মন দিয়েছে ধরা পর্ব -২১+২২ শেষ

#মন_দিয়েছে_ধরা
#পর্ব_২১
লেখনীতে….#পুষ্পিতা_প্রিমা

নীরার গর্ভকালীন সময়গুলোতে বাড়ির সবাই চিন্তায় ছিল। প্রথমত ওর বিপি লো হয়ে যাওয়া, দ্বিতীয়ত ওর বমি বন্ধ না হওয়া, খাওয়ায় অরুচি এবং পা ফুলে যাওয়া। এমনকি ভাতের মাড়ের গন্ধও সে সইতে পারেনা। ফুলের গন্ধ, পারফিউম তার কাছে থেকে সরিয়ে সরিয়ে রাখতে হয় রিপকে।
মাছ মাংস ছোঁয়াও বন্ধ করে দিয়েছে সে। এত এত
শিদল ভর্তা খেল তারপরও শিদলে তার অতৃপ্তি আসে না। গরম ভাতের সাথে লাল মরিচ পেঁয়াজ কুঁচি দিয়ে মেখে কি তৃপ্তিকরে ভাত খায় সে। রিপ শুধু দেখে আর ভাবে মাতৃত্ব মুখের কথা নয়।

একদিন হুট করে এসে আবদার করে বসলো

আমার না কচু খেতে ইচ্ছে করছে।

রিপ সরাসরি উত্তর দিল।

খাওয়া চলবে না। ডাক্তার বারণ করেছে মনে নেই?

নীরা জেদ ধরলো।

না কচু খাবই। ওলকচু, পানিকচু,কচুর লতি সব খাব। না আনলে খবর আছে। আমি বাবাকে ফোন করে বলব। আর যে আসছে তাকে বলব তোর বাপ আস্ত একটা বদ। তুই ডাকবি বদমাশ বাপ।

বলেই হনহনিয়ে চলে গেল ঘর থেকে।

রিপ হা করে ওর যাওয়া দেখলো। কি অদ্ভুত মেয়ে সে!

ওর খাওয়ার তীব্র ইচ্ছে সাথে সারাক্ষণ প্যানপ্যানানি দেখে রিপ না এনে পারলো না। তবে অল্পকিছু খেতে বললো। কিন্তু অত বারণ শোনে কে? সেদিন কচু খেয়ে নীরার এলার্জি বেড়ে গেল। এলার্জিনামক ঝক্কিটা সামলানোর পর তার বিপি লো হয়ে যাওয়ায় ইমার্জেন্সি ইউনিটে ভর্তি করানো হলো। আটচল্লিশ ঘন্টা পর বাড়ি ফিরলো সে। সারাক্ষণ হাতের মুঠোয় লেবু কচলাতে কচলাতে দিন কাটে তার। চারিদিকে এত উদ্ভট উদ্ভট গন্ধ টের পায় সে। তালহা বেগম একসময় বলে বসলেন

তোমার বাচ্চা মাথাভর্তি চুল নিয়া আসতেছে তাই তোমার এত বমি হইতেছে।

নীরা আজববনে গেল। ওর মাথাভর্তি চুলের সাথে বমির কি সম্পর্ক?

অন্য একদিন বলে বসলেন,

যে আসতেছে সে হবে খুঁতখুঁতে টাইপ।

নীরা হ্যা না কিছু না বলে শুনেই গেল।
বয়স্ক মানুষের বিশ্বাসে সে আর জল ঢালতে গেল না।

সাতমাসে পড়েছে সবে। নওফুজ সাহেব এলেন মেয়েকে দেখতে নীরার মাও এসেছে। ছোট ছোট হাতের ফুলতোলা কাঁথা আর নীরার পছন্দের খাবার দাবার নিয়ে । সেই গর্ভধারণের দ্বিতীয় মাসেই নীরা বাপের বাড়ি গিয়েছিল আর যেতে পারেনি। রিপকে কত করে বুঝালেন নওফুজ সাহেব যে প্রথম সন্তান হওয়ার সময় বাপের বাড়িতে থাকলে ভালো। রিপ তা শোনার পাত্র নয়। মুনাও বেঁকে বসলো। কেন এই বাড়িতে কি ওর যত্ন-আত্তির কম হচ্ছে?
শ্বশুরবাড়িতে যত্ন-আত্তির কম হলে তখন বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হয় যাতে মা যত্ন নিতে পারে মেয়ের। এখানে তো তার যত্নআত্তিরের অভাব হচ্ছে না। বরং এতগুলো বছর পর এই বাড়িতে একজন অতিথি আসছে তা নিয়ে সবার আনন্দের শেষ নেই।

____________

রিপ রাতের কাজগুলো ঘরে বসে করার চেষ্টা করে। দিনের বেলা কোর্টকাছারি আর ক্লায়েন্টের ঝক্কিঝামেলা শেষে রাতের বেলা নীরার সাথে দু একটা গল্প সাড়তে সাড়তে ফাইলপত্রের কাজ সেড়ে নেয়।

জগ নিয়ে রান্নাঘরে গিয়েছিল রিপ। ঘরে আসতে আসতে শুনতে পেল নীরা খিক খিক করে হাসছে হাসছে একা একা। ঘরে পা রেখেও একই দৃশ্য দেখতে পেল। সাত মাসের উঁচু হওয়া পেটে হাত রেখে এমনভাবে হাসছে যেন তাকে কেউ সুড়সুড়ি দিচ্ছে। রিপ হতচকিত, হতভম্ব চোখে চেয়েই রইলো। হ্যা মুড সুয়িং হয় ঠিক কিন্তু এভাবে?
সেদিন তো রিপকে ফোনে বলেই ফেলল

ধুরর মাতারি কিচ্ছু ভাল্লাগেনা ঘরে আইলে আয় নো আইলে রাখ।

রিপ ফোনের ওপাশে হাসবে কি কাঁদবে বুঝে উঠতে পারলো না। উফফ এই সাতটা মাস নীরাকে সে কিভাবে সামলে রেখেছে খোদা জানে।

রিপ ওর হাসি চেয়েই রইলো। আগে থেকে বেশ স্বাস্থ্যবান হয়েছে সে। গায়ের রঙ খুলে গিয়েছে। হাত পা গুলো হৃষ্টপুষ্ট দেখাচ্ছে ফুলে যাওয়ায়।
তালহা বেগম ওকে দেখে সেদিন বলে দিলেন যে নাতি আসছে। নীরা খুশি হলেও রিপ চেয়েছিল মা বলুক একজন নাতনি আসছে। সে খুশি হয়নি সেটা বলা যায় না কিন্তু তার ইচ্ছে ছিল একটা ছোট্ট নীরা।

নীরা স্টপ! কি হয়েছে? এভাবে হাসছো কেন?

