জলপদ্ম পর্ব -০১

#জলপদ্ম
#কুরআতুল_আয়েন

|১|
তনু আপুর গা’য়ে হলুদে রক্তিম ভাই আর উনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অতিমাত্রায় সুন্দর মুখশ্রীর মেয়েটিকে দেখে আমি যেনো চমকে উঠি।আমি তো শুনেছিলাম রক্তিম ভাই তনু আপুর বিয়েতে আসতে পারবেন না।উনার ভার্সিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে।তাহলে এখন এলেন কীভাবে!আমার এইসব ভাবনার মাঝেই রিমি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।আমাকে দেখেই চিৎকার করে বললো,

‘রিমঝিম এই সবুজ শাড়িটাতে যে তোকে কি সুন্দর লাগছে।ইশশ!আমি যে কেনো হলুদ শাড়ি পড়তে গিয়েছিলাম।’

আমি রিমির কথায় তেমন একটা পাত্তা দিলাম না।আমার চোখ যে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে আছে রক্তিম ভাই আর সেই মেয়েটির উপর।কে এই মেয়ে যার সাথে রক্তিম ভাই এতো হেসে হেসে কথা বলছেন।কই!আমার সাথে তো একটিবারও এইভাবে হেসে কথা বলেন না!তার,চেয়ে বড় কথা উনি তো আমাকে সহ্যই করতে পারেন না।কেনো যে রক্তিম ভাই আমার উপর রাগ দেখান তা আমি একদন্ডও বুঝতে পারি না।এখনো তাকিয়ে দেখি রক্তিম ভাই আর ওই মেয়েটি হেসে হেসে কথা বলছে।শুধু তাই নয়,মেয়েটা যেনো রক্তিম ভাইয়ের উপরে ঢলে পড়বে।যখন কল্পনায় ভেসে উঠলো মেয়েটি রক্তিম ভাইয়ের উপর ঢলে পড়েছে তখনি আমার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেলো।ভিতরে ভিতরে তৈরি হলো অসহনীয় এক ব্যথা।আর,না পেরে রিমির দিকে তাকিয়ে বললাম,

‘রিমি!রক্তিম ভাইয়ের তো আসার কথা ছিলো না তনু আপুর বিয়েতে।তাহলে,আজকে এলেন কীভাবে।’

‘ভাইয়ার নাকি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস নেই।তাই চলে এসেছে।’

আমি শুধু ছোট করে উত্তরে বললাম,

‘ওহহ!’

তাও,আমার মন কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।রক্তিম ভাইয়ের পাশে এই মেয়েটিকে আমার কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না।তার থেকে বেশি অসহ্য লাগছে রক্তিম ভাইয়ের হাসি দেখে।উনার এই হাসিতে যে আমি কতোবার কপোকাত হয়েছি!! আর আজকে,উনার এই হাসিই আমার কাছে বিষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।উনার দিকে তাকিয়েই রিমিকে ক্ষিপ্ত হয়ে বললাম,

‘উনার পাশে এই মেয়েটি কেরে!’

রিমির সোজাসাপ্টা উত্তর,

‘ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড।এমনকি,একটু আগে শুনে আসলাম তনায়া আপুর মুখে মা’র নাকি তারিন আপুকে বেশ পছন্দ হয়েছে।ভাইয়ার বউ করলে নাকি তারিন আপুকেই করবে।’

আমি অবাক হয়ে বললাম,

‘তারিন আপুটা আবার কে!’

রিমি এবার বেশ বিরক্ত হলো।তার মুখ দেখেই বুঝতে পারলাম।আমার কথার পিঠে দাঁত চেপে বললো,

‘তুই এতোক্ষণ যেই মেয়ের কথা জানতে চাইলি সেই মেয়েটার নাম তারিন।মানে আমার ভাইয়ার হবু বউ আর আমার হবু ভাবি।বুঝেছিস গাধী!’

