বেদনার রং নীল পর্ব -১৭+১৮

#বেদনার_রঙ_নীল
সপ্তদশ পর্ব
লিখা- Sidratul Muntaz

রাইফা হাতের ডায়েরীটা লুকিয়ে অজান্তার ঘরে গেল। সেখানে তুলিকে খুঁজে পেল না। সে নিচে নামল। ড্রয়িংরুমের সোফায় ওইতো তুলিকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে ।তুলি যদি প্রশ্ন করে ডায়েরীর ব্যাপারে তাহলে রাইফা তার কাছে মিথ্যা বলতে পারবে না। কিন্তু সত্যিটাও রাইফা এখন বলতে চায় না। তুলি অবশ্য রাইফাকে এই বিষয় প্রশ্ন করলই না। বরং আজকে সে খুব কম কথা বলছিল। রাইফা যে একটা ডায়েরী লুকিয়ে রাখছে সেটা তুলি লক্ষ্য করেও কিছু বলল না৷ রাইফা নিজেই বলল,” ডায়েরীটা শানের। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্য নিয়েছি। কালকেই ফেরত দিয়ে দিবো।”

” ও আচ্ছা।” তুলি এর বাইরে একটা শব্দও খরচ করল না। বাড়ি ফেরার পর তন্বি আর রাইফা হাসি-খুশি গল্প-গুজব শুরু করল। কিন্তু তুলি তাদের সাথে শামিল হলো না। বারান্দায় বিরস মুখে বসে রইল সে। ডিনারের সময় যখন তন্বি তুলিকে ডাকতে বারান্দায় এলো তখন তুলি বলল,” আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তন্বি।”

” কি সিদ্ধান্ত?”

” এই বাড়িতে আমরা থাকবো না।”

তন্বি তুলির এমন কথার অর্থ বুঝতে পারল না। মাথা দুলিয়ে প্রশ্ন করল,” মানে কি?”

” তোর নাকি কোন খালা থাকে এইখানে? চল আমরা সেই খালার বাড়িতে গিয়ে উঠি। আমি একটা চাকরির চেষ্টা করবো। ভার্সিটির হল না পাওয়া পর্যন্ত আমরা ওখানেই থাকবো।”

তন্বি তুলির কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে প্রশ্ন করল,” তোর কি হয়েছে তুলি? সন্ধ্যা থেকেই কেমন মনখারাপ করে আছিস! কি ভাবছিস? এসব কথা কি ভেবে বলছিস? আমরা এখান থেকে চলে গেলে রাইফা কত কষ্ট পাবে জানিস না তুই?”

” কিন্তু মানুষের বাড়িতে এভাবে পড়ে থাকাও তো কোনো ভালো কাজ নয়।”

ঠিক সেই সময় রাইফা প্রবেশ করল বারান্দায়৷ তুলির শেষ কথাটা শুনতে পেয়েই তার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল৷ বুকের কাছে হাত গুটিয়ে প্রশ্ন করল কঠিন গলায়,” কি সমস্যা তোদের? কি গুজুরগুজুর করছিস?”

তন্বি বলল,” তেমন কিছু না।”

” আমি শুনেছি। এই বাড়িটা মানুষের বাড়ি তাই না? আমি কেউ না তোদের?”

তুলি কোনো কথা বলল না। তন্বি বলল,” আরে ছাড়তো, ওর যেন কি হয়েছে এজন্য এসব আবোল- তাবোল কথা বলছে। তুই কিছু মনে করিস না।”

” আরেকবার যদি এই ধরণের কথা শুনি তাহলে তোদের দুইটারই চুল ছিঁড়বো আমি।”

” আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝেছি। এখন যা।”

” খেতে আয় তুই। এটাকেও নিয়ে আয়।”

” আচ্ছা আমরা আসছি।”

তন্বি জোর করে রাইফাকে বারান্দা থেকে বের করে দিল৷ তারপর তুলির কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,” তোর কি হয়েছে? হঠাৎ এখান থেকে চলে যেতে চাইছিস কেন? কারো আচরণে কোনো কষ্ট পেয়েছিস? সূচি আন্টি কিছু বলেছে?”

” আরে সেরকম কিছু না। সূচি আন্টি আমাকে কি বলবে? তিনি তো খুব ভালোমানুষ। ”

” সেটাই তো আমি ভাবছি। তাহলে তোর কি হলো?”

” কিছু না। থাক বাদ দে। আমার মাথাব্যথা করছে।”

তুলি ডিভানের উপর বসে ছিল৷ এবার নিচে নেমে তন্বির সাথে ডাইনিংরুমে এলো। সূচি রাতের খাবার পরিবেশন করছেন। আয়োজন খুবই ভালো। হাঁসের ডিম ভুনা, গলদা চিংড়ি ভাজা, গরম ভাত আর ডাল। তুলির সবকিছুই বিষাক্ত লাগছিল। সে পারলে কাল থেকে শানকে আর পড়াতেও যেতো না। কিন্তু এখন হুট করে নিষেধও করা যায় না। সে নিজেই টিউশনিটা করতে রাজি হয়েছিল৷ নিষেধ করলে ব্যাপারটা ভালো দেখাবে না। সুতরাং তুলিকে যেতেই হবে। প্রতিদিন প্রণয়ের মুখোমুখি হতে হবে। আবার এইখানে থাকলে রাইফাকেও দেখতে হবে। বার-বার তুলির মন ক্ষত-বিক্ষত হবে। সে সহ্য করবে কি করে এসব? তার গলা দিয়ে খাবার নামছে না।

কলিংবেল বাজল৷ তুলি দরজার কাছে বসেছিল। তাই সূচি তাকে আদেশ দিলেন,” তুলি, দেখোতো মা কে এসেছে?”

তুলি হাত ধুঁয়ে দরজা খুলতে গেল। সে অন্যমনস্ক ছিল তাই লুকিং গ্লাসে না তাকিয়েই দরজা খুলে দিল৷ সামনে প্রণয়কে দেখে তুলির চোখ ছানাবড়া। প্রণয় হাসিমুখে বলল,” হায়।” তুলি বাকরুদ্ধ প্রায়। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। ভেতর থেকে আওয়াজ দিলেন সূচি,” কে এসেছে তুলি?”

প্রণয় নিজেই জবাব দিল,” আমি আন্টি। প্রণয়।”

তারপর সে তুলির দিকে তাকাল। তুলির মুখে তখনও কোনো রা নেই। চুপচাপ ড্রয়িংরুমের বাতি জ্বেলে গম্ভীর গলায় বলল,” বসুন আপনি।”

” বসবো মানে? আপনি যাচ্ছেন কোথায়? আমি তো আপনার কাছেই এসেছি।”

তুলির পা থমকে গেল। শান্ত গলায় জানতে চাইল,” আমার কাছে কেন?”

