তোলপাড় পর্ব ৪৬(শেষ)

তোলপাড়
ইসরাত জাহান তানজিলা
পর্ব-৪৬(শেষ পর্ব)

রুদ্র বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর কেউই কোনো কথা না বলে সবাই সবার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। রুদ্র যে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে বাসায় এসেছে এটা যেন নিতান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার। এটা নিয়ে কেউই কোনো কথা বললো না। বাসার সবার এই স্বাভাবিক আচরণটাই প্রচণ্ড অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে অরূণীর। কিছু ভেবে পাচ্ছে না অরূণী। মিলাকে একবার বিষয়টা জিজ্ঞেস করবে? অরূণী অনেকক্ষণ ধরে মিলাকে বিষয়টা জিজ্ঞেস করার সুযোগ খুঁজছে, কিন্তু পাচ্ছে না। মিলা কি রুদ্রর ব্যাপারটা বলেছিলো সূর্যকে? অরূণী ফ্যাকাশে মুখে বারান্দায় বসে রইলো। একটু পর রুদ্র ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “বাসার খবর বলো? আমি আসার পর উনারা কি বলেছে?”
– “কিছুই বলে নি। সবাই যার যার মতো ব্যস্ত।”
রুদ্র ভ্রু কুঁচকালো। বিস্মিত গলায় বলল, “কিছু বলে নি?”
– “না কিছু বলে নি। আমি বাসার মানুষদের হাবভাব বুঝতে পারছি না। আমার সাথে কথা বলছে না।”
অরূণীর গলা ভারী শোনা গেল। রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। বিষয়টা রুদ্রকেও ভাবাচ্ছে। বলল, “এমন আচরণের পিছনে কী কারণ থাকতে পারে বলো তো?”
অরূণীর চোখ ভিজে যাচ্ছে, “জানি না। কিন্তু বাসার মানুষদের এমন আচরণ আমার ভালো লাগছে।”
– “আরে তুমি কাঁদছো? পাগল হয়েছো? আমি আছি তো। কান্না-কাটির স্বভাব এখনো গেল না।”
অরূণী বারান্দা থেকে দেখলো সূর্য বাসা থেকে বের হচ্ছে। অরূণী রুদ্রর উদ্দেশ্যে বলল, “ফোন রাখছি। ভাইয়া বাসা থেকে বের হয়েছে। ভাবীর সাথে জরুরি কথা আছে। এখন না বললে, পরে সুযোগ পাবো না।”
অরূণী ফোন রেখে রুম থেকে বের হতে নিলেই সেলিনা আহমেদ কে দেখে দরজার সামনে। অরূণীকে দেখে সেলিনা আহমেদ বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল, “কোথায় যাচ্ছিস? আচ্ছা.. আচ্ছা শোন অরূণী, আজকে কোথায়ও বের হোস না তুই। তোর ছোট ফুপু আসবে দুপুরে। এসেই চলে যাবে। তোকে দেখে না কত বছর হয়েছে। তোকে দেখতে চাইলো খুব।”
অরূণী সন্দিগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সেলিনা আহমেদের দিকে। আস্তে করে কেবল বললো, “আচ্ছা।”
সেলিনা আহমেদ হালকা হেসে চলে গেল। অরূণী মিলার রুমে গিয়ে দেখে মিলা শুয়ে আছে। অরূণীকে দেখে উঠে বসলো। হাই তুলতে তুলতে বলল, “শরীরটা হঠাৎ করে খারাপ লাগছে।”
অরূণী মিলার পাশে বসলো। মিলা আবার বলল, “রুদ্রর ব্যাপারটা তোমার ভাইয়াকে বলেছি। এত বুঝিয়ে বললাম তা তাঁর মুখ থেকে তেমন কোনো কথাই বের হচ্ছে না।”
অরূণী বিষণ্ণ গলায় বলল, “বাসার সবাই কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে। সবার মনে কি চলছে তা তুমি জানো ভাবী? আমি জানি তুমি জানো। প্লীজ ভাবী বলো।”
– “সত্যি অরূণী আমি কিছু জানি না।”
মিলার সাথে কথা বলে তেমন কোনো লাভ হলো না। রুদ্র বলেছিলো দেখা করার কথা। কিন্তু দুপুরে যেহেতু ছোট ফুপু আসবে,অরূণী আর বের হলো না। অরূণী অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলো দুপুরের পর কিন্তু কেউই আসলো না। অরূণী কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সেলিনা আহমেদ আবার বলল, “তোর ফুপু সন্ধ্যার দিকে আসবে। কি যেন কাজে আটকে গেছে।”
বিকালের দিকে হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ফিরলো সাহেদ আহমেদ। বাসায় এসেই সেলিনা আহমেদ কে রুমে ডাকলো। সূর্যও আসলো একটু পর।

