বাবুইপাখির অনুভূতি পর্ব -৫১+৫২

#বাবুইপাখির_অনুভূতি🕊️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম🕊️
— পর্বঃ৫১
_________________

ছলছল চোখে তাকাচ্ছে আহি, কখনো নিলয়ের দিকে তো কখনো নিলয়ের হাতে থাকা চিঠিটার দিকে। আহির এই মুহূর্তে মানতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আদ্রিয়ান তাঁর আশেপাশে নেই। আহি ছলছল চোখ নিয়েই নিজের হাত নিলয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

‘ এটা কিসের ভাইয়া?’

‘ তা তো জানি না। আমি পড়ে দেখি নি আসলে আদ্রিয়ান চেয়েছিল নিজ হাতে এটা তোমায় দিতে কিন্তু সময়টা এত দ্রুত চলে গেল যে ও বুঝতেই পারে নি। যাইহোক রাত হচ্ছে এখন বাড়ি যাও বাড়ি গিয়ে পড়ে নিও চিঠিটা।’

উওরে দু’বার মাথা নাড়িয়ে পিছন ফিরে চললো আহি। আহির চোখ এইমাত্র অনেক কিছু বললো নিলয়কে। যেটা নিলয় বেশ বুঝতে পেরেছে। আনমনেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো,

‘ একটু দেরি হয়ে গেল যে আহি।’

বলেই আকাশ পথে তাকালো নিলয় আর উইস করলো,

‘ আদ্রিয়ান যেন খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসে দেশে।’

ভেবেই অন্যদিক দিয়ে চললো নিলয়।’
____

রাতের জোৎসা ভরা আলোর পথ পেরিয়ে আনমনেই হাঁটছে আহি। মনটা একদমই ভেঙে গেছে তাঁর, বুকের ভিতর খাঁ খাঁ করছে। শুন্যতা ফিল হচ্ছে ভীষণ এতক্ষণে আহি বুঝতে পারলো সন্ধ্যা থেকেই তাঁর মনটা এত উতলা কেন ছিল?’ ভালোবাসাটা যেন তাঁর জন্য নয়, যখনই ভালোবাসা নিবেদন করতে যায় তখনই কোনো না কোনো প্রবলেম এসে তাঁকে ধরা দেয়। নীরবের ক্ষেত্রেও হয়েছে আর এখন আদ্রিয়ান। ভেবেই দীর্ঘ শ্বাস ফেললো আহি। আজ আকাশের বুকে কোনো তাঁরা নেই, একদমই নিরিবিলি আর নিস্তব্ধ লাগছে চারপাশ। আহি আনমনেই হাঁটতে লাগলো তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে। ভিতর থেকে একদম পাথর হয়ে গেছে সে। সে বুঝতে পারে না বার বার তাঁর সাথেই এমন কেন হয়? সত্যি কি তাঁর ভাগ্যে ভালোবাসা নেই। যাকে সে মন থেকে ভালো বাসতে যায় তখনই সে তাঁর থেকে দূরে চলে যায়।’

আহি নানান কিছু ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চললো নিজের গন্তব্যে দিকে।’

আর এইদিকে, মেঘের মাঝে ভেসে চলা ফ্লাইটের তিন নাম্বার সারির লাস্টের সিটের জানালার পাশে বসে আছে আদ্রিয়ান। মনে ভিতর অদ্ভুত ফিলিংস হচ্ছে তার। সে জানে না আহি তাঁর অনুভূতি মিশ্রিত চিঠিটা পড়ে কি করবে? তাঁকে কি আবার ফিরিয়ে দিয়ে উদাস করবে নাকি আনমনেই চোখে বুঝিয়ে ফেললো আদ্রিয়ান। আর বেশি ভাবতে পারলো না সে। বুকের ভিতর কেমন ধুম ধুম শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ একজন ছুড়ি দিয়ে তাঁর হৃদয়টাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে। জোরে নিশ্বাস ফেললো আদ্রিয়ান। অস্থিরতা হচ্ছে ভীষণ? সে জানে না আগামী দিনগুলো কিভাবে সে সুইজারল্যান্ডে কাটাবে? কম হলেও তাঁকে আহিকে ছেড়ে ৬ মাস থাকতেই হবে। এতগুলো দিন কি করে আহিকে ছেড়ে থাকবে ভাবতেই বুকের বাম পাশে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হচ্ছে আদ্রিয়ানের।’

মাঝেমধ্যে কিছু ব্যস্ততার কাছে ভালোবাসাকে হার মানতেই হয় যেমন আজ আহি আর আদ্রিয়ানকে মানতে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে সময়টা যেন সত্যি খুব বেশি বেইমানি করে ফেলে।’– কথাগুলো ভেবে আকাশ পথে আদ্রিয়ান আর মাঝ রাস্তায় আহি দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। তাঁরা কেউ জানে না এদের উপসংহারটা আসলে কেমন হবে?’ বিচ্ছেদ নাকি অন্যকিছু।’

.
.

টেবিলের কোনে জানালার পাশে বসে আছে আহি। রাতের আকাশে থাকা চাঁদ মামার মৃদু আলো উঁকি মারছে তাঁর রুমে। জানালার কার্নিশ বেয়ে অল্প স্বল্প বাতাসও আসছে কিছু কিন্তু যেটা খুবই অল্প এতটাই অল্প যে জানালার পর্দাটাও খুব বেশি নড়তে পারছে না। এসবের ভিতরেই টেবিলের ওপর নিলয়ের দেওয়া আদ্রিয়ানের লেখা নীল খামের চিঠিটার দিকে তাকিয়ে আছে আহি। বিষন্ন হয়ে আছে মনটা তবে চিঠিটা পড়ার জন্য নয় আদ্রিয়ানের এইভাবে হুট করে চলে যাওয়ার জন্য। আহি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নীল খামের ভিতর থেকে সাদা পৃষ্ঠার চিঠিটা বের করলো তারপর দুই ভাঁজ খুলতেই আদ্রিয়ানের হাতের লেখা চোখে পড়লো আহির। যেখানে প্রথমেই লেখা__