নীরার হাসি থেমে গেল।

সে বড়ই আহ্লাদী গলায় বলল

এদিকে আসুন না।

রিপ এগিয়ে গেল।

কোনো সমস্যা?

আসুন। হাতটা এদিকে দিন।

রিপ গেল। হাত বাড়াতেই নীরা তার উঁচু হয়ে আসা পেটের ডানপাশে হাতটা রেখে বলল

এই যাহ ডিসুম ডিসুম থামিয়ে দিল? খুব সভ্য বাচ্চা আমার। বাবার গলা শুনেই শান্ত হয়ে গিয়েছে।

কি হয়েছে?

রিপের প্রশ্ন শুনে নীরা আবারও ফিক করে হেসে দিয়ে বলল

ও ফুটবল খেলছিল এতক্ষণ। বাবাহ গো কি লাতি। মা ঠিকই বলেছে ও হবে আমার শাহজাদা। আমার জান্টুস। ডিসুম ডিসুম ভালোই পারে দেখছি। মায়ের কথা শুনে তো ভেবেই নিয়েছি যে ওকে বক্সিং শেখাবো। আমরা মা ছেলে ডিসুম ডিসুম খেলবো। খেলায় আপনাকে নেব না। কারণ আপনি ফেল্টুস সেই খেলায়।

বলেই আবারও হাসতে লাগলো নীরা। রিপ বলল

ওহহ তুমি মুভমেন্ট বুঝতে পারছো।

বুঝতে পারছি মানে। ওর ভাষাও বুঝতে পারছি । ও বলছে মা আমার আর এখানে ভাল্লাগেনা। তাই ডিসুম ডিসুম করে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দুষ্টু বাচ্চা আমার।

রিপ হেসেই ফেললো।

কোমরে হাত রেখে হেসে উঠতেই নীরা ওরদিকে তাকালো। ইশ মানুষটার হাসি কি সুন্দর!

এই এই এডভোকেট সাহেব এদিকে বসুন না। একটা কথা বলি।

রিপ ফাইলপত্র বন্ধ করে এসে তার পাশে বসলো। নীরা বুকে মাথা ঠেকিয়ে বলল

আমি না বাবুর নামও ঠিক করে রেখেছি।

কি নাম?

নাম একটাই। ছেলে হলেও ওই নাম দেব, মেয়ে হলেও ওই নাম দেব।

কি নাম দেবে?

মাহি। নামটা সুন্দর নাহ? ওটা আলুর মতো। ছেলেমেয়ে যাইহোক দুটোতে খাপ খেয়ে যাবে। আমি ডাকব ও মাহি, এই মাহি, হ্যা রে মাহি। আমার সারাটাদিন হবে মাহি মাহিময়। সে আমাকে মা মা ডেকে অস্থির বানিয়ে ফেলবে। আমাকে না বাড়ির সবাইকে পাগল বানিয়ে ফেলবে। আপনিও পাগল হয়ে যাবেন।

রিপ ওর উত্তেজনা দেখে

ওকে ওকে ফাইন। এখন একটু রিল্যাক্স নীরা। হাঁপিয়ে উঠেছ।

নীরা থামলো। পুনরায় বলা শুরু করলো,

ধরুন ছেলে হলো। আমি ওর বউয়ের জন্য সোনার গহনা বানিয়ে রাখবো। যাতে ওর বিয়ের সময় এত্তগুলা গহনা দিতে পারি বউকে। বৌমা তো খুশি হয়ে যাবে আর বলবে আমিই জগতের একমাত্র শ্বাশড়ি যে তার ছেলে বউকে এত এত গহনা দিয়েছে।

রিপ বলল

আচ্ছা দিও।

আর যদি মেয়ে হয় তার জন্যও গহনা বানাবো। বিয়ের দিন আমার মেয়ে আমার গহনা পড়ে সাজবে। ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভাববে জগতের এই একমাত্র মা যে নিজের মেয়েকে বিয়ের সময় এত গহনা দিয়েছে।

রিপ মাথা দুলালো।

আচ্ছা।

নীরা ওর মুখের দিকে তাকালো।

আমি খুব বকবক করছি না?

রিপ ওর মুখের দিকে তাকালো। মৃদু হেসে বলল

আরেহ না। ভালোই লাগছে। ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার স্যাপার থাকে তোমার গল্পে।

নীরা খুশি হলো। বলল

আসলে আমি কথা বললে ও একদম চুপ হয়ে থাকে। নইলে এমন লাতি মারে। বাবাহ গো। কি দুষ্টু বাচ্চা আমার। এডভোকেট সাহেব!

জ্বি বলো। শুনতে পাচ্ছি।

ও এরকম লাতালাতি করলে আমার কি যে আনন্দ লাগে। ও আমার হাসি-কান্না সব বুঝতে পারে জানেন?

কিভাবে বুঝলে।

বুঝি বুঝি। এটা মায়েরা বুঝে। আল্লাহ আমি নাকি মা হয়ে যাচ্ছি।

বলেই লাজুক হাসলো নীরা। রিপ বলল

হুহ তারপর।

ধুরর তারপর তারপর। তারপর আবার কি? আচ্ছা আপনি ওকে নিয়ে কিছু বলবেন না?