বলেই,রিমি চলে গেলো।আর আমি হাবলার মতো রিমির যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলাম।মুহুর্তেই চোখের কোণে পানি চলে আসলো।রক্তিম ভাই প্রেম করেন তা আমার ধারণার বাহিরে ছিলো।উনার পার্সোনালিটি দেখে তো এইরকম মনে হয় নি।এ্যাঁ!কি ভাব দেখাতো উনি।আর,তলে তলে এতো কিছু।

আর,কিছু না ভেবে ধপাধপ পা’য়ে ছাঁদ থেকে নেমে আসলাম।পিছন থেকে তনু আপুর গলার আওয়াজ শুনা যাচ্ছিলো তাও আমি পাত্তা না দিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

ফুপির বাসাটা মফস্বল এলাকাতে হলেও বেশ জাঁমকালো।তনু আপুর বিয়েতে যেনো বাড়ি টা আরো জমজমাট হয়ে গিয়েছে।ফুপি আর ফুফা তাদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে যেনো তেনো ভাবে দিতে চান না।তাই তো,তনু আপুর বিয়েতে ফুফা উনাদের এলাকার সবাইকে দাওয়াত করেছেন।বাড়িটার সামনেই চিকন সরু একটা রাস্তা।রাস্তাটার চারপাশে সবজির বাগান করেছেন ফুফা।সবজির বাগানের মাঝখানে বাঁশের উপর বাঁধা একটা লাইট জ্বলজ্বল করছে।সেই লাইটের আলোয় রাস্তার কিছু অংশ দেখতে সক্ষম হয়েছি।সবাই ছাঁদে মজা করতে ব্যস্ত আর আমি এইখানে বসে দুঃখবিলাস করতে ব্যস্ত।হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি মেহেদী দিতেই ভুলে গিয়েছি।মন টা যেনো আরো খারাপ হয়ে গিয়েছে।কতোকিছু ভেবেছিলাম,তনু আপুর বিয়েতে কতো মজা করবো আর এখন কষ্ট পেতে পেতে তব্দা হয়ে যাচ্ছি।আর কিছু না ভেবে,ড্রয়ার থেকে একটা মেহেদী নিয়ে বিছানার মাঝখানে বসে পড়লাম।মেহেদী দেওয়ার মাঝখানেই আমার ফোন টা বেজে উঠলো।ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আমার চোখ দুটো মনে হয় ছানাবড়া হয়ে গিয়েছে।মেহেদী রেখে ফোন টা হাতে নিয়ে মেসেজ টা ওপেন করলাম।ফোনের স্ক্রিনে পরিষ্কার ভাবে ভেসে উঠেছে,

‘সবুজ রঙ টায় যে তোমাকে এতো সুন্দর লাগবে তা ভাবতেই পারি নি।এই বেশে আমার সামনে এসে একদম ঠিক করো নি।আমার বেহায়া চোখ দুটো এখন শুধু তোমার দিকেই থাকবে।তবে কি জানো!!সবুজ রঙ টা বরাবরই আমার কাছে খুব অপছন্দের ছিলো।কিন্তু,আজ থেকে এই রঙটা আমার কাছে প্রিয় হয়ে গিয়েছে।’

আমি কতোক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইলাম মেসেজ টার দিকে।কে হতে পারে তাই ভাবছি।আমার জানামতে,আমার নাম্বার পরিবারের লোকজন আর ফ্রেন্ডস দের ছাড়া কারোর কাছেই নেই।বিষয় টা খুব জটলা লাগছে আমার কাছে।হঠাৎ চোখ পড়লো,মেহেদী টার দিকে।এইসব ভাবনা বাদ দিয়ে তাড়াহুড়ো করে বাকি অর্ধেক মেহেদী টা হাতে লাগিয়ে ছাঁদের উদ্দেশ্য পুনরায় রওনা দিলাম।কয়েক সিঁড়ি আগাতেই বেজে গেলো বড়সড় একটা বিপত্তি।শাড়ি এপাশ ওপাশ হয়ে পেট থেকে অনেকটা সরে গিয়েছে।সেই সাথে সেইফটিপিনও নিচে পড়ে গিয়েছে।রাগে,দুঃখে আমার কান্না করে দেওয়ার উপক্রম।এতো সুন্দর করে শাড়িটা পড়লাম আর গা’য়ে হলুদ শেষ হতে না হতেই শাড়ি পড়াও ভেস্তে গেলো।নিচু হয়ে যখন সেইফটিপিন টা হাতে নিবো তখনই সামনে কারোর ছাঁয়া দেখতে পেয়ে কিছুটা ভয় পেয়ে যাই।দ্রুত গতিতে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলাম।সেই সাথে শাড়িটাও যেনো আরো সরে গিয়েছে পেট থেকে।সামনে রক্তিম ভাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি থতমত খেয়ে গিয়েছি।একবার নিজের দিকে তাকাচ্ছি তো আরেকবার রক্তিম ভাইয়ের চোখের দিকে।রক্তিম ভাইয়ের চোখ যে সোজাসুজি আমার পেটের দিকে পড়েছে তা বুঝতে পেরেই আমি উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।গুটিগুটি পা’য়ে এখান থেকে যেতে নিলেই রক্তিম ভাই আমাকে আটকে দিলেন।আমি শুধু নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।একটু পর অনুভব করলাম রক্তিম ভাই আমার ইনারের ফিতা টা ধরে আছেন।ইশশ!কখন যে ব্লাউজের আস্তরণ থেকে বেরিয়ে আসলো তা বিন্দুমাত্র টের পায়নি।বেশ লজ্জা আর অস্বস্তি হচ্ছে।রক্তিম ভাইয়ের মুখোমুখি হতে খুব দ্বিধা কাজ করছে।রক্তিম ভাই ফিতা টা ধরে যখন আরেকটু জোরে টান দিলেন তখন আমি রক্তিম ভাইয়ের কিছুটা কাছে চলে যাই।কিছুক্ষণ এইভাবে টেনে ধরে আচমকাই ছেড়ে দিলেন,তখনি ঠাস করে এসে আমার পিঠে বাড়ি খেলো ইনারের ফিতা টা।আমার মুখ দিয়ে আচমকাই “আহহ” শব্দ টা বেরিয়ে আসলো।রক্তিম ভাই আমাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলেন,

