ক্যাসিনো পর্ব -৪২+৪৩

#ক্যাসিনো
#পর্ব_৪২
©লেখিকা_মায়া

আফজাল শরীফ অশ্রশিক্ত নয়নে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। অনিতের কাছে এসে,,জোরে কয়েটা থাপ্পর মারে। আর হুংকার গলায় বলতে থাকে?? কেন মারলি তুই ওকে? কিসের জন্য?? কি ক্ষতি করেছিল শাহানা তোর?? বল আমায়?

অনিত চোখ দুটো ছোট ছোট করে বাবার দিকে এক ধ্যানে কিছু ক্ষন তাকিয়ে থাকে। তার পর ধীর কন্ঠে বলে!!
সাপ নিয়ে কখনো খেলতে নেই। কিন্তু তুমি সাপ নিয়ে খেলেছো। তবে সাপ ততক্ষণেই নিরাপদ যতক্ষন সে ফনা উঠাই না। কিন্তু যখনি সাপ ফনা তোলে তখন তার ফনা টা পা দিয়ে পিষে দিতে হয়!!
আজ হাতে গুলি লেগেছে। কাল বুকে ও লাগতে পারে বাবা। তাই মাথা উঁচু করে তোলার আগেই। মেরে দিয়েছি। আমার রিস্ক ভালো লাগে না। এতো যত্নে গড়া আমার অন্ধকার সাম্রাজ্য কে ও বিনষ্ট করতে চাইলে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রশ্নেই আসে না।
আফজাল শরীফ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে বলে ও তোর বোন ছিল অনিত!!

yes! she is my step sister….
মনে করিয়ে দেয় আবারো সৎ বোন ছিল আমার! নিজের বোন নয়। আর তুমি কি করে ভাবছো? যে তোমার সৎ ন্যায় নিয়ে চলা মেয়েকে ছেড়ে দিলে সে আমাদের পরবর্তী তে বিপদে ফেলতো না। আর ঐ বাচ্চা গুলো কে ছাড়ার জন্য যদি হাতে গুলি তুলতে পারে। সে মেয়ে তোমার আমার সবার বুকে গুলি ছুড়তে পারে বাবা। আর যা হয়েছে মঙ্গলজনক ভেবে নাও। আমি তোমাকে দেখে অবাক হচ্ছি যে নিজের জন্মদাতা পিতা কে খুন করতে যার হাত কাঁপেনি। সে তার মেয়ের খুনের জন্য চোখের পানি ফেলছে। যে হাজার হাজার পরিবার কে কাঁদিয়ে বাঁচিয়ে আছে সে আজ নিজে কাঁদছে। হাস্যকর বাবা এটা।

নিশান শাহানার নিথর দেহ টা জরিয়ে ধরে আছে। প্রিয় মানুষ টাকে হারানোর ব্যাথা কত টা প্রখর তা নিশান এখন অনুভব করছে। তার কাছে মনে হচ্ছে এই কষ্টের থেকে তার নিজের মৃত্যু শ্রেয় । এতো যন্ত্রনা কেন হচ্ছে?? তার ভিতরের হাড় পাঁজর যেন ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। হৃদপিন্ড টা যেন দগ্ধ আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে এখনি তো জীবিত ছিল মানুষ টি । আর এখনি সে মৃত্যু মানুষ নামে আখ্যায়িত হয়ে গেছে। নিশানের এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। তার প্রিয়তমা স্ত্রী আর কখনো এই দুনিয়ায় চোখ খুলবে না। সে চলে গেছে এই দুনিয়া ছেড়ে। নিশানের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে নিঃশব্দে
কিন্তু তার আহাজারি করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। অনেক জোরে জোরে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। কেন জানি না। তার কষ্টের পরিমাণ বেশি হওয়ায় কাঁদতে পারছে না। ঐ যে কথায় আছে অল্প দুঃখে কাতর অধিক শোকে পাথর।
হঠাৎ নিশানের চোখ জোড়া নিমিষেই রক্ত বর্ন ধারন করে। খুন চেপে যায় তার মাথায়। নিশান উঠে দাঁড়ায়। চোখের পানি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে। আশে পাশে তাকিয়ে,লোহার রড পেয়ে যায় সে। সেটা হাতে তুলে নিয়ে অনিতের মাথায় আঘাত করে। আচমকা এমন আক্রমণে হতভম্ব হয়ে যায় সে। আফজাল শরীফ নিজেও চোখ বড় বড় করে নেয়।

