ফিলোফোবিয়া পর্ব -০৯

ফিলোফোবিয়া

ঊর্মি প্রেমা (সাজিয়ানা মুনির )

( কার্টেসি ছাড়া কপি নিষেধ)

‘ আমি তোমাকে পার্সোনালি সরি বলতে এখানে ডেকেছি। শুনলাম, আমাকে নাকি ভীষণ অপছন্দ করো?’
সমুদ্রের কথায় ভীষণ লজ্জা পেল প্রিয়। আড়চোখে তানহার দিকে তাকালো। নিশ্চয়ই তানহা বলেছে সব! রাগ হচ্ছে ভীষণ। এখন তাদের কি করে বুঝাবে? ভ্রান্তিতে পড়েছিল সে। সমুদ্রকে শতাব্দ ভেবে এসব বলেছে!
সমুদ্র ফুরফুরে মেজাজে আবার জিজ্ঞেস করল,
‘ আমাদের কোন ঝামেলা হয়েছিল কি? আমার তো মনে পড়ছেনা প্রিয়।’
কি বলবে বুঝে উঠতে পারছেনা প্রিয়। কথা এড়াতে বুদ্ধি আটল। অকপট কন্ঠে বলল,
‘সেদিনের জন্য সরি ভাইয়া। আমার কারণে আপনাদের পিকনিকটা নষ্ট হলো।’
‘ তুমি সরি বলছ কেন? সরি আমরা বলবো। শাদ বাঁদরামি না করলে এসব হতো না সেদিন।’
‘মানে’ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল প্রিয়।
‘ শাদ বাহির থেকে দরজা আটকিয়েছিল সেদিন। মা আর ভাইয়ের আশকারা পেয়ে পেয়ে ছেলেটা দিনদিন বাঁদরামোর মাত্রা ছাড়াচ্ছে। যদিও এবার ছাড় দেয়নি ভাই। পরের দিন সকালে বেশ কড়া করে শাসিয়েছে। ওর সাথে টোটালি কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।’
হতভম্ব প্রিয়। এতকিছু জানতো না সে। সেদিনের ঘটনাটা এক্সি*ডেন্ট ভেবে নিয়েছে। আবার সমুদ্র বলল,
‘ শাদের ওই বা*জেভাবে ফাইজলামোর জন্য মন থেকে সরি।’
‘ তার দরকার নেই কোন।’
‘ দরকার নেই বলছ কেন? অন্তত আমার থেকে সরি ট্রিট তো নিতেই পারো।’
‘ সরি ট্রিট?’
অবাক কন্ঠে বলল প্রিয়। হেসে ফেলল সমুদ্র। বলল,
‘ হ্যাঁ, সরি ট্রিট। গ্রহণ করতে হবে অবশ্যই।’
মৃদু হাসল প্রিয়। সমুদ্রের জোরাজোরিতে ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়াল। কিছু একটা ভেবে জিজ্ঞেস করল সমুদ্র,
‘আচ্ছা প্রিয়! আমাকে তোমার অপছন্দ কেন? বললা না তো!। তোমার বান্ধবী রোজ কথা শোনায়। কারণটা কিন্তু আজ বলতে হবে আমায়!’
তানহা চোখমুখ অন্ধকার করে নিলো। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
‘ নিশ্চয়ই কিছু করেছ। নয়তো অপছন্দ করবে কেন?’
‘ আমি সত্যি কিছু করিনি।’ দুর্বল স্বরে উত্তর দিলো সমুদ্র।
তানহা মানলো না। ঠোঁট বাকিয়ে ভেঙ্গচি কাটল। দুজনের মধ্যকার দুরত্বটা আরো বাড়ালো। দূরত্ব কমিয়ে সমুদ্র কাছে ঘেষতে চাইলে। তানহা চেঁচিয়ে উঠল। কন্ঠে ক্রোধ ঢেলে বলল,
‘ একদম ঘেষাঘেষি করবা না! কাছ ঘেষলে এখনি উঠে বাড়ি চলে যাবো।’
অসহায় হয়ে চেয়ে আছে সমুদ্র। দুজনের দিক বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রিয়। বাহির থেকে খালি চোখে আমরা যা দেখি তা কখনো পুরো সত্য নয়। এর আড়ালেও লুকিয়ে থাকে আরেকটা সত্য! এতোদিন ভাবতো সমুদ্রের প্রতি তানহাই বেশি দু*র্বল। এখন দেখছে ঘটনা পুরো উল্টো। সমুদ্রই তানহাতে ভীষণরকম দূর্বল। এইটুকু মেয়ে কলেজে পড়ুয়া এতবড় ছেলেটাকে শাসাচ্ছে! নাকানিচু*বানি খাওয়াচ্ছে।
সমুদ্র অসহায় ভঙ্গিতে প্রিয়’র দিক ইশারা করল। পরিস্থিতী প্রতিকূলে যেতে দেখে ভীতু কন্ঠে আমতাআমতা করে বলল প্রিয়,
‘ আসলে দোষটা আমার। আমি ভেবেছিলাম তোর সাথে শতাব্দ ভাইয়ের সম্পর্ক। যাকে আমার অপছন্দ। উল্টাপাল্টা যা বলতাম সেগুলো শতাব্দ ভাইয়াকে ভেবেই বলতাম।’
প্রিয়’র কথায় সমুদ্র তানহা হতভম্ব। বিস্ময় কাটিয়ে আচমকা কিটকিটে হেসে ফেলল দুজন। কোন ভাবেই হাসি থামছেনা সমুদ্রের। হতবুদ্ধিতে চুপসে গেল প্রিয়। সে এমন কি বলল!
অনেক কষ্টে সমুদ্র হাসি থামিয়ে বলল,
‘ শতাব্দ ভাই আর প্রেম? যেইদিন আমার ভাই আহসান খাঁন শতাব্দের প্রেম হবে নিশ্চয়ই সেদিন সূর্য উল্টো দিকে উঠবে।’
‘ কেন? উনার কারো সাথে প্রেম হতে পারে না?’ প্রিয় বোকাসোকা মুখে জিজ্ঞেস করে বসলো।
‘ সম্ভব না। ভাই আর প্রেম? এক সুতায় গাঁথা যায় না।’
‘ এমনো তো হতে পারে কোন মেয়ে তাকে ভালোবাসে!’
‘ অসম্ভব প্রায়! গুড লুকিং পার্সোনালিটি দেখে পটে গেলেও। তার রাগ, জেদ, বদ মেজাজ ঠেলার মত কোন মেয়ে এখনো দুনিয়াতে জন্ম হয়নাই।’
মন ছোট হয়ে এলো। শতাব্দকে দেখে তো অতটাও বদমেজাজি মনে হয়না প্রিয়’র। সমুদ্র কি মজা করে বলল? হয়তো। গভীর ভাবনায় ডুব দিলো।