প্রণয় পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলল,” এটা ফেলে এসেছিলেন।”

তুলি আঁড়চোখে মোবাইলের দিকে একবার তাকাল। সে এটা ভুল করে ফেলে আসেনি। ইচ্ছে করেই রেখে এসেছিল। প্রণয় বলল,” এতো ভুলোমন কেন?”

” আপনি কি এটা দেওয়ার জন্যেই এই রাতেরবেলা এসেছেন?”

” আপনার কাছে এটা জরুরী না-ই মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এটা খুবই জরুরী। ”

তুলি বলতে চাইছিল, সে এটা নিতে চায় না। ঠিক সেই সময় সূচি প্রবেশ করলেন। প্রণয়কে দেখেই হাসিমুখে বললেন,” আরে প্রণয়, কি অবস্থা বাবা? কেমন আছো?”

” আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আন্টি। আপনি কেমন আছেন?”

সূচি প্রণয়ের পাশের সোফায় বসলেন,” ভালো আছি। তুমি হঠাৎ কি মনে করে?”

” মিস তুলি তার জরুরী একটা জিনিস আমাদের বাড়িতে ফেলে গেছিলেন। সেটাই দিতে এলাম।”

” এইরাতে? আগামীকাল তো ও তোমাদের বাড়ি যেতোই। তখন দিলেই হতো! কষ্ট করে এইসময় কেন আসতে গেলে বাবা?”

” কারণ জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ আন্টি। মোবাইল ফোন।”

” ওরে বাবা, তুলি কি ব্যাপার? তুমি মোবাইল কি করে ফেলে এলে? এমন ভুল কেউ করে?”

তুলি হাসার ভাণ ধরে মোবাইলটা হাতে নিল। তারপর প্রণয়ের দিকে চেয়ে বলল,” আপনাকে ধন্যবাদ।”

সূচি বললেন,” এসেছোই যখন, ডিনার করে যাও। আমরাও মাত্র খেতে বসেছিলাম।”

” না আন্টি। আমার কাজ হয়ে গেছে। আমি চলে যাই।”

” আরেকদিন এসো। তুমি তো আগে প্রায়ই এদিকে আসতে। এখন কেন আসো না?”

” আগে আমার এদিকে একটা টিউশনি ছিলো। তাই আসতে হতো। আর এখন একটু ব্যস্ত হয়ে গেছি।”

” বুঝেছি। পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ততা তাই না?”

” জ্বী আন্টি।”

” এসো কিন্তু আবার।”

” আসবো। আল্লাহ হাফেজ।”

প্রণয় যাওয়ার সময় তুলির দিকে তাকাল৷ কিন্তু তুলি অন্যদিকে ঘুরেছিল। সে চলে যেতেই দরজা আটকে সূচি বললেন,” তোমার ছেলেটাকে কেমন লাগে তুলি?”

তুলি চমকে উঠল এই প্রশ্নে। থতমত খাওয়া গলায় বলল,” জ্বী আন্টি, মানে?”

” মানে ছেলেটাকে তোমার পাত্র হিসেবে কেমন লাগে?”

” কার পাত্র?”

” রাইফার পাত্র।”

তুলির ভেতরটা ভস করে জ্বলে উঠল। সূচি খোশমেজাজে বললেন,” ছেলেটা সবদিক দিয়েই পারফেক্ট। রাইফার জন্য তাকে আমার খুবই পছন্দ। যদিও রাইফাকে এতো দ্রুত বিয়ে দেওয়ার প্ল্যান নেই। কিন্তু ভালো ছেলে পেলে অসুবিধাও নেই। তুমি কি বলো? ওদের বাড়িতে রেগুলার যাচ্ছো-আসছো। প্রণয়কে ভালো মনে হয়? সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে নাকি? অবশ্য আজ-কালকের ছেলে সিগারেট তো খাবেই। না খেলে সেটাই বরং বিস্ময়কর।”

তুলি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,” দুইদিনে কি আর মানুষ চেনা যায় আন্টি? কার মনে কি আছে সেটা কি করে বুঝবো?”

এই কথা বলেই সে চলে গেল। সূচি পড়ে গেলেন মহা দুশ্চিন্তায়। তুলি এই কথা কেন বলল? প্রণয়ের কোনো দোষ দেখেছে নাকি? তার মেঝোভাইটা তো হাফ মেন্টাল। পাহাড়ে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া অন্যকোনো কাজ নেই। গ্র্যাজুয়েশনটাও শেষ করেনি পাগলামির চক্করে। একদম ভবঘুরে ধরণের ছাগল। ছোট ভাইটা তো ফুল মেন্টাল৷ ছোটোখাটো একটা ভূমিকম্প। এদের মধ্যে প্রণয়কে একটু স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কিন্তু তুলির কথা শুনে মনে হচ্ছে, এখানেও ঘাপলা আছে। ধূর, ওই বাড়িতে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

প্রণয় বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠেই তুলিকে ম্যাসেজ করল। তুলি আবার খেতে বসে সেই ম্যাসেজটি দেখল,” আপনাকে বিণুনী বাঁধলে এতো মিষ্টি লাগে.. জানতাম না তো!”

অন্য সময় হলে এই ম্যাসেজ দেখে তুলি না হেসে পারতোই না। কিন্তু এই মুহূর্তে হাসি তো এলোই না বরং খাওয়ার রুচি চলে গেল। সে খাবার ডাস্টবিনে ফেলে হাত ধুঁয়ে নিল। রাইফা ফিল্টার থেকে নিয়ে পানি খাচ্ছিল। তুলিকে জিজ্ঞেস করল,” কে এসেছেরে?”

তুলি রূঢ় স্বরে উত্তর দিল,” তোর ফিয়্যান্সে।”

রাইফার প্রায় বিষম উঠে গেল। তুলি ততক্ষণে ঘরে ঢুকে গেছে। রাইফা বোকার মতো দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, রিসব এখানে কি করে আসবে? তার তো তাজিংডং এ থাকার কথা!

রাতে প্রণয় আরও অনেকবার তুলিকে ম্যাসেজ করেছিল। এই যেমন,” আপনি কিন্তু আজকেও গান শোনালেন না। আচ্ছা, এতো দ্রুত চলে এলেন কেন?”

” ফোন করা যাবে?”

