কালো রাত্রির খামে পর্ব -২৭+২৮

#কালো_রাত্রির_খামে (২৭)
#লেখা: ইফরাত মিলি
___________________

কিছু একটা ভালো লাগছে না রাত্রির। মনের ভিতর অস্বস্তি হচ্ছে। তানবীনের কথা স্মরণে আসছে বার বার। চৌদ্দ বছর কথাটা ভাবলে গায়ে এখনও কাঁটা দিয়ে ওঠে তার। চৌদ্দ বছর মানুষটা বন্দি জীবন কাটাবে? এ কথা যে চিন্তা করতেও কষ্ট হয়, মানতেও কষ্ট হয়। রাত্রি বুঝতে পারছে না তানবীনের কথা ভেবে এত কেন কষ্ট পাচ্ছে সে? তার আর কী-ই বা করার আছে? এমনও নয় যে তানবীন তাকে অপেক্ষা করতে বলেছে। তবু কেন মনে হচ্ছে আদিলকে বিয়ে করা তার অনুচিত?
সারাটা পথ বিভিন্ন চিন্তা করতে করতে বাড়ি পৌঁছলো রাত্রি।
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে হলো কিছুক্ষণ, কারণ দরজা খুলতে দেরি করেছে। শ্রাবণীর জ্বর। তাই আজ সে স্কুলে যায়নি। রাত্রি শ্রাবণীর কপালে হাত রেখে বললো,
“জ্বর কমেছে?”

“জানি না। একবার আমাদের সৎ মায়ের কাছে যাও। ওনার কী যেন হয়েছে।”

“কী হয়েছে?”

“গিয়ে দেখো না।”

রাত্রি এক প্রকার উৎকণ্ঠা হয়েই ছুটে যায় প্রিয়ারার কাছে। তাকে রান্নাঘরে পাওয়া গেল। রাত্রি দেখতে পেল প্রিয়ারা কাপড়ের টুকরো বাঁধছে পায়ে। মেঝেতে রক্ত। রাত্রি প্রিয়ারার সামনে এসে বসলো। ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,
“কী হয়েছে আপনার?”

“তেমন কিছু না। পা কে’টে গেছে।”

“দেখি… কীভাবে কাটলো?”

রাত্রি ক্ষত দেখতে চাইলে প্রিয়ারা বাধা দিলেন।
“ছাড়ো তো, বেশি কাটেনি।”

“বেশি কাটেনি মানে? কাপড় ভিজে গেছে তো রক্তে। কাটলো কীভাবে?”

“বেখেয়ালে বটিতে পা পড়েছিল।”

রাত্রি কাপড়ের বাঁধনটা খুললো। খুব বেশি কাটেনি, গভীরও হয়তো নয় ক্ষত। রাত্রি রক্ত থামানোর জন্য হলুদের গুঁড়া দিলো ক্ষত স্থানে। প্রিয়ারা এই যত্ন টুকু পেয়ে আপ্লুত হলো। খুব ভালো লাগলো তার।
রাত্রি প্রিয়ারার দিকে তাকিয়ে দেখলো তার চোখে জল। কেমন ভালোবাসাময় চাহনি। আজ রাত্রির প্রিয়ারাকে কিছু কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে। যা কখনও বলা হয়ে ওঠেনি। রাত্রি বললো,
“জানি না একজন সৎ মা কখনও আপন মায়ের মতো হয়ে উঠতে পারে কি না। তবে আপনি একজন ভালো মা। এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আপনার মতো একজনকে পরিবারের সদস্য হিসেবে পেয়েছি। আপনি আমাদের ভালো মা!”