নিশান এলোপাতাড়ি মারতে থাকে অনিত কে আর চিৎকার করে বলে,, কেন মারলে ওকে কেন?? তোদের মত নরপশুদের পাপের শাস্তি তাকে কেন দেওয়া হলো?? আমি বাঁচবো কি করে ওকে ছাড়া। শাহানা নাম ধরে আহাজারি তে ফেটে পড়ে সে। অন্য সব গুন্ডারা নিশান কে ঠেষে ধরে। নিশান কে তারা মাটিতে ফেলে দেয় তার পর। এক জন এক জন করে নিশানের হাতে দাঁড়িয়ে পড়ে এক জন। অপর জন পায়ের উপর। কেউ পিঠে পা তুলে দেয়। অনিত নিজে এবার এসে নিশানের মাথায় পা তুলে দেয়। অনিতের মাথায় আঘাত করাই ফেঁটে যায় মাথা। সেখান থেকে রক্ত গরিয়ে পড়ছে।

নিশান চোখ মুখ শক্ত করে নেয়। শাহানার লাশের দিকে তাকিয়ে জোরে চিৎকার করে শপথ নেয়। আমি তোদের কাউকে ছাড়ডো না।‌সবাই কে কষ্টের শেষ সীমানা অতিক্রম করিয়ে মারবো তোদের। এক জন কেও ছাড়বো না। তোদের না খুন করার আগে আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি
আমাকে সেই পর্যন্ত হায়াত দারাস করে।

অনিত শয়তানি ভাবে বাঁকা হেসে বলে,
চেয়ে তো ছিলাম এখনি তোকে মারতে। কিন্তু তোর এই চ্যালেঞ্জ আমি সাদরে গ্রহণ করলাম। এতো ক্ষন তোকে ও মারার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু এখন তোকে এমন মৃত্যু উপহার দিবো তা কখনই ভুলতে পারবি না। কত টা ভয়ঙ্কর মৃত্যু হতে পারে তোর তা কল্পনাও করতে পারবি না।

নিশান কে অনিত তার মুখে আফিম দিয়ে দেয় মুখ ভর্তি। আফিমের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় খানিক ক্ষন বাদেই পুরো নেশাক্ত হয়ে পড়ে। নিশান উঠে দাঁড়াতে পারে না। মাথা টা তার ঝিম ঝিম করতে থাকে। যতটুকু সজ্ঞান তার থাকে সেই দিয়ে ঢুলতে ঢুলতে শাহানার লাশের উপর পড়ে যায় সে। এলোমেলো কথায় আফজাল শরীফ কে বলে,, আপনি বাবা নামের কলংক। বাবা হওয়ার অধিকার আপনার নেই। কিছু কিছু তেই নেই। নিশান আর কিছু বলতে পারে না তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে।

আফজাল শরীফ ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। সে এখন অনুভূতিহীন মানুষ। আফজাল শরীফ এখন কাঁদছেন‌ না। কিন্তু তার নিজের উপরই নিজের এতো পরিমাণ রাগ হচ্ছে যে নিজেকেই খুন করতে ইচ্ছে করছে তার। সারা জীবনে যত পাপ সে করেছে। তার প্রায়শ্চিত্ত
এখন শাহানা জীবন দিয়ে ভোগ করলো। কষ্টে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই তার। ছেলে মেয়ে গুলো কেও আজাদ করার ক্ষমতা ও নেই আর নিশান কেও ছেড়ে দিতে পারবে না।

পরবর্তী তে….সেই রাতেই সব বাচ্চা গুলো কে পাচার করে দেওয়া হয়। এই দিকে শিরীন, শাহানা কে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দেখে মিসিং ডাইরি করে।মেহমেতের বাসায় গিয়ে জানতে পারে, শাহানা তাদের বাসাতে যায়ইনি ,আর সব থেকে বড় কথা,মেহমেতের এক্সিডেন্ট হয়। আর সে এখন কোমায় আছে।
শিরীন কিছু বুঝতে পারে না। তার মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে যায়।

