#ভালবাসার_প্রহর
#লেখনীতে_মায়া_মনি
#পর্ব৩৭
জেরিনের রুমটা ঘুরে ঘুরে দেখছে স্নেহা।খুব পরিপাটি করে সাজানো।বারান্দায় একটা দোলনা ও আছে।স্নেহা সব কিছু ছুঁয়ে দেখছে।জেরিন বিছানায় বসে আছে। স্নেহা বারান্দা থেকে রুমে এলো।হাল্কা হেসে জেরিনের সামনে বিছানায় বসে।জেরিন যথাসম্ভব নম্র ভাবে আছে।স্নেহা হেসে বলে,
—-“রুমটা অনেক সুন্দর।খুব যত্ন করে সাজানো সব।”
জেরিন আলতো হেসে বলে,
—-“মানুষের তিনটা জিনিস পরিপাটি না হলেই না।থাকার স্থান,খাবার,জামা।”
স্নেহা স্তির চোখে জেরিনের দিকে তাকিয়ে আছে।স্নেহা জেরিনের গালে হাত রাখতেই জেরিন একটু চমকে যায়।স্নেহা মৃদু কন্ঠে বলে,
—-“তুমিও অনেক সুন্দর।স্পর্শ সত্যি সেই কাজ করেছে।সবাই ভাবতো বেচারা ভাই আমার মেয়েই পাবে না।”
জেরিন লজ্জায় মাথা নত করে হাসে।নিচুস্বরে বলে,
—-“মানুষটা অনেক ভালো,কেয়ারিং।”
—-“তোমাকে মেহরাব ম্যানশনে স্বাগতম। আশা করছি খুব দ্রুত আমরা এক সাথে দিন পার করবো।”
জেরিন হাল্কা হাসলো,
—-“আমিও অপেক্ষায় আছি ভাবি।”
স্নেহা জেরিন কে এক হাতে জড়িয়ে ধরলো।দরজায় কড়া পরতেই চোখ তুলে তাকায় দুজন।মহিনি মেহরাব মাধুর্য মাখা মুখে বলেন,
—-“স্নেহা,শুভ ডাকছে তোমাকে।”
স্নেহা এবং জেরিন উঠে দাঁড়ায়।সম্মতি জানিয়ে স্নেহা বসার ঘরে গেলো।মহিনি মেহরাব রুমে প্রবেশ করে চারপাশে চোখ দিলেন।জেরিন মাথা নিচু করে আছে।মহিনি মেহরাব এক গাল হাসি দিয়ে কাছে এসে বলেন,
—-“উঠলে কেনো,বসো?”
জেরিন বিছানায় বসে।মহিনি মেহরাব পাশে বসে দুহাতে মুখ উচু করে ধরেন।মিষ্টি করে হেসে বলেন,
—-“তোমাকে আমি কিন্তু মেয়ে বানিয়ে নিচ্ছি,পুত্র বধু না।স্নেহা কিন্তু আমার মেয়ে তবে পুত্র বধু।তুমি আমার মনে অন্য এক স্থান নিয়েছো।সেটা আমার আর তোমার মাঝেই থাকবে শুধু।আমি শুনেছি তুমি খুব ভালবাসো তোমার মাকে।”
জেরিন নিচুস্বরে বলে,
—-“ছোট থেকে মায়ের হাত ধরেই বেড়ে উঠেছি।বাবার ভালবাসা তেমন একটা পাইনি আমি।”
মহিনি মেহরাব ইশারায় কাছে আসতে বলেন।জেরিন সামনে এগিয়ে বসলে তিনি বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরেন
আদুরে গলায় বলেন,
—-” আমিও চাই তোমার মায়ের মতো অনেক বেশি ভালবাসো আমাকে।সেই অধিকার কী দিবে না আমাকে বলো?”
জেরিন ধরা গলায় বলে,
—-“দিবো মা!”
মহিনি মেহরাব বুক ছিড়ে এক তৃপ্তির নিশ্বাস ফেললেন।জেরিনের কপালে চুমু খেয়ে গলায় থাকা চেইন জেরিন কে পরিয়ে দিলো।জেরিন অবাক হয়ে বলে,
—-“এটা তো মা আপনার?”
মহিনি মেহরান মৃদু ধমক দিয়ে বলেন,
—-“চুপ! তুমি আমার মেয়ে, আমি আমার মেয়েকে ভালবেসে এটা পরিয়ে দিলাম।মায়ের সব গহনা, সব কিছুর প্রতি মেয়ের অধিকার থাকে বুঝলে?”
