#অপেক্ষিত_প্রহর
#আফসানা_মিমি
|১৬তম পর্ব |
মধ্যরাত। সহস্র বছরের অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে আজ আমরা এক হয়েছি। ইফাজ কখন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। মনে হচ্ছে, হাজারো বছর পর শান্তির ঘুম ঘুমোচ্ছে। এদিকে আমি ইফাজের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অতীতের কথা ভেবে যাচ্ছি। দেড় বছর আগের অতীতের দিনটা কত জঘন্য ছিল আমাদের জন্য। কিন্তু আজ শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আমরা দুজন এক হয়েছি। সবই ভাগ্য; গতকাল ভেবেছিলাম আমরা কখনো এক হতে পারব না। কিন্তু ভাগ্যের লীলাখেলা আজ আমরা একসাথে। আমার ভাবনার মাঝে ইফাজ নড়েচড়ে উঠলো। আমার মুখশ্রীতে তাকিয়ে দেখে আমি একমনে ইফাজের পানে তাকিয়ে আছি আমার তাকানো দেখেই ইফাজ কপাল চাপড়ে প্রশ্ন করল,
– এই বউ তুমি ঘুমাওনি?
ইফাজের কথা শুনে মাথা নাড়ালাম। যার অর্থ না আমি ঘুমাইনি। ইফাজ আমার কথা শুনে অস্থির হয়ে গেল।
– কেন খারাপ লাগছে হিবারাণী! আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেই! ঘুম চলে আসবে।
– ইফু আমার কাছে না সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, প্রতিদিনের ন্যায় আজও আপনি আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাবেন। আচ্ছা আমি কি সত্যিই আপনার কাছে এসেছি? এই যে আপনার সাথে মিশে আপনার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। সব কি সত্যিই?
ইফাজ আমার কথা শুনে মুচকি হাসলেন। আমাকে টেনে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে কপালে অধর ছুঁয়ে দিলেন।
– হ্যাঁ আমার হিবারাণী, তুমি এখন স্বপ্ন দেখছো ।না আমার সাহসী হিবারাণী সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে এসে আমার কাছে এসেছে। যা আমি ছেলে হয়েও পারিনি এতদিন। আর তোমার এই ইফু তোমারই থাকবে সব সময়। আমি জানি এতদিন আমাদের ভালোবাসার বিশ্বাসের জোড়ে তুমি আমাল অপেক্ষায় ছিলে এবং দেখো তোমার বিশ্বাস আমি ভাঙতে দেইনি। তুমি আজ না আসলেও কিছুদিনের মধ্যেই আমি তোমার কাছে চলে যেতাম। এখানে শুধু ছিলাম কিছু নিকৃষ্ট মানুষদের মুখ থেকে পর্দা সরাতে।
ইফাজের কথায় কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম,
– আপনি জানেন! এই দেড়টা বছর আমার কেমন কেটেছে? সেই দেড় বছর আগের সেই নির্দিষ্ট দিনের কথা মনে করে করে আমি এক রাত ঘুমাতে পারিনি। সেদিনটা আমাকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে ফেলেছে। কেন এসেছিল সে নিকৃষ্ট ঘৃণিত দিন আমাদের মাঝে? আমরা তো আর পাঁচ টা দম্পতিদের মতো সুখে থাকতাম।
