একদিন কাঁদবে তুমিও পর্ব -৪৫+৪৬

#একদিন_কাঁদবে_তুমিও
#পর্ব_৪৫
#Saji_Afroz

নাবীহার কথা শুনে ইনতিসার চমকায়। তার খুশির হওয়ার কথা। কিন্তু সে অবাক হয় এই ভেবে যে, নাবীহা আজরাকে তালাক দিতে বলছে! এমনটা নাবীহা বলবে ইনতিসার ভাবেনি কখনো। তাছাড়া সেও আজরাকে ছেড়ে দেবে এটা ভাবেনি। তাই নাবীহার মুখে এই কথা শুনে কী বলবে ভেবে পায় না সে।
নাবীহা বলল, কী হলো? চুপ যে?
-তুমি আসলেই চাও আমি ওকে ছেড়ে দিই?
-হু। যা হবে একান্তই আমার হবে। সেটার ভাগ আমি কাউকে দিতে পারব না।
-কিন্তু…
-কী? দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে চান?
-এমনটা নয়।
-তবে কেমন? যদি আমাকেই ভালোবাসেন তবে আমাকে নিয়েই থাকুন!

ইনতিসারের কপালে চিন্তার ভাজ দেখে নাবীহা বলল, পারবেন না তো? তবে এসব বাদ দিন। আজরার সঙ্গেই সংসার করুন।

নাবীহা এতদিন পর তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। এখন যদি সে কিছু না বলে, তবে নাবীহা তার মতামত বদলাতে পারে।

ইনতিসার হালকা কেশে বলল, আমার সমস্যা নেই। কিন্তু হুট করে আজরা কী ডিভোর্স এ রাজি হবে? তাই ভাবছিলাম আগে বিয়েটা করে নিই আমরা? পরে সে এমনিতেই ডিভোর্স দিয়ে দেবে।

কোনো ভণিতা ছাড়াই নাবীহা বলল, নাহ! আগে ডিভোর্স হবে তারপর সব হবে। ঠকতে ঠকতে ক্লান্ত আমি। আর ঠকতে চাইনা। আপনি সময় নিন। ভাবুন।

ইনতিসার হ্যাঁ সূচকভাবে মাথা নেড়ে গাড়ি চালানো শুরু করলো।
নাবীহা চোখ জোড়া বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন মনে বলল, এইবার নাহয় একটু নিজের জন্যই ভাবলাম!
.
.
.
আজরার সঙ্গে শপিংমল এ আসে মানতাশা। মানতাশারই হঠাৎ বাইরে আসার ইচ্ছে হয়েছে। আবদার করে বসে আজরার কাছে। তাই সে না এসে পারলো না। কিন্তু এখানে যে আরশানের দেখা পেয়ে যাবে ভাবেনি।
তাকে দেখেই আরশান কাছে আসলো। মানতাশা চলে যেতে চাইলে তার পথ আঁটকায় সে। আজরা তাদের কথা বলার সুযোগ দিয়ে দূরে চলে যায়। মূলত আজরাই আরশানকে খবর জানিয়েছে তারা এখানে আসবে।
এদিকে আজরা চলে যাওয়াই তার উপরে রাগ হয় মানতাশার৷ সে আরশানকে বলল, কী চায়?
-তোমাকে চাই।
-আমাকে!
-হুম। সব ভুলে চলে আসো আমার কাছে।
-এত সহজে সব ভুলে যাব?
-সবটা ঠিক করে নেব।

মানতাশা একটু ভেবে বলল-
যেতে পারি। তবে একটা শর্তে।
-কী?
-তোমার ভাবীর সঙ্গে আমি থাকতে পারব না। আর আমার নামে একটা আলাদা ফ্লাট কিনে দিতে হবে। সেখানেই থাকব আমরা। বলো রাজি?