জেরিন চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি ফেলে দিলো।মহিনি মেহরাব চোখের পানি মুছে আবারো জড়িয়ে ধরলেন।সেই দৃশ্য স্পর্শ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।মুখে তার প্রাপ্তির হাসি।জেরিন কে একটা ভালো দিন সে উপহার দিতে পেরেছে।
.
.
.
.
চোখে মুখে পানি দিয়ে ওয়াসরুম থেকে বেড়িয়ে এলো জেরিন।ঘড়িতে ১১ টা বাজে। চারপাশে নিরবতা শুরু।রাতের শহর একদম শান্ত।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।স্পর্শ বোতল ভরে পানি এনে দরজা লাগিয়ে স্তির হয়ে যায়।উন্মুক্ত জেরিনের কোমর আর পিঠ দেখে।স্পর্শের উপস্থিতি পেয়ে দ্রুত ফ্লোর থেকে শাড়ি তুলে বুকে চেপে ধরে জেরিন।স্পর্শ ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
—-“কী সমস্যা?”
জেরিন অপ্রস্তুত হয়ে বলে,
—-” আপনার কী সমস্যা?”
স্পর্শ বোতল রেখে এক পা এক পা করে জেরিনের কাছে এগিয়ে আসে।জেরিন ভিত চাহনিতে পিছিয়ে যায়।স্পর্শ দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,
—-“এভাবে পিছিয়ে যাচ্ছো কেনো? শাড়ি বা ফ্লোর থেকে তুললে কেনো,তাহলে খুলেছো কেনো?”
জেরিন লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো।নিশ্বাস ভাড়ি হয়ে আসে।স্পর্শ কোমর টেনে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।শাড়িটা আবারো ফ্লোরে পরে গেলো।জেরিন কাপা কাপা গলায় বলে,
—-“কী করছেন আপনি?”
স্পর্শ শান্ত গলায় বলে,
—-“কেনো দেখতে পারছো না?বেশি কথা বললে ফেলে দিবো।”
জেরিন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।স্পর্শ মুচকি হেসে আরো চেপে ধরে জেরিন কে।জেরিন স্পর্শের টি- শার্ট এর কলার খামচে ধরে।নিজের ওষ্ঠদ্বয় দ্বারা জেরিন ওষ্ঠদ্বয় আকড়ে ধরে।স্পর্শের হাত জেরিনের পিঠে শিতল ছোঁয়া দিচ্ছে।কেপে উঠছে জেরিন।ধিরে ধিরে জেরিনের ঘাড়ে গভীর চুমু খেলো স্পর্শ। ঠোট দিয়ে কামড়ে ধরলো স্পর্শ। জেরিন নিজেকে ছাড়াতে চাইলে স্পর্শ জেনো আরো ঝাপটে ধরে।আরো একবার স্পর্শের ভালবাসায় বন্ধি হলো জেরিন।
___________________________
ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে রিয়া।আজ বেশ মজা দেখিয়েছে স্পর্শের বদমাইশ বন্ধুদের।সেই মুহূর্তের কিছু ভিডিও দেখছে আর হাসছে রিয়া।এখনো তো অনেক মজা দেখানো বাকি ওদের।খিলখিল করে হাসছে আর ভিডিও দেখছে।হঠাৎ অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে।কপাল কুঁচকে চিন্তা করল কে হতে পারে।ধরবে কিনা ভাবতে ভাবতে আবার কল এলো।ফুস করে নিশ্বাস ফেলে রিসিভ করে কানে দিলো,
—-“হ্যালো কে?”
ওপাশ থেকে বলে উঠে,
—-“কেমন আছেন বেয়াইন সাব?”
রিয়া বেশ চমকে গেলো।এই ছেলেটা আবার কে?বেশ চেতে বলে,
—-“রাত কয়টা বাজে হ্যা? অচেনা একটা মেয়েকে কল করে বলছেন, কেমন আছেন বেয়াইন সাব? বলি, আমি আপনার কোন কালের বেয়াইন? ”
ওপাশের ব্যক্তির অবস্থা কী হতে পারে ভেবে একটু হাসলো রিয়া কিন্তু প্রকাশ করল না।বেশ অসহায় গলায় উত্তর এলো,
—-“বেয়াইন সাব, করলা আর নিম পাতার জুস খাবিয়েও মন ভরলো না আপনার? এখন ঝারিও দিচ্ছেন?”
