ভালোবাসার লুকোচুরি পর্ব -১১

#ভালোবাসার_লুকোচুরি
#লেখনী_আলো_ইসলাম

“১১”

–” রুহি রেগে চারিদিকে তাকিয়ে রোহানকে খুজতে থাকে। তখনই পেছন থেকে একজন বলে আমাকে খুঁজছিলে বুঝি রুহি সোনা। আচমকা এমন কথা শুনে পিছু ঘুরে রোহানকে দেখে চমকে উঠে রুহি। দু’পা পিছিয়ে গিয়ে রাগী লুকে বলে এই সব কি হচ্ছে ভাইয়া৷ কি শুরু করেছো তুমি। মানুষজন হাসছে সে খেয়াল আছে তোমার?
– রোহান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে কে কি ভাবলো না ভাবলো আমার তাতে কি? আমার তো একমাত্র লক্ষ্য আমার বউটার রাগ কমানো। বউ কথাটা শুনে রুহি আরো রেগে গিয়ে বলে একদম বউ বউ করবে না। আমি কারো বউ না৷ শুনো ভাইয়া এই সব করে কোনো লাভ নেই। তিলে তিলে যে শক্ত দেয়াল তুমি গড়ে দিয়েছো আমার মধ্যে তা এত সহজে ভাঙ্গার নয়। কথাটা বলতেই রুহির চোখে পানি চলে আসে কিন্তু সে পানি রোহানকে সে দেখাতে চাই না। তাই দ্রুত পায়ে চলে আসে সেখান থেকে। রোহানও মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে৷ এতখন পায়েল অনিতা অবাক হয়ে সব দেখছিলো দাঁড়িয়ে। এমন রোহানকে সত্যি যেনো তারা মানতে পারছে না।

– তারা নিজেদের সামলিয়ে রোহানের কাছে এসে বলে চিন্তা করবেন না ভাইয়া রুহি বড্ড অভিমানী সেটা তো জানেনই। তবে বেশি দিন থাকতে পারবে না। আসলে কষ্ট টা বেশি পেয়েছে তাই সব কিছু মানতে সময় লাগছে ওর।। তাছাড়া ও কিন্তু আপনাকে ভালোবাসে অনেক। পায়েলের কথায় রোহান মুখে এক চিলতে হাসি এনে বলে আমি সব জানি৷ এটাও জানি রুহির অভিমান কি করে ভাঙ্গতে হবে। ও যে ভেতর ভেতর অনেক কষ্ট পাচ্ছে এমন করে থাকতে।

– আমরা আপনার পাশে আছি ভাইয়া। যদি কোনো হেল্প লাগে তো বলবেন আমাদের। ওদের কথায় রোহান মুখে চওড়া একটা হাসি এনে বলে তোমাদের তো আমার লাগবেই । তবে পরে বলব কেনো লাগবে আর কি করতে হবে আপাতত আমি আসি ভালো থেকো বলে রোহানও চলে যায়।

— রুহি কলেজ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটছে। রোহানের উপর রাগ করে বেরিয়ে এসে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিছে সে৷ হেঁটেই যাচ্ছে রুহি এমন সময় একটা গাড়ি এসে থামে রুহির সামনে। হঠাৎ সামনে গাড়ি চলে আসায় ঘাবড়ে যায় রুহি। গাড়ির দিকে তাকিয়ে রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগে আসিফকে দেখে থেমে যায়। আসিফ গাড়ি থেকে নেমে রুহির সামনে এসে দাঁড়ায়। মুখে যেনো তার প্রাপ্তির হাসি ঝুলে। কিন্তু রুহি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে আসিফের দিকে।

— কেমন আছো রুহি। তোমাকে অনেক মিস করছি। তুমি আমার ফোন ধরো না কেনো? আমাকে কি তোমার একটু মনে পড়ে না?
– এক নিশ্বাসে বলে কথাটা গুলো আসিফ। আসিফের কথায় রুহি বিরক্ত নিয়ে বলে কে আপনি যে আপনার ফোন ধরতে হবে৷ আপনার কথা মনে করতে হবে। হু আর ইউ?

