#পরিণীতা
#পর্ব_১২(অন্তিম পর্ব)
#লেখনীতে_সাবরিনা_সিদ্দিকা_তাবাচ্ছুম
আজ বিহি বাড়ি ফিরবে। আদিব ওকে এখানে রেখে যেতে রাজি না। এতো মাস পর ফিরে পেয়েছে ও সামনে রেখে ওকে যত্ন করে সুস্থ করে তুলবে। সাথে যাচ্ছে বুশরাও! কারণ বিহি চেয়েছে বুশরা যাতে শহরে চাকরি করে। আদিবকে বলে তার অফিসে চাকরি দিবে কিন্তু আদিব তার অতীত সম্পর্কে কিছু শঙ্কায় ছিল। তাই সে আগে তা ক্লিয়ার করতে চাইছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে সে চাইনি এসব মাথায় আনতে। এতো মাস পর যে বিহিকে পেয়েছে এটাই তো অনেক। তিনটা মাস সে তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলেছে। আজ তো তার কাছে ফিরে এসেছে।
বাড়ি ফেরার আগে ডাক্তারের সকল চেক আপ করানোর জন্য গাড়ি মাঝপথে থামিয়েছে। পাহাড়ে তেমন একটা ডাক্তার পাওয়া সম্ভব না। বুশরা দূর থেকে ডাক্তারের চিকিৎসা করাতো। খুব বেশি সিরিয়াস হলে ডাক্তার বাড়িতে আনতো।
————————
বাড়ির সবাই আনন্দ মেতেছে কারণ ঘরের মেয়ে যে ঘরে ফিরেছে। বিহির মা তো মেয়েকে দেখে কান্না শুরু করে দিয়েছে অবশ্য এটা খুশির কান্না। সবাই বিহিকে নিয়ে মেতে আছে। মেয়েটার অসুস্থতা নিয়ে চিন্তিত আদিব। কারণ তার মতে এতোদিন তো সুস্থ হয়ে যাওয়ার কথা। কেন এমন হচ্ছে!
“মা তোমরা কেমন আছো?”
“তোকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না কী করে খুশি থাকি বল তো?”
“নিজের এই অবস্থা করেছো এই জন্য? আদিবকেও দেখি একই অবস্থা! এই দেখো আমি একদম ফিট!”
বলে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিল। আদিব এসে ধরলো।
“বেশি বুঝো?”
বিহি চুপ করে বসে রইলো। সে জানে আদিব তার কত কেয়ার করে। এখন কিছু হলেই প্রচুর বকে! হাঁটাচলা সম্পূর্ণ বন্ধ। সবই আদিব করে দিচ্ছে। এই সব কেয়ার দেখে বুশরা একপাশে গিয়ে বলে,
“আমার জীবনটা ও এমন হতে পারতো! কিন্তু আমাকে ঠকিয়ে মা-বাবাকেও মে!রে চলে গেলো! ভাইজান কী সুন্দর বিহির কেয়ার করে। আমার জীবনে কেন এমন হলো! আমি তো রাহাতকে(বুশরার হাসবেন্ড) আমার সাথে অনেক রাখার চেষ্টা করেছি। আদিব ভাইয়ার বিহির প্রতি ভালোবাসা গুলো দেখলে মনে হয় যেন চেয়ে থাকি।”
—————————
দুইমাস পর,
বিহি এখন অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছে।হাঁটাচলা করতে তেমন একটা কষ্ট হয়না তার। এটার পেছনে অবশ্য আদিবের অবদান অনেক বেশি। সে এতো মাস পর বিহিকে কাছে পেয়ে সবরকম যত্ন করেছে। সে যে পাগলের মতো খুঁজেছিল বিহিকে। আজ যখন ফিরে এসেছে আর হারাতে দেয় কী করে!
এই দুইমাস অফিসের সব কাজ বাড়িতে নিয়ে এসেছিল আদিব। কারণটা হলো বিহির দেখা শোনা করা।আদিবের কড়া নির্দেশ মানতে বাধ্য বিহি। কোনোরকম ত্রুটি রাখেনি বিহির যত্নে! হয়তো ভালোবাসা এমন। হারিয়ে গেলে তারপর বোঝা যায়।
বুশরা এখন আদিবের অফিসে কাজ করে। সে আদিব এবং বিহিকে তার অতীত সম্পর্কে সবকিছু জানিয়েছিল। সে ছিল সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান কিন্তু সম্পত্তির লোভে রাহাত বুশরাকে বিয়ে করে এবং সুযোগ বুঝে তার মা বাবাকে মে”রে পালিয়ে যায়।
বুশরা এখন স্বাবলম্বী নারী!