‘ আমি জানি না তোমার নামের এই চিঠিটা তোমার মনে কোনো জায়গা করে নিতে পারবে না। আমার অনুভূতিগুলো তোমার সামনে ঠিক ভাবে উপস্থাপন করতে পারবে কি না? তবে কি জানো আমি কখনো ভাবে নি কোনো মেয়ের জন্য এইভাবে চিঠি লিখতে বসবো তাও কি না বৃষ্টির মাঝে এই গভীর রাতে। এই বৃষ্টিই যেন তোমাকে আমার মনে করে দেওয়ার প্রথম তরঙ্গ।’

‘ তোমার সাথে আমার প্রথম আলাপনই হয়ে ছিল ঝগড়া দিয়ে, মনে আছে কি তোমার সেই বিয়ে বাড়ির কথা। প্রচন্ড বিরক্ত নিয়েই সোফাতে বসে ছিলাম আমি, কারন এইসব বিয়েবাড়ি টিয়েবাড়ি একদমই পছন্দ নয় আমার তারওপর সেই ছোট্ট বাচ্চার নিয়ে আসা চিঠি। চিঠির খামের ওপর লাভ লেটার লেখা দেখেই চরম রাগ হয়েছিল আমার। আর রাগের বসেই সেদিন ফাঁকা রুমে তোমায় নিয়ে গিয়ে কতটাই না উচ্চ স্বরে কথা বলেছিলাম তোমার সাথে,সেদিন তো তোমাকে সহ্য করতেই পারছিলাম না। কিন্তু কে জানতো একটা সময় সেই সহ্য করতে না পারা মেয়েটাকেই এত ভালোবেসে ফেলবো আমি। এরপর তোমার সাথে সেকেন্ড মিট হলো ভুল করে তুমি আমার গাড়িতে উঠলে। সেদিনও কি ঝগড়া তোমার সাথে, সেটার কারনও ছিল এই চিঠি তুমি ভুল করে আবারো নীরবের চিঠি আমায় দিয়ে ফেললে, তারপর ঝগড়ার বেগে ধুলোবালিতে সেদিন কতই না বাড়াবাড়ি যদিও সেসব ভাবলে এখন ভীষণ হাসি পায় আমার, তারপর তুমি আমার অফিসে এলে তোমায় দেখে রাগ করে তাড়িয়ে দিলাম, শ্রীমঙ্গলে দেখা হলো, ঝড়বৃষ্টিতে ভয় পেয়ে তোমায় জড়িয়ে ধরলাম। এই জড়িয়ে ধরা বিষয়টাই যেন ছিল তোমার প্রতি আমার প্রথম অনুভূতির সূচনা। এটার জন্যই জানতে পারলাম তুমিই ছিলে সেই মেয়ে যে কি না ছোট বেলায় আমায় বাঁচিয়ে ছিলে। তারপর আবার অফিসে দেখা হলো ঝগড়া করলাম যদিও সেদিন তোমার কোনোই দোষ ছিল না কিন্তু তারপরও আসলে কি বলো তো ছোট বেলা থেকেই আমি নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে পারি না, তারওপর তোমার সাথে আমার রাগটা কিছুতেই দেখাতে পারতাম না যার বিনিময় হিসেবে বার বার কটুকথা শোনাতাম তোমায়। তারপর সেদিন ভার্সিটিতে নীরবের প্রতি তোমার ব্যর্থতার অনুভূতি দেখলাম। সেদিন ছিল তোমার প্রতি আমার শূন্যতার অনুভূতি। তোমার সেই বেঞ্চে বসে রিনিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার দৃশ্যটা কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না আমি। খুব কষ্ট হয়েছিল সেদিন বার বার মনে হয়েছিল তোমার কাছে গিয়ে তোমাকে শান্ত্বনা দেই। কিন্তু সেটা তো কিছুতেই পসিবল ছিল না। তারপর বৃষ্টিতে ভিজে তোমায় নিয়ে আমার বাড়িতে আনা তোমার লেখা প্রথম চিঠির ‘বাবুইপাখির অনুভূতি’ গুলো পড়া যেটা তুমি টানা চারদিন বসে লিখেছিলে। সেদিন খুবই খারাপ লেগেছিল আমার বার বার মনে হয়েছিল হয়তো একটুর জন্য হলেও নীরবকে তোমার ভালোবাসা উচিত ছিল। পরক্ষণেই এখনকার কথা ভাবলে মনে হয় ভালো হয়েছে নীরব তোমায় রিজেক্ট করেছে। কারন ও রিজেক্ট না করলে হয়তো আজ আমি এখানে বসে তোমার জন্য অনুভূতি লিখতেই বসতাম না। হয়তো তোমায় ভালোবাসার সুযোগটাই হতো না।’– এই কথাটা পড়ে আনমনেই হেঁসে ফেললো আহি। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে আবারো পড়তে শুরু করলো_

‘ তারপর ধীরে ধীরে তোমার সাথে বন্ধুত্ব করা তোমাকে চেনা, ধীরে ধীরে তোমাতে আসক্ত হওয়া, তোমাকে ভালোবাসার আবেদন জানানো যদিও সেটা ব্যর্থতা ছিল। জানো তো আমি যখন সেদিন তোমায় ভালোবাসার কথা বলেছিলাম তখন আমি এটা ভাবে নি তুমিও আমায় ভালোবাসবে। আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি আমার কাছে থাকবে। তোমার আমাকে ভালোবাসার প্রয়োজন নেই, আমি তোমায় ভালোবাসবো তুমি শুধু থাকবে আমার কাছাকাছি, রোজ রাতে তোমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমাবো আমি। কারন তুমিই যে আমার রাতের দুঃস্বপ্নের মাঝে একটু খানি আলোর রশ্মি। হসপিটালের যে কটা রাত তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছিলাম সেই কটা রাত যেন আমার জীবনের শান্তিময় রাত ছিল। আমার জীবনে এই পর্যন্ত যতগুলো রাত গিয়েছিল তাঁর মধ্যে সেই হসপিটালে কাটা এক সপ্তাহ ছিল সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। এরপর মাঝখানে কাটলো যে দুই দিন। এই দু’দিনেই তোমার শূন্যতা ঠুকরে ঠুকরে যন্ত্রনা দিচ্ছিল আমায়।’

