কি করে বোঝাই ভালবাসি পর্ব -০৪+৫+৬+৭

#কি_করে_বোঝাই_ভালবাসি ( ৪,৫,৬,৭)

৪.

-কিরে কোথায় গিয়েছিল?
ঘরে ঢুকতেই রনির মুখোমুখি কৌশিক।
-এই একটু হেটে আসলাম।
-একটু তুই তো পুরো দুই ঘন্টা ধরে গায়েব। সারা বাড়ি আশেপাশে সবখানে খুঁজে দেখলাম।
-একটু দূরে চলে গিয়েছিলাম।
-যা রেডি হয়ে নে। বগুড়া যেতে প্রায় তিন ঘন্টার উপর লেগে যাবে। সবাই রেডি।
-আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দে।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেছে বেশ। বাড়ির ভেতরে সবাই বউ বরনের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে ব্যস্ত। কৌশিক কিছুক্ষন থেকে বেরিয়ে আসে। বকুল গাছের তলায় এসে বসে। সিগারেট জ্বালিয়ে টানতে থাকে আপন মনে। কালকেই বউভাত। তারাও রাতের ট্রেনে ঢাকা ফিরবে। আচ্ছা তিথির ফোন নাম্বার তো নেয়া হল না। শান্তর কাছে নিশ্চই আছে। যদি আবার অন্য কিছু ভাবে। তাহলে কি হবে?
কি করে পাবে ফোন নাম্বার। আচ্ছা সে কি যাবে তিথির বাড়িতে?
-কিরে? চলে এলি যে। রনি এসে পাশে বসে।
-হইচই আর ভাল লাগছে না।
-কেন রে। কত সুন্দর সুন্দর সব মেয়ে।
-ওই বয়স কি আর আছে।
-তোকে তো আর মজা করতে বলছি না। পছন্দ করে বিয়ে করে ফেলবি। আচ্ছা ওই মেয়েটা কই বলতো?
-কোন মেয়ে?
-আরে কাল যাকে দেখলাম। সালাম চাচার মেয়ে। বেশ দেখতে কিন্তু।
-কেন? তোর পছন্দ হয়ে গেল নাকি?
-পছন্দ হলেও কি করবো বল। জানিস তো বাবা মা কেমন স্ট্যাটাস কনসার্ন। কখনই মেনে নেবে না।
-তাতে কি আলাদা থাকবি।
-তাই কি হয় নাকি? তোর মত হলে হত। তোর বাবার মত যদি বাবা থাকতো তবে এখুনি বিয়ে করে নিয়ে যেতাম।
-কেন আমার বাবা কি কিছু বলবে না নাকি।
-বলবে যে না তা তুই খুব ভাল করে জানিস। আজ পর্যন্ত তোকে কিছু বলেছে?
-আজ পর্যন্ত এমন কিছু করি নাই যাতে বাবা কিছু বলতে পারে। কিন্তু এই ব্যাপারটায় আমি ঠিক জানি না।
-তারমানে তুইও মেয়েটাকে নিয়ে ভাবছিস?
-বাদ দে। চল শুয়ে পড়ি। রাত তো অনেক হয়ে গেছে।
-কেন? আমাকে বললে কি ক্ষতি।
-চল বেটা ওঠ। কাজ নাই তাই খই ভেজে বেড়াচ্ছিস। আর সব গেল কই। এরা তো মনে হচ্ছে শান্ত কে আজ বাসর ঘরে ঢুকতে দেবে না।

৫.

