কল্পকুঞ্জে কঙ্কাবতী পর্ব -০৬

#কল্পকুঞ্জে_কঙ্কাবতী
লেখনীতে: নবনীতা শেখ
|পর্ব ৬|

“আমার হৃদয়হরণী, কোমল এক রমণী সে। তাকে দেখলেই শুধু দেখে যেতে ইচ্ছে হয় এই দু’চোখ ভরে। তার চোখের উপচে পড়া মায়ায় আমি তলিয়ে পাচ্ছি না কুল। বড্ড অদ্ভুত নারী সে। তার আশেপাশে না থাকলে নিজেকে ছন্নছাড়া লাগে, দিন-দুনিয়া হারিয়ে ফেলি। অথচ, সেই নারীটি পাশে থাকলে আমি গোটা নিজেকেই হারিয়ে ফেলি। প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন আমিটা তার সান্নিধ্যে পালটে যাই, পুরোই বিপরীতধর্মী এক সত্তা আমাকে কাবু করতে থাকে। আমার সবচেয়ে প্রিয়! সবচেয়ে প্রিয়– তার কোমল শরীরের মিষ্টি সেই পদ্ম পাপড়ির সুবাস। পাগল করে দেয়। কখনও কোনো নারীর প্রতি আমার এমন অনুভূতি আসেনি। তবে তার প্রতি কেন? কারণ একটাই– সে যে ভিন্ন, আমার কঙ্কাবতী ভিন্ন। তাকে…”

হঠাৎ কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে আমি ঈষৎ কেঁপে উঠলাম। মুহূর্তেই ভয় আমার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। দরদর করে ঘামা শুরু করলাম। মনে মনে দোয়া-দুরুদ পড়ে পেছনে মুড়লাম। আমাকে ভয় পেতে দেখে আমার বিপরীতে অবস্থিত মানুষটি খিলখিল করে হেসে উঠল।
চোখ মেলে তাকালাম আমি। সামনে রাহী দাঁড়িয়ে আছে। বুকে হাত রেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। পরক্ষণেই এক হাতে রাহীর বাহুতে মারলাম।

ও ‘আউচ’ টাইপের শব্দ করে বলল, “মারিস কেন?”

“ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি। আমি তো মনে করেছিলাম, আমার পেছনে তোর ভাই।”

রাহী আবারও হাসল। সেকেন্ড দশেক পর সে প্রশ্ন করল, “ভাইয়ার রুমে কী করছিস?”

“উমম… কিছু না।”—বলেই হাতের ডায়ারিটা জায়গা মতো রেখে দিলাম। তারপর আবার রাহীকে বললাম, “চল এখান থেকে। তোর রুমে যাব। মণি কী করছে এখন?”

“রান্না করছে। শোন, পরশু নৌশির বার্থডে। প্ল্যান করেছিস কিছু?”

“হুমম, করেছি।”

দুজনে মিলে কথা বলতে বলতে রুম থেকে বেরোলাম। মামার বাসায় এসেই মণির সাথে কিছুক্ষণ গল্প করেছিলাম। কুঞ্জ ভাই বাসায় এসেই কোথায় যেন গিয়েছে! তাই মণির সাথে কথা শেষেই কুঞ্জ ভাইয়ের রুমে চলে এসেছিলাম। এই বাসায় আমার সবচেয়ে প্রিয় রুম এটা। এখানে সব কিছুতে ওঁর ছোঁয়া আছে। বাতাসে মিশে আছে তাঁর ঘ্রাণ। এজন্যই আসা।
আমি কুঞ্জ ভাইয়ের বুক শেলফ থেকে বই হাতড়াতে হাতড়াতে তাঁর ডায়ারি পেয়েছি। সেটাই পড়ছিলাম। এই ডায়ারিটা আমি এর আগেও পড়েছি। এটা পড়েই তো তাঁর প্রেমিকা সম্পর্কে জেনেছি। মানতে হবে, মেয়েটা সৌভাগ্যবতী!

