অসময়ের বৃষ্টি পর্ব-০৩

#অসময়ের_বৃষ্টি
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৩

৩.
অংক এবং উপপাদ্য।

মানুষের জীবনটা কোনো জ্যামিতির বই নয় যে একটা নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে সরলরেখা টানলে তা অন্য একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়েই মিলবে। জীবনের রেখাগুলো বড় আঁকাবাঁকা, বড় রহস্যময়। কখনো কখনো দুটো রেখা সমান্তরাল চলতে চলতে হুট করে একে অপরের থেকে এত দূরে সরে যায় যে আর কখনোই তাদের মিলন ঘটে না। আবার কখনো তারা এত কাছাকাছি আসে যে মনে হয় এই বুঝি মিলে গেল, ঠিক তখনই ভাগ্য নামের এক অদৃশ্য হাত মাঝখান থেকে নদী খুঁড়ে দেয়।

আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারের তিন তলার চার নম্বর ফ্ল্যাটটায় আজ সকাল থেকেই এক এলাহী কাণ্ড চলছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে খাঁটি ঘিয়ে ভাজা পোলাওয়ের সুগন্ধ আর খাসির মাংসের কোরমার কড়া মসলার ম ম গন্ধ। রেনুর মা রেহানা বেগম চুলার সামনে দাঁড়িয়ে ঘামছেন। তাঁর পরনের সুতি শাড়িটা ঘামে লেপ্টে গেছে। বড় মেয়ের জন্য এত বড় ঘর থেকে সম্বন্ধ আসছে, তাঁর হাতের রান্নায় যেন কোনো খুঁত না থাকে। ড্রইংরুমে রেনুর বাবা রহমান সাহেব নিজের পুরোনো কাঠের আলমারি থেকে বের করা ধোয়া, কড়া ইস্ত্রি করা সাদা পাঞ্জাবিটা পরে সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তাঁর চোখের চশমাটা বারবার নাকের ডগায় নেমে আসছে, আর তিনি সেটা ডান হাতের মধ্যমা আঙুল দিয়ে ঠেলে ওপরে তুলছেন। তাঁর সামনে সেন্টার টেবিলে একটা কাঁচের বাটিতে সাজানো রয়েছে লালমোহন আর সন্দেশ। রহমান সাহেব একটু পর পর ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন আর পকেটে রাখা রুমাল দিয়ে কপালের কাল্পনিক ঘাম মুছছেন। মধ্যবিত্ত বাবারা যখন মেয়ের বিয়ের পাকা কথা বলেন, তখন তাঁদের মুখের গাম্ভীর্যের আড়ালে একটা মস্ত বড় নিঃস্ব হওয়ার ভয় লুকিয়ে থাকে।

রেনু তার ছোট ঘরটার বিছানার ওপর চুপচাপ বসে আছে। তার কোলের ওপর একটা গাঢ় নীল রঙের জামদানি শাড়ি ছড়ানো। শাড়িটা তার মা অনেক শখ করে আলমারির লকার থেকে বের করে দিয়েছেন, সুগন্ধি ন্যাপথলিনের একটা হালকা গন্ধ আসছে ওটা থেকে। রেনুর হাত দুটো শাড়িটার ওপর নিথর হয়ে পড়ে রইল। তার চোখ জানালা দিয়ে বাইরের আকাশটার দিকে। আকাশটা আজ বড় বেশি পরিষ্কার, এক ফোঁটা মেঘের চিহ্নও কোথাও নেই। অথচ রেনুর মনে হচ্ছিল, তার চারপাশের বাতাসটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ঠিক এই সময়েই তার বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা মৃদু কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা নাম। আর তা হলো ‘ইশতিয়াক’।

