এক শহর প্রেম পর্ব -০৭+৮

#এক_শহর_প্রেম💓
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথী
#পর্ব_৭
হোস্টেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মারসাদ ও আহনাফ সিগরেট ফুঁ*কছে। এটা ওদের এক বাজে স্বভাব বলা যায়। রবিন, রিহান ও মৃদুল মোবাইলে গেইম খেলছে এখন। আহনাফ সিগরেটের ধোঁয়া ছেড়ে কৃষ্ণ অম্বরে দৃষ্টিপাত করে মারসাদকে জিজ্ঞেস করে,

–আদিরার পেছোনে গিয়েছিলি?

মারসাদ নিরব হাসলো কিন্তু জবাব দিলো না। আহনাফ প্রতিউত্তর না পেয়ে বলে,
–আমি কিভাবে জানলাম জানতে চাইলি না?

মারসাদ ভাবলেশহীন ভাবে বলে,
–আমার বোনকে সঙ্গ দিতে গিয়েছিলি। তারপর সেখান থেকে স্টুডেন্ট পড়াতে গিয়েছিস।

আহনাফও হাসলো। ওদের কথা শুনে মনে হচ্ছে দুই বন্ধু একে অপরকে নজরবন্ধী করে রাখে! মারসাদ একটু রম্য স্বরে পি*ঞ্চ করে বলে,
–তা তোর টিউশন তো সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা ও নয়টায় ছিল তাই না? তাহলে ওই সময় কেনো গেলি?

আহনাফ বাঁকা হেসে মারসাদকে বলে,
–তুই কোনো ওই রাস্তায় গেলি? আমাকে ছাড়া তো তুই একা যাস না ওখানে।

মারসাদ ও আহনাফ দুইজন দুজনের দিকে তাকিয়ে জোড়ালো হাসলো। ভেতর থেকে রিহান ওদের হাসি শুনে আওয়াজ করে বলল,

–কী-রে? তোদের কী পে ত্নী ধরছে? এমন করে হাসোস কেন?

আহনাফ জোরে বলে,
–তুই তোর গেইম খেল আর চিৎকার করতে থাক। পরে হেরে না যাস আবার!

মারসাদ লম্বাশ্বাস ফেলে ভাবলেশহীন কন্ঠে বলে,

–এভরিথিং ইজ এট্রাকশন এন্ড ইনফেচুয়েশন।

আহনাফ মারসাদের কাঁধে হাত রেখে বলে,
–ইনফেচুয়েশন থেকে লাভ। মায়া থেকে ভালোবাসা। প্রতিটা মূহুর্তে নিজের মধ্যে বিপরীত পাশের মানুষটার জন্য প্রেম প্রেম পায় তারপর এক প্রেমকাহিনী। আমরা বিভিন্নরকম ভাবে প্রেমে পরি। তুইও পরেছিস!

মারসাদ তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আহনাফকে পর্যবেক্ষণ করলো। আহনাফের চোখে মুখে চাপা হাসি। মারসাদ জেদী স্বরে বলল,

–এসব কোনো লাভ-সাব না বুঝেছিস? মেয়েটার ভীতু সরল মুখাবয়ব দেখতে ভালো লাগে তাই আরকি!

আহনাফ ব্যাঙ্গ করে বলে,
–তাই বুঝি মারসাদ ইশরাক তার আপিলির প্রিয় ড্রেসটা আদিরাকে পড়তে দিলো!

