বাবুইপাখির অনুভূতি পর্ব -২১+২২

#বাবুইপাখির_অনুভূতি🕊️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম🕊️
— পর্বঃ২১
_________________

পা টিপে টিপে এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে এগোচ্ছে আহি। কাল হসপিটালে তার প্রথমদিন থাকায় ভার্সিটি আসতে পারে নি সে। কিন্তু এরপর আর প্রবলেম হবে না ভার্সিটি শেষে হসপিটাল যাবে আহি। এই জবটা পাওয়ার একমাত্র কারন হলো রিনি, তাঁর পরিচিত একজন কলিগের সাহায্যে এই জব পাইয়ে দিয়েছে আহিকে। এসব ভাবতে ভাবতেই এগোচ্ছিল আহি। এমন সময় তার দিকে এগিয়ে আসছিল রিনি আর অথৈ। তাঁরা আহির কাছে এগিয়ে এসে বললো,

‘ কি রে কেমন আছিস কাল থেকে তো, তোর কোনো খোঁজই নেই।’

ওদের কথা আহি একটু হেঁসে বললো,

‘ ওই একটু।’

‘ তা কালকের জবের ফাস্ট ডে কেমন কাটলো তোর?’ (রিনি)

‘ হুম খুব ভালো তোরা তো জানিসই বাচ্চাদের আমার কতো ভালো লাগে সেই হিসেবে জবটা পেয়ে আমি খুব খুশি।’

‘ হুম তা তো তোর চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি (অথৈ)

উওরে দাঁত কেলানি হাসি দিয়ে বললো আহি,

‘ ওই আর কি চল ক্লাসে যাওয়ার যাক।’

‘ হুম।’

বলেই তিনজন একসাথে চললো কিছুদূর যেতেই আহি রিনি একদিকে আর অথৈ একা অন্যদিকে চলে গেল।’

অতঃপর আজকের মতো ভার্সিটি শেষ করে যে যার বাড়ি যাবে এখন। অথৈ বাস ধরার জন্য চলে গেল, আর রিনি গাড়ি করে চলে গেল। আর আহি আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছে। এখান থেকে সে সোজা হসপিটাল যাবে তারপর ওখান থেকে সোজা বাড়ি। আজ একবারও নীরবের সাথে দেখা হয় নি আহির এর জন্য মনটা হাল্কা খারাপ তাঁর। আনমনেই নানা কিছু ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলতে লাগলো আহি। এমন সময় হুট করেই তাঁর সামনে একটা ইয়া বড় কালো গাড়ি এসে থামলো। হুট করে এমন ভাবে গাড়িটা সামনে চলে আসাতে পুরোই চমকে উঠলো আহি। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে গাড়িটার দিকে তাকালো সে। এরই মধ্যে গাড়ি ভিতর থেকে কালো কোট পরিধিত দুটো লোক বেরিয়ে এসে বলে উঠল আহিকে,

‘ ম্যাম আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে?’

হুট করে অচেনা দুটো লোকের মুখে এমন কথা শুনে আহি আশেপাশে তাকালো আসলে সে বুঝে উঠতে পারলো না কথাটা আসলে কাকে বললো লোকগুলো। আহিকে এদিক সেদিক তাকাতে দেখে আবারো বলে উঠল লোকগুলো,

‘ আমরা আপনাকেই বলছি ম্যাম?’

এবার যেন সত্যি সত্যি আহির চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। আহি নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো,

‘ আপনারা আমায় ম্যাম বলছেন কেন, আমার মনে হয় আপনাদের কোথায়ও একটা ভুল হচ্ছে, আমি আপনাদের ম্যাম নই।’

আহির কথা শুনে লোকদুটো আবারো একসাথে বলে উঠল,

‘ আমাদের কোনো ভুল হচ্ছে না ম্যাম এই দেখুন আপনার ছবি।’

বলেই আহির সোজাসুজি থাকা লোকটি তার মোবাইলটা দেখালো আহিকে। সত্যি সত্যি এদের হাতে নিজের ছবি দেখে পুরোই চমকে উঠলো আহি। চোখ বড় বড় করে বললো সে,

‘ এটা তো আমারই ছবি।’

‘ জ্বী ম্যাম আপনারি ছবি আপনাকে আমাদের বস আমাদের সাথে যেতে বলেছে।’

লোকটির কথা শুনে ভ্রু-কুচকে বললো আহি,

‘ যেতে বলেছে মানে এইভাবে হুট করে যেতে বলতেই আমি যাবো না কেন আর আপনাদের বস কে?’

‘ দেখুন ম্যানন নাম বলা যাবে না আপনাকে যেতে বলেছে আর আপনাকেই যেতে হবে।’

‘ আমি যাবো না আপনারা আপনাদের বসকে গিয়ে বলুন আমি যাবো না বলা নেই কওয়া নেই হুট করে যেতে বললেই যাবো নাকি আমি।’

বলেই চলে যেতে নিলো আহি। আহিকে যেতে দেখে লোকদুটো আহির পথ আঁটকে দাঁড়িয়ে বললো,

‘ আপনাকে তো এভাবে যেতে দেওয়া যাবে না।’

‘ দেখুন আমি আপনাদের কোনো বসকে চিনি না তাই আমায় যেতে দিন।’

‘ এটা বললে তো হবে না আমাদের বসের অর্ডার ম্যাম পালন তো করতেই হবে।’

‘ দূর এ কোন মুসিবতে পরলাম আমি।’

‘ আপনাকে যেতে হবে ম্যাম বসের অর্ডার।’

লোকগুলোর কথা শুনে বেশ খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,

‘ আপনাদের বস কে বলুন তো?’