আর এই দিকে অনিত সব প্লান তৈরি করে, কিভাবে নিশান কে ফাঁসানো যায়। অনিত ইচ্ছাকৃত ভাবেই শাহানা কে এখানে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তাকে মেরে ফেলার কোন প্লান ছিল না। সে শুধু এই অন্ধকার সাম্রাজ্য আর তার বাবার আসল রূপ শাহানা কে দেখা তে চেয়েছিল। শুধু মাত্র শাহানার কারনে সে তার মায়ের সাথে সম্পর্ক খারাপ করেছে। অনিতের মা এ্যানি। আফজাল শরীফ গ্রাজুয়েট সম্পন্ন করার জন্য দেশের বাইরে যায় তখন এ্যানির সাথে তার পরিচয় হয়। আস্তে আস্তে বন্ধত্ব থেকে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। আর শেষে চুপিচুপি বিয়ে করে ফেলে তারা। এ্যানি বিদেশে বড় হলেও তার মা ছিলেন খাঁটি বাঙালি। আর বাবা হলেন বিদেশি। এ্যানির সাথে বিয়ে হওয়া নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়। তখন আফজাল শরীফের বাবা বিয়ে টা মেনে নিতে নারাজ। তার কারনে আফজাল শরীফ এ্যানি কে নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। আর তখন তিনি ছোট খাটো একটা কম্পানি তে চাকরি করতেন।‌কিন্তু দিন দিন এ্যানির চাহিদা যেভাবে বাড়তে থাকে তাতে আফজাল শরীফের সেই অল্প বেতনে এ্যানির এসব আবদার মিটানো কষ্ট সাধ্য হয়ে উঠে। আর তখনই ভালোবাসা রক্ষার্থে অসাধু ব্যবসায়ে জরিয়ে পড়ে তিনি।‌আস্তে আস্তে তা অনেক বড় আকার ধারণ করে। আফজাল শরীফের নিজের ও টাকার প্রতি নেশা জন্ম নেয়। আর এরি মাঝে বাংলাদেশ থেকে খবর আসে আফজাল শরীফের মা ভিষন অসুস্থ আর তাকে তিনি শেষ দেখা দেখতে চায়। অতঃপর আফজাল শরীফ একা আসেন তার মাকে দেখতে। শেষ ইচ্ছে ব্যাক্ত করে বলে,যেন সে দেশেই থেকে যায় আর তার বাবার পছন্দের কাউকে বিয়ে করে। মায়ের শেষ ইচ্ছা আর বাবার পিড়া পিড়িতে বাধ্য হয়ে বিয়ে করে শিরীন কে। ততদিনে এ্যানির বাচ্চা হয়ে গেছে,আর অনিতের বয়স তখন ৬বছর। এ্যানি যখন এসব জানতে পারে তখন থেকে শুরু হয় তাদের সম্পর্কের ফাটল। কিন্তু আফজাল শরীফ জানাই শিরীনের সাথে তার কোন প্রকার স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক নেই। আর এতে তাদের সম্পর্ক আবার ভালো হয়ে যায়। বিগত ৬বছর পর আবার জানতে পারে এ্যানি মা হতে চলেছেন। আর তার কোল আলো করে আসে দুই জমজ মেয়ে,অরিন আর অন্তরা। আর ততদিনে শাহানার বয়স ৪বছর।
এবং পরিশেষে যখন এ্যানি এসব জানতে পারে,যে শিরীনের মেয়ে হয়েছে। তখন থেকেই এ্যানির সাথে সম্পর্কের দাগ আস্তে আস্তে গাঢ় হতে থাকে। আর এসবের মাঝে আবার আফজাল শরীফের এমন কুৎসিত সত্যতা উন্মুক্ত হয়ে যায় আফজাল শরীফের বাবার কাছে। আর তখন তার বাবা নিজে ছেলের বিরুদ্ধে কেস দায়ের করে। আর আফজাল শরীফ ক্ষীপ্ত হয়ে তার বাবাকে শিরি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। আর তা দেখে ফেলে শিরীন। শিরীন কে তখন তার বাবা মাকে আর শাহানা কে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে রাখে তাকে। আর এটাও জানতে পারে,যে আফজাল শরীফ বিবাহিত এক জন পুরুষ যার তিন সন্তান রয়েছে। এসবে শিরীন নিজেও আস্তে আস্তে ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকে। আর তখন থেকেই শাহানা কেন জানি সে ঘৃনা করতে থাকে। ভাবে,,,,

