#অসময়ের_বৃষ্টি
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#শেষ_পর্ব
মানুষের জীবনের কিছু কিছু দিন আসে যা কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায় আলাদা করে লাল কালি দিয়ে দাগিয়ে রাখা থাকে না। খুব সাধারণ আর আটপৌরে আটটা-পাঁচটার দিনের মতোই তারা আসে। অথচ দিনশেষে দেখা যায়, সেই অতি সাধারণ দিনটাই এক ধাক্কায় পুরো জীবনের মোড়টা অন্য কোনো অচেনা নদীর দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারের চার নম্বর ফ্ল্যাটে রহমান সাহেব হসপিটাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন আজ প্রায় বিশ দিন হলো। স্ট্রোকের ধকলটা তাঁর সত্তরের কোঠায় ছোঁয়া শরীরের ওপর দিয়ে বেশ বড়সড় একটা ঝড় বইয়ে দিয়ে গেছে। বাঁ হাত আর বাঁ পা-টা এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি। সকালে আর বিকেলে রিফাত কিংবা রেহানা বেগমকে ওনার দুই পাশে ধরে দাঁড় করাতে হয়। তবে ইদানীং তিনি একটা বেলজিয়ামের তৈরি পুরোনো কাঠের লাঠিতে ভর দিয়ে ঘরের ভেতর নিজে নিজেই চার-পাঁচ কদম হাঁটতে পারেন।
রহমান সাহেবের মুখের সেই চিরচেনা রাশভারী এবং হিসেবি ভাবটা এখন আর নেই। যে মানুষটা এক সময় বাজারের এক টাকার হিসাব এদিক-ওদিক হলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলতেন, তিনি এখন দিনের বেশিরভাগ সময় ড্রইংরুমের জানালার পাশের ইজিচেয়ারটায় মূর্তির মতো বসে থাকেন। তাঁর চোখ থাকে জানালার বাইরে আকাশের দিকে, কখনো বা নিমের ডালটায় বসে থাকা একটা একলা চড়ুই পাখির দিকে। মাঝে মাঝে টেবিলে রাখা ফিলিপস কোম্পানির পুরোনো থ্রি-ব্যান্ডের রেডিওটার নব ঘুরিয়ে খুব নিচু ভলিউমে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনেন, ‘আমার নিশীথরাতের বাদলধারা…’।
রেহানের সাথে রেনুর বিয়েটা ভেঙে যাওয়ার পর আজিমপুরের এই চেনা ফ্ল্যাটটায় প্রথম একটা সপ্তাহ এক থমথমে নিস্তব্ধতা ছিল। আত্মীয়-স্বজনদের ফিসফিসানি, চায়ের কাপের আড়ালে বাঁকা হাসি আর রেহানা বেগমের ঘরের কোণে বসে ওড়নায় মুখ গুঁজে কান্না সব মিলিয়ে বাতাসটা ভারী হয়েছিল। রেনুর মেজ খালা মমতাজ বেগম তো একদিন বসার ঘরে সবার সামনেই বলে বসলেন, “মেয়ের কপালটা দেখলা রেহানা? বিয়ের পিঁড়িতে বসার আর মাত্র দুই দিন বাকি, আর তখনই জামাই হাতছাড়া হইলো। এমন সোনার টুকরো ছেলে, গুলশানে ফ্ল্যাট, লাখ টাকা বেতন! একটা রাত ছেলেটার ফোন সাইলেন্ট আছিল বইলা রেনু এতবড় জেদ দেখাইল? এখন এই আধমরা বাপ আর বেকার ভাই লইয়া কে তোমারে পার করব, শুনি?”
রেনু সেদিন ড্রইংরুমের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিল। তার চোখে পানি আসেনি, বরং তার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠেছিল। সে মমতাজ বেগমের সামনে গিয়ে খুব শান্ত গলায় বলেছিল, “খালাম্মা, মানুষটার একটা রাত ফোন বন্ধ ছিল বলে আমি বিয়েটা ভাঙিনি। আমি বিয়েটা ভেঙেছি কারণ তার কাছে আমার বাবার জীবনের চেয়ে নিজের রাতের ঘুমটা বেশি দামী ছিল। যে মানুষ ঝড়ের রাতে ছাতা হাতছাড়া করে নিজের মাথা বাঁচায়, তাকে আর যাই হোক সংসারের মাঝদরিয়ায় হাল ধরতে দেওয়া যায় না। আপনি চা খাবেন? বানিয়ে দেব?”