‘ নাম বলা যাবে না ম্যাম।’

আহি কিছুক্ষন ভেবে চিন্তে বলে উঠল,

‘ আচ্ছা আপনারা আমায় ধরে নিয়ে মেরে ফেলার ফন্দি আঁটছেন না তো?’

আহির কথা শুনে লোকগুলোর চক্ষু বেরিয়ে আসার উপক্রম। কিছুটা নিরাশ হয়ে বললো তাঁরা,

‘ না ম্যাম এটা একদমই আপনার ভুল ধারণা।’

‘ তাহলে আপনারা আমায় কেন নিতে চাইছেন বলুন তো?’

এবার যেন আহির কথা শুনে বিরক্তির চরম সীমানায় পৌঁছে গেছেন তাঁরা। চরম মার্কার বিরক্ত থাকা সত্বেও ঠান্ডা গলায় আবারো বলে উঠল লোকগুলো,

‘ আপনাকে বস আমাদের সাথে যেতে বলেছে ম্যাম প্লিজ চলুন আপনি গেলেই সবটা বুঝতে পারবেন।’

‘ কিন্তু আমার যে এখন কাজ আছে?’

‘ সেটা নিয়ে ভাববেন না বস দেখে নিবেন আপনি শুধু চলুন আমাদের সাথে।’

লোকগুলোর এবারের কথা শুনে গভীর ভাবনায় মগ্ন হলো আহি। মনে মনে ভাবছে সে__

‘ এখন আমি কি করবো এদের সাথে যাবো নাকি মনে তো হয় না এঁরা আমাকে এমনি এমনি যেতে দিবে। এদের দেখেও তো মনে হচ্ছে না এঁরা খারাপ মানুষ কানে ব্লুটুথ, চোখে কালো চশমা পোশাক আসাক দেখে বোঝাই যাচ্ছে এঁরা কারো গার্ড কিন্তু এঁরা আমায় কেন নিতে আসছে আর বসটাই বা কে? আমার ছবিও বা পেলো কোথায়?

— এরকম নানা প্রশ্ন মাথা ঘুরপাক ঘুরপাক খাচ্ছে আহির। আহিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আহির ভাবনার মাঝে আবারো বলে উঠল লোকগুলো,

‘ কি হলো ম্যাম চলুন?’

লোকগুলোর কথা শুনে হাল্কা চমকে উঠলো আহি পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে শেষমেশ বাধ্য হয়ে বললো সে,

‘ ঠিক আছে চলুন গিয়ে দেখা যাক আপনাদের বসটা কে?’

আহি গাড়ি দরজা পর্যন্ত আসতেই একজন লোক গাড়ির দরজাটা খুলে দিলো। এদের কাজ কর্মে বেশ অবাক আহি তবে আপাতত সেসব কিছু না ভেবে আস্তে গিয়ে বসে পড়লো সে গাড়িতে। আহি ভিতরে বসতেই আবারো একজন গার্ড গাড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বসে পড়লো সামনের ড্রাইভিং সিটে।’

অতঃপর আহিকে নিয়ে চললো তাঁরা তাদের বসের কাছে। গাড়ি চলতেই এক অজানা ভয় এসে গ্রাস করলো তাকে সাথে কিছুটা অস্থিরতাও ফিল হচ্ছে। তারপরও যথারীতি নিজেকে স্বাভাবিক রেখে চুপচাপ বসে রইলো আহি গাড়িতে।’

_____

একটা বড় বুক শপের দোকানের ভিতর ঘুরে ঘুরে এটা ওটা দেখছে রিনি। একটা সুন্দর গল্পের বই সাথে কিছু রং তুলি আর পেন্সিল কিনবে সে। আঁকা আঁকি করতে ভিষন পছন্দ করে রিনি। ভার্সিটি শেষ করেই আজ বাড়ি না গিয়ে সোজা এখানে এসেছে সে। এমনি সময় আহিকে নিয়ে আসতো কিন্তু আজ কেন যেন একাই চলে আসলো রিনি। অনেক খুঁজে একটা সুন্দর গল্পের বই খুঁজে বের করলো সে। হঠাৎই বইটা নিয়ে ঘুরতে গিয়ে আচমকা কারো সাথে ধাক্কা খেলো সে। ঘটনাটা হুট করে হয়ে যাওয়াতে দুজনেই চমকে উঠলো বেশ সাথে দু’জনের হাতে থাকা ফোনদুটো ছিঁটকে পড়লো এদিক ওদিক। রিনির হাতে থাকা বইটাও পড়েছে নিচে। রিনি আস্তে আস্তে সামনের ব্যক্তির দিকে তাকাতেই ভার্সিটির সেই ছেলেটি মানে শুভকে দেখে আরো চমকে উঠলো। কিছুটা বিরক্ত মাখা মুখ নিয়ে বললো সে,

‘ আপনি?’

ততক্ষণে শুভও খেয়াল করলো মেয়েটা সেই ভার্সিটির আহির বন্ধু। মেয়েটিকে দেখেই দু’কদম পিছনে চলে গেল শুভ, কারনটা আর যাই হোক কোনোভাবেই আবারো এই মেয়েটার সাথে ঝগড়া করতে চায় না সে। শুভকে পিছনে যেতে দেখে রিনি অবাক হয়ে বললো,

‘ আপনি পিছিয়ে যাচ্ছেন কেন?’

