#মন_দিয়েছে_ধরা
১৭
তোমার ভাই কি আসছে? আসলে তাড়াতাড়ি আসতে বলো। না আসলে বলে দিও আমি আর জীবনেও ওই বাড়িতে যাব না।
রাগে ফোঁসফোঁস করে কথাটা বললো নীরা। মুনা ফিক করে হেসে উঠে হাসি চওড়া করলো। হাসতে হাসতে বলল
ও তো দেখলাম বেরিয়েছে। ওভাবে বেরোয়নি। শার্ট প্যান্ট যা পড়েছিল সেভাবে বেরিয়েছে।
আচ্ছা আমি আসতে বলেছি এজন্য দামে উঠেছে তাই না? ঠিক আছে। ফিরলে বলে দেবে আমাকে যেন একটা ফোনও না করে।
মুনা বলল
আরেহ এভাবে রেগে যাচ্ছিস কেন? এখনও তো সময় আছে। দেখ কি করে।
আসবে না। আমি জানি। না আসুক। আমিও যাব না। ফোন রাখছি। মাকে গিয়ে বলি সব পোলাও কোরমা আমরা খেয়ে নেব।
ওর গলায় কান্না কান্না ভাব,
মুনা হাসতে হাসতে বলল
তোকে কিভাবে রিপ সামলাচ্ছে আমার তো সেটাই অবাক লাগছে নীরু। তুই দেখছি জ্বালিয়ে মারছিস।
তোমার ভাই আমাকে জ্বালাচ্ছে। আমি ফোন দিয়েছি ফোন রিসিভ করেনি উল্টো মেসেজ লিখে পাঠিয়েছি তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই। কেমন বজ্জাত লোক দেখেছ?
আরেহ শান্ত হ। ও আসুক আমি দেখি বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠিয়ে দেব।
না বাপু থাক। অত বুঝাতে হবে না তোমার ভাই নামক বাচ্চাটাকে। উনি বড় বড় ভাবের ডিগ্রি নিয়ে বসে থাকে সারাদিন আর এটুকু বুঝেনি বউ তাকে আবদার করে যেতে বলেছে। বাজে লোক। আজ এলেও দরজা বন্ধ করে রাখবো আমি। রাখি।
নীরা ফোন রেখে দিল রেগেমেগে।
রিপ তার ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাড়ি ফিরলো। হাতে নানারকম ব্যাগ। মুনা এসে জানতে চাইলো
কি রে কই গিয়েছিলি? নীরু ফোন দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে তুই নাকি ফোন তুলিসনি।
রিপ সে কথার জবাব না দিয়ে বলল
বাজার এনেছি। আর এগুলো ওদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
তারমানে যাচ্ছিস। তাহলে ওর ফোনটা ধরলি না কেন?
এমনি।
দু-হাত ঝাড়তে ঝাড়তে ঘরের দিকে পা বাড়ালো সে। মুনা মিষ্টির কার্টুন, ফলমূলের ঝুড়ি আর বাজারের থলেটা নিয়ে চলে গেল।
_______________
জামাই আসবে না শুনে মন খারাপ করে বসেছিলেন নওফুজ সাহেব। ভাইপো গুলো এসে সুখবর দিয়ে বলল,
‘ কাকা তোমাদের জামাইকে এগিয়ে নিয়ে আসতে যাচ্ছি। রাস্তায় গাড়ি থামলো দেখলাম।
নওফুজ সাহেবের চোখেমুখে আনন্দ উচ্ছ্বাস। নীরাকে ডেকে বললেন
নীরা মা সাহেব তো চলে এসেছে দেখি। তুই মাঝেমাঝে এমন এমন কথা বলিস চমকে দিস আমাকে।
নীরা এসে উত্তেজিত গলায় বলল
সত্যি?