এইবার চুপসে যায় আরশান। তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে মানতাশা বলল, শর্ত মানতে পারলেই এসো।

মানতাশা হাঁটতে শুরু করে। সে জানে, আরশান কখনোই এটা মানবে না। তাই ওমন কথা সে বলেছে, যাতে করে তাকে আর বিরক্ত না করে আরশান। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে এজাজকে। পেছনে ফিরে আরশানকে না দেখে সে এজাজের কাছে আসলো। এজাজ তাদের দেখেছে। কিন্তু কোনো কথা সে শুনতে পায়নি। তাই সে বলল, তোমার হাসবেন্ড বুঝি?
-হু।
-কী বলল?
-ওসব ছাড়ো। তুমি এইখানে?
-শপিং করতে আসলাম।
-ওহ!
-ফিরে যাচ্ছ না কেন তার কাছে?
-ইচ্ছেটা মরে গেছে। অতি লোভের শাস্তি পেয়েছি আমি। আরও পেতে চাইনা! এইবার একটু সুখ চাই। কিন্তু আমি জানি, ফিরে গেলে আবারও দু:খের সাগরে ভাসতে হবে।

আজরা আসে। এজাজকে দেখে বলল, কেমন আছেন?
-ভালো। আপনি?
-জি ভালো। চলুন না কোথাও গিয়ে বসি?

আজরার কথাতে তারা কফি খেতে আসে। অসাবধানতার বশত ওয়েটারের কাছ থেকে মানতাশার হাতে গরম কফি পড়ে। সে মুখে শব্দ করে উঠলে ছুটে যায় এজাজ। বোতল থেকে তার হাতে পানি ঢেলে বলল, জ্বলছে?

তার দিকে ছলছলে নয়নে তাকিয়ে রইলো মানতাশা। একটুও বদলায়নি এজাজ। কত বড়ো ধোকা তাকে দিয়েছে মানতাশা। তবুও সে কত সহজে ক্ষমা করে দিয়েছে তাকে। এজাজকে হারানোর এই আফসোস বুঝি আজীবন কাঁদাবে তাকে!
.
.
.
সাজিরের মা বসে রয়েছে তাসফিয়ার বাবার সামনে। তাসফিয়াকে নিতেই এসেছেন তিনি। অনেক বোঝানোর পরেও রাজি হলো না তাসফিয়া। মুখ বাঁকিয়ে ভেতরে চলে গেল সে। সাজেদা বেগম মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে বললেন, আমি সাজিরকে পাঠাব। সে নিয়ে যাবে মেয়েকে তার রাগ ভাঙিয়ে।
-আচ্ছা আপা।

সাজেদা বেগম হালকা কেশে বললেন, একটা কথা ছিল যে ভাই।
-জি বলুন?
-সম্পত্তি সাজিরের নামে করার কথা ছিল। কিন্তু তখন তাড়াহুড়োতে বিয়ে হওয়াই এসব করা হয়নি। এখন তো করা যায়?

তিনি কিঞ্চিৎ হেসে বললেন-
ভালোই হলো তখন করিনি। এখন আর সাজিরের নামে করব না। করব আমার মেয়ের নামে। তাকে আপন করে নিতে বলেন, সব এমনিতেই পাবে।

সাজেদা বেগম অবাক হয়ে বললেন, এমন তো কথা ছিল না ভাই!
-আপনার ছেলে আমার মেয়েকে মেনেই নিচ্ছে না। আপনি চান সব ওর নামে করে দিই? তবে আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ কোথায়?

তার কথা শুনে সাজেদার মুখ মলীন হয়ে যায়। কী ভেবেছিল আর কী হচ্ছে! এসবের জন্য নাবীহা দায়ী। ওর জন্যেই সাজির সামনের দিকে এগুতে পারছে না।

-কী ভাবছেন? বাসায় গিয়ে ছেলেকে বোঝান। সম্পত্তির প্রয়োজন হলে তাকে বলুন তাসফিয়ার মন জিতে নিতে। বউ এর সবকিছুই তো তার!
-জি আচ্ছা।
.
.
.
-তুই আবার নাবীহাকে কিছু বলিসনি তো?

