অনুভূতি,পর্ব-২৬+২৭

অনুভূতি
পর্ব ২৬
মিশু মনি
.
৩৯.
আট টার দিকে হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়লো ওরা।
বাইরে এসে রেস্টুরেন্ট এ নাস্তা করে প্রথমেই গেলো হযরত শাহজালাল (রহ:) এর মাজারে। ভেতরে ঢুকে মিশুকে নিচে দাড় করিয়ে রেখে ওরা উপরে মাজার দেখতে চলে গেলো। মাজারে মহিলাদের ঢোকা নিষেধ। মিশু নিচে ঘুরেঘুরে কবুতর, পুকুর, নামাজের জায়গা, আর নিচে শুয়ে থাকা লোকজন দের দেখছিলো। একজন গার্ড টাইপের কেউ এসে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে লাঠি দিয়ে মেরে ঘুমিয়ে থাকা লোকজন দের তুলে দিচ্ছে।
মেঘালয় পিছনে দাঁড়িয়ে বললো, “ম্যাম।”
মিশু পিছন ফিরতেই মেঘালয় হাসলো। বললো, “আসুন।”
বাইরে বের হয়ে রাস্তার দুপাশে অনেক দোকান দেখতে পেলো মিশু। একটা দোকান থেকে মেঘালয় হালুয়া কিনে দিলো ওর হাতে। দুপাশের দোকান গুলো দেখতে দেখতে মিশু হালুয়া খাচ্ছিলো আর রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলো। গাড়িতে উঠে মিশু সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসার জন্য অনুনয় করতে লাগলো। মেঘালয় ওকে বসিয়ে দিয়ে নিজেই ড্রাইভ করতে লাগল। একমাত্র মেঘালয় ই এদিকের রাস্তা চেনে। বাকিরা চেনেনা।
মিশু জিজ্ঞেস করলো, “এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
– “রাতারগুল।”
– “রাতারগুল আবার কি? কি আছে সেখানে?”
– “রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট।”
– “সোয়াম্প ফরেস্ট আবার কি?”
– “বাংলাদেশে দুটো বিখ্যাত বন আছে শোনোনি? ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট আর সোয়াম্প ফরেস্ট?”
মিশু লাফিয়ে উঠে বললো, “ওহ বুঝতে পেরেছি। আমরা এখন সেখানে যাচ্ছি? খুব মজা হবে।”
– “হুম, অনেক মজা হবে।”
মিশু একটু কি যেন ভেবে বললো, “আচ্ছা শুনেছি ওই ফরেস্ট টা পুরোটাই জলের উপর? আমরা যখন ভেতরে ঢুকবো আমার পায়জামা ভিজে যাবে না?”
সবাই হেসে ফেললো মিশুর কথা শুনে। একদম বাচ্চাদের মতন কথাবার্তা। মেঘালয় হেসে জবাব দিলো, “আমরা তো পায়ে হাঁটবো না রে পাগলী। আমরা নৌকায় পুরো বনটা ঘুরবো।”
– “ইস! কত্ত মজা হবে তাহলে।”
ওর এমন শিশুসুলভ কথাবার্তা শুনে বাকিরা হাসছিলো। মজা লাগছে শুনতে। পূর্ব বললো, “ভাবি ওখানে কিন্তু গাছে সাপ ঝুলে ঝুলে থাকে। আমরা যখন নৌকা নিয়ে জংগলের ভেতর ঢুকবো, টুপ করেই একটা সাপ আপনার কোলের উপর পড়বে।”
মিশু অবাক হয়ে মেঘালয়কে জিজ্ঞেস করলো, “সত্যি! তাহলে তো আরো মজা হবে। আমি সাপ কোলে নিয়ে বসে থাকবো আর তুমি সায়ান ভাইয়ার ক্যামেরা দিয়ে আমার একটা ছবি তুলে দিবা আচ্ছা?”
সবাই আবারো হেসে উঠলো। পূর্ব ভেবেছিলো সাপের কথা বললে মিশু হয়ত আঁৎকে উঠবে। কিন্তু মিশুর আরো মজা লাগছে সেটা শুনে। সত্যিই মেয়েটা এখনো বড্ড ইনোসেন্ট।
মেঘালয় একটা বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাড় করালো। বাড়িটা বাইরে থেকে দেখতে বেশ সুন্দর। মিশু একবার জানালা দিয়ে মাথা বের করে সেদিকে তাকালো। তারপর মেঘালয় কে জিজ্ঞেস করলো, “আমরা এই বাড়ির ভেতর দিয়ে জংগলে ঢুকবো?”
মেঘালয় হাসতে হাসতে বললো, “না রে পাগলী। বাড়ির ভেতর দিয়ে কখনো জংগলে ঢোকা যায় বুঝি? তোমার কি মনেহয় এর ভেতরে নদী আর বন আছে?”
মিশু লজ্জা পেয়ে গেলো। সত্যিই তো! বাড়ির ভেতরে কিভাবে বন থাকতে পারে। কি যে বোকার মত প্রশ্ন করে সে! নিজেই নিজেকে বলতে লাগলো। মেঘালয় একজনকে কল দিয়ে কথা বললো। তারপর মিশুকে বললো, “এটা নায়ক সালমান শাহ এর বাড়ি।”
– “কোন সালমান শাহ?”
– “বাংলাদেশে একজন ই জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ ছিলেন।”
– “তুমি আমার এমন ই একজন, যারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবে না এ মন,সেই সালমান শাহ?”