সাথে সাথে দাঁড়িয়ে পড়লো শুভ। তারপর আমতা আমতা করে বললো সে,

‘ না আসলে আমি ভেবেছিলাম আপনি..

শুভর পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই রিনি চেঁচিয়ে বলে উঠল,

‘ কি ভাবছিলেন আপনি?’

রিনির কথা শুনে যেন হার্ট অ্যাটাক করবে শুভ তৎক্ষনাৎ বুকে হাত দিয়ে বললো সে,

‘ আপনি এমন কেনো বলুন তো সবসময় ঝাঁঝালো কন্ঠ নিয়ে কথা বলুন মিষ্টি করেও তো কথা বলা যায় নাকি।’

‘ দেখুন আপনার থোবড়া দেখলেই আমার মাথা গরম হয়ে যায় সরুন তো..

বলেই নিচ থেকে বই আর বাম দিকের কালো কভারের মোবাইলটা হাতে নিয়ে উঠতে নিলো সে এরই মধ্যে শুভও নিচে বসে পড়লো তাঁর মোবাইলটাও উঠাতে হবে কি না। সাথে সাথে উপর নিচ করতে গিয়ে দুজনের মাথায় বারি খেলো দুজন। রিনির তো মুখ থেকে অটোমেটিক বেরিয়ে আসলো,

‘ আউচ।’

সাথে সাথে শুভ কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বলে উঠল,

‘ সরি সরি সরি আপু…

ব্যস হয়ে গেল যাও এতক্ষণ রিনি তার রাগকে কন্ট্রোল করতে পেরেছিল সেটাও শুভর ‘আপু’ ডাক শুনে হয়ে গেল। রিনি রাগী লুক নিয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠের সাথে বলে উঠল,

‘ কি বললেন আপনি? আপনাকে তো আমি?’

সাথে সাথে শুভ তাঁর মোবাইলটা নিয়ে এক দৌড়। সে বলতে চায় নি মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল। শুভর এমন কাজ দেখে রিনির রাগ যেন সপ্তম আকাশে উঠে গেছে। নেক্সট টাইম পেলে একে যে খুন করবে এটা কর্নফাম। ভেবেই রাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ালো রিনি তাঁর সুন্দর মুড টাকে একদম নষ্ট করে দিলো__

‘ বদমাশ ছেলে কোথাকার?’

বলেই হন হন করে উল্টো দিকে হাঁটা দিলো রিনি।’

অন্যদিকে একটা বুক সেলফের পিছনে লুকিয়ে আছে শুভ। ভয়ে যেন শরীর কাঁপছে তাঁর। এই মেয়েটা আসলেই খুব ডেঞ্জারাস দুু’বার দেখা হলো আর দু’বারই তাঁর দিকে মারার জন্য তেঁড়ে আসলো।’ উফ বাবা গো বাবা মেয়ে না যেন ‘ধানি লঙ্কা’…

ভেবেই জোরে নিশ্বাস ফেললো সে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে গায়ের শার্টটা সাথে পিছনে থাকা ব্যাগটা ঠিক করে রিনির একদম উল্টো দিক দিয়ে হাঁটা শুরু করলো সে।’

____

নিজের রুমে বসে আছে আদ্রিয়ান। মাথার মধ্যে হাজারো চিন্তা ভাবনায় মগ্ন সে। এমন সময় তার রুমে ঢুকলো নিলয়। আদ্রিয়ানের সামনে গিয়ে বললো সে,

‘ তাহলে মিটিং রুমে যাওয়া যাক?’

‘ হুম।’

বলেই আদ্রিয়ান তাঁর চেয়ার থেকে উঠে চললো আদ্রিয়ান। আদ্রিয়ান যেতেই নিলয় একটা ফোন একটা ফোন করে বললো,

‘ তোমরা কোথায়?’

নিলয়ের কথা শুনে শুনে অপর পাশের লোকটাও বলে উঠল,

‘ এইতো স্যার আর আধ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছাচ্ছি।’

‘ ঠিক আছে।’

বলেই ফোনটা কেটে জোরে শ্বাস ফেলে চলে যায় সে মিটিং রুমে।’

___

বেশ কিছুক্ষন পর আহিদের গাড়ি এসে থামলো একটা বড় কোম্পানির সামনে। গাড়ি থামতেই সামনের দুজন লোক নেমে আহির সামনের দরজাটা খুলে দিয়ে বললো,

‘ আমরা এসে পড়েছি ম্যাম?’

উওরে আহিও আর বেশি কিছু না ভেবে আস্তে আস্তে বের হলো সে গাড়ি থেকে। তারপর সামনের দিকে তাকাতেই চোখ যেন তাঁর আরই চড়ুই গাছ। কারন কোম্পানিটা আর কারো নয় আদ্রিয়ানের। যেটাতে এর আগেও একবার এসেছিল আহি। সেইদিনের কথা ভাবতেই শুঁকনো ঢোক গিললো আহি তারপর আমতা আমতা করে বললো,

‘ এখানে?’

আহির কথা শুনে লোকদুটোও বলে উঠল,

‘ জ্বী ম্যাম।’

‘ এটা তো আদ্রিয়ান মাহামুদের কোম্পানি।’

‘ এই তো আপনি বুঝতে পেরেছেন তাহলে চলুন ভিতরে আপনার জন্য বস অপেক্ষা করছে।’

সাথে সাথে আহি ভয়ার্ত কন্ঠ নিয়ে বললো,

‘ মাথা খারাপ হয়েছে আপনাদের এখানে আমি যাবো, এইবার সত্যি সত্যি শিওর আপনাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে?’