থমথমে হলো মারসাদের মুখশ্রী। আহনাফ বুঝতে পারে নি মারসাদের খারাপ লেগে যাবে। আহনাফ কিছু বলতে উদ্যত হলে মারসাদ থমথমে কন্ঠে বলে,

–তার প্রয়োজন ছিল সেটার। আপিলির কিছু যদি কারও প্রয়োজনে ব্যাবহৃত হয় তবে আমার আপিলির নিশ্চয়ই ভালো লাগবে।

মারসাদ সিগরেটটা ফেলে রুমের ভিতরে চলে যায়।
__________

সপ্তাহখানেকের বেশি কেটে যায়। আদিরার সাথে মারসাদের খুব একটা দেখা হয় নি। দেখা হলেও চোখাচোখি পর্যন্ত সিমাবদ্ধ। আদিরা পরের মাসের জন্য সকালের দিকে একটা টিউশন খুঁজছে। কিন্তু পাচ্ছেই না। মাস শেষ হতে আর ১০-১৫ দিনের মতো আছে। স্টুডেন্টের মাকেও বলে রেখেছে। তিনি দেখবেন বলেছেন। সামনের মাসে এক্সামও আছে। বই তো কেনা হয় নি তার তাই সে সময় পেলে লাইব্রেরিতে চলে যায়। আজও লাইব্রেরিতে বসে একটা বই থেকে কিছু নোট করছিল তখন কেউ একজন এসে সামনে থেকে আদিরার বইটা বন্ধ করে দেয়। আচমকা এমন হওয়াতে আদিরা চমকে তাকায়। সামনে অচেনা কিছু ছেলে। বেশভূষা আদিরার কাছে সুবিধার লাগছে না। একটা ছেলে আদিরার থেকে বইটা নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলো। তারপর ধ*পাস করে বইটা টেবিলের উপর রেখে দিয়ে ছেলেটা তাচ্ছিল্য স্বরে বলল,

–এসব পড়াশোনা করার কী দরকার তোমার? তোমার তো রিচ বয়ফ্রেন্ড আছেই। মারসাদ ইশরাক! ভার্সিটির সিনিয়রকে তো নিজের ইশারায় এনে ফেলেছো তাহলে এসব মোটাসোটা বই পড়ে সময় নষ্ট করা তো ইউজলেস! তা মারসাদকে কীভাবে তোমার দিওয়ানা বানালে? রূপ দিয়ে বুঝি?

আদিরার গা ঝিমঝিমিয়ে উঠলো। প্রতিটা কথার কতোটা ঘৃণ্য গভীরতা আছে তা স্পষ্ট। ছেলেগুলোর বাজে মন্তব্যে আশেপাশের কিছু ছাত্র-ছাত্রী নিজেদের কাজ ফেলে উৎসুকভাবে চেয়ে আছে। ওই ছেলেটাই আবার বলে,

–চলো। তোমাকে সাগর ডেকে পাঠিয়েছে। মারসাদকে কীভাবে নিজের জাঁলে ফাঁসালে তা আমরাও জানতে চাই।

কথাটা বলেই ছেলেটাসহ সাথের যারা ছিল তারা বিশ্রি হাসলো। আদিরার চোখে অশ্রুরা টলমল করছে। আশেপাশের কেউ এগিয়ে এলো না। দুই-একজন ছেলে উঠে বাহিরে চলে গেলো লাইব্রেরি থেকে। আদিরা কারও কিঞ্চিত পরিমানও সহোযোগিতা না পেয়ে মনঃক্ষুণ্ণ হলো। নিরবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। ওদের মধ্যে আরেকটি ছেলে আদিরাকে কাঁদতে দেখে ব্যাঙ্গ করে বলে,

–এমনভাবে কাঁদে না খুকুমণি। চলো আমাদের সাথে।

ছেলেগুলো আদিরাকে নিয়ে যেতে চাইলে আশেপাশে লক্ষ্য করে দেখে সবাই তাকিয়ে আছে তাই লাইব্রেরি থেকেই একটা মেয়েকে ডাক দেয় যাতে সেই মেয়েটা আদিরাকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। ওই মেয়েটাও বাধ্য হয়ে আদিরার কাছে আসে। অসহায়ভাবে আদিরার ভীত মুখের দিকে তাকিয়ে ছেলেগুলোর সাথে নিয়ে যেতে থাকে। আদিরা না যাওয়ার জন্য অনেক বারণ করলেও ছেলেগুলো তোয়াক্কা করে না। লাইব্রেরি থেকে বের হওয়া মাত্রই যখন ডান দিকে মোড় নিবে তখনি এক ভরাট কন্ঠস্বরের অধিকারী মানুষ ছেলেগুলোর উদ্দেশ্যে বলে উঠে,