______________
“আচ্ছা, নবু! তুই থাক। আমি শাওয়ার নিয়ে আসি। বিশ মিনিট।”

“জানা আছে। তোর আর তোর ভাইয়ের ৪০ মিনিটের নিচে কখনো হয় না। তুই না হয় মেয়ে মানুষ, মানা যায়। কিন্তু তোর ভাই! তাঁর এত সময় লাগে কেন? সে পোলা মানুষ। গুনে গুনে পাঁচ মিনিটে গোসল করবে। এর বেশি কেন নেবে?”

“আমি কি জানি!”

“এককাজ করতে হবে। তোর যে ভাবি হবে, তাকে বলব, ‘ভাবি, শুনুন, জামাইকে হাতে রাখুন। গোসলে পাঁচ মিনিটের যত সেকেন্ড বেশি লাগাবে, তত টাকা ফাইন কাটবেন। আপনার ভালোর জন্যই বলছি।’ একথা বললে দেখবি, সব একদম ঝাক্কাস!”

আমার কথা শুনে রাহী হাসল। কপাল কুঁচকে বললাম, “এত হাসি পায় কেন তোর? আমার জামাই এমন করলে তাকে ওয়াশরুমে আটকে রাখব। বলব, ‘তোর বের হাওয়া লাগব না। তুই এখানেই থাক।’ আমার আবার এরম মানুষ দেখলে রাগ উঠে। উফফস, সরি! এরকম ‘পোলা’ মানুষ।”

রাহী হাসতে হাসতে বলল, “তোর কপালে এমন একটাই জুটুক। আমি গেলাম।”

কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল রাহী। আমি রাহীর রুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে চলে এলাম। মণি এক ধ্যানে রান্না করছে। আমি পা টিপে টিপে গিয়ে মণির পেছনে দাঁড়ালাম।

“কিছু লাগবে, মা?”

আমি মণিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “উফফ! বুঝে গেলে কী করে, আমি এসেছি?”

মণি আলতো হেসে বলল, “ওভাবেই।”

“কী রান্না করছ এটা?”

“ছোটো মাছ।”

“উমম… লুকস ডিলিসিয়াস।”

মণি হাসল। আমি আবারও বললাম, “আচ্ছা, মণি! তোমার ছেলে যে দিনদিন কেমন যেন রুঢ় হয়ে যাচ্ছে, এই ব্যাপারে খেয়াল রেখেছ?”

মণি হাতের খুন্তি নাড়ানো বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “সে কী! কী করেছে তোকে ঐ গর্ধবটা?”

“কিছু করেনি। তবে মনের ভেতর এক নারীকে রেখে আমার এই বাচ্চা মনটার সাথে খেলছে।”

শেষোক্ত কথাটি বড্ড মিনিমিনিয়ে বললাম; যা মণির কানে পৌঁছোয়নি। মণি জিজ্ঞেস করল, “কী বললি?”

“কিছু না। বলছি, তোমার ছেলেকে বিয়ে-টিয়ে দিয়ে দাও। পরে মেয়ে পাবে না, বুঝলে?”

“কেন? আমার ওমন ছেলের জন্য কি মেয়ের অভাব আছে নাকি?”

“সেই তো! এখন অভাব নেই। দিনকে দিন যেমন হয়ে যাচ্ছে; পরে দেখবে, একটা মেয়েও বিয়ে করবে না।”

“সমস্যা নেই। অন্য কেউ বিয়ে না করলে তুই করে নিস।”

মণির এই একটা কথাতেই আমার সমগ্র মুখশ্রী সিঁদুর-লাল বর্ণ ধারণ করে ফেলল। কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। লজ্জা পেলাম বুঝি! খানিকটা অবাকও হলাম। ওঁকে পছন্দ করলে তার মানে বাড়ির কারো কোনো সমস্যা নেই! ইশ! কেন যেন খুশি খুশি লাগছে।

