১৬
রিপের গভীর চাউনি লক্ষ করতেই নীরা লজ্জা পেল। ভাতের লোকমা মেখে রিপের মুখের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল
খান।
রিপ লোকমা মুখে তুললো না।
ধীরেসুস্থে প্রশ্ন করলো
তোমার মন ভালো হয়ে গিয়েছে? মানে রাগটাগ আর নেই?
নীরা ওর চোখ বরাবর তাকিয়ে আবারও চোখ সরিয়ে নিল। বলল
নিজের হাতে খাবেন? আমি উঠে যাচ্ছি। খুব ঘুম পাচ্ছে। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে। এখন অনেক রাত।
রিপ প্রশ্ন করলো,
সকাল সকাল কেন উঠতে হবে?
কাজ আছে।
কি কাজ?
এত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না।
আমিও খাব না। তুমি খাও।
নীরা উচ্চস্বরে বলল
যদি না খেয়ে উঠে যান। তাহলে খবর আছে।
তুমিও আমার প্রশ্নের উত্তর না দিলে খবর আছে।
নীরা নিজেকে শান্ত রাখলো। বলল
আগে খান। তারপর বলব।
রিপ চুপচাপ খেল। পানি খেয়ে নীরার শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে বলল
এবার বলো।
নীরা রেগে বলল
আমার শাড়ির আঁচলে মুখ মুছলেন কেন?
তুমি তো রুমাল রাখোনি।
দরদ দেখিয়ে খাইয়ে দিচ্ছি বলে শাড়িতে মুখ মুছবেন?
তুমি এভাবে বলছো যেন কোনো পর মানুষ তোমার আঁচলে মুখ মুছেছে।
কোনো আপন মানুষও তো নয় যে খুশি হব।
একথায় রিপ কষ্ট পেল। চেহারায় তা না ফুটিয়ে বলল
এবার আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
নীরা প্লেট নিয়ে চলে যাচ্ছিলো। রিপ তার পথ আটকে গমগম স্বরে বলল
নীরা হচ্ছেটা কি? কিছু জিজ্ঞেস করছি তোমায়।
নীরা কিছু না বলে চলে গেল। ফিরে এসে দেখলো রিপ শুয়ে পড়েছে। কয়েক লোকমা খাইয়ে দিতে পেরেছে এটা তার শান্তি। এবার সে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে। মাঝখানে কোলবালিশটা রেখে সেও শুয়ে পড়লো। সারাশরীর এখনো শিরশির করছে। তাকে কিভাবে জড়িয়ে ধরলো তখন। গালটা চেপে ধরলো গালে। ভাবতেই কেমন কেমন লাগছে তার। পাগল পাগল অনুভূতি।
রিপ ঘাড় ফেরাতেই মাঝখানে কোলবালিশ দেখলো। নীরাও ওপাশে মুখ করে শুয়েছে। এত বুঝিয়েও কোনো লাভ হলো না দেখে সে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করলো। দীর্ঘশ্বাসটা নীরার কানে আসতেই তার মনটা উতলা হয়ে উঠলো এটা জানতে নীরা চলে যাবে ভেবে এই দীর্ঘশ্বাস? সে ফিরতেই দেখলো রিপ ওপাশে ফিরে ঘুমোচ্ছে। কই দিব্যি ঘুমোচ্ছে। কোনেকিছু যায় আসেনা নীরা চলে গেলে। নীরা আবারও ফিরে গেল। কান্না পেল। রেগেমেগে কোলবালিশটা নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলবে তখন কোলবালিশটাতে হাত দিল রিপও। দুজনেই চুপচাপ চেয়ে রইলো কি করতে যাচ্ছিলো সেটা বুঝে উঠতে। রিপ সেটা টেনে নিয়ে বলল
এটা আমার কোলবালিশ। ছাড়ো।
নীরা নাকমুখ কুঁচকে গলা চড়িয়ে বলল
এটা আমার।
রিপ হেঁচকা টান দিয়ে বালিশটা তার পিঠের পেছনে নিয়ে গেল। বলল
আমার।
নীরা তোতলে বলল
ওটা পেছনে নিয়ে গেলেন কেন? রিপ কোলবালিশটার দিকে ফিরে সেটিকে জড়িয়ে ধরে চোখ বুঁজে বলল
আমার কোলবালিশ আমি যেদিকে রাখতে পছন্দ করি।
নীরা গালফুলিয়ে নাক ফুলিয়ে তার গায়ের উপর দিয়ে কোলবালিশটা নিয়ে ফেলার সময় রিপ তার হাত চেপে ধরলো। বলল
চোর। আমার কোলবালিশ নিচ্ছ কেন?
এটাতে আপনার নাম লেখা আছে? কোথায় লেখা আছে? দেখান দেখি।
কোলবালিশ নিয়ে টানাটানি করতে করতে একসময় রিপের নীচে চেপে গেল নীরা। চোখ বড় বড় করে চাইতেই রিপ তার দিকে ঝুঁকে কড়াচোখে তাকিয়ে বলল
একদম বাড়াবাড়ি করবে না নীরা।
নীরা আমতাআমতা করে বলল
সরুন।
আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
না দিলে কি করবেন?
