অদ্ভুত প্রণয়নামা পর্ব -১৯+২০

#অদ্ভুত_প্রণয়নামা
#পর্ব_১৯
#তাশরিন_মোহেরা

অচেনা নাম্বার থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজটা দেখে মুখে থাকা পায়েশ আর গি’ল’তে পারলাম না আমি। পায়েশের দিকে তাকিয়ে ভাবছি। কিন্তু আশ্চর্য! আমি কিছুই ভাবতে পারছি না। ভাবনারা সব নীড় হারিয়েছে যেন! মস্তিষ্ক শুধু এক দৃশ্যই দেখিয়ে যাচ্ছে আমায়,

‘নিজের বাবাকে নিজেই মা’র’লে, মুখর।’

গলায় দলা পেকে কি যেন বিঁধছে। পানি পান করা দরকার। গ্লাসে পানি ঢালতে গিয়ে দেখি আমার হাত অবশ হয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছে। তখনি দেখলাম মুখর সাহেব সামনে এসে গ্লাসে পানি ঢেলে দিতে দিতে বললো,

‘আপনি খা’ন কি বলুন তো, মিস.তিথিয়া? জগটাও ঠিক মতো তুলতে পারছেন না! আহারে!’

মুচকি হাসলো ছেলেটা। আমি হা করে তার মুখপানে চেয়ে আছি। তার কথাটুকু আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করলেও আমি কিছু বলতে পারলাম না। হাতের সাথে সাথে আমার ঠোঁটটাও অবশ হয়ে গেছে। না না, আমার পুরো শরীরটাই অবশ হয়ে গেছে!

হাসতে থাকা ছেলেটার দিকে অপলক চেয়ে আছি। মুখর ছেলেটাকে প্রথম দিন এমনটা দেখিনি আমি। প্রথম দিকে সে ছিল ভারী চুপচাপ এবং গম্ভীরমুখো! যে কিনা তার অনুভূতিদের ঠিক করে বুঝতে জানতো না, প্রকাশ করতে জানতো না। তবে এখন? সে আগের চাইতে সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি জানি না এর কারণটা কি? তবে আমি ইদানীং তাকে দেখে বেশ অবাক হয়েছি ক্ষণে ক্ষণে! ছেলেটা তার গাম্ভীর্যের মুখোশ খুলে ধীরে ধীরে প্রাণবন্ত হতে শিখেছে। শিখেছে তার ভেতরকার অনুভূতিদের প্রকাশ করতে! কিন্তু এর মাঝে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছে মেসেজটি।
এখনের এই হাস্যোজ্জ্বল ছেলেটা কি করে তার বাবাকে খু’ন করতে পারে? কস্মিনকালেও কি এসব সম্ভব? অন্য কারো পক্ষে সম্ভব হলেও তা মুখরের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। এটুকু অন্তত আমি বিশ্বাস করি না! হ্যাঁ, আমি এ মেসেজের একটা অক্ষরও বিশ্বাস করি না। তবে কেন আমি এতো ঘাবড়ে যাচ্ছি? কেন আমার মস্তিষ্ক বারবার আমায় শুধু মিথ্যে মেসেজটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে? মুখরের অনেক গূঢ় সত্য এখনো আমি জানি না। আমার জানার কোনো অধিকারও নেই। এ কারণেই হয়তো মেসেজটা ভুল করে দেখে আমার ঘাবড়ানোটা বেড়ে গেছে।

‘ম্যাম, চলুন! আমি রেডি।’

মুগ্ধের কথায় আমার ধ্যানভঙ্গ হয়। আমি চমকে তাকাই। দেখি মুখর-মুগ্ধ দুজনেই আমার দিকে তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে। আমি জোরপূর্বক হেসে বললাম,

‘চলো!’

মুখর এগিয়ে এসে বললো,

‘আপনি ঠিক আছেন, মিস.তিথিয়া? আপনাকে দেখে ভীষণ ভীত লাগছে। আর এভাবে ঘামছেন কেন? কিছু হয়েছে?’

আমি তার কথায় কিছুক্ষণ চুপ থাকি। আমাকে চুপ থাকতে দেখে সে আবারো বললো,

‘মিস.তিথিয়া?’

আমি তার দিকে ফিরে বলি,

‘জ্বি? কিছু বলেছেন?’

সে আমাকে বললো,

‘আপনার কি খারাপ লাগছে? ফ্যানের নিচেও এভাবে ঘামছেন যে?’

আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম,

‘নাহ! কিছু হয়নি। চলো, মুগ্ধ!’