–নিলয় ভালোয় ভালোয় আদিরাকে ছেড়ে দে। নয়তো পস্তাতে হবে।

আদিরা কান্নারত ঝাপসা চোখে ভরাট কন্ঠস্বরের অধিকারী ছেলেটির মুখমণ্ডল পরিষ্কার ঠাওর করতে পারলো না তবে গলার স্বরে পরিচিত মনে হলো। ছেলেগুলোর মধ্যে নিলয় নামের ছেলেটি বলে উঠে,

–দেখ মারসাদ, তুই তোর মতো থাক। তোর সময় আমরা কেউ বাঁধা দিতে আসিনি তাই আমাদের সময়ও তুই আসবি না। মেয়েটাকে সাগর নিয়ে যেতে বলেছে তাই ওকে নিয়ে যাবো। বাগড়া দিতে আসবি না। মারসাদ তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

–তা মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়ার কারণটা তো আমাকেই বানানো হয়েছে তাই না? আমার জন্য তো আমি কোনো নির্দোষের ক্ষতি হতে দিতে পারি না। ভালোয় ভালোয় বলছি আদিরাকে ছেড়ে দে আর নিজেদের মতো থাক।

মারসাদ আদিরার হাত ধরে রাখা মেয়েটার দিকে তাকালো। মেয়েটি সাথে সাথে আদিরার হাত ছেড়ে দিয়ে লাইব্রেরিতে চলে গেলো আবার। আদিরা সেখানে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে চলেছ। নিলয় নামের ছেলেটা মারসাদকে উদ্দেশ্য করে ক্ষিপ্ত স্বরে বলে,

–ভালো করছিস না মারসাদ। এর মূল্য চু*কাতে হবে। এই মেয়ের জন্য তোর এতো দরদ কেনো? যা খুশি হোক ওর। তুই আমাদের মাঝে নাক গলাস কেন?

মারসাদ নিলয়ের কাছে এসে নিলয়ের কাঁধে হাত দিয়ে শার্টের উপর ময়লা ঝাড়ার মতো করে শান্ত স্বরে বলে,

–নিজেদের মতো থাক। বাকিটা তোদের না জানাই উত্তম। সাগরকে বলে দিবি, মারসাদকে ভিপির পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে যেতে শুনে এতো খুশি হওয়ার কিছু নেই। মারসাদের প্রতিচ্ছবি এখনও আছে। নিজের ভাগ্যের কথা ভাব তোরা।

নিলয় ও সাথের ছেলেদের নিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে যায়। মারসাদ গিয়ে আদিরার সামনে দাঁড়িয়ে রুক্ষ স্বরে বলে,

–এতো অবলার মতো চুপচাপ থাকো কেনো তুমি? এতো ভীতু কেনো তুমি? নিজের সেফটির ব্যাপারে কোনো হুঁশ জ্ঞান নেই তোমার। ছেলেগুলো কিছু বাজে মন্তব্য করলো আর তুমি কাঁদা শুরু করলে। সাগরকে ভয় পাও বলেই সে তোমাদের দিয়ে যা-তা করায়। টিচারের সাহায্য নিবে বা ভিপি আশিক ভাই ও রাসেল ভাইয়ের সাহায্য নিবে। অবশ্য তোমাকেই বা বলছি কেনো? তোমাকে যখন নাচ করতে বলেছিলাম তখনও তুমি নিশ্চুপ ছিলে। আমি চাইলেই সেটার বাজে ফায়দা তুলতে পারতাম তবে যেটুকু দরকার ছিল কাজ সেটুকুই করেছি। আজ আমি এখানে না এলে তোমাকে যে কী বাজে পরিস্থিতিতে পরতে হতো তা তোমারও ধারণা নেই। যাও ক্লাসে যাও। মাহির সাথে সাথে থাকবে। আমার ফোন নাম্বার নিয়ে রাখবে মাহির থেকে। মাহি এখনই চলে আসবে।