মমতাজ বেগম মেয়ের এমন ধারালো কথা শুনে আর এক মুহূর্ত বসেননি, তক্ষুনি ব্যাগ গুছিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। রেনু তার ধানমন্ডির আইটি ফার্মের চাকরিতে পুরো দমে মন দিয়েছে। এখন সে আর জীবনের সমীকরণ নিয়ে আগের মতো দুশ্চিন্তা করে না। প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটায় সে তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হয়, আর সন্ধ্যা সাড় সাতটায় ক্লান্ত শরীরে ফিরে আসে। তবে এই ব্যস্ত, হিসেবি রুটিনের মাঝখানে একটা মানুষ খুব নিঃশব্দে, অলক্ষ্যে তাদের পুরো পরিবারের সাথে জড়িয়ে গেছে। সে ইশতিয়াক।
ইশতিয়াক প্রতিদিন নিয়ম করে বিকেল পাঁচটায় আজিমপুরের এই ফ্ল্যাটটায় আসে। তার আসার কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নেই, অথচ বিকেল পাঁচটা বাজলেই রহমান সাহেব জানালার দিকে চোখ রেখে অপেক্ষা করতে থাকেন। দরজায় মৃদু নক হলেই রিফাত ছুটে গিয়ে দরজা খোলে, “ইশতিয়াক ভাই! আসুন আসুন।”
ইশতিয়াক ঘরে ঢুকেই খুব সহজ ভঙ্গিতে রহমান সাহেবের পায়ের কাছে বসে। ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো কাঠের তৈরি দাবার বোর্ড বের করে। রহমান সাহেব কাঁপানো ডান হাত দিয়ে দাবার খুঁটি চালেন। ইশতিয়াক ইচ্ছা করেই প্রতিটা খেলায় এমন সব আনাড়ি চাল দেয় যে রহমান সাহেব বোকা বনে যাওয়ার ভান করে হেসে ওঠেন। ওনার মুখের সেই হাসিটা দেখার জন্য ইশতিয়াক পুরো ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে মগবাজার থেকে আজিমপুর ছুটে আসে।
রেহানা বেগম এখন ইশতিয়াককে দেখলেই রান্নাঘরে চলে যান। কোনো কথা না বলেই এক কাপ কড়া লিকারের আদা চা আর একটা কাঁচের পিরিচে দুটো নোনতা বিস্কুট পাঠিয়ে দেন। রিফাত তার কলেজের ফিজিক্সের কোনো কঠিন থিওরি আটকে গেলেই খাতা-কলম নিয়ে ইশতিয়াকের পাশে এসে বসে, “ইশতিয়াক ভাই, এই উপপাদ্যটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না।” ইশতিয়াক হাসিমুখে ল্যাপটপ বন্ধ করে রিফাতকে বোঝাতে বসে। সে যেন কোনো জাদুমন্ত্রে এই মধ্যবিত্ত পরিবারের ইঁট-কাঠের দেয়ালগুলোর ভেতরের একজন হয়ে উঠেছে, অথচ কেউ তাকে কোনোদিন আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাড়ির জামাই বা অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সে আছে এক অদ্ভুত শূন্যস্থানের মতো, যা চেনা যায় না কিন্তু যার অনুপস্থিতি সবাইকে টের পাইয়ে দেয়।
সেদিন ছিল একটা মেঘলা মঙ্গলবার। জুন মাসের মাঝামাঝি, আকাশটা সকাল থেকেই এক চিলতে তামাটে রোদের মুখ দেখায়নি। দুপুরের পর থেকেই মেঘগুলো দল বেঁধে ঢাকার আকাশে ডেরা জমিয়েছে।