আমি মুখরের দিকে ফিরে দেখলাম না আর। কেননা তার দিকে তাকাতে গেলেই আমার বারবার সেই ভয়ংকর মেসেজটা চোখে ভেসে উঠছে। কয়েকবার ঢোক গিললাম আমি। আচ্ছা? মেসেজটা মুখর সাহেব দেখলে তার মুখভঙ্গি ঠিক কেমন হবে? সে যদি তার বাবাকে না মে”রে থাকে তবে বেশ অবাক আর ভীত হবে। আর যদি মে’রে’ই থাকে…
ছিঃ আমি এসব কি ভাবছি? মুখর এমনটা করতে পারে না, অবশ্যই না! এটুকু আমার মনের বিভ্রাট! মনকে ভীষণ ধিক্কার জানালাম আমি। এই মনটাই বারবার মুখরের প্রেমে পড়েছে আর এখন তাকেই সন্দেহ করছে!

চোখ আমার এবার মুগ্ধের কাছে গেল। এমন ফুটফুটে একটা ভাই রেখে সে কখনোই কাউকে মা’র’বে না। মুগ্ধের দিকে চেয়েই মুখর তার সব দুঃখ দুর্দশা ভুলেছে। এমন একটা ঘৃণ্য কাজ সে করতে পারে না!

.

আজ ক’দিন হলো আমি মুখরের চোখে চোখে তাকাতে পারিনি। তার সাথে চোখাচোখি হলেই আমি আঁতকে উঠি, সে আমার পাশে এলেই আমি আঁতকে উঠি। এমনকি সে আমায় কিছু বলতে এলেও আমি আঁতকে তাকে এড়িয়ে যাই। মুখর এতে বড্ড দুঃখ পায়। আমি তা আড়ালে খেয়াল করি। তবে আমি ঠিক বুঝছি না কেন আমার এই পরিবর্তন! আমি তো মনে মনে বিশ্বাস রাখছিই যে মুখর তার বাবাকে মা’র’তে পারে না। হাজার চেষ্টা করছি তার মুখোমুখি হয়ে ঠিক আগের মতোই কথা বলতে! কিন্তু সে সামনে এলেই এক অজানা ভয় কাজ করে মনে। মস্তিষ্ক বারবার সাড়া দেয়, ‘তাকে এড়িয়ে যা, তিথিয়া!’

আজও ঠিক এভাবেই এড়িয়ে বেরিয়ে পড়ছিলাম। তখন দেখি ওড়নাতে হালকা টান পড়ে। পেছন ফিরে দেখি মুখর আমার ওড়না আকড়ে ধরেছে হালকা। করুণ চোখে বলে উঠলো,

‘আমি কি কিছু করেছি, মিস.তিথিয়া?’

আমি বুঝেও না বোঝার ভান করে চোখ সরিয়ে বললাম,

‘ক-কেন?’

বুকটা উচ্চগতিতে লাফাচ্ছে আমার। আমি বিন্দুমাত্র ভাবিনি ছেলেটা আমায় এভাবে আটকে ফেলবে। সুরটা কোমল রেখেই সে বললো,

‘আমি কি আপনাকে কোনোভাবে রাগিয়েছি? কিংবা এমন অসঙ্গত কিছু বলেছি?’

আমি এবারও না বোঝার ভান করলাম। তার দিকে না ফিরে বললাম,

‘না!’

‘তবে কেন আপনি আমায় এড়িয়ে চলছেন? আমি আজ আপনার জন্য পায়েশ রেঁধেছিলাম আবারো। কিন্তু আপনি কথা বলছেন না দেখে দিতে পারলাম না।’

আমি অপ্রস্তুত হেসে বললাম,

‘ঠিক আছে, তবে পরে একসময় রেঁধে খাওয়াবেন। আজ আসি! মুগ্ধের দেরি হচ্ছে!’

আমি এখনো তাকে একপ্রকার এড়িয়ে আসতে চেয়েছিলাম। একটা অযুহাত দিয়ে পুনরায় চলে যেতে নিলে দরজা আটকে দাঁড়ায় মুখর। আমার দিকে ফিরে বলে,

‘তাহলে আমার চোখে তাকিয়ে বলুন আপনি কোনো কারণে আমার উপর রেগে নেই!’