‘ আচ্ছা আমায় কি একটুও ভালোবাসা যায় না আহি? নীরবের মতো না হক ওর থেকে অল্প খানিকটা কি ভালোবাসা যেত না? তোমার কি এই কয়দিনে আমার এত কাছাকাছি থেকেও বিন্দুমাত্র আমার জন্য ফিলিংস জন্মায় নি? একবারো কি এই রাগী মানুষটাকে তুমি মিস করো নি? একবারও কি তোমার মনে হয় নি এই মানুষটার সাথেও একসাথে থাকা যায়, বা এই মানুষটার সাথে সারাজীবন থাকার প্রতিশ্রুতি জন্মায় নি? তোমাকে কি খানিকটায়ও আদ্রিয়ান নামক মানুষটার শুন্যতা ফিল করায় নি?’– আমাকে কিন্তু বড্ড করেছে তোমার স্মৃতিতে আমি যেন ক্ষণে ক্ষণে চুর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছি আহি, আমার তোমায় খুব প্রয়োজন? আমার ভিতরটা যে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে আহি, আমি শান্তি মতো ঘুমাতে পারি না রাতে, একটা আমার দুঃস্বপ্নের কারন আর দুই নাম্বার কারনটা হলে তুমি? প্লিজ আমায় আর ক্ষত বিক্ষত করো না, নইলে যে সত্যি সত্যি শেষ হয়ে যাবো আমি। তুমি নামক আসক্তি আমায় ধীরে ধীরে শেষ করে দিবে আহি। তোমায় বড্ড বেশিই ভালোবেসে ফেলেছি আমি। এবার প্লিজ দূরে সরিয়ে দিও না আমায়, আমি যে আর সইতে পারছি না। বার বার মনে হয় আমার হৃদয়টাকে কে যেন ছুড়ি দিয়ে বারংবার আঘাত করছে। জ্বলন্ত আগুন দিয়ে হৃদয়টাকে ক্ষনে ক্ষনে পুড়িয়ে দিচ্ছে।”

এতটুকু পড়েই ধম ফেললো আহি। আদ্রিয়ানের এই কথাগুলো যেন তাঁকেও ভিতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে। চোখ ভেসে আসছে তাঁর। আহি আকাশ পথে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলো,

‘ আপনি আমায় এত ভালো কেন বাসলেন আদ্রিয়ান? পরক্ষণেই আবার ভাবলো, এতই যখন আমি নামক আসক্তি আপনায় কষ্ট দিচ্ছিল তাহলে কেন এইভাবে না বলেই হুট করে চলে গেলেন আপনি? আমার সাথে কি একবার দেখা করা যেত না, বা ফোন করে একটি বার বলা যেত না আমি চলে যাচ্ছি আহি। এতই সময়ের অভাব পড়লো আপনার যে দুই দন্ড কথা বলারও টাইম হলো না। এখন নিজেও কষ্ট পাচ্ছেন আর এই আহি নামক মেয়েটাকেও কষ্ট দিচ্ছেন। আপনি বড্ড খারাপ আদ্রিয়ান, বড্ড খারাপ। আর পড়বো না আমি আপনার চিঠি।’

বলেই চিঠিটাকে টেবিলের উপর রেখেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো আহি। হুট করেই এক আকাশ সমান অভিমান এসে ভর করলো তাঁকে। বড্ড অভিমান হলো আহির আদ্রিয়ানের ওপর।’

‘ এত ভালোবাসে অথচ ভালোবাসার মানুষটার জন্য একটুখানি সময় বার করতে পারলো না। চাই না আপনার ভালোবাসা থাকুন আপনি দূরে কোনো প্রয়োজন নেই আহির আপনাকে হুহ।’

বলেই রুমের লাইট অফ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো আহি। পাশ ফিরে একবার চিঠিটার দিকে তাকিয়ে উল্টোদিক ঘুরে কাঁথা জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো আহি। কিছুক্ষন পর আবার চোখ খুলে তাকালো সে। আবার অভিমান করে চোখ বন্ধ করে নিলো। আবার বিরক্ত হয়ে উঠে বসলো আহি। শান্তি মিলছে না তাঁর, আদ্রিয়ানের ওপর ভিষণভাবে রেগে গেছে সে? এতটাই রেগে গেছে যে কাছে পেলে কি করতো জানে না আহি?’

অন্যদিকে আহির কান্ড কারখানা বার বার পলক ফেলে দেখতে লাগলো তাঁর বিছানার ওপর থাকা খরগোশ ছানা। সে বুঝতে পারছে না আহির কান্ড কারখানা। কেন বার বার উঠছে বসছে ছটফট করছে। বুঝতে পারলে হয়তো শান্ত্বনা দিতো।’

এদিকে,
আহি চরম প্রকার বিরক্ত হয়ে বিছানার ওপর থেকে তাঁর ফোনটা বের করে কল করলো রিনিকে। প্রথম দু’বার কল করতেও রিনি ধরলো না, এতে যেন আরো রাগ হলো আহির। তিন নাম্বার কল করতেই অপর পাশে ঘুম ঘুম কন্ঠে বলে উঠল রিনি,

‘ হ্যালো?’

রিনির হ্যালো শুনে অপরপাশে কর্কশ গলায় বলে উঠল আহি,

‘ ওই বান্দর মাইয়া এতক্ষণ সময় লাগে ফোন ধরতে, কখন ফোন দিসি আমি?’

হুট করেই এমন ঝাঁঝালো গলা শুনে ঘুম উড়ে গেল রিনির পরক্ষনেই এটা যে সত্যি সত্যি আহির নাম্বার কি না চেক করে বললো,

‘ হ্যালো?’