আজরার কথা শুনে মানতাশা বলল, কী বিষয়ে?
-ওর সম্পর্কে আমি যা বলেছি।

মিথ্যে বলল মানতাশা-
আরেহ না!
-আচ্ছা তুই বল? আমি কী মিথ্যে কিছু বলেছি? আরশান ভাই তোকে কতটা চায়! আজও কত মিনতি করলো।
-যাই বলিস আজরা! ওভাবে তোর চলে যাওয়াটা আমার পছন্দ হয়নি। নাবীহা হলে ওমন করতো না।
-কারণ সে তোর ভালো চাইবেও না।
-তুই চাস ওর ভালো? ডিভোর্স হয়েছে এমন কারো জন্য প্রস্তাব দিতে চেয়েছিস!
-কেন চেয়েছি ব্যাখ্যা করেছি আমি। তাছাড়া তোরা এমন ভাব করছিস যেন আমি ভুল কিছু করলাম। এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব ও পাবে বলে তোর মনেহয়? ভালো চাই বলেই বলেছি আমি।
-সেটা আমি বুঝছি। কিন্তু নাবীহা নিশ্চয় অন্যকিছু ভাবছে।
-তোকে বলেছে নাকি কিছু?
-নাহ!
-বলে থাকলে বলব ও যতটুক ততটুক নিয়েই ভাবতে। ডিভোর্স হলেও ওর চেয়েও ঢের যোগ্য আমার ভাই। আরে ওর ভালো মন্দ বিচার করার ক্ষমতা নেই এখন। মনমানসিকতা ভালো নেই। ওর কোনো পরামর্শ তুই গ্রহণ করবি না।

এই বলে আলমারি থেকে আরও কিছু বাক্স নামালো আজরা। মূলত ইনতিসারের দেওয়া উপহার সামগ্রী বান্ধবীদের দেখাতে নামাচ্ছে সে। নাবীহা ফ্রেশ হয়ে আসবে জানায়। কিন্তু সে যে আড়াল থেকে এসব শুনছে তারা টেরই পায়নি।

নিজেকে সামলে নিয়ে একটু বাদে নাবীহা প্রবেশ করলো। এতসব উপহার দেখে মানতাশা বলল, এত এত সারপ্রাইজ তোকে ইনতিসার ভাই দিয়েছে!

আজরা হেসে বলল-
উনি কারণে অকারণে সারপ্রাইজ গিফট দিতে ভালোবাসেন। এটা তার সুন্দর একটি স্বভাবও বলতে পারিস।

বিছানার উপরে থাকা উপহার সামগ্রীর দিকে তাকিয়ে নাবীহা আপন মনে ভাবলো, সেও এমন রাজকীয় ভাবে থাকতে পারতো। যদি বিয়েটা ইনতিসারের সঙ্গে হত!

নিশ্চুপ নাবীহাকে দেখে আজরা বলল, কী ভাবছিস?
-ভাবছি তুই অনেক ভাগ্যবতী।
-আসলেই। নাহলে কী আর এতসব কিছু পাই?
-এতসব কিছুর জন্য ভাগ্যবতী নাকি ইনতিসারের জন্য?

নাবীহার কথার মানে বুঝতে না পেরে আজরা বলল-
বুঝিনি?
-কিছু না।

আরেকটু থেমে নাবীহা বলল, সারপ্রাইজ তোর খুব পছন্দ তাই না?
-সে আবার কার হবে না!
-সামনে অনেক বড়ো একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে তোর জন্যে।
-তাই! কী বল?
-সময় হলেই জানবি।

