিছু না বললেও তার ভেতরের হাহাকারটা আরিফ ধরতে পারল। সে ইশতিয়াকের কাঁধে হাত রেখে বলল, “জীবনটা এমনই রে বন্ধু। আমরা যারা কাগজের পাতায় গল্প লিখি, আমাদের নিজেদের জীবনের গল্পটা অন্য কেউ লিখে রেখে দেয়। আমরা শুধু বাধ্য ছেলের মতো সেই স্ক্রিপ্ট দেখে অভিনয় করে যাই।”
এদিকে আজিমপুরের কোয়ার্টারের ফ্ল্যাটটিতে তখন উৎসবের শেষ মুহূর্তের আমেজ। ঘরজুড়ে নতুন কাপড়ের গন্ধ, আতর আর গোলাপজলের সুবাস। আত্মীয়-স্বজনে পুরো বাড়ি গমগম করছে। রেনুর ছোট বোন রীতা সারাক্ষণ হাসাহাসি করছে, বন্ধুদের নিয়ে বিয়ের গীত গাইছে। রেনুর মা রেহানা বেগম আলমারি থেকে একে একে দামী শাড়ি আর গয়না বের করে সবাইকে দেখাচ্ছেন। কিন্তু এই উৎসবের আবহাওয়ার মধ্যেও রেনু যেন এক জ্যান্ত লাশ। তার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে মাত্র। তার গালে, হাতে তখনো কাঁচা হলুদের গন্ধ আর হলদেটে আভা। তাকে সবাই খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তার চোখের কোণের সেই গাঢ় কালো একাকীত্বটা কোনো মেকআপ দিয়ে ঢাকা যাচ্ছে না। রেহান আজ সন্ধ্যায় এসেছিল কিছু দরকারি কথা বলতে। সে ড্রইংরুমে বসে চা খেতে খেতে রেনুর বাবার উদ্দেশ্যে বলল, “আঙ্কেল, বিয়ের পরদিনই কিন্তু আমরা সিলেটের একটা রিসোর্টে যাচ্ছি। আমার ব্যাংকের কলিগরা একটা গেট-টুগেদার অ্যারেঞ্জ করেছে। রেনুর পাসপোর্টটা রেডি রাখতে বলবেন, আগামী মাসে আমাদের একটা কানাডা ট্যুরও হতে পারে।”
রহমান সাহেব খুশি হয়ে বললেন, “হ্যাঁ বাবা, অবশ্যই। রেনুর পাসপোর্টের কাজ তো আগেই করা আছে। তোমরা যেখানে নিয়ে যাবে, ও সেখানেই যাবে।”
রেনু এক কোণে দাঁড়িয়ে রেহানের কথা শুনছিল। রেহান যখনই কথা বলে, তার প্রতিটা বাক্যে ‘আমি’, ‘আমার ব্যাংক’, ‘আমার ফ্যামিলি’ এই শব্দগুলো ঘুরেফিরে আসে। সেখানে রেনুর কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। সে যেন রেহানের জীবনের একটা নতুন, দামী শো-পিস, যা সে তার বন্ধুদের সামনে প্রদর্শন করবে।
হুট করে রেনুর মনে পড়ল ইশতিয়াকের কথা। ইশতিয়াক কখনো ‘আমার’ শব্দটা উচ্চারণ করত না। সে সবসময় বলত, “রেনু, চলুন আকাশটা দেখে আসি”, “রেনু, আপনার কি চা খেতে ইচ্ছে করছে?” ইশতিয়াক নিজেকে বিলিয়ে দিতে জানত, আর রেহান শুধু অধিকার খাটাতে জানে।
রাত তখন প্রায় একটা। বিয়ের আর মাত্র একটা দিন বাকি। মেহমানরা সবাই যে যার মতো ঘুমাতে গেছে। রেনু তার ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আকাশটা মেঘে ঢাকা, ঝিরঝিরে একটা হাওয়া দিচ্ছে। ঠিক সেই নীলক্ষেতের বিকেলের মতো আবহাওয়া। রেনুর চোখে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে মনে মনে বলল, “ইশতিয়াক, আপনি কি একবারও আসবেন না? আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা… তারপর তো আমি অন্য কারো খাতার অংক হয়ে যাব।” ঠিক তখনই ড্রইংরুম থেকে একটা বিকট শব্দ শোনা গেল। কারোর একটা ভারী শরীর মেঝেতে পড়ে যাওয়ার শব্দ। রেনু চমকে উঠে ড্রইংরুমে ছুটল। গিয়ে দেখল, তার বাবা রহমান সাহেব মেঝেতে শুয়ে আছেন, তাঁর মুখটা একদিকে বেঁকে গেছে, হাত-পা কাঁপছে। তিনি গোঙাচ্ছেন, মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে।
“বাবা! বাবা কী হয়েছে তোমার?” রেনু চিৎকার করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়ির মানুষ জেগে গেল। চারিদিকে চিৎকার, চেঁচামেচি, কান্না। রেহানা বেগম মাথায় হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লেন। রেনুর ছোট ভাই রিফাত ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আপু, বাবার বোধহয় স্ট্রোক হয়েছে! এখন কী করব?”