প্রিয়ারার অক্ষি দ্বয় আনন্দ নীরে সিক্ত হয়। বুকটাও কেমন ভিজে ওঠে ভালোবাসায়। রাত্রি আরও বললো,
“আপনাকে ধন্যবাদ আমাদের মা হওয়ার জন্য।” কীয়ৎক্ষণ থেমে থেকে আবার বললো, “আপনি বৃক্ষের মতো। আপনার সুবিশাল শাখা-প্রশাখা তলে আমাদের নিবাস। সব সময় ছায়া দিয়ে ঘিরে রাখবেন আমাদের। আমরা এই ছায়াতল থেকে বের হতে চাই না।”

প্রিয়ারা কিছু বললেন না, শুধু টের পেলেন চোখ গলিয়ে দুটো উষ্ণ ধারা নেমে যাচ্ছে তার গণ্ডদেশ পেরিয়ে। আজ তার খুব সম্মান বোধ হচ্ছে।

___________________

রোশনিকে যেন নিজের জীবন থেকে তাড়াতেই পারছে না অয়ন। বার বার রোশনির প্রসঙ্গ তার জীবনে এসে যাচ্ছে। সবকিছু মাড়িয়ে আসতে চাইলেও আসতে পারছে না। আজ শায়লা বেগম রাস্তায় দাঁড় করিয়ে অনেক কিছু বললেন। এমনকি জেল-হাজতের ভয়ও দেখিয়েছেন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে না কি জেলের ভাত খাওয়াবে। কিন্তু অয়ন বুঝতে পারছে না সে কী বাড়াবাড়িটা করছে? সে কি রোশনিকে বলেছে তুমি আমার প্রেমে পড়ো? আমার জন্য পাগল হয়ে থাকো সারাজীবন? এমন কিছু তো বলেনি সে। বরং রোশনির সাথে কঠিন আচরণ করে বার বার এড়িয়ে গেছে রোশনিকে। শায়লা বেগম মেয়ের জন্য পাত্র দেখছে ভালো কথা, মেয়ে বিয়ে করবে না বলছে, পাগলামি করছে, সেও ভালো কথা। এখানে অয়নের দোষ কী? দোষ কি এটাই যে রোশনির পাগলামির বিষয়বস্তু সে? এটাই তার দোষ?
এমনিতেই নানান চিন্তা, তার উপর এই মহিলার বার বার এমন কথাবার্তা বিষফোড়ার ন্যায় ঠেকছে। অয়নও আজ অতিষ্ঠ হয়ে বললো,
“জেলে তো আপনাকে ঢোকাবো, বিনা কারণে বার বার আমাকে উত্যক্ত করার কারণে। সবকিছুর একটা সীমা আছে।”

এ কথা শুনে শায়লা বেগম হুংকার ছাড়লেন। তবে তা গ্রাহ্য না করে চলে এলো অয়ন। সে মাথায় অন্য কিছু নিতে চাচ্ছে না, সে শুধু জানে তাকে অনেক ইনকাম করতে হবে। দু বেলা দু মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে সবাইকে নিয়ে। পাওনাদারদের পাওনা পরিশোধ করতে হবে। অনেক দায়িত্ব। এত দায়িত্বের ভারে মানুষ নুয়ে পড়ে, তবে সে শিরদাঁড়া সোজা করে রাখবে। সে নুয়ে পড়বে না, ভাঙবে না। গেট দিয়ে ঢোকার পরই একটা মেয়েকে দেখতে পেল। বাড়ির অভ্যন্তরে ঢুকছে মেয়েটা। হাতে বড়ো সাইজের কালো ব্যাগ। মেয়েটাকে রোশনির মতো মনে হচ্ছে কেন? এটা কি রোশনি? অয়ন ডাকলো,
“এই শুনুন।”

মেয়েটা দাঁড়ালো। পিছন ফিরে তাকাতেই চমকালো অয়ন। এটা তো আসলেই রোশনি! কিন্তু হাতে ব্যাগ কেন? রোশনি অয়নের সামনে এসে দাঁড়ালো। মাথা নিচু রেখে বললো,
“আমি চলে এসেছি।”

“মানে?”