হ্যা। আমি যাচ্ছি।
নীরা ছুটতে ছুটতে দোতলার বারান্দায় চলে গেল। উঁকিঝুকি দিয়ে দেখলো নীরার বড় জেঠাতো ভাই শিহাবের সাথে কথা বলতে বলতে আসছে রিপ। নীরার খুশি দেখে কে? সে একছুটে রান্নাঘরে চলে এল। মা তাকে ধমকে বললেন
পাজি মেয়ে। না জেনেশুনে ছেলেটাকে বকাবকি করছিস এতক্ষণ। আমি বলে দেব সব।
নীরা হেসে ডাকলো চুমু ছুঁড়ে দিয়ে বলল..
ওমমমমমাহ।
মা ঝামটি মেরে বললেন,,
যাহহহ অসভ্য। এ নাকি একজন এডভোকেটের বউ।
______________
নীরার বাবা জামাইকে পেয়ে মহাখুশিতে কি বলবে ভেবে পাচ্ছেন না। এইসেই কতকথা। জামাই শ্বশুরের কথার তালে তালে উত্তর দিচ্ছে বলে তিনি আরও মজা পাচ্ছেন কথা বলে। উনার মেয়েটা আজকাল বদ হয়েছে বেশ। ভালো ছেলেটার নামে উল্টাপাল্টা কথা বললো শুধু শুধু।
নীরা নাশতার নিয়ে আসা যাওয়া করতে করতে কয়েকবার এল আর গেল। রিপ ওকে আড়চোখে একবার দেখেছিল বৈকি নীরা একবারও তাকায়নি।
এই বাড়িতে তার অন্যরূপ। কেমন চটপটে উড়ুউড়ু। বাড়ির আদুরে কন্যা। সেলোয়ার-কামিজ পরিহিত এক যুবতী। চঞ্চল চলনবলন তার। রিপ ভারী অবাক হলো তার দিকে একবারও না তাকানোর কারণ কি? বরং বেশিবেশি তাকানো দরকার সে এককথায় চলে এসেছে বলে।
নাশতা খেয়ে নীরার ঘরে এল রিপ। নীরা তার পিছু পিছু হেঁটে এল। রিপ তার ঘরময় পায়চারি করলো। দেয়ালে টাঙানো পেইন্টিংগুলো দেখলো।
এগুলো তুমি এঁকেছ?
পেছনে ফিরে নীরার দিকে তাকালো সে। নীরা লজ্জাবতীর মতো মাথা নাড়ালো।
সুন্দর!
নীরা বেশ খুশি হলো। বলল,
আরও আছে আমার আলমিরায়। আপনাকে দেখাচ্ছি। বসুন।
রিপ দেয়ালের পেইন্টিংগুলো নেড়েচেড়ে দেখলো। বেশ সুন্দর আঁকে তো।
নীরা তার বাকি পেইন্টিংগুলো বের করে বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখলো। রিপের সামনে বসে একটা একটা দেখাতে লাগলো। রিপ মনোযোগ সহকারে দেখলো। তখনি মুনা ফোন দিল। নীরা ফোন কানে দিতেই নীরা বলল
হ্যা আপা। এসেছে।
কত বকাঝকা করলি পাগল।
নীরা লাজুক মুখে বলল
আচ্ছা তোমাকে পরে ফোন দিচ্ছি।
মুনা হেসে বলল
আচ্ছা রাখ।
রিপ ওর দিকে চোখ তুলে বলল
কি বললো?
কিছু না।
এত এত পেইন্টিংয়ের মাঝে রিপের চোখ আটকে গেল একটি পেইন্টিংয়ে। সেটি নিতেই নীরা সেটি খপ করে নিয়ে উঠে গেল। বলল
এগুলো দেখুন।
রিপ সন্দিগ্ধ গলায় বলল
ওটা কার? আমাকে দেখাও।
নীরা গলায় জোর দিয়ে বলল,
নাহহহ।
রিপ উঠে দাঁড়ালো। নীরা সরে গেল। বলল
দেব না।
রিপ তার পেছনে গিয়ে বলল
দাও বলছি নীরা। আমাকে দেখতে দাও।
নীরা বলল
না এটা দেখাতে পারব না। এটা আমার পার্সোনাল জিনিস।
রিপ ভারমুখে চেয়ে বলল
তুমি দেখাবে কি দেখাবে না?