বলেই উল্টোদিক ফিরে চলে যেতে নিলো আহি। আহিকে যেতে দেখে আবারো সামনের লোকটি মুখোমুখি দাঁড়ালোর আহির। তারপর বললো,

‘ আপনি এইভাবে যেতে পারবেন না ম্যাম?’

এবার বিরক্তির একদম শেষ পর্যায়ে চলে গেছে আহি। এখন তাঁর নিজের মাথার চুল নিজেরই ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে তাঁর কেন যে সে এখানে আসতে গেল। শেষমেশ আর কোনো উপায় না পেয়ে আহি ভয়ে ভয়ে এগিয়ে আদ্রিয়ানের কোম্পানির ভিতরে।’….
!
!
!#বাবুইপাখির_অনুভূতি🕊️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম🕊️
— পর্বঃ২২
_________________

ভয়ে জড়সড় হয়ে আদ্রিয়ানের রুমে বসে আছে আহি। কি হবে না হবে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। কিছুক্ষন আগেই বলা হয়েছে তাঁকে আদ্রিয়ান মিটিং রুমে আছে আর সে যেন তাঁর জন্য এখানে বসে অপেক্ষা করে। আহির মাথাতে কিছুতেই আসছে না আদ্রিয়ান তাঁকে কেন ডাকলো? তাঁর যতদূর মনে পড়ে তাদের সাথে গত কদিনে কোনো ঝগড়া হয় নি। আর কাল তো সে তাকে বাঁচিয়েছে তবে কি আদ্রিয়ান তাঁকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য ডেকেছে। কিছুই যেন মাথাতে আসছে না আহির মাথাটা তাঁর ভনভন করছে সাথে অস্থিরতাও ফিল হচ্ছে। আহি জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে বসে রইলো চেয়ারে। তাঁর সামনেই কিছু খাবার আর পানি রাখা। পানির গ্লাস টাকে হাতে নিয়ে ঢকঢক করে সব পানিটা খেয়ে নিলো আহি। তারপর অপেক্ষা করতে লাগলো সে আদ্রিয়ানের জন্য।’

____

অন্যদিকে কিছুক্ষনের মিটিং শেষ করে কিছুটা ক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে বসে আছে আদ্রিয়ান আর সামনেই নিলয় তাকে কিছু বোঁঝাচ্ছে। একটা লোকের খামখেয়ালির জন্য আজকের প্রজেক্টটা ঠিক টাইম মতো দিতে পারে নি আদ্রিয়ান। পাঁচ মিনিট লেট হয়েছে তাদের যদিও ক্লাইন্ট কিছু বলে নি আদ্রিয়ানকে তাঁরপরও আদ্রিয়ানের রাগ হচ্ছে। আর তার রাগ কমানোর জন্যই নিলয় তাকে কিছু বলছে। এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলো শুভ। মিটিং রুমের দরজার সামনে এসে বললো সে,

‘ ভাইয়া আসবো?’

হুট করেই শুভর গলা শুনে আদ্রিয়ানের রাগান্বিত মুখটা আরও রেগে গেল। অন্যদিকে শুভ দৌড়ে এসে একটা সুন্দর গিফট বক্স এগিয়ে দিয়ে বললো,

‘ হেপি বার্থডে ভাইয়া?’

মুহূর্তের মধ্যে আদ্রিয়ানের মেজাজ চরম বেগে বিগড়ে গেল। এক আদ্রিয়ান তাঁর জন্মদিন পালন তো দূরে থাক উইস করা পর্যন্ত পছন্দ করে না। কারন এই দিনেই তাঁর সঙ্গে ঘটেছিল সেই ভয়ানক ঘটনা। আদ্রিয়ান একপলক শুভর হাসিমাখা মুখ আর একবার গিফটের বক্সটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল নিলয়কে,

‘ ও আবার এখানে কেন এসেছে নিলয়?’

‘ আদ্রিয়ান আমার কথাটা একটু শোন?’

‘ তুই ওঁকে এক্ষুনি এখান থেকে চলে যেতে বল?’

‘ আদ্রিয়ান প্লিজ আজকের দিনটা অন্তত রাগারাগি করিস না।’

নিলয়ের কথা বলা শেষ হতেই শুভ বলে উঠল,

‘ প্লিজ ভাইয়া আমায় ক্ষমা করে দেও এই দেখো আমি তোমার পছন্দের সেই জিনিসটা এনেছি যেটার ভাঙার জন্য তুমি আমার সাথে কথা বলো না, অনেক খুঁজে এটাকে আমি পেয়েছি দেখো?’

এই বলে শুভ টেবিলের উপর রাখা তাঁর আনা বক্সটা খুলে দেখালো আদ্রিয়ানকে। একটা সুন্দর কাঁচের তৈরি শোপিচ, একদম হুবহু তাঁর ছোট বেলার শোপিচটার মতো কিন্তু এটা দেখে আদ্রিয়ান মোটেও খুশি হয়নি বরং আরো রেগে গেছে কারন এটার জন্য আজ তাঁর এতো সমস্যা। আদ্রিয়ান শোপিচটার দিকে তাকিয়েই উঠে দাঁড়ালো তারপর নিলয়কে উদ্দেশ্য করে বললো,

‘ ওঁকে এসব নিয়ে চলে যেতে বল নিলয়? আমার মাথা এমনিতেও গরম আছে তারপর উল্টো পাল্টা কিছু করে ফেলবো যেটা মটেও ভালো হবে না।’

বলেই চলে যেতে নিলো আদ্রিয়ান। আদ্রিয়ানকে যেতে দেখে শুভ গিয়ে হাত ধরে বসলো আদ্রিয়ানের তারপর বললো,

‘ প্লিজ ভাইয়া এইবার অন্তত আমায় মাফ করে দেও?’