বিকাল বেলার ম্লান রোদ। অরূণী ছাদে বসে আসে। রুদ্র বার বার ফোন দিয়ে বলছে, “অরূণী তোমায় দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। বাসা থেকে বের হও না একবার।”
অরূণী মন খারাপ করে বলল, “ফুপু এখনো আসছে না ধ্যাত।”
রুদ্র হেসে বলল, “শ্বশুড় মশাইয়ের খবর কী? মেয়ে কি আমায় দিবে না না-কি জোর করে তুলে আনবো?”
অরূণীও হাসলো। বলল, “আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম আপনি কানাডা গিয়ে আমায় ভুলে গিয়েছেন। অন্য কোনো মেয়ের সাথে প্রেম করছেন..।”
– “এসব ভেবে ভেবে কাঁদতে তাই তো? আমার ভালোবাসা তো অরূণীতেই আটকে আছে।”
রুদ্রর কথায় অদ্ভুত এক প্রশান্তি বয়ে গেল। রুদ্রর গলায় রসিকতা। কৌতুক ভরা গলায় গান ধরলো,
“বন্দে মায়া লাগাইছে
পিরিতি শিখাইছে
কি জাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে।”
অরূণী রুদ্রর গানে মগ্ন হয়ে যায়। কি চমৎকার গানের গলা রুদ্রর। অরূণী নিবিষ্ট হয়ে বলল, “এত দারুণ গানের গলা আপনার! সিঙ্গার হলেন না কেন? কই আগে তো বলেন নি আপনি গান করতে পারেন। প্লীজ আরেকটা গান বলেন না।”
কারো পায়ের শব্দ পেয়ে অরূণী কথা বলা বন্ধ করে পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে মিলা দাঁড়িয়ে আছে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। কেমন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চেহেরা মিলার। অস্থির গলায় বলল, “অরূণী জরুরি কথা আছে।”
অরূণী ঘাবড়ে যায়। বলল, “কি হয়েছে ভাবী?”
– “তোমার ফুপু টুপু কেউ আসবে না। মিথ্যে বলে তোমায় বাসায় রেখেছে। একটু পর ছেলে পক্ষ তোমায় দেখতে আসবে। এসে আংটি পড়াবে,বিয়েও হয়ে যেতে পারে। বাসার সবাই তাই চুপ করে আছে,তোমায় কিছু বলছে না। এখন কি করবে তোমার ব্যাপার। সময় বেশি নেই।”
অরূণীর মনে হলো ওর পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। গলা থেকে কথা বের হচ্ছে না। কান থেকে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে যেন। পুরো শরীর কাঁপছে। অরূণী দুই দণ্ড না ভেবেই আতঙ্কিত গলায় বলল, “ভাবী আমি পালিয়ে যাবো। প্লীজ ভাবী কোনো একটা ব্যবস্থা করো। আমি সারাজীবন তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো। এরকম কিছু হয়ে গেলে আমি আত্মহত্যা করবো।”
অরূণী আর কিছু বলতে পারছে না। কি হচ্ছে এসব? দিশেহারা হয়ে শুধু এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুই ভাবতে পারছে না। মিলার মুখ দেখে বুঝা গেল ও খুব বিপদে পড়েছে। অরূণী কোনো মতে আবার বলল, “কেউ জানবে না তুমি আমায় সাহায্য করেছো। আমি কাউকে বলবো না।”
মিলাও আতঙ্কিত হয়ে পড়লো। বাসার কেউ যদি জানতে পারে অরূণীকে মিলা পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে তাহলে ব্যাপারটা কত খারাপ হবে? মিলা সে সব চিন্তা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে বলল, “আচ্ছা তাহলে পালিয়ে যাও। শুধু মোবাইলটা নিয়ে যাও। সময় নেই বেশি। রুদ্র কে ফোন করো।”
অরূণী হাত-পা ভয়ে জমে যাচ্ছে। ভিতরে কান্না আটকে আছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “আমি কীভাবে বাসা থেকে বের হবো?”
– “বাসার সবাই ব্যস্ত আছে। এই ফাঁকে বেড়িয়ে পড়ো। আমাকে খুঁজতে পারে,আমার যেতে হবে।”
মিলা চলে গেল। অরূণী গায়ে যা পড়া ছিলো তা পড়েই বাসা থেকে বের হয়ে গেল। শুধু হাত-পা আর গলা কাঁপছে অরূণীর। রুদ্রর নম্বরে ডায়েল করলো দুর্বল হাতে। রুদ্র সব শুনে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে রইল। বলল, “অরূণী তুমি আমার বাসার দিকে এসো না তোমায় খুঁজতে আসতে পারে। তুমি গাড়িতেই বসো থাকো। আমি আসছি। তুমি কোনো চিন্তা করো না।”
মিনিট বিশেক পর রুদ্র আর কিরণ সেখানে গিয়ে হাজির। অরূণীর কাঁদছে। রুদ্রকে দেখে কান্নাটা আরো বেড়ে গেল। কিরণ বলল, “আগে তোরা বিয়েটা সেরে ফেল। বিয়ে হয়ে গেলে তখন আর ফ্যামিলির মানুষদের কিছু করার থাকবে না।”
রুদ্র অরূণীর হাত শক্ত করে ধরে আছে। আশ্বস্ত গলায় বলল, “কেঁদো না অরূণী। বাসার সবাই একদিন মেনে নিবে তুমি দেখো।”
রুদ্র কিছুক্ষণ পর আবার বলল, “মিলা ভাবী না বললে কি যে হয়ে যেত..।”
অরূণীর কান্না আরো বাড়ে। বাসার সবাইকে ছেড়ে এভাবে আসতে হবে কখনো ভাবতে পারে নি।