‘এইটা কি তোর নিউ কালেকশনের ব্রা!!ওইদিন সামনের মোড়ের মার্কেট থেকে যে কিনেছিলিস নেটের ওইটা নাকি!নিউ কালেকশন বলেই কি ফিতা বের করে রেখেছিস।যাতে সবাই তোর দিকে তাকায়।আচ্ছা!তুই কি ব্রা’র ফিতা দেখিয়ে দেখিয়ে বিয়ে বাড়ির সবাইকে পাগল করার ধান্দা করছিস নাকি।তুই তো ধান্দা বাজ রে রিমঝিম।আর,ব্লাউজের গলা এতো বড় কেনো।ছি ছি!আমার বংশের মান-সম্মান ডুবিয়ে দিবি তো তুই।’

আমি কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছি না।শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি রক্তিম ভাইয়ের দিকে।কি কথার ছিরি উনার।আমি কিছু না বলে চলে আসতে নিবো তখনি উনি আমার হাত ধরে নিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বললেন,

‘বাপরে!শাড়িও পড়েছিস দেখছি।এইটা কি একটা কালারের শাড়ি পড়লি রিমঝিম।কেমন গু গু কালার।ছোট বাচ্চারা অনেক সময় সবুজ কালারের পায়খানা করে ঠিক সেইরকম কালার টা।তুইও তো ছোটবেলায় করেছিলিস।একদম এই কালার টা এসেছিলো।বাহ্!তোকে দেখতে একদম গু গু লাগছে।মানে,সেইরকম একটা ফ্লেভার পাচ্ছি।এই রিমঝিম দূরে যা তো আমার থেকে,তোর কাছ থেকে কেমন গু গু গন্ধ পাচ্ছি।’

রক্তিম ভাইয়ের কথা শুনে আমি যেনো আকাশ থেকে পড়লাম।ভিষণ রাগ হচ্ছে উনার উপর।বরং,তার চেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে ওই মেসেজটার উপর।কারণ,ওই মেসেজেই তো লিখা ছিলো আমাকে এই সবুজ রঙটায় ভিষণ সুন্দর লাগছে।কোনোদিন যদি ওই আগুন্তকঃ ব্যক্তিটিকে আমার চোখের সামনে পাই তাহলে একদম খবর করে ছাড়বো।সেখানে আর দাঁড়িয়ে না থেকে নিচে নেমে আসার জন্য পা বাড়াতেই রক্তিম ভাই আমার কোমর টা নিজের সাথে চেপে ধরে নিলেন।এমতাবস্থায় বললেন,

‘কি তেজ বাপরে!আমার বংশের মেয়েদের তো এতো তেজ মানায় না।তাই,তোর তেজের ফুটানি আমার সামনে চলবে না।’

আমি নাক ফুলিয়ে বললাম,

‘সমস্যা কি আপনার রক্তিম ভাই।তখন থেকে কি যা তা বলছেন।ছাড়ুন আমাকে।আমি আপনার বোন হই।’

‘শোন রিমঝিম!এইরকম গু কালারের ফ্লেভারের কোনো বোন আমার দরকার নেই।তোর থেকে,রিমি আর তনায়া হাজার গুনে ভালো।’

‘আমি যেহেতু ভালো নই তাহলে,আমার সাথে এইভাবে চিপকে আছেন কেনো।যত্তসব!’