রিপ প্রশ্নটা শুনে চুপ হয়ে গেল। কি বলবে সে? তার কি বলার আছে? তবে ভয় হয় একটা ব্যাপারে। সে তো ভালোবাসে এটা বলতে পারেনা। সন্তানকে কি ভালোবাসা বলে বলে বুঝাতে হয়? যদি সে কোনোদিন মনে করে তার বাবা তাকে ভালোবাসে না রিপ এটা একদমই সহ্য করতে পারবে না।

কি ভাবছেন?

নীরা আমাকে এখন দেখলে মনে হয় আমি তোমাকে ভালোবাসি?

নীরা মাথা দুলালো।

কি দেখে মনে হয়?

আপনার চোখ।

চোখ?

হ্যা।

আপনার চোখদুটোর দিকে ভালো করে তাকালে তারা গড়গড় করে সবটা বলে দেয়। ওই চোখদুটো আমাকে কি বলে জানেন?

কি বলে?

কানে কানে বলি। আমার দুষ্ট বাচ্চা নইলে শুনতে পাবে।

রিপ ওর কান নিয়ে গেল নীরার কাছে। নীরা ওর গলা ঝাপটে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে

চোখদুটো আমাকে বলে রিপ রেজওয়ান খান নীরাতে ফেঁসে গিয়েছে।

___________

সেদিন মাঝরাতে হঠাৎ রিপের ঘুম ছুটতেই সে কারো আর্তনাদ শুনতে পেল। ঘুমঘুুম চোখ মেলে দেখলো নীরা কাঁদছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে। চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। ব্যাথায় গত কয়েক রাত ধরে এভাবে কেঁদে যাচ্ছে সে।
সে ভয়াজড়ানো গলায় নীরার মাথা টেনে এনে বুকে চেপে ধরে বলল

তুমি আমাকে ডাকবে না? খুব কষ্ট হচ্ছে ? পানি খাবে?

নীরা কান্না থামিয়ে দেয়।

না না।

রিপ তারপরও অনুভব করতে পারে। মাথায় হাত বুলায়। কপালে চুম্বন আঁকে। নীরা শান্ত বাচ্চার মতো চোখ বুঁজে রাখে। মিনমিন করে বলে

আমি তো আস্তে আস্তে কাঁদছিলাম যাতে আপনি না শুনতে পান। আমি কি একটু লুকিয়ে কাঁদতেও পারবে না?

অবশ্যই পারো। যেভাবে কাঁদলে তোমার মন ভালো থাকে সেভাবেই কাঁদো। তোমার কষ্টের ভাগ তো আমি নিতে পারছিনা কিন্তু পাশে তো থাকতে পারি। এই যে আমার কাছে আসামাত্রই তোমার কান্নার বেগ থেমে গেল।

নীরা নাক টেনে বলে

আপনার ঘুম নষ্ট হচ্ছে।

তুমি তো সারাক্ষণই কষ্ট সয়ে যাচ্ছ। এটুকু আমার জন্য কিছু না।

আচ্ছা আমি আর কাঁদছিনা। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।

তুমি ঘুমাও। আমার চোখে আপনাআপনি ঘুম নামবে।

নীরার প্রেগন্যান্সির এই প্রত্যেকটা রাত রিপের আতঙ্কে কাটে। জীবনে এমন ভয় সে হয়ত এই প্রথমবার পাচ্ছে। কেমন একটা ভয়। বুক কামড়ে ধরে ভাবতে গেলে। তার হাতের বাঁধন জোরালো হতে হতে আবারও শীতল হয়। মেয়েটার শরীরটা তুলোর মতো নরম ঠেকছে তার কাছে। কত ধকল যাচ্ছে সে অনুভব করতে না পারলেও চোখের দেখায় দেখতে পাচ্ছে। এজন্যই বলে মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত।

_______________

হসপিটালে নিয়ে আসার পর থেকে রিপ নীরার হাত ছাড়েনি। ও চোখের আড়াল হলেই নীরা সাহস হারিয়ে ফেলছিল। ব্যাথায় বুদ হয়ে যাচ্ছিলো। রিপ থাকলে ও কথায় ভুলিয়ে রাখে।
বিপি লো হয়ে যাওয়া, শরীরে পানি আসা ইত্যাদি নিয়ে ডাক্তাররা বলেছে খুব সিরিয়াস কন্ডিশন। রক্ত দিতে হবে।

নীরা রিপকে ডেকে বারবার জিজ্ঞেস করছিল যে বাচ্চা তো আরও অনেকদিন পর হবে। আজ কেন নিয়ে এলেন হাসপাতালে? ডেট আঠারো তারিখ ছিল না? আজ তো তবে সাত তারিখ। আমার বাচ্চার কি কিছু হয়েছে? ওর নড়াচড়া টের পাই না দুদিন।

বলতে বলতে ওর চোখে জল নেমে এল। কথা বলতে গিয়ে বড়বড় শ্বাস টানছে।
রিপ কি উত্তর দেবে খুঁজে পেল না। মাথায় হাত বুলিয়ে শুধু সান্ত্বনা দিল

তোমার আর তোমার বাচ্চার কিছু হবে না। আমি কিছু হতে দেব না। আমি সবসময় আছি। তুমি একটুও চিন্তা করবে না।

নীরা তার কথা শুনে হুহু করে কেঁদে উঠে বলল

যদি আমার কিছুটিছু হয়ে যায় আমার বাচ্চাকে একদম বকাটকা দেবেন না ঠিক আছে? ও খুব নিষ্পাপ। আমার অনেক আদরের। অনেক সাধনার। ওকে বকাঝকা করলে আমি কিন্তু খুব কষ্ট পাব, খুব কাঁদবো এডভোকেট সাহেব।

এসব কি কথা নীরা? তুমি তোমার বাচ্চাকে নিয়ে ঘরে যাবে। ও তো তোমাকে ছাড়া আর কাউকেই চেনে না। কি বলছো এসব?