কিরণ ওদের আরো কয়েকজন বন্ধুকে খবর দেয়। বিয়েটা হয়ে যায় সাদামাটা ভাবে। অরূণী হাঁফ ছাড়ে। রুদ্র ওর হাজবেন্ড! এ যেন স্বপ্ন। পুরোটাই স্বপ্ন মনে হচ্ছে। অরূণী ওর গায়ে চিমটি কাটে। সত্যিই বিয়ে হয়ে গিয়েছে? রুদ্রর বন্ধুরা এখনো ওদের সাথে। কিরণ বেশ চিন্তিত মুখে বলল, “দোস্ত আপাতত আমার মামার বাসায় চল। রাতটা সেখানেই থাকিস। তারপরের চিন্তা তারপর।”
রাত হয়েছে বেশ। রুদ্র ভেবে চিন্তে দেখলো রাতটা সেখানে থাকাই উত্তম। রুদ্র বলল, “আচ্ছা চল।”
কিরণ এ পর্যায়ে হাসতে হাসতে অরূণীকে বলল, “কী ভাবী? এখনো কাঁদছেন? মেসে গিয়ে আমায় তো হুমকি ধামকি কম দেন নি। সেইফটি পিন দিয়ে আমার পেটও ফুটো করে দিতে চেয়েছেন। রুদ্রর ফোন নম্বরের জন্য….।”
অরূণী লজ্জা পেলো ভীষণ। কান্না থেমে গেল সেই দিন গুলোর কথা ভেবে আপনাআপনি। রুদ্র হাসি চাপিয়ে বলল, “কিরণ তুই আমার বউকে লজ্জা দিস। তোর এত সাহস?”
রুদ্রর বন্ধুরা চলে যাওয়ার আগে রুদ্র বলল, “দোস্ত তোদের বিয়ের মিষ্টিও খাওয়াতে পারলাম না। বুঝিসই তো পরিস্থিতি। তবে শীঘ্রই সব পরিস্থিতির মোকাবেলা করে ধুমধাম করে আবার বিয়ে করবো। তখন তোদের খাওয়াতে খাওয়াতে পেট খারাপ করে ফেলবে।”
রুদ্রর কথায় হাসির ধুম পড়লো।
– “শালা,আমরা কী তোর বিয়ের মিষ্টি খেতে এখানে আসছি?”
সবাই চলে গেল। শুধু কিরণ বাদে। এভাবে হুটহাট পালিয়ে বিয়ে সে নিয়ে রুদ্রর কোনো ভাবনা চিন্তা দেখা গেল না। বেশ হাসিখুশি। অরূণীর বিষণ্ণ মুখ। রুদ্র অরূণীর হাত ধরে কিরণের উদ্দেশ্যে বলল, “ দোস্ত চল তোর মামার বাসায়।”
কিরণের মামার বাসার উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠলো। কিরণ বলল, “এখন তোর শ্বশুড় বাড়ির লোকজন গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালে কি সিনেমাটিক ব্যাপার হবে বল তো?”
– “আলতু ফালতু কথা বলে তুই আমার বউটাকে চিন্তায় ফেলিস না।”
রুদ্রর মুখে যতবার বউ শব্দটা শুনছে ততবারই অরূণী কিছুক্ষণের জন্য কান্না ভুলে যাচ্ছে।