তানহার চোখে ডুবে আছে সমুদ্র। সামনে ধোঁয়া উঠা কফির মগ। সময় থমকে আছে অন্যকোথাও। সবটাই যে্ন সুন্দর স্বপ্ন। আচমকা সামনে এসে কেউ দাঁড়াল। ছিটকে উঠল সমুদ্র। সাথেসাথে চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো। তোতলানোর সুরে বলল,
‘ ভাই! তু…মি এখানে?’
সর্বদার মতই গম্ভীর শতাব্দ। চোখমুখ স্বাভাবিক ভীষণ। তড়িঘড়ি করে সমুদ্র নিজে থেকেই বলতে লাগল,
‘ ভাই ও…ও আমার বন্ধু সোহেল আছে না? ওর বোন। এখানে ঘুরতে এসেছে। সোহেল একটু ব্যস্ত তাই ওদের বাসায় নিয়ে যেতে বলল।’
শতাব্দ’ কি বিশ্বাস করল? মাথা তুলে ভীতু দৃষ্টিতে তাকালো সমুদ্র। চোখমুখ আগের মতই স্বাভাবিক। পরিবর্তন নেই কোন!
রেস্তোরাঁর বামপাশে ছোট পুকুরের মত জায়গাটা সুন্দর সাজানো। সেখানে বসে দোলনায় দুলছিল প্রিয়। তানহার ডাকে ভিতরে এসে হতভম্ব সে। শতাব্দ সামনে দাঁড়িয়ে। সমুদ্র ভয়ে কাঁপাকাঁপি করছে। পাশেই কাচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে তানহা। শতাব্দ গম্ভীর মুখ করে একবার প্রিয়’র দিক তাকালো। তারপর সমুদ্রের দিক দৃষ্টি রেখে বলল,’ সোসাল সার্ভিস! কই বাসায় তো তোকে দিয়ে পানির গ্লাসটা পর্যন্ত উঠানো যায়না! এদিকে গ্রাম জুড়ে সমাজ সেবা হচ্ছে?’
আমতা আমতা করে সমুদ্র উত্তর দিলো,
‘ সোহেল অনেক করে বলছিল তাই..
থামিয়ে দিলো শতাব্দ শান্ত কন্ঠে বলল,
‘ গালফ্রেন্ডকে ইম্প্রেস করবি নিজের জিনিস দিয়ে কর। আমার বাইক নিয়ে কেন?’
‘ আস..লে ভাই। হয়েছে কি..’
‘ কিছু শুনতে চাইছিনা। বাড়ি থেকে মিথ্যা বলে বান্ধবীর পাহারাদার হয়ে এসেছ?
শেষ কথাটা প্রিয়’র উদ্দেশ্যে বলল। নড়েচড়ে উঠল প্রিয়। কিছু বলবে তার আগেই শতাব্দ রাশভারী হয়ে বলল,
‘ চলো।’
কোথায় যাবে বুঝল না প্রিয়। কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে গেল শতাব্দ। বাধ্য মেয়ের মত তার পিছনে গেল। যাওয়ার সময় সমুদ্রের উদ্দেশ্যে শতাব্দ কড়া করে বলে গেল,
‘সাতটার আগে যেন বাইক গ্যারেজে থাকে ।’
বোকার মত মাথা নাড়াল সমুদ্র। শতাব্দের যাওয়ার দিক তাকিয়ে ফিচেল হেসে বলল,
‘ রাজনীতি পড়াশোনার বাহিরে এই প্রথমবার ভাই কাউকে নিয়ে এতটা সিরিয়াস। তার রাগ জেদ বদমেজাজ ঠেলার লোক এসে গেছে বোধহয়।’