নীরা গালফুলিয়ে বলল
নাহ।
ঠিক আছে। আমি আজকে থাকব না। খেয়েদেয়ে চলে যাব।
নীরা ফিক করে হেসে উঠে বলল
আমি আপনাকে থাকতে বলেছি?
রিপ তাজ্জববনে গেল। বিস্ময় নিয়ে বলল
মানে?
মানে আপনি খাবেন দাবেন তারপর চলে যাবেন।
ওহহ আচ্ছা।ঠিক আছে।
দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে যাচ্ছিলো রিপ। নীরা গিয়ে পেছন থেকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে রেখে বলল
আচ্ছা আচ্ছা দেখাচ্ছি। নিন।
বুকের সামনে নীরার হাত থেকে পেইন্টিংটা নিয়ে সেটি দেখলো রিপ। নীরা চোখদুটো চেপে ধরলো ওর পিঠের সাথে। রিপ পেইন্টিংটা মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে তীর্যক হাসলো। ছবিতে সে। আর কিছু ঠিকঠাক আঁকতে না পারলেও চোখ, নাক, ঠোঁট ঠিকঠাক তার মতো আঁকতে পেরেছে।
বাঁধন হালকা হয়ে আসতেই রিপ সামনে ফিরলো। নীরা ওর কাছাকাছি এসে দু’হাতে মুখ ঢেকে রাখলো। রিপ হেসে উঠে বলল
হয়েছে হয়েছে।
নীরা দু-হাত মেলে তাকাতেই রিপকে হাসতে দেখে আবারও মুখ ঢেকে রিপকে পিছু করে দাঁড়ালো। রিপ ধীরপায়ে হেঁটে গিয়ে নীরার পেছনে দাঁড়িয়ে খানিকটা ঝুঁকে পেইন্টিংটা নীরার সামনে রাখলো। ইচ্ছে করেই জানতে চাইলো
এটা কে?
নীরা ধীরেধীরে মুখ থেকে হাত নামিয়ে পেইন্টিংটাতে চোখ রেখে বলল
বনমানুষ।
প্রগাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দতরঙ্গ ঢেউ খেলে গেলে নীরার কর্ণরন্ধ্রে। ঘাড়টা একপাশে হেলতেই রিপ কাঁধে থুঁতনি ঠেকিয়ে বলল
অথচ তুমি লিখেছ “মনমানুষ”।
চলমান……#মন_দিয়েছে_ধরা
লেখনীতে#পুষ্পিতা_প্রিমা
#পর্ব_১৮
নীরা লজ্জা পেয়ে একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মা জেঠি তখন রান্নাঘরে রাতের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত। মাছের ঝোলে লবণ হয়েছে কিনা দেখার জন্য নীরাকে ডাক পাড়তে চেয়েছিলো। তারা কেমন লবণ খায় নীরা ভালো জানবে। নীরা তখুনি হাজির। মুখে লাজ লাজ ভাব। বেসিনে রাখা কাপ প্লেটগুলো ধুঁতে ধুঁতে মিটমিট করে হাসছে। জেঠি ইশারায় মাকে দেখিয়ে দিতেই উনি নীরার কাঁধ ছুঁয়ে বললেন
ওই নীরু কি হয়েছে তোর?
নীরা চমকে উঠে মায়ের দিকে তাকালো। লাজুক হাসতেই মা জেঠি হেসে উঠলো একসাথে। নীরা রাগ করে বলল,
তোমরা হাসছো কেন?
তুই হাসছিলি কেন?