আমার হৃদপিণ্ড এবার বোধহয় বেরিয়েই পড়বে। কি করছেটা কি এই ছেলে? তার চোখে তাকিয়ে রেগে নেই বলার জন্য এতো কাছে এসে দাঁড়িয়েছে সে? এতোটা অসতর্ক হওয়ার কোনো মানে আছে? এই অবস্থায় যদি মুগ্ধ আমাদের দেখে ফেলে?
কিন্তু ছেলেটার শরীর থেকে কেমন একটা মোহনীয় ঘ্রাণ পাচ্ছি আমি। এখনি তার বুকে ঝাপিয়ে পড়তে মন চাইছে আমার।
‘তিথিয়া, তুই দিনদিন একটু বেশিই বে’হা’য়া হয়ে যাচ্ছিস?’ মনে মনে বিড়বিড় করলাম। তার চোখের দিকে তাকাতেই আবারো মোহাবিষ্ট হয়ে পড়লাম। আমি তাকাতেই ছেলেটা হাসলো। ইশ! তীরের মতো কি যেন বিঁধলো বুকে? মুখর সাহেব, এভাবে হাসবেন না, দয়া করে।’

হঠাৎ মুগ্ধের আওয়াজ শোনা গেল। এখনি এসে গেল যে! এই ভয়ে তড়িৎ সরে যেতে নিলাম। কিন্তু এতে আমার মাথাটা মুখরের ঠোঁটে বেশ জোরেই আঘাত করলো। সে বেশ শব্দ করে উঠলো। পেছন ফিরে দেখি মুখর তার নাকে হাত দিয়ে কুঁকড়ে আছে। আর তার নাক দিয়ে অঝোরে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সাথে সাথেই মুখে হাত দিয়ে ফেলি আমি! আবারও? আবারও আঘাত করে বসলাম ছেলেটাকে! ধ্যা’ৎ! আমি জিভ কেটে তার দিকে ফিরে কান মলে বললাম,

‘সরি, এবারের জন্য ক্ষমা করুন।’

দ্রুতপায়ে বেরিয়ে এলাম। না জানি এই আঘাতের জন্য কাল কি জরিমানা দেয় ছেলেটা! তবে বড্ড খারাপ লাগলো মুখরের জন্য আমার। নিজের মাথায় নিজেই চাপড় মারলাম। এতো বেখেয়ালি আমি না হলেও পারি! ছোটকাল থেকেই অযথা আহত হওয়া, অন্যকে আহত করা আমার নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে উঠেছে। এই অভ্যাস আমি চাইলেও ত্যাগ করতে পারছি না!

যাক! এতোকিছুর পরও আবার সহজ হতে পেরেছি মুখরের সাথে। কি এক মিথ্যা মেসেজ আমায় তার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে! আমি নিজেও এতে ভারী কষ্ট পেয়েছি! আর মুখরকেও বেশ অস্থির মনে হলো। আমার সাথে কথা বলতে না পেরে ছেলেটা কষ্ট পেয়েছে? পেয়েছেই তো! তার সারা মুখ জুড়েই তো এই কষ্ট দৃশ্যমান। কিন্তু কেন সে কষ্ট পেল? আমি তো তাকে ভালোবেসেছি বলে তার সাথে নিজের দূরত্বটা মানতে পারিনি। তবে…

‘ডোন্ট টেল মি….’

মুখরও আমার প্রেমে পড়ে গেল না তো? না না, এটা কি করে সম্ভব?

‘অসম্ভব হওয়ারও তো কিছু না।’

আমার মন আমায় বললো। সেকি? মুখর? সেই গম্ভীর, শক্ত চাহনির ছেলেটা আমার প্রেমে পড়েছে? বারবার পানি ছুঁড়ে মারা ছেলেটা আমায় ভালোবেসেছে?
আমার বুকটা এমন দ্রিমদ্রিম গতিতে বাজছে কেন? মাথাটাও কেমন ঘুরছে! মুখটাও তো গরম হয়ে উঠছে ক্রমে। সেকি!

হঠাৎ কানে একটা গু’লি’র শব্দ প্রবেশ করলো জোরে। আমি থমকালাম। গু’লি’র শব্দে পাশ থেকে কে যেন ‘আহ!’ বলে চিৎকার করে উঠলো। পাশে তাকাতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না আর। জোরে চিৎকার করে ডেকে উঠি,

‘মুগ্ধ!!’