অফিসের কাজ শেষ করে রেনু যখন নিউমার্কেটের মোড়ে এসে বাস থেকে নামল, তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা ছটা বেজে বিশ মিনিট। চারপাশটা যেন অসময়েই অন্ধকার হয়ে গেছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোগুলো সবেমাত্র টিমটিম করে জ্বলে উঠেছে। বাতাসে একটা সোঁদা মাটির গন্ধ, যা জানান দিচ্ছে যে এক্ষুণি এক পশলা ভারী বৃষ্টি নামবে। রেনু তার শাড়ির আঁচলটা ভালো করে কাঁধে জড়িয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিল। হুট করেই তার বুকের ভেতর একটা পুরনো স্মৃতির ঢেউ আছাড় খেল। আজ থেকে ঠিক একটা মাস আগে, ঠিক এইরকম একটা মেঘলা, ওলটপালট করা দিনেই তার জীবনে ইশতিয়াক নামের বাউন্ডুলে মানুষটার প্রথম আগমন ঘটেছিল। সেদিনের রেনু আর আজকের রেনুর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। সেদিনের রেনুর মনে ছিল এক আকাশ অনিশ্চয়তা, ভয় আর পরিবারের অংক মেলানোর তীব্র তাগিদ। আর আজকের রেনুর মনে নিটোল বিশ্বাস। সে এই এক মাসে জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা আবিষ্কার করেছে, নিরাপত্তা কখনো ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটে থাকে না, গুলশানের এপার্টমেন্টেও থাকে না প্রকৃত নিরাপত্তা থাকে একটা ভরসাযোগ্য, শক্ত মানুষের হাতের মুঠোয়, যে চরম ঝড়ের রাতেও হাতটা ছেড়ে দেয় না। ঠিক এই সময়েই আকাশটা ফুঁড়ে ঝুম বৃষ্টি নামল। একদম এক মাস আগের সেই বিকেলের মতোই বেপরোয়া, নিয়মকানুনহীন হুটহাট বৃষ্টি। রেনু চটজলদি রাস্তার পাশের একটা পুরোনো বইয়ের দোকানের টিনের শেডের নিচে এসে আশ্রয় নিল। দোকানটা বন্ধ, কিন্তু শেডটুকু মাথা বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট। রেনু তার ভ্যানিটি ব্যাগের চেইনটা খুলল। ভেতরে হাত দিতেই তার আঙুলে ঠেকল গাঢ় নীল রঙের ফোল্ডিং ছাতাটায়। ঠিক এমন একটা ছাতা সে নিজের প্রথম বেতনের টাকায় ইশতিয়াককে উপহার দিয়েছিল। সে ছাতাটা বের করল, কিন্তু হাতলটা ধরেও ছাতাটা মেলল না। সে ছাতাটা বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো যখন পিচের রাস্তায় পড়ে ছিটকে উঠছিল, রেনুর মনে হলো সে যেন এক অলীক স্বপ্নের ঘোরে চলে গেছে। “ছাতাটা ব্যাগে রেখে এভাবে বোকার মতো ভিজলে কিন্তু আবার অ্যাজমা বেড়ে যাবে, রেনুকা রহমান। তখন ইনহেলার খোঁজার জন্য আবার আমাকে ব্যাগ হাতড়াতে হবে।” একটি অতি পরিচিত, শান্ত এবং মৃদু রসবোধে ভরা গলা শুনে রেনু চমকে পাশে তাকাল। ইশতিয়াক দাঁড়িয়ে আছে। তার থেকে ঠিক হাতদুয়েক দূরে, ঠিক