যাহহ। তোমরা বেশি বেশি করো।
ঝামটি মেরে সেখান থেকে চলে গেল সে। মা মাথা নাড়িয়ে বললেন
এই মেয়ে আর বড় হলো না।
নীরা বাবার কাছে চলে গেল।
কিরে জামাই কোথায়?
ঘরে।
ঘরে কি করছে?
ওড়নার কোণা মোচড়াতে মোচড়াতে নীরা জবাব দিল,
কি করছে আমি জানিনা।
নওফুজ সাহেব হাসলেন।
নীরা মা এদিকে আয়। একটা কথা বলি।
নীরা বাবার পাশে গিয়ে বসলো। উনি চুপিসারে ফিসফিস করে বললেন,
তোর এককথায় তো চলে এল দেখছি। পটেছে নাকি?
নীরা ফিক করে মুখ চেপে ধরে হেসে উঠলো । বাবাও হাসলেন।
আরেহ বল। আমার তো তর সইছে না।
নীরা লাজুক মুখে বলল
আমার লজ্জা করছে।
বাবা হো হো করে হেসে উঠে বললেন
হয়েছে হয়েছে আমি বুঝে গিয়েছি। আমার পাগল মেয়ে শেষমেশ এডভোকেট সাহেবকে পাগল বানিয়েই ছেড়েছে। এই না হলো নওফুজ শিকদারের একমাত্র কন্যা। সাবাশ সাবাশ।
রিপ তখন পায়ে পায়ে হেঁটে লিভিংরুমে চলে এল।
রিপকে আসতে দেখে নওফুজ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। রিপ বলল
আপনি বসুন। বসে কথা বলি।
নীরা বাবার পাশে চুপটি করে বসে থাকলো। রিপের দিকে তাকালো না। নওফুজ সাহেব বললেন
নীরা মা নিশ্চয়ই খুব জ্বালাচ্ছে তোমাকে।
রিপ নীরার দিকে তাকালো। নীরা একবার রিপের দিকে তাকালো তারপর বাবার দিকে তাকালো। রিপ মৃদু হেসে বলল
না। তেমন কিছু না।
না না আমি বেশ বুঝতে পারছিনা নীরা তোমাকে জ্বালাচ্ছে খুব। আসলে ওকে আমিই এসব শিখিয়েছি। আজকালকার ছেলেপেলেরা তো ভালোটালো হয় না। তাই এসব দুষ্টুমি শিখিয়েছি কে জানতো এত ভালো একটা ছেলে পেয়ে যাব। তবে আমি ওকে বারণ করে দিয়েছি ভালো ছেলের সাথে দুষ্টুমি করা চলবে না।
বলেই তিনি হেসে উঠলেন।
নীরা বাবার হাতে চিমটি কাটলো। উনি খুকখুক করে কেশে উঠলেন। রিপ কান চুলকে তারপর কান ঘষতে ঘষতে বলল
ওহহ।
নীরা বলল
বাবা চা খাবে?