(চলবে)#অদ্ভুত_প্রণয়নামা
#পর্ব_২০
#তাশরিন_মোহেরা

মুগ্ধের নিচের দিকটা রক্তে ভিজে গেছে। তার পায়ে গুলি লেগেছে। সে পা টা ধরেই আর্তনাদ করে চলছে। আমি তার এই অবস্থায় আঁতকে উঠি। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখি গুলিটা আসলে কোথা থেকে এসেছে। কিন্তু আশেপাশে সন্দেহজনক কাউকে দেখা গেল না। মানুষগুলো আমাদের দিকেই চেয়ে আছে। মুগ্ধ আমার হাত খামচে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

‘ম্যাম, আমি ব্যাথা পাচ্ছি। খুব!’

আমার মস্তিষ্ক হঠাৎ অচল হয়ে যায়। এইটুকুন একটা বাচ্চাকে গুলি করার সাহস কে পায়? এদের কি বিবেক নেই? চারদিকে মানুষজন জড়ো হওয়া শুরু করেছে। কিন্তু এগিয়ে এসে ছেলেটাকে কেউ তুললো না। রক্তে ভেজা ছেলেটাকে নিয়ে আমি কি করবো বুঝে উঠছি না। পুরো শরীর অসম্ভব রকমের কাঁপছে আমার। এর মধ্যে দেখলাম মুগ্ধ কাঁদতে কাঁদতেই বেহুশ হয়ে পড়ছে। আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম,

‘দয়া করে কেউ সাহায্য করুন। বাচ্চাটার গুলি লেগেছে, এখনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। দয়া করুন! কেউ তো একটু সাহায্য করুন।’

আমি অঝোরে কেঁদে দিলাম। মুগ্ধের এমন অবস্থা আমার কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না। বুকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে ভীষণভাবে। একটা মধ্যবয়সী লোক এসে মুগ্ধকে পাজাকোলে তুলে নিলো। মুগ্ধ হুশ হারিয়েছে কিন্তু এর মাঝেও ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো। আমি মুখে হিজাব চেপে কান্নাদের কোনোমতে আটকে রাখলাম। লোকটা একটা গাড়িতে আমাদের তুলে দিলো। পাশের একটা মেডিকেলে আসতেই আমি তড়িৎ নেমে পড়লাম। ড্রাইভারটাকে অনুরোধ করে বললাম,

‘বাচ্চাটাকে একটু ভেতরে নিয়ে আসুন, প্লিজ!’

ড্রাইভারটা বিরক্ত হয়ে আমায় বললো,

‘এর জইন্য ভাড়া বাড়াই দেওন লাগবো।’

আমি আর্তনাদ করে বলে উঠলাম,

‘এমনটা করবেন না, প্লিজ। আমার কাছে খুব বেশি টাকা নেই। আর বাচ্চাটাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’

‘তো আমি কি করুম, আপা? গাড়িত উঠছেন অহন টেকা দিতে না করতাছেন। পোলাটারে ভিত্রে নিয়া যাইতেই তো মেলা কাম!’

আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম,

‘আচ্ছা আমি একটু পরেই আপনাকে টাকা পরিশোধ করে দেবো। ছেলেটাকে আগে ভেতরে নিয়ে আসুন, জলদি। এমন নির্দয় হবেন না।’

এতে ড্রাইভারটার মন কিছুটা হলেও গললো বোধহয়। সে মুগ্ধকে কোলে করে ভেতরে নিয়ে এলো। আমি তড়িৎ মুখরকে ফোন দিয়ে বলি,

‘মুগ্ধের পায়ে গুলি লেগেছে। জলদি কাছের হাসপাতালটায় চলে আসুন।’

.

হাসপাতালের বেডে অচেতন হয়ে শুয়ে আছে মুগ্ধ। পায়ে বেন্ডেজ করে দেওয়া হয়েছে তার। বেশি রক্তক্ষরণ না হওয়ায় অবস্থা কিছুটা ভালো তার। এবার মুগ্ধের জ্ঞান ফেরার পালা। মুখর কেবিনের সামনে গম্ভীরমুখে পায়চারি করছে। সে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছে এই কয় ঘণ্টায়। সে এবার ধপ করে বসে পড়লো চেয়ারে। দু’হাতে মাথা চেপে বসে আছে সে। আমি এ মুহুর্তে কি বলবো, কি করবো বুঝতে পারছি না। ছেলেটাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও আমার নেই। বেশ একটা কঠিন সময় পার করছে মুখর। তাকে কিছু বলতে গিয়েও অনেকবার ভাবতে হবে আমার। আমি চুপচাপ তার পাশে গিয়ে বসলাম।

মিনিট খানেক নিরবতার পর মুখর মুখ খুললো। ক্ষীণ স্বরে বললো,

‘আমি ভাই হিসেবে ব্যর্থ, মিস.তিথিয়া! এই একা শহরে মুগ্ধকে আমি একা ছেড়ে দিয়েছি।’

কথা বলতে গিয়ে মুখরের গলা কাঁপছে। কিছু বলতে গিয়েও যেন সবটা তার গলায় বিঁধছে। তার প্রত্যুত্তরে আমি কিছু বলতে পারলাম না। কেমন রাগ লাগছে নিজের উপর! আমার ভরসায় ছেলেটাকে ছেড়েছিলো মুখর। অথচ তার নিরাপত্তা দিতে গিয়ে আমি নিজেই ব্যর্থ!