রিপে ভেবে বলল,
সরব না।
রিপকে অবাক করে দিয়ে নীরা তার বুকের শার্ট টেনে বক্ষঃস্থলে নাকমুখ ডুবিয়ে দিয়ে বলল
সরতে হবে না।
________________________
সকালে ঘুম ভাঙতেই নিজের বক্ষঃস্থলে এক ঘুমন্ত রমণীকে আবিষ্কার করলো রিপ।
খোলা চুল, শাড়ির আঁচল কুন্ডলী পাকিয়ে বিছানার চাদরের সাথে লেপ্টে আছে। ধ্যানমগ্ন হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে যেতেই টান পড়লো শার্ট। নীরার মুঠোয় তার শার্ট। সে ধীরেধীরে ছাড়িয়ে নিয়ে নেমে গেল বিছানা থেকে। হালকা বৃষ্টি হয়েছিল রাতে। এখন হালকা শীত শীত অনুভূত হচ্ছে। নীরার গায়ে কাঁথা টেনে দিয়ে কাল রাতে গোছানো ব্যাগ থেকে সব কাপড়চোপড় বের করে ব্যাগটা লুকিয়ে ফেললো রিপ । উম সরে যাওয়ায় নীরার চোখটা ছুটে গিয়েছিল। সে ঘুমঘুম চোখে রিপের কান্ডকারখানা দেখে মিটিমিটি হাসলো আর ব্যাগটা দেখে ফেললো। রিপ ফ্রেশ হতে চলে গেল। মুখ হাত ধোয়া শেষে ওয়াশরুম থেকে বেরুতেই নীরাকে দেখতে পেল ব্যাগটাতে পুনরায় কাপড় ভরছে। ফোলা চোখ জোড়া মেলে রিপকে দেখে সে পুনরায় তার কাপড়চোপড় ওয়ারড্রব থেকে নিয়ে ব্যাগে ভরতে লাগলো। রিপ তটস্থ পায়ে হেঁটে তার পাশে এসে দাঁড়ালো। ব্যাগটিকে উদ্দেশ্য করে বলল
এগুলো কিসের জন্য?
নীরা তার দিকে চোখতুলে তাকালো। ঘুম ভাব কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
রাত না পেরুতেই ভুলে গিয়েছেন?
রিপ কপাল কুঁচকে বলল
তুমি সত্যি সত্যি চলে যাবে?
মিথ্যে মিথ্যে যাওয়া গেলে তাই যেতাম।
রিপ কিছু না বলে শব্দহীন দেখে যেতে লাগলো। ব্যাগ গোছান শেষে নীরা রিপের মুখমণ্ডলের দিকে তাকালো আবারও। হাসি চেপে রেখে কাঠকাঠ গলায় বলল
ভালোবাসলে নাকি ছেড়ে চলে যায় সবাই। তাই আমিও চলে যাচ্ছি। ভালোবেসেছি তাই এর দায় তো চুকাতেই হবে।
গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে ওয়াশরুমে চলে গেল সে। রিপ ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে তারপর রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। মুনা চা বসিয়েছে।
তোর মহারানী উঠেছে? কত বেলা হয়ে গেল। ভাবলাম কি না হলো আজ।
রিপ চুপ করে রইলো। রয়েসয়ে মুনার কাছে কথাটা পাড়লো।
ও নাকি চলে যাচ্ছে আবার।
কোথায়?
ওর বাড়িতে।
যাক।
রিপ স্তম্ভিত চোখে তাকালো।
যাক মানে? কেন যাবে? আমি কি করেছি?
মুনা অবাক চোখে তাকিয়ে বলল
তুই এত হাইপার হচ্ছিস কেন? ও ওর বাপের বাড়ি যাবে না? তোর হাত ভাঙার পর এসেছিল আর তো যায়নি। যেতে ইচ্ছে যখন হয়েছে তখন যাক।
রিপ ‘চ’ কারান্ত শব্দ করে গ্লাসে পানি ঢেলে খেল। কি করে বুঝাবে নীরা সেজন্য যাচ্ছে না। একেবারে চলে যাচ্ছে।
মুনা তার অস্থিরতা টের পেয়ে হেসে ঠেস মেরে বলল
তোর এত চিন্তা কিসের? ও চলে গেলে তোর কি যায় আসে? ওকে নিয়ে ভাবার সময়ও তোর আছে?
কি বলতে চাইছো? ওকে নিয়ে আমি ভাবি না?