আমার কথা শেষ হতেই ইফাজ নিজের অধর যুগল আমার অধরের ছুঁয়ে দিলেন। পরপর কপালে তিন চারবার অধর ছুঁয়ে বললেন,
– আমি সব জানি, আমার হিবারাণী আমিহীনা ভালো ছিলু না সেটাইও জানি। তুমি কি ভেবেছিলে! সেখানে তোমার খোঁজখবর নেইনি আমি? অবশ্যই নিয়েছি। আমার লোকজন সর্বদা তোমার আশে পাশে থেকেছে। তোমাকে সবদিক থেকেই রক্ষা করেছে। নাহলে তো আমার মামা তো তোমাকে কবেই,,,,, বাদ দাও এসব কথা। এখন আমি আর তুমি কাছাকাছি থাকবো আর কোন ঝামেলা করতে পারবে না কেউ।
ইফাজের কথায় আমার মন শান্ত হলো না বরঞ্চ আরো ছটফটে হয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠলো অতীতের সেই নিকৃষ্ট দিনটি।
———-
দিনটি ছিল শুক্রবার। বাবা মা খুবই ব্যস্ত আজ। মা তো রান্না ঘর থেকে বাইরে বেরই হচ্ছে না। আর বাবা! এই বাহিরে পরিষ্কার করছেন তো এই ঘরে এসে গোছগাছ করছেন। এই দুজনের আজ কি হয়েছে কেন তাঁদের এত দৌঁড়াদৌড়ি। আমার ভাবনার মাঝে দো’তলা থেকে নিচে নেমে আসেন। আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে,
– ভালোবাসি বউ।
ইফাজের কথা শুনে হাসলাম। এই মানুষটা সব সময় এমন করে হুটহাট একথা সেকথা বলে আমাকে লজ্জায় ফেলে দেয়।
ইফাজ আর আমি চেয়ার পেতে বসলাম। আমাদের বাড়ির পিছন দিক থেকে খুব সুন্দর প্রকৃতির দেখা যায়। দূর-দূরান্তের শুধু ধান খেত আর তার দুইপাশে সারি সারি গজারি গাছ।
– আচ্ছা ইফু! আপনি কি জানেন আজ বাসায় কি হবে? না মানে বাবা-মার এরকম দৌঁড়ঝাপের কারণ তো আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
– তেমন কিছু না। আজ আমার মামা আসবে। তো আমার শ্বশুর শাশুড়িকে আমি বলেছিলাম যে আমার বাড়ি থেকে মানুষ আসবে। সেই থেকেই তাঁদের এমন তড়জোড় শুরু।
ইফাজের কথা শুনে আমার চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল।আমার শ্বশুর বাড়ি থেকে মানুষ আসবে আর ইফাজ আমাকে এখন বলছে? রাগে, দুঃখে,কষ্টে ইফাজকে কতক্ষন পিঠৈ কিল ঘুষি দিতে লাগলাম। আমার আঘাত করা দেখে ইফাজ বলা শুরু করল,
– আরে করছো কি বউ? এভাবে মরছ কেন? আহ ব্যথা পাচ্ছি তো! এভাবে মারলে কিন্তু তোমার ঐ নরম তুলতুলে হাতের সাথে তোমার ঠোঁট দুটো খেয়ে ফেলবো। আমার কি দোষ, আজ সকালে মামা বলল যে আমি যেখানে আছি সেখানের ঠিকানা দিতে। আমিও ঝটপট ঠিকানা দিয়ে দিলাম। আর মামা রওনা দিলেন এখানে আসবে বলে। আর এই কথা তোমার বাবা মা কে বলার পর থেকে শুরু করেছেন মেহমান আপ্যায়ন করবেন কীভাবে।
ইফাজকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলাম বাসায়। বাসায় এসে মাকে ঘর-দোড় গোছগাছ করতে সাহায্য করলাম।