আদিরা নিরবে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে রা পর্যন্ত নেই। মারসাদ লক্ষ্য করলো। এবার নরম কন্ঠস্বরে বলে,

–এই শহর বড্ড নিষ্ঠুর। তোমার মতো সবাই এতো সরল হয় না। এতো সহজ সরল হলে হাঁপিয়ে উঠবে তুমি। বন্ধু বানাও। জানি তুমি গ্রাম থেকে এসেছো। গ্রামের মেয়েরা তো ডানপিঠে হয়। তুমি একা বলে হয়তো এতো চুপচাপ। আমাকে যদি রাফি মেসেজ করে না জানাতো তবে আজ তুমি কতো বড়ো বিপদে পরতো তার ধারণাও নেই তোমার।

আদিরা কিছু বললো না। মাহিকে আসতে দেখে মারসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যায়। মাহি এসে আদিরার দুই গালে হাত দিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে,

–কী হয়েছে আদু? তুই কাঁদছিস কেনো? দাভাই জলদির মধ্যে ফোন করে বলল এখানে আসতে। আর কিছু বলল না।

মাহি আদিরাকে লাইব্রেরির ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসায় তারপর কারও থেকে পানি চেয়ে নিয়ে আদিরাকে দেয়। আদিরা কিছুক্ষণের মধ্যো স্বাভাবিক হয়ে যতোটুকু সম্ভব মাহিকে বলে। মাহি আদিরাকে নিয়ে ক্লাসে গেলো।

________

সাগর রাগে ক্ষোভে ক্রুদ্ধ হয়ে হাতে থাকা বি*য়ারের ক্যান মাটিতে ছুঁড়ে মা র লো। সাগর ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে,

–ওই মারসাদকে আমি দেখে নিবো। ওর সবকিছু ছিনিয়ে নিতে আমি কুণ্ঠাবোধ করি না। ওই আদিরা মেয়েটাকে আমি মারসাদের জীবন থেকে দূরে সরাবোই। এতো কেয়ার ওই মেয়ের জন্য? কিছু একটা তো আছেই। এই সাগর তোর জীবন ন র ক সমতূল্য করে তুলবে মারসাদ। সামিরাকে বাগে পেয়ে গেছি তোর কারণেই। এবার পালা আদিরার। সামিরা এখন আমার চালের গুটি। ওর আদিরার প্রতি রাগ-ক্ষোভকেই আমি কাজে লাগাবো।

………

পদ্ম জলাশয়ের কাছে বসে আছে আদিরা, সাবিহা ও রিন্তি। আর মাহি রঙ তুলির সংমিশ্রণে ক্যানভাসে কিছু আঁকছে মোবাইল দেখে দেখে। আজ ক্লাসের পর মাঝের গ্যাপটা একটু দীর্ঘ। দুই ঘন্টার মতো। কিছু খাবার কিনে এনে ওরা এখানে এসে বসেছে। আদিরা মাহির বই থেকে কিছু নোট করছে আর একটু পরপর মাহির ক্যানভাসে কি আঁকছে তা দেখার চেষ্টা করছে। সাবিহা ও রিন্তি ফেসবুক নিয়ে ব্যাস্ত। দীর্ঘ এক ঘন্টা যাবত কিছু আঁকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মাহি। তাও হচ্ছে না। শেষে অর্ধেকের বেশি কাজ সমাপ্ত করে মাহি ক্যানভাসটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে শুকাতে দিলো। বাকিটা ছুটির পর আঁকবে। মাহি এসে আদিরার পাশে বসে খাবারের প্যাকেট খুলতে খুলতে বলল,

–আদু তুই চাইলে বইটা আজ নিয়ে যেতে পারিস। আমি নাহয় মোবাইলে ছবি তুলে রাখবো। তুই দুইদিন রেখে আমাকে দিয়ে দিস।