শুভর স্পর্শ পেতেই যেন পুরনো অতীত তাঁকে আরো গভীরভাবে ধরতে আসলো বাবা মায়ের সেই মৃত্যু দেহ খুব গভীর ভাবে মনে পড়ছে আদ্রিয়ানের। আদ্রিয়ান রেগে গিয়ে একটা ধাক্কা মারলো শুভকে সাথে সাথে শুভ ছিঁটকে গিয়ে পড়লো টেবিলের কাছে। টেবিলের কোঁনায় কপাল লেগে হাল্কা কেটে যায় তাঁর। সাথে সাথে নিলয় দৌড়ে গিয়ে বলে উঠল,

‘ শুভ?’

নিলয়ের কথা শুনে আদ্রিয়ানও পিছন ফিরে তাকায় শুভর কপালে রক্ত দেখে ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠে তাঁর কিন্তু শুভর দিকে এগিয়ে না গিয়ে স্ট্রিট গলায় বলে সে,

‘ ওকে এখান থেকে চলে যেতে বল নিলয়?’

বলেই হন হন করে বেরিয়ে যায় সে। রাগে তাঁর মাথা ফেটে যাচ্ছে।’

আর আদ্রিয়ানের যাওয়ার পানে শুভ অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো,

‘ তুমি কি আমায় কোনোদিনও ক্ষমা করবে না ভাইয়া?’

শুভর কথা শুনে ভিষন খারাপ লাগে নিলয়ের। নিলয় শুভর দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ আয় আমি তোর কপালে মলম লাগিয়ে দেই?’

‘ তাঁর দরকার নেই ভাইয়া, আমি ঠিক আছি।’

বলেই চলে যায় শুভ। শুভর যাওয়ার পানে প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে তাকিয়ে থাকে নিলয়। তাঁরপর কিছুক্ষন টেবিলের উপর থাকা শোপিচটার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই তার মনে পড়লো ভিতরে আদ্রিয়ানের রুমে আহি আছে আর আদ্রিয়ান এখন রেগে আছে ওহ শিট ভেবেই শোপিচটা হাতে নিয়ে এক দৌড় দিল নিলয়।’

____

‘ তুমি এখানে কি করছো?’

প্রচন্ড রাগি মুড নিয়ে কথাটা বলে উঠল আদ্রিয়ান আহিকে। কিছুক্ষন আগে নিজের রুমে ঢুকে আদ্রিয়ান। আর ভিতরে ঢুকেই আহিকে দেখে রেগে গিয়ে উপরের কথাটা বলে সে। আদ্রিয়ানের ধমকের স্বরের কথা শুনে আহি ভয়ার্ত মুখটা কেঁপে উঠে। আহি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে এসে বললো,

‘ আসলে?’

‘ get out of my room?’

আদ্রিয়ানের কথা শুনে ভয়ের সাথে সাথে প্রচন্ড রাগ হয় আহির নিজেই আসতে বললো আবার নিয়েই তাড়িয়ে দিচ্ছে?’ আহিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবারো বলে উঠল আদ্রিয়ান,

‘ কথা কি কানে যাচ্ছে না তোমার বেরিয়ে যাও আমার রুম থেকে?’

আদ্রিয়ানের কথা শুনে প্রচন্ড রাগ নিয়ে আহি আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে এসে বললো,

‘ আপনার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে নিজেই আসতে বলেছেন আবার নিজেই রাগ দেখাচ্ছেন?’

আহির কথা শুনে বেশ অবাক হয়ে বললো আদ্রিয়ান,

‘ হোয়াট?’

‘ দেখুন বেশি হোয়াট হোয়াট করবেন না আপনার জন্য আমার জবের দ্বিতীয়দিনই অফ গেছে, একই তো নিজে ডেকেছেন তার ওপর আবার রাগ দেখাচ্ছেন, একটু রাগটা কমান বুঝলেন বেশি রাগ স্বাস্থ্য মন কোনোটার জন্যই ভালো নয়। আল্লাহই মালুম আপনার বাবা মা আপনার সাথে কিভাবে থাকে?’ হয়তো আপনার রাগ দেখেই তাঁরা চুপ হয়ে থাকে।’

আহির এবারের কথা শুনে আদ্রিয়ানের রাগ যেন মাথায় উঠে গেছে আদ্রিয়ান আহির দিকে তাকিয়ে ধমকের স্বরে আরো ক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে বললো,

‘ কি বললে তুমি?’

এমন সময় আদ্রিয়ানের রুমে ঢুকলো নিলয় সে এগিয়ে এসে বললো,

‘ আদ্রিয়ান ওর কোনো দোষ নেই ওকে আমি ডেকেছি?’

নিলয়ের কথা শুনে আহিকে আর কিছু না বলে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বললো সে,

‘ তুই? তুই ওঁকে কেন ডেকেছিস?’

‘ আসলে আদ্রিয়ান?’