গাড়ি চলছে। আকাশে ঝলমলে চাঁদ। চারদিকে জ্যোস্না। অরূণীর মন খারাপ বেশ। হয়ত বাসার মানুষের কথা চিন্তা করে। রুদ্র অরূণীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “বউ হয়েছে টা কী বলবে? সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। তোমার চাঁদের মতো জামাইটা তোমার পাশে বসে আছে! তাকাও, তাকিয়ে দেখো একবার।”
অরূণী হেসে ফেলল রুদ্রর রসিকতায়। রুদ্র অরূণীর কোমড় আঁকড়ে ধরে বসলো। অরূণী আবার শিউরে উঠলো। শ্বাস দ্রুততর হচ্ছে শুধু। রুদ্র কিরণের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিরণ আমাদের দিকে তাকাবি না তোর গার্লফ্রেন্ডের কসম। আর আমরা ফিসফিস করে যা বলবো ভুলেও শোনার চেষ্টা করবি না।”
অরূণী লজ্জায় চুপসে যাচ্ছে। কিরণ আওয়াজ করে হাসে, “ভাই একটু ধৈর্যশীল হ।”
রুদ্র অরূণীর কানের কাছে মুখ নিয়ে আবার বলতে লাগলো, “একটা কবিতা শুনবে?”
রুদ্র দরাজ কণ্ঠে টেনে টেনে আবৃত্তি করতে লাগলো,