কে জানে। সে তুই ভালো জানিস।
নুডলস গরম পানিতে ঢেলে দিয়ে ডিম ভেঙে সাদা পেয়ালায় নিতে নিতে মুনা বলল
শুধু পুরুষমানুষ হলেই হয় না বুঝলি। মা বোন, পরিবার পরিজনের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালনের পাশাপাশি স্ত্রীর আবদার আহ্লাদ পূরণ করতে জানতে হয়। মেয়েরা পরিবার পরিজন ফেলে যার কাছে চলে আসে সে যদি তাদের না বুঝে তার চাইতে কষ্ট আর কিছু নেই। ওরা খেতে না ফেলেও এতটা কষ্ট পায় না যতটা কষ্ট পায় স্বামী নামক মানুষটা তাদের না বুঝলে। সম্পর্ক তো ওই বুঝাবুঝির উপরেই ঠিকে থাকে। আমাকে যে আজ এই বাড়িতে এখনো দেখছিস তা তোর বড়দার কারণেই। আমি সবাইকে টেবিলে আসতে বলি। তুইও চলে আয়।
মুনা বেরিয়ে গেল। তার পেছন পেছন রান্নাঘর থেকে রিপও বেরিয়ে গেল। নীরাকে সে যেতে দেবে না।
পরীর বার্থডের দিন পরী কি কি করেছে, তাদের কি কি বলেছে তা নিয়ে খেতে খেতে কথা বলাবলি করছিল সবাই মিলে। হাসাহাসিও হচ্ছিল। নীরা আসায় সবার কথা ধামাচাপা পড়ে গেল। সে কেন যায়নি তা নিয়ে সবার মনে প্রশ্ন। মুনা সবার ভাবনা ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য বলল
নীরু নাকি বাপের বাড়িতে যাবে। কয়েকদিন থাকবে।
জহির সাহেব বললেন
হ্যা যাক। রিপ ওকে গিয়ে দিয়ে আসবি।
রিপ খেতে খেতে থেমে গেল। পুরাই আজব! তার পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। নীরা চুপচাপ চা খেতে খেতে তার দিকে তাকালো। রিপ চোখ সরিয়ে নিল। তার কথার কোনো দাম নেই।
সন্ধ্যা নামলো। রিপ কোর্ট থেকে ফিরে দেখলো নীরা বেগুনি রঙের একটা শাড়ি পড়েছে। সেজেগুজে ঠোঁট রাঙিয়ে গুনগুন করে গান গেয়ে ঘরময় পায়চারি করছে। রিপকে দেখে খানিকটা চমকালেও আর কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। রিপ কোর্ট টাই খুলে বিছানায় বসলো। নীরা পানির গ্লাস তার সামনে ধরলো। রিপ একচুমুক পানি খেয়ে চোখা দৃষ্টিতে তাকালো। নীরাও তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল
আপনার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। আমি বেরুচ্ছি তাহলে।
রিপ বলল
আমার ফ্রেশ হতে সময় লাগবে।
সময় লাগুক। আমার কি? আমি যাচ্ছি।
রিপ হতভম্ব চোখে তাকিয়ে বলল
মানে?
মানে টানে কিচ্ছু না। আপনি তো যাচ্ছেন না তাই আপনার ফ্রেশ কতক্ষণ সময় লাগবে সেটা আমার লাগছে না।
নীরা বোরকা পড়ে নিল। রিপ আমতাআমতা করে বলল
ওহহ আমি না যেতে পারলে তো আরও ভালো। ভালো খুব ভালো।
নীরা বোরকা পড়া শেষে আয়নায় তাকালো। ডামপাশ বাঁপাশ ঘুরে নিজেকে দেখে তারপর লাগেজটা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
তালহা বেগম বললেন
একা একা যাচ্ছ?
হ্যা।
কেন? রিপ যাচ্ছেনা কেন?
উনি যেতে চান না তাই বলছি না।
আচ্ছা তোমার আব্বা এগিয়ে দিয়ে আসুক।
মুনার সাথে খানিকক্ষণ কথা বললো নীরা।
জহির সাহেব এসে বললেন বৌমা চলো গাড়িতে তুলে দিই।
জহির সাহেবের সাথে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কি মনে করে অদৃশ্য এক মায়ার টানে আবারও ঘরের দিকে ছুটে গেল নীরা। রিপ অফিসের ড্রেস পাল্টে টি শার্ট গায়ে দিয়ে বেরুতেই যাচ্ছিলো। বুকের উপর নীরার ঝাঁপিয়ে পড়াতেই সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
নীরা কয়েকমুহূর্ত চুপ থেকে তারপর ধীরেধীরে মুখ তুলে বলল, আপনি রাতে আসবেন। আমি অপেক্ষায় থাকবো।
তারপর ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল সোজা।
নীরা বাড়ি ফিরতেই মা বাবা খুশি হলেন কিন্তু নারাজ হলেন জামাই আসেনি বলে। নীরা বলল উনি রাতে আসবেন। জামাই আসবে শুনে খুশিহয়ে বাজারে চলে গেলেন নওফুজ সাহেব। হরেক পদের আয়োজন শুরু করলেন নীরার মা। নীরার জেঠাতো ভাইগুলো নীরাকে অনেক পঁচালো এই বলে তোর বর আসবে না। নীরা টেনশনেও ছিল। এডভোকেট সাহেব যদি না আসে সব বৃথা যাবে। তার অপেক্ষা বাবা মায়ের আয়োজন।
চলবে…