একটু আগেও ইনতিসারকে বলা কথার জন্যে আফসোস হচ্ছিলো নাবীহার। কিন্তু এখনো আজরার বলা কথাগুলো শুনে সে বুঝতে পারে, যা হচ্ছে তাই ঠিক! এটাই হওয়া উচিত আজরার সঙ্গে। নাবীহা চাইলেই কী করতে পারে সেটা দেখানোর সময় এসেছে। সে কার যোগ্য এটা জানানোর সময় এসেছে। আজরার এই অহংকার তার পতন ঘটাবে। এখন ইনতিসারের অপেক্ষা। তার সিদ্ধান্ত কী হয় এটা জানার অপেক্ষায় রয়েছে নাবীহা।
.
.
.
রাতে স্টাডি রুমে অফিসের কিছু কাজ সেরে ঘুমোতে আসে ইনতিসার। আজরা ঘুমিয়ে গেছে। বিছানায় শুতেই কাশির পরিমাণ বেড়ে গেল ইনতিসারের। সন্ধ্যার পর থেকেই কাশি হয়েছে তার। উঠে পড়লো ইনতিসার। কাশতে কাশতে বারান্দায় চলে আসলো সে। কাশির কারণে মাথাটাও ধরেছে খুব। হাঁটাহাঁটি করলে নিশ্চয় ভালো লাগবে।

খানিক বাদে আজরাকে ট্রে হাতে দেখে চমকে উঠলো সে। আজরা এসে বলল, রঙ চা করে এনেছি। গলায় আরাম পাবেন। সাথে মেডিসিন নিয়ে এলাম৷ খেয়ে নিন।

চা এর কাপটা হাতে নিয়ে ইনতিসার বলল, তুমি তো ঘুম ছিলে।
-ঘুম ছিলাম বলে কী আপনার যন্ত্রণা টের পাব না?

চা শেষ করে মেডিসিন খেয়ে রুমে আসে তারা। আজরা বাম নিয়ে ইনতিসারকে বলল, আপনি শুয়ে পড়ুন। আমি মাথা টিপে দিই। নিশ্চয় মাথাটাও ধরেছে?

হ্যাঁ সূচক ভাবে মাথা নেড়ে শুয়ে পড়ে ইনতিসার। আজরা তার মাথা টিপে দিতে শুরু করলো। ইনতিসার ভাবলো, বলার আগেই কিভাবে সব বুঝে নেয় আজরা!
আরামে চোখ জোড়া লেগে আসে ইনতিসারের।

হঠাৎ ইনতিসারের ঘুম ভেঙে যায়। টের পেল এখনো আজরা মাথা টিপতে ব্যস্ত। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে দেখলো, প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেছে। তবুও আজরা থামেনি। ইনতিসার ব্যস্ত হয়ে তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, এখনো জেগে আছ তুমি? আরে হাত ব্যথা করবে তাও!
-কারণ আপনি আরামে ঘুমোচ্ছেন। তাই কিভাবে থামি বলুন?
-সেরে গেছে মাথাব্যথা।
-মিথ্যে বলছেন।
-উহু! শুয়ে পড়ো।

ইনতিসারকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো আজরা। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো ইনতিসার। আজরা তার কত খেয়াল রাখে! সত্যিই মেয়েটা তাকে খুব ভালোবাসে।

পরমুহূর্তেই নাবীহার কথা মনে পড়ে ইনতিসারের। আজরাকে তালাক দিতে বলেছিল সে। এতবড়ো অন্যায়টা কিভাবে করবে ইনতিসার! কাকে বেছে নেবে সে? তাকে সে ভালোবাসে? নাকি সে যাকে ভালোবাসে!
.
চলবে#একদিন_কাঁদবে_তুমিও
#পর্ব_৪৬
#Saji_Afroz

আরশান ও মানতাশার দুরত্ব দেখে এজাজের মনে যেন নতুন এক আশা জন্ম নিয়েছে। আর তা হলো মানতাশাকে আবারও নিজের করে ফিরে পাওয়ার। সে লোভে পড়ে ভুল করেছিল। এখন নিজের ভুল শোধরাতে চায়। তবে ভুল শুধরে কী সে এজাজের কাছে ফিরে আসতে পারে না? জানে, সবটা এতটাও সহজ হবে না। এজাজের পরিবার মেনে নেবে না। কিন্তু আজও যে এজাজ ভুলতে পারেনি মানতাশাকে। তাইতো এতকিছুর পরেও তাকে আবারও ফিরে পেতে চায় সে।
এজাজের হাতে সময় খুব বেশি নেই। একবার কী কথা বলে দেখবে মানতাশার সঙ্গে?
এই ভেবে এজাজ ফোন দেয় মানতাশাকে। তার সঙ্গে একা দেখা করতে বলল। মানতাশা তাকে আসবে জানায়।