রেনু ফোনটা হাতে নিল, কিন্তু রিসিভ করল না। সে স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল যতক্ষণ না রিং হওয়া বন্ধ হলো। ইশতিয়াকের সাথে গত তিন দিন তার কোনো যোগাযোগ নেই। রবীন্দ্র সরোবরের সেই সন্ধ্যার পর থেকে তাদের দুজনের মাঝখানে কেমন যেন একটা দুর্ভেদ্য দেয়াল খাড়া হয়ে গেছে। রেনু নিজেই সেই দেয়ালটা তুলেছে, কারণ সে জানে, ইশতিয়াকের বাউন্ডুলে মায়ায় বেশি জড়িয়ে পড়লে সে আর এই মধ্যবিত্ত জীবনের কঠিন অংকটা মেলাতে পারবে না। জীবনটা তো আর গল্প নয়, এখানে মাস শেষে বাড়িভাড়ার রসিদ আসে, বাজারের ফর্দ আসে, ছোট ভাইয়ের কলেজের ফিস দিতে হয়।

বিকেল ঠিক চারটায় রেহানরা এল। রেহান মানুষ হিসেবে বেশ সুপুরুষ, লম্বা, ফর্সা, পরিপাটি করে ছাঁটা চুল। তার পরনে দামী ফ্রেঞ্চ ব্যান্ডের শার্ট আর পায়ে চকচকে চামড়ার জুতো। কথা বলে খুব মেপে মেপে, প্রতিটি বাক্যের সাথে একটা বা দুটো করে ইংরেজি শব্দ জুড়ে দেওয়া তার স্বভাব। তার সাথে এসেছেন তার বাবা-মা এবং বড় বোন। ড্রইংরুমে হাসির রোল উঠল। রেহানের বাবা রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললেন, “রহমান ভাই, আমাদের রেহানের তো কোনো ডিমান্ড নেই। আপনাদের মেয়ে আমাদের প্রথম দেখাতেই পছন্দ। বিয়ের ডেটটা আমরা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই রাখতে চাচ্ছি। রেহানের আবার ব্যাংকের ফরেন অডিটের কাজ শুরু হবে, তখন আর ছুটি পাওয়া মুশকিল হবে।”

রহমান সাহেব হাত কচলে বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, “জি, ভাইসাহেব। আপনারা যেভাবে বলবেন, সেভাবেই হবে। তবে আয়োজনটা আমি আমার সাধ্যমতো…”

“আরে না না, বড় আয়োজনের কোনো দরকার নেই। আমরা জাস্ট ক্লোজ ফ্যামিলি মেম্বারদের নিয়ে একটা ছোট হোটেল বা রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠান করব। রেহান নিজেই সব ম্যানেজ করে নেবে,” রেহানের মা হাতের সোনার চুড়ি নাড়িয়ে বললেন। রেনুকে যখন ড্রইংরুমে ডেকে আনা হলো, সে মাথা নিচু করে সোফার এক কোণে গিয়ে বসল। রেহান তার দিকে তাকিয়ে ভদ্রতার এক চিলতে হাসি হেসে নিচু গলায় বলল, “রেনু, আপনি তো ধানমন্ডির একটা আইটি ফার্মে জয়েন করেছেন শুনলাম। বিয়ের পর কিন্তু জবের দরকার হবে না। আমি চাই আমার ওয়াইফ ফ্যামিলিটাকেই ফুল টাইম দেখুক। আমাদের ওদিকের লাইফটা একটু বিজি, আপনি জবে গেলে ঘর সামলানো টাফ হবে।” রেনু একবার রেহানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে একটা আত্মবিশ্বাস আছে, একটা সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আছে, একটা অধিকারবোধ আছে। কিন্তু সেখানে কোনো মায়া নেই, কোনো নীলক্ষেতের মোড়ের ভাঙা ছাতার মতো আশ্রয় নেই যা রেনুকে তীব্র ঝড়ে আগলে রাখতে পারে। রেনু মৃদু মাথা নাড়ল, যার অর্থ সে রাজি। মধ্যবিত্তের মেয়েদের রাজিনামা দিতে বেশি সময় লাগে না।