আফজাল শরীফ এখন চাইলে ও এই পাপাচার থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না।‌কারন‌ অনেক বড় বড় লোকদের সাথে তার চলাফেরা। সে যদি এখন ভালোও হতে চায়। তো তাকেও মেরে ফেলবে। সাথে তার পরিবারের সবাইকে ও। তাই সে সব কিছু চুপ চাপ সহ্য করতে থাকে।

তিন দিনের মাথায়। শাহানার লাশ উদ্ধার করা হয়,অনিত আগে থেকেই পুলিশ কে মোটা অংকের টাকা দিয়ে নিজের দলে নিয়েছিল। তার পর ফরেনসিক রিপোর্ট কেও টাকার শক্তি তে বদলে দেয় সে। কেউ নিশানের হয়ে কেস লড়েনি। নয়ন মিয়া পাগলের মত ছুটাছুটি করেছেন। নিশানের মা পাগল প্রায় অবস্থা। নির্জনী সব কিছু সামাল দিতে হিমসিম খেয়ে যায়। মা বাবাকে এতো টা ভেঙে পড়তে দেখে। সে নিজেও মনোবল হারিয়ে ফেলে। আড়ালে চোখের পানি বিসর্জন দেয়। এছাড়া যে কিছু করার নেই তার। সমস্ত প্রমান লুটপাট করে তাদের ইচ্ছা মত লোক লাগিয়ে মিথ্যা প্রমান দিয়ে নিশান কে যাবত জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। নিশান কে চড়া পাওয়ারের ,ড্রাগস দেওয়া হতে থাকে। তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়ে যায়। তার সাথে কি হচ্ছে তার ব্যাপারে সে অগ্য।

যখন তার মস্তিষ্ক সচল হতে থাকে তখন অনিত চলে আসে। ততদিনে ৭দিন পার হয়ে যায় সে কারাদণ্ডে রয়েছে।
নিশানের জ্ঞান‌ আসার সাথে সাথে পাগলামি শুরু হয়ে যায় তার। নিশান কে অনিত বলে,সে যেনো চুপ থাকে, যদিও সত্যি কথা শুনার মতো কেউ নেই এখানে তবুও, কাউকে সত্যি টা না বলতে। আর যদি সে সত্যি টা প্রকাশ করে,তো তার পরিবার কে খতম করে দেওয়া হবে। নির্জনীর মত ফুল কে , বিনষ্ট করে দেওয়া হবে। নিশান অসহায়ের মতো কেঁদে ছিল সেদিন যেদিন তার মা বাবা এসেছিল‌ তার সাথে দেখা করতে। নয়ন মিয়া এক বার বলতে বলেছিল,যে তুমি এসব কিছুই করোনি। এসব মিথ্যা। কিন্তু নিশান কিছুই বলতে পারেনি।