– “হ্যা, সেই সালমান।”
মিশুর চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেলো। আর ওকে দেখে বাকি চারজন হেসেই খুন। বেশি আনন্দে মেয়েটা একেবারেই ছোট বাচ্চাদের মতন হয়ে যায়। কি বলে না বলে কোনো বোধ থাকেনা। মেঘালয় গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বের হলো। বাকিরাও নেমে দাঁড়ালো।
একজন লোক এসে মেঘালয়ের সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন, “আরে মেঘালয় যে! অনেক দিন পর।”
– “ফ্রেন্ডস দের নিয়ে ঘুরতে চলে এলাম। কেমন আছেন?”
লোকটি হাসিমুখে কথা বলতে লাগলেন। উনি বোধহয় শুধু পূর্বকেই চেনেন। পূর্ব’র দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছো?
ওরা বেশিক্ষণ দেড়ি করলো না। এমনিতেই বেলা দশটা বেজে গেছে। রাতারগুল পৌছাতে দুপুর প্রায় হয়েই যাবে। বিকেলে আবার চা বাগানে মিটিং আছে। তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট দিতে হলো। মিশু অবাক হয়ে সবকিছু দেখছে আর মুগ্ধ হচ্ছে। গাড়ি থেকে চা বাগান দেখতে পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে। মেঘালয়ের হাত চেপে ধরে বললো, “এত্ত সুন্দর কেন!”
মেঘালয়ের খুবই ভালো লাগছে মিশুকে দেখে। যে মানুষ টার মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা নেই, প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে যে অভিভূত হয়না, তাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে গিয়ে আনন্দ নেই। মিশুর উচ্ছ্বসিত মুখ, আনন্দে বারবার লাফিয়ে উঠা, উত্তেজনায় হাত তালি দেয়া সবই মেঘালয়কে মুগ্ধ করছে প্রতি মুহুর্তে। ইচ্ছে করছে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য যদি মিশুকে দেখিয়ে আনতে পারতাম!
মিশু বললো, “আমার কি ইচ্ছে করে জানো? ওই যে গামছার মত ড্রেসগুলো পড়ে, পিঠে একটা বালতির মত ঝুড়ি ঝুলিয়ে চা বাগানে চা পাতা তুলি। আমাদের একটা ছোট্ট সুন্দর সোনামণি হবে, তাকে গামছায় বেঁধে পিঠে ঝুলিয়ে আমি চা বাগানে চা পাতা তুলবো। কেমন মজা হবে বলোতো?”
মেঘালয় হেসে ফেললো। সায়ান বললো, “কোনোকালে কোনো মেয়ের এরকম ইচ্ছে হয় আমার জানা ছিলোনা।”
মিশু বললো, “আমার খুব হয়। আমার ইচ্ছে হয় পাহাড়ের উপর গিয়ে জুম চাষ করি, কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে কুপিয়ে জমি চাষ করবো। অনেক কষ্ট করবো, অনেক পরিশ্রমী হবো। তারপর অনেক দিন বাঁচবো।”
পূর্ব চোখ দুটো বড়বড় করে বললো, “কেয়া বাত হ্যায়! দারুণ দারুণ ইচ্ছে তো তোমার মিশু। আর কি কি ইচ্ছে আছে বলোতো শুনি?”
মিশু আগ্রহী হয়ে বলতে লাগলো, “আমার ইচ্ছে করে পাহাড়ের উপর গিয়ে একটা ঘর বানিয়ে থাকি। আমাদের অনেক অভাব থাকবে, আমি আর মেঘ কষ্ট করে রোজগার করে আনবো। তারপর মজা করে খাবো। মেঘ অনেক দূর থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে আনবে, আমি জুম চাষ নিয়ে ব্যস্ত থাকবো। আবার ইচ্ছে করে মেঘের দেশে একটা ঘর বানিয়ে থাকি। ঘুম থেকে উঠে যখনি বাইরে এসে দাঁড়াবো, মেঘ উড়ে এসে আমাদের ছুঁয়ে যাবে।”
মেঘালয় বললো, “বাড়ি বানিয়ে থাকাটা হয়ত সম্ভব না। তবে সাজেকে মেঘের দেশে নিয়ে যাবো তোমায় একদিন। ঘুম থেকে উঠে যখন বাইরে এসে দাঁড়াবে, তুলোর মত মেঘ এসে তোমাকে শীতল স্পর্শ দিয়ে যাবে।”
– “আচ্ছা। তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবা হ্যা?”
– “হুম তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবো।”
পূর্ব জিজ্ঞেস করলো, “ভাবি আর কি কি ইচ্ছে আছে বলেন না শুনি। আপনার ইচ্ছেগুলো একদম ইউনিক। লাখ টাকায় ও কেনা যাবেনা। বলেন শুনি?”
মিশু একটু নড়েচড়ে বসলো। পিছন ফিরে ওদের দিকে তাকিয়ে পা দুটো সিটের উপর তুলে বসলো। মেঘালয় মিশুর বসার স্টাইল দেখে মুখ টিপে হাসলো। অন্যকেউ ওর সামনে এভাবে বসার সাহস হয়ত পাবেনা। আর ওর চারপাশের সবাই খুব বেশি ভদ্র সবসময়। মিশু কোনোকিছু না ভেবেই পা উপরে তুলে বসলো সেটা মেঘালয়ের কাছে অন্যরকম লাগাটাই স্বাভাবিক। নিঃসংকোচ আচরণ বরাবর ই ওকে মুগ্ধ করে।
মিশু বললো, “আমার না পাহাড়ের প্রতি খুব টান। পাহাড়ের উপর একটা পিঠার দোকান দিতে ইচ্ছে করে। আচ্ছা মেঘ,পাহাড়ে পিঠা বিক্রি হবে?”