“বাড়ি থেকে চলে এসেছি। আমি আর ফিরবো না ওখানে।”

রোশনির কথা যেন অয়নের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
“হ্যাঁ? কী বলছেন? আপনার কথা বুঝতে পারছি না।”

রোশনি বললো,
“মা আমার বিয়ের জন্য পাত্র দেখছে। কিন্তু আমি তো অন্য কাউকে বিয়ে করবো না। আমি তো আপনাকে ভালোবাসি। এই জন্য বাড়ি থেকে চলে এসেছি। ভালো করেছি না?”

অয়ন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। এই মেয়ে বলছে কী? মাথা ঠিক আছে? অয়ন এবার সামান্য মেজাজ খারাপ আচরণ করে বললো,
“পাগল আপনি? কী বলছেন এসব পাগলের মতো? এই কিছুক্ষণ আগে আপনার মা’র সাথে দেখা হলো। বাজার থেকে ফিরছেন তিনি। আমাকে দাঁড় করিয়ে যা নয় তাই কথা শোনালেন। বলেছে আমাকে জেলে দেবে। আর আপনি গাঁটরি-বোঁচকা নিয়ে আমার বাড়িতে চলে এসেছেন? আমায় মা’রতে চান?”

“মা’রতে চাইবো কেন? আমি তো…”

“থামুন। আপনাকে অনেক বুঝিয়েছি। আপনি কার্টুন। শোনেন এক কান দিয়ে, আরেক কান দিয়ে বের হয়ে যায় সব। বাড়ি যান। আপনার মা যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক করবে তাকে বিয়ে করুন। সুখী হবেন। আমায় ক্ষমা করুন প্লিজ।”
অয়ন হাত জোড় করলো।

রোশনি অবাক হচ্ছে। সে ভাবতো অয়ন তাকে মনে মনে পছন্দ করে। এবং অয়ন যখন শুনবে তার মা বিয়ের জন্য পাত্র দেখছে এবং সে বিয়ে করবে না বলে পালিয়ে এসেছে, তখন খুব খুশি হবে। কিন্তু অয়নের মাঝে তেমন কিছু তো নেই। তবে কি তার ভাবনারা ভুল? ভিত্তিহীন?
রোশনি বললো,
“আপনার জন্য আমি বাড়ি থেকে চলে এলাম, আর আপনি এরকম করে কথা বলছেন আমার সঙ্গে?”

অয়নের মনে হলো রোশনিকে রেগে গিয়ে কিছু বোঝানো যাবে না। মেয়েটা তাহলে অনেক আগেই এসব পাগলামি থামিয়ে দিতো। অয়ন এবার শান্ত মৃদু স্বরে বললো,
“আমার অভাবের ঘরে আপনাকে মানাবে না রোশনি। খুব ভালো স্বামী পাবেন আপনি, তা রেখে আমার জন্য কেন কাঁদবেন? আবেগ ফেলে একটু বিবেক দিয়ে ভাবুন। আমাকে ভালোবাসার কোনো কারণ নেই আপনার।”

“না থাক কোনো কারণ। তবুও আমি আপনাকে ভালোবাসি।”

“বাড়ি যান।”

“না, বাড়ি ফিরবো না আমি। মা জোর করে আমার বিয়ে দিয়ে দেবে!”

“আর আপনি বাড়িতে না গেলে আমাকে জেলে দিয়ে দেবে। আমার এখন জেলে গেলে চলবে না রোশনি। আমাকে অনেক কাজ করতে হবে, টাকা ইনকাম করতে হবে। আমার পাগলামি করার সময় নেই। ভালো থাকুন।”

অয়ন রোশনির পাশ কাটিয়ে চলে গেল। সব সময়ের মতোই অবজ্ঞা পেল মেয়েটা। কষ্টে তার গলা আটকে আসে। সে পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললো,
“তাহলে আপনি আমাকে সত্যিই ভালোবাসেন না?”