রিয়া এবার চিন্তায় পরল কে এটা? বন্ধু তো তিন জন ছিল।রিয়া ভাবুক গলায় বলে,
—-“আপনি কে মশাই বলুন তো?”
—-“আমি রেহান বেয়াইন সাব।”
রিয়ার চোখ কপালে।এই শালা নাম্বার পেলো কিভাবে? রিয়া অবাক হয়ে বলে,
—-“আমার নাম্বার পেলেন কিভাবে আপনি?”
রেহান মৃদু হেসে বলে,
—-“চুরি করেছি বলতে পারেন।”
—-” আমি আপনার নামে মামলা করবো।আমার নাম্বার চুরি করার সাহস পেলেন কিভাবে?”
রেহান শব্দ করে হেসে বলে,
—-“মনের টানে বেয়াইন সাব।মনের টানে সব সম্ভব।”
#ভালবাসার_প্রহর
#লেখনীতে_মায়া_মনি
#পর্ব৩৮
ব্যস্ত শহরে আজ নিজেকে বেশ হাল্কা লাগছে জেরিনের।ভার্সিটির বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে রিকশার অপেক্ষায়।চোখে -মুখে অদ্ভুত হাসি।এমনি একদিন রিকশার অপেক্ষায় পেয়েছিল ২য়বার স্পর্শকে সে।এক গাল হাসি দিয়ে দু পা সামনে যেতেই সেই চেনা পরিচিত গাড়িটা সামনে এসে থামে।অবাক হলেও মুচকি হেসে দেয় জেরিন।স্পর্শ গাড়ি থেকে নেমে জেরিনের সামনে এসে দাঁড়ায়।দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলে,
—-“কেমন আছো?”
জেরিন মুচকি হেসে বলে,
—-“অনেক ভালো, তুমি?”
—-“অসম্ভব ভালো।”
জেরিন মাথা তুলে হেসে বলে,
—-“তাই নাকি?”
স্পর্শ হেসে বলে,
—-“হ্যা তাই!”
স্পর্শের সাথে গাড়িতে উঠে বসে জেরিন।আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেলো পারিবারিক ভাবে বিয়ে ঠিক হয়েছে। বাসায় সবাই ব্যস্ত কেনাকাটা করতে।নানা আয়োজনে সবার ছুটাছুটি। হাসান বাসায় আসলে স্পর্শ সুন্দর ভাবে ডিভোর্স পেপার দেখায়।সাথে বন্ধু মহলের করা কেস এর পেপার ও।আইনত ভাবে এবং ধার্মিক ভাবে হাসান হেরে যায়।পরিবারের সবাই খুশি মেয়ের মুখে হাসি দেখে।জেরিন স্পর্শের কাধে মাথা রেখে নরম গলায় বলে,
—-“পহেলা ফাল্গুনে আমাদের আবার দেখা। অসম্ভব সেই মিষ্টি অনুভূতির হাতে স্পর্শ মেহরাব আমার মন ছুঁয়ে যায়।”
স্পর্শ জেরিনের কপালে চুমু দিয়ে বলে,
—-“একটা সাদা পরি এসে আমার পাশের জায়গা বসে।চোখে-মুখে তার কি যে লজ্জা ছিল।কোথাও এক মায়ার টান ছিল,তাই এক সাথে বাদাম ও খেতে পেরেছি।”
জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত সত্যি অপ্রত্যাশিত ভাবে উপহার দেয় সেরা কিছু।স্পর্শের নামে পুরো জীবন লিখে দিবে কল্পনাও ছিল না জেরিনের।
_________________________
কাট ফাটা রোদে ফুলের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে রিয়া।ঘামে কপাল ছুঁয়ে পরছে নোনাক্ত পানি।এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দোকান দার কে বেশ ধমকে বলে,
—-“এতো সময় লাগে ফুল দিতে?সেই কত সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছি আমি।”
পাশ থেকে পুরুষালি কন্ঠে কেউ বলে,
—-“বেয়াইন সাব এতো হাইপার হচ্ছেন কেনো?”