এদিকে মানতাশাকে তৈরী হতে দেখে কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করে আজরা। মানতাশা মুখ ফসকে সঠিক ঠিকানা দিয়ে দিলেও এজাজের সঙ্গে দেখা করবে তা জানায়নি।
বলল, এসে সব জানাব তোকে। কিন্তু তুই প্লিজ আরশানকে যেন কিছু বলতে না যাস!
আজরাকে ফোন করেছিল আরশান। লাইনে রেখেই সে এখানে এসেছিল। কারণ একটাবার সে মানতাশার সঙ্গে কথা বলতে চায়। জানাতে চায় নিজের সিদ্ধান্ত। তাই আজরা ফোন হাতে এখানে এসেছিল। ওপাশ থেকে সবই শুনে আরশান।
মানতাশা বেরুনোর পর ফোন কানে নিয়ে মুচকি হেসে আজরা বলল, আমি কিন্তু কিছু বলিনি ভাই!
আরশানও হেসে বলল, বেরুচ্ছি তবে আমিও।
.
.
.
আজরা কী সবসময় নাবীহাকে নিয়ে এমন কথাবার্তা বলতে থাকে? নিশ্চয়! নাহলে সে এসব বলার সময়ই কেন নাবীহা গিয়ে পৌঁছায় সেখানে?
প্রথমদিন অবশ্য ভুলবশত সেসব শুনে ফেলেছিল নাবীহা। কিন্তু পরবর্তীতে আড়ালে দাঁড়িয়ে গোপনে ইচ্ছেকৃতভাবেই সব শুনেছে সে। নিজের প্রতি আজরার এমন ধারণা শুনে কষ্ট পাওয়ার চেয়েও রাগ হচ্ছে নাবীহার। সে নাকি তাদের হিংসে করে! যদি তাই করতো তবে শুরুতেই আজরার সঙ্গে ইনতিসারের বিয়ের কথা শুনে কুপরামর্শ দিতো তাকে। কই! এমন কিছুই তো সে করেনি! আরশান মানতাশার গায়ে হাত তুলেছে বলে তার কাছে এখন ফিরে না যাওয়ার পরামর্শ সে দিয়েছে। আর কখনোই না যেতে তো বলেনি! শুধুমাত্র আরশান যাতে মানতাশার শূন্যতা অনুভব করে সেইজন্যেই তার এমন চাওয়া। এটাকে এমন বাজে ভাবে আজরা উপস্থাপন করবে কখনো ভাবেনি সে।
নাবীহার ফোন বেজে উঠে। তার ফুফু ফোন করেছে। নিশ্চয় তাকে আরও কিছু কথা শোনাবেন। তবুও সে ফোনটা রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে সাজেদা বেগম বললেন, সাজির তার বউ এর রাগ ভাঙিয়ে তাকে বাসায় নিয়ে এসেছে।

নাবীহা বলল, ভালো খবর। আমাকে কেন বলছেন?
-যাতে তুমি আর কোনো শয়তানি না করো।

নাবীহা একটু কর্কশ কণ্ঠে বলল, সবসময় আজেবাজে কথা আপনি বলবেন না। আগে ফুফু মনে করে চুপ থাকতাম। এখন সম্পর্ক নেই বলে যখন আপনি আমাকে অপমান করেন তেমনি আমিও করতে পিছপা হব না। তাই মুখ সামলে কথা বলবেন।

হঠাৎ নাবীহার মুখে এমন কথা শুনে চমকালেন সাজেদা বেগম। অবাক হয়ে বললেন তিনি, কিসের এত তেজ তোমার? জাত বংশের কিছু ঠিক নাই! এত বড়ো মুখ নিয়ে চলো কিভাবে? ওহহো! শুনেছি বান্ধবীর দয়ায় দিন পার হচ্ছে। এসবই পারবা। ওমন পরিবারের দয়া পাবার যোগ্য তুমি, সদস্য হওয়ার নয়।
-তাই! খুব তাড়াতাড়ি দেখা যাবে আমি কিসের যোগ্য।