“যদি নিষ্কলুষ প্রেমিক হও,
জগদ্বাসীর সবচেয়ে অগ্নিমূল্যের প্রণয়ীনী হবো।
ষদুষ্ণ প্রেমোতাপ রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যাবো।
যদি মধ্যাহ্নের রৌদ্রতাপে হিমশীতল দখিনা সমীরণ হও,
মাখিয়ে দিবো তোমার অন্তরতম অঁচল,গোধূলির রক্তিম সূর্যের সমস্ত রঙে।
তমসাবৃত যামিনীতে পূর্ণ চন্দ্রমা হবো,
চন্দ্রসুধা ছড়িয়ে দিবো তোমার হৃদ চরাচরে।
যদি নিষ্কলুষ প্রেমিক হও,
হবো দু চিলতে কাঠের তরী, ভালোবাসার উত্তল মহাতরঙ্গে।
দাঁড়বিহীন তরী জীবনের শেষ অপরাহ্নেও ভাসতে থাকবে প্রেম সায়রে।”

রুদ্রর শ্বাস অরূণীর কাঁধে আছড়ে পড়ছে। অরূণী গভীর আবেগে চোখ দুটো বুঁজে শুনছে কবিতা। কোনো কিছু না বলে শুধু রুদ্রর কাঁধে মাথা রাখলো। অরূণীর মনে হচ্ছে এত সুখে ও কেঁদে ফেলবে,ওর গায়ে জ্বর এসে যাবে। রুদ্রও চুপ থাকলো। হঠাৎ অরূণী মরিয়া হয়ে ওঠে বলল, “লাবণ্য নামের সেই মেয়েটার সাথে আপনার কথা হয়? কানাডা গিয়ে কোনো মেয়ের সাথে কথা বলেছেন?”
হঠাৎ অরূণীর এরূপ প্রশ্ন রুদ্র না হেসে পারলো না, “এই শুভ দিনে তুমি এসব কি জিজ্ঞেস করলে? পেত্নি ভর করেছে না-কি?”
অরূণী মেনিমুখো হয়ে বলল, “কয়দিন যাবৎ জিজ্ঞেস করবো করবো ভাবছি আর জিজ্ঞেস করা হয় নি। হঠাৎ মনে পড়লো।”
– “কোনো মেয়ে-টেয়ের সাথে কথা বলি না।”
রুদ্র আবার বলল, “অরূণী আমি চেয়েছিলাম আমাদের খুব ধুমধাম করে বিয়ে হোক। তুমি লাল টুকটুকে বউ সাজবে। বিশ্বাস করো অরূণী আমি চাইনি আমাদের এভাবে বিয়ে হোক। বিয়ে হলো! কিন্তু তুমি বউ সাজলে না, আমিও বর সাজলাম না। তোমার হাতে মেহেদি নেই, গায়ে লাল বেনারসী নেই।”
কেমন বিষণ্ণ শুনালো রুদ্রর গলা। অরূণী সব ভুলে হাসতে হাসতে বলল, “মনের সাজ, বড় সাজ।”
অরূণীর সেই চঞ্চল হাসি। রুদ্রও হাসতে লাগলো।