মেঘালয় বললো, “কেন হবেনা? পাহাড়ের উপর হাজার হাজার ট্রাভেলার্স ঘুরতে আসে। তারা পিঠা কিনে কিনে খাবে।”
– “বিদেশি রাও আসে? বিদেশিরা তো দুই টাকার পিঠা খেয়ে আমাদের দশ টাকা দিয়ে যাবে। তখন আমাদের অনেক গুলা টাকা হবে।”
সায়ান বললো, “তোমার বরের এমনিতেই অনেক গুলা টাকা আছে মিশু। সারাজীবন পায়ের উপর পা তুলে বসে বসে খেতে পারবা।”
মিশু একবার মেঘালয়ের দিকে তারপর সায়ানের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমার রেডিমেড কিছু ভালো লাগেনা। কিছু প্রস্তুত আছে,সেটা ভোগ করতে একটুও আরাম পাইনা আমি। বরং নিজে প্রস্তুত করে সেটা ভোগ করার মাঝে অন্যরকম আনন্দ। বাপের টাকায় ফুটানি মারার চেয়ে নিজে দু টাকা ইনকাম করে কষ্ট করে চলাটাও শান্তি।”
সবাই লজ্জা পেয়ে গেলো। মেঘালয় মুচকি হাসলো মিশুর জীবন দর্শন দেখে। মেয়েটা যেমন সরল,তেমনি তেজীও। কোনোকিছুর জন্য কারো উপর নির্ভর করতে রাজি নয়। আমার যা আছে, আমি তাই নিয়েই সুখী। অন্যের কাছে ফ্রিতে কিছু নিয়ে আলগা সুখের কোনো মানেই হয়না। এসব ভেবে ভেবে মেঘালয় হাসছিলো। মিশু জিজ্ঞেস করলো, “এই আমার না খুব আচার খেতে ইচ্ছে করছে।”
মেঘালয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এখন সে আচার কোথায় পাবে? পূর্ব ফাজলামি করে বললো, “ভাবির কি বমি বমি পাচ্ছে?”
– “না, আমার জার্নিতে বমি আসেনা।”
– “মাথা ঘুরাচ্ছে?”
– “না, আমার কখনো মাথা ঘুরায় না।”
– “ওহ শিট, কোথায় ভাবলাম আমরা আংকেল হবো।”
বলেই সবাই হেসে উঠলো। মিশু এই ইয়ার্কির আগাগোড়া কিচ্ছু বুঝতে পারলো না। ইহকালে কেউ কখনো ওর সাথে এরকম ফাজলামি করেনি। আচার খাওয়ার সাথে আংকেল হওয়ার কি সম্পর্ক মাথাতেই ঢুকলো না। সবাই হাসছে আর মিশু জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মেঘালয় ও ফ্রেন্ড দের দিকে তাকিয়ে হাসছে। মিশু যে এই সাধারণ ফাজলামিটা ধরতে পারেনি সেটা দেখে আরো মজা লাগছে সবার।
মিশু মেঘালয়ের দিকে ফিরে বললো, “এখানে কোথাও আচার পাওয়া যাবে না?”
ওরা আবারো হেসে উঠলো। মিশু জিজ্ঞেস করলো, “হাসছো কেন তোমরা?”
মেঘালয় বললো, “তুমি বাংলা সিনেমা দেখো না? সিনেমায় বাড়ির বউরা আচার খেলে স্বামী আর শ্বাশুরিরা কি বলে জানো না?”
মিশু মুখ বাঁকা করে বললো, “সিনেমা দেখার সময় কখনো পাইনি। ছোটবেলা থেকেই প্রত্যেকটা সেকেন্ডকে আমি কাজে লাগাতাম। যেটুকু অবসর পেয়েছি, বিদেশি উপন্যাস পড়েই কাটিয়েছি।”
সবাই চুপ হয়ে গেলো। আনন্দময় শৈশব হয়ত মিশুর ছিলোনা। নিজে যদিও বাচ্চা স্বভাবের,তবুও সময়ের ব্যাপারে সবসময় ই খুব সিরিয়াস ও। ইচ্ছে পূরণের বেলায় যেকোনো উদ্ভট কাজ করা যেতে পারে, কিন্তু সময়কে সবসময় কাজে লাগানো চাই।
সায়ান বললো, “মিশুর একটা জিনিস দেখে আমি খুব অবাক হই। আমরা সচরাচর যেসব বলাবলি করি,ও সেসব জানেনা। আবার আমরা যেসব কল্পনাও করিনা, ও সেসব নিয়ে ভাবে।”
মেঘালয় বললো, “এটা সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার। আল্লাহ মেয়েটাকে যে কি দিয়ে বানাইছে! জগতের সব উদ্ভট চিন্তা ওর মাথায় ঘুরপাক খায়।”
মিশু বললো, “আমি আবার কি উদ্ভট চিন্তা করলাম?”
– “পাহাড়ের উপর পিঠার দোকান দেয়ার চিন্তাটা কি উদ্ভট নয়?”
– “আহা! আমি তো অল্প কয়দিন ব্যবসা করবো। পনেরো দিন পিঠা বেচবো। তারপর আবার অন্য ব্যবসা।”
পূর্ব বললো, “এরা দুটোই সবসময় ব্যবসার চিন্তা ভাবনা মাথায় নিয়ে ঘোরে।”
বলেই হেসে উঠলো। সবাই মিলে হাসাহাসি করতে করতে রাতারগুলের কাছাকাছি পৌছে গেলো। গাড়ি থেকে নেমে দোকান থেকে একগাদা চাটনি কিনে মেঘালয় মিশুর হাতে ধরিয়ে দিলো। মিশু চাটনি গুলো গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে বললো, “আমরা জংগলের ভেতরে গিয়ে চাটনি বেচবো। যারা আমাদের মত ঘুরতে এসে আচার খেতে চাইবে, তারা আমার কাছে চাটনি কিনে কিনে খাবে। এক পিছ তিন টাকা।”
পূর্ব সবাইকে দাড় করিয়ে কোমরে হাত রেখে বললো, “সাধে কি বললাম এরা সবসময় ব্যবসার চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘোরে? রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের ভেতরে গিয়ে সে নাকি আচার বেচবে?”