এই বলে ফোনের লাইন কেটে দেয় নাবীহা।
একটুর জন্য মনে হয়েছিল সে যা করছে তা ঠিক নয়। কিন্তু তার সাথে যা হচ্ছে তা কী ঠিক? এইবার আর ভুল ঠিক কিছুই ভাববে না সে। তাই করবে যেটা তার মন বলে। এবং সবাইকে দেখিয়ে দেবে সে চাইলেই কী করতে পারে!

-আসব?

ইনতিসারকে দেখে ভেতরে আসতে বলল নাবীহা। সে আসলে নাবীহা বলল, তারপর? কী সিদ্ধান্ত নিলেন আপনি?
-আমি তোমাকেই ভালোবাসি। এটা তো মানো?
-কিভাবে মানব বলুন? মানার মতো করে দেখান কিছু!
-আজরার মতন বউ থেকেও তোমার পেছনে ঘুরছি। এতে বোঝো না?
-স্বীকার করলেন তবে আজরা ভালো?
-নি:সন্দেহে সে ভালো।
-তবে থাকুন তার সঙ্গে।
-না নাবীহা। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই। কিন্তু তোমার কী মনেহয়? আজরাকে বললেই তালাক দিয়ে দেবে? দেবে না! কারণ ও আমাকে অনেক ভালোবাসে। প্রয়োজনে সতীনের সংসার করবে সে।

একটু ভেবে নাবীহা বলল, হুম। এটা আমিও মানি। কিন্তু কতদিন আর যন্ত্রণা সহ্য করবে? জোর করে কী সংসার করা যায়? ঠিকই ছেড়ে দেবে একদিন।
-একদিন সেটা কোনদিন হয় তা কী বলা যায় বলো? তাছাড়া আমার মা জানলে এটা কখনোই হতে দেবেন না।
-তবে আপনি কী চাইছেন?
-বিয়েটা সেরে নিতে৷ বিয়ে হয়ে গেলে মা ও কিছু করতে পারবে না। এদিকে আজরা তার বান্ধবীকেই বিয়ে করেছি দেখে নিজেই চলে যাবে।
-গ্যারান্টি কী? যদি সে থেকে যায়! তালাক ছাড়া আপনাকে আমি বিয়ে করছি না। আমি আজরা নই। ভুলভাল আমাকে বোঝাবেন না প্লিজ। যদি আজরাকে ছাড়তে না পারেন তবে আমাকে জীবনে জড়াতে আসবেন না।

হতাশ হয়ে উঠে পড়ে ইনতিসার। অনেক ভেবেছে সে। ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জীবনে তার নাবীহাকেই প্রয়োজন। আরেকবার ওকে পাওয়ার সুযোগ সে হাত ছাড়া করতে চায় না। কিন্তু এখন তালাকের কথা বললে কত ধরনের অসুবিধা হবে এটা নাবীহা বুঝছে না।

যেতেও চেয়েও থেমে যায় ইনতিসার। পেছনে ফিরে বলল, আমার এই কথাটা শোনো। এতে করে আমাদের সবার জন্যই ভালো হবে। আমি চাইনা কোনো ঝামেলায় আর তোমাকে হারাতে। একবার বিয়ে হয়ে গেলে বাকি সব সহজে হয়ে যাবে।
.
.
.
-কী বলবে বলে ডেকেছ? বলছ না কেন?