‘ আবার কি হ্যালো হ্যালো করছিস আদ্রিয়ান এমন কেন করলো রিনি, আমায় নাকি বড্ড ভালোবাসে তাহলে আমায় না বলে কি করে সুইজারল্যান্ড চলে গেল। গেল তো গেল যাওয়ার আগে একবার আমার সাথে দেখা করতে পারতো না। কল করে বলা যেত না আমি চলে যাচ্ছি। আমায় ছাড়া নাকি থাকতে কষ্ট হয়, ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায় তাহলে কি করে পারলো আমায় ছেড়ে চলে যেতে। লোকটা চরম বদমাশ, শয়তান, রাগী, হনুমান আমি কখনই ক্ষমা করবো না তাঁকে, কি করে পারলো এতটা নিষ্ঠুর হতে,, এই রকম হাজারো আদ্রিয়ান কানেক্টেড কথা বলতে লাগলো আহি রিনিকে। এক পর্যায়ে সে নিজেই বক বক করতে করতে ফোন কেটে দিল। আর রিনি পুরো অবাক হয়ে থ মেরে বসে রইলো সে কিছু বুঝতেই পারলো না আহি কেন এইভাবে তাঁর সাথে চিল্লাচিল্লি করলো, আদ্রিয়ান কাজের জন্য সুইজারল্যান্ড গেছে সেটা সে জানতো কারন শুভ তাঁকে বলেছিল কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁর কি করার ছিল?’ হঠাৎ করে আবারো ফোনটা বেজে উঠল রিনির এবারও আহির নাম্বার দেখে থ মেরেই ফোনটা তুলে বললো সে,

‘ হ্যালো।’

‘ তোর হ্যালোর ৪৪০, শোন ওই বদমাইশ লোকটাকে বলে দিস এই আহি তাঁকে ভালোবাসে না। তাঁর প্রতি আহির কোনো ফিলিংস নেই, তাঁর জন্য এই আহি মোটেও কষ্ট পাচ্ছে না।’

বলতে বলতে কেঁদে ফেললো আহি। আহিকে কাঁদতে দেখে ভয়ংকর ভাবে অবাক হয়ে বললো রিনি,

‘ কি হলো তুই আবার কাঁদছিস কেন?’

রিনির কথা শুনে কান্না ভেঁজা কন্ঠে বলে উঠল আহি,

‘ কাঁদবো না তো কি করবো? কি করে পারলো এমন করতে, আমাকে তো একবার কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। আদ্রিয়ান খুব খারাপ রিনি, খুব খারাপ।’

এভাবে কিছুক্ষন কান্না ভেঁজা কন্ঠে বকবক করে আবার ফোন কেটে দিল আহি। এরপর আধ ঘন্টা কেটে গেল রিনি চুপচাপ থ মেরে বসে রইলো। আহিও আর কল করে নি হয়তো ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আহির বিষয়টাকে বুঝতে তাঁর আধ ঘন্টা সময় লাগলো। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে চরম রাগ নিয়ে রিনি কল করলো শুভর নাম্বারে।’

____

হসপিটাল থেকে কেবলই বের হলো শুভ এমন সময় রিনির কল দেখে খুশি হয়ে বললো সে,

‘ হ্যালো জান।’

সাথে সাথে কর্কশ কন্ঠ নিয়ে অপর পাশে বললো রিনি,

‘ তোমার জানের গুষ্টি কিলাই, তোমার ভাই কি করে পারলো আমার বেস্টুকে কাঁদাতে, কিভাবে না বলে চলে গেল সুইজারল্যান্ড। আমার বেস্টু কাঁদতে কাঁদতে আধ ঘন্টা,আর চিল্লাতে চিল্লাতে একঘন্টা ধমকালো আমায়।’

রিনির কথা শুনে ফট করেই বলে উঠল শুভ,

‘ তো এক্ষেত্রে আমি কি করতে পারি?’ আর তুমি আমার ওপর কেন রেগে আছো? আমার কি করার ছিল?

‘ কি করার ছিল মানে তুমি তোমার ভাইকে আটকাবে না।’

রিনির কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বললো শুভ,

‘ আমি! আমি কি করে আটকাতাম আর ভাইয়ার চলে যাওয়াতে আহি আপু কেন কাঁদছে?’

শুভর কথা শুনে ভয়ংকরভাবে জোরে শব্দে করে একটা চিল্লানি দিল রিনি, এতটাই জোরে চিল্লানি দিল যে শুভর কান যেন ওখানেই স্তব্ধ হয়ে গেল।’

ততক্ষণে রিনিও ফোন কেটে দিল। আর শুভ থ মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বিস্মিত হয়ে বললো,

‘ কি হলো? কেন হলো? কিছুই তো বুঝলাম না তাহলে মাঝখান দিয়া আমার কানটা কেন ঝালাপালা হয়ে গেল?’
!
!
!#বাবুইপাখির_অনুভূতি🕊️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম🕊️
— পর্বঃ৫২
_________________

সময়টা যেন এগোতেই চাইছে না আজ! বারবার মনে হচ্ছে আহির আজকের রাতটা খুবই দীর্ঘ তাঁর জন্য। তাই তো মিনিট পাঁচেক আগে ঘুম ভাঙতেই ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতেই চোখটা বিষন্ন তাঁর, কারন ঘড়ির কাঁটায় তখন কেবল চারটা বাজে। বাহিরে এখনো অন্ধকার বিদ্যমান। চরম ভাবে বিষন্ন মাখা মুখ নিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো আহি। ঘুমে চোখ জ্বলছে তাঁর অথচ ঘুমাতে পারছে না সে। মাথার ভিতর শুধু আদ্রিয়ানের লেখা কথাগুলো ভনভন করছে। জোরে এক নিশ্বাস ফেলে সামনের টেবিলের দিকে তাকালো আহি, আদ্রিয়ানের লেখা চিঠিটা এখনো সেখানেই পড়ে আছে। চিঠির উপরে কালো একটা বলবেন রাখা আহি রেখেছিল কাল যেন বাতাসের তীব্রতায় চিঠিটা উড়ে না যায়। যদিও বাহিরের বাতাসে অল্প স্বল্প নড়ছে সেটা। আহি আনমনেই এগিয়ে গেল চিঠিটার দিকে আদ্রিয়ানের লেখা পুরো কথাগুলো পড়তে ভীষণভাবে ইচ্ছে করছে তাঁর। তাই নিজের ইচ্ছেটাকেই এই মুহূর্তে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে গেল সে টেবিলের দিকে। চেয়ার টেনে বসে পড়লো আবার। টেবিলের উপরে থাকা ল্যাম টাইটটা অন করে আবার মনোযোগ দিলো আদ্রিয়ানের লেখা চিঠিটার দিকে। যেখানে লেখা,

‘ তুমি কি জানো আহি? তুমি আমার জীবনে হুট করে আসা এক দূর্ঘটনা। এমনই এক দূর্ঘটনা যে দূর্ঘটনাকে আমি চাইলেও মুছতে পারছি না আমার মন থেকে, বের করতে পারছি না আমার মাথা থেকে। যার আঘাত এখনো পোয়াতে হচ্ছে আমায়, জানি না এই ক্ষতর আঘাত আধও কখনো কমবে কি না?’

