অসময়ে_রোদন পর্ব ৩

গল্পঃ #অসময়ে_রোদন (৩য় পর্ব)
লেখাঃ #তাজরীন_খন্দকার

একজন বাবা তার নবজাতকে সন্তানকে মেরে ফেলার হুমকি দিতে পারে?
তাহলে এই তিন বছর এমন পিশাচ বাবার কাছে আমার সন্তান কেমন ছিলো?
ভাবতেই ভাবতেই বাচ্চার সেই লাল ফোলা চোখ দুটো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
আমি টি টেবিলটাতে ভর করে উঠে দাঁড়িয়েই বললাম,
___ বাবা আমার সন্তান ভালো নেই, ওকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। চলো বাবা এখনি চলো।

বাবা এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু আমার পাগলামো বেড়ে চললো। আমি বুঝে গেছি আমার সন্তান সত্যি ই ভালো নেই, তার আমাকে ভীষণ প্রয়োজন!

আমার বাবা শান্ত গলায় ধিরে ধিরে আমাকে বললেন,
___আবি পাগলামি করিস না মা। এই তিন বছর যেভাবেই হোক ছিল তো নাকি? আরেকটু অপেক্ষা কর, এবং বুঝেশুনে পা বাড়া। অরুণকে আমার ভয় হয়, হুট করে তুই তোর সন্তানকে আনতে পারবিনা।

বাবার কথা শুনে আমি আবারও ধপাস করে নিচে বসে গেলাম। হ্যাঁ সত্যিই হুট করে কিছু করা সম্ভব নয়। যেই অরুণকে আমার ভালোবাসার শক্তি আঁটকাতে পারেনি, সেখানে জবরদস্তিতে নিয়ে যাওয়া বাচ্চাকে ফিরিয়ে আনা আমার পক্ষে এতোটা সহজ হবে না।
আমি বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম,
___ বাবা আমার মনে হচ্ছে, যেই মেয়েটা আমার সন্তানকে কোলে করে অরুণের সাথে গেলো, তাকে আমি চিনি, কখনো এই কণ্ঠস্বর আমি শুনেছি। কিন্তু অরুণের দ্বিতীয় স্ত্রী সে নয়, সে অন্য কেউ!
কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, আমার সন্তানকে ওই মেয়ে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল, কেন নিয়ে গিয়েছিলো?

বাবা করুণ স্বরে বললো,
___এবার থাম না মা! আমরা এভাবে কি করে এসব জানবো বল? খোঁজ নিতে হবে তো।

আমি মাথা নেড়ে রুমের দিকে যাওয়ার উদ্যত হতে হতে বললাম,
___ হ্যাঁ খোঁজ নিতে হবে। আর আজকে ফয়সাল ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিল।

আমি চলে যাচ্ছি, সে সময় বাবা বলছে..
___ সেদিন যদি ভুলটা না করে ফয়সালকে একটাবার বুঝতি!

আমি জানি বাবা এখন কি বলবে। তাই শোনার অপেক্ষা না করে দ্রুত পায়ে রুমে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে, ভেতরটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। কবে আমি আমার সন্তানকে কাছে পাবো? কবে কাছ থেকে মন ভরে দেখার সুযোগ পাবো? অরুণ এসব করার আগে আমাকেই মেরে ফেলতো যদি, তাহলে আরো ভালো হতো! কেন আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিতে চাইছে?
আজও আমি উত্তর পাইনি সে কেন আমাকে ছেড়ে গেলো, কেন তার আকাশসম ভালোবাসা হঠাৎ ঘৃণায় রূপ নিলো, আমি জানার চেষ্টা করেছি কিন্তু বেলা শেষে ক্লান্ত হয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছি! কিন্তু আমার সন্তানের আশা তো এখন ছাড়তে পারবোনা। যাই হয়ে যাক না কেন, আমি আমার সন্তানকে ফিরিয়ে আনবো।

যন্ত্রণা, দুশ্চিন্তা, আকুলতা, অস্বস্তিতে সে দিনটা কেটে গেলো। পরেরদিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও অফিসে গেলাম, আজকে কোনো খবরাখবর নেওয়ার সময় নেই, আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত কাজ করে ছুটি নিবো ভেবে নিলাম। এদিকে অফিসে বসে আমার ফয়সাল ভাইয়ের কথা মনে হলো, উনার থেকে সাহায্য চাইলে কেমন হয়? বাবা তো অসুস্থ, আমি একা মানুষ কোন সাহসে এমন ভয়ানক মানুষের আশপাশ পর্যবেক্ষণ করবো?
এই চিন্তাটা আসার সাথে সাথে উনাকে ফোন লাগালাম। আজ বহু বছর পরে এই নাম্বারে আমি ডায়াল করেছি। একটা সময় খুব করা হতো, তবে যখন থেকে জেনেছিলাম ফয়সাল ভাই আমাকে বোনের বাইরে অন্যকিছু ভাবে, আমাকে নিয়ে জীবনের স্বপ্ন দেখে, ঠিক তখন থেকেই এই অবহেলা। কারণ তখন আমার জীবনে অরুণ এসে গিয়েছিলো! আমার প্রেম সম্পর্কে তখন বাবাও কিছু জানতেন না, তাই আমাকে না বলেই উনাদের প্রস্তাব অনুযায়ী বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেলেছিলেন, আর আমি তখনি পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এমনকি পালিয়ে গিয়েছিলামও! আমার বাবা পরবর্তীতে আমাকে মেনে নিলেও মানতে পারেনি অরুণের মা! কয়েক মাসের মধ্যে অরুণও চলে গেলো মানতে না পারার দলে, ক্ষুন্ন হয়ে গেলো আমাদের চোখ ধাঁধানো প্রেম কাহিনী!
বিষাদের সমুদ্রে ভেসে চললাম নিথর আমি! এই চলা এখনো অব্যহত। জানিনা আর কতদিন চলবে!