“না।”

রোশনি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রয় ঠাঁয়। এরপর ব্যাগপত্র নিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল। এই শেষ, আর কখনও আসবে না সে। যে মূল্য দেয় না, তার কাছে এভাবে ঝুলে থাকা যায় না।
রোশনি বাড়িতে চলে এলো। শায়লা বেগম রোশনিকে বাড়িতে না দেখতে পেয়ে পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। রোশনির হাতে ব্যাগ দেখে উনি নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। ভীষণ জোরে একটা থা’প্পড় মা’রলেন রোশনিকে। রোশনি থা’প্পড় খেয়ে শব্দ করলো না, গালে হাতও দিলো না। বাবার দিকে একবার তাকিয়ে রুমে চলে গেল।

____________________

বৃষ্টি নামার আগেই বেরিয়ে গেলেন পারভীন। আজ তিনি অফিসে যাননি, যাবেন না। এখান থেকে বাসায় যাবেন। এসেছিলেন বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে। বেশি দেরি করতে চান না। বিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হওয়াই ভালো।

পারভীন চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই আদিল কল দিলো।

“আমাদের বিয়ে কবে?” কল রিসিভের পরই আদিল এই প্রশ্ন করলো।

“আমি কীভাবে জানবো?”

“ওহ, জানেন না।”

এটুকু বলেই আদিল কল কেটে দিলো। রাত্রি বুঝতে পারছে না আদিল কী করছে। সে অপেক্ষা করলো এই ভেবে যে আদিল কল দিবে আবার। কিন্তু কল দিলো না। কল এলো শ্রাবণীর স্কুল থেকে। শ্রাবণীর ক্লাস টিচার কল দিয়েছেন। রাত্রিকে জরুরিভাবে স্কুলে ডাকলো। কী হয়েছে বললেন না।
রাত্রিকে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বের হতে হলো। খুব চিন্তা হচ্ছে। কী হয়েছে স্কুলে? শ্রাবণী কোনো ঝামেলা করেনি তো? আর ভালো লাগছে না। মেয়েটাকে ঝামেলা করতে নিষেধ করা হলেও শোনে না।

স্কুলে শুধু রাত্রিকে ডাকা হয়নি, আরও একজনের অভিভাবককে ডাকা হয়েছে। আসলে শ্রাবণী একজনের সঙ্গে প্রচণ্ড ঝগড়া করেছে। হাতাহাতি পর্যন্ত চলে যাচ্ছিল তাদের ঝগড়া। যার সঙ্গে ঝগড়া করেছে সেই মেয়েটার নাম রুমি। যে সব সময় উত্যক্ত করে শ্রাবণীকে। রুমিই স্যারদের কাছে এসে অভিযোগ করেছে শ্রাবণীর বিরুদ্ধে। শ্রাবণীকে টিসি দেওয়ার কথা পর্যন্ত হচ্ছিল। রাত্রি অনেক বুঝানোর পর শেষমেশ মানাতে পারলো স্যারদের। কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলার পর শ্রাবণীকে ক্ষমা চাইতে বলা হলো রুমির কাছে। কিন্তু শ্রাবণী জিদ ধরলো। সে কিছুতেই ক্ষমা চাইবে না। রাগ দেখিয়ে বের হয়ে গেল মিটিং রুম থেকে।
ক্লাস থেকে ব্যাগ নিয়ে এলো। আর এক মুহূর্ত থাকবে না এই স্কুলে। যেতে যেতে পানির বোতল থেকে পানি খেয়ে বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো স্কুলের মাঠে। আর ছুঁড়ে ফেলার সময় খুব ক্ষোভ নিয়ে বললো,
“আমি এই বা*র স্কুল ঘৃণা করি!”