‘বুঝলি রিমঝিম মানুষের ভালো করতে নেই।তোকে তো আমি এইভাবে চেপে ধরেছি যাতে তোর পেট কারোর চোখে না পড়ে।এইরকম চর্বিওয়ালা পেট দেখলে মানুষ দৌড়ে পালাবে।তুই কি খুব খাস নাকি!তোর পেট এমন বাড়ছে কেনো!তার চেয়ে বড় কথা তুই তো একটা বেশরম মহিলা।’

রাগে আমার শরীর শিরশির করে উঠলো।দু’হাত দিয়ে রক্তিম ভাইয়ের বুকে বেশ জোরেই একটা ধাক্কা মারলাম।এতে,রক্তিম ভাই কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছেন।ধাক্কা মেরে আমার মাথায় কাজ করলো আমার হাতে তো মেহেদী ছিলো।তাকিয়ে দেখি আমার হাতের মেহেদী লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে।সেই সাথে রক্তিম ভাইয়ের শুভ্র সাদা পাঞ্জাবি টাও।পিটপিট করে রক্তিম ভাইয়ের দিকে তাকালাম।উনার রক্ত বর্ণ চোখ গুলো দেখে আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম।উনি আমার দিকে ধপাধপ্ পা’য়ে এগিয়ে এসে বললেন,

‘আমার দু’হাজার টাকার দামের পাঞ্জাবি টা নষ্ট করে দিলি তুই।টাকা কি গাছে ধরে নাকি।আমার ইনকামের টাকায় কিনেছিলাম।আর,তুই কিনা আমার পাঞ্জাবি টার বারোটা বাজিয়ে দিলি।’

রক্তিম ভাইয়ের কথা শেষ হতে না হতেই আশপাশ না তাকিয়ে দিলাম এক দৌড়।এইখানে থাকা আর একদন্ডও চলবে না।রক্তিম ভাইয়ের সামনে তো মোটেও না।
—-
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সবাই প্রায় রেডি হয়ে গিয়েছে।শুধুমাত্র আমিই বাদ আছি।রিমি চোখে মাশকারা দিতে দিতে আমার দিকে তাকালো।আমি কাঁদো কাঁদো মুখ করে রিমিকে বললাম,

‘আমি কি তোর এতোই পর হয়ে গেছি যে আমাকে ঘুম থেকে জাগালিও না।একা একা রেডি হয়ে নিলি।’

রিমি ভ্রু কুঁচকে বললো,

‘তোকে সেই কখন থেকে ডাকছি তোর উঠার কোনো নামগন্ধ নেই।তাই আমরা রেডি হওয়া শুরু করে দিয়েছি।’

আমি রিমিকে কিছু না বলে কাপড় আর ব্রাশ নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় লাগালাম।তবে,লাভের লাভ কিছুই হলো না।ওয়াশরুমে তনায়া আপু গোসল করছে।কিছুক্ষণ বসে থেকে যখন দেখলাম তনায়া আপুর বের হওয়ার কোনো লক্ষ্মণ নেই তখনি জামা কাপড় আর ব্রাশ নিয়ে পুকুর পাড়ের দিকে এগিয়ে গেলাম।সেখানে গিয়েও শান্তি নেই!রক্তিম ভাই আর আবির ভাই পুকুরের ঘাটে বসে আছেন।আমাকে যেতে দেখে আবির ভাই বললো,

‘কিরে রিমঝিম!তুই এখানে কেনো!হাতে কাপড়চোপড় নিয়ে এসেছিস।তুই কি পুকুরে গোসল করবি!’