কিরণের মামার বাসায় এসে পৌঁছালো ওরা। অরূণীর শুধু এখন চিন্তা হচ্ছে,বাসায় কী হলো? সবাই কি খুঁজছে ও’কে? আব্বা-আম্মা কাঁদছে?
কিরণের মামা-মামী খুব আন্তরিক মানুষ। কিরণ তাঁদের আগেই বলেছে যে ওরা এখানে আসবে। তাঁরা খাবারদাবারের আয়োজন করে রেখেছে। কিরণের মামাতো বোন আবার একটা রুম খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে,ওদের বাসর ঘর। অরূণী প্লেটে খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করছে শুধু,খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। রুদ্র বার বার খেতে বলছে অরূণীকে ইশারায়। খাবার টেবিল থেকে ওঠে রুদ্র কিরণকে ডাকলো। অরূণী কিরণের মামাতো বোন নিপার সাথে। নিপা মেয়েটা এত কথা বলে! কথা বলার ভঙ্গিও চমৎকার।
রুদ্র কিরণকে ডেকে নিয়ে বলল, “দোস্ত আমি একটু বাইরে বের হবো,অরূণীর জন্য শাড়ি কিনবো।”
কিরণ একটু ভেবে বলল, “আচ্ছা যা। একাই যাবি?”
– “হ্যাঁ একাই। তুই অনেক কষ্ট করেছিস এখন বিশ্রাম নে।”
অরূণী নিপার সাথে বসে আছে। রুদ্র কে দেখছে না। কারো কাছে জিজ্ঞেস করতেও লজ্জা পাচ্ছে। হঠাৎ অরূণীর মনে হলো মিলার কাছে নিপার ফোন নম্বর থেকে একটা কল করা যায়। অরূণীর নিপার ফোন থেকে কল করলো মিলার নম্বরে। ফোন রিসিভ করে মিলা হ্যালো,হ্যালো করতে লাগলো। অরূণী ভয় ভয় গলায় বলল, “ভাবী।”
মিলা চমকে গিয়ে বলল, “অরূণী? কোথায় তোমরা? ঠিক আছো তো?”
– “তোমার কাছে কেউ নেই তো?”
– “না নেই। তোমাদের কি অবস্থা তাই বলো। বাসার সবাই খুঁজছে তোমাকে। আম্মা কাঁদছে। সাবধানে থেকো।”
মিলা ফোন রেখে দিলো। কে যেন আসছে। রুদ্র ঘণ্টা খানেক পর বাসায় ফিরলো। শপিং ব্যাগ তিনটা নিপার হাতে দিয়ে বলল, “অরূণীকে সাজিয়ে দেও।”
অরূণী রুদ্রর পাগলামিতে অবাক না হয়ে পারলো না। সাজগোজ শেষে অরূণীকে ওদের জন্য যে রুম সাজানো হয়েছে সে রুমে নিয়ে গেল। তাজা ফুল দিয়ে সাজানো ঘরটা। ফুলের গন্ধে চারদিকটা মউমউ করছে। অরূণী চোখ বন্ধ করে ফুলের ঘ্রাণ নিতে লাগলো। বিছানার মাঝখানে গুটিসুটি মেরে বসে রইলো। একটু পর রুদ্র আসলো। অরূণীর পাশে বসলো। বলল, “অরূণী একটা দারুণ খবর আছে।”
অরূণী চোখ তুলে তাকায়। আগ্রহী গলায় বলল, “কী?”
– “তোমার শ্বশুড় আলয়ের লোকজন তোমায় মেনে নিয়েছে। সকালে আপনি আপনার শ্বশুড়ের বাসায় যাচ্ছেন।”
– “মেনে নিয়েছে? সত্যি মেনে নিয়েছে?”
– “এমন ব্ল্যাক-মেইল করেছি মেনে না নিয়ে উপায় আছে? তাছাড়া আমি কানাডায় যাওয়ার পর থেকে আব্বা-আম্মা অনেক বদলে গিয়েছি।”
অরূণী খুশি হলো। কিন্তু খুব বেশি খুশি হতে পারলো না, “ও বাসায় গেলে নিম্মি আপার কথা আমার মনে পড়বে।”
রুদ্র একটা ক্ষীণ শ্বাস ফেলে বলল, “থাক, বাদ দেও না ওসব।”
অরূণীকে হাসাতে রুদ্র ফের বলল, “আমজাদ স্যার,কার্তিক মশাই, দারোয়ান কাকা, সেই চায়ের দোকানি সবাইকে দাওয়াত করা উচিত তাই না?”
অরূণী হেসে ফেললো সেই দিন গুলোর কথা ভেবে। হঠাৎ একটা খাম বের করলো বালিশের নিচ থেকে। রুদ্রর দিকে খামটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “নিন,আপনার সে ঐতিহাসিক টাকা। টাকা গুলো চাইলে জাদুঘরে সংরক্ষণ করতে পারেন। বিয়ে বসন্ত এসে গেছে যে।”
অরূণীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে রুদ্র। বলল, “এখন তোমার টাকা আর আমার টাকা একই তো কথা। তোমার কাছেই রাখো।”
দুইজনে আরেক দফা হাসলো।