‘ আসলে কি, তুই জানিস না এই মেয়েটাকে আমি দু চক্ষে সহ্য করতে পারি না আর আমায় জিজ্ঞেস না করে ওকে কেন ডেকেছিস?

‘ আমি চেয়েছিলাম আদ্রিয়ান?’

‘ তোকে এত চাইতে কে বলেছে তবে আমি বেশ বুঝতে পেরেছি তুই ওকে কেন ডেকেছিস কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখিস আমি সারাজীবন আমার অসুখ নিয়ে থাকবো তারপরও এই মেয়েটার হেল্প নিবো না, এখন তুই আর ওই মেয়েটা দুজনই বের হ আমার রুম থেকে?’

‘ আদ্রিয়ান আমার কথাটা তো একটু শোন?’

‘ আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না বেরিয়ে যা সাথে ওই মেয়েটাকেও নিয়ে যা?’

এই বলে আদ্রিয়ান আহির দিকে তাকিয়ে ধমকের স্বরে বললো,

‘ গেট আউট?’

আদ্রিয়ানের ধমক শুনে কেঁপে উঠলো আহি তক্ষৎনাত সে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কি ঘটলো তাঁর সাথে এতক্ষণ সব যেন তাঁর মাথার উপর দিয়ে গেল। আহি যেতেই আদ্রিয়ান গিয়ে বসে পড়ে চেয়ারে প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তাঁর। কতকিছু শোনালো মেয়েটি তাঁকে। এদিকে নিলয় কিছুক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসলো আদ্রিয়ানের দিকে তারপর শুভর আনা শোপিচটা আদ্রিয়ানের সামনে টেবিলের উপর রেখে বললো সে,

‘ আমি জানি আদ্রিয়ান তুই এখন প্রচন্ড রেগে আছিস? একটা কথা কি জানিস তোর সব ঠিক আছে কিন্তু শুভর সাথে তোর কাজগুলো ঠিক নেই। আমি মানছি আদ্রিয়ান আজ আঙ্কেল আন্টি না থাকার কারনেই তোর এত রাগ শুভর উপর কিন্তু একটা কথা মাথা রাখিস দোষটা শুভর চেয়ে তোর বেশি তুই যদি সেদিন রাগ করে বাড়ি থেকে না বের হতিস তাহলে এইসব কিছুই হতো না৷ না তোর দুঃস্বপ্ন তোকে তাড়া করে বেড়াতো আর নাই আজ তোর সাথে শুভর এই দ্বন্দ থাকতো, দেখ আদ্রিয়ান শুভ সেইসময় অনেকেই ছোট ছিল। ছোট থাকা সত্বেও ও বার বার তোর কাছে আসে ও তো এটাও জানে না ওর ভুলটা আসলে কোথায় ছিল? মানুষ মাত্রই তো ভুল হয় ও ভুল করে ফেলেছে আদ্রিয়ান আইথিংক তোর বড় ভাই হিসেবে ওকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত ছিল। অনেক দিন আগে থেকেই এই কথাগুলো তোকে বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু বলতে পারি নি আজ বলে দিলাম পারলে একটু ভেবে দেখিস একটা কথা মাথায় রাখিস শুভর কিন্তু আপন বলতে তুই ছাড়া আর কেউ নেই আর তোরও শুভ ছাড়া পরম আপন কেউ নেই আর রইলো আহির কথা ওকে আমি ডেকেছিলাম যাতে তোর প্রবলেমের সমাধান হয় তুই রাতে আরামে ঘুমাতে পারিস কিন্তু তুই যখন না করেছিস আর ডাকবো না আর একটা কথা আহির সাথে অকারণেই রাগারাগি করলি তুই আজকে ওর কোনো দোষ ছিল না। আমিই ওকে তোর নাম করে এখানে এনেছিলাম আই এম সরি। আজ আর অফিসে আসবো না হাফটাইম ছুটি নিলাম..

বলেই রুম থেকে বেরিয়ে যায় নিলয়। আর আদ্রিয়ান চুপচাপ তাকিয়ে রইলো নিলয়ের যাওয়ার পানে। চাইলে অনেককিছুই বলতে পারতো কিন্তু কিছু বললো না আদ্রিয়ান। চুপচাপ তাকিয়ে রইলো সে তার সামনে থাকা শোপিচটার দিকে। চারদিক ঘুরিয়ে গোল কাঁচের বন্দী করা একটা শোপিচ ভিতরে রয়েছে একটা সুন্দর সবুজে ঘেরা গাছ আর গাছের নিচে বসে থাকা বই হাতে একটা ছোট্ট ছেলে পুতুল। এই শোপিচটার বিষেসত্ব হলো এটা লাল নীল লাইট জ্বলে যেটা অন্ধকার রুমে আরো বেশি সৌন্দর্যকর। আদ্রিয়ান আনমনেই শোপিচটা হাতে নিলো। শোপিচটার নিচে থাকা ছোট্ট সুইচটা টিপ দিতেই লাল নীল লাইট জ্বলে উঠলো সাথে ঘুরতে লাগলো চারদিকে। সাথে ছোট্ট সাদা গোল গোল ফোমগুলো বৃষ্টির মতো জড়ছে গাছটার চারপাশ দিয়ে এক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আদ্রিয়ান শোপিচটার দিকে। হঠাৎই মনে পড়লো তার সেই ছোট বেলার কথা।’