আরেহ আমি খাব কি? এডভোকেট সাহেবও নিশ্চয় খাবেন।
নীরা বলে উঠলো
খাবে মানে। সারাদিন ভাত না দিলেও চলবে। শুধু চা আর চা। এমন চা-খোর আমি জীবনে দেখিনি।
রিপ হা করে চেয়ে থাকলো। নওফুজ সাহেব হেসে উঠে বললেন
একদম মায়ের মতো হয়েছে। শুধু বরের বদভ্যাস ফাঁস করে। অবশ্য চা-খোর হওয়াটা বদভ্যাসের মধ্যে পড়ে না। তাহলে চা নিয়ে আয় নীরা মা।
ওকে।
রিপের দিকে একপলক তাকিয়ে নীরা চলে গেল চা আনার জন্য। রিপ নওফুজ সাহেবের সাথে বসে রইলো। মেয়ে একদম বাপের মতোই হয়েছে।
____________
রাতের টেবিল নানারকম বাহারি রান্নায় সেজেছে। রিপ বরাবরের মতো স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ায় রাতে হালকা খাবার খায়। কিন্তু আজকে তার পাত ভারী হয়ে গিয়েছে তার খাওয়ার তুলনায়। সবগুলো রান্নায় মজা হয়েছে। খেতে-খেতে তার মৃদুমন্দ মাথা দুলে বলা জবাবটাই নীরার মা জেঠিকে শান্তি দিয়েছে। তারা খুশি হয়েছেন। নীরা চিংড়ি মাছের বাটি নিয়ে গপাগপ খেয়ে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। রিপ খুবই সন্তর্পণে সেটি সরিয়ে রেখে দিল নিজের পাশে। খুব বেশি চোখে না পড়লে পরে বিষয়টি সবাই বুঝতে মিটমিট করে হাসলো। নীরা নাকফুলিয়ে রিপের উপর ক্ষেপা চোখে তাকালেও রিপ তা তোয়াক্কা করলো না।
নওফুজ সাহেব অন্যরকম একটা শান্তি অনুভব করলেন। যাক তার পাগলীটাকে সামলানোর মানুষ চলে এসেছে। এবার মরেও শান্তি।
খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই টিভি দেখছিল। নীরা মাল্টা আর আপেল কেটে নিয়ে এল। আমের মৌসুম তাই আমও কেটে এনেছে। কেউ তেমন খেল না দেখে সে নিজেই বসে বসে সব খেল আর ভাবতে লাগলো এডভোকেট সাহেব যাচ্ছে না কেন? ওরেবাবা না গেলে তো আজ তাকে লজ্জায় মরতে হবে। ধুরোহ অত লজ্জা পাওয়ার কি দরকার? বর তো তারই।
আমার বোধহয় বেরোনো উচিত।
নীরার ভাবনার সুঁতো ফট করে ছিঁড়ে গেল রিপের কথা শুনে । সে লাফ মেরে আধশোয়া থেকে সোজা হয়ে বসলো। শিহাব বলে উঠলো
কি বলেন? এতরাতে কোথায় যাবেন?
নওফুজ সাহেব বললেন
কি বলে এই ছেলে? আরেহ শ্বশুরবাড়িতে একরাত থাকা যায় না? এ কেমন কথা? আমি তো বউয়ের পেছন পেছন চলে যেতাম।
বলে ফেলার পর মনে হলো তিনি বেফাঁস কথাবার্তা বলে ফেলেছেন মেয়ে জামাইয়ের সাথে। রিপ বলল,
না আসলে…
নীরা বলে উঠলো।
কোনো ব্যাপার না। আপনি আসুন।
এই এই চুপ। কি বলছিস নীরা মা। দাঁড়া তোর মাকে ডাকি। নীরার মা শুনছো? এদিকে এসো তো। জামাই নাকি চলে যাচ্ছে।
নাজিয়া বেগম তড়িঘড়ি করে এসে বললেন
এ কি কথা? নীরু কিছু বলেছে? হঠাৎ চলে যাওয়ার বায়না উঠলো কেন? এই কি বলেছিস তুই?
নীরা ঠোঁট উল্টে বলল,
এখানে তো সবাই আছে। আমি কি বলেছি জিজ্ঞেস করো তো ?