” আপনি কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত? ইউ ক্যান শেয়ার উইদ মি!”

” ওয়েট, আজমীর কোনো ঝামেলা করেনি তো?”

তুলি কোনোবারই ম্যাসেজের রিপ্লাই করল না। প্রণয় সকালে ফোনও করেছিল। তুলি ধরল না।

শানের পড়ার টেবিলে বসে পা দুলাচ্ছে তুলি। কাল সারারাত ঘুম হয়নি বিধায় মাথাটা খুব ব্যথা করছে তার। ইচ্ছে করছিল না পড়াতে আসতে। কিন্তু না এসেও থাকতে পারছিল না। যেভাবেই হোক সে আজ প্রণয়ের মুখোমুখি হবে না। আর শান খালি আজকে একটা উনিশ-বিশ করুক। তাহলেই তুলি চলে যাবে। এই উছিলায় আর কখনোই পড়াতে আসবে না।

শান ভিতরে ঢুকেই তুলিকে সালাম দিল। তুলি সোজা হয়ে বসে সালামের উত্তর নিল। তারপর শানকে বসতেও বলল। শান চেয়ার টেনে বসল। আজকে ছেলেটাকে খুব শান্ত মনে হচ্ছে। অবশ্য প্রতিদিনই সে প্রথম দিকে শান্ত থাকে। তুলি নিশ্চিত, আজকেও শান কিছু একটা করবেই। তুলি সেই সময়টির অপেক্ষায় আছে। তুলি পড়ানোর জন্য বই বের করল। প্রথমেই সে শানকে একটা ম্যাথ করতে দিল। শান্ত যথেষ্ট বিনয়ের সাথে সমস্যাটির সমাধান করল। তুলি একটু আশ্চর্য হলো বটে। ব্যাপার কি? সাইক্লোন আজ কোনো কথা-বার্তাই বলছে না। শুধু ভদ্র ছেলের মতো পড়াশুনা করছে। দুই ঘণ্টা কিভাবে যেন পার হয়ে গেল। শান সম্পূর্ণ সময়টা নীরব ছিল। তুলির বিস্ময় যেন কাটছেই না। সে প্রশ্ন করেই বসল এক পর্যায়,” তোমার কি হয়েছে শান? আজকে এতো পড়াশুনা করছো? কোনো দুষ্টুমি নেই?”

শান তুলির প্রশ্নটা জবাব না দিয়ে অন্য কথা বলল,” আমি আপনার সাথে খুব ইম্পোর্টেন্ট একটা বিষয় নিয়ে ডিসকাশন করতে চাই।”

” ওরে বাবা, কি ইম্পোর্টেন্ট বিষয়?”

” আমি একটা মিশন শুরু করতে যাচ্ছি। সেই বিষয়ে আপনার হেল্প দরকার। আই থিংক ইউ ক্যান হেল্প মি!”

তুলি চিন্তায় পড়ে গেল। এইটুকু ছেলে আবার কি মিশন শুরু করতে যাচ্ছে? কার্টুন-ফার্টুন দেখে হয়তো মাথা নষ্ট হয়ে গেল নাকি?
তুলি বলল,” আচ্ছা কি মিশন??
“একটা মেয়েকে খুঁজে বের করার মিশন।”

এই কথাটা শুনে তুলির হাতটা গাল থেকে সরে নিচে পড়ে গেল। এই পুচকু ছেলে কি-না মিশন করবে তাও আবার মেয়ে খুঁজে বের করার মিশন? খুবই অদ্ভুত!

তুলি মুচকি হেসে বলল,” মেয়েটা কে? তোমার গার্লফ্রেন্ড?”

শান চোখ সরু করে মুখ কুচকালো,” ছিঃ, নো! আমার গার্লফ্রেন্ড কেনো হবে? আর গার্লফ্রেন্ড হলে আমি তাকে খুঁজবো কেনো?”

আসলেই তো, গার্লফ্রেন্ড হলে খুঁজবে কেন? তুলি মাথা নাড়িয়ে বলল,” ও আচ্ছা। তারমানে গার্লফ্রেন্ড না। তাহলে কে?”

“সেটাই খুঁজে বের করতে হবে। ”

” মানে?”

” লুক, উই হ্যাভ ওয়ান ক্লু অনলি। ”

শান কথাটা বলেই টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা রঙিন ওরনা বের করল।

” হেয়ার ইজ দিজ। এইটা আমি ভাইয়ার আলমারিতে পেয়েছি। এই ওরনার ওনারকে খুঁজে বের করতে হবে আমাদের।”

তুলি শানের হাত থেকে ওরনাটা নিল। এইটা তো রাইফার কাছে দেখেছিল সে। ওরনার একপাশে হালকা ছিঁড়েও গেছে। তুলির মনে আছে, এই ওরনা পরেই রাইফা মাঝে মাঝে কোচিং-এ আসতো৷ রিকশার হুডের সাথে খোচা লেগে ছিঁড়ে গেছিল। কোনো সন্দেহ নেই যে ওরনাটা রাইফার। কিন্তু এইটা শানের কাছে কি করে এলো? তুলি ওরনাটাকে ইনিয়ে-বিনিয়ে দেখতে লাগল৷ তার কোনো ভুল হচ্ছে না। এইটাই সেই ওরনা।

শান বলল,” ভাইয়া এইটা খুব যত্ন করে আলমারিতে তুলে রেখেছে। এর মানে এইটা খুব স্পেশাল। ভাইয়া সহজে কোনোকিছুর যত্ন নেয় না।সামথিং ইজ ফিশি! আই থিংক ভাইয়া ইজ ইন লভ উইথ দিজ গার্ল।

তুলি কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার মাথাটা আবার ব্যথা করছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,” তোমার সাথে এই বিষয়ে অন্য একদিন কথা বলবো শান। আমি আসছি।”

তুলি ঘর থেকে বের হয়ে গেল। চোখ উপচে জল পড়ছে। তুলি বামহাতে চোখের জল মুছে নিল। সে হয়তো ভুলেই গেছিল, শান প্রণয়কে রেডলাইট বলে ডাকে। কিন্তু ‘ভাইয়া’ বলে সে ডাকে অন্যকাউকে!

তুলি যখন করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তখন আচমকা প্রণয় এসে হাত চেপে ধরল তার। তুলি রাগান্বিত দৃষ্টিতে বলল,” আপনার প্রবলেম কি? আমাকে ছাড়ুন।”

” প্রবলেমটা তো আপনি বলবেন। আমার ফোন ধরছেন না কেন?”

” আমার ইচ্ছা!”