খুব ভোরে ছাদে চলে আসে শান্ত । মিথিলা তখনও ঘুমে। কাল সারাদিন তিথিকে কোথাও দেখেনি। আসলেই চলে গেল নাকি? সেদিন রাতে অবশ্য একটু বেশী বলা হয়ে গেছে। নাহ চিলেকোঠার ঘর তালা দেয়া। ছাদেও কেউ নেই।

নীচে নেমে মায়ের ঘরের দিকে যায় শান্ত। মা নামায পড়ছেন। সে সোফায় বসে।
-তুমি এত সকাল সকাল? ঘুম হয় নাই? কিছু লাগবে?
-মা… তিথি কোথায়?
-কেন?
-এমনি কালকে দেখলাম না।
ছেলের মুখের দিকে ভাল করে তাকান আফরোজা বেগম। এমন তো না যে তিনি জানতেন না ব্যাপারটা। তিনিও তো মেয়েটাকে নিজের ঘরেই রাখতে চেয়েছিলেন। হঠাৎ করেই ছেলে তার বসের মেয়েকে বিয়ে করবে বলে উঠে পড়ে লাগলো। তিনি শুধু মেয়েটার কষ্ট দেখেছেন বসে বসে।
-ও তো ওদের বাসায় চলে গেছে। আমাকে ফোন করেছিল।
-আচ্ছা।
-এখন বিয়ে করে ফেলেছো শান্ত। এতদিন নিজের যা ইচ্ছা তাই করেছো। এসব আর করা চলবে না। বউ নিয়ে সুখে থাক এই দোয়াই করি সব সময়। আর ওই মেয়েটাকে এখন নিজের মত বাচঁতে দাও।
-কি বলছ মা?
-কেন তুমি কি ভেবেছ আমি কিছু বুঝি না। আমি তোমাকে যেমন বড় করেছি তেমন ওকেও করেছি। হতে পারে ও আমার নিজের মেয়ে না। তাই বলে তুমি ওকে যে কষ্ট দিয়েছ তার জন্য আমি তোমাকে কোনদিন মাফ করবো না।আমি ওকে তোমার চেয়েও ভাল ছেলের সাথে বিয়ে দেব। নিজের ঘরে যাও।

শান্ত বেরিয়ে আসে আর কোনো কথা না বলে।
ছেলেকে নিজের মত করে বড় করবেন ভাবলেও সেটা সম্ভব হয়নি। ছেলে পুরোটাই তার বাবার স্বভাব পেলো। সারাজীবন তিনি যে কষ্ট ভোগ করলেন হয়তো মিথিলাও এমন কষ্টই ভোগ করবে। তিনি সমাজের ভয়ে চলে যেতে পারেননি সব ফেলে । তিথির ভাগ্য ভাল। এটা ভেবে নিজেই হেসে ওঠেন আফরোজা বেগম।

৬.

সন্ধ্যার পর থেকে কৌশিকের দেখা নেই। এদিকে ট্রেনের সময় হয়ে যাচ্ছে। বলা নেই কওয়া নেই মাঝে মাঝেই এই উধাও হবার রহস্য কি? শান্ত তো শশুর বাড়ি চলে গেছে। বাকিরাও বাসে চলে গেল। জনাবের শখ হয়েছে রাতের ট্রেন থেকে যমুনা দেখবে। কোনো মানে হয় এর। ফোনটাও ধরছে না।

অটো থেকে ছোট বাড়িটার সামনে নামলে কৌশিক। দরজার কড়া নাড়তেই একটা আট দশ বছরের ছেলে ছুটে এল।
-কাকে চান?
-তিথি আছে?
ছেলেটা আপা আপা বলতে বলতে ছুটে গেল। বড়ির ভেতরে।