এদিকে সকালের পর থেকেই ইফাজে সাথে আমার কোন কথা হয়নি। এই বদ শিল্পীটার সাথে আমি রাগ করেছি।অনেক রাগ করেছি। ইফাজ আমাকে প্রথমে বলে দিয়ে বালো কিছু আয়োজন করতাম। এজন্যই ইফাজের সাথে অনেক অভিমান করেছি।
যথাসময়ে শ্বশুর বাড়ির লোক মানে মামা শ্বশুর আমাদের বাসায় প্রবেশ করল, যা আমি আমার ঘরের জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম। ইফাজের মামাকে দেখে বাবার মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল। আমার মনে হচ্ছে যে, বাবা এই লোকটার এখানে আসা পছন্দ করেন নি। জোরপূর্বক কুশল বিনিময় করে বাবা মামাকে নিয়ে আসলেন ঘরে। আমি এপর্যন্ত ঘর থেকে বের হয়নি। দুপুরে খাবারের টেবিলে মাকে সাহায্য করতে হবে এজন্য ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও ঘর থেকে বের হলাম। আমাকে দেখা মাত্রই ইফাজ এগিয়ে আসলো। আমার হাত ধরে টেনে মামার কাছে এসে দাঁড়িয়ে আস্তে করে বলল,
– মামা এই তোমার ভাগ্নের বউ। আমার বিয়ে করা স্ত্রী। আমরা বিয়ে করেছি। ইচ্ছাকৃতভাবে না, একটা অ্যাক্সিডেন্টে। কিন্তু আমি তাঁকে মনে প্রানে ভালবাসি। তুমি মাকে আর বাবাকে বুঝাবে বলে দিলাম।
ইফাজের কথা শেষ হতেই মামাকে মুচকি হেসে সালাম দিলাম,
– আসসালামু আলাইকুম মামা, ভালো আছেন?
আমার কথা শোনার পর মামা কেমন যেন চোখে আমার দিকে তাকালেন। জিব্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে সালামের উত্তর নিলেন,
– ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছি। তুমি কেমন আছো সুইটি?
মামার মুখে সুইটি শুনে ভ্রু যুগল কুঁচকালাম। কেন যেন মামার মুখে সুইটি সম্মোধনটা আমার পছন্দ হয়নি। মনে হচ্ছে এটা কোন সম্মোধন না, অকথ্য গালি। যা আমার উপর ছুড়ে মেরেছে মামা।
আমাদের কথার মাঝেই বাবার আগমন ঘটে। বাবা আমাকে দেখা মাত্রই শক্ত কন্ঠেস্বরে বললেন,
– আহিবা মা, যাও তোমার মাকে সাহায্য করো। আমি এখানে মেহমানের সাথে কথা বলছি।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। ধান খেতের পাশে মন খারাপ করে বসে আছি। আমার মন খারাপের কারণ হলো ইফাজ। ইফাজকে নাকি আগামীকাল’ই শহরে চলে যেতে হবে। এখানে আসাতে নাকি ইফাজের গানের রেকর্ডিংয়ে অনেক সমস্যা হয়েছে। ইফাজের মামা আজ এজন্যই এসেছেন। আমাদের কলেজ থেকে অনেক কষ্টে বিদায় নিয়ে এসেছেন। আমাদের পরীক্ষা যেহেতু সামনে তাই প্রিন্সিপাল স্যার ছেড়ে দিয়েছেন।
বাড়ি থেকে বের হয়েছি অনেকক্ষণ হয়েছে। এতক্ষণে ইফাজের মামা চলে গিয়েছেন হয়তো। ইফাজের মামা আজ চলে যাবেন সিথে করে ইফাজকেও নিতে চেয়েছিলেন কিন্তু ইফাজ নানান বাহানা দিয়ে আশ্বস্ত করলেন যে আগামীকাল সকালে চলে যাবেন।
– এই হিবারানী, এখানে কি করছো? তোভার এই অধম স্বামী সেই কতক্ষণ যাবত তোমাকে খুঁজে চলছে সে খবর কি তুমি রাখো?