” ওয়াও, সবকিছু আপনার ইচ্ছাতেই হবে? ইচ্ছা করলেই আপনি মানুষ মেরে ফেলবেন?”

” আশ্চর্য! আমি কাকে মারলাম?”

প্রণয় তুলির ব্যাগ খুলে মোবাইলটা বের করল। তারপর মিসডকল অপশন দেখিয়ে বলল,” দেখুন, ফিফটি এইট মিসডকলস। কোনো ধারণা আছে আপনার?সারাদিন ধরে কল দিয়েছি। অথচ একবারও ধরেননি। কয়টা ম্যাসেজ দিয়েছি?”

তুলি ঝাঁজালো কণ্ঠে বলল,” আপনি ফোন দিলেই ধরতে হবে এমন শর্ত নিয়েই কি মোবাইলটা দিয়েছিলেন? তাহলে আপনার মোবাইল আপনার কাছেই রাখুন৷ আমার দরকার নেই। টাইমপাস করার জন্য অন্যকাউকে খুঁজে নিন। আমি ওই ধরণের মেয়ে না।”

তুলি চলে যেতে লাগল। প্রণয় হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সে পুনরায় তুলির হাত চেপে ধরে বলল,” থামুন। আপনার কি হয়েছে আমাকে বলুন তুলি। হঠাৎ এমন কেন করছেন?”

” আমার খুব রাগ হচ্ছে প্রণয়। কথায় কথায় হাত টেনে ধরবেন না। হাত ছাড়ুন।”

প্রণয়ের মাথা তখন অনেক গরম। সে তুলির হাত তো ছাড়লই না বরং আরও শক্তভাবে টেনে ধরে তাকে কাছে টেনে বলল,” ছাড়বো না।”

তুলি ঠাস করে চড় মারল প্রণয়ের গালে। প্রণয় কিংকর্তব্যবিমুঢ়। এবার অনায়াসেই ছেড়ে দিল সে হাত। তুলি ঘৃণ্যদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থেকে চলে এলো। রাইফা আজকেও তুলিকে নিয়ে যেতে এসেছে। তুলি নিচে নামছিল দেখে রাইফা বলল,” কিরে, আজকে এতো দেরি হলো যে?”

তুলি রাগে কটমট করে বলল,” তুই এখানে কেন এসেছিস?”

রাইফা হকচকিয়ে গেল,” মানে?”

” প্রতিদিন তোর এখানে কেন আসতে হবে? তোর তো এখানে কোনো কাজ নেই!”

“আমি তো তোকে নিতে এসেছি।”

” আমি কোনো বাচ্চা না যে প্রতিদিন আমাকে নিতে আসতে হবে।”

” তুলি তুই এইভাবে কথা বলছিস কেন?”

মিষ্টি এসে হঠাৎ বলল, ” রাইফা, তুলি আজকে এমনিতেও দেরি হয়ে গেছে। এখন তোমাদের যাওয়ার দরকার নেই। আজকে বরং তোমরা ডিনার করে যাও কেমন?”

তুলি নিষেধ করতে চাইল কিন্তু এর আগেই রাইফা আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো হেসে বলল,”ঠিকাছে আপু!”

তুলি আর রাইফা পাশাপাশি চেয়ারে বসল। রাইফার কারণে তুলিকেও বাধ্য হয়ে খেতে বসতে হয়েছে। কিন্তু তার কিছুই মুখে দিতে ভালো লাগছে না। তাদের ঠিক বরাবর টেবিলের বিপরীত পাশে বসে আছে শান। খুব শান্তভঙ্গিতে ছেলেটা প্রায় দশমিনিট ধরে খেয়ে যাচ্ছে। এমন ভাবে খাচ্ছে যেন খাওয়া ছাড়া পৃথিবীতে আর কিচ্ছু নেই। পৃথিবীর সবথেকে ভদ্র ছেলে সে। তার মনে নেই কোনো শয়তানি, আছে শুধু সরলতা। ঠিক এই মুহুর্তে শানকে কেউ দেখলে মনে করবে এর থেকে নিষ্পাপ আর কেউ হতেই পারেনা। ভাজা মাছ উল্টে খাওয়াও তাকে শিখিয়ে দিতে হবে। রাইফা অনেকক্ষণ ধরে শানের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। সেদিকে শানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই বললেই চলে। সে তো খাওয়া নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। এমনকি তাকে বেড়েও দিতে হচ্ছে না। যেটা দরকার লাগছে নিজেই নিয়ে নিচ্ছে। তারপর আবার জায়গার টা জায়গা মতো রেখেও দিচ্ছে। রাইফা ঠাট্টার সুরে বলল, ” বাহ, ফরমালিটি কি জিনিস, ম্যানার্স কি জিনিস একে দেখেই তো শেখা উচিত!”

শান এই কথা শুনে আঁড়চোখে একবার তাকাল। রাইফা আদুরে কণ্ঠে বলল,” শান বেবি, কেমন আছো তুমি?”

শান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আঙ্গুল চাটতে শুরু করল। দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা বলার বা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাইফা আতঙ্কিত হয়ে তুলির হাত খামচে ধরল। ভয় লাগছে তার। বেশ তো শান্ত হয়ে বসে খাচ্ছিল ছেলেটা! কি দরকার ছিল পাগল ক্ষেপানোর? এখন যদি কিছু উল্টাপাল্টা করে? যদি খাবারের ঝোল নিয়ে রাইফার মুখে মেরে দেয়? তখন কি হবে?

শান অবশ্য এমন বেয়াদবি করল না। সে খুব শান্ত ভঙ্গিতে বলল,” ডোন্ট কল মি বেবি। আই এম নট ইউর বেবি।”

শানের উত্তর শুনে রাইফার এক ভ্রু উঁচু করে তাকাল। এইটুকু ছেলের এতো অ্যাটিটিউড! ভাবা যায়? এমন সময় মিষ্টি এসে বসল। তুলি আর রাইফাকে দেখে বলল, ” তোমরা খাচ্ছো না কেন?”

রাইফা হাসি মুখে বলল,” এইতো খাচ্ছি আপু। আন্টি কোথায়? আমাদের সাথে খাবে না?”

” ছোটমা সময়মতো খেয়ে নেয়।”

” ও আচ্ছা। তাহলে প্রণয় কোথায়? তাকেও ডাকো।”

প্রণয়ের নাম শুনে তুলির খাওয়া থেমে গেল। রাইফার উপর রাগ হলো। মিষ্টি প্রণয়কে ডাকছে। একটু পরেই প্রণয় হাজির হলো। তাকে দেখে তুলির অস্বস্তি বাড়ল। মিষ্টি বলল,” খেতে বস ভাই।”

প্রণয় গুমোট কণ্ঠে বলল,” আমি খাবো না আপু।”

” হঠাৎ খাবি না কেন?”