আদিরা খুশি হলো। মাহি আদিরার দিকে খাবার দিলে আদিরা ইতস্ততভাবে অল্প একটু নেয়। মেস থেকে যা নিয়ে এসেছে তা মাহি ওদের দিতে তার কেমন যেনো লাগছে। মাহি আদিরার টিফিন বক্স খুলে আলু ভাজি দিয়ে রুটির টুকরো ছিঁড়ে নিজেই খেয়ে নেয়। সাবিহা ও রিন্তিও রুটি ছিঁড়ে নিলো। মাহি রুটি খেতে খেতে বলে,

–দারুন স্বাদ তো। আমার রুটি ভাজি খাওয়া না হলেও স্বাদটা অনেক মজা। সাবিহা, রিন্তি তোদের কেমন লাগলো?

রিন্তি বলে,
–অনেক মজা। আমার তো আলুভাজি সবসময় প্রিয়। কিন্তু হোস্টেলে আলুর সাথে পেঁপে দিয়ে ভাজি করে যা আমার একটুও ভালো লাগে না। পেঁপে কেন দিবে! বিরক্ত লাগে।

সাবিহাও একই ভাবে বিরক্তি প্রকাশ করে। ওরা চারজনে মিলেমিশে টিফিন শেষ করে। এখন ক্লাসের জন্য যাবে। আদিরা উৎসুক কন্ঠে মাহিকে বলে,

–মাহি তোমার চিত্রটা দেখাও না।

মাহি নাচক সুরে বলে,
–উহু। আগে পুরোটা শেষ করি তারপর। এখন উপরে পর্দা দিয়েই রাখবো। এখন দেখলেও বুঝবি না কিছু তোরা।

ওরা চারজন ক্লাসের উদ্দেশ্যে চলে যায়।
#এক_শহর_প্রেম💓
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথী
#পর্ব_৮
–এই মেয়ে দাঁড়াও। তোমার সাথে কথা আছে।
মারসাদের সিরিয়াস কন্ঠস্বরে আদিরা ভয় পেয়ে গেলো। এই মাত্র সে জবা ফুল গাছ থেকে একটা ফুল ছিঁড়েছে। এখন এটার জন্য কী ব*কা শুনতে হবে? আদিরা ভয়ে ভয়ে পেছোন ফিরলো। মেকি হাসতে চাইলো। মারসাদ আদিরাকে মেকি হাসতে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো অতঃপর সামনে এসে সন্দিহান কন্ঠে বলল,

–কী হয়েছে? তুমি কী আবারও ভয় পেয়েছো কোনো কারণে?

আদিরা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। আমতা আমতা করে কিছু বলতে চাইল। তার আগেই তার মনের অজান্তেই তার ফুল নিয়ে রাখা হাতটা পেছোনে লুকালো। মারসাদ সেদিকটা ঠিকই লক্ষ্য করলো আর নিরব হেসে বলল,

–ফুল ছিঁড়া নিষেধ তবে আমি তোমাকে ব*কবো না। জবা গাছটাতে ভরপুর ফুল। আর কিছুক্ষণ পর এগুলো মুষড়ে যাবে। এর থেকে যদি কারও হাতের শোভাবর্ধন করে তবে ক্ষতি কী?

আদিরা যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। মারসাদ এবার সিরিয়াস কন্ঠে বলে,
–শোনো তুমি টিউশন খুঁজছিলে না? আমার স্টুডেন্টের সাত বছর বয়সি চাচাতো ভাইকে পড়াতে পারবে? ক্লাস টু তে পড়ে সে। ওর কোনো টিচার টিকে না। প্রচুর দুরন্ত বাচ্চা।

আদিরার চোখে মুখে খুশির ঝিলিক খেলে গেলো। মাস শেষ হতে আর আট দিনের মতো আছে। তার স্টুডেন্টের মা এখনও নতুন টিউশন খুঁজে দিতে পারে নি আর সে নিজেও পায় নি। মারসাদ আবারও বলল,

–তোমাকে কিন্তু আজ থেকেই পড়াতে হবে। আর সে বলেছে তুমি যদি এই মাসে বাকিদিন গুলো প্রতিদিন যাও তবে তোমাকে অর্ধেক পেমেন্ট করবে। রাজী তুমি?