রিপকে কিছু বলতে না দিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে গেল। নীরা সেখান থেকে চলে গেল রিপকে ভেংচি কেটে।
রিপ অবলার মতো তার ভেংচি কাটা দেখলো।
নওফুজ সাহেব রিপকে বসিয়ে দিল সোফায়। বলল
যতক্ষণ আমরা জামাই শ্বশুর জেগে থাকতে পারি আজ। যত কাপ চা খেতে পারি। এই রাতটা স্মরণীয় হয়ে থাকুক। কোথাও যাওয়া চলবে না।
রিপ মৃদু হাসলো। বলল
জ্বি।
_____________
রাত বাড়তেই রিপ শ্বশুরের কাছ থেকে ছাড়া পেল। বাপ মেয়ে দুজনেই এত বকবক করতে পারে। মানুষটাকে রিপ অবশ্য খুব পছন্দ করে। বেশ হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল একজন মানুষ। তার এইধরনের মানুষগুলোকে খুব ভালো লাগলেও সে তা প্রকাশ করতে পারে না। হুট করে মন ভালো করে দেয়ার মতো জাদু থাকে তাদের মধ্যে।
ঘরের দরজা বন্ধ ছিল। রিপ নব ঘোরালেও কাজ হলো না। সে ডাকলো
নীরা! দরজা খোলো।
নীরা দরজা খুললো প্রায় কয়েক মিনিট পর। পড়নে মিষ্টি রঙের শাড়ি। খোলা চুল গুলো সামনে ফিরিয়ে মোচড়াতে মোচড়াতে রিপের দিকে তাকালো। রিপ ঘরে ঢুকতেই দরজায় খিল লাগালো। পুনরায় রিপের দিকে তাকিয়ে আঙুলে আঁচল পেঁচাতে পেঁচাতে বলল
আপনি চলে যাননি?
রিপ তার প্রশ্নে মৃদু হাসলো। দুপাশে মাথা নাড়ালো।
নীরাও তার সাথে হেসে হেসে বলল,
কেন যাননি?
এমনি।
আপনার বিছানা ঠিক আছে। ঘুমিয়ে পড়ুন। আমি লাইট অফ করে দিচ্ছি। ঠিক আছে?
না ঠিক নেই। তুমি এদিকে এসো।
নীরা বক্ষপিঞ্জরে দুর্নিবার কম্পন টের পেল। দুরুদুরু বুকে, সংকুচিত হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো
কেন?
বলেছি তো এদিকে এসো।
অজানা ভয়, লজ্জা, জড়তা আর সংকোচে নীরা এগুলো না। রিপকে পিছু করে দাঁড়িয়ে বলল
নাহ, যাব না।
রিপ কপাল ভাঁজ করে বলল
আমি থেকেছি তাই তুমি খুশি হওনি?
নীরা চট করে তার দিকে ফিরলো। কিছুক্ষণ ক্ষেপাচোখে তাকিয়ে থাকলেও যখন বুঝলো এই লোকের সাথে ক্ষেপাক্ষেপি করে কোনো কাজ হবে না তখন খুবই আলগোছে তার পড়নের শাড়িটা দেখিয়ে দিল ইশারায়।
রিপ অধর চওড়া করে হাসতেই নীরাও তার সাথে তাল মিলিয়ে হাসলো।
পা টিপে টিপে তার সামনে এগিয়ে এসে ভুরু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো
কেমন? কেমন লাগছে?
রিপ এবার শব্দ করে হেসে উঠে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল
পাগল।
নীরা তৎক্ষনাৎ কোমরে হাত রেখে আরও এগিয়ে এল তার দিকে । চোখমুখ কুঁচকে বলল
আমি পাগল? তাহলে আপনি পাগলের বর। পাগলের পাগলা জামাই।
রিপ এবার শব্দ করেই হাসলো। নীরা বলল
ওমা। আমি হাসার কথা কি বলেছি? মনে হচ্ছে আমি কোনো জোক শোনাচ্ছি।
রিপ হাসি থামালো। দম নিল।
তারপর মন্থর গতিতে ওর দিকে একপা এগিয়ে এসে দূরত্ব ঘুচিয়ে গলার স্বর ভারী করে ডাকলো
নীরা!