প্রণয় তুলির দিকে চেয়ে অকপটে বলল,”যেটা খেয়েছি সেটাই তো এখনও হজম হচ্ছে না। ”

তুলি আৎকে উঠল। মিষ্টি চিন্তিত গলায় বলল,” হজম হচ্ছে না মানে? কি এমন উল্টা পাল্টা খেয়েছিস তুই?”

প্রণয় ভারী কণ্ঠে জানাল,” প্রথমবার তো, তাই হজম হচ্ছে না। ”

প্রণয়ের কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে তুলির ইচ্ছে করছে মাটির সাথে মিশে যেতে। সে একদম পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল।
মিষ্টি আবার বলল,” প্রথমবার মানে?তুই কিসের কথা বলছিস?”

প্রণয় কোনো উত্তর দিল না। তুলির প্রায় হিঁচকি ওঠার উপক্রম। গলায় খাবার আটকে গেছে। কিছুতেই নামছে না। প্রণয় কি তাকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্যই এসব বলছে? আপাতত কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সে আশেপাশে কেবল পানি খুঁজতে লাগল। ঠিক এমন সময় শান বলে উঠল,” আই থিংক, মিস কিউটিপাই রেডলাইটকে কিস করেছে!”

শানের কথায় মিষ্টির চোখ চড়কগাছ। প্রণয় অবাক হয়ে তাকাল। গতকালকের ঘটনা দেখেই কি শান এই কথা বলছে? সে ভাবতেও পারেনি শান ব্যাপারটা এইভাবে বুঝবে। তুলির আর পানি খাওয়া হল না। খাবার মুখে নিয়েই হিঁচকি তুলতে লাগল সে। রাইফা কেবল সবার অবস্থা দেখে যাচ্ছে। কি হচ্ছে বা হয়েছে তার কিছুই সে বুঝতে পারল না।

চলবে।#বেদনার_রঙ_নীল
অষ্টাদশ পর্ব
লিখা-Sidratul Muntaz

প্রণয় কাশছে। তুলিও হিঁচকি তুলছে। দুজনেরই হঠাৎ কি যেন হয়ে গেল। প্রণয়ের কাশির পরিমাণ কমে এলেও তুলির অবস্থা খুবই খারাপ। মনে হচ্ছে এখনি বমি করে দেবে। মিষ্টি তড়িঘড়ি করে তুলিকে পানি দিল। পানিটা খেয়েই তুলি দাঁড়িয়ে গেল। প্রণয়ের যেন খুব জরুরী কোনো কাজ মনে পড়েছে এমন ভাণ করে সে এখান থেকে চলে গেল। রাইফা আর মিষ্টিও উঠে দাঁড়িয়েছে। এখন শুধু বসে আছে শান। তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয়নি এখানে।

মিষ্টি তুলির কাঁধে হাত রেখে বলল,” তুমি কি ঠিকাছো? বসো। খাবার টা শেষ করে নাও। আর শানের কথায় কিছু মনে কোরো না।”

তারপর সে শানের দিকে চেয়ে ধমক দিল,” এই শান, এইসব কি ধরনের কথা বলিস তুই? এক্ষনি স্যরি বল তুলি আপুকে।”

শান ভ্রু কুঁচকালো। দায়সারাভাবে বলল,” আমার কি দোষ? আমি তো জাস্ট গেইস করলাম।”

” তোকে এমন উল্টা-পাল্টা গেইস করতেই বা কে বলেছে? বেয়াদব! স্যরি বল দ্রুত।”

তুলি মিষ্টির হাতের উপর হাত রেখে প্রশমিত কণ্ঠে বলল,” থাক মিষ্টি আপু। আমি কিছু মনে করিনি। এইখানে শানের কোনো দোষও নেই। ও ছোটমানুষ।”

” অবশ্যই দোষ আছে। আর ও তোমাকে স্যরিও বলবে। স্যরি বল শান?”

শান নরম কণ্ঠে বলল,” স্যরি তুলি আপু। ডোন্ট মাইন্ড প্লিজ!”

রাইফা অবাক হয়ে তাকাল। শানের কণ্ঠে ‘স্যরি’ যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য ঘটার মতো ব্যাপার। তুলি বলল, ” ইটস অলরাইট। ”

তারপর সে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,” আপু আমি না আর খেতে পারবো না।”

” আচ্ছা কোনো সমস্যা নেই। তুমি যাও গিয়ে হাতটা ধুঁয়ে নাও। ”

তুলি হাত ধুঁতে গেলে রাইফাও তার পেছনে এলো।তুলি পানির কল ছেড়ে হাত ধুঁয়ে নিচ্ছিল। রাইফা এই ফাঁকে জিজ্ঞেস করল,” দোস্ত, শান ওই রকম কথা কেনো বলল?”

তুলি ঝাঁজ মেশানো কণ্ঠে উত্তর দিল,”আমি কি জানি? যে বলেছে তাকে জিজ্ঞেস কর।”

” সে তো আর অযথা এসব বলবে না। তার মাথায় এমন একটা ভাবনা এলো কি করে?”

” জানি না।”

” প্রণয়ও আজকে কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছিল তাই না? আচ্ছা তুলি, প্রণয়কে তোর কেমন লাগে?”

তুলি আঁড়চোখে চেয়ে বলল,” মানে?”

” মানে সে কিন্তু খুব ভালো ছেলে। দেখতেও কত হট, না? ক্রাশ খাওয়ার মতো। তোর প্রণয়কে হট লাগে না?”

রাইফা ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তুলি ব্যাপারটাকে উল্টোভাবে বুঝল। ঈর্ষায় জ্বলে উঠল তার মন। কোমরে হাত রেখে বলল,” তোর প্রণয়ের গুণগান গাওয়া শেষ হলে এবার কি আমরা যেতে পারি?”

” তুই কি বিরক্ত হচ্ছিস?”