পরদিন বিকেলে রেনু ইশতিয়াককে একটা সংক্ষিপ্ত মেসেজ পাঠাল, “আজ বিকেল ৫টায় নিউমার্কেটের পেছনের সেই ফুচকার দোকানটায় আসতে পারবেন? একটা জরুরি কথা ছিল।” ইশতিয়াক ঠিক পাঁচটার পাঁচ মিনিট আগেই এসে হাজির হলো। তার পরনে সেই চিরচেনা জিন্স আর একটু কুঁচকে থাকা খয়েরি রঙের শার্ট। তাকে দেখলে মনে হয় সে এইমাত্র কোনো এক গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে। দুনিয়ার কোনো তাড়া তাকে স্পর্শ করে না। তারা দুজনে ফুচকার দোকানের একদম কোণের একটা পুরোনো কাঠের বেঞ্চিটায় বসল। ফুচকাওয়ালা প্লেটে তেঁতুলের টক আর কাঁচামরিচ দিয়ে ফুচকা সাজিয়ে দিয়ে গেল, কিন্তু কেউ একটা ফুচকাও মুখে তুলল না। ফুচকা থেকে ধোঁয়া উঠছে না, কিন্তু তবুও পরিবেশটা কেমন যেন গুমোট।

“বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে?” ইশতিয়াক খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।

রেনু ফুচকার প্লেটের দিকে তাকিয়ে চামচ দিয়ে একটা ফুচকা ভাঙতে ভাঙতে বলল, “হ্যাঁ। আগামী মাসের সাত তারিখ। শুক্রবার।”

“পাত্রের নাম রেহানই তো? সেই ব্যাংকের কর্মকর্তা?”

“হুম।” রেনুর গলার আওয়াজ বুজে এল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে ইশতিয়াকের দিকে সরাসরি তাকাল। সে বলল, “ইশতিয়াক, আপনি আমাকে একটা কথা সত্যি করে বলবেন? কোনো উটকো গল্প না বানিয়ে একদম সোজা উত্তর দেবেন।”

“কী কথা?” ইশতিয়াক তার শান্ত চোখ দুটো রেনুর মুখে রাখল।

“আপনি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছেন? সত্যি করে বলবেন। আপনার এই জীবনে কি কোনো মানুষের জন্য কখনো বুকটা কেঁপে ওঠেনি?”

ইশতিয়াক একটু হাসল। সে পকেট থেকে চারমিনার সিগারেটের প্যাকেটটা বের করতে গিয়েও রেনুর দিকে তাকিয়ে হাতটা সরিয়ে নিল। সে দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল, “মামা, দুটো কড়া লিকারের চা দাও তো।” তারপর রেনুর দিকে ফিরে বলল, “গল্প লেখকদের ভালোবাসতে নেই, রেনু। তারা যদি কোনো একটা নির্দিষ্ট মানুষকে ভালোবেসে ফেলে, তবে তাদের গল্পের চরিত্রগুলো সব একঘেয়ে আর একপেশে হয়ে যায়। তাদের হৃদয়ে একটা মস্ত বড় শূন্যতা থাকতে হয়, যাতে সেই শূন্যস্থানে তারা পুরো দুনিয়ার মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প এনে জমা করতে পারে। আমি বাউন্ডুলে মানুষ, আমার হৃদয়ে ওই শূন্যতাটুকুই আমার সম্পত্তি।”

“আপনি সবসময় সব কথা এত ঘুরিয়ে, এত নাটকীয় করে বলেন কেন? সোজা করে বলতে পারেন না যে আপনি একটা আস্ত কাপুরুষ?” রেনুর চোখে হঠাৎ এক পশলা পানি এসে জমল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, তার গলা কাঁপতে লাগল। “আপনি কি জানেন না, আমি কেন এই বিয়েটা করছি? আপনি যদি একবার… জাস্ট একবার এই এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে বলতেন যে ‘রেনু, তুমি এই বিয়েটা করো না, আমি তোমাকে আগলে রাখব’, আমি সব কিছু ছেড়ে চলে আসতাম। আমি বাবার অংক, সমাজের হিসেব, রেহানের গুলশানের ফ্ল্যাট সব কিছু এক লাথিতে ফেলে দিয়ে আপনার ওই চিলেকোঠার ঘরে চলে যেতাম। কিন্তু আপনি একটা বারও আমাকে আটকানোর চেষ্টা করলেন না কেন? কেন এত নির্বিকার হয়ে আছেন?”