এইরকমেরই একটা শোপিচ গিফট করে ছিল আদ্রিয়ানের আম্মু আদ্রিয়ানকে। খুব শখের ছিল আদ্রিয়ানের এটা। রোজ রাতে এর আলোকিত লাল নীল আলো দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পড়তো আদ্রিয়ান। এভাবে চলছিল দিন তারপর হুট করে ঘটে গেল সেই ঘটনা সেদিন যখন আদ্রিয়ানের জ্ঞান ফিরে নিজের রুম থেকে বের হয়। তখনই পুরো বাড়ি জুড়ে কান্নার রোল পড়েছিল আদ্রিয়ানের বাবার কলিগরা সাথে টুকিটাকি আত্মীয়স্বজনের। আদ্রিয়ান বেশ অবাক হয়েই আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। রুম থেকে বের হতেই পাশাপাশি নিচে বাবা মাকে শুয়ে থাকতে দেখে শরীরটা যেন আরো আঁতকে উঠলো আদ্রিয়ানের। মুক্তি পণের টাকা নিয়ে গাড়ি করে যখন যাচ্ছিল আদ্রিয়ানের বাবা মা তখন আদ্রিয়ানের দুঃশ্চিন্তায় খুব স্পিডেই গাড়ি চালাচ্ছিল আদ্রিয়ানের বাবা আর তখনই একটা মোড়ের মাথায় যেতেই বাম দিক দিয়ে একটা ট্রাক এসে মেরে দিয়ে চলে গেল ওনাদের সাথে সাথে দুজন গাড়ি উল্টে ছিঁটকে পড়লো এদিক সেদিক। সেদিন এত কষ্ট হচ্ছিল আদ্রিয়ানের যা বলার একদমই বাহিরে সেই কষ্ট এখনো হয় আর সবচেয়ে বাজে যেটা ছিল সেটা হলো সেদিন তার জন্ম দিন ছিল। আর আজও তাঁর জন্ম দিন।’

কথাগুলো ভাবতেই চোখে আপনাআপনি পানি চলে আসে আদ্রিয়ানের। কষ্টে যেন বুক ফেটে যাচ্ছে তার। শুভর দোষ এতটুকুই ছিল তার জিনিসটা ভাঙা আর আদ্রিয়ানের দোষ হলো রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া। এমনটা নয় আদ্রিয়ান ভালোবাসে না শুভকে বা শুভর উপর তাঁর ভিষণ রাগ আছে। না শুভর ওপর তার কোনো রাগ নেই রাগ হলো নিজের ওপর। শুভকে দেখলেই নিজেকে কেমন অপরাধী মনে আদ্রিয়ানের তাঁর জন্যই অল্প বয়সে বাবা-মার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে শুভ। নানা কিছু ভেবে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো আদ্রিয়ান। ভিতরে ভিতরে খুবই গিলটি ফিল হচ্ছে তার।’

____

মাঝখানে কাটলো দু’দিন।’

এই দু’দিনে আহির সাথে আর দেখা হয়নি আদ্রিয়ানের।’

আজ দু’দিন পর আবার হসপিটালে এসেছে আদ্রিয়ান তবে এবার আর কোনো সমস্যার জন্য আসে নি। তাঁর সমস্যার সমাধান তো পেয়েই গেছে শুধু কারনটা অজানা। এইবার আদ্রিয়ান এসেছে একটা বিশেষ কারনে সেটা হলো আহিকে সরি বলা। কারন সেদিন সত্যি আহির কোনো দোষ ছিল না। আদ্রিয়ান আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় সেই ওয়ার্ডটার দিকে যেখানে আহিকে সে দেখেছিল। আদ্রিয়ান চুপচাপ ভিতরে ঢুকে আশেপাশে তাকালো বাচ্চারা চুপচাপ বসে আছে কিন্তু আহিকে না দেখে বেশ খানিকটা হতাশ হয়ে এগিয়ে গেল সে বাচ্চাগুলোর দিকে। তারপর ওদের সামনে বসে বলে উঠল,

‘ হ্যালো তোমাদের এখানে যে একটা মেয়ে আসতো সে আসে নি এখনও?’

আদ্রিয়ানের কথা শুনে একটা ছেলে বলে উঠল,

‘ না তুমি কে?’

‘ আমি আদ্রিয়ান আর তুমি?’

‘ আমি হাসান।’

এরপর একে একে সবার সাথে পরিচিত হয় সে। কিছুক্ষনের মধ্যে আদ্রিয়ান এদের সবার বন্ধু হয়ে যায়। এমন সময় একটা ছোট্ট ছেলে এসে আদ্রিয়ানের হাতে একটা আরমোনিকা দিয়ে বললো,

‘ এটা তুমি বাজাতে পারবে জানো এটা আমার আম্মু আমায় কিনে দিয়েছে?’

ছেলেটির কথা শুনে আদ্রিয়ান ছেলেটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো,

‘ খুব সুন্দর।’

‘ হুম। তুমি বাজাতে পারবে নেও বাজাও জানো তো ওই আহি আপুকে বলেছিলাম বাজাতে কিন্তু আপু পারে নি তুমি পারবে।’

ছেলেটির কথা শুনে আদ্রিয়ান ছেলেটির হাত থেকে আরমোনিকাটা নিয়ে বললো,

‘ দেখি চেষ্টা করে..