সবাই আরেক দফা হেসে নিলো এসব নিয়ে। মিশুও খিলখিল করে হাসতে লাগলো।
৪০.
ফোনের স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেঁপে উঠলো দুপুরের। নিখিল!
ও রিসিভ করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, “হ্যালো।”
ওপাশ থেকে নিখিলের কর্কশ গলা ভেসে আসলো, “রিসিভ করতে এত সময় লাগে?”
ভয় পেয়ে গেলো দুপুর। নিখিল কখনো এভাবে রাগ দেখায়নি ওকে।আর এখন তো ও অন্য কারো স্ত্রী। গত দুদিন নিখিলের সাথে কোনোরকম কথাও হয়নি। আজকে হঠাৎ কি হলো ওর?
নিখিল বললো, “বরের সাথে প্রেম নিয়ে ব্যস্ত ছিলে বুঝি?”
– “নিখিল, তুমি এভাবে কেন কথা বলছ?”
– “তোমার সাথে আর কিভাবে কথা বলা উচিৎ?”
– “এরকম বিহ্যাভ দেখানোর জন্য কল দিয়ে থাকলে ফোন রাখো।”
– “রাখবো। তার আগে শুনি মহারাণীর নতুন জীবনটা কিভাবে শুরু হচ্ছে?”
নিখিলের কথা বলার স্টাইল দেখে রাগ হলো দুপুরের। ও বললো, “খুব ভালো ভাবেই শুরু হচ্ছে। আমার বর আমার অনেক কেয়ার করে।”
– “তা তো করবেই। সুন্দরী বউ পেয়েছে না? তার তো আর রৌদ্রময়ীর দরকার ছিলো না, তার দরকার ছিলো তোমাকে। সে তো কেয়ার করবেই।”
– “নিখিল, ভাষা এমন করছো কেন?”
– “তাছাড়া? তোমার শ্বশুরঘরের লোকরাও তো অনেক কেয়ার করে তাইনা? করবেই তো। তাদের তো একজন পুত্রবধূ দরকার ছিলো, স্পেশালি রৌদ্রময়ীর কোনো দরকার ছিলোনা।”
দুপুরের মেজাজ রীতিমত খারাপ হতে শুরু করেছে। ও সবকিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু বিনা কারণে খারাপ আচরণ একদম ই সহ্য করতে পারেনা। বললো, “নিখিল তুমি দয়া করে ফোনটা রাখো। আর রাগ ঝাড়ার জন্য ফোন দিওনা প্লিজ।”
– “আমি রাগ গুলো কাকে দেখাবো তাহলে? তোমার কি কিছুই করার ছিলোনা? আমি তোমার বাবাকে ভালো করেই চিনি। তুমি যদি তাকে একবার বলতে বিয়েতে তোমার মত নেই তবে উনি কখনোই তোমাকে জোর করে অরণ্য’র সাথে বিয়ে দিতো না।”
দুপুর রেগে বললো, “এই জন্য রেগে আছো? দেখো, হয়ত আমি চাইলেই বিয়েটা ভাংতে পারতাম। কিন্তু সেই মুহুর্তে আমার কাছে আমার বাবার সম্মান টাই সবচেয়ে বড় ছিলো। বাবার মুখের উপর না বলে দেয়ার মত শক্তিটা পাইনি আমি।”
– “আমি কি তোমার অযোগ্য ছিলাম? আমাকে বিয়ে করলে তোমার বাবার সম্মান নষ্ট হয়ে যেত? আমি তো চেয়েছিলাম গিয়ে তোমার বাবার হাতে পায়ে ধরে তোমাকে চাইতে। আমাকে বারণ করেছিলে কেন?”
– “নিখিল,আমার জায়গায় নিজেকে দাড় করিয়ে একবার ভাবো। আশাকরি উত্তর পেয়ে যাবা। গত দুদিন যাবত পুড়ে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছি আর তুমি ফোন দিয়ে আমাকেই রাগ ঝারছো?”
কণ্ঠটা হঠাৎ নরম হয়ে গেলো নিখিলের। ও বললো, “আমি তোমার সাথে চরম খারাপ আচরণ করতে চাই দুপুর। যাতে করে খুব সহজেই আমার প্রতি তোমার বিতৃঞ্চা চলে আসে আর আমাকে ভূলে যেতে পারো।”
দুপুর হাসার চেষ্টা করে বললো, “তোমার ধারণা ভূল। যত খারাপ কাজ করেই আমার সামনে আসোনা কেন, দুপুর কখনো তোমাকে ভূলতে পারবে না। তোমার জায়গাটা আজীবন তোমার। সেখানে খারাপ আচরণ করে অযথা আমাকে কষ্ট দিওনা নিখিল।”
নিখিলের কান্না পেয়ে গেলো। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “হুম। ভালো থেকো।”
– “আর আগামী তিনদিন আমাকে কল দিওনা। এই তিনদিন অরণ্য হয়ত প্রত্যেকটা সেকেন্ড আমার সাথে থাকবে।”
– “হানিমুনে যাচ্ছো?”