-আপা তোমার কাছে একটা ছেলে এসেছে?
-কে ?
-ওই যে কাল তোমাকে দিয়ে গেল না উনি।
এত রাতে এই লোক এখানে কেন। কাল তো বেশ ভালই মনে হয়েছিল।
তিথি বেরিয়ে আসে।
-আপনি?
-আজ চলে যাচ্ছি তো তাই দেখা করতে এলাম।
-কেন?
-না মনে হল বলে যাই।
-দেখেন ভাইয়া এটা একটা গ্রাম। এখানে ছেলেরা ইচ্ছা করলেই মেয়েদের সাথে দেখা করতে আসতে পারে না। আপনাদের ঢাকা শহরে হয়তো এমনটা হয়।
-আমি এখুনি চলে যাব। দেখ অটো দাড়িয়ে আছে।
-আচ্ছা ঠিক আছে ভেতরে এসে বসেন।
-বসবো না। মানে আমি কি আপনার ফোন নাম্বার টা পেতে পারি? তা না হলে তো যোগাযোগ করতে পারবো না।
-আমার সাথে কেন যোগাযোগ করতে হবে?
-আপনাকে আমার খুব ভাল লেগেছে। কথাটা স্পষ্ট ভাবেই বললাম। কিছু মনে করবেন না প্লিজ।
-ভাল লাগা। আপনাদের মত বড়লোকদের ভাললাগা আর ভালবাসায় আমার বিশ্বাস নেই। আপনাকে তো ভদ্রলোক বলেই ভেবেছিলাম। কিন্তু আমারই ভুল। শান্তর বন্ধুরা তো শান্তর মতই হবে।
-আপনি কিন্তু আমাকে অপমান করছেন।
-যাক তাহলে তো মিটেই গেল। এবার ভালই ভালই বিদায় নিন।
কৌশিক তিথির কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে অটোতে গিয়ে ওঠে। এতটা অপমান কখনও তাকে সহ্য করতে হয়নি। তাও আবার একটা মেয়ের কাছে। সারাজীবন বরং সেই মেয়েদের পাত্তা দেয়নি। আচ্ছা ওই মেয়েগুলোও কি এতটা অপমানিত হয়েছিল?
বাড়ির সামনে অটো থেকে নামতেই রনি ছুটে এল।
-কিরে কোথায় গিয়েছিলি? ট্রেন মিস হয়ে যাবে। চল গাড়িতে ওঠ। ব্যাগগুলো কাঁধে নিয়ে দুজনে গাড়িতে বসে। স্টেশন বেশী দুরে না তাই রক্ষা। কৌশিকের মুখ দেখেই রনি চুপ করে থাকে। কি সমস্যা জিজ্ঞেস করতেও ভয় লাগে। আগে কখনও এমন কালো মুখ দেখেনি ওর।
ট্রেন ছাড়ার পর অনেকটা স্বাভাবিক হল অবশ্য। তবে রনি কিছু জিজ্ঞেস করলো না। নিজে বললে বলবে।

-তিথিদের বাড়ি গিয়েছিলাম?
-কি? কেন?
-দেখা করবো বলে। চলে যাচ্ছি বলে।
-বলে গেলেই পারতি। আমি তো আর বাঁধা দিতাম না।
-বাঁধা দিলেই বুঝি ভাল করতি। খুব অপমান করছে আমাকে।
-কেন?
-ফোন নাম্বার চেয়েছিলাম। আর বলেছিলাম ওকে খুব ভাল লেগেছে।
-তুই কি পাগল? এক দিনেই ভাল লাগার কথা বলে ফেললি।
-কি করবো বল। মনে হচ্ছিল না বললে হারিয়ে ফেলবো। অভিশাপ লেগেছে বুঝলি। এতদিন যতগুলো মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়েছি তাদের।
হো হো করে হেসে ফেলে রনি।
-তো দিল তোকে ফোন নাম্বার?
-নাহ্। কি করে পাই বলতো?
-এই জন্যই তো বলি নিজে নিজে কিছু করার আগে পরামর্শ নিতে। তাহলেই এতকিছু হত না।
-মানে?
-তিথির ফোন নাম্বার তো আমার কাছেই আছে।
-কি? কিভাবে?
-শান্তর ফোন থেকে নিয়েছিলাম।

৭.