অনিত শেষ বার যখন নিশানের সাথে দেখা করতে আসে তখন বলে, জানো নিশান,, জীবন টা হলো ক্যাসিনোর রুলেটের মতো! কি করে শুনো! রুলেটে যেমন ছোট একটা চাকা সব সময় স্পিন করতে থাকে। ঠিক তেমনি আমাদের ভাগ্যের চাকা টাও স্পিন‌ করতে থাকে। রুলেটে যেমন, অনেক অনেক সংখ্যা থাকে, ঠিক তেমনি আমাদের জিবনে ও অনেক অনেক সংখ্যা থাকে,যেই সংখ্যা গুলোতে রয়েছে, দুঃখ কষ্ট আত্মত্যাগ, আত্মগ্লানি,যন্ত্রনা,ভুগান্তর,সুখ,আরো অনেক কিছু। বল টা যেই নাম্বারে এসে থেমে যায় সেই নাম্বারে যা আছে তা আবার আমাদের জীবন টা ঠিক সেই ভাবে চলতে থাকে। আবার বল স্পিন হতে থাকে। এই করতে করতে এক সময় খেলাও শেষ আর আমাদের জিবন‌ টাও শেষ। কিন্তু যদি টাকা থাকে না পকেটে, তাহলে আমরা এই জীবন নামক রুলেট কেও কিনতে পারি। যেমন, খুন কে ধর্ষন বলতে পারি,আসল খুনি কে মুক্ত করে ভালো মানুষ কে খুনি বানাতে পারি,আর সব থেকে বড় কথা,এক জন মানুষ কে ধ্বংস ও করতে পারি। this is money power!!
এখন তুমি দেখবে মৃত্যু কত টা ভয়ঙ্কর হতে পারে। অনিত কথা শেষ করেই উচ্চ স্বরে হাসতে থাকে।
আর এই দিকে নিশানের মন শুধু এক জন মানুষ কে খুঁজছে ,সে হলো মেহমেত,,
কোথায় সে ?? তার এতো বড় বিপদে কোথায় মেহমেত কে তো এক বারো দেখা গেল না।‌ তাহলে কি সত্যিই মেহমেত নিজেও প্লান‌ করে অনিতের হাতে তাদের তুলে দেয়? হ্যাঁ মেহমেত নিজেও এর মধ্যে আছে না হলে, তার ড্রাইভার কেন তাদের কে নিতে আসতো।
কিন্তু তখন ও নিশান সিওর ছিল না।‌ যে মেহমেত এমন কাজ করতে পারে।

আর ততদিনে নিশানের সাথে পাশবিক নির্যাতন শুরু হয়ে যায়। তাকে প্রতি দিন ড্রাগস দিয়ে জ্ঞানশূন্য করে রাখা হয়। মাথায় কারেন্টের শক দেওয়া হয়।‌ আরো নানান নির্যাতনের শিকার হয় সে প্রতি নিয়ত মৃত্যুর যন্ত্রনা দেওয়া হয় তাকে। আর এতো নির্যাতনে নিশানের মস্তিষ্ক অচল হয়ে পড়ে। এরি মাঝে এক দিন নিশানের সাথে দেখা করতে আসে মিনাল!!!

চলবে_____????#ক্যাসিনো
#পর্ব_৪৩
©লেখিকা_মায়া

জীবন যখন দুঃখ দূর্দশার নদীতে বহমান। যেখানে নেই কোন কূল কিনারা। যেখানে নিশান প্রান পনে চেষ্টা করছিল। এখান থেকে বের হওয়ার। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিল। কোন মিরাকেল হয়ে যাক। এবং সে মুক্তি পেয়ে যাক। আর আসল দোষীদের সে নিজের হাতে শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু সকল ক্ষীণ আশা কে মাটি চাপা দিতে আসে মিনাল।

নিশান গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে মাটিতে,
চোখ বন্ধ করে শাহানার সাথে কাটানো মূহুর্ত গুলো মনে করছে। আর নিজের অজান্তেই চোখের কোণ বেয়ে পানি পড়ছে।
হঠাৎ পরিচিত এক কন্ঠস্বর ভেসে আসে নিশানের কানে। বিদ্যুৎ ন্যায় চোখ খুলে শুয়া থেকে উঠে দাঁড়ায় সামনে মিনাল কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তরিঘরি তার কাছে যায়।