মানতাশার কথা শুনে এজাজ বলল, তুমি তো জানো কত ভালোবাসতাম তোমাকে আমি? একটু হলেও তো ধারণা রয়েছে?
-হুম।
-সেই ভালোবাসা এখনো রয়েছে মানতাশা। তাই তুমি কষ্ট আছ জেনে স্থির থাকতে পারছি না। যার কারণে পরিবারের বিপক্ষে গিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।
-কী?
-তোমাকে আবার আমার করে নেওয়ার।

একথা শুনে মানতাশা অবাক হয়ে বলল, কী বলছ?
-হু৷ আমি চাই তুমি আবারও ফিরে আসো আমার কাছে। যা হয়েছে সব ভুল মনে করে ভুলে যাও।

আজও তার প্রতি এজাজের এমন ভালোবাসা দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয় মানতাশা। আরও একবার তাকে ঠকানোর জন্য আফসোস হলো তার৷ কিন্তু মানতাশা এজাজের প্রস্তাব মুহুর্তেই প্রত্যাখ্যান করে বলল, তুমি কী চাও? আরও একবার ভুল করি আমি?
-চাইনা বলেই এসেছি তোমার কাছে।
-তোমাকে ঠকিয়েছিলাম এর শাস্তিস্বরূপ এসব আমার প্রাপ্য ছিল। কিন্তু আমি এখন নতুন করে আর কাউকে ঠকাতে চাইনা। আরশান যেমনোই হোক, সে আমার স্বামী। এই সম্পর্কটাকে এতটা ঠুংকো আমি বানাতে চাইনা। আমার ভুল ছিল, ওর ও ছিল। সবটা সংশোধন করে আমি আবার নতুন করে শুরু করব ওর সাথেই। আরশান আমাকে ফিরে পেতে চায়। আমিও কী ওর সাথে কম অন্যায় করেছিলাম! তবে আমি কেন যাব না!

একটু থেমে মানতাশা বলল-
আমি আরশানকে একটি শর্ত দিয়েছিলাম। এটি সে পূরণ করলেও যাব না করলেও যাব। জানি যে এটি পূরণ করলে হয়তো ভাই ভাবীর সাথে সম্পর্ক ছেদও হতে পারে। এতে করে এত আরাম আয়েশের জীবন থেকে বঞ্চিত হব আমরা। কারণ সবকিছুই তার ভাই এর গড়া। বিশ্বাস করো, তবুও আমি আরশানের সঙ্গেই থাকতে চাই। শুধু তাই কেন! যদি কুড়ো ঘরেও কোনো কারণে থাকতে হয় আমি থাকব। আর কোনো লোভ আমি করব না। এইবার অন্তত বৈবাহিক সম্পর্কটাকে গুরুত্ব আমি দেব। কিছু মনে করো না এজাজ। আজ আরেকবার তোমাকে প্রত্যাখ্যান করতে হচ্ছে নিজের সম্পর্কের খাতিরে।

মানতাশার কথা শুনে দু:খ পেল না আজ। বরং আজ সে মানতাশার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানালো। কারণ আজ সে নিজের সুখের কথা না ভেবে সম্পর্কের গুরুত্ব এর কথা ভেবেছে। মানতাশার মাঝে এমন পরিবর্তন দেখে সত্যিই খুশি হয়েছে এজাজ।
সে বলল, আমি দু:খ পাইনি। তুমি খুব সুখী হও এই আশা করি।

এদিকে দূর থেকে এসব শুনে মুখে হাসি ফোটে আরশানের। মানতাশার অতীতের কথা জেনেও তার কষ্ট হচ্ছে না। ভালো লাগছে তার বলা কথাগুলো শুনে। আরশান নিজেও মানতাশাকে ফিরে পেতে চায়। এর বিনিময়ে তার সব শর্ত মানতে রাজি সে।
.
.
.
কলিংবেল বাজলে আজরা ভাবলো মানতাশা এসেছে। সে ড্রয়িংরুমে ছিল বলে নিজেই দরজা খুলতে এলো। দরজা খুলে নাবীহাকে বউ সাজে দেখে অবাক হলো সে। বিস্ময়ভরা কণ্ঠ নিয়ে বলল, কোথা থেকে এলি তুই?

সে কিছু বলার আগে পেছনে তাকিয়ে আরও বেশি অবাক হলো আজরা। এই কাকে সে বর বেশে দেখছে! এটা স্বপ্ন নাকি সত্যি!
.
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here