মণিকে উদ্দেশ্য করে থেমে থেমে বললাম, “তাহলে এখন তাঁকে বিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, আমি আছি।”
মণি কাজে ব্যস্ত। শুনল কি আমার কথা! হয়তো হ্যাঁ, কিংবা না। সে যাক গিয়ে! আমার মনে লাড্ডু ফুটছে। এখন তার কঙ্কাবতীর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আমার জিনিসের ব্যাপারে আমি আবার ভীষণ পজেসিভ। কিছু পছন্দ হয়ে গেলে, আমার ওটা লাগবেই। সেম ডিজাইনের অন্য প্রোডাক্ট না, আমার এটাই লাগবে।

_____________
কুঞ্জ ভাই বাসায় ফিরেছেন ঘণ্টা দুয়েক বাদেই। এদিক-ওদিক না তাকিয়ে মণিকে দু’টো কথা বলে নিজের রুমে চলে গেলেন। বসার ঘর থেকে আমি সবটা দেখলাম। বাহ! লোকটার ভাব দ্যাখো! আমাকে যেন দেখেও দেখলেন না।

কুঞ্জ ভাই রুমে যাওয়ার মিনিট দশেক বাদে আমিও গেলাম সেদিকে। দরজা ভেজানো। ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলাম। নাহ্! পুরো রুমে কুঞ্জ ভাই নেই। হয়তো শাওয়ার নিচ্ছেন! স্বস্তির একটা শ্বাস ফেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলাম কুঞ্জ ভাই বারান্দা থেকে বেরোলেন। চোখাচোখি হয়ে গেল আমাদের। শুকনো একটা ঢোক গিলে মনে মনে বাহানা আওড়াতে লাগলাম।

কুঞ্জ ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কী?”

“ইয়ে… বলছিলাম কী… আপনি শাওয়ার নেবেন না?”

“হুম। নেব। এটা বলার জন্য রুমে এসেছিস?”

“না… মানে হ্যাঁ। মণি বলল…”

কুঞ্জ ভাই আমাকে থামিয়ে দিলেন, “থাক, কিছু বলতে হবে না। বোস এখানে।”

আমি চুপচাপ গিয়ে সোফায় বসে পড়লাম। কুঞ্জ ভাই নিজের হাতের ফোনটা বিছানায় ফেলে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে ওঁর ঠোঁটের সাথে লাগোয়া সেই বাঁকা হাসিটা আমার দৃষ্টি অগোচর হয়নি। উনি কি বুঝে গেলেন?
কপাল কুঁচকে ঠোঁট কামড়ে ভাবতে লাগলাম, উনি হাসলেন কেন?

উত্তর পেলাম না। কিন্তু বিছানার উপর ফেলে রাখা ফোনটা আমার নজর কাড়ল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে চোরের মতো ফোনের কাছে গেলাম। ফোন হাতে নিয়ে দেখলাম লক করা। পাসওয়ার্ড কী হবে?
প্রথমবার লিখলাম, ‘03041999’

ওঁর জন্মতারিখ এটা। কিন্তু খুলল না। পরেরবার মণির জন্মতারিখ ট্রাই করলাম। তাও হলো না। আর একবার করা যাবে! ভাবতে লাগলাম। অনেক ভেবে এক পর্যায়ে লিখলাম, ‘KANGKABATI’

খুলে গেল। ইশ! প্রচুর রাগ লাগছে। এত দরদ কীসের ঐ মেয়ের প্রতি! এই মেয়েটাকে এখন সামনে পেলে তুলে একটা আছাড় দিতাম। শাকচুন্নিটা আমার জিনিসের দিকে হাত বাড়িয়েছে!
কুঞ্জ ভাইয়ের মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, কনট্যাক্টস, সব দেখতে লাগলাম। নাহ্! কোথাও এই কঙ্কাবতীকে পেলাম না। কুঞ্জ ভাই যে সেয়ানা! কোন চিপায় যে লুকিয়ে রেখেছে!