“হ্যাঁ। প্রচুর বিরক্ত আমি।”

তুলি এই কথা বলেই গটগট করে চলে গেল। রাইফা হাঁ করে তাকিয়ে তুলির চলে যাওয়া দেখল। সে ভেবেছিল প্রণয়ের প্রশংসা শুনলে তুলি লজ্জা পাবে। তাদের মধ্যে কিছু একটা চলছে এই ব্যাপারে রাইফা নিশ্চিত। কিন্তু এখন তুলি এমন ব্যবহার করল কেন? আর এতো রেগে যাওয়ার মতোই বা কি হলো! রাইফা বিভ্রান্ত।

প্রণয় ঘরে এসে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল৷ তার এই মুহূর্তে ইচ্ছে করছে গাড়ি নিয়ে কোথাও চলে যেতে। অনেক বেশি মনখারাপ হলে কিংবা মেজাজ বেশি গরম হলে তার এরকম লাগে। এই মুহূর্তে তার মন খারাপ নাকি মেজাজ গরম সেটা নিজেও বুঝতে পারছে না সে। গাড়িটা সুস্থ থাকলে সে ঠিকই কোথাও একটা চলে যেতো এইরাতে। কিন্তু বাড়ির গাড়ি নিয়ে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। তাহলে বাড়ির মানুষ ঝামেলায় পড়বে। প্রণয় গ্যারেজ মেক্যানিকের কাছে ফোন করে অযথাই কিছুক্ষণ রাগ ঝারল।

” গাড়ি ঠিক হতে কয়দিন লাগবে?”

” এইতো স্যার, দশ-এগারো দিন।”

” এখনও দশ-এগারো দিন কেন? দশ-এগারো ঘণ্টা সময় দেওয়া হলো। এর মধ্যে সব রেডি চাই।”

” স্যার কি পাগল হয়ে গেছেন?”

” শাট আপ, আমি পাগল হয়ে গেছি মানে কি? আপনারা কি ঘোড়ার ডিমের কাজ করেন? ”

বাইরে থেকে প্রণয়ের গর্জন শুনে ভেতরে প্রবেশ করল রাইফা,” কি হয়েছে? এনিথিং রং?”

প্রণয় ফোন রেখে বলল,” নাথিং। তুমি কিছু বলবে?”

” তোমাদের মাঝে কি হয়েছে প্রণয়?”

প্রণয় বুঝেও না বোঝার ভাণ করল,” আমাদের মানে? কাদের?”

” তোমার আর তুলির কথা বলছি।”

প্রণয় অনীহা প্রকাশ করতে অন্যদিকে চাইল। গম্ভীর গলায় বলল,” এই বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই না।”

” কেন? যদি কোনো প্রবলেম হয়ে থাকে তাহলে আমার সাথে শেয়ার করতে পারো। আই ক্যান হেল্প ইউ।”

প্রণয় বিরক্তি ঝরা কণ্ঠে বলল,” তোমার বেস্টফ্রেন্ডের মাথায় প্রবলেম আছে তাই না?”

রাইফা হেসে উঠল। জানতে চাইল,” কেন?”

প্রণয় ঘুরে তাকিয়ে অভিযোগের স্বরে বলল,” আমি ওকে একটুও বুঝতে পারছি না। ও কি চায়? প্রথমে আমার মনে হয়েছিল ও আমাকে পছন্দ করে। কিন্তু এখন ওর আচরণে মনে হচ্ছে আমাকে সহ্যই করতে পারে না। আজকে ও একটা সিলি ম্যাটার নিয়ে আমাকে চড় মেরেছিল জানো?”

রাইফা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে উচ্চারণ করল,” সিরিয়াসলি? ও তোমাকে চড় মারল? আই কান্ট বিলিভ! তুলি তো এতো রুড না!”

” আমি জানি না ওর কি হয়েছে। ও আমার মাথা খারাপ করে ছাড়বে।”

রাইফা প্রণয়ের কাছে গিয়ে আলতো গলায় প্রশ্ন করল,” ডু ইউ লভ হার?”

প্রণয় শান্ত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,” এক্সট্রিমলি!”

রাইফার চোখ দু’টি আনন্দে ঝলমলিয়ে উঠল। উল্লাসে বিচলিত হয়ে বলল,” আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। ডন্ট ওরি! আমি ওর সঙ্গে কথা বলবো। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

” আমার কথা বোলো না প্লিজ। তাহলে ভুল বুঝতে পারে।”

” নো টেনশন। আমি ওকে কিছু বুঝতেই দিবো না।”

” থ্যাঙ্কিউ। ”

” মেনশট নট, ব্রাদার-ইন-ল।”

” রিসবের সাথে তো এখনও তোমার বিয়ে হয়নি রাইফা।”

প্রণয়ের মন্তব্যে খানিক থমকালো রাইফা। তারপর আরক্ত দৃষ্টিতে বলল,” উহুঁ,আমি সেটা মিন করিনি। তুলির সাথে যদি তোমার অ্যাফেয়ার হয় তাহলে তো তুমি আমার ব্রাদার-ইন-ল হবে তাই না?”

প্রণয় হাসল। রাইফা বাম চোখ টিপে বলল, ‘ বাই।’

তুলি ড্রয়িংরুমে বসেছিল রাইফার অপেক্ষায়। তাকে উপরে প্রণয়ের ঘর থেকে বের হতে দেখে তুলির মনটা ফুসঁ করে খারাপ হয়ে গেল। সে বিষণ্ণ হয়ে একাই গাড়িতে গিয়ে বসে রইল। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলেন,” রাইফা ম্যাডাম কোথায়?”

তুলি কঠিন জবাব দিল,” আমি জানি না।”

একটু পর রাইফা গাড়িতে এসে অবাক হয়ে বলল,” তুই কোথায় ছিলি তুলি? তোকে কত খুঁজলাম আমি!”

” আমাকে খোঁজার সময় আছে তোর? তুই তো এখন অনেক ব্যস্ত!”

রাইফা তুলির অভিমানী কথার অর্থ বুঝল না। হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল,” দিন দিন তুই কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিস!”

তুলি মনে মনে বলল,” আমার জায়গায় থাকলে বুঝতি।”

” জানিস, প্রণয়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম৷ সে তার দুঃখের কাহিনী আমাকে শোনাচ্ছিল।”

তুলি নিজের কান দু’টো চেপে ধরে বলল,” আমি এসব শুনতে চাই না।”

” আজব, তুই এমন করছিস কেন?”