কেমন আছো নিশান?? নিশান উত্তর না দিয়ে আশেপাশে কাউকে খোঁজতে আরম্ভ করে
নিশানের এমন আচারনে মিনাল ভরকে গিয়ে বলে কি খোঁজছো তুমি?? তুমি একা এসেছো?? মেহমেত আসেনি ঐ কোথায়???
মিনাল তখন কিছু ক্ষন থম মেরে বলে। তুমি মেহমেত কে খোঁজছো?? হ্যাঁ কোথায় ও এক বারো আসেনি আমার সাথে দেখা করতে।
মিনাল তখন যা বললো,, তা শুনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না নিশান। তার সারমর্ম হলো মেহমেত কিভাবে আসবে? সে তো নিজেই নিশান কে ফাঁসিয়েছে। কি করে ফাঁসিয়েছে,, তা বলতে গিয়ে মিথ্যে কাঁদার নাটক করে বসে মিনাল। ছেলেরাও যে ছলনা করে কাঁদতে পারে তা হয়তো মিনাল কে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। তার ভাষ্যমতে ,মেহমেত নিজেই ড্রাগসের বক্স তার ঘরে রেখেছে। তার একটা ফটো ও দেখালো নিশান কে। মেহমেত একটা বক্স হাতে ঘরে প্রবেশ করছে।
যেই বক্স থেকেই পুলিশ ড্রাগস পেয়েছে।‌আর এসব মিথ্যা সাক্ষী ও মেহমেত নিজে জুগার করেছে। নিশানের সরল মন ক্ষনিকের বদৌলতে বিষিয়ে দেয় মিনাল। তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে মেহমেত এই কাজ করেছে।‌ এখন নাকি মেহমেত মজ মাস্তিতে দিন পার করছে। এমন নানান কথা সে লাগিয়ে দেয় নিশান কে। নিশানের প্রতিশোধের আগুন আরো দগ্ধ হয়ে উঠে। জলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার পর দাউ দাউ করে যেভাবে আগুন জ্বলে ঠিক সেভাবেই।
নিশান চিৎকার করে উঠে বিশ্বাস ঘাতক বলে।
বেঈমান কেন মানুষ এতো?? আমি নিজের সব থেকে ভালো বন্ধু মনে করেছিলাম আর সে আমার সুখের ঘর এভাবে পুড়ে ছাই করে দিলো। কি ভাবে পারলো সে?? কেন এমন করেছে সে ???

কারন সে ফাস্ট ডিভিশন পেতে চেয়েছিল! সবাই তাকে চিনবে এটা চেয়েছিল।‌শুধু মাত্র ভালো রেজাল্টের জন্য সে বন্ধুত্বের নাটক করছে। আর সব থেকে বড় একটা কথা ,সে নিজে শাহানা কে পছন্দ করতো। আর শাহানা তোমাকে !! এই রেশ সে তুলেছে তোমার উপর।

নিশান আর নিতে পারছে না এই সমস্ত কথা। তার অসুস্থ মস্তিস্কে এমন কথা যেন, বজ্রপাতের ন্যায় মস্তিকে আঘাত করছে।

জীবন যখন নিশান স্রোতস্বিনীর হাতে ছেড়ে দিয়েছে নিশান । ঠিক সেই সময়ে খবর আসে
তাকে আজ তাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু কেন নিয়ে যাওয়া হবে তা সে জানে না। ২মাস পর সূর্যের আলো চোখে পড়লো নিশানের। হায় মুক্তি কতটা মূল্যবান তা বন্দি হওয়ার পর বুঝা যায়।
নিশান কে নিয়ে পুলিশরের গাড়ি ছুটে চললো নিশানের গ্রামের উদ্দেশ্য।

বাড়িতে গিয়ে দেখে, দরজা থেকে মানুষ জন ভীড় করে আছে তার বাড়িতে। এতো ভীড় কেন তাদের বাড়িতে।‌হঠাৎ নিশানের বুক টা ধুক করে উঠে। কোন বিপদ হলো না তো?? সে পুলিশের হাতকরি সমেত দৌড়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো।
মেয়ে মানুষের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। নিশান বুঝতে পারছে কারো কিছু হয়েছে । ছুটে গিয়ে দেখে,সাদা কাপড়ে পাশাপাশি দুই টা লাশ। নিশানের বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়। অজানা আতঙ্কে সে লুকিয়ে পড়ছে নিজের থেকে। কাঁপা কাঁপা হাতে প্রথম লাশের মুখের কাপড় সরাতেই । নিশান ছিটকে দূরে সরে যায়। তার মমতাময়ী মায়ের মুখ। নিশান বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। সারা প্রতিবেশীরা আহাজারি করে কান্না করছে।
শেষ হয়ে গেছে নিশান তোর মা বাবা আত্মহত্যা করেছে । তোর বোন বড় দিঘিতে ঝাঁপ দিয়েছে। তার লাশ টাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিরবে নিশানের গাল বেয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। মা বাবা‌ নির্জনী কেউ এই দুনিয়াতে নেই। হঠাৎ নিশান কাঁদতে কাঁদতে বলে,,সবাই এতো স্বার্থপর কেন?? আমাকে নিষ্ঠুর পৃথিবীতে রেখে কেন সবাই চলে যাচ্ছে কেন?? মা তো সন্তান কে ছেড়ে কখনো যায়না কিন্তু মা কি করে করলো এটা। নিশান মাটি খাঁমচে ধরে কাঁদছে। ছোট বাচ্চাদের মত কাঁদছে। ইয়া আল্লাহ কি পরিক্ষা নিচ্ছো তুমি আমার!! কত কষ্ট দিতে চাও আর।