এসব কাজে আধা ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। আমার হাতে আছে আর দশ মিনিট। যা যা করার এই দশ মিনিটেই করতে হবে। ভাবতে ভাবতে কুঞ্জ ভাইয়ের মেসেঞ্জারে আমার ইনবক্স ওপেন করলাম। একদম ফক্কা। কোনো কথা হয়নি। অন্য হাতে নিজের ফোন বের করলাম।

কুঞ্জ ভাইয়ের ফোন থেকে নিজেকে মেসেজ করলাম, “শোনো!”

নিজের ফোন থেকে মেসেজ করলাম, “হুম… বলুন।”

ওঁর ফোন থেকে মেসেজের রিপ্লাই দিলাম, “তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে।”

আমার ফোন থেকে দুটো অবাক হওয়ার ইমোজি দিয়ে লিখলাম, “হঠাৎ?”

কুঞ্জ ভাইয়ের ফোন থেকে লিখলাম, “না। অনেক আগে থেকেই। বলার সাহস পাইনি।”

নিজের ফোন থেকে লিখলাম, “তা আজ কীভাবে পেলেন?”

কুঞ্জ ভাইয়ের ফোন থেকে লিখলাম, “অপেক্ষা করতে করতে যদি অন্য কারো হয়ে যাও! তাই আগেই বলে দিলাম। এখন যা হবার হবে।”

“উমম… বুঝলাম।”

“বোঝাবুঝি না। স্যে ইয়েস অ্যর নো।”

নিজের ফোন থেকে লজ্জার ইমোজি দিয়ে লিখলাম, “ইয়েস…”

ব্যাস! এই কনভারসেশনের একটা স্ক্রিনশট নিলাম। এরপর কনভারসেশন ডিলিট করে দিলাম। স্ক্রিনশট ভালো মতো এডিট করে নিলাম, যাতে আমার নাম না বোঝা যায়। তারপর কুঞ্জ ভাইয়ের ফেসবুকে এই স্ক্রিনশটটা পোস্ট করে দিলাম। ক্যাপশনে লিখে দিয়েছি, “অনেক অপেক্ষার পর ফাইনালি সে আমার!”

সাথে দুটো রেড লাভ ইমোজি। আহা! এবার যেন শান্তি লাগছে। গ্যালারি থেকে সেই স্ক্রিনশটটাও ডিলিট করে ফোনটা জায়গা মতো রেখে দিলাম।

তখনই পেছন থেকে দরজা খোলার সাউন্ড পেয়ে সেদিকে তাকালাম। সদ্য শাওয়ার নেওয়া কুঞ্জ ভাইয়ের দিকে তাকাতেই মনে হলো আমার হৃৎপিণ্ড একটা স্পন্দন মিস করে গেল। পরপর তুমুল বেগে স্পন্দিত হতে লাগল।

আমাকে রুমের মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কুঞ্জ ভাই বললেন, “এভাবে মূর্তি বনে আমাকে দেখার কিছু নেই। আমি জানি, আমি দেখতে অসাধারণ! হাঃ!”

মুখ ভেটকালাম। কুঞ্জ ভাই আমার এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে শব্দ করে হাসলেন। হাসতে হাসতে হাতের টাওয়ালটা আমার দিকে ছুঁড়ে বললেন, “ব্যালকনিতে শুকোতে দিয়ে আয়।”

কিছু না বলে তাই করলাম। এখন কোনো মতে ওঁর সামনে থেকে সরতে হবে। উনি পাশে থাকলেই হৃৎপিণ্ডটা কীভাবে যেন লাফায়! উফ! হার্টের পেশেন্ট বানিয়ে দিয়েছেন আমাকে।

চলবে…

[আগামী পর্ব রোববার দেব।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here