প্রশ্নটা শুনে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো দুপুরের। হানিমুন নিয়ে কত্ত প্লান ছিলো নিখিলের সাথে। নিখিল বলেছিলো ওকে দার্জিলিং নিয়ে যাবে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিয়ে আনবে। রিসোর্টের বিছানায় শুয়ে নিখিলের বুকে মাথা রেখে দূরের হিমালয় দেখবে ও। সব স্বপ্ন নিমেষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
নিখিল বললো, “আচ্ছা রাখছি দুপুর। নিজের খেয়াল রেখো।”
– “তুমিও। আর প্লিজ সিগারেট খেও না।”
– “আমার জন্য চিন্তা করাটা বাদ দিও দুপুর। আমি চেষ্টা করবো যাতে কখনো তোমাকে ফোন না দেই।”
– “ফোন দিও। আগামী তিনটা দিন দিওনা।”
– “কোথায় যাচ্ছো?”
– “সিলেটে যাচ্ছি। নূরজাহান গ্রান্ডে উঠবো। একদিন ট্যুরে গিয়ে ওই হোটেলে শুয়ে শুয়ে আমাকে ভিডিও কল দিয়েছিলে। কি পরিমাণ কষ্ট হবে আমার ভাবতে পারো নিখিল?”
– “আচ্ছা যাও। সাবধানে থেকো।”
শেষ মুহুর্তে গলাটা ভিজে উঠলো দুপুরের। ফোন রেখে আয়নার দিকে তাকালো ও। চোখ মুছলো শাড়ির আঁচলে। এই চোখের জল কাউকে দেখাতে চায়না ও। একটু বাদেই অরণ্য এসে বেড়িয়ে পড়ার জন্য তাগাদা দিলো। লাগেজ নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে দুপুরের সামনে দাঁড়ালো। টিস্যু পেপার নিয়ে দুপুরের কাজল ঠিক করে দিতে দিতে বললো, “একটু নিজের কেয়ার করতে পারো না? বড্ড অগোছালো তুমি।”
দুপুর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বেড়িয়ে পড়লো ওরা সিলেটের উদ্দেশ্যে।
চলবে..

অনুভূতি
পর্ব ২৭
মিশু মনি
.
৪১.
রাতারগুলে নৌকায় ওঠার সময় লাইফ জ্যাকেট পড়তে হলো মিশুকে। মেঘালয় ওকে জ্যাকেট পড়িয়ে দিয়ে হাত ধরে নৌকায় তুললো। নৌকায় পা রাখতেই নৌকা দুলে উঠলে মেঘালয় শক্ত করে ধরে ফেললো ওকে। ঘাটে থাকা মাঝি আর সমস্ত ট্রাভেলার্স হা করে চেয়ে আছে ওদের দিকে। মেঘালয় বারবার বলছে, “একটু সাবধানে পা ফেলো মিশু, এইদিকে পা দিওনা,এইখানে পা রাখো, পড়ে যাবা একটু সাবধানে।” এই টাইপের কথাবার্তা আর ওর মিশুকে আগলে রাখার ধরণ দেখে লোকজন বুঝে গেছে ছেলেটা মেয়েটাকে কতটা ভালোবাসে।
একজন মহিলা তার স্বামীকে বললো, “দেখেছো কিরকম কেয়ার করে? সব মেয়েই এরকম কেয়ার চায়। সারাজীবন সাধনা করে হয়ত এরকম জীবনসঙ্গী পাওয়া যায়।”
কথাটা মিশুর কানে লাগলো এসে। কেবলই নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হচ্ছিলো ওর।সবাই যেভাবে চেয়ে আছে তাতে খুব লজ্জাও লাগলো। নৌকায় বসে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো ও। ওর পাশে বসে মেঘালয় ওর হাত ধরে রেখেছে। বাকি তিনজন পিছনের দিকে বসেছে। নৌকা ছেড়ে দিলো।
নৌকায় দুজন মাঝি। একজন বয়স্ক লোক আরেকজন ওনার ছেলে। ছেলেটি নিতান্তই ছোট। বয়স এগারো/বারো হবে হয়ত। সে দিব্যি গায়ের জোরে নৌকার দাড় বাইছে। ধীরেধীরে বনের ভেতর প্রবেশ করলো ওরা। মিশুর চোখ বিস্ময়ে বড়বড় হয়ে গেলো। পানির রঙ একদম গাঢ় সবুজ, আর সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। জংগলের ভেতর দিয়ে ক্রমশই নৌকা ভেতরে ঢুকছিলো। মিশু আনন্দে লাফিয়ে ওঠার মত অবস্থা। নতুন নতুন কিছু গাছ, গাছের ও অন্যরকম একটা গন্ধ আছে। প্রাণভরে ও গাছের গন্ধ নিতে লাগলো। পানিতে ছপছপ শব্দ তুলে নৌকা বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফরেস্টের গভীরে ঢুকে রীতিমত গা ছমছম করতে লাগলো। নিচেও সবুজ পানি, মাথার উপরেও ঘন গাছের ডালপালা বিস্তৃত হয়ে আছে, দুপাশেই ঘন জংগল। বেশ থ্রিলিং লাগছে মিশুর কাছে। ও শিহরিত হয়ে উঠছে বারবার। আর মেঘালয় চেয়ে আছে ওর মুগ্ধ চোখের দিকে। মিশুকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে মুগ্ধ হলে, আর সবচেয়ে বেশি স্নিগ্ধ লাগে স্নানের পর।
বনের গভীর থেকে গভীরে নৌকা প্রবেশ করছে। দুপাশের ডালপালা এসে গায়ে লাগছে। একদম ঘন জংগলে ঢোকার পর মেঘালয় বললো, “মামা একটু দাঁড়ান তো।”
মাঝি দাড় বাওয়া বন্ধ করতেই মেঘালয় আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়ে হাত ধরে মিশুকে তুললো। মিশুকে একটানে বুকে নিয়ে বললো, “পূর্ব ক্যাপচার।”
পূর্ব টুক করে ক্যামেরায় ক্লিক করে নিলো। ঘন সবুজের মাঝে দুজন সুখী মানুষ একে অপরের দিকে চেয়ে আছে! মিশু মেঘালয়ের বুকে ভর দিয়ে মাথাটা উপর দিকে তুলে মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছে মেঘালয়ের দিকে। মিশুর গলায় আবার চাটনি ও ঝুলছে। পূর্ব বললো, “চাটনিকন্যা চাটনি গুলা রেখে একটা ছবি তুলুন প্লিজ। হাস্যকর লাগছে।”
মিশু চাটনি গুলো গলা থেকে নামিয়ে নৌকায় ফেললো। মেঘালয় মিশুর কোমরে হাত রেখে কাছে টেনে নিলো। এক হাত মেঘালয়ের বুকের উপর, আরেকহাত মেঘালয়ের গলায় জড়িয়ে ধরে রেখে মিশু তাকালো গাছের দিকে আর মেঘালয় তাকিয়ে রইলো মিশুর দিকে। পূর্ব ছবি ক্লিক করে নিলো। তারপর খুশি খুশি গলায় বললো, “এই বছরের সেরা ছবি দোস্ত।”
মেঘালয় মিশুর হাত ধরে বসালো ওকে। নৌকা আবারো চলতে শুরু করলো। মেঘালয় মাঝিকে বললো, “মামা কি রাগ করছেন?”