(চলবে)#কালো_রাত্রির_খামে (২৮)
#লেখা: ইফরাত মিলি
___________________

“শ্রাবণী…শ্রাবণী দাঁড়াও।”

পিছন থেকে ডাকলো রাত্রি। শ্রাবণী গেটের সামনে থামলো। বাড়ির গেট। সে স্কুল থেকে আগে আগে চলে এসেছে, রাত্রি এসেছে পিছন পিছন। আকাশ ছিল এতক্ষণ গম্ভীর, এখন বৃষ্টি পড়ছে। ভিজে যাচ্ছে শ্রাবণী, ভিজছে রাত্রিও। রাত্রি সামনে এসে বললো,
“বেয়াদব হয়ে গেছো? এটা কেমন আচরণ করলে তুমি? তোমাকে কী বললাম আর তুমি কী করলে? অমনভাবে চলে এলে? আমি স্যারদের এত করে বলে মানালাম, আর তুমি সবকিছু শেষ করে দিলে! তোমাকে তো আসলেই টিসি দিয়ে দেবে এবার!”

“দিক, টিসি দিক। আমিও টিসি চাই। আমি আর পড়তে চাই না ওই ফালতু স্কুলে।”

“তাহলে কোন স্কুলে পড়বে তুমি? তোমাকে তো আর কোথাও ভর্তি করাবো না।”

“ঠিক আছে, আমি তাহলে কোথাও পড়বোই না।”

“পড়বে না মানে? অশিক্ষিত থাকবে?”

“হ্যাঁ, অশিক্ষিতই থাকবো, কী হবে লেখাপড়া করে? অন্যায় কি আমি একা করেছি? রুমি করেনি? রুমি নিজ থেকে আমার সঙ্গে ঝগড়া করেছে। কিন্তু দেখো ওর মা-বাবাকে কারো কাছে ক্ষমা চাইতে হয়নি। ওকেও আমার কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়নি, ওকে টিসি দেওয়ারও কথা ওঠেনি। সবকিছু হলো শুধু আমার বেলায়! দরিদ্রদেরই শুধু সবখানে মাথা নত করতে হয়। কেন করতে হয়? সব জায়গাতে আমরা অবহেলিত!”

রাত্রি বললো,
“চুপ করো তুমি, এসব শুনতে চাইছি না তোমার থেকে। তোমার এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। তোমাকে আগামীকাল স্কুলে নিয়ে যাব, সবার কাছে ক্ষমা চাইবে।”

“মরে যাব, তবুও ক্ষমা চাইবো না। দোষ আমি করিনি, ক্ষমা কেন তাহলে আমি চাইবো?”

রাত্রি শ্রাবণীকে দুই হাতের বেষ্টনে আলতো করে ধরে বললো,
“এমন করো না শ্রাবণী, জিদ ধরো না। তোমাকে ওই স্কুলে পড়তে হবে। ওটা ভালো স্কুল।”

“আমাদের কোনো কিছুই তো ভালো না, শুধু শুধু একটা ভালো স্কুলে পড়ে কী হবে? কোনো দরকার নেই। আমি ওই স্কুলের সঙ্গে মানানসই নই। আমি আর ওই স্কুলে যাব না। আমাকে মে’রে ফেললেও যাব না।”

রাত্রি শ্রাবণীকে ছাড়লো। বললো,
“বেশ, যেমন তুমি চাইবে। তোমাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করে দেবো।”

শ্রাবণী হাসার চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না।
রাত্রি শ্রাবণীকে দ্রুত বাসায় যেতে বললো, কিন্তু নিজে গেল না। হাত-পা অবশ লাগছে তার। অয়ন লেখাপড়া ছেড়ে দিলো, শ্রাবণীও স্কুল ছাড়তে চাচ্ছে! আর সে সবার সিদ্ধান্তকে মেনে নিচ্ছে। এখন যেন তার আর জোর খাটানোর ক্ষমতা নেই। জোর খাটাবেই বা কীভাবে? সবার সিদ্ধান্তই সবার দিক থেকে সঠিক।

উপর তলার আঙ্কল বাড়ি ফিরেছেন। তার মাথার উপর ছাতা। রাত্রি দাঁড়িয়ে আছে গেটের সম্মুখে। তিনি রাত্রিকে দেখে বললেন,
“আরে মা, ভিজছো কেন? আজকালকার বৃষ্টি তো ভালো না, ভিজলেই জ্বর হয়। মিনারা তো জ্বরে পড়ে গেছে।”

“চাচির জ্বর?”