রুদ্র অরূণীর হাতটা ধরে পকেট থেকে একটা গোল্ড রিং বের করে অরূণীর আঙুলে পরিয়ে দিয়ে গভীর আবেগে অরূণীর হাতে চুমু খেলো। অরূণীর সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠলো। রুদ্র অরূণীর কাঁপা কাঁপা ঠোঁট দুটোর দিকে নেশা ভরা চোখে তাকালো। অরূণীর চিবুক ধরে মুখটা উঁচু করে অরূণীর ত্তষ্ঠের সুধা পান করে। অরূণী শুধু কেঁপে কেঁপে ওঠছে। চোখে-মুখে নিদারূণ লজ্জার স্ফুলিঙ্গ ছড়াচ্ছে। রুদ্র অরূণীর কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে গভীর আবেগে বলল, “অরূণী ভালোবাসি।”
রুদ্রর উষ্ণ নিঃশ্বাস অরূণীর শরীরে বিঁধছে। সুখানুভূতিতে কাঁপছে অরূণীর শরীরের রন্ধ্র রন্ধ্র। অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন! চারদিকে তাজা ফুলের ঘ্রাণে মাতাল পরিবেশ। দুই জনের মনে ভালোবাসার তোলপাড়।

সকালে ওঠে ওরা রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। ঘুমে অরূণীর চোখ ঢুলুমুলু করছে। রুদ্র অরূণীর দিকে তাকিয়ে হাসছে। অরূণী দারুণ লজ্জায় মিইয়ে যাচ্ছে। রুদ্রর বাসার সবাই সাগ্রহে বউ বরণ করলো। বিয়ের আনন্দ বাসা জুড়ে। রুদ্র এতটা আশা করেনি। রুদ্রর মা একটু পর পর এসে অরূণীর কাছে বসছে, খোঁজ খবর নিচ্ছে।

মাস তিনেক পর সাহেদ আহমেদ বারান্দায় বসে আছে। মুখটা গম্ভীর তাঁর। একমাত্র মেয়েকে দেখছে না তিন মাস ধরে।মেয়ের প্রতি রাগ অভিমান সব ভুলে যাচ্ছে দিন দিন। সূর্য কে ডেকে বলল, “অরূণী ওর শ্বশুড় বাড়ি না-কি ঢাকায়?”
– “খোঁজ নিয়েছিলাম। এতদিন ঢাকায় ছিলো। কাল না-কি শ্বশুড় বাড়ি গিয়েছে।”
সেলিনা আহমেদ কাঁদছে। বোনের জন্য সূর্য মনও খারাপ হয় আজকাল। সাহেদ আহমেদ সব ভুলে বলল, “ রুদ্র তো ছেলে হিসেবে মন্দ না। সুপুরুষ বটে। ওদের কে বেড়াতে আসতে বল। অরূণীকে দেখছি না কত দিন হয়ে গেছে।”
সাহেদ আহমেদের চোখ ভিজে ওঠছে। চশমার মোটা কাঁচের আড়ালে ভেজা চোখ দু’টো কেউই দেখলো না।
(সমাপ্ত)
নিয়মিত গল্প পড়তে ভিজিট করুন গল্পের ঠিকানায়

2 COMMENTS

  1. Just assume… অনেক ভালো লেগেছে গল্পটা। এতো দিন অপেক্ষায় ছিলাম। পুরোটা পড়ে অনেক ভালো লাগলো।

  2. এই গল্প আমার লুকিয়ে রাখা স্মৃতি কে নতুন করে সজীব করে তুলেছে,,,,,,,,,,,, তা করা কি খুব দরকার ছিল!!! ঠিক এভাবেই আমার এক তরফা ভালোবাসার শুরু টা এইরকম ছিল। যদি ও আমার পাগলামি গুলো তার কাছে প্রকাশ হয় নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here