মাঝি হাসলো, “না মামা রাগ করিনাই।”
মেঘালয় হেসে জবাব দিলো, “আমার বউ হয় মামা। গত পরশু আমাদের বিয়ে হইছে।”
– “সুন্দর মানাইছে আপনাদের। আল্লাহ নিজে আপনাদের একজনরে আরেকজনের জন্য বানাইছে।”
মিশু লাজুক ভঙ্গিতে হাসলো। মেঘালয় বললো, “মামা আরো বিরক্ত করবো। কিছু ফটোশুট করবো। রাগ করবা মামা?”
– “না, আমার রাগ নাই।”
নৌকার ছোটমাঝি অর্থাৎ বাচ্চা ছেলেটি হঠাৎ গান গাইতে শুরু করলো। ওর গানের গলা শুনে সকলকে একবার মুগ্ধ হতেই হলো। মেঘালয় ও ওর বন্ধুরাও যোগ দিলো সাথে। এরকম একটা ছোট বাচ্চা এত সুন্দর গান গাইতে পারে ওরা ভাবতেও পারেনি। আরাফ পুরো গান সহ বনের দৃশ্য ভিডিও করে নিলো।
নৌকা বাক নেয়ার সময় মেঘালয় বিভিন্ন স্টাইলে মিশুর ছবি তুলে নিলো। মিশুর ও ছবি তুলতে খুবই ভালো লাগে। ও নানান পোজ দিয়ে ছবি তুলছে।মেঘালয় বললো, “আমি কখনোই এত ছবি তুলিনা। আজকে তুলছি কারণ এগুলা স্মৃতি হয়ে থাকবে। কোনো একদিন আমাদের বাড়িতে ভক্তরা আসবে ঘুরতে, বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে এই ছবিগুলো স্মৃতি হয়ে ঝুলবে। ক্যাপশনে থাকবে, “বিয়ের পরদিন প্রথম মধুচন্দ্রিমা”
পূর্ব বললো, “দোস্ত মধুচন্দ্রিমার মত কিছুই তো করলি না।”
– “পাবলিকের সামনে করবো নাকি? আজব তো।”
সবাই হেসে উঠলো। মিশু লজ্জায় লাল থেকে নীল,নীল থেকে বেগুনী হতে লাগলো। ওর লাজুক চেহারাটা ফটাফট ক্যামেরায় ধারণ করছে পূর্ব। ওদের অজান্তেই দুজনের অনেক ছবি তুলে নিলো ও। মিশুকে সবাই ভীতু ভেবেছিলো, ও সেরকম একটুও নয়। ছবি তোলার সময় বারকয়েক নৌকা দুলে উঠেছিলো।মিশু পড়েও যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো কয়েকবার। অন্য মেয়ে হলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বন মাথায় তুলতো। মিশু দিব্যি উৎফুল্ল হয়ে বসে আছে। ওর বরং আফসোস হচ্ছে কেন পড়ে গেলো না সেটা ভেবে। পড়লে এই সবুজ জলের গন্ধটাও গায়ে মেখে নিতে পারতো। এসব ভাবছে আর চাটনি খেয়ে যাচ্ছে অনবরত।
রাতারগুলের ভেতরে যে টাওয়ারটা আছে সেখানে এসে নৌকা দাড় করালো। মেঘালয় হাত ধরে মিশুকে উপরে তুললো। অনেক উঁচু টাওয়ার। সবাইকে নিচে দাড় করিয়ে পূর্বকে নিয়ে একদম চূড়ায় উঠে গেলো ও। বেশি মানুষ উঠলে টাওয়ার দুলে উঠে,কেঁপে ওঠে। তাই বাকিরা নিচেই রইলো। মিশু সবকিছু উপভোগ করছে একদম ভেতর থেকে। মেঘালয়কে জড়িয়ে ধরে থ্যাঙ্ক ইউ বলতে ইচ্ছে করছে ওর। উপরে উঠেও দুজনের অসংখ্য ছবি তুললো পূর্ব। একদম চূড়ায় মিশু মুগ্ধ হয়ে বনের দিকে চেয়ে আছে আর মেঘালয় পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে আছে ওকে। নেমে আসার পর বাকিরা উপরে উঠলো আর মেঘালয় ফাঁকা নৌকায় শুয়ে মিশুকে বুকে নিয়ে ছবি তুললো। অনেক ট্রাভেলার্স ইমপ্রেসড ওদের এনার্জি আর প্রেম দেখে।
বেশ কিছুক্ষণ প্রাণভরে শ্বাস নিলো ওরা। মিশু বিস্ময়ে কথাই বলতে পারছে না। অনেকে মিশুর গলায় ঝোলানো চাটনি দেখে অবাক হয়ে থাকতো। মিশু তাদেরকে বলতো, “চাটনি খাবেন? তিন টাকা পিছ।” যাকে বলা হতো সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেতো একদম। মিশু একটা চাটনি ছিড়ে তাদের হাতে দিয়ে দিতো। সে টাকা বের করতে গেলে ও বলতো, “টাকা লাগবে না। এমনি দিছি। এমনির আরেক নাম তিন টাকা।”
সবাই আরো বেশি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেতো। “এমনির আরেক নাম তিন টাকা” এরকম বাক্য এ জনমে কেউ শোনেনি বোধহয়। মেঘালয়ের বন্ধুরা মিশুর কথাবার্তা আর কাণ্ড দেখে মজা পাচ্ছিলো। পুরো বনটা নৌকায় ঘোরার পর ধীরেধীরে আবারো ঘাটের দিকে ফেরা হলো। মিশুর মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ওর মুখটা ছোট্ট একটু হয়ে গেছে।
মেঘালয় জিজ্ঞেস করলো, “কি হইছে মিশুমনি?”