ফয়সাল ভাইকে বলে দিলাম অরুণের পরিবারের উপর ভালো করে খোঁজখবর নিতে। পরেরদিন বিকালে উনাকে নিয়ে আমি সেখানে যাবো, কাছে না হোক দূর থেকে ব্যপারটা বুঝার চেষ্টা করবো।

ফয়সাল ভাই আমার কথামতো খোঁজ নিতে তাদের বাসার আশেপাশের মানুষের সাহায্য নিলেন।
রাতে তিনি আমাকে আচমকা একটা অসম্ভাব্য সংবাদ দিলেন, যেটা শুনতে আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। এটা শুনে অরুণের কার্যকলাপে আমার আরো ভয় জন্মালো। সেদিন রাতটা আগেরদিনের চেয়েও খারাপ গেলো।
পরের দুপুরে কোনো রকম কাজ শেষ ফয়সাল ভাইয়ের সাথে রওয়ানা দিলাম অরুণের নানার বাড়ির দিকে। হ্যাঁ উনি গত ছয়মাস থেকে নাকি ওখানেই থাকেন। অরুণের বউয়ের সাথে হাত তোলা ঝগড়া পর্যন্ত হয়েছে উনার, এক পর্যায়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করলো।
আমি শুধু ভাবছি অরুণ একমাত্র ছেলে হয়ে তার এতো ভালোবাসার মা’কে এতটা কষ্ট দিতে পারলে, এবং তার বউ উনাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারলে, ওরা আমার সন্তানকে কতটা অবহেলায় রেখেছে?
না জানি আমার বাচ্চার সাথে কতো খারাপ হয়েছে!

স্থানীয় মানুষদের সাহায্যে আমরা আছর নামাজের সময় অরুণের মামাবাড়ি পৌঁছালাম। বাড়ির গেইটে পা রাখতেই দেখি নিচু হয়ে তিনি সবজি গাছে পানি দিচ্ছে, আমাদের গেইট খোলার আওয়াজে মাথার আঁচলটা কানে উনি গুঁজে ফিরে তাকালেন, ফিরে আমাকে দেখেই উনি তারাহুরো করে ভেতরে চলে যেতে চাইলেন। আমি দ্রুত পা বাড়িয়ে দিয়ে উনাকে ডেকে থামালাম। এগিয়ে গিয়ে উনার কাঁধে হাত রেখে বললাম,
___পালাচ্ছেন কেন? যা করার তো করেছেনই! বলুন আমার সন্তানকে আপনার ছেলে কেমন এবং কোথায় রেখেছে!?

উনি এবার মুখ থেকে আঁচলটা সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদো স্বরে বললো,
___আবিদা তোমার স্নেহা ভালো নেই!

আমি তোতলে বললাম,
___খুব স্নেহের নাম রেখেও আমার মেয়ে ভালো নেই কেন? সবকিছু আপনার জন্যই হয়েছে, এটাই চেয়েছিলেন না?

আমার রাগের তীব্রতা দেখে ফয়সাল ভাই আমাকে শান্ত হওয়ার ইশারা করলো।
অরুণের মায়ের চোখে আজ আর্তনাদ ছাড়া কিছুই নেই, তিনি কাঁদতে কাঁদতে আমার কথাকেই সায় দিয়ে বললেন,
___ ইসস যদি আগে বুঝতাম! আজ এতগুলো জীবনের এমন দশা হতোনা!

আমি রাগ থাকলেও নিজেকে সংযত করে বললাম,
___সময় পেরিয়ে গেছে, আপনার অসময়ের এই রোদনধারা কেউ দেখবেনা আর! এখন প্লিজ বলুন আমার সন্তানের সাথে অরুণ আর ওর বউ কি খারাপ করেছে? আমার জন্য করা খারাপির জন্য ওকে ছেড়ে দিলেও, আমার সন্তানের কিছু হলে ছাড়বোনা।

অরুণের মা কাঁপা গলায় বললো,
___অরুণ তার বউয়ের কথা মতো স্নেহাকে এক দম্পত্তির নিকট বিক্রি করে দিয়েছে!

চলবে…….

আপনি Tajrin’s world এ যুক্ত আছেন তো? সেখানে অবশ্যই গল্প নিয়ে পোস্ট দিবেন। এছাড়াও যেকোনো আপডেট সেখানেই আগে পাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here