সাদাফ এখন বিহির সামনে আসে না। বিহিও তেমন একটা কথা বলে না। সাদাফকে দেখে মনে হয় সে অনুতপ্ত! এখন সে একাই থাকে। বড় আম্মু বিয়ের কথা বললে এড়িয়ে যায়। বিদেশ ফিরে যাওয়ার প্ল্যান চলছে। হয়তো খুব শীঘ্রই তা হয়েও যাবে।
“বিহি”
“আদিব এসেছো তুমি?”
“হুম”
“এতো দেরি হলো কেন?”
“কিছু কাজ ছিল। তোমাকে বলেছি না দেরি হবে আমার”
“বুঝতে পেরেছি”
“আচ্ছা আমি খাবার দিচ্ছি ফ্রেশ হয়ে এসো”
বিহি যেতে নিলে আদিব হাত ধরে বলল,
“তুমি খেয়েছো? ওষুধ আছে কিন্তু মনে রেখো”
“উমম..
বিহি আমতা আমতা করে বলল,
“না আসলে,,”
“বুঝেছি খাও নি। তুমি কথা শুনতে চাও না কেন বলো তো! তুমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ নও। আমি চাই না তোমার আবার কিছু হোক। তোমাকে হারিয়ে আমার পাগল পাগল অবস্থা হয়েছিল সেটা কী জানো তুমি??”
“হয়েছে হয়েছে! আমি তোমার সাথেই খাবো তো। একা খেতে কার ভালো লাগে? আম্মু ও মামার বাসায় গিয়েছে। তাই তোমার জন্য বসে আছি”
“আমার তো দেরি হবে বলেছিলাম।”
“আমার ও ক্ষিদে ছিল না”
আদিব বুঝলো বিহি ওকে কথার ফাঁ-দে ফেলেছে। সে পারবে না। তাই সে বলল,
“আচ্ছা যাও”
বিহি হেসে দিলো। আদিব বিহির হাসি দেখে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেল। আদিব নিচে আসতেই দেখলো বিহি একটা প্লেট নিয়ে বসে আছে।
“একটা প্লেট কেন? তোমার খাবার কই?”
“এই যে!”
আদিব কিছু বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বিহি হেসে বলল,
“আমরা দুজন এক প্লেট থেকে খাবো।”
আদিব চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
“ওহ তাই বলো!”
“হুম এতে তো অনেক সওয়াব! স্বামী স্ত্রী এক প্লেটে খাবার খাওয়া সুন্দর।”
“হুম হা করো”
আদিব বিহিকে খাইয়ে দিলো। দুজনে একসাথে খাওয়া শেষ করে চলে এলো।
ব্যালকনিতে বসে আছে দুজনে। আজকে এই চাঁদটা ঝলমল করছে।
“বিহি তোমার সাথে এমন একটা রাত কাটানোর কত ইচ্ছে ছিল! তুমি হারিয়ে যাওয়ার পর যখন আমি একটা হয়ে গিয়েছিলাম তখনো চাঁদ এভাবেই ঝলমল করতো। শুধু পাশে তুমি থাকতে না। তোমার অভাব আমাকে তিনটা মাস তাড়িয়ে বেড়িয়েছে! আমি ঘুমাতে পারতাম না রাতে। সবাই বলতো তুমি বেঁচে নেই। আমি জানতাম তুমি বেঁচে আছো।”
আদিবের চোখের কোণে পানি জমেছে।
বিহি একনজরে চেয়ে আছে। আদিব ওকে এতোটা ভালোবাসে। সে আসলেই ভাগ্যবতী!
আদিবের চোখের কোণে পানি মুছে দিয়ে বলল,
“এই যে আমি ফেরত এসেছি। এখন এসব ভুলে যাও। আমি তো এসে গিয়েছি। শুনেছি তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছিলে?”(মজা করে)
আদিব থতমত খেয়ে বলল,
“তোমাকে কে বলল? আর আমি বিয়ে করতে যাচ্ছিলাম না। সবাই চাইছিল! আমি ইগনোর করার চেষ্টা করতাম। কারণ বিহির জায়গা কী কেউ নিতে পারবে?”