নিশানের কান্নাতে কেউ কেউ দুঃখ প্রকাশ করলো। আবার কেউ কেউ মুখ বেঁকিয়ে বলে, এমন সন্তান কে তো গলা টিপে মেরে ফেলা উচিত যার জন্য নিজের মা বাবা মরছে। কত কষ্ট করে খেটেখুটে বড় জায়গায় পড়াশোনার জন্য পাঠিয়েছে। আর ছেলে কি করলো?? একটা খুনি ধর্ষক তৈরি হয়েছে। ছিহ!

অন্তিম ক্ষন অব্দি সে আহাজারি করে কেঁদেছে। মা বাবার কে কবর দিয়ে সবাই চলে আসছিল আর নিশান কবরে শুয়ে চোখের পানি ফেলছিল। নিজের বোনের লাশ টাও পাওয়া যায়নি। শেষ দেখা টাও সে দেখতে পেল না। এতো আক্ষেপ সে রাখবে কোথায়?? দিঘির পানি নিশান নিজেও ঝাঁপ দিয়েছিল। আত্মহত্যার চেষ্টা সে নিজেও করেছে।‌ কিন্তু পুলিশ থাকার কারণে তাকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয়।

পরবর্তী একটা জীবন্ত লাশের ন্যায় দিন যাপন করেছিল। নরকের যন্ত্রনা কে সে বুকে জরিয়ে জীবন নির্বাহ করেছিল। এর পর দেবী রায় আসেন নিশানের সাথে দেখা করতে। এবং তাকে সব খুলে বলার জন্য একটা কাগজে সে লেখেছিল যে শাহানা কে বা কারা খুন করেছিল!! কিন্তু পরেরদিন দেবি আর যায়নি। আর এই দিকে সেই কাগজ টা লুকাতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় কারারক্ষীর হাতে। সেই কাগজ যখন কমিশনারের কাছে পৌঁছে যায়।তখন নিশান বেঁচে থাকা কষ্ট সাধ্য হয়ে যায়। সবাই কে তখন তার সাথে দেখা করা বাতিল করে দেওয়া হয়। কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়ে তাকে ঘুমিয়ে রাখা হয়। আস্তে আস্তে নিশানের অধঃপতন শুরু হয়ে যায়। মানসিক রোগী তে পরিণত হয়।
পরবর্তী তাকে মানসিক হাসপাতালে রাখা হয়। ১বছর মানসিক হাসপাতালে কাটিয়ে, অন্যে জেলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। আর তখন থেকে জিবন টা তার স্বাভাবিক চলতে থাকে। এরি মধ্যে মেহমেতের দেওয়া আশা যে ১২বছরের জেল খাটার পর তাকে দেওয়া হবে। তখন থেকেই নিশানের প্রতিশোধের আগুন দ্বিগুণ হতে থাকে। অধীর আগ্রহে দিন গুনতে থাকে। আর নিশানের ভালো আচারনের কারনে দুই বছর আগেই তাকে জেল হাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
আর তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রতিশোধ নেওয়া। সাধারণ যে জনগন কে সে মেরেছে। তারা মেইন কারপিটদের মারতে তাদের সাহায্য নিয়েছিল সে। কিন্তু দিন দিন ঐ লোক গুলোর টাকার প্রতি যে লোভ বেড়ে যায়। আর নিশান কেই ব্লাকমেইল করতে থাকে যে সব পুলিশদের বলে দিবে। তাই তাদের খুন করা হয়েছিল। আর কোন প্রমান রাখা হয়নি।‌কিন্তু দপ্তরি কে মারতে সে ইচ্ছে করেই প্রমান রেখেছিল মেহমেত কে ফাঁসাতে। নিশানের ব্লেজার সে নিজেই চুরি করিয়েছিল।
নিশান সবাই কে মেরে ফেলেছে।‌ ভিসি! যে টাকার লোভে নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছিল।‌এবং হাইকোর্টে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে ছিল। এডভকেট, পুলিশ অফিসার, সবাইকে যারা যারা এই কেসে সাত দিয়েছিল সবাইকে খুন করেছে সে। কাউকে দূর্ঘটনায়,কাউকে কারেন্ট শক দিয়ে,কাউকে পানি তে ডুবিয়ে। আর যাদের আমরা সাধারণ লোক বলছিলাম এরা কোন সাধারণ লোক জন ছিল না। এরা এক একটা কালো ধান্দার সাথে যুক্ত ছিল।