নীরা সেই ডাকে বাহ্য রূপ ছেড়ে ডুবতে লাগলো তার অন্তর্নিবিষ্ট জগতে। মুহূর্তেই পাল্টে গেল তার চোখেমুখের ধরণ। একটিমাত্র ডাক, সম্বোধনে সেই যাইহোক নীরার ভেতরটাতে কেমন যেন করে উঠলো। তার বাকবিভূতি রূপটা মলিন হয়ে আসতে আসতেই ধরা দিল বাকহীন একটা সিক্তবদন। তাতে ভালো করে তাকাতেই রিপের বোধগম্য হলো কিছু পরেই তাতে বৃষ্টি নামবে। রিপের প্রতি অভিযোগের ঝড় উঠবে, শোনাবে অব্যক্ত অভিমানের আধ্বান।
রিপের কাছাকাছি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওর শার্টের বোতাম নিয়ে নিরর্থ কৃতি সম্পাদন করতে করতে ক্রন্দমমিশ্রিত গলায় নীরা প্রশ্ন করলো..
আমাকে আপনার খুব অপছন্দ তাই না?
রিপ তাত্ক্ষণিক জবাব দিল।
নাহ।
আমি জানি। আমি আপনাকে খুব জ্বালাতন করি।
নাহ।
আমি আপনার মনের মতো না।
এটা মিথ্যে।
আমি আপনার যোগ্য না।
এটাও মিথ্যে।
আপনি আমাকে ভালোওবাসেন না।
হ্য তাই তাই। যা মনে করো তুমি।
তাত্ক্ষণিক একে অপরের দিকে তাকালো তারা। রিপের চোখেমুখে কেলি করে গেল ভুল স্বীকারোক্তি দেয়ার মুষ্কচ্ছেদন। চোখ পাকিয়ে নীরার মুখমন্ডলে দৃষ্টিপাত করে বলল
নাহ এটা সত্যি নয় নীরা। উফফ।
নীরা তাকে ছেড়ে দিল। বলল
এটাই সত্যি। আমি সইতে পেরেছি আপনি স্বীকার করতে পারছেন না কেন? অথচ বেফাঁসে ঠিকই বলে ফেললেন। আপনি আমাকে ভালোটালো বাসেন না।
নীরা কেঁদে উঠে সরে যেতেই রিপ কুপিত গলায় ডাকলো
নীরা প্লিজ আর না।
নীরা থেমে গেল। এক পাও এগোবে না।
নীরা এগুলো না। দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে নাকমুখ মুছতে মুছতে বলল
সত্যিই তো বলেছি। বাসেন না এটা মানতে এত কষ্ট কেন আপনার?
রিপ মন্থরগতিতে হেঁটে গেল তার পেছনে। নীরা হাতের উল্টোপিঠে চোখমুখ মুছে নাক টেনেই যাচ্ছে।
আচমকা উদর বেষ্টনী করে ধরা দুহাতের মজবুত স্পর্শে আপাদমস্তক কেঁপে উঠলো নীরার। তার অনাবৃত গ্রীবার পশ্চাদ্ভাগে অধরোষ্ঠের ছোঁয়ায় সে লজ্জায় নুইয়ে পড়ে কুইকুই শব্দ করে উঠলো। প্রিয় মানুষের প্রিয় নিঃশ্বাস তার কর্ণরন্ধ্রের ব্যাপ্ত হতে হতে তার কর্ণগোচর হলো,,
অত কিছু জানিনা। আমি শুধু বাসি। সেটা ভালো কিংবা মন্দ। যেটা বাসলে তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না। আমি তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাববো না আমি সেরকম বাসি। আর কোনো অভিযোগ?
নীরা অস্ফুটস্বরে বলল,
হ্যা।
আবার কি?
নীরা ধীরেধীরে তার দিকে ফিরলো। এক হাতে ঘাড়ে হাত মালিশ করতে করতে অন্য হাতের অঙুলি দ্বারা রিপের খোঁচাখোঁচা দাঁড়িগুলো ছুঁয়ে বলল
বাবাহ দাঁড়ি নয় যেন মৌমাছির হুল। হুল ফুটিয়ে দিয়েছেন পুরো।
রিপ হতভম্ব চোখে তাকালো। তাকে মৌমাছির সাথে তুলনা?