প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে পাশ ফিরে রেহান কে আবিষ্কার করে চোখের সামনে রিয়া।সেদিনের পর রেহানের সাথে তেমন কথা হয়নি।যদিও রেহান ম্যাসেজ দিতো কিন্তু রিয়া ও ইচ্ছে করে ঝুলিয়ে রাখতো ম্যাসেজ গুলো।রিয়া চুপ করে থাকায় রেহান আবার ও বলে,
—-“কী ব্যাপার, বেয়াইন্ সাব দেখি বোবা হয়ে গেছে।”
—-“আপনাকে কী এই অসময় আমাকে বিরক্ত করতে সরকার পাঠিয়েছে?”
রিয়ার তেতো কথা বেশ মিঠা মনে হলো রেহানের। মুচকি হেসে বলে,
—-“মন পাঠিয়েছে গো সুন্দরী। ”
রিয়া চোখ রাঙিয়ে বলে,
—-“আপনার যত ঢং!”
দোকানদার গাড়িতে বেলি ফুল,গোলাপ ফুল,গাদা ফুল আরো অনেক ফুল তুলে দিলো।সেখান থেকেই একটা ফুল রেহান রিয়াকে দিয়ে মিষ্টি হেসে বলে,
—-“পরে না চোখের পলক, কী তোমার রুপের ঝলক!”
রিয়া ফুলটা গাড়িতে রেখে বলে,
—-“আপনি জ্ঞান হারাবেন,মরে যাবেন,বিড়াল ও বাচাতে আসবে না গো।”
রিয়া গাড়িতে উঠে বসে।রেহান হতাশ গলায় বলে,
—-“বেয়াইন সাব আর কত, কয়দিন পর তো ধরা দিতেই হবে। ”
—-“সেটা না হয় দেখা যাবে বেয়াই সাব।”
___________________________
মেহরাব কম্পানিতে আশরাফ মেহরাব ছেলের বিয়ের কার্ড দিচ্ছেন।শুভ মিষ্টি বিলিয়ে যাচ্ছে।সবাই বেশ খুশি। আশরাফ মেহরাবের পর স্পর্শ প্রথম যে অল্প বয়সে সাক্সেস হয়েছে কাজে।শুভ বাবার কেবিনে এসে মৃদু ব্যস্ত হয়ে বলে,
—-“বাবা, সব কাজ শেষ এখন শুধু সাজানো বাকি।”
আশরাফ মেহরাব একটা চেক ছেলেকে দিয়ে বলেন,
—-“জেরিন কে নিয়ে শপিং সেরে ফেলো।আর স্নেহা কে নিয়ে ও যাও।দেখো ওর কী কী লাগে।”
শুভ হাল্কা হেসে বলে,
—-“বাবা স্নেহা কে বেশি লাই দিয়ে ফেলছি না তো?”
—-“লাই দিচ্ছি বলে মনে হচ্ছে না তবে,তোমার বউকে ঠিক রাখার দায়িত্ব তোমার।”
শুভ সম্মতি দিয়ে বলে,
—-“আমি চেষ্টা করছি বাবা সব ঠিক রাখার।”
___________________________
ঘড়িতে রাত ১২ টা বাজে।এপাশ ওপাশ করেও ঘুম আসছে না জেরিনের।মুখ থেকে চাদর নামিয়ে স্পর্শের দিকে তাকালো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝুম।ঠান্ডা ভাবে চাদর গায়ে শুয়ে আছে।পাশেই স্পর্শ ল্যাপটপে মুখ গুঁজে কাজ করছে।জেরিনের অস্থিরতা দেখে স্পর্শ ল্যাপটপ অফ করে এক পাশে রেখে দিলো।জেরিনকে টেনে তুলে বসায়।ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,
—-“উঠালে কেনো?”
স্পর্শ মুচকি হেসে গলায় কিছু একটা পরিয়ে দিলো।জেরিন ভালো করে চেয়ে দেখে সোনার চেইন।স্পর্শ জেরিনের কপালে চুমু দিয়ে বলে,
—-“হ্যাপি এনিভার্সিরি মেরি জান এবং শুভ জন্মদিন। ”
জেরিন বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে।টুপ করে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পরে চোখ থেকে।জেরিন ধরা গলায় বলে,
—-“তোমার মনে ছিল?”
স্পর্শ বুকে জড়িয়ে বলে,
—-“অবশ্যই আছে! এমনই বৃষ্টি ময় রাতে পেয়েছি প্রিয়তমা কে।সেদিনই হয়েছে প্রিয়তমার জন্ম।আমি এমন বিশাল দিন কীভাবে ভুলি?”
চলবে..
চলবে