প্রথম দিনের জায়গাটাতেই। তার পরনে একটা নীল রঙের ফতুয়া, কাঁধে সেই পুরনো, তালি দেওয়া ওয়াটারপ্রুফ ঝোলা ব্যাগ। তার চুলগুলো ইতিমধ্যে বৃষ্টির ছাটে ভিজে কপালে-গালে লেপ্টে গেছে। সে তার চিরচেনা সেই নিরীহ, মায়াবী হাসিটা নিয়ে রেনুর দিকে তাকিয়ে আছে। রেনু নিজের চোখের কোণে জমা হওয়া জলটুকু বৃষ্টির পানির সাথে মিশিয়ে দিয়ে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, “আপনি এখানে কী করছেন? আপনার তো আজ বিকেল পাঁচটায় বাবার সাথে দাবা খেলার কথা ছিল। মা আপনার জন্য চা বানিয়ে বসে আছেন।”
ইশতিয়াক পকেটে হাত দিয়ে একটা চারমিনার দেশলাই বের করল। একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে সে শেডের আড়ালে পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “আজিমপুরই যাচ্ছিলাম। কিন্তু নীলক্ষেতের এই মোড়টায় এসে হুট করে পা দুটো আটকে গেল। মনের ভেতর কে যেন বলল ঠিক এক মাস আগের এই দিনে এক জেদি, অহংকারী ভদ্রমহিলা সিএনজির কাদা মেখে এই শেডের নিচে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রকৃতির এই বিশেষ অ্যানিভার্সারিটা মিস করা কি ঠিক হতো, বলুন? তাই ভাবলাম দাবা খেলাটা আজ না হয় একটু পরেই হোক।” সে দেশলাই কাঠিটা জ্বালানোর চেষ্টা করতেই রেনু কোনো কিছু চিন্তা না করে এক কদম এগিয়ে এসে ইশতিয়াকের হাতটা চেপে ধরল।
ইশতিয়াক থমকে গেল। দেশলাইয়ের কাঠিটা তার হাতেই নিভে গেল। সে বড় বড় চোখ করে রেনুর দিকে তাকাল। রেনুর হাতের স্পর্শে তার বাউন্ডুলে, ছন্নছাড়া মনটা কেমন যেন এক নিমেষে শান্ত, স্থির হয়ে গেল।
রেনু ইশতিয়াকের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখ দুটো এখন আর বিষণ্ণ নয়, সেখানে কোনো একাকীত্ব নেই। সেখানে আছে এক মহাসমুদ্রের মতো গভীর মায়া আর অধিকারবোধ। রেনু খুব ধীরস্থির, গলায় বলল, “আমি সেদিন নিউমার্কেটের ফুচকার দোকানে আপনাকে কাপুরুষ বলেছিলাম, ইশতিয়াক সাহেব। তার জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমি তখন এতই অন্ধ ছিলাম যে বুঝতে পারিনি আপনি আমাকে কতটা ভালোবাসলে তবেই নিজের সুখের কথা এক ফোঁটাও না ভেবে, আমার পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু আজ আমি আপনাকে বলছি, আমার আর কোনো রেহানের নিখুঁত, গোছানো অংকের দরকার নেই। আমি আপনার এই ছন্নছাড়া, বাউন্ডুলে জীবনের মার্জিনে ফেলে রাখা অপ্রয়োজনীয় হিজিবিজি দাগটা হয়েই বাঁচতে চাই। আপনি কি আমাকে আপনার ওই মগবাজারের চিলেকোঠার ঘরের গল্পে একটা স্থায়ী চরিত্র করবেন? নাকি সারা জীবন শুধু দূর থেকেই মানুষের গল্প লিখে যাবেন?”