“হ্যাঁ, তিনদিন যাবৎ। ঘরে যাও তাড়াতাড়ি।”

_________________

দুপুরের রোদের মাঝে রুফটপে বসে আছে শ্রাবণী। কাঁদছে সে, গতকাল স্কুলে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোর জন্য। তার পাশেই বসে আছে মিশাত।
কাল থেকে বেশ কয়েক বারই কান্না করেছে সে। সবার আড়ালে। আজ কেঁদে ফেললো মিশাতের সামনেই। খুব কষ্ট হচ্ছে তার। কাল থেকেই বুকের ভিতর কেমন এক হাহাকার হয়ে চলছে।

মিশাত বললো,
“কেঁদো না, যা হওয়ার হয়ে গেছে। ব্যাপারটাই এমন যে যারা গরিব তাদেরই নত স্বীকার করতে হবে।”

“গরিব হওয়াটাই কি আমাদের অন্যায় মিশাত ভাই? আজ আমি রুমিদের মতো হলে স্যাররা কি আমাকে টিসি দেওয়ার কথা বলতো? বলতো না। রুমিকে তো বললো না টিসির কথা।”

“এটা নিয়ে মন খারাপ করো না। সবই ভাগ্য।”

“আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম ওই স্কুলে মানিয়ে নিতে, কিন্তু ওই মেয়েগুলো আমাকে থাকতে দিলো না। ওরা নিশ্চয়ই এখন পৈশাচিক আনন্দ পাবে।”

“সেটা তোমার দেখার বিষয় নয়। তুমি তোমার মানসিক শান্তিটা খুঁজবে। তুমিও তাদের ছেড়ে এসে শান্তিতে থাকবে।”

শ্রাবণী আবার কেঁদে উঠলো,
“আপুকে সবার কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছে, এটা খুব অপমানজনক ছিল।”

“এখন তুমি এটা মনে ধরে বসে থাকবে?”

“এসব বিষয় সহজে ভোলার নয়।”

শ্রাবণী আরও কিছুক্ষণ কাঁদার পর শান্ত হলো। সিদ্ধান্ত নিলো আর কাঁদবে না সে। সব কথার শেষ কথা এটাই, সে ওই মেয়েগুলোকে ছেড়ে আসতে পেরেছে। এটা তার জন্য অনেক শান্তির।

____________________

পরশু বিয়ে। একদম পাকা কথা হয়ে গেছে। এখনকার যা পরিস্থিতি তাতে বিয়েতে অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। অনুষ্ঠান যদি করা হয় পরে কখনও করা হবে, আর করা না হলে তো না-ই।

রাত্রি কলিং বেল চাপলো। দরজা খুললো আদিল। রাত্রি ভিতরে ঢুকতে চাইলে তার সামনে এক হাত প্রসারিত করলো আদিল। রাত্রি কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বললো,
“এসব কী?”

“ভিতরে আসবেন কি-না ভাবুন। মালিহা বাসায় নেই।”

“কোথায় গেছে?”

“ওর বান্ধবীরা এসে নিয়ে গেছে ওকে।”

আজকে আসাটাই কি তবে বৃথা? মেয়েটা আজ বাসায় থাকবে না জানিয়ে যাবে না একবার? জানলে কী আর এখন কষ্ট করে আসতে হতো? আদিলও তো জানাতে পারতো কল করে। রাত্রি বললো,
“সেটা কল দিয়ে জানালেই তো পারতেন।”

“কল দিয়ে জানালে তো আর আসতেন না। এই যে দিনের বেলা রাত্রি দেখতে পেলাম, এটাও তো দেখা হতো না।”

“আচ্ছা, আমি এখন যাব। ভালো থাকুন।”

রাত্রি বেরিয়ে পড়লো। আদিলও দরজা টেনে রেখে রাত্রির পিছন পিছন আসতে আসতে বললো,
“আর একটা দিন পর আমাদের ঘরে নতুন মানুষ আসবে, জানেন?”