ইফাজের কন্ঠস্বর শুনে বসা থেকে উঠে দৌঁড়ে ইফাজকে জড়িয়ে ধরলাম।
– আপনি চলে যাবেন না ইফু! আভি আর আপনার অপেক্ষার প্রহর গুনতে চাই না। অপেক্ষা যে মৃত্যুর চেয়ে কষ্টকর সেটা আপনি জানেন? আমি একেবারে গ্রামে থেকে যান না! শহরে যাবেন না। সেখানে গেলে আপনাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যাবে সবাই।
আমার কথা শেষ হতেই ইফাজ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
– এই প্রিয়লতা, তোমাকে ছাড়া এই ইফাজকে কাবু করতে কেউ সক্ষম হবে না। তুমি চিন্তা করিও না। খুব শীঘ্রই ঢাক-ঢোল বাজিয়ে তোমাকে বউ করে নিয়ে যাবো।
ইফাজের কথায় কিছু বললাম না। চুপটি করে ইফাজের সাথে মিশে রইলাম।
সন্ধ্যা হতেই বাসায় ফিরে আসি আমি আর ইফাজ। চেয়ারে ইফাছেথ মামাকে বসে থাকতে দেখে অবাক হই।
– মামা, তুমি না চলে গিয়েছিলে? আবার আসলে যে?
ইফাজ মামাকে দেখা মাত্রই প্রশ্ন করেন। ইফাজের কথার প্রত্যুওরে মামা ভয়ার্ত কন্ঠস্বরে বলেন,
– ইফাজ, মামা আমার! তোভার বাবার অবস্থা ভালো না রি! বাজারের কাছে যেতেই তোর মা ফোন করে যে , তোর বাবার সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গে গিয়েছে। এখন হাসপাতালে ভর্তি। খবরটা শোনার পর দৌঁড়ে তোর কাছে ছুটে এলাম। এখন তুই কি করবি বল?
মামার কথা শুনতেই ইফাজ হন্তদন্ত হয়ে দো’তলায় চলে গেলেন। মিনিট পাঁচেক পর আবারো ফিরে এসে বললেন যে,
– চলো মামা, দেরী করা যাবে না। বাবার কিছু হলে আমি মরেই যাবো।
ইফাজের তাড়াহুড়ো দেখে বাবা মা ও চলে আসেন। বাবা ইফাছেয উদ্দেশ্যে বললেন,
– কি হয়েছে বাবা, এভাবে কোথায় যাচ্ছো?
– বাবা এখন কিছু বলার সময় নেই। শুধু বলতে পারি, আপনার বন্ধু খুব অসুস্থ। দেখতে যাবেন অবশ্যই। আমার বউ আর শাশুড়ি মায়ের খেয়াল রাখবেন।
আসি বউ!
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
ইফাজ চলে যেতেই বাবা মায়ের দিকে তাকালাম। ইফাজ যে ওদের মা বাবা ডাকলো, কেন? তারমানে কি?
– ঠিক ধরেছিস। আমরা সব জানি। আমরা রাজি। আর কিছু জিজ্ঞেস করবি না।
এখন বাবা মায়ের সাথে ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে না। বাবা মাকে কিছু না বলে ঘরে চলে আসলাম। রাতেও মা বাবার ডাকে ঘর থেকে বের হইনি।
মাঝ রাতে কিছুর শব্দ শুনে জানালা খুলি। অদূরে কারোর ছায়াদেখতে পেয়ে ভাবলাম যে হয়তো ইফাজ চলে এসেছে। ইফাজের ভাবনা মাথায় আসতেই সদর দরজা খুলে বাহিরে বের হলাম। এদিক সেদিক চারদিকেও ইফাজের কোন চিন্হ না পেয়ে হতাশ হলাম। বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই কেউ একজন আমার হাতে টেনে ধরলো। হাত ধরা ব্যাক্তিটি নিচু আওয়াজে বলল,
– সুইটি! অনেকদিন পর কোন রমণীকে দেখে আমার পুরুষত্ব জেগে উঠলো। আজ তোমাকে ভোগ করে তৃষ্ণা মিটাবো। তোমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল হয়েছে আমার সামনে আসা। আজ তোমাকে কে বাঁচাবে সুইটি?
চলবে…..
[