হ্যা তা ঠিক। ও আমাকে ছাড়া কাউকে চেনে না। কিন্তু আপনাকে তো চেনে কিন্তু ভয় পায়।

কেন ভয় পায়?

ভয় পায় না। লজ্জা পায়। আপনি আসামাত্রই ও নড়াচড়া বন্ধ করে দেয় তাই বলছি। আপনি কোথাও যাবেন না প্লিজ। ব্যাথায় আমার শরীরটা ঝাজড়া হয়ে যাচ্ছে। আমি কি করব এখন?

কুয়াশাচ্ছন্ন চোখদুটো দিয়ে নীরার যন্ত্রণাকাতর মুখটা দেখে তাকে ডাক্তারের হাতে ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে এল রিপ। হসপিটালের করিডোরে নীরার বাপের বাড়ির সবাই, রিক মুনা মা বাবা, চৌধুরী বাড়ির সবাই অপেক্ষারত। রিপ কারো সাথে কোনোরূপ কথা না বলে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। কেউ ওকে আটকালো না।

সবার ভয়, শঙ্কা, উত্তেজনা, কৌতূহলকে থমকে দিয়ে খুবই সুন্দর, সুশোভন, মনোরম একটি সুচিক্কণ ক্রন্দন সুর সবার কানে ভেসে এল অনেক অপেক্ষা প্রহর গোনা শেষে। সেই শব্দ শুনে সবার মুখে আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ রব উঠলো। অতি উত্তেজনায় নীরার মা কান্নায় ভেঙে পড়লো এই ভেবে তার পাগলিটা আজ মা হয়েই গেল। সময় কিছু পার হতেই পুরো করিডোর মাথায় তোলা নরম তুলতুলে অথচ তেজস্বী ক্রন্ধনরত নতুন সদস্যটিকে পেয়ে ঝলমলিয়ে হেসে উঠলো তিন তিনটি পরিবারের মানুষ। শুধুমাত্র একজনই বাচ্চাটির মাকে দেখার তাড়না অনুভব করছিল দূর থেকে। তার আর তার বাচ্চাটার তার মাকে দরকার। সে কেমন আছে?

চলমান…..

বড়বড় কমেন্ট করেনা এখন কেউ🥱🥱#মন_দিয়েছে_ধরা
#পর্ব_২২
লেখনীতে….#পুষ্পিতা_প্রিমা

রিপ দু-হাত মেলে কোলে তুলতুলে শরীরটা নিতেই বক্ষস্থল কেঁপে উঠলো তার। এত নরম! তার শক্ত হাতে যদি ব্যাথা পায় নীরা তো তার আস্ত রাখবে না। বলবে কতবড় সাহস আপনার আমার বাচ্চাকে ব্যাথা দিয়েছেন। সে মুনাকে বলল

নিয়ে ফেলো আপা।

নেব কেন? রাখ। আদর কর। কার মতো হয়েছে বল তো?

রিপ ভালো করে তাকালো। বলল

কারো মতোই তো লাগছে না।

এখন লাগবে না। চল্লিশ দিন পার হলেই বুঝা যাবে ভালো করে।

রিপ হেঁটে হেঁটে বাচ্চাটার নাকমুখ চোখে ছোট্ট ছোট্ট চুমু বসিয়ে দিল। একদম শান্ত। চোখ মেলতে পারছেনা ভালো করে। ঠোঁট দুটো নাড়ার চেষ্টা করছে। সে ঠোঁটদুটোর উপর আলতো করে চুমু খেল। নীরা যে বলে তার দাঁড়িগুলো মৌমাছির হুলের মতো। কই তার বাচ্চা তো কাঁদলো না? নাকি সে বাবার সামনে ভদ্র সাজছে? অগণিত আদর করা শেষে তালহা বেগম ডাক দিলেন

এই এই এদিকে নিয়ে আয়। ওকে খাওয়াতে হবে।

রিপ এগিয়ে গেল। বাচ্চাকে দিল না। আবদার করলো

মা আমি ভেতরে যেতে পারব?

তালহা বেগম গালভরে হাসলেন। বলল

পাগল ছেলে। যাহ। ওর মাকে দেখা। ওর পরাণ জুড়াক।

রিপ তীব্র উত্তেজনা নিয়ে কেবিনের ভেতরে পা রাখলো। দুর্বল ও শীর্ণমুখে নীরা চোখ বুঁজে আছে। কয়েক মুহূর্তের লহমায় কেমন চুপসে গিয়েছে সে। কত ঝড় না গেল তার উপর। রিপ তার দিকে এগিয়ে গিয়ে পাশের টুলে বসলো। ডাকলো

নীরা!

নীরা বোধহয় এই ডাক শোনারই অপেক্ষায় ছিল। চোখ মেলে চট করে তাকালো রিপের দিকে। কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর জল জমে উঠলো ওর চোখজোড়ায়। রিপ হাস্যমুখে নীরাকে ইশারায় দেখিয়ে দিল কোলের বাচ্চাটিকে। নীরা দুচোখ মেলে দেখে তাকে । দেখতে দেখতে তার ব্যাথা যন্তণা দুঃখ যাতনার কথা ভুলে যায়। বুকের ভেতরটা লাফাতে থাকে আনন্দে। গলার কাছে কথারা থমকে থাকে। চোখ ফুঁড়ে গাল বেয়ে জলের স্রোত নেমে আসে। আনন্দের, সুখের কান্না। কাঁপা-কাঁপা হাত তুলে নরম তুলতুলে বাচ্চাটিকে ছোঁয়ামাত্রই বাচ্চাটা চেঁচিয়ে কেঁদে উঠে। নীরা দ্রুত হাত সরিয়ে ফেলে। রিপ হেসে বলল

এতক্ষণ কোলে নাওনি তো। তাই রাগ করেছে।

তাই?