“না তো, কে আসবে?” রাত্রি বুঝতে পারলো না আদিলের কথা।

আদিল বললো,
“আমার বউ আসবে।”

রাত্রির এবার একটু লজ্জা লাগলো। আদিল বললো,
“আপনি আমার বউ দেখতে আসবেন তো রাত্রি?”

“না।”

“কেন?”

“কারণ ওইদিন আমাকে শ্বশুরবাড়িতে যেতে হবে।”

“ওহ, আপনারও বিয়ে?”

“হুম।”

“কার সঙ্গে?”

“আদিলের সঙ্গে।”

“আদিল? ওই পাগল ছেলেটা?”

“হুম।”

আদিল হেসে ফেললো। কিন্তু রাত্রির হাসি পাচ্ছে না। নানান চিন্তায় আজকাল সে যেন হাসতে ভুলে গেছে। চিন্তা নিয়ে হাসা যায় না। আজ তানবীনের মামার সঙ্গে তাকে দেখা করতে হবে। এরপর তানবীনের সঙ্গে।
আদিল রাত্রিকে অন্যমনস্ক লক্ষ করে বললো,
“আপনি কিছু ভাবছেন?”

“না।”

“তানবীনের কথা ভাবছেন না কি?”

রাত্রি দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললো,
“জানি না।”

আদিল বললো,
“আমি খুব করে চেয়েছিলাম তার সঙ্গে আপনার বিয়ে না হোক, কিন্তু তাই বলে এমনভাবে বিয়েটা বন্ধ হোক তা কখনও চাইনি। তার জন্য কষ্ট লাগছে।”

রাত্রি কিছু বললো না। আদিলও আর কোনো কথা বললো না। বাড়ির ভিতরের জবা গাছ থেকে একটা জবা ছিঁড়লো। রাত্রির দিকে সেটা বাড়িয়ে দিলেই নিতে অসম্মতি জানালো রাত্রি। আদিল জোর করে ফুলটা রাত্রির হাতে দিয়ে বললো,
“আপনার ভাবনায় অন্য কারো উপস্থিতি আমায় খুব হিংসুটে বানিয়ে দেয় রাত্রি। ভালোবাসলে কি এমন হিংসুটে হওয়া বাধ্যতামূলক?”

রাত্রি অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিলো,
“জানি না।”

“কখনও জানতে পারলে আমাকে জানাবেন।”

“আচ্ছা।”

রাত্রি চলে যায়। পথে যেতে যেতে তার মনে হয়, ভালোবাসলে হিংসা ব্যাপারটা আপনা থেকেই এসে যায়। তবে এই হিংসা খারাপ নয়, এই হিংসা ভালো।

___________________

তানবীনের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছাটা পূরণ হলো খুব কষ্টে। মামা প্রথমে চাইছিলেন না রাত্রির তানবীনের সঙ্গে দেখা হোক। তিনি বলেছিলেন, তানবীনের সঙ্গে এখন দেখা করাটা ঝামেলার। আর দেখা করলে তানবীনেরও মন খারাপ হবে। কিন্তু পরে আবার কী মনে করেই ফোন করে ডাকলেন। হয়তো তুরিনকে দেখা করাতে নিয়ে এসেছেন বলে রাত্রিকেও একবার দেখা করার সুযোগ দেবে ভেবেছেন।

তানবীনের সামনে দাঁড়িয়ে রাত্রির সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। কী বলবে, কী করবে কিছু বুঝতে পারছে না সে। চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত তার জড়তা। কিন্তু তানবীনের জড়তা নেই। সে তাকিয়ে দেখছে রাত্রিকে। তুরিনের সঙ্গে আগেই কথাবার্তা সেরেছে। রাত্রি একবার তার দিকে তাকিয়ে বললো,
“কেমন আছেন আপনি?”