আমি মাথা নাড়িয়ে জবাবে বললাম,

‘হ্যাঁ!ওয়াশরুম বুকিং হয়ে গিয়েছে।তোমার বোন আধঘন্টা যাবত ধরে ওয়াশরুমে আছে।তাই তো আমি বাধ্য হয়ে এইখানে এসেছি।’

আমার কথা শুনে আবির ভাই দাঁড়িয়ে পড়লো।কিছুটা সন্দেহের গলায় বললো,

‘এতোক্ষণ ধরে তনায়া কি করছে ওয়াশরুমে।ডাল মে কুচ কালা হ্যায়!আমি সিউর ও ওয়াশরুমে ফোন নিয়ে গিয়েছে।ব্যাপার টা দেখতে হচ্ছে তো।ওই রক্তিম তুই থাক আমি গেলাম।’

আবির ভাই চলে যেতেই আমি পুকুরের শেষ সিঁড়ি টার দিকে এগিয়ে গেলাম।রক্তিম ভাইয়ের দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করি নি।যা মন চায় তাই করুক।তাতে আমার কি।সিঁড়িতে বসে পা দুটো পুকুরের পানিতে মেলিয়ে দিলাম।পা দুটো নাড়াচ্ছি আর ব্রাশ করছি।এমন একটা ভাব করছি যেনো এইখানে আমি একাই আছি।আর কেউ নেই।ব্রাশ করা শেষে যখন মাথায় মগ দিয়ে পানি ঢালতে যাবো তখনেই রক্তিম ভাই চেঁচিয়ে উঠলেন।আমি ভয়ে পিছন ফিরে তাকালাম উনার দিকে।উনি আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,

‘এখানে তুই কোন সাহসে গোসল করতে এসেছিস।তাও আবার গেঞ্জি আর ট্রাউজার পড়ে।তোর কি মাথা খারাপ রিমঝিম।ও আমি তো ভুলেই গেছিলাম,তুই একটা বেশরম মহিলা।মানুষকে শরীর দেখিয়ে নিজের কাছে আনার ধান্দা করিস।আই রিপিট রিমঝিম!আমার বংশের এমন বদনাম আমি হতে দিবো না।শিগগির!!বাড়ির ভিতরে যা।’

আমি রক্তিম ভাইয়ের কথা পাত্তাই দিলাম না।মুখ ভেঙচি মেরে সামনে ফিরে মাথায় পানি ঢালার আগেই রক্তিম ভাই আমাকে টেনে উপরে তোললেন।হাতের কব্জির টাকে এমনভাবে ধরেছেন মনে হয়,আমার এই জায়গা টা লোহা।আর,আমি এদিকে ব্যথায় কুঁকড়িয়ে যাচ্ছি।আমাকে উনার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে বললেন,

‘বলেছি না!বাড়ির ভিতরে যেতে।তাও,এখানে কেনো বসে আছিস।আমার কথা কি কানে যায় না তোর।’

‘পুকুরে তো মানুষ গোসল করে রক্তিম ভাই।আমি করলে কি এমন হয়।আর,ওয়াশরুম তো ফাঁকা নেই কীভাবে যাবো তাহলে আপনিই বলুন।’

রক্তিম ভাই কিছু বলার আগেই কোথা থেকে তারিন আপু এসে রক্তিম ভাইয়ের একহাত জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে আটকে রাখলেন।তারিন আপুকে দেখে রক্তিম ভাই আমাকে ছেড়ে দিয়ে নিজেকে ঠিক করে নিলেন।তারিন আপু আমার দিকে বিরক্তির দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন।যা আমার চোখ এড়ায়নি।রক্তিম ভাই তারিন আপুকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

‘তোর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো তারিন।’

তারিন আপু রক্তিম ভাইয়ের কথায় মিষ্টি হেসে বললেন,

‘যেখানে তুই আছিস সেখানে আমার কোনো অসুবিধা হতেই পারে না।সারাটা জীবন আমি তোর সাথে গাছের নিচেও কাটিয়ে দিতে পারবো।’

রক্তিম ভাই শুধু মুচকি হাসলেন।যা দেখে আমার ভিতরে গড়া রক্তিম ভাইয়ের জন্য সুপ্ত অনুভূতি এক নিমিষেই তিক্ত অনুভূতিতে পরিণত হয়ে গিয়েছে।তাদের দিকে একবার তাকিয়ে আমি সোজা পুকুরে গিয়ে নেমে পড়লাম।একের পর এক ডুব দিতেই লাগলাম।কয়েক দফা ডুব দিয়ে আমি এই ভিজা শরীর নিয়ে রক্তিম ভাই আর তারিন আপুর সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ির পিছন দিয়ে চলে আসলাম।একপ্রকার রাগ দেখিয়েই দরজা টা বন্ধ করে দিলাম।
—-
লেহেঙ্গা পড়তে গিয়ে পড়লাম আরেক বিপদে।লেহেঙ্গার ব্লাউজ টা যে এতো ছোট হয়ে যাবে তা নিতান্তই আমার অজানা ছিলো।তাও,কোনো রকম পড়ে নিয়েছি।তনু আপুকে সাজানোও কমপ্লিট হয়ে গিয়েছে।একটু পরেই বরের বাড়ির লোকজন চলে আসবে।সবাই উঠোনে থাকলেও আমি রুমের ভিতরে আছি।তার কারণ একটাই,আমি রক্তিম ভাইয়ের সামনে কিছুতেই পড়তে চাই না।সারাঘর জুঁড়ে পায়চারী করছি।যখন বাহির থেকে বর আসার আওয়াজ পেলাম তখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না।দরজা খুলে বাহিরে এসে দেখি দরজার সামনে রক্তিম ভাই দাঁড়িয়ে আছেন।চোখ,মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে উনি রেগে আছেন।আমাকে দেখেই উনি হিসহিসিয়ে বললেন,