আদিরা রাজী হয়ে যায়। খারাপ কী? তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলেই হয় তো টিউশন গুলো পেয়ে যাচ্ছে। মারসাদ বলে,

–তাহলে সন্ধ্যার পর তোমাকে আমি রিসিভ করতে আসবো। তোমার মেসে বলে রাখবে।

আদিরার চোখ মুখে বিমর্ষতা ফুটে উঠলো। আদিরা বলল,
–সন্ধ্যার পর? সকালে হলে হয় না?

মারসাদ লম্বাশ্বাস ফেলে বলে,
–না। বাচ্চাটা সকালে একটু বেশি সময় ঘুমোয়। আর দুষ্ট বাচ্চা তো। রাতেই পড়বে। চিন্তা করো না। পরের মাসে তিনদিন রাতে পড়াবে আর শুক্রবার দিনে পড়িও। রাতে যেদিন পড়াবে সেদিন আমার সাথে দিন মিলিয়ে নিও যাতে যাতায়াত প্রবলেম না হয়। এই সাত-আট দিনই সমস্যা হবে তোমার।

আদিরা মিনমিন স্বরে বলল,
–আপনার সাথেই তো যেতে চাই না!

মারসাদ শুনলো। তাও ভ্রুঁ উুঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
–কিছু বললে?

আদিরা মেকি হাসি দিয়ে বলে,
–না। না। কিছু না। আসি ভাইয়া।

আদিরা মুখে না বললেও মনে মনে আদিরা ভাবে,
“পরের মাস থেকে দেখি বলে কয়ে দিনের বেলা আনতে পারি কি-না। উনার সাথে এই সাতদিনই বা কিভাবে যাবো! নেহাত জরুরী আমার।”

……..

আদিরা চলে যাবার পর আহনাফ একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে। আহনাফ এসে পাশে দাঁড়িয়ে মারসাদের কাঁধে কনুই রেখে বলে,

–কী চলছে?

মারসাদ বাঁকা হেসে বলে,
–ফগ চলছে!

আহনাফ উচ্চস্বরে হেসে মারসাদকে ঘু*সি দিয়ে বলে,
–শা*লা! তুই আদিরার জন্য টিউশনও খুঁজছিস আবার কেয়ারনেসও দেখাচ্ছিস! তাও বলবি জাস্ট সরল মুখ দেখে এমনিই মায়া লেগেছে? হাহ্!

মারসাদ ভাবলেশহীন ভাবে বলে,
–অযথা বেশি বোঝার স্বভাব তোর। ওর দরকার ছিল আর রাতের বেলা মেয়েটার সেফটিও দরকার।

আহনাফ বাঁকা হেসে বলে,
–তাহলে কয়েকমাস আগে সামিরাকে কেনো রাত নয়টার দিকে বাড়িতে পৌঁছে দিলি না বা একটু এগিয়েও দিলি না? আমি তোর বেষ্টফ্রেন্ড বন্ধু! তোরে চিনি এক দুই বছর হলো না কিন্তু! তোর সবকিছু আমার সাথে শেয়ার করতি। সেই স্কুল থেকে। তাই আমার সামনে লুকাতে গিয়ে বারবার ধরা খেয়ে যাস।

মারসাদ বাঁকা চোখে তাকালো। তারপর আহনাফের হাত কাঁধ থেকে সরিয়ে স্থান ত্যাগ করলো। আহনাফ হাসলো আর নিজে নিজেই বলল,