মুখর আবারো বলে উঠে,

‘একটা বিশাল সাপ আমার পেছনে পড়ে আছে। ক্রমেই গিলছে আমার পুরো পরিবারকে। তাদের রক্ষা করতে গিয়ে আমি ব্যর্থ! ব্যর্থ এক পথহারা পথিক আমি!’

মুখরের কথার কিছুই আমি বুঝলাম না। শুধু অপলক চেয়ে আছি ভেঙে পড়া একজন শক্ত খোলসে মোড়া মানুষকে। হঠাৎ সেখানে হনহনিয়ে আসে একটি ছোটখাটো গোছের মহিলা। তার দৃষ্টি এলোমেলো। মুখরকে দেখতেই তার দিকে তেড়ে আসেন তিনি। মুখর মহিলাকে দেখেই তড়িৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। মহিলাটা মুখরের বুকের উপর আঁচড়ে পড়ে বলে উঠে,

‘মুখর, আব্বা আমার! আমার ছেলে কোথায়? আমার মুগ্ধ কোথায়? আমি দেখতে চাই!’

মুখর মহিলাকে জোরে জড়িয়ে বলে,

‘মা, তুমি এসেছো? মুগ্ধ ঘুমাচ্ছে ভেতরে, মা। আমাদের চিন্তায় ফেলে ডেভিলটা কি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে দেখো!’

দুজনের কথায় বুঝলাম মহিলাটা মুখর-মুগ্ধের মা। মুখরের মা মুখরকে ধরেই হু হু করে কেঁদে উঠলো। আমারও বুক ভেঙে কান্না এলো। কিছু সময় দুজনেই নিঃশব্দে অশ্রুপাত করলো। মুখরের মা এবার কেবিন থেকে মুগ্ধকে দেখে এলো।
কিছুক্ষণ পর তিনি এসে মুখরের পাশে চেয়ারে বসলেন। চোয়াল শক্ত করে বললেন,

‘কাজটা কে করেছে তুই ধরতে পেরেছিস তো, আব্বা?’

ক্ষণেই মুখরের ভ্রু জোড়াও কুঁচকে এলো। নিঃশব্দে কিছু একটা ভাবলো সে। পরমুহূর্তেই উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। তার মায়ের দিকে ফিরে বললো,

‘এর একটা সুরাহা না করলে হয় না, মা। আমি আসছি!’

মুখরের মা তখনি পথ আটকে বলে,

‘এখন যাসনে, আব্বা! ওরা আমার মুগ্ধের পায়ে গুলি করেছে। এখন তোর কিছু হয়ে গেলে আমি তা সহ্য করতে পারবো না রে, মুখর!’

মুখর তার মায়ের হাত সরিয়ে বলে উঠে,

‘আমার কিছু হবে না, মা। আমি ফিরে আসবো!’

এই বলে এদিক সেদিক না দেখেই মুখর
হাসপাতাল ছাড়ে। পুরো দৃশ্যটা দেখেও আমি তাকে আটকানোর সাহস পাইনি। আমি জানি না মুখর কোথায়, কেন যাচ্ছে! তবে আমার বুঝতে বাকি নেই মুখর নিরাপদ কোথাও অবশ্যই যাচ্ছে না! নির্বাক হয়ে তাকে দেখছি আমি। ছেলেটার চোখটা ক্রমেই লালবর্ণ ধারণ করেছে। এই দৃষ্টিতে বেশিক্ষণ চোখ রাখা দায়, যেন এতেই জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যাবে সবটা!
আমি মনমাঝে বললাম,

‘মুখর সাহেব, যেখানেই গিয়ে থাকুন, সুস্থভাবে ফিরে আসুন। আপনার আম্মা আর ভাইয়ের জন্য হলেও আপনাকে শত বিপদের মুখ থেকে ফিরে আসতে হবে!’

(চলবে)

(আগামীকাল রহস্যের গিঁট খুলবে একেক করে, ইনশাআল্লাহ!)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here