– “আমার ওই বনের ভেতর থেকে যেতে ইচ্ছে করছিলো। একদম ই ফিরতে ইচ্ছে করছে না।”
– “আহারে বাচ্চাটা। মন খারাপ করে না সোনামণি। আমরা যতক্ষণ ভেতরে ছিলাম, এতক্ষণ কেউ ওখানে থাকেনা রে। মামাকে কতক্ষণ বসিয়ে রাখলাম দেখোনি? এর বেশি সময় ওখানে থাকে কেউ?”
মিশু মুখটা কালো করে বসে রইলো। সবই বুঝতে পারছে তবুও ওর মন খারাপ লাগছে। মেঘালয়ের ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখতে। কিন্তু পাবলিক প্লেসে সেটা সম্ভব না। মিশুর মন খারাপ করা চেহারা দেখে ওর ও খারাপ লাগছে। ঘাটে ফেরার আগেই মেঘালয় মাঝিকে কিছু বখশিশ দিয়ে দিলো। যেটা ঠিক করা হয়েছিলো সেটা নিয়েই অনেকে দরদাম করে, সেখানে এক্সট্রা বখশিশ পেয়ে মাঝি খুশি হয়ে গেলেন। ঘাটে ফিরেই মেঘালয় দেড়ি না করে মিশুকে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলো।
সায়ান এক বোতল পানি এনে দিলো। মিশু পানি খেয়ে সিটে চুপচাপ বসে রইলো। মেঘালয় দুহাতে ওর মুখটা ধরে বললো, “এই পাগলী, মন খারাপ করে থাকবা? তুমি জানো না তুমি এরকম গাল ফুলিয়ে বসে থাকলে আমার ও মন খারাপ হয়ে যায়?”
মিশু মেঘালয়ের বুকে মাথা রেখে বললো, “সবকিছু এত সুন্দর কেন? বেশি সুন্দর দেখলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। আমি কেমন যেন হয়ে যাই।”
– “কাল তোমাকে আরো সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে যাবো পাগলী। কাল একদম সকাল সকাল বের হবো, সারাটা দিন তুমি সেখানে প্রকৃতির কোলে বসে থাকবা।”
মিশু আর কিছু বললো না। পূর্বরা গাড়ির কাছে আসছে দেখে ও সোজা হয়ে বসলো।
গাড়ি ছেড়ে দেয়ার পর আশেপাশের সৌন্দর্য দেখে ওর মন ভালো হয়ে যাচ্ছিলো। বিকেল গড়িয়ে এসেছে। খাবার খেয়ে পান্থুয়ামাই চলে গেলো ওরা। কিন্তু সময়ের অভাবে বেশিক্ষণ থাকা হলোনা। মিশুর মনটা একটু ভালো হতে শুরু করেছিলো, আবারো খারাপ হয়ে গেলো। ও কোনো কথা না বলে একদম গম্ভীর হয়ে বসে রইলো।
৪২.
হোটেলে ফিরে মিশুকে ফ্রেশ হতে বলে পূর্ব’র সাথে কথা বলার জন্য ওদের রুমে গেলো মেঘালয়। রুম থেকে বেড়িয়ে নিজের রুমে ঢুকতে যাবে এমন সময় পিছন থেকে একজন ডাকলো, “আরে মেঘালয় না?”
মেঘালয় পিছন তাকাতেই খুশি হয়ে উঠলো – অরণ্য!
অরণ্য মেঘালয়ের ছোটবেলার বন্ধু ছিলো। কলেজে ওঠার পর সবাই যে যার মত আলাদা হয়ে গেছে। কিন্তু খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিলো ওদের। মেঘালয় গিয়ে অরণ্যকে জড়িয়ে ধরে বললো, “কেমন আছিস বন্ধু?”
– “ভালো,ইন ফ্যাক্ট খুব ভালো। হানিমুনে এসেছি দোস্ত।”
– “সত্যি! কংগ্রাচুলেশনস বন্ধু।”
– “অনেক দিন পর দেখা। তুই কি ট্যুরে এসেছিস?”
মেঘালয় মাথা চুলকে বললো, “হুম ফ্রেন্ড সার্কেল নিয়ে এসেছি। তোর ভাবিও আছে।”
অরণ্য হেসে বললো, “ভাবি কোথায়?”
– “রুমে, ফ্রেশ হচ্ছে। মাত্র বাইরে থেকে ফিরলাম তো। তোর বউকে দেখাবি না?”