হুমম।

নীরা দু-হাত বাড়িয়ে দিল। রিপ ওর বুকের উপর শুয়ে দিতেই নীরা জড়িয়ে ধরলো আলতো করে। বাচ্চা কেঁদেই চলেছে। নীরা চোখ বন্ধ চুপটি করে রইলো। তাকে হাত দিয়ে ছোঁয়ার কত স্বপ্ন দেখে এসেছে সে। আজ ছুঁতে পারছে। কি দুষ্টু বাচ্চা মায়ের উপর অভিমান করে এত কাঁদতে হয়?

মুনা এসে ফিডিং করাতে সাহায্য করে। রিপ তখন চলে যায়। মুনা চলে যেতেই রিপ আবার ফের আসে। বাচ্চা তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। রিপ গিয়ে নীরার পাশে বসে। নীরা ওর হাতটা নিয়ে কানের পাশে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে রাখে। রিপ ওর মুখের সামনে গিয়ে কপালে কপাল চেপে ধরে। কপালে গভীর চুম্বন এঁকে ফিসফিস করে বলে

নীরা তোমাকে পেয়ে আমি খুব খুশি। আমি আজ সুখী মানুষ।

সাথে সাথেই হাতের তালুতে নীরার কান বেয়ে গড়িয়ে পড়া তপ্তঅশ্রুজল টের পায় সে। নীরা কাঁদতেই থাকে সুখের অসুখে।

___________

বাড়িতে উৎসবের আমেজ। নাজিয়া বেগম আর তালহা বেগমের মধ্যে একপ্রকার বাকবিতণ্ডা লেগে গেল নাম রাখা নিয়ে। তালহা বেগম বললেন আমার ভাইয়ের নাম হবে সুলতান খান। নাজিয়া বেগম বললেন এসব পুরোনো রাজা-বাদশার নাম। তালহা বেগম জবাবে বললেন, আমার ভাই বাদশা-ই।

সুলতান নামটা ভালো হবে না। ওর নাম রাখবো আরশ নয়ত আজিম। এই নামের অনেক ফজিলত আছে।

মুনা এসে বলল

আচ্ছা ঠিক আছে। যার যেটা পছন্দ সেই নামে ডাকবেন।

দু’ঘন্টা তারা একে অপরের সাথে কথা বলেনি এ’নিয়ে। পরে বাবু যখন তালহা বেগমের কোলে হিসু করে দিল তখন নাজিয়া বেগমও হাসতে হাসতে বললেন

সুলতান তো কাম সেড়ে দিয়েছে বেয়াইন।

তালহা বেগম উনার গালে নাতির ছোট্ট তুলতুলে গালটা লাগিয়ে রেখে হেসে উঠে বলেন

এসব তো নিয়ামত।

নামকরণের দিন মাহিদ রেজওয়ান খান রাখা হলো। রিক মুনা আর জহির সাহেবের নামটা বেশ পছন্দ হয়েছে। নীরা মহাখুশি এডভোকেট সাহেব তার কথা রেখেছে বলে। আদি ইশার সাথে পরীও এল নামকরণের দিন। সে মাহিদের মাথার কাছে বসে। ছোট্ট ঠোঁট বাবুর হাতে কপালে গালে ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলল

বাবুহ বাবুহ আদোল।

রিপ তার গালে চুমু খেয়ে বলল,

মা এটা তো ভাই। পরীর ভাই।

ভাইই? আমাল ভাই?

রিপ হেসে বলে

হ্যা ভাই। আপনি আপু।

আফুহহ?

হুহ আফুহ। বড় আফুহ।

ব-লো।

হুম ব-লো।

পরী দাঁত দেখিয়ে খিকখিক করে হাসে। ভাইকে পেয়ে কি খুশি সে!

_______________

প্রায় চারমাস পরের কথা……

খুশিমনে বাড়ি ফিরতেই রিপ দেখতে পেল নীরা বিছানায় শোয়া বাচ্চাকে আদর আদর করতে বকবক করেই যাচ্ছে।

মাহি সোনা আমায় মা ডাক। একবার ডাক। আচ্ছা অর্ধেক ডাক। একটুখানি ডাক। এট্টুখানি। আচ্ছা এখন ডাকিস না। তুই তো কথা বলতে পারিস না।
শোন তুই সবার আগে মা ডাকবি। সবাইকে একদম তাক লাগিয়ে দিবি। সারাক্ষণ ম্যা ম্যা করবি। আমি একটুও বিরক্ত হব না সোনা। বিনিময়ে বেশি বেশি আদর দেব, সোহাগ দেব। লক্ষকোটি চুমু দেব।

বলতে বলতে আবারও ছেলের দুগালে চুমু খায় সে। পেটে সুড়সুড়ি দেয়। মায়ের মজা ছেলে যেন বুঝতে পারে। তাই হাসতে থাকে মায়ের সাথে। নীরা ওর হাসি দেখতে থাকে মুগ্ধ হয়ে। তারপর চোখের কোণা থেকে কাজল নিয়ে কানের নীচে ছুঁয়ে দেয়। কি প্রাণবন্ত হাসি। মায়ের নজর নাকি লাগে বেশি?