তুলি জবাব দিল না। রাইফা নিজের মতো বলে গেল,” প্রণয়ের ছোট্টবেলা থেকে বাবা-মা কেউ নেই। আন্টি তো শানকে জন্ম দিতে গিয়েই মারা গেলেন। আর আঙ্কেল মানে প্রণয়ের বাবা স্ত্রীকে এতো ভালোবাসতেন যে স্ত্রীর মৃত্যুর চল্লিশ দিনের মাঝে তিনিও চলে গেলেন ওপারে। মিষ্টি আপু, প্রণয় আর ছোট্ট শান, এই তিন ভাই-বোন মা-বাবা ছাড়া একাই বড় হচ্ছিল। যদিও বংশগতভাবে ওদের টাকা-পয়সার অভাব ছিল না। কিন্তু একজন অভিভাবকও তো লাগে। তখন অজান্তা আন্টি এলেন তাদের জীবনে। অজান্তা আন্টির একমাত্র ছেলে রিসবকে নিয়ে তিনি ছিলেন সিঙ্গেল মাদার। আবার সম্পর্কে তিনি প্রণয়ের ছোটখালা। স্বামীর সাথে তার ডিভোর্স হয়ে গেছিল। এজন্যই তিনি সব ছেড়ে প্রণয়দের বাড়িতে চলে এসেছেন। তারা সবাই অজান্তা আন্টিকে অনেক ভালোবাসে। ”

” বুঝলাম। এজন্যই তারা অজান্তা আন্টিকে ছোট মা বলে ডাকে?”

” ঠিক বলেছিস।”

” আর রিসবের কি হলো?”

রিসবের প্রসঙ্গ আসায় রাইফা খানিক অপ্রস্তুত হলো। লাজুক কণ্ঠে বলল,” সে তো ভবঘুরে। তবে বর্তমানে তার একটাই কাজ, পর্বত আরোহণ করা। শুনেছি সে খুব শীঘ্রই ঢাকা আসছে। তখন দেখা হবে।”

” ও।”

” বলছিলাম প্রণয়ের ব্যাপারে। সে কত ভালো ছেলে জানিস? ওকে তুই ভুল বুঝিস না প্লিজ৷ তোকে কিছু উদাহরণ দেই।”

” রাইফা, আমি তোর কাছে প্রণয়ের প্রশংসা শুনতে চাইছি না।”

রাইফা জেদ নিয়ে বলল,” আমি বলতে চাইছি। তাই তোকে শুনতেই হবে। আঙ্কেলের মৃত্যুর পর প্রণয় খুব ছোট ছিল। মিষ্টি আপুও কিশোরী। তাই তাদের ফ্যামিলি বিজনেস হ্যান্ডেল করার মতো কেউ ছিল না। ওই অবস্থায় অজান্তা আন্টি অফিসে বসতেন। ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। তিনি অসংখ্য লোককে অনেক মাসের বেতন না দিয়েই ছাঁটাই করেছিলেন। আসলে এমন করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু প্রণয় ম্যাচিউর হওয়ার পর বুঝতে পারল ওই ইমপ্লয়িদের কাছে তার বাবা সারাজীবন অপরাধী হয়ে থাকবে। এই ভাবনাটা তার মাথায় এনেছিল প্রিয়ন্তীর বাবা। তিনিও প্রণয়দের অফিসে চাকরি করতেন। আর প্রিয়ন্তী প্রণয়ের ক্লাসমেইট ছিল। প্রণয় কি করল জানিস? সেই সব ইমপ্লয়িদের লিস্ট নিয়ে নিজস্ব ফিক্সড ডিপোজিট থেকে সবার পাওনা শোধ করে দিল। এদের মধ্যে অনেকেই ছিল যারা মারা গেছে। আবার কারো কারো হদিশ পাওয়া যায়নি। প্রণয় তারপর তার বাবার নামে একটা ফাউন্ডেশন চালু করল। যেখান থেকে অভাবী মানুষরা চাইলেই বিনা শর্তে লোন নিতে পারবে। সেই ফাউন্ডেশন এখনও আছে। তুই দেখবি?”

” আমার দেখার ইচ্ছে নেই। আর এসব সে কেন করেছে? নাম কামানোর জন্য তাই না? যেন সবাই তার বাবার নাম স্মরণ করে!”

” হ্যাঁ। এইটুকুই বা কয়জন ছেলে করে বল? বাবার মৃত্যুর পরেও বাবার সম্মান নিয়ে কেউ এতো চিন্তা করে?”

তুলি জবাব দিল না। প্রণয়ের প্রতি দূর্বলতা সে কাটাতে চায়।

রাতেও ঘুমানোর সময় রাইফা প্রণয়ের প্রসঙ্গ টেনে আনল। তুলি বিরক্ত হয়ে বারান্দায় চলে গেল। রাইফা সাথে সাথেই প্রণয়কে ফোন করল,” হ্যালো প্রণয়, জেগে আছো?”

” হ্যাঁ। কিছু কাজ ছিল।”

” এতো শব্দ কেন? তুমি কি বাইরে?”

” হুম। ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছিলাম।”

” তুলির ব্যাপারে কথা বলতে চাই।”

” ওকে বলো।”

” তুলিকে আমি তোমার ব্যাপারে যা বলার বলেছি। আমার মনে হয় ও তোমাকে পছন্দ করে। তুমি ওকে প্রপোজ করে দিচ্ছো না কেন?”

প্রণয় বিস্মিত কণ্ঠে বলল,” এইভাবে কিভাবে প্রপোজ করে দিবো রাইফা? ও যদি আমাকে পছন্দ করতো তাহলে আমার ফোন ফিরিয়ে দিতো না। আমাকে ওইভাবে চড় মারতো না। আমি শিউর ও আমাকে পছন্দ করে না৷ তাহলে আমি কিসের ভরসায় ওকে প্রপোজ করবো? রিজেক্ট হওয়ার জন্য?”

” বুঝেছি। তুলি আসলে তোমার ইম্পোর্ট্যান্স বুঝতে পারছে না৷ তুমি একটা কাজ করো। ওকে ইগনোর করো।”

” এটা করলে কি লাভ?”

তুলি বারান্দা থেকে বের হলো। রাইফা আর কথা বলতে পারল না। তাকে অতি দ্রুত চুপ করতে হলো। তুলি বলল,” কি ব্যাপার? কার সঙ্গে কথা বলছিস তুই?”

রাইফা মৃদু হেসে বলল,” প্রণয়।”

তুলি ফুঁসে ওঠা কণ্ঠে বলল,” ও। তাহলে তো তোর এখন প্রাইভেসী দরকার। আমি বারান্দায় চলে যাবো নাকি তুই অন্যরুমে যাবি? ”

” কি বলছিস? আমি অন্যরুমে কেন যাবো?”

” তন্বি তো ঘুমিয়ে আছে। যদি উঠে যায় তাহলে তোর প্রাইভেসী নষ্ট হবে না?”