রাগ করে নীরাকে ছেড়ে দিল সে। হম্বিতম্বি দেখিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো চোখের উপর হাত রেখে। পায়ের কাছ থেকে কোলবালিশটা নিয়ে মাঝখানে রাখলো। নীরা মুচকি হেসে ধীরপায়ে হেঁটে গিয়ে ঘরের লাইট অফ করে ডিমলাইটটা জ্বালিয়ে দিয়ে আরাম করে বিছানায় বসলো। রিপের দিকে তাকিয়ে থাকলো মিটমিটে হাসি ঠোঁট ঝুলিয়ে রেখে। রিপ কিছুক্ষণ পর তাকাতেই দেখলো নীরার চোখ বন্ধ। সেও চোখ বন্ধ করলো। নীরা চোখ খুলতেই দেখলো রিপ ওভাবেই আছে। সে কোলবালিশ ডিঙিয়ে রিপের হাতের ভাঁজে তার হাতটা রাখবে রাখবে করে রাখলো না। যেই না অসতর্ক সহিত হাতটা রিপের হাতে লাগলো রিপ খপ করে ধরে ফেললো ওর হাতটা। আঁতকে উঠলো নীরা। রিপ নীরার চোখাচোখি তাকিয়ে ভুরু উঁচিয়ে বলল
কি মতলব?
নীরা মৃদু হাসি ঝুলিয়ে বলল,
কোলবালিশটা সরিয়ে ফেলি?
বিছানায় কে রেখেছিল ওটা ভুলে গিয়েছেন নাকি?
বিছানায় আমি রেখেছি। কিন্তু মাঝখানে রেখেছেন আপনি।
হ্যা। এখানেও আমার দোষ।
নীরা সেটি সরিয়ে ফেললো। বলল
আচ্ছা আমার দোষ। সরিয়ে ফেললাম।
সরিয়েছ কেন? পারলে আস্ত একটা দেয়াল তুলে দাও। তারপর বলবে আমি সেটাও আমি করেছি। সব দোষ আমার। সবসময়ই আমার উপরেই আঙুল উঠে।
নীরা হেসে বলল
মানলাম তো আমার দোষ। সরিয়েও ফেলেছি। কাছে যাই?
রিপ জবাব দিল না। শুধু মুখ ভার করে চেয়ে রইলো। নীরা হাসতে হাসতে থেমে থেমে বলল
গোমড়ামুখো।
বোবা লোক।
ভাবওয়ালা।
ঢংওয়ালা।
আর কি বলবে ভাবছিল নীরা।
রিপ ওর দিকে তেড়ে এসে বলল
আর কি? থামলে কেন?
নীরা ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে গেল তার নীচে । আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকালো। রিপের ভারী নিঃশ্বাস তার মুখে আছড়ে পড়তেই সে ফিক করে হেসে উঠে নাকে নাক ঘষা মেরে বলল
আমার মানুষ।
রিপের ভাঁজপড়া কপাল মসৃণ হয়ে এল। নীরা প্রাণখোলা হাসলো। জানতে চাইলো,
আর আমি?
রিপ মুখ খুললো। বলল,
তুমি মন মানুষী।
নীরা আরও প্রসন্ন হাসলো। রিপও ওর সাথে তাল মিলিয়ে ঈষৎ হেসে খানিকটা ঝুঁকতেই নীরা ওর ঠোঁটজোড়ায় আঙুল চেপে হেসে উঠে বলল
ও আল্লাহ! আমি মরেই যাব।
রিপ কপাল কুঁচকে বিক্ষোভে বলল
তাহলে ছেড়ে দাও। চলে যাচ্ছি।
নীরা ছাড়লো না। সাথেসাথে দুহাতে আরও শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরে দু জোড়া অধরোষ্ঠে সংযোগ স্থাপন করলো।
চলমানমন দিয়েছে ধরা পর্ব -১৬
🙈🙈🙈🙈🙈🙈🙈