‘তোর বাহিরে যেতে হবে না।দরজা বন্ধ করে বসে থাকবি।’

আমি বাজখাঁই কন্ঠে বলে উঠলাম,

‘মানে!তনু আপুর বিয়েতে আমি উপস্থিত থাকবো না?কিন্তু কেনো?কাল গা’য়ে হলুদেও আপনার জন্য থাকতে পারি নি আর আজ বিয়েতেও।’

‘তোর এইরকম খুল্লাম খুল্লাম ড্রেস নিয়ে বিয়ের ওইখানে যাওয়ার দরকার নেই।নিজেকে একবার আয়নায় দেখেছিস তুই!!’

‘দেখেছি তো!কি হয়েছে এখন!’

রক্তিম ভাই কোনো কথা ছাড়াই আমাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরলেন।রাগান্বিত গলায় বলতে শুরু করলেন,

‘যেগুলো দেখার অধিকার শুধু আমার সেগুলো অন্যকেউ কেনো দেখতে যাবে।আর,আমি থাকতে কেনোই বা তা হতে দিবো।আমি,আমার জিনিস কারোর সাথে ভাগ করিনা রিমঝিম।’

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম রক্তিম ভাইয়ের দিকে।উনার কথার আগামাথা কোনো কিছুই বুঝলাম না।এইসব কথা বাদ দিয়ে নাছোড়বান্দা হয়েই বললাম,

‘আমি বিয়েতে যাবো মানে যাবোই।’

আমার কথায় যেনো রক্তিম ভাই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন।কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন,

‘ওকে!তোকে আমি যেতে দিবো।তবে,একটা শর্ত আছে।সেই শর্ত টা মানতে পারলেই তুই যেতে পারবি।’

আমিও সাথে সাথে বললাম,

‘কি শর্ত রক্তিম ভাই।তাড়াতাড়ি বলুন।’

‘তোকে ফুফার একটা ফতোয়া পড়ে যেতে হবে।লেহেঙ্গার এই ব্লাউজ পড়ে যাওয়া যাবে না।’

আমি চোখ দুটো বড় বড় করে ফেললাম।একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে বললাম,

‘আমি কখনোই পারবো না রক্তিম ভাই।আপনি আমাকে হাসির পাত্রী করতে চাইছেন আমি বুঝতে পারছি।’

‘তাহলে,বিয়েতে যাওয়ার কথা মাথা থেকে বাদ দিয়ে দে।এখানেই বন্দী হয়ে থাক।’

আমি হাজার বাহানা দিয়েও রক্তিম ভাইয়ের মন গলাতে পারলাম না।আর,তনু আপুর বিয়েতেও যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে পড়লাম।অবশেষে,বাধ্য হয়েই রক্তিম ভাইয়ের কথামতো লেহেঙ্গার ব্লাউজের উপর ফুফার একটা ফতোয়া পড়ে বিয়ে পড়ানোর জায়গায় চলে গেলাম।আমাকে দেখে যেনো চারপাশে হাসির রোল পড়ে গিয়েছে।আর,আমি শুধু লজ্জায় কাচুমাচু করছি।বরযাত্রীর প্রতিটি মানুষ আমাকে নিয়ে ঠাট্টা,মশকরা করছে।অপমানে আমার চোখ দুটো যেনো অন্ধকার হয়ে আসছে।রক্তিম ভাইয়ের দিকে একরাশ অভিমান নিয়ে তাকালাম।উনি দিব্বি সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছেন।মনে মনে পণ করে নিলাম আর যাবো না রক্তিম ভাইয়ের সামনে।যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে চলবো।

চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here