এরপর আদ্রিয়ান তাঁর মুখের সামনে আরমোনিকাটা নিয়ে বাজাতে শুরু করলো। আর বাচ্চাগুলো হা হয়ে তাকিয়ে রইলো আদ্রিয়ানের মুখের দিকে।’

এরই মধ্যে এক প্রকার দৌড়ে রুমে ঢুকে উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল আহি,

‘ সরি সরি বাচ্চারা আজ আমার একটু লেট হয়ে…

আর কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় আহি সামনেই আদ্রিয়ানকে দেখে চরম প্রকার অবাক হয় সে। অন্যদিকে আহিকে দেখেই আদ্রিয়ান তাঁর আরমোনিকা বাজানো থামিয়ে দিলো। আদ্রিয়ান বাজানো থামাতেই বাচ্চাগুলো বলে উঠল,

‘ তুমি থেমে গেলে কেন?’

উওরে আদ্রিয়ান আর কিছু না বলে আবারো বাজাতে শুরু করলো। আর সবাই চুপচাপ বসে দেখতে লাগলো আদ্রিয়ানকে আর শুনতে লাগলো আদ্রিয়ানের বাজানো আরমোনিকা। আহিও বেশ মুগ্ধ আদ্রিয়ানের আরমোনিকা বাজানো শুনে।’

কিছুক্ষন পর…

পাশাপাশি বসে আছে আদ্রিয়ান আর আহি। সামনেই বাচ্চাগুলো খেলছে। হঠাৎই আহি বলে উঠল,

‘ আপনি এখানে কেন? আবারো কি কোনো কারনে রাগ দেখাতে এসেছেন?’

আহির কথা শুনে আদ্রিয়ান আহির দিকে তাকিয়ে ছোট্ট দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে উঠল,

‘ আই এম সরি।’

আদ্রিয়ানের কথা শুনে আহি যেন অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছে তাঁর যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না আদ্রিয়ান তাঁকে সরি বললো। আহি অবাক চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ কি?’

‘ আসলে সেদিন আমি ভিষণই রেগে ছিলাম তারপর হুট করেই তোমায় সামনে দেখে আই এম সরি সেদিন তোমার কোনো দোষ ছিল না আসলে নিলয় আমায় কিছু বলে নি সেদিন তোমার ব্যাপারে।’

আদ্রিয়ানের কথা শুনে মুচকি হেঁসে বললো আহি,

‘ ইট’স ওকে আর আমিও সেদিনের জন্য সরি।’

আহির কথা শুনে বেশ খানিকটা অবাক হয়ে বললো আদ্রিয়ান,

‘ কেন?’

‘ আসলে আমিও সেদিন রেগে গিয়ে আপনার বাবা মা নিয়ে কথা বলেছিলাম সত্যি আমি জানতাম না আপনার বাবা মা আর বললো না আহি।’

কারন এসব কথা সেদিন নিলয় তাঁকে বলেছিল। সেদিন যখন আহি অফিস থেকে বেরিয়ে যায় তখন নিলয়ও দৌড়ে যায় আহির কাছে তারপর ওর কাছে সরি বলে। আর তখনই কথার তালে তালে জানতে পারে আহি যে আদ্রিয়ানের বাবা মা নেই। ভিতর থেকে ভিষণই খারাপ লাগে আহির সে চেয়েছিল আদ্রিয়ানকে একবার সরি বলতে কিন্তু সাহস হয়ে উঠে নি তাঁর।’

আদ্রিয়ান আহির কথা শুনে হাল্কা হেঁসে বললো,

‘ ইট’স ওকে।’

উওরে আহিও মুচকি হাঁসলো এমন সময় তাদের সামনে দুটো ছেলে মেয়ে আসলো। একজন আদ্রিয়ানের হাত আর অন্যজন আহির হাত ধরে বললো,

‘ চলো না কিছু খেলি।’

ওদের কথা শুনে আদ্রিয়ান আহি দু’জনই একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে এগিয়ে গেল ওদের সাথে। তারপর পুরো রুম জুড়ে বাচ্চাদের সাথে হুড়োহুড়ি আর হাসাহাসি করতে লাগলো আহি আর আদ্রিয়ান। যেন তাঁরাও বাচ্চা হয়ে গেছে।’

হঠাৎই ছোটাছুটি করতে গিয়ে আহি আদ্রিয়ান মুখোমুখি হয়ে গেল। দু’মিনিটের জন্য হলেও একে অপরের দিকে তাকিয়ে রয় দুজন। এরই মধ্যে আচমকা আদ্রিয়ানের ফোনটা বেজে উঠল। আদ্রিয়ানও বেশি কিছু না ভেবে ফোনটা তুলে বললো,

‘ হ্যালো।’

আদ্রিয়ানের ‘হ্যালো’ শুনে অপর পাশে একটা লোক চিন্তিত কন্ঠ নিয়ে বলে উঠল,

‘ স্যার লাস্ট দু’দিন যাবৎ শুভ স্যার বাসা থেকে একদমই বের হচ্ছেন না। হসপিটালেও ফোন করে ছিলাম যে উনি কোনো ছুটি নিয়েছেন কি না কিন্তু ওনারা বললেন এমন কোনো বিষয় নিয়ে শুভ স্যারের সাথে কথা হয় নি ওনারাই উল্টো জিজ্ঞেস করলেন শুভ স্যার হসপিটালে কেন আসছেন না। ফোনও নাকি করেছিলেন কিন্তু শুভ স্যার ধরেন নি?

লোকটির কথা শুনে আদ্রিয়ান বিস্ময় ভরা কন্ঠ নিয়ে বললো,

‘ হোয়াট?’
!
!
!
!
!
♥️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here