‘ জানো তো কাল আমি সুইজারল্যান্ড চলে যাচ্ছি। জানি না আবার কবে ফিরবো। তবে আনুমানিক ছয় মাস তো লাগবেই আমার। হয়তো এই ছয় মাস তোমার সাথে আমার কোনো দেখা হবে না, কথা হবে না। জানি না আগামী ছয় মাস কিভাবে তোমায় ছেড়ে কাটাবো আমি? ইচ্ছে ছিল তোমাকে আমার অনুভূতিগুলোর কথা নিজ মুখে বলবো কিন্তু সাহস হয়ে উঠলো না আর সময়েও হয়তো কুলাতো না। তাই এই চিঠি।’

অবশেষে এতটুকু বলবো আহি, এই ছয় মাস যদি তোমাকে ক্ষনে ক্ষনে আমাকে মনে করায়, আমার স্মৃতি তোমাকে কাঁদায়, আমার শূন্যতা তোমায় ফিল করায় তাহলে প্লিজ একটি বার আমার কাছে এসে বলো,

‘ ভালোবাসি তোমায়। বিশ্বাস করো কোনো দ্বিধা ছাড়াই তোমায় সেদিন জড়িয়ে ধরবো আমি। আর বললো,

‘ আমিও বড্ড ভালোবাসি তোমায়।’

আর যদি এমনটা না তাহলে আমি তোমায় কথা দিচ্ছি এই আদ্রিয়ান আর কখনোই তোমার সামনে ভালোবাসার আবেদন নিয়ে আসবে না। বিরহ নিয়ে কাটাবে সারাজীবন তারপরও তোমার জীবনের কাটা হয়ে দাঁড়াবে না সে।’

অতঃপর আর দুই লাইন বলতে চাই তোমায়। যদি এই ছয় মাস আমাকে মনে করায় তোমায়।আর বুঝিয়ে দেয় ‘তুমিও ভালোবাসো আমায়’। তবে দেখা হবে নিচের কয় লাইনের কাব্যের তালেতালে ছন্দের মেলায়,

‘ দেখা হয় নি সেথায় আমাদের,
যেথায় আছে এক ঝাঁক শালিকের মাঝে সবুজের মেলা?’
‘ সবুজ পেরোতেই নদীর মালা,
নদীর বুকে টগরের ভিঁড়ে শাপলার ছড়াছড়ি, মুগ্ধ হবে তুমি প্রকৃতির অপলক সৌন্দর্যের মায়ায়।’

‘ উত্তেজিত হয়ে যখন আশেপাশে খুঁজবে আমায়
তখনই ঢেউয়ের ভিড়ে নৌকা মেলে মাঝি বলবে তোমায় ‘যাবে কই?’

‘ তুমি বলবে, দূর সীমানায় সবুজের মাঝে বেঞ্চের পাড়ায়, যেথায় আছে বাবুইপাখির ভয়ংকর উড়াউড়ি।’

যদি পেয়ে যাও সন্ধান,

‘ তবে তীরে এসে খুঁজবে আমায়, আর বলবে এসেছি আমি?’

‘ উতলা হয়ে খুঁজো না খুব, চলে এসো ফুলের ভিঁড়ে পাপড়ির মায়ায়!’

আমিও অপেক্ষায় থাকবো তোমার।’

ইতি,
আদ্রিয়ান!’ ❤️

পুরো চিঠিটা পড়ে যেন হতভাগ আহি, এমন জায়গা কোথায় মিলবে তাঁর? যেথায় প্রকৃতির এতগুলো সৌন্দর্য একসাথে ঘুরপাক খায়।’

কথাগুলো যখন ভাবলো আহি সেই মুহূর্তেই দেয়াল ঘেঁষে থাকা একটা ছোট্ট টিকটিকি বলে উঠল,

‘ ঠিক ঠিক ঠিক।’

আবারও বিষন্ন আহি। নিরালায় তাকিয়ে রইলে সে আকাশের পানে।’

_____

পরন্ত বিকেল বেলা। আনমনেই নিজের খরগোশ ছানাকে কোলে নিয়ে হাঁটছে আহি। আজ কেবল দু’দিন হলো আদ্রিয়ানের সাথে আহির একদমই যোগাযোগ বন্ধ। না হয় মেসেজে কথা আর নাই হয় ভিডিও কলে দেখা। এই দুইদিনেই পুরো ব্যাকুলতার শীর্ষে আহি। আগামী দিনগুলো কি করে কাটাবে ভাবতেই যেন বুক চিঁড়ে কান্না আসে তাঁর। অত্যাধিক ধারে সে ব্যাকুল হয়ে আছে আদ্রিয়ানের সামনে গিয়ে ভালোবাসি বলবে বলে। সাথে ওই প্রকৃতিও দেখার জন্য। আহি জানে না আদ্রিয়ান যে জায়গার কথা তাঁকে বলেছে সেটা আধও কোথায় আছে। শেষের ছন্দগুলো নিজে অন্য পৃষ্ঠায় লিখে নীরব, অথৈ, রিনি, শুভ এমনকি নিলয়কেও দেখিয়েছে সে৷ কিন্তু কেউই এমন জায়গার হদিস বলতে পারলো না তাঁকে। আধও এমন জায়গা আছে কি না কে জানে। কিন্তু আদ্রিয়ান যখন বলেছে তাহলে নিশ্চয়ই আছে। আশেপাশে না থাকলেও দূরে কোথাও নিশ্চয়ই আছে। সেই না দেখা হওয়া জায়গা, শালিকের ভিঁড়ে সবুজের মাঠ, নদী, নদীর বুকে শাপলা ফুল, নৌকা মাঝি, বাবুইপাখি আর সবশেষে ফুলের পাপড়ি। জোরে নিশ্বাস আহি। মনটা একদমই নির্বিকার তাঁর। হঠাৎই আহির চোখ গেল সামনের সেই ভাঙাচোরা বাড়িটাই দিকে, মনে পড়লো তাঁর সেদিনের কথা যেদিন এই খরগোশ ছানাকে ধরতে গিয়ে আদ্রিয়ানকে দেখেছিল সে। আদ্রিয়ান মাথা ঘুরিয়ে পড়েছিল তাঁর বুকে। ছোট বেলার কথাও মনে পড়লো তাঁর অল্প স্বল্প যদিও বেশি কিছু মনে নেই। আহি বেশি কিছু না ভেবে খরগোশ ছানাকে আদর করতে করতে এগিয়ে গেল সামনে আর বললো,