তানবীন বললো,
“মাকে ভীষণ মিস করি! মা আর তুরিনের সঙ্গ ছাড়া একদম ভালো লাগে না! বাবাকেও মিস করি!”

রাত্রির খুব কষ্ট হচ্ছে এসব শুনে। কিছু বলতে পারলো না সে। একটুক্ষণ পর বললো,
“আগামীকাল আমার বিয়ে।”

মনে ভীষণ ধাক্কা লাগলেও তানবীন মুখে হেসে বললো,
“শুভকামনা রাত!”

“বিয়েটা আপনার সঙ্গে হওয়ার কথা ছিল।”

“পৃথিবীতে কত কথাই তো মানুষের দেওয়া-নেওয়ার থাকে। সব কথা কি রাখা যায়? কিছু কথা বৃথা হয়ে যায়, কিছু কথা বৃথাই বলা হয়।”
একটু থেমে বললো,
“বিয়ে কি তার সঙ্গে?” আদিলের কথা বললো তানবীন।

রাত্রি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
তানবীন বললো,
“তুমি তারই ভাগ্যে লেখা ছিলে রাত, আমি মধ্যে থেকে শুধু শুধু তোমায় স্বপ্ন দেখতাম। তোমাকেও প্রায় স্বপ্ন দেখিয়ে ফেলেছিলাম। দুঃখিত সেজন্য। আমি বুঝতে পারিনি আমার ভাগ্য এতটা খারাপ হয়ে উঠবে।”

“এরকম বলবেন না, আপনার কোনো দোষ ছিল না। আপনার কোনো দোষ নেই।”

তানবীন মাথা নত করে ফেললো। কয়েক সেকেন্ড অমন দাঁড়িয়ে থেকে আবার মাথা তুলে বললো,
“নিজের জীবন গুছিয়ে নাও। আমার কথা ভাবার দরকার নেই। আমার জন্য আর চোখের জল ফেলবে না। খুব ভালো থেকো আদিলের সঙ্গে। ভালোবেসো তাকে।”

রাত্রির বাম চোখ থেকে স্বচ্ছ বারি ধারা নেমে গেল। তানবীন অবশ্য তা খেয়াল করলো না। সে বললো,
“যখন আমি এখান থেকে বের হবো, ততদিনে তোমার বাচ্চাও বড়ো হয়ে যাবে। বাচ্চার মা কি অত সময় পর মনে রাখবে আমাকে?”

“নিশ্চয়ই রাখবে।” বলতে গিয়ে এবার প্রকাশ্যেই কেঁদে ফেললো রাত্রি।

তানবীন বললো,
“কাঁদছো তুমি? এত কান্নার মূল্য কীভাবে দেবো? কান্না খুব দামি, সহজে মূল্য চুকানো যায় না। তুমি কেঁদো না রাত, কষ্ট হচ্ছে আমার।”

রাত্রির কান্না থামলো না। মনে হচ্ছে এই মানুষটাকে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করা অন্যায়। কিন্তু কিছু করার নেই। তাকে তার বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। আবেগকে সব ক্ষেত্রে প্রশ্রয় দেওয়া অনুচিত। ওদিকে তানবীনের সঙ্গে কথা বলার সময় শেষ। আর কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলো না। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বেরিয়ে আসতে হলো বাইরে। চারিদিকে যেন বিষাক্ত বাতাস ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছু ভালো লাগছে না।
রাত্রিকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেলেন জামাল হোসেন। তিনিও বিয়ের জন্য শুভকামনা জানালেন।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here