ফুচকার দোকানের পাশে একটা সিডি দোকানে তখন কম ভলিউমে কোনো একটা পুরোনো গান বাজছিল। চারপাশের মানুষের চ্যাঁচামেচি, রিকশার বেল, বাসের হর্ন সব কিছু যেন রেনুর এই কান্নার তোড়ে এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। ইশতিয়াক চুপ করে রইল। তার মুখের সেই মলিন হাসিটা উবে গেছে। সে রেনুর দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো বিষণ্ণতায় আর এক গভীর হাহাকারে ভরে উঠল, যা রেনু আগে কখনো দেখেনি। সে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে খুব নিচু, ভাঙা গলায় বলল, “রেনু, আমি একটা বাউন্ডুলে ছেলে। আমার নিজের কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নেই। আজ ফ্রিল্যান্সিং করে দু-পয়সা পাচ্ছি, কাল হয়তো ল্যাপটপটা নষ্ট হলে তাও থাকবে না। আমার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, আমি আজ এখানে তো কাল ঢাকার অন্য কোনো মেসে। আমি মেঘের মতো ভেসে বেড়াই। আপনার মতো একটা গোছানো, দায়িত্বশীল মেয়ে, যে তার পরিবারের একমাত্র ভরসা তাকে আমি আমার এই ছন্নছাড়া জীবনে টেনে এনে একটা জীবন্ত নরক তৈরি করতে পারি না। রেহান আপনাকে যে সামাজিক নিরাপত্তা দেবে, যে পাকা ছাদ দেবে, যে নিশ্চিন্ত জীবন দেবে, তা আমি এই জন্মে কোনোদিনও দিতে পারব না। ভালোবাসা দিয়ে তো আর মাসের শেষের বাজারের ফর্দ মেটানো যায় না, রেনু। জীবনটা আমার উপন্যাসের পাতা নয় যে আমি কলমের এক খোঁচায় অভাব দূর করে দেব।”

রেনু চোখের পানি মুছে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার বুকটা অভিমানে আর অপমানে ফেটে যাচ্ছিল। সে ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে তীব্র গলায় বলল, “আপনি একটা কাপুরুষ, ইশতিয়াক সাহেব। আপনি জীবনকে ভয় পান, আপনি দায়িত্ব নিতে ভয় পান। আপনি শুধু দূর থেকে মানুষের জীবন দেখতে ভালোবাসেন, নিজের জীবনে কোনো সত্য গল্প তৈরি করার সাহস আপনার নেই। আপনার ওই এক কাঠি ভাঙা ছাতার মতোই আপনার মনটাও ভাঙা।” রেনু আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে দ্রুতপায়ে হেঁটে নিউমার্কেটের চেনা ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। সে একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকাল না।

ইশতিয়াক সেই কাঠের বেঞ্চিটায় একাই বসে রইল। ফুচকাগুলো ততক্ষণে একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, চায়ের ওপর একটা হালকা সর পড়ে গেছে। সে পকেট থেকে সেই একমাত্র দেশলাই আর সিগারেটটা বের করল। চারপাশের বাতাস তখন একদম স্থির, এক ফোঁটা হাওয়া নেই, কোনো বৃষ্টিও নেই। কাঠিটা জ্বলল, আর ইশতিয়াক এক বুক ধোঁয়া টেনে নিয়ে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “হ্যাঁ রেনু, আমি কাপুরুষ। কারণ আমি তোমাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছি, আর তাই তোমার সুন্দর জীবনটার ধ্বংসের কারণ আমি হতে চাই না। কিছু মানুষকে না পাওয়ার মধ্যেই তাদের ভালো রাখা লুকিয়ে থাকে।”

চারপাশে তখন সন্ধ্যার ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। ঢাকা শহর তার চিরচেনা নিয়মে আলোর রোশনাই ছড়াচ্ছে। কেউ কারো জন্য থামে না, কোনো সময়ের স্রোত কারো বুকভাঙা কান্নার জন্য এক সেকেন্ডের জন্যও থমকে দাঁড়ায় না। ইশতিয়াক একাই সেই নতুন নীল ছাতাটা হাতে নিয়ে অন্ধকারের দিকে হাঁটতে লাগল।

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here