নীরা গালফুলায়। অভিমান করে বলে

এ্যাহ নমাস পেটে রেখে দুনিয়ায় আনলাম আমি। আর সে হচ্ছে বাপের মতো। হাসেও বাপের মতো। দুষ্টু ছেলে। পাজি ছেলে। বাপের ভদদরো ছেলে।

বলতে বলতে ডানেবামে নাড়েচাড়ে । মাহিদ ঠোঁট টেনে কেঁদে উঠে। নীরা পিঠের নীচে হাত গলিয়ে কোলে তুলে আদর করে। দোলাতে দোলাতে বলল

আহারে কাঁদেনা বাবাহ। মা তো মজা করছি। আমার জান্টুস, আমার মনা, আমার সোহাগ। তোকে আমি বকতে পারি? তুই তো আমার কইলজ্যা, আমার ফুসফুস, আমার সব রে মাহি। ও মাহি তোর বাপ কোথায় গেল রে? শালার জামাই বেশ বেশি ছাড় পাইছে এ কয়েকদিনে। দেরী করে ঘরে ফিরে আজকাল । শোন তোর দাঁত উঠলে তোর বাপের ডান হাতের আঙুলে কামড়ে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলবি যাতে আর কলম ধরতে না পারে, লিখতে না পারে বুঝছিস? বুঝছিস মনা?

সুড়সুড়ি দিতেই আবারও হেসে উঠে মাহিদ। নীরা হাসতে হাসতে টাপুসটুপুস চুমু খায়। বুকের সাথে চেপে ধরে বলে, তোরে আমার কি করতে মন চায় রে মাহি।

রিপ ঘরে পা রাখতেই নীরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।

এই এই ওয়াশরুমে যান আগে। হাতমুখ ধোয়া ছাড়া আমার বাচ্চাকে ছুঁবেন না।

আচ্ছা ঠিক আছে বাবাহ যাচ্ছি।

রিপ কোর্ট খুলে টিশার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। নীরা মিনমিন করে বলে

এই মাহি তোর বাপ আসছে। কোলে নিলেই খ্যাঁচ করে কেঁদে উঠবি। ঠিক আছে। বুঝিয়ে দিবি যে তুই ভয়ানক রেগে আছিস। ঠিক আছে?

রিপ গলায় ঝুলানো তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে এল। নীরা চুল আঁচড়াচ্ছে। মাহিদ দোলনায়। হাত পা নেড়ে খেলছে। রিপ তোয়ালে রেখে দিয়ে মাহিদকে কোলে তুলে নিল। বাবার মুখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে তারপর ঠোঁট এলিয়ে হাসলো সে। রিপ ওর হাসি দেখে কপালে বিরাট চুম্বন দিল। দু গালে চুমু চুমু দিতে দিতে বলল

কি ব্যাপার খান সাহেব? খ্যাঁচ করে কেঁদে উঠছেন না কেন?

নীরা চমকে উঠে তাকালো রিপের দিকে। রিপ ওকে ঠেস মেরে বলল

দাঁত উঠেনি এখনো? দাঁত উঠলে খাওয়ার সময় খ্যাঁচখ্যাঁচ করে কামড় বসিয়ে দেবেন। ঠিক আছে।

নীরা লজ্জা পেয়ে বলল

যাহ। অসভ্য লোক।

বাবার কোল পেয়ে শান্ত বাচ্চার মতো ঘুমে তলিয়ে যায় মাহিদ। রিপ কিছুক্ষণ পায়চারি করে ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে। সারাবাড়ি হাঁটে। মুনা একসময় দেখে বলে

এত শান্ত হয়ে আছে। ঘুমালো নাকি?

রিপ বলল,

হ্যা।

তা তুই ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘুরছিস? তারউপর আবার আদর করছিস? ঘুমের মধ্যে আদর করলে রাগী হয় সেটা জানিস না?

এসব আবার কেমন লজিক?

জানিনা। তোকে বুঝানোর সময় নেই। যা ওকে শুয়ে দিয়ে আয়। কোলে ঘুমানোর অভ্যাস করলে তো আরও জ্বালা।

রিপ ওকে নিয়ে গিয়ে দোলনায় শুইয়ে দিল।

নীরা চুল আঁচড়ানো শেষ করে রিপের দিকে তাকালো। বলল

বিনুনি পাকাতে পারেন?

চেষ্টা করে দেখা যায়।

নীরার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। চুল নিয়ে বিনুনি পাকানোর অব্যর্থ চেষ্টার পরেও যখন সম্ভব হলো না তখন নীরা তার দিকে ফিরে রেগে বলল

কচু জানেন? শুধু ফসফস করে লিখতে জানলে হয় না।

রিপ হেসে উঠে তাকে আয়নার দিকে ফিরিয়ে চুলগুলো বামপাশে সামনে ফিরিয়ে দিল। ডানপাশে অনাবৃত স্থানে ঠোঁট চেপে ধরে জড়িয়ে ধরে গালে গাল চেপে ধরে বলে

কাল ব্যারিস্টারি প্রমোশনের লেটার হাতে পাচ্ছি ম্যাডাম।

নীরা হতভম্ব চোখে আয়নায় রিপের দিকে তাকিয়ে থাকে।

সত্যি?

হুমম।

আমি এখন থেকে ব্যারিস্টার ডাকবো?

পারেন।

মাহি ডাকবে ব্যারিস্টার বাপ।

মোটেও না। ও আমাকে পাপা ডাকবে।

কচু ডাকবে কচু কচু।

রিপ হাসলো। নীরাও তার সাথে সাথে হাসলো। হাসি থামিয়ে বলল

আমার মাহিটা কি লাকি না? সে আসার সাথে সাথেই আপনার লেটার চলে এল। আপনি সিনিয়র এডভোকেট থেকে সোজা ব্যারিস্টার হয়ে গেলেন।

হু। হি ইজ আওয়ার কিং। দা গ্রেট মাহিদ রেজওয়ান খান। সান অফ রিপ রেজওয়ান খান এন্ড নীরা মারিয়াম।

নীরা মিষ্টি করে হাসলো। রিপের ফোন বেজে উঠতেই সে ফোনের কাছে চলে গেল। ফোন করা শেষে নীরা ডেকে বল,

এই ব্যারিস্টার সাহেব একটাহহ।

রিপ ফিরতেই সে নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরলো। ইঙ্গিত বুঝতে পেরে রিপ মৃদু হেসে উঠে বলল