‘ জানিস জীবনটা হলো গোলকধাঁধা। জীবনে অনেককিছু হারিয়েছি বুঝলি প্রথম ভালোবাসা, বাবুইপাখি, কুকুর ছানা। আরও কত কি? কিন্তু এই মুহূর্তে আদ্রিয়ান আর তোর কথা ভাবলে মনে হয় যা হারিয়েছি তাঁর থেকে ভালোকিছু পেয়েছি। কিন্তু আফসোস হলো আমি ভালো সেই জিনিসটাকে কাছে পাচ্ছি না,তবে আমি জানি খুব তাড়াতাড়ি আমি পেয়ে যাবো তাঁকে। আর যেদিন পাবো সেদিন আর ছাড়বো না বুঝলি একদম তোর মতো যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দিবো।’

বলতে বলতে এগিয়ে চললো আহি এভাবেই দিন কাটছিল দুদিন থেকে চারদিন, চারদিন থেকে ছয় দিন, ছয় দিন থেকে বারো, বারো থেকে চব্বিশ আর বলতে না বলতেই কেটে গেল পুরো এক মাস। এবার আহি ধীরে ধীরে ভিতর থেকে ভেঙে পড়ছে, সময় যেন একদম কাটতেই চায় না তাঁর। কষ্ট হয় ভীষণ। রোজ রাতে আদ্রিয়ানের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হয় তাঁর কিন্তু বলে না। আদ্রিয়ানও তাঁকে ফোন করে না। এতে যেনো আরো বেশি কষ্ট হয় আহির। একবার কি ফোন করা যায় না তাঁকে খুব নাকি ভালোবাসে তাহলে ফোন কেন করে না? একবারও কি ইচ্ছে করে না আহি নামের এই মেয়েটার সাথে কথা বলতে। ভেবে পায় না আহি, বুকের ভিতর অসম্ভব যন্ত্রণা হয় তাঁর। শূন্যতা ফিল করতে করতে যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এত যন্ত্রণা কি খুব বেশি পাওয়ার দরকার ছিল। আকাশ পানে তাকিয়ে বললো আহি,

‘ আপনার কি সত্যি আমার সাথে একবারও কথা বলতে ইচ্ছে করে না আদ্রিয়ান, সামনে এক্সাম আসছে আপনার চিন্তায় সেটাও হচ্ছে না?’

মনের মাঝে অনেকটা অভিমান নিয়ে এগিয়ে চললো আহি। কিন্তু সে তো জানে না তাঁর থেকেও বেশি ব্যাকুল হয়ে আছে সুইজারল্যান্ডে থাকা মানুষটি। রোজ রাতেই ভাবে আহিকে একবার কল করবে কিন্তু কোথাও যেন এক সংকোচ এসে ভর করে তাঁকে তাই আর কল করা হয় না। আদ্রিয়ান পণ করেছে আর যা কথা হবে সব সামনাসামনি। যদিও সে জানে না আহির মনে কি চলছে? ও কি আসবে আধও তাঁর বলা সেই জায়গায়? ভেবে পায় না আদ্রিয়ান। জানালার দিকে আনমনেই তাকিয়ে রইলো আদ্রিয়ান, অন্ধকারে টুইটুম্বর চারপাশ। আজ ভীষণই ক্লান্ত আদ্রিয়ান তবে শরীর নয় মন। বুকের হাত রাখলো আদ্রিয়ান, আর বললো,

‘ কবে শেষ হবে এই দুরত্ব, আর আমি জানবো তোমার অবস্থা আহি। তুমি আসবে সেখানে, নাকি অপেক্ষা করাবে আমাকে? কে জানে?’

____

বিকেল সাড়ে পাঁচটার কাছাকাছি।’

সরু রাস্তা পেরিয়ে উঁচু পুলের ইটের তৈরি রেলিং ধরে হাঁটছে আহি।’ এটা হলো সেই জায়গাটা যেখানে আদ্রিয়ান তাঁকে নিয়ে এসেছিল নীরবকে ভোলাতে। চেঁচিয়ে নিজের অনুভূতিগুলোকে বাহিরে বের করেছিল সে। কিন্তু কে জানতো এক অনুভূতি ছাড়াতে আরেক অনুভূতি এসে ভর করবে তাঁকে। আহি আনমনেই হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল পুলের নিচে। ভরা জঙ্গলে ঘেরা চারপাশ। হঠাৎই কিছু একটার টুং টাং শব্দ কানে ভেসে আসলো তাঁর কানে। আহি বেশ অবাক হয়ে এগিয়ে গেল সামনে। কতদূর এগোতেই চোখ পড়লো আহির একজন বৃদ্ধ মানুষের দিকে। লোকটি পড়নে কালো পাঞ্জাবি, সাদা লঙ্গি সাথে মাথায় কালো ওড়না নাকি গামটা প্যাঁচানো ঠিক বুঝতে পারছে না আহি, মুখ ভর্তি সাদা দাঁড়ি। হাতে তার দোতারা। সেটা নিয়েই টুংটাং শব্দ করছে সে। আহি সেটারই শব্দ পেয়েছিল মাত্র। আহি বুঝতে পেরেছে উনি হয়তো একজন বাউল। আহি আনমনেই এগিয়ে গেল সেদিকে। একটা গাছের নিচে চুপটি করে বসে রয়েছে বাউল, চারপাশে গাছপালা ভর্তি সেই গাছ থেকেই আসছে মন মাতাল করা বাতাস। বাতাসের তীব্রতা খুবই। বাতাসে ভীষণভাবে চুল উড়ছে আহির, আনমনেই সে এগিয়ে গেল বাউলের কাছে।’