রেস্তোরাঁর সামনে রিকশা ডাকতে। বিনাবাক্যে, বাধ্য মেয়ের মত উঠে বসল প্রিয়। পাশ ঘেষে বসল শতাব্দ। মাঝে দুরত্ব রেখে কিছুটা সড়ে বসতে চাইল প্রিয়। বোধহয় পছন্দ হলো না শতাব্দ’র। কোমর টেনে আবারো মিশিয়ে নিলো। আড়চোখে তাকাল প্রিয়। শতাব্দের হাতটা কোমরে তখনো। বেশ স্বাভাবিক সামনের দিক তাকিয়ে আছে শতাব্দ।
রিকশা চলছে তার আপন গতিতে। নিস্তেজ রোদটা ধীরেধীরে মিয়িয়ে যেয়ে। সন্ধ্যা নামছে। শেষ বিকালের আলোটা তার মুখে এসে পড়ছে। এই প্রথম কাছ থেকে দেখছে শতাব্দকে। এতদিন সাধারণ চোখে দেখে আসা এই মানুষটাকে আজ ভীষণ অসাধারণ লাগছে। হ্ঠাৎ মনে হচ্ছে মানুষটা সুদর্শনের সাথে সাথে মায়ায় জড়ানোর জাদুও জানে। কি মায়া ওই অদ্ভুত সুন্দর চোখে!
আচমকা প্রিয়’র দিক ফিরল শতাব্দ। সাথে সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো প্রিয়। আরো ঝুঁকে বসলো শতাব্দ। প্রিয়’র কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘ ডার্ক কালার পড়ে চোখে কাজল লেপ্টে আমার সামনে আসতে বারণ করেছি্লাম। কেন আসলে! এইযে নিশ্বাসের গতি বাড়ছে, মাথাটা ঝিমঝিম করছে এর দায়ভার কে নিবে এখন?’
লজ্জায় ঝুঁকে থাকা আঁখিপাতা মেলে, আড়চোখে তাকাল প্রিয়। চোখাচোখি হতেই দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। বাতাসে আজ মা*দক ছড়িয়ে। ভীষণ মাতাল মাতাল মন। চোখ বুজে আসছে আবেশে। হঠাৎ প্রিয়’র হাতটা নিজের হাতে্র মুঠোয় নিয়ে নিলো শতাব্দ। আঙ্গুলের ভাঁজে আঙ্গুল ডুবিয়ে আরো কাছে টেনে নিলো। বুকে জড়িয়ে কপালে আলতো করে চুমু এঁকে দিলো। গভীর কন্ঠে বলল,
‘ সেদিন ভোরে আমি এসেছিলাম। গাড়িতে চড়ে পিছন ফিরে কেন তাকালেনা একবার! গত সাতদিন কত ছটফট করেছি, কতটা অশান্তিতে ছিলাম তুমি জানো? আমার তোমাকে ছাড়া চলছিল না প্রিয়!’
যন্ত্রের মত শক্ত হয়ে আছে প্রিয়। শরীর কাঁপছে থরথর। বুকের ধুকপুক বেড়েছে শতগুন। নিশ্বাসের উঠানামা ক্রমাগত। সারা অঙ্গ আবেশে ঝড়ঝড়িত। সময়টা কি থেমে গেল? শরীর থেকে মন, নিশ্বাস থেকে মস্তিষ্ক জুড়ে। সমস্তটাই তাকে ঘিরে। কারো স্পর্শ এতটাও গভীর হয় কি? তার চাহনিতে এই স্পর্শে আজ কোন অস্বস্তি নাই! কেন? তবে কি তানহার কথাই মিলে গেল। চোখে প্রেম জমেছে প্রিয়’র!

চলবে………

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই সবার মতামত জানাবেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here