ওহহ, কাম। এটা কোনো ব্যাপারই না।

নীরা ভালোবাসা পেতে ছুটে এল।

_____________________

মাহিদ এখন বসতে শিখেছে। হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। কোলে স্থির হয়ে বসতে চাই না। রিক তাকে সবেমাত্র কোলে নিয়েছে। সে মোচড়ামুচড়ি করতে শুরু করে দিল । হাত পা নাড়তে নাড়তে রিকের মুখে ধমাধাম পা দিয়ে মেরে বসলো। রিক হো হো করে হেসে উঠে বলল

নীরু রে তোর বাচ্চা তো ভারী পাজি হয়েছে।

হ্যা বাপের মতো হচ্ছে।

রিপ ওর দিকে চোখ তুলে তাকালো। রিক হেসে বলল

বল তোর মতো হয়েছে। আমার ভাই কি এত পাজি?

নীরা হেসে বলল

হ্যা আমার মতো হয়েছে। আমার ছেলে আমার মতো না হয়ে তোমার ভাইয়ের মতো হতে যাবে কেন?

রিক হেসে উঠলো। রিপ ভুরু কুঁচকে চেয়ে রইলো। মাহিদ রিকের কোল থেকে নেমে যাওয়ার পায়তারা করছে। এখন আধোআধো কথা বলতে শিখছে যদিও তেমন কিছুই স্পষ্ট করে পারেনা। নিজে নিজে কি যেন আওড়াতে থাকে।

ঠাসস করে জগ পড়ে যাওয়ার শব্দ হতেই সবাই আঁতকে উঠলো। তালহা বেগম কপাল চাপড়ে হায়হায় করে বলে উঠলেন

সর্বনাশ করেছে রে রিপ। তোর পোলা তো জগ ভেঙে ফেলছে। তুই ওকে ধরে রাখতে পারলি না গাঁধা?

রিক অসহায় মুখে চেয়ে দেখলো টি টেবিলে রাখা জগটা লাতি মেরে ফেলে দিয়েছে মাহি। সে বলল

ও সেটাতে লাতি বসাবে কে জানে?

নীরা এসে ধমক দিয়ে বলল

হ্যা রে মাহি এরকম করে কেউ? এভাবে জগটা ভেঙে ফেললি?

মাহি ঠোঁট টানতে শুরু করলো মায়ের বকুনি খেয়ে। বহুযুদ্ধ করে ডাকলো

আপপা।

রিপ সোফা থেকে উঠে গিয়ে কোলে নিয়ে হেসে বলল

নীরা দেখেছ পাপপা ডেকেছে।

নীরা বলল

কচু ডেকেছে।

রিপ মাহিদের গালে চুমু দিয়ে বলল

আমাকে পাপপা ডেকেছে। তুমি অস্বীকার করো আমার তাতে কি যায় আসে?

দেখেছ দেখেছ কান্ড! আমার কত সাধের জগটা ভেঙে ফেললো।

রিক বলল

আর কত কি ভাঙবে।

কি বললি?

কিছু না মা।

বলেই হাসলো রিক। মুনা এসে রিপের কোল থেকে কোলে নিল। সেদ্ধ করা নুডলস খাইয়ে দিতে দিতে বলল

এই মাহি সবাইকে বল আমি এই বাড়ি ভেঙে আবার গড়বো। তুলে আবার বসাবো। কেউ কিচ্ছু বলতে পারবে না।

মাহিদ মুখ থেকে নুডলস গুলো ফুঁড়ফুঁড় করে উড়িয়ে দিয়ে কোল থেকে নেমে যাওয়ার জন্য
মোচড়ামুচড়ি করতে করতে ডাকলো

উউউব্বাপ।

মুনা ফিক করে হেসে বলল

হ্যা রে নীরু ওকে বাপ ডাকা শিখিয়ে ফেলেছিস?

নীরা রিপের দিকে তাকিয়ে জিভের আগায় কামড় খেল।

_________________

পরিশিষ্ট :

মাহিদের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে তাই
জন্মদিন উপলক্ষে চৌধুরী বাড়ির সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে। মাহিদ অসুস্থ ছিল। গত দুদিন আগে সিঁড়ি থেকে পড়ে কপাল ফাটিয়েছে। তার ব্যান্ডেজ এখনো আছে। নীরা তাকে দেখে দেখে রাখলেও সে একপলক চোখের আড়াল হতেই কাম বাড়িয়ে বসে থাকে। একমুহূর্তের জন্যও শান্তিতে এক জায়গায় বসে না। তার আগে ব্যাট ঘুরাতে গিয়ে নিজের ব্যাটের বাড়ি নিজে খেয়ে মাথায় ফুলিয়ে ডবডবে বানিয়ে ফেললো। নীরা কেঁদেকেটে সাগর বানালো অন্যদিকে মায়ের কান্না দেখে সে হেসে লুটোপুটি। কিন্ডারগার্টেনে পড়তে দিয়েছে তাকে। সেখানে একটা মেয়েকে একটা ছেলে মারতে দেখে ওই ছেলেটাকে মেরে, খামচি দিয়ে রক্তাক্ত করে এসেছে। টিচাররা সবাই নীরা আর রিপকে ডাক পাঠালো। অভিযোগ শুনিয়ে ইজ্জতের দফারফা বানিয়ে ছাড়লো। সেসব তো গেল। পরীর সাথে ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুল মচকে আরও হো হো করে হাসতে নীরাকে এসে বলল

আম্মুউউ বুড়ো আঙুল রাগ করেছে। ব্যারিস্টারের মতো।

নীরার কি আর বলার থাকে? ভেবেছে ব্যারিস্টারকে বিচার দেবে। সে আদর করে করে বাঁদর বানিয়ে ফেলেছে খুব। কিন্তু কোথায় তার বাপ তাকে শাসন করবে তা না করে তিনি বাড়ি ফিরে ছেলের আঙুলে মলম মালিশ করতে করতে ব্যাথা কমিয়ে দিতে পেরে বলল