– রুহির এমন কথা শুনে আসিফ অবাক হয়ে বলে এই সব কি বলছো রুহি৷ তুমি কি আমার উপর রেগে আছো এখনো। প্লিজ রাগ করো না। আমি সেদিনের জন্য সরি। তোমার মতামত না নিয়ে এমন একটা কাজ করা আমার ঠিক হয়নি। প্লিজ আমাদের বন্ধুত্বটা তাই বলে শেষ করে দিও না। অসহায় ভাবে বলে আসিফ।

– রুহি মুচকি হেসে বলে বন্ধু কিসের বন্ধু। কোনো ঠক মিথ্যাবাদী অন্তত কারো বন্ধু হতে পারে না। আপনি আমাকে ঠকিয়েছেন। মিথ্যা বলেছেন সব কিছু আমাকে। আসলে ভাইয়ার সাথে খেলায় নেমেছিলেন আপনি যার গুটি হিসেবে আমাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। আমার ভাবতেও লজ্জা লাগছে এখন যে আমি আপনার মতো একটা মানুষকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম।

– রুহির কথার পরিবর্তে কি বলা যায় আসিফের জানা নেই। কারণ ঠিকই তো বলছে রুহি। রোহানকে হারানোর নেশায় তো রুহির কাছে আসা। কিন্তু সেটা যে সত্যি ভালোবাসায় পরিনত হয়ে যাবে ভাবেনি আসিফ।

– আমি মানছি আমি রোহানের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে ছিলাম তোমাকে তার মাধ্যমও করতে চেয়েছিলাম কিন্তু বিশ্বাস করো রুহি কখন যে তোমাকে সত্যি ভালোবেসে ফেলেছি বুঝিনি। আমি তোমাকে সত্যি মন থেকে ভালোবাসি। তাই তোমাকে বিয়ের করার প্রস্তাব নিয়ে তোমার বাড়ি যায়। কিন্তু আমি ভাবিনি তোমারও একটা মতামত থাকতে পারে৷ আমি সব কিছুর জন্য তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি রুহি। তুমি অন্তত আমাকে ভুল বুঝো না আর। আমি সত্যি অনেক কষ্টে আছি তোমাকে ছাড়া। তোমার বন্ধুত্বটা অন্তত আমার সাথে রাখতে চাই।

– দেখুন আসিফ আমি কারো বন্ধু না আর না হতে চাই। তাছাড়া রোহান ভাইয়া চাইনা আমি আপনার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখি। ওই মানুষটার চাওয়া পাওয়ার মুল্য আমার কাছে অনেক। কারণ আমি ভালোবাসি খুব ওই মানুষটাকে। প্লিজ আপনি আমাকে আর বিরক্ত করবেন না। আপনি ভালো থাকুন আর আমাকেও ভালো থাকতে দিন হাত জোড় করে বলে রুহি। তারপর চলে যায় সেখান থেকে। আসিফ পিছু ডেকেও শুনে না আর রুহি। একটা হতাশার নিশ্বাস ত্যাগ করে আসিফ চলে যায়।

— রাতে রুহি খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবার সাথে একটু গল্প করে নিজের ঘরে আসে। রোহান অনেক আগেই চলে এসেছিলো সবার মাঝ থেকে। রুহি ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। ঘরের মধ্যে অন্ধকার হয়ে আছে। রুহির যত দূর মনে আছে সে ঘরে আলো জ্বালিয়ে গিয়েছিলো তাহলে লাইট অফ করলো কে। রুহি ভাবনা চিন্তা ছেড়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে আলো জ্বালিয়ে পিছু ঘুরে রোহানকে শুয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠে। আচমকা রোহানকে এইভাবে ঘরে দেখে ভয় পেয়ে যায় রুহি।

– রুহি স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে রেগে বলে তুমি আমার ঘরে কি করছো ভাইয়া। বের হও বলছি। তোমার নিজের ঘর নেই আমার ঘরে এসে শুয়ে আছো। বের হও বলছি আমার অনেক ঘুম পাচ্ছে। সারাদিন অনেক জ্বালিয়েছো প্লিজ এখন একটু স্বস্তি দাও বলতে বলতে এগিয়ে আসে রোহানের দিকে।
– রোহান যেনো রুহির কোনো কথা কানেই নেয়নি এমন একটা ভাব। আগের ন্যায় নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। তাই দেখে রুহি দাঁতে দাঁত চেপে বলে কি হলো কথা শুনতে পাচ্ছো না বের হও বলছি বলে রোহানের হাত ধরে টানে। রোহান উল্টো রুহির হাত ধরে টেনে বুকের উপর ফেলে চেপে ধরে। রুহিকে ঘুরিয়ে রুহির গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়ে বলে বউ যেখানে আমিও সেখানে এটাই না হওয়ার কথা মিসেস শেখ। মিসেস শেখ কথাটার মধ্যে যেনো এক অন্যরকম শিহরণ আছে। কথাটা শুনা মাত্র রুহি কিছুখনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর ঘোর থেকে বেরিয়ে বলে এই সব কি করছো। কেউ দেখে ফেললে খুব বাজে হয়ে যাবে ব্যাপারটা প্লিজ তুমি আমার ঘর থেকে যাও ভাইয়া।