“সেটাও ঠিক! নিলে মে*রে ঠ্যাং ভে^ঙে দিবো”
দুজনেই হেসে উঠলো। এমন মুহূর্ত যে আবার আসবে আদিব ভাবতে পারেনি। কারণ বিহিকে তন্ন তন্ন করে খোঁজার পরও সে পাইনি। তবে সে আশা রেখেছিল। প্রতিটি মোনাজাতে চোখের পানি ফেলে শুধু বিহিকেই চেয়ে গিয়েছে। আজ সেই বিহি তার কাছে চলে এসেছে। আসলেই! আল্লাহ্ তায়ালা কাউকে নিরাশ করেন না। আদিব হয়তো হারাম কিছু চাইনি বলেই ফিরে পেয়েছে। হারাল সবসময়ই সুন্দর! দিন শেষে এখানেই শান্তি!
বিহি ভাবছে আদিব বিহিকে ফিরে পাওয়ার পর কত খুশিই না হয়েছিল।বিহি তার ব্যবহারে বিস্মিত হয়েছিল। আদিব খুব শান্ত প্রকৃতির মানুষ। সে আমাকে দেখার পরেই এসে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করেছে আমার কী হয়েছে? পায়ে ব্যা”ন্ডেজ কেন? সে এসেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেনি আমি কোথায় ছিলাম কেন আসিনি। সে প্রথমেই আমাকে চাপ দেয়নি সব কথা শোনার। তিনমাস পর সে চাইলেই আমাকে অবিশ্বাস করতে পারতো কিন্তু সে তা করেনি। আদিব আমাকে যত্ন করতে করতে আস্তে আস্তে পুরো ঘটনা সম্পর্কে অবগত হয়েছে। এখন সে ভ*য়*ঙ্ক*র অতীত ভুলতে চাই!
বিহি আকাশের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছিল। আদিবের দিকে তাকাতে দেখলো আদিব বিহির দিকে তাকিয়ে আছে।
“কী হলো আদিব? কী দেখছো?”
“তোমাকে!”
“হিহি”
“হাসতে হবে না চলো।”
“হুম আমি লাইট অফ করে সব গুছিয়ে আসছি”
“আমি হেল্প করছি”
বিহি হেসে গোছাতে লাগলো।
তারপর ওরা দুজন ঘুমাতে চলে গেলো।
সকালে বিহি ঘুম থেকে উঠে দেখলো ফজরের আযান দিচ্ছে। পাশে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আদিব। বিহি একটু তাকিয়ে মুচকি হাসলো। ঘুমালে আদিবকে ছোটো বাচ্চার মতো লাগে।
বিহি উঠে ওর করে এলো। তারপর আদিবকে ডেকে তুলল। আদিব মসজিদে চলে গেলো এবং বিহি বাসায় নামাজ পড়ে নিলো।
নামাজ শেষ করে আদিব ফিরলে কফি হাতে বিহি আর আদিব ব্যালকনিতে বসলো। দুজনের কিছু সুন্দর মুহূর্ত! দুজনে আপনাদের সহিত ভোর হওয়া দেখছে। হাসিখুশি দিয়ে শুরু হচ্ছে আরেকটি সকাল।
সারাজীবন যেন এভাবেই কাটাতে পারে। নতুন আশায় নতুন ভাবে শুরু হবে আরেকটা সকাল ইনশাআল্লাহ।
বিহিই তাহলে আদিবের #পরিণীতা!
~সমাপ্ত….।
(1089 শব্দের)
[প্রথমেই দুঃখিত দেরি করার জন্য। এই কয়েকদিন আমি একদমই লিখতে পারিনি তবুও যেটার শুরু আছে সেটা তো ইতি টানতেই হবে! ভালো খারাপ সব মিলিয়ে শেষ হলো আমার আরেকটি গল্প #পরিণীতা। শুরু করার সময় ভাবিনি এতো ভালোবাসা পাবো এই গল্পে। আলহামদুলিল্লাহ যা ভেবেছি তার থেকেও অনেক বেশি পেয়েছি। গতপর্বটা একটু অগোছালো হওয়ার জন্য দুঃখিত; এই কয়দিন লেখার মতো অবস্থা ছিল না। শেষ হিসেবে সবার থেকে একটা সন্তুষ্টিমূলক মন্তব্য আশা রাখছি। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব মিলিয়ে কেমন লেগেছে জানাবেন।
সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন!]