রেনু নিজেকে সামলে নিল। এই কঠিন বিপদে মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়েরা হুট করে খুব শক্ত হয়ে যায়। সে রেহানকে ফোন করল। রেহানের ফোন তখন বন্ধ। সে বারবার চেষ্টা করল, কিন্তু ওপাশ থেকে শুধু যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল, “আপনার ডায়ালকৃত নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।”
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। রাতের ঢাকা শহরে এই বৃষ্টি যেন এক অভিশাপ। কোনো রিকশা নেই, কোনো সিএনজি নেই। হসপিটালে নেওয়ার মতো কোনো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। আত্মীয়-স্বজনরা সবাই মুখে চ্যাঁচামেচি করছে, কিন্তু কাজের কাজ কেউ করছে না। রেনুর বুকটা ভেঙে আসছিল। সে চরম অসহায় বোধ করতে লাগল। এই বিশাল ঢাকা শহরে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কি কেউ নেই? হুট করেই রেনুর মাথায় একটা মানুষের চেহারা ভেসে উঠল। সে আর এক সেকেন্ডও চিন্তা না করে মোবাইলটা হাতে নিল। নম্বরটা তার মুখস্থ। সে ডায়াল করল। মাত্র দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে ইশতিয়াকের শান্ত, গভীর গলা ভেসে এল, “হ্যালো, রেনু?” সে যেন জেগেই ছিল, যেন সে জানত রেনুর ফোন আসবে।
“ইশতিয়াক! বাবা… বাবার স্ট্রোক হয়েছে। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। রেহানের ফোন বন্ধ, বাইরে বৃষ্টি… আমরা কোনো গাড়ি পাচ্ছি না ইশতিয়াক! আমি কী করব?” রেনু আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে, সে ফোনের ওপাশেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
“রেনু, একদম শান্ত হোন। কান্নাকাটি বন্ধ করুন। আমি পনেরো মিনিটের মধ্যে আসছি। আপনি চাচাজিকে একটা চাদর দিয়ে জড়িয়ে রাখুন।” ইশতিয়াকের গলার আওয়াজের দৃঢ়তায় রেনুর ভেতরের সব ভয় এক নিমেষে উবে গেল। ঠিক বারো মিনিটের মাথায় আজিমপুরের কোয়ার্টারের সামনে একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে থামল। ইশতিয়াক নিজে সেই অ্যাম্বুলেন্সের সামনে বসে এসেছে। তার পুরো শরীর বৃষ্টিতে ভেজা, চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। সে সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় উঠে এল। কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ইশতিয়াক রিফাতকে বলল, “রিফাত, চাচাজির মাথাটা ধরো। অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে হবে। দেরি করলে ড্যামেজ বেড়ে যাবে।”
ইশতিয়াক নিজে রহমান সাহেবকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। তার ভেজা শরীর থেকে বৃষ্টির ফোঁটা টুপটুপ করে মেঝেতে পড়ছিল, কিন্তু তার হাত দুটো ছিল ভীষণ শক্ত, যেন সে কোনো বহুমূল্য জিনিস আগলে রাখছে। পরের কয়েকটা ঘণ্টা কেটে গেল এক চরম ঝড়ের বেগে। ঢাকা মেডিকেল হসপিটালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সামনে ইশতিয়াক একাই সব সামলাতে লাগল। ডাক্তার ডাকা, ট্রলি জোগাড় করা, ইমার্জেন্সি ফাইল তৈরি করা সব সে একাই করল। রেনুর আত্মীয়রা হসপিটালের করিডোরে বেঞ্চে বসে শুধু ফিসফিস করছিল, কিন্তু ইশতিয়াক ছুটছে এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে। তার পরনের ফতুয়াটা তখনো ভেজা, ঠান্ডায় তার শরীর হালকা কাঁপছে, কিন্তু তার চোখে কোনো ক্লান্তি নেই। ভোর চারটার দিকে ডাক্তার ইমার্জেন্সি থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি রহমান সাহেবের চশমাটা রেনুর হাতে দিয়ে বললেন, “আইসিইউতে শিফট করতে হবে। স্ট্রোকটা বেশ বড় ছিল। তবে রাইট টাইমে নিয়ে এসেছেন। আর আধা ঘণ্টা দেরি হলে ওনাকে বাঁচানো যেত না। এখন দ্রুত কিছু দামী ইনজেকশন আর মেডিসিন লাগবে। ফার্মেসি থেকে নিয়ে আসুন।”