এদিকে হঠাৎই দোতারা বাজাতে বাজাতে গান ধরলো সেই বাউল,

‘ ঘড় কুটার এক বাসা বাঁধলাম বাবুইপাখির মতো
এই হৃদয়ের ভালোবাসা, দিলাম আছে যত।’

আহি যেন বাউলটির কন্ঠ শুনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো ওখানেই। এত সুন্দর গলা।’

এদিকে বাউল দোতারায় চার পাঁচ বার টুংটাং শব্দ করে আবারো বলতে শুরু করলো,

‘ ঘড় কুটার এক বাসা বাঁধলাম বাবুইপাখির মতো
এই হৃদয়ের ভালোবাসা, দিলাম আছে যত।’

‘ একটা ময়না পাখি সেই বাসা….য়
পুসি কত ভালোবাসায়?”
তারে চোখে চোখে রাখি_
উইড়া যেন না যায় আমার পোষা ময়না পাখি,পাখি চোখে চোখে রাখি
উইড়া যেন না যায় আমার পোষা ময়না পাখি!’

‘ ঘড় কুটার এক বাসা বাঁধলাম বাবুইপাখির মতো
এই হৃদয়ের ভালোবাসা, দিলাম আছে যত।’

এতটুকু বলে আবারো দোতারায় সুর টানলো বাউল। আহি আনমনেই গিয়ে বসলো বাউলের পিছনে গাছের সাথে হেলান দিয়ে কেমন এক অনুভূতিতে চলে গেছে সে। বাউলের গানের তালে তালে যেন আদ্রিয়ানকে ফিল করছে সে। এদিকে বাউল আবারো গাইতে শুরু করলো,

‘ ফাঁক পাইলে সেই ময়না পাখি, যদি গো পালায়?'(২)
সকাল বিকাল তাই পাখিরে পুষি দুধ কলায়।’
পাখির সনে,
আমার সনে,
ভাব হয়েছে মনে মনে!'(২)

‘ তবু ভয়ে থাকি। উইড়া যেন না যায় আমার পোষা ময়না পাখি, পাখি চোখে চোখে রাখি
উইড়া যেন না যায় আমার পোষা ময়না পাখি।’

‘ ঘড় কুটার এক বাসা বাঁধলাম বাবুইপাখির মতো
এই হৃদয়ের ভালোবাসা, দিলাম আছে যত।’

এতটুকু গেয়ে জোরে নিশ্বাস ফেললো বাউল। বাউলকে থেমে যেতে দেখে আহি বেশ নিস্তব্ধ হয়ে তাকালো বাউলের দিকে। এরই মধ্যে বাউল কান্না ভেঁজা কন্ঠ নিয়ে গাইতে শুরু করলো,

‘ কোন ফাঁকে পালাইয়া গেলো পাইলাম নারে টের,
পাখিটা হইলো না আপন কপালেই ফের!'(২) ‘

এবারের লাইনটা শুনে যেন আঁতকে উঠলো আহি, এক মিনিটের জন্য হলেও বুকটা কেঁপে উঠল তাঁর। পলকবিহীন তাকিয়ে রইলো সে বাউলের মুখের দিকে। অশ্রু ভেজা চোখ নিয়েই গাইছে বাউল,

‘ ভাবের বুঝি অভাব ছিল, তাই এমন প্রতিশোধ নিলো!'(২)

কান্দাইলো দুই আঁখি, উইড়া গেছে খাঁচা ছেড়ে আমার পোষা পাখি।’
আমি দুঃখ কোথায় রাখি? উইড়া গেছে খাঁচা ছেড়ে আমার পোষা পাখি।’

‘ ঘড় কুটার এক বাসা বাঁধলাম বাবুইপাখির মতো
এই হৃদয়ের ভালোবাসা, দিলাম আছে যত।'(২)

‘ একটা ময়না পাখি সেই বাসা…য়
পুষে ছিলাম কত আশায়?’
আমি দুঃখ কোথায় রাখি, উইড়া গেছে খাঁচা ছেড়ে আমার পোষা পাখি।
আমি দুঃখ কোথায় রাখি,
উইড়া গেছে খাঁচা ছেড়ে আমার পোষা পাখি
উইড়া গেছে খাঁচা ছেড়ে আমার পোষা পাখি
উইড়া গেছে খাঁচা ছেড়ে আমার পোষা পাখি।’

গান শেষ হলেও যেন গানের রেশ কাটে নি আহির মাঝে। চোখ ভিজে গেছে তাঁর। কি গান গাইলো বাউল, বুকের ভিতর কষ্ট হচ্ছে আহির। আদ্রিয়ানকে হারিয়ে ফেলার ভয় এসে গ্রাস করলো তাঁকে। এদিকে বাউলও জোরে নিশ্বাস ফেললো চোখের পানি মুছে ফেললোও আরো কান্না পাচ্ছে তাঁর। ভালোবাসার মানুষকে হারানো যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক তা হয়তো উনিই ভালো জানেন।’

কিছুক্ষন ওভাবে কাটানোর পর আহি গিয়ে বসলো বাউলের পাশ দিয়ে তারপর বললো,

‘ আপনি কি ব্যর্থ প্রেমিক বাউল দাদু?’

হুট করে অচেনা কারো কন্ঠ কানে আসতেই হকচকিয়ে উঠলো বাউল। বিস্ময় ভরা চোখ নিয়ে আহির দিকে তাকিয়ে বললেন উনি,

‘ তুমি কে আর এইখানে কি করছো?’