– কেউ আসবে না আপাতত এইদিকে। তাছাড়া দেখলো বা। আমরা তো আর অন্যায় কিছু করছি না। রোহানের মুখে এমন লাগামহীন কথা শুনে রুহি লজ্জায় কুঁকড়ে উঠে যেনো। তার উপর রোহান রুহির গলায় মুখ ডুবিয়ে রাখার ফলে রুহির অন্য রকম ফিল আসে। কেঁপে কেঁপে উঠে রুহি মাঝে মাঝে তাই দেখে রোহান রাগী কন্ঠে বলে একদম নড়াচড়া করবে না রুহি সোনা। আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে৷ আমি একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই। সো একদম চুপচাপ ভালো মেয়ের মতো শুয়ে থাকো ওকে বলে রুহির গালে একটা ভালোবাসার পরশ একে দেয় রোহান। এতে রুহির নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। তাই দেখে রোহান মুচকি হেসে আবার রুহির গলায় মুখ ডুবিয়ে শুয়ে পড়ে।
– একটু পর রুহি বুঝতে পারে রোহান ঘুমিয়ে পড়েছে। রুহি রোহানের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি আসে। রোহানের চুল গুলোয় হাত দিয়ে নাড়িয়ে বলে এতো যখন ভালোবাসো আগে বলোনি কেনো। তাহলে তো তোমার জন্য আমার এখন অভিমান না ভালোবাসাটায় প্রকাশ পেতো। ভুল করেছো তার শাস্তি তো তোমাকেই পেতেই হবে শেখ রোহান। রুহি এবার রোহানের থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে কিন্তু রোহাম ঘুমন্ত অবস্থায় ও রুহিকে শক্ত করে চেপে ধরে আছে তাই রুহি আর চেষ্টা করে না রোহানের থেকে ছাড়া পাওয়ার। রোহানের সাথে সেও ঘুমিয়ে যায়।

–” পরের দিন কলেজে বসে আছে রুহিরা। পায়েল অনিতা অনেকখন ধরে উসখুস করছে রুহিকে কিছু একটা বলার জন্য। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারছে।তাই দেখে রুহি ভ্রু কুচকে বলে ব্যাপার কিরে তোদের। এমন অস্থির দেখাচ্ছে কেনো তোদের। কোনো সমস্যা?

– রুহির কথায় অনিতা মুখে জোরপূর্বক হাসি এনে বলে আসলে রুহি একটা কথা বলার ছিলো জানিনা কেমন ভাবে নিবি বিষয়টা তুই তাই একটু চিন্তা হচ্ছিলো আর কি।
– এত ভণিতা ছেড়ে কি কথা বলে ফেল।
– আমরা অনেক দিন কোথাও ঘুরতে যায় নাই। তাই ভাবছিলাম আজ যদি আমরা একটু বের হতাম তাহলে তোর মনটা ফ্রেস হতো আর আমাদের ও ভালো লাগতো।

-পায়েলের কথায় রুহি একটু ভাবান্তর হয়ে বলে এটা বলার জন্য এত কিছু। সে তো বলে দিলেই হয়। ঘুরতে যাওয়া নিয়ে আমি আবার না করি কবে।।তাহলে চল হয়ে যাক আজ হাসি মুখে বলে রুহি। রুহির কথায় পায়েল অনিতা দুজনেই স্বস্তি পায়। তারাও হাসি মুখে বলে তাহলে চল বের হয়।

– কিন্তু যাবো কোথায় আমরা? রুহি বলে।
– সে তোকে ভাবতে হবে না জায়গা আমাদের ঠিক করাই আছে তুই গেলে দেখতে পাবি আর সারপ্রাইজও হবি চল চল। পায়েলের কথায় আর কান দেয় না রুহি তিনজন বেরিয়ে পড়ে।