লোকটাকে এতটা অপমান করা ঠিক হয়নি। কিন্তু শান্তর কথা ভেবে ভেবে মাথাটা এমন গরম হয়ে ছিল যে, রাগটা আরেক জনের ওপরে গিয়ে পড়েছে। কিন্তু মাফ চাইবার কোন উপায় তো নেই। না দিয়েছে নিজের ফোন নাম্বার না তার ফোন নাম্বার নিয়েছে। কি আর করা যাবে।
সে এখন হলে। আসার আগে অবশ্য চাচীর সাথে দেখা করে এসেছে। শান্তার চলে গেছে বহু আগেই। চাচী তাকে ধরে খুব কান্না কাটি করছিলেন।
শান্তর বিয়ের সময় মন খারাপ লাগলেও এখন তার মনে হচ্ছে আল্লাহ যা করেন তাতেই মঙ্গল। চাচীকে তো সে দেখেছে কতটা সহ্য করতে।
ক্লাস শেষে রুমে এসে বিছানায় শুয়ে ফোন হাতে নিতেই ম্যাসেজ টা দেখলো।
‘Sorry’.
অপরিচিত নাম্বার। সে কোন রিপ্লাই দিল না। গোসল করবার জন্য উঠে পড়লো।
ফোনটা এলো সন্ধ্যার দিকে অপরিচিত নাম্বার ধরবেনা ধরবেনা করেও তিথি ফোনটা ধরলো।
-হ্যালো
-কেমন আছেন আপনি?
-কে বলছেন?
-আমি কৌশিক।
-আপনি? নাম্বার কোথায় পেলেন?
-সেটা দিয়ে আর কি হবে।
-কেন ফোন করেছেন?
-সরি তো বলেছি। আবারও বলছি। আসলে সেদিন ওভাবে আপনাদের ওখানে যাওয়া ঠিক হয়নি।
-আচ্ছা ঠিক আছে। এখন রাখি।
-ঠিক আছে।

অফিসে নিজের ঘরে এসির মাঝেও ঘেমে ওঠে কৌশিক। একটা মেয়ের সাথে কথা বলতেই তার এই অবস্হা।
-কি বাসায় ফিরবেনা?
-জ্বি বাবা। এখুনি বেরুচ্ছিলাম।
গাড়িতে বাবার পাশে বসে কৌশিক চুপ করে বসে থাকে। তার মনে হচ্ছে বাবা তার মনের কথা সব পড়ে ফেলছেন।
-কি হয়েছে বলতো? এমন পাথরের মত বসে আছ কেন? আর কদিন থেকেই দেখছি খুব অন্যমনস্ক। তোমার ফুপু বলল খাওয়া দাওয়াও নাকি করছো না ঠিকমত? কোনো সমস্যা?
-না বাবা।
-যদি থাকেও আমাকে বলতে পার। বন্ধুর বিয়ে থেকে আসার পর থেকেই দেখছি কেমন যেন হয়ে গেছ? কাউকে ভাল লেগেছে?
কৌশিক মূর্তি হয়ে গেল।
রিয়াদ সাহেব ছেলেকে দেখে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে মুচকি হাসলেন। কত কষ্ট করেই না মানুষ করেছেন ছেলেকে। কৌশিকের যখন পাঁচ বছর তখন কৌশিকের মা মারা যায়। নাহ তিনি আর বিয়ে করননি। গ্রাম থেকে তার বিধবা বোনকে এনেছিলেন। ছেলেকে কোন রকম কুশিক্ষার আশ্রয় নিতে শেখাননি তিনি। বাইরে থেকে তাদের সম্পর্ক অন্য রকম মনে হলেও তারা খুব বন্ধু। হয়তো কোন মেয়েকে পছন্দ হয়েছে তাই তাকে বলতে কৌশিকের এত লজ্জা। তিনি আড় চোখে ছেলের দিকে তাকালেন একবার। এখন গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে।
বাসায় ঢুকেই তড়িঘড়ি করে নিজের ঘরে চলে গেল কৌশিক। ধপ করে বিছানায় শুয়েই উঠে বসলো। বাবা কি করে বুঝে ফেলে সব। কিন্তু কি বা বলবে বাবাকে? তিথি তো কথাই বলল না ভাল করে? কি করে বোঝাবে সে তার অনুভূতি?
বাবাকে দিয়ে কি শান্তর মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে? কিন্তু তিথি যদি না করে দেয়?
ধুর এভাবে আর কদিন থাকলে আমি নিজেই পাগল হয়ে যাব।

চলবে……

এমি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here