–তোকে স্বিকার করতেই হবে। ইউ আর ইন ফার্স্ট স্টেজ অফ লাভ।
_________

আদিরা টিউশন করিয়ে সন্ধ্যার আগে মেসে ফিরলো। ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে বিছানার সাথে গা এলিয়ে দিয়ে কয়েক মিনিট গড়ানোর পরপরই ফোনটা চিৎকার করে বেজে উঠলো। আদিরা ফোন হাতে নিয়ে দেখলো আননওন নাম্বার তাই কে টে দিলো। কিছুক্ষণ পর আবারও বেজে উঠলো। আদিরা এবারও রিসিভ করলো না। মোট চারবার ফোন আসার পর পঞ্চমবারে টেক্সট আসলো,

“ফোন রিসিভ করছো না কেনো? এখনি রিসিভ করবে।
_____মারসাদ”

আদিরা বেকুব বনে গেলো। লোকটা তার ফোন নাম্বার কোথায় পেলো? এই প্রশ্নই তার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। আবার ফোন বেজে উঠলে আদিরা রিসিভ করে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে রাগী কন্ঠে মারসাদ বলে উঠলো,

–জলদি নিচে আসে। টিউশনের সময় হয়ে আসছে মনে আছে? দশ মিনিটের মধ্যে নিচে আসবে। কাম ফার্স্ট।

আদিরাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কে*টেও দিলো। আদিরা ঠোঁট উল্টে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মেসেজ টোনের আওয়াজে মেসেজটা ওপেন করে দেখে সেখানে লেখা,

“বড্ড ঘাড়*ত্যা*ড়া তুমি। মুখ দিয়ে বুলি না ফুটলেও ত্যা*ড়ামি লেভেল ভালোই। এতো না ভেবে জলদি নিচে আসো। তোমার জন্য সারারাত বসে থাকতো পারবো না। জলদি আসো।”

আদিরা মুখ কালো করে উঠে গেলো। তৈরি হয়ে নিচে নামলো। মারসাদ রিকশাতে বসে আছে। আদিরার জন্য পেছোনে আরেকটা রিকশা। স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে উঠে বসলো। গন্তব্য পৌঁছানোর পর রিকশাওয়ালারা ওদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো পারিশ্রমিক না নিয়ে। আদিরা অবাক হয়ে বলল,

–ভাড়া নিলো না তো আমার থেকে।

মারসাদ সামনে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
–তোমার তো আমার সাথে বসতে সমস্যা তাই ডাবল রিকশা নিয়েছি। এখন তাও তোমার সমস্যা? আজব তুমি!

আদিরা বোকার মতো তাকিয়ে থেকে হুঁশ হবার পর মারসাদের পেছোনে যেতে থাকে। স্টুডেন্টের বাসায় গিয়ে স্টুডেন্টকে দেখেই আদিরা বুঝে গেছে প্রচণ্ড ধৈর্যশীল না হলে একে পড়ানো সম্ভব না। স্টুডেন্টের মা ছেলের চঞ্চলতা আদিরাকে বলে তারপর গেলো। স্টুডেন্ট আদিরাকে প্রশ্নর উপর প্রশ্ন করে যাচ্ছে। যেমনঃ নাম কী? কোন ক্লাসে পড়ে? কোথায় থাকে? কোন সাবজেক্টে পড়ে? মেসে কেনো থাকে? গ্রামের বাড়ি কোথায়? ভাই-বোন কতজন? নাস্তাতে কী খেয়েছে? বন্ধু-বান্ধব কতজন? ইত্যাদি।

আদিরা হাঁপিয়ে উঠেছে উত্তর দিতে দিতে। স্টুডেন্টের মা একবার এসে ধ মক দিয়ে গেছে তার ছেলেকে কিন্তু ছেলে আবার কিছুক্ষণ পড়ার পর প্রশ্ন করা শুরু করেছে। আবার নিজে সারাদিন কী করলো না করলো সবটা বলে। পড়ানোর শেষে স্টুডেন্টের মাকে আদিরা দিনে পড়ানোর কথাটা জানায়। স্টুডেন্টের মা পরের মাস থেকে কোনোমতে শুক্রবার ও শনিবার দিনে পড়ানোর কথা বলেছে কিন্তু বাকি দুইদিন রাতেই।
______