ডাক্তার একটা প্রেসক্রিপশন বাড়িয়ে দিলেন। রেনু প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে দেখল, ওষুধের দাম প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা। তার ব্যাগে এই মুহূর্তে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা আছে। বাকি টাকা কোথায় পাবে? রেহানের ফোন এখনো বন্ধ। রেনু আইসিইউ-এর কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই ইশতিয়াক রেনুর পাশে এসে দাঁড়াল। সে রেনুর হাত থেকে আলতো করে প্রেসক্রিপশনটা টেনে নিল। বলল, “আপনি এখানে চাচির পাশে বসুন। আমি মেডিসিন নিয়ে আসছি।”
“ইশতিয়াক, অনেক টাকা লাগবে… আমার কাছে এখন…” রেনু নিচু গলায় বলল।
ইশতিয়াক রেনুর চোখের দিকে তাকিয়ে সেই চিরচেনা মলিন হাসিটা হাসল। সে বলল, “রেনু, একটু আগেই আমার এক বন্ধু আমার একটা বইয়ের রয়্যালটির টাকা দিয়ে গেছে। টাকাটা আমার কোনো কাজে লাগছিল না। ওটা বোধহয় আজ এই কাজের জন্যই এসেছিল। আপনি চিন্তা করবেন না।” ইশতিয়াক দ্রুতপায়ে ফার্মেসির দিকে চলে গেল। রেনু তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে আবার পানি গড়িয়ে পড়ল। তবে এবারের পানিটা দুঃখের নয়, এক গভীর অনুশোচনার আর মায়ার।
সকাল ছয়টায় রেহান হসপিটালে এল। তার পরনে দামী ট্র্যাকিং স্যুট, চোখে তখনো ঘুমের ঘোর। সে রেনুর সামনে এসে বিরক্ত মুখে বলল, “রেনু, হোয়াট ইজ দিস? রাতে আমার ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিল, আমি ঘুমাচ্ছিলাম। সকালে উঠে দেখি রিফাতের মেসেজ। হসপিটালে এসেছ কেন? প্রাইভেট কোনো ক্লিনিকে নিতে পারতে। সরকারি হসপিটালের পরিবেশ কত ডার্টি!”
রেনু রেহানের দিকে তাকাল। যে মানুষটাকে সে নিজের জীবনের ‘সঠিক সমীকরণ’ ভেবেছিল, তাকে আজ বড় বেশি ক্ষুদ্র, বড় বেশি তুচ্ছ মনে হলো। রেনু খুব ঠাণ্ডা গলায় বলল, “আমার বাবা আইসিইউতে, রেহান। এই মুহূর্তে সরকারি বা বেসরকারি দেখার সময় আমার ছিল না। আর রাতের বেলা যখন কোনো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন তুমি ঘুমাচ্ছিলে।”
“আই অ্যাম সরি, রেনু। বাট তুমি তো বুঝতে পারছ, আমাদের কাল বিয়ে। এই অবস্থায় অনুষ্ঠান করা পসিবল না। আমার ফ্যামিলি ভাবছে ম্যারেজ ডেটটা ডেফার করতে হবে,” রেহান একটু ইতস্তত করে বলল।
“বিয়েটা পিছাতে হবে না, রেহান,” রেনু খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল। “বিয়েটা আর হবেই না। তুমি এখন আসতে পারো।”
রেহান আকাশ থেকে পড়ল। “হোয়াট ডু ইউ মিন?”
“আমি যা বলেছি, খুব স্পষ্ট বলেছি। যে মানুষ আমার বাবার জীবনের চেয়ে নিজের ঘুমকে বেশি দামী মনে করে, তার সাথে আমি আমার বাকি জীবন কাটাতে পারব না। আমার অংক ভুল হতে পারে রেহান, কিন্তু আমি ভুল অংক নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।”
রেহান রাগে আর অপমানে লাল হয়ে হসপিটালের করিডোর দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল। ইশতিয়াক তখন এক ব্যাগ ওষুধ নিয়ে করিডোরের ওপাশ থেকে আসছিল। সে রেহানকে চলে যেতে দেখে রেনুর পাশে এসে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, “রেহান সাহেব চলে গেলেন যে?”
রেনু ইশতিয়াকের দিকে ফিরল। তার মুখটা এখন একদম শান্ত, কোনো মেঘ নেই সেখানে। সে ইশতিয়াকের ভেজা ফতুয়াটার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, চলে গেছে। সে তার নিজের গোছানো পৃথিবীতে ফিরে গেছে। আর আমার এই ছন্নছাড়া পৃথিবীতে শুধু আপনিই পড়ে রইলেন, ইশতিয়াক সাহেব।”
ইশতিয়াক কিছু বলল না। সে শুধু তার হাতের ওষুধের ব্যাগটা আইসিইউ-এর নার্সের দিকে বাড়িয়ে দিল। হসপিটালের জানালার বাইরে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটে উঠেছে। রাতের সেই মরণ-কামড় দেওয়া বৃষ্টিটা থেমে গেছে, আর চারপাশের ধুয়ে যাওয়া গাছপালাগুলোর ওপর এক চিলতে সোনালী রোদ এসে পড়েছে। ইশতিয়াক আর রেনু দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেই আলোর দিকে তাকিয়ে রইল। না চাইতেও সময়ের স্রোত তাদের এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে কোনো সামাজিক সমীকরণ নেই, আছে শুধু দুটো হৃদয়ের নীরব সত্য।