রাইফা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তুলি বারান্দায় ঢুকে দরজা আটকে দিল ধপাস করে। এই ঘটনা দেখে হঠাৎ রাইফার মাথায় বুদ্ধি এলো। সে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,” আইডিয়া পেয়েছি প্রণয়। তুলি তোমার সাথে আমাকে কথা বলতে দেখলে জেলাস করে৷ এর মানে সামথিং সামথিং। বুঝতে পারছো?”

” হ্যাঁ, পারছি।”

” তাহলে চলো, আমরা একটা প্রিটেন্ড করি।”

” সেটা কিরকম?”

” তুলির সামনে আমরা কাপল হওয়ার একটিং করবো। তুলি ভাববে আমরা রিলেশনে আছি৷ তারপর ও জেলাস করবে।”

প্রণয় বিব্রত কণ্ঠে বলল,” না, না, খুব ফিল্মি আইডিয়া এটা।”

” তবুও একবার ট্রাই করে দেখি! যদি কাজ হয়?”

তুলি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ থেকে টুপটুপ করে জল পড়ছিল৷ ওইপাশে রাইফার গুজুরগুজুর কথার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তুলি ওসব শুনতে চায় না। তবুও তার শুনতে হচ্ছে। যদিও সে কোনো কথা স্পষ্ট বুঝতে পারছে না, তবুও তার কষ্ট হচ্ছে। কারণ রাইফা যে মানুষটির সঙ্গে কথা বলছে, সে প্রণয়। তুলির আকাঙ্ক্ষিত পুরুষ।

ইদানিং শানকে পড়াতে গেলে প্রণয় খুব একটা বিরক্ত করে না তুলিকে। সে দূরেই থাকে। আর শানও আগের মতো ঝামেলা করে না। আজ-কাল সে ভদ্র বাচ্চা হয়ে গেছে। তবে কিছু সমস্যা হচ্ছে। শান আর প্রণয়ের ঘর পাশাপাশি হওয়ায় সমস্যাটা তুলির নজরে বেশি লাগছে। শানের ঘরের একটা দেয়ালে সবসময় পর্দা দেওয়া থাকে। ওই পর্দা সরালেই কাঁচের দরজা। দরজার ওই পাশে প্রণয়ের ঘর। ট্রান্সপারেন্ট দরজা দিয়ে প্রণয়ের বিচরণ খুব সহজেই লক্ষ্য করা যায়। সে হেঁটে হেঁটে কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলে। আজকে তুলি না পারতে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,” তোমার ভাইয়া কার সঙ্গে কথা বলে সাইক্লোন?”

শান খেয়াল করে দেখল প্রণয় হাসছে। সে একটু বিভ্রান্তি নিয়ে বলল,” মেইবি গার্লফ্রেন্ড।”

তুলি রেগে বলল,” প্রত্যেকদিন এইখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হবে কেন? তুমি তোমার ভাইয়াকে বলো সে যেন অন্যকোথাও গিয়ে তার প্রাইভেট টকিং করে৷ এখানে আমাদের পড়াশুনার ডিস্টার্ব হয়।”

শান মাথা নেড়ে বলল,” ওকে। বলছি।”

শান ট্রান্সপারেন্ট দরজা খুলে প্রণয়ের মনোযোগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে তালি বাজালো। কিন্তু প্রণয় ফোনে এতোই মগ্ন যে কোনোদিকে তার খেয়াল নেই। শান একটু শব্দ করে বলল,” রেডলাইট,মিস তোকে বলেছে অন্যকোথাও যেতে।”

প্রণয় অবাক হয়ে বলল,” কি ব্যাপার?”

শান আগের কথাটাই আবার বলল,” মিস তোকে বলেছে অন্যকোথাও যেতে। এখানে আমাদের ডিস্টার্ব হচ্ছে।”

প্রণয় আঁড়চোখে তুলির দিকে একবার তাকাল। তারপর ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলল,” এটা আমার ঘর। আমি যেখানে খুশি দাঁড়িয়ে কথা বলবো। তোর মিসের এতো প্রবলেম হলে তাকে বল অন্যকোথাও গিয়ে পড়াতে।”

তুলি ক্ষেপে উঠে দাঁড়ালো। বই-খাতা গুছিয়ে নিতে নিতে বলল,” চলো শান, আমরাই না হয় অন্যকোথাও গিয়ে বসি।”

তারপর প্রণয়ের দিকে গরম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বেরিয়ে গেল তুলি। শানও বের হলো। প্রণয় সন্তুষ্ট হয়ে বলল,” তোমার আইডিয়া কাজ করছে রাইফা। তুলি সত্যিই জেলাস করছে।”

রাইফা সবকিছু শুনে খুশিতে আটখানা হয়ে বলল,” আগেই বলেছিলাম! এইবার কাজ হবে।”

প্রতিদিনের মতো আজকে আর তুলিকে নিতে রাইফা এলো না। সুতরাং তুলিকে একাই বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু মিষ্টি তুলিকে একা ছাড়তে নারাজ। সে প্রণয়কে ডেকে বলল,” তুলিকে একটু পৌঁছে দে না ভাই!”

প্রণয় কিছু বলার আগেই তুলি বাঁধ সাঁধল,” সমস্যা নেই। আমি একাই চলে যেতে পারবো।”

প্রণয় এই কথা শুনে বলল,” ওকে। বেস্ট অফ লাক। ”

মিষ্টি রেগে বলল,” এইটা কি ধরণের কথা প্রণয়? ও একা কিভাবে যাবে? যা তুই ওর সাথে।”

তুলি মাথা নিচু করে অভিমানী কণ্ঠে বলল,” থাক লাগবে না মিষ্টি আপু। উনি মনে হয় ব্যস্ত।”

” একদম না। কিসের ব্যস্ততা ওর? প্রণয় তুই যা।”

প্রণয় শিষ বাজাতে বাজাতে বের হলো। তুলি মিষ্টির থেকে বিদায় নিয়ে প্রণয়ের পেছনে এলো। কেউ কোনো কথা বলছিল না। চুপচাপ দু’জন দুইপাশে বসে রইল। গাড়ি চলতে শুরু করল। দশমিনিট পর তুলি হঠাৎ খেয়াল করে বলল,” আমরা কোথায় যাচ্ছি? এটা তো বাসার রাস্তা না!”

প্রণয় নির্বিকার কণ্ঠে বলল,” হুম। আপনাকে কিডন্যাপ করবো। আমাকে চড় মারার শাস্তি।”

তুলি দুইহাতে মুখ চেপে ধরল। সে প্রণয়ের কথাটা বিশ্বাস করে সে সত্যি সত্যি আতঙ্কিত হয়ে উঠল।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here