মাহি খুব মনোযোগ দিয়ে নিরিবিলিতে কিছু আঁকছে। আশেপাশে কারও উপস্থিতি তার স্মরণে আসছে না। আদিরা মাহির পেছোনে দাঁড়িয়ে চিত্রটা খুব ভালো করে লক্ষ্য করে বলে,

–চেনা চেনা লাগছে চিত্রর মানুষটাকে।

মাহি চমকে পেছোনে তাকিয়ে আদিরাকে দেখে হাসে। তারপর মাহি বলে,

–সেদিনও এটাই আঁকছিলাম কিন্তু ছুটির পর পুরো চিত্রটা বিগড়ে গেছিলো। তাই আজ একসাথে একটু সময় নিয়ে আঁকছি।

আদিরা উৎসুক হয়ে বলল,
–আমি চিত্রর মানুষটাকে দেখেছি মনে হচ্ছে।

মাহি মুচকি হেসে বলল,
–হ্যাঁ। এটা দাভাইয়ের বন্ধু আহনাফ!

আদিরা এবার চিনতে পারে পুরোপুরি। তারপর মাহিকে প্রশ্ন করে,
–তুমি তাকে ভাইয়া বলো না? নাম ধরে বলো যে?

মাহি মুখ লটকে বলল,
–সে আমার চিরশ*ত্রু! আমাকে না জ্বালালে তার পেটের ভাত হ*জম হয় না। আমাকে পিঞ্চ করা এর অন্যতম প্রিয় কাজ। তাই একে আমি ভাই-টাই বলে সম্মান দিতে পারবো না। পারলে তো তুই করে বলতাম! কিন্তু দাভাইয়ের বন্ধু বলে আপনি-তুমি দুইয়ের সংমিশ্রণে বলি। তাছাড়া উনার কোনো প্রবলেম নেই উনাকে ভাই না বলাতে। কখনও কথার মাঝে বাধ সাধে নি ভাই না বলাতে।

আদিরা মুচকি হাসলো অতঃপর রম্য স্বরে বলল,
–তা এজন্যই কী চিরশ*ত্রুকে রঙ-তুলিতে ফুটিয়ে তুলছো? কী দারুন শ*ত্রুতা তোমাদের!

মাহি ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো আদিরার দিকে। আদিরার চোখে-মুখে রম্যতার ছাঁপ দেখে বলল,

–তুই কী আমাকে পিঞ্চ করছিস?

আদিরা ঠোঁট চেপে হাসি আটকিয়ে মাথা নাড়িয়ে না বোধক ইশারা করে। মাহি আদিরাকে একবার পরখ করে আবার চিত্রতে তুলি দিয়ে ঠিক করা শুরু করলো। পেছোনে দাঁড়িয়ে আদিরা মুখ টিপে নিঃশব্দে হাসছে। মাহি হুট করে পেছোন মুড়লো। আদিরাকে হাসতে দেখে তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

–তুই হাসছিস কেনো?

আদিরা এবার হাসি আটকাতে না পেরে জোরেই হেসে দিলো। অনেকদিন পর সে প্রাণখোলা হাসছে। মাহি না বুঝে তাকিয়ে আছে। অদূরে কেউ আদিরার হাসির ছবি তুলে নিলো। তারপর নিজে নিজেই বলল,

“যার হাসি মুগ্ধতা ছড়ায়। তাকে আমি কিভাবে হারাই!”

…….

মারসাদ ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে আহনাফকে নিয়ে ভিপি আশিক ভাইয়ের কাছে যাচ্ছে। আশিক ভাই মারসাদের কাছ থেকে জানতে চান কেনো মারসাদ ভিপির পদে দাঁড়িয়েও সরে যেতে চায়। আসলে সাগর সবার কাছে ব্যাপারটা বলে বেড়াচ্ছে যার দরুন গুঞ্জন উঠেছে।

চলবে ইন শা আল্লাহ্,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here