— একটা বাগান বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামে ওদের। সবাই গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক দেখতে থাকে। রুহি সামনে থাকাতে দেখে অনেক ফুলের গাছ সারি সারি হয়ে। তাই দেখে রুহি উত্তেজিত কন্ঠে বলে কত ফুল দেখ। জায়গাটা তো সেই সুন্দর রে। থাংকু ইয়ার এত সুন্দর জায়গায় নিয়ে আসার জন্য। রুহির কথায় ওরা শুধু মুচকি হাসে।
– আচ্ছা ভেতরে চল বলে অনিতা সামনে এগিয়ে যায় তারপর পায়েল পেছনে রুহি।

– গেটের সামনে আসতেই অনিতা পায়েল থেমে যায় তাই দেখে রুহি ভ্রু কুচকে বলে কি হলো থেমে গেলি যে? অনিতা হাত ইশারা করে সামনে দেখায় রুহিকে।।রুহি সামনে তাকিয়ে দেখে পুরো রাস্তায় ফুলের পাপড়ি ছড়ানো। তার মাঝে সুন্দর করে লেখা সরি রুহি সোনা। আরেক জায়গা লেখা আছে আই লাভ ইউ রুহি। প্লিজ এক্সেপ্ট মাই সরি নানা রকম লেখা দ্বারা সজ্জিত। এই সব দেখে রুহির বুঝতে বাকি নেই এটা কার কাজ। রুহি রাগী চোখে পায়েল অনিতার দিকে তাকায় তাতে ও দুজন মাথা নিচু করে ফেলে।

– ওরা দুজন রোহানের কথা মতোই রুহিকে এখানে নিয়ে আসে। রোহান এইসব এরেঞ্জ করে রুহির জন্য। আজ রুহির অভিমান ভেঙে ভালবাসা প্রকাশ করিয়ে ছাড়বে রোহান যার জন্য এত আয়োজন করা তার।

– তোরা আমার ফ্রেন্ড হয়ে এমন করতে পারলি আমার সাথে। রোহান ভাইয়ার সাথে তোরাও সাথ দিয়েছিস।

– সরি রুহি। আসলে রোহান ভাইয়া এমন ভাবে বলল আমাদের আমরা আর না করতে পারিনি। তাছাড়া ভাইয়া তোকে সত্যি অনেক ভালোবাসে রে রুহি তাহলে তুই কেন সব ভুলে মেনে নিচ্ছিস না।

– তোদের থেকে আর একটা কথাও শুনতে চাই না আমি। কাউকে লাগবে না আমার পাশে থাক তোরা আমি চলে যাচ্ছি বলে রুহি উল্টো ঘুরে চলে আসার জন্য তখনই উপরে থেকে রোহান চিৎকার করে বলে তুমি যদি এখান থেকে চলে যাও তাহলে কিন্তু আমি লাফ দেবো এখান থেকে রুহি সোনা। আর রোহান শেখ যা বলে তাই করে এটা নিশ্চয় জানো তুমি। রোহানের এমন কথায় থেমে যায় রুহি পিছু ঘুরে তাকিয়ে দেখে রোহান দুই তালার উপর দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখে ভয়ের ছাপ দেখা যায় রুহির।

– রুহি তুই চলে যাস না প্লিজ। তাহলে রোহান ভাইয়া সত্যি সত্যি লাফ দিবে ওইখানে থেকে। তুই খুব ভালো করে জানিস রোহান ভাইয়া এক কথার মানুষ। যদি ভাইয়া সত্যি এমন একটা কাজ করে আর কিছু হয়ে যায় তাহলে কি তুই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবি। অনিতার কথায় রুহি একবার রোহানের দিকে আরেকবার অনিতার দিকে তাকায়। কি করবে সে বুঝে আসে না।

– রুহি এবার সামনে এগিয়ে যায় ফুলের উপর দিয়ে।তাই দেখে পায়েল অনিতা প্রাপ্তির হাসি দেয় রোহানের মুখেও হাসি আসে।

– চলবে….

( ❌কপি করা নিষেধ ❌ভুলক্রুটি ক্ষমার সাপেক্ষে বিবেচনা করবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here