বৃষ্টির শব্দ তখন নীলক্ষেতের টিনের চাল ছাড়িয়ে চারপাশের কংক্রিটের দেয়ালে তীব্র বেগে আছাড় খাচ্ছিল। নিউমার্কেটের ব্যস্ত রাস্তায় পিচের ওপর দিয়ে নোংরা পানির স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ইশতিয়াকের মনে হলো, তার চারপাশের পুরো পৃথিবীটা যেন এক ইশারায় স্তব্ধ হয়ে গেছে। কোনো গাড়ির হর্ন নেই, কোনো মানুষের চ্যাঁচামেচি নেই। আছে শুধু রেনুর এই বুক কাঁপানো স্বীকারোক্তি।
ইশতিয়াক তার ঠোঁটের সিগারেটটা ফেলে দিল। সে তার কাঁধের ঝোলা ব্যাগটার চেইন খুলে ভেতর থেকে একটা জিনিস বের করল। রেনু অবাক হয়ে দেখল। সেটা আর কোনো ভাঙা, লজ্জাবতী ছাতা নয়। সেটা রেনুর দেওয়া সেই গাঢ় নীল রঙের নতুন ফোল্ডিং ছাতাটা। ইশতিয়াক ওটা এক মুহূর্তের জন্যও নিজের কাছ থেকে আলাদা করেনি। ইশতিয়াক ছাতাটা আলতো করে মেলে ধরল। গাঢ় নীল রঙের সেই ছাতাটা তাদের দুজনের মাথার ওপর একটা ছোট, নিজস্ব আকাশের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সে রেনুর মাথার ওপর ছাতাটা ধরে তার সেই মলিন হাসিটা হাসল। সে খুব নিচু, গভীর গলায় বলল, “রেনু, আমার চিলেকোঠার ঘরটা খুব ছোট। সেখানে হয়তো কোনো দামী সোফা নেই, গুলশানের মতো লাক্সারিয়াস ফ্ল্যাট নেই। তবে সেখানে একটা ভাঙা টেবিল আছে, এক আকাশ জোছনা আছে আর বর্ষার দিনে টিনের চালে বৃষ্টির গান শোনার মতো একটা জানালা আছে। আপনি যদি সেই ঘরে আসেন, তবে আমার এই সাধারণ লেখকের উপন্যাসের শেষ পাতাটা বড় বেশি সুন্দর হয়ে যাবে। আপনি কি সত্যি আসবেন?”
রেনু আর কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার কোনো প্রয়োজনও ছিল না। সে অলক্ষ্যে ইশতিয়াকের আরও কাছে সরে এল। ইশতিয়াকের একটা হাত ছাতার হাতলটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল, আর অন্য হাতটা রেনু নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। ছাতাটার নিচে তারা দুজনে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রইল। ইশতিয়াক এবারও ছাতাটা রেনুর দিকেই বেশি বাড়িয়ে ধরে রেখেছিল, যার ফলে তার নিজের ডান কাঁধটা পুরোপুরি ভিজে জবুথবু হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এবার রেনু আর তাকে ছাতাটা মাঝখানে রাখতে বলল না, কিংবা নিজে দূরে সরে গেল না। কারণ সে মনে মনে জেনে গেছে এই ভিজতে থাকা, ছন্নছাড়া মানুষটার কাঁধটাই আসলে তার জীবনের সবচেয়ে দামী ছাদ।
জীবনে হুটহাট এমন সব ঘটনা ঘটে যায় যা আমরা আমাদের সবচেয়ে বুনো কল্পনাতেও কখনো ভাবি না। অনিশ্চিত এই রহস্যময় জীবনে সময়ের স্রোতে এমন কিছু মানুষের আচমকা আগমন ঘটে, যাদের নিজের করে পাওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা বা পূর্বপরিকল্পনা আমাদের থাকে না। কিন্তু তারপরেও, প্রকৃতির কোনো এক অলীক নিয়মে, না চাইতেই আমরা তাদেরকে পেয়ে যাই। আর ধীরে ধীরে, মায়ার ছায়াবাজিতে, সেই মানুষগুলোই আমাদের হৃদয়ের এমন একটা শক্তপোক্ত, গভীর জায়গা করে নেয় যে পুরো পৃথিবী একপাশে চলে গেলেও, জীবনের সব অংক ভুল প্রমাণিত হলেও, তাদেরকে আর কোনোদিনও হাতছাড়া করা যায় না। তারা জীবনের অসময়ের বৃষ্টি হয়ে আসে, আর পুরো মনটাকে এক চিলতে স্নিগ্ধতায় ভিজিয়ে দিয়ে যায়।
নীলক্ষেতের মোড়ে তখন আষাঢ়ের ঝুম বৃষ্টি ঝরছে, আর সেই বৃষ্টির সুরের মাঝে দুটো ভিন্ন পৃথিবীর মানুষ এক অদৃশ্য সুতোয় চিরকালের জন্য বাঁধা পড়ে গেছে। যে সুতো ছেঁড়ার সাধ্য এই দুনিয়ার কোনো হিসেবি সমীকরণের নেই।
(সমাপ্ত)