নীরা ম্যাজিক দেখেছ? মাহির ব্যাথা ভ্যানিশ।

বাপের গলা ধরে ঝুলিয়ে থেকে কি আহ্লাদ তখন ছেলের। বড় হতে হতে এসব থাকলে ভালোই। ছেলেরা বড় হলে তো আবার বাবার ছেলের মধ্যে অদৃশ্য একটা দেয়াল তৈরি হয়ে যায় আপনাআপনি। নীরা রাগ করে আর থাকতে পারেনা বাবা ছেলের খুনসুটি দেখে।

ইশার কোলে বাচ্চা এসেছে দেড়বছর হলো। পুরোটাই ইশার কার্বনকপি। দেখতে শ্যামবরণ। চেহারায় গুচ্ছ গুচ্ছ মায়া। মাথা গোলগাল করে চুল কাঁটা। ডাগর ডাগর চোখ। রঙটা ফর্সা হলে, চোখটা ঘোলাটে হলে একদম পরীর মতো লাগতো। দু বোনের চেহারার অনেক মিল। পরী রিক মুনার পরিচয়েই বড় হচ্ছে। সে এখন ক্লাস থ্রি’তে পড়ে। তার আর মাহিদের জন্মতারিখ একই। সাত তারিখ। তাই তাদের দুজনের জন্মদিনের অনুষ্ঠান একসাথে হচ্ছে।

ভাইবোন নতুন জামাকাপড় পড়ে মেহমানের অপেক্ষায় বসে থাকলো। আদি ইশা, রাইনা আফি আসার পর থেকেই পরীর খোঁজ করে যাচ্ছে। পরী তাদের দেখে লুকিয়ে থাকলো সুপ্ত অভিমানে। আম্মার কোলে বোনকে দেখে দেখার ইচ্ছে হলেও সে সামনে গেল না। আদি পাগলের মতো খোঁজ করলো তার । পরী এল না। দেখা দিল না। রিপ এসে সান্ত্বনা দিয়ে বলল

আমি নিয়ে আসবো। তুই শান্ত হয়ে বোস। দেখি মামাকে দে তো ইশু। এটা তো পুরোটাই তুই।

ইশা হাসলো। বলল

সবাই এইরকম বলে। পরী ওর আব্বার মতো হয়েছে। পিহু আমার মতো।

রিপ পিহুকে কোলে নিয়ে চলে গেল। ঘরে গিয়ে দেখলো পরীর পাশে মন খারাপ করে বসে আছে মাহিদ। রিপ গিয়ে বলল

কি হয়েছে আপনাদের? মন খারাপ কেন? পরী মা এখানে কেন? আম্মা আব্বা এসেছে তোমার।

পরী ছুটে এসে পিহুকে কোলে নিতে চাইলো। রিপ বললো

তুমি বসো। আমি দেই।

পরী কান্না আটকে রেখে বসলো। রিপ ওর কোলের উপর পিহুকে দিল। পরী বোনকে ছুঁতে পেরে হাসলো। গালে আদর আদর করতে করতে ডাকলো

বোন। আমি তোমার আপু।

রিপ হেসে বলল

বোনকে তো দেখতে যায় না তার বড় আপু।

পরী চোখ পাকিয়ে তাকায়। রিপ কপালে আদর দিয়ে বলে

পরীর এত দুঃখ কিসের? পরীর চারটা মা চারটা বাবা। দুটো বাড়ি। চারজন দাদু নানু। দুটো ভাই। রেহান আর মাহি। একটা পুচকু বোন। কেন এত দুঃখ মায়ের?

পরী ঠোঁট উল্টায়।

রিপ পিহুকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পরীকে কোলে টেনে গাল মুছে দিতে দিতে বলে

পরী মা এখন আম্মা আব্বার কাছে যাবে। তারা তো পাগল হয়ে আছে পরী মাকে দেখবে বলে, আদর করবে বলে। পরী মা এখন যাবে, তাদের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কত আদর বাকি আছে তার জন্য।

রিপের গলা জড়িয়ে ধরে ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠে পরী। বলে

আই অলওয়েজ মিস মাই আম্মা আব্বা এন্ড মাই ফ্যামলি।

পরীকে নিয়ে রিপ চলে গেল। মাহিদকে বলল

পাপা বাবুকে দেখে রেখো। আমি তোমার আম্মুকে পাঠাচ্ছি।

মাহিদ মাথা নাড়ায়। রিপ চলে যেতেই পিহুর দিকে সরু চোখে তাকায় মাহিদ ।
গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ পিহুর হাত পা নেড়ে খেলা দেখতে থাকে। তারপর ওর পিঠের নীচে হাত গলিয়ে কোলে নিয়ে বসে।
হাত ছুঁতেই পিহু ওর আঙুল আঁকড়ে ধরে। জিহবা দেখিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে। উঃউঃ শব্দ করে হাসে।
মাহিদ ওর আঙুল ছাড়িয়ে নেয়। খিক করে হেসে বলে,

কালো বাবুনি।

পিহু হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে একসময় ওর নাক বরাবর হাতের পড়া ঝুনঝুনি দিয়ে দুম করে মারে। মাহিদ ব্যাথা পায়। রেগে গিয়ে বলে

কালোনিইইইই।

ধপাস করে বিছানায় ফেলে দিতেই পিহু চেঁচিয়ে কেঁদে উঠে। নীরা হন্তদন্ত পায়ে হেঁটে এসে পিহুকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে শান্ত করাতে করাতে বলে

মাহি কি করেছিস?

পিহুনি কালোনি আমাকে মেরেছে। ব্যাথা পেয়েছি। তোকে আর কোলে নেব না বাপ।

সমাপ্ত……

ইয়া বড় বড় কমেন্ট চাই আজকে……… 🥹

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here