‘ আমি আহি এখান থেকেই যাচ্ছিলাম হঠাৎই আপনার দোতারার শব্দ শুনে এগিয়ে আসলাম আপনি কি সুন্দর গান করেন। আমি মুগ্ধ বাউল দাদু, কিন্তু আপনার গান শুনে খুব কান্না পেল। আপনি কি সত্যি ব্যর্থ প্রেমিক বাউল দাদু?’

আহির হাসি মুখ থেকে যেন বিচলিত বাউল। সে ভাবে নি এখানে কেউ তাঁর গান শুনে তাঁর কাছে আসবে। আহির হাসি মাখা মুখটা দেখেও কেন যেন ভালো লাগলো তাঁর। বাউলকে চুপ থাকতে দেখে আবারো বলে উঠল আহি,

‘ কি হলো বাউল দাদু কথা বলছেন না কেন?’

উওরে বাউল নির্বিকার কন্ঠ নিয়ে বললো,

‘ হুম।’

বাউলের কথা শুনে আহি খুব আগ্রহ নিয়ে বললো বাউলকে,

‘ আমাকে বলবেন আপনার কাহিনী, আমি শুনতে চাই কি হয়েছিল আপনার জীবনে?’

আহির কথা শুনে বাউলেরও যেন বলতে ইচ্ছে হলো তাঁর জীবনের কাহিনি বলতে। এত বছরে কেউই এমন প্রশ্ন করে নি তাঁকে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন বাউল,

‘ এ ছিল আজ থেকে আরো চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর আগের কথা। আমি ঢাকার একদম শেষ প্রান্তে থাকা একটা ছোট্ট গ্রামে থাকতাম। বলতে গেলে যৌবন বয়স ছিল আমার। হয়তো তোমার মতোই বয়স ছিল। সারাদিন গান গাইতাম এখানে সেখানে। বিভিন্ন জায়গায় হেঁটে হেঁটে গান গাওয়াই ছিল আমার জীবনের লক্ষ্য। তখন আমার গ্রামের পাশের গ্রামের জমিদারের মেয়ে আমার গান শুনে খুবই মুগ্ধ হলো। রোজ বিকেলে আমার গান শোনার জন্য ঘাটপাড়ে বসে থাকতো। আমারও ভালো লাগতো। তারপর ধীরে ধীরে ভালোবাসা হয়ে গেল দুজনের মধ্যে। একজন আরেকজনকে ছাড়া যেন চলতো না দু’দন্ড কিন্তু,

এতটুকু বলে দম ছাড়লো বাউল। বাউলকে চুপ হতে দেখে বলে উঠল আহি,

‘ কিন্তু কি হলো বাউল দাদু?’

‘ হঠাৎই একদিন জমিদার মশাই আমাদের সম্পর্কের কথা জানতে পারলেন। সেদিন প্রচুর মেরেছিল আমায়। এরপর শুরু হলো অবহেলা আমাদের মধ্যে কথা বলা, দেখা হওয়া সব বন্ধ হয়ে গেল। একদিন জানতে পারলাম আমার পার্বতীর নাকি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।’

আর বলতে পারছে না বাউল চোখ ভেসে আসছে তাঁর। বাউলের কথা থেমে যাওয়ায় আবারো বললো আহি,

‘ বিয়ে কি হয়ে গিয়েছিল?’

উওরে বাউল আকাশ পথে তাকিয়ে বললো,

‘ না।’

‘ তাহলে কি হয়েছিল?’

‘ আমায় ছেড়ে আমার পার্বতী বহু দূরে চলে গেল এতটাই দূরে চলে গেল আমি চাইলেও কাছে আনতে পারতাম না।’

‘ বিয়ে যখন হয়নি তাহলে কোথায় গিয়েছিলেন উনি?’

আহির কথা শুনে নিস্তব্ধ হয়ে আকাশ পথে হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন বাউল,

‘ ওই যে দূর আকাশের তাঁরা হয়ে মাটির নিচে।’

সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে উঠলো আহি। চোখ ভিজে গিয়েছে তাঁর, বুক চিঁড়ে ভীষণ কান্না পাচ্ছে আহির।’

‘ শুনেছিলাম বিয়ের দিন নাকি বিষ খেয়ে আত্নহত্যা করেছিল ও। আমিও চেয়েছিলাম কিন্তু সাহসে কুলালো না। আর সেই থেকেই আমি এমন পথে পথে ঘুরি আর গান গাই।’

আহি কান্না ভেঁজা কন্ঠ নিয়ে বললো,

‘ আপনি বিয়ে করেন নি কেন?’

‘ ওর পর আর কাউকে মনেই ধরে নি। ধরলে নিশ্চয়ই করতাম, আজ তবে আসি বুঝলে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। তুমিও বাড়ি যাও এই জঙ্গলে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না।’

বলেই উঠে দাঁড়ালো বাউল। বাউলের পাশাপাশি আহিও উঠে দাঁড়ালো। বাউল আর কিছু না বলে এগিয়ে যেতে লাগলো সামনে হঠাৎই আহি বলে উঠল,

‘ আবার কবে আসবেন বাউল দাদু?’

উওরে বাউল খুশি মনে আহির দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ তা তো ঠিক নেই। ভালো থেকো আর তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেও।’

বলেই এগিয়ে গেল বাউল দোতারায় আওয়াজ করতে করতে। আর আহি নির্বিকার হয়ে তাকিয়ে রইলো বাউলের যাওয়ার পানে। নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো আহি,

‘ আদ্রিয়ান এখন প্লিজ চলে আসুন আমার কাছে, আপনিও হারিয়ে গেলে আমি সত্যি শেষ হয়ে যাবো।’

বলেই চোখের পানি মুছে উল্টো দিক ঘুরে হাঁটা শুরু করলো আহি।’

____

হঠাৎই ঘুমের ঘোরে আহিকে কাঁদতে দেখে অস্থির হয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো আদ্রিয়ান। আচমকাই বুকটা কেঁপে উঠলো তাঁর। বার বার মনে হচ্ছে আহি ভালো নেই কোনো কারনে?’ একরাশ অস্থিরতা এসে গ্রাস করলো তাঁকে। আনমনেই ভাবলো আদ্রিয়ান,

‘ যে করেই হোক খুব তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে হবে তাঁকে?’
!
!
!

#TanjiL_Mim♥️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here