– “হোয়াই নট? হাজার হলেও দোস্ত। তোর বউ মানেই তো আমার বউ,আমার বউ মানে তোর বউ।”
মেঘালয় হো হো করে হেসে উঠলো। অরণ্য বললো, “ভাবিকে নিয়ে আমাদের রুমে আয়। এইতো এটাই আমাদের রুম।”
– “ওকে,তুই গিয়ে কফি বানাও। আমরা আসছি।”
অরণ্য হাসতে হাসতে মেঘালয়ের রুমের বিপরীত রুমটায় ঢুকে গেলো। মেঘালয় রুমে ঢুকে দেখলো মিশু গুনগুন করে গান গাইছে আর চুল আচড়াচ্ছে। চুল ঠিকমত মুছতেই পারেনি আর আচড়াচ্ছে দেখে ও রেগে বললো, “তোমাকে ভেজা চুল আচড়াতে বারণ করেছিলাম।”
মিশু মুখ কাচুমাচু করে বললো, “ইস! ভূলেই গিয়েছিলাম।”
– “আচড়েছো ভালো করেছো। এক পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা। চলো ওর বউকে দেখে আসি।”
মিশু উঠে দাঁড়াল। মেঘালয় এগিয়ে এসে তোয়ালে নিয়ে মিশুর চুলগুলো ভালো মত আচড়ে দিয়ে বললো, “কিচ্ছু পারেনা সোনামণিটা। চোখে কাজল দাও।”
মিশু চোখে কাজল দিতে গিয়ে একচোখে মোটা, আরেক চোখে পাতলা হয়ে গেলো। মেঘালয় নিজেই সেটা ঠিক করে দিলো। তারপর শাড়ি পড়িয়ে দিয়ে হালকা মেকাপ করিয়ে একদম পুতুলের মত দেখাচ্ছিলো মিশুকে। মেঘালয় বললো, “উফফ যা লাগছে না। আমার তো মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”
– “তোমার বন্ধুর আবার মাথা খারাপ যেন না হয়।”
– “সেটাই ভাবছি। এই আমরা তো আবার বের হবো। তাড়াতাড়ি আসো।”
অরণ্য’র দরজায় নক করতেই ও দরজা খুলে অভ্যর্থনা জানালো। মিশু মেঘালয় ভেতরে ঢুকে দুপুরকে দেখে একদম হতবাক! একদম একইরকম দেখতে একটা মেয়েকে ট্রেনে দেখেছিলো ওরা। নতুন বউয়ের সাজে দেখেছিলো। সেই মেয়েটাই কি? নাহ, একটু পার্থক্য আছে। ওই কনের চেয়ে এই মেয়েটা একটু বেশি ফর্সা। ট্রেনে দেখা মেয়েটা একটু শ্যামলা ছিলো। কিন্তু চেহারার গড়নে অদ্ভুত মিল। মেঘালয় ও মিশু একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো।
দুপুর বললো, “বসুন আপনারা।”
মিশু ও মেঘালয় থতমত খেয়ে চেয়ে আছে। মিশু রৌদ্রময়ীর সাথে কথাও বলেছে। কথা বলার সময় মেয়েটার মুখের ভঙ্গি যেমন হয়,এই মেয়েটার ও ঠিক সেরকম হচ্ছে। মিশু হেসে বললো, “ভাবি তো অনেক সুন্দর দেখতে।”
দুপুর হাসার চেষ্টা করলো। মিশু সবার সাথে খুব অনায়াসেই মিশে যায়। ও গিয়ে দুপুরের পাশে দাঁড়িয়ে দুপুরকে রীতিমত জড়িয়ে ধরলো। মেঘালয়ের মিশুর এই জিনিস টাই খুব পছন্দ। সবাইকে দ্রুত আপন করে নেয় মেয়েটা। মিশু হেসে হেসে বললো, “সত্যিই ভাবি আপনি খুব সুন্দর। অরণ্য ভাইয়া কি সুন্দর একটা বউ পেয়েছে!”
অরণ্য হেসে জবাব দিলো, “আপনি কিন্তু একদম পুতুলের মত দেখতে। দেখলেই কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে।”
অরণ্য’র মুখে এমন কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো মিশু। মেঘালয় ও অরণ্য হেসে উঠলো। মিশু লজ্জায় অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। দুপুর বললো, “সত্যি বলেছে কিন্তু। তোমাকে দেখলেই গাল টেনে দিতে ইচ্ছে করে। একদম খুকুমণি খুকুমণি চেহারা। শাড়ি পড়ে ঠিক রাজকন্যাটি লাগছে।”
মিশু হাসলো। মেঘালয় মাথা চুলকালো লজ্জা পেয়ে। দুপুর মিশুকে বললো, “সরি বোন। তুমি বলে ফেলেছি। আসলে তুমি দেখতে এমন পিচ্চি, আপনি বলতেই ইচ্ছে করেনা। আর এত আপন আপন লাগে, আপনি বলা যায় বলো?”
মিশু দুপুরকে জড়িয়ে ধরে বললো, “তুমি করেই বলুন। আমার ভালো লাগছে শুনতে।”
অরণ্য দু কাপ কফি এগিয়ে দিলো মেঘালয় ও মিশুর দিকে। মেঘালয় সোফায় বসে কফিতে চুমুক দিলো। মিশু দুপুরকে নিয়ে বিছানার উপর বসেছে। অরণ্য ও মেঘালয় হাসাহাসি করছে। মিশু দুপুরকে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা আপনার কি আপনার মত দেখতে কোনো বোন আছে?”
চমকে উঠলো দুপুর। অরণ্য ও মাথা তুলে তাকালো মিশুর দিকে। কারো মুখে কোনো কথা ফুটছে না। দুপুরের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেলো হঠাৎ।
চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here