মাঝে মাঝেই গ্রামে যেতো নিশান মা বাবার কবর টা আর নেই। সেই জায়গায় আরো অনেক মানুষ কে দাফন‌ করা হয়েছে, কিন্তু
শেষ চিহ্নের জন্য ছুটে যায় নিশান সেখানে

শাহানার কবর টা বাঁধানো রয়েছে যার কারণে নিশান শাহানার কবরে ও ঘন্টার ঘন্টা কাটিয়ে আসে। শাহানাকে কবর দেওয়া হয় তাদের বাসার বাগানে।

নিশান এতো ক্ষন নিজের গল্প মেহমেত আর মরিয়ম কে শুনালো। মিনাল এতো বড় ঘাতকতা করেছে তা জানতে পারার পর মেহমেতের মনের ভিতর কি চলছে নিশান বুঝতে না পারলেও মরিয়ম ঠিকই বুঝতে পারছে।
নিশান হঠাৎ থম মেরে কিছু ক্ষন বসে থেকে, চিৎকার করে কাঁদতে থাকে,,তার কান্নাতে কত টা ভয়ঙ্কর কষ্ট লুকিয়ে আছে,তা হয়তো মরিয়ম আর মেহমেত উপলব্ধি করতে পারছে। বিনা দোষে এক জন মানুষ কে কত টা সময় ধরে এই সব কষ্ট সহ্য করে আস্তে হচ্ছে। নিজের সমস্ত আপন মানুষ সে হারিয়েছে। চোখের পানি মুছে দেওয়ার ও কোন আপন জন তার নেই।

অতৃপ্ত আত্মাদের মত ভয়াবহ নিশানের কান্না। শরীর কে হারিয়ে ফেলার পর আত্মার আহাজারি যেমন করে ঠিক সেভাবে কান্না করছে নিশান।

কি দোষ করেছিলাম আমি?? মেহমেত এতো বড় বেঈমানী টা কেন করেছিল??
মরিয়ম চোখ বন্ধ করে নেয়,, নিশান কে শুধু মুখে বলে লাভ নেই,,,এখন তাকে প্রমান দিয়েই বুঝাতে হবে যে মেহমেত নির্দোষ। মিনালের কোন চক্রান্ত আছে এর মধ্যে। মেহমেত নিশানের কথায় যখন বলতে যায় যে মিনাল সব মিথ্যা বলছে। তখন মরিয়ম মেহমেতের হাত ধরে নিয়ে তাকে কিছু বলতে না করে। মেহমেত তখন ভ্রু কুঁচকে নেয়। পরক্ষনে ভাবে হয়তো মরিয়ম এই বিষয়ে অন্য কিছু ভেবেছে।

নিশান কে তখন উঠতে বলে,, এবং তাদের সাথে যেতে বলে। কেন যেতে বলছে তার কোন উত্তর সে দেয়না।
নিশান কে নিয়ে সেই হসপিটালে যাওয়া হয় যেখানে মেহমেতের ট্রিটমেন্ট হয়েছিল। ডাক্তার এবং সমস্ত ধরনের রিপোর্ট আরো তথ্য দিয়ে নিশান কে মরিয়ম বুঝানোর চেষ্টা করলো যে মেহমেতের কোন দোষ নেই। সে তিন বছর কোমায় ছিল কার এক্সিডেন্টে। আর সেদিন রাতে তাদের কে নিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল সে। কিন্তু সেই বাসায় গিয়ে তাদের পায়নি। কিন্তু নিশানের ভাবভঙ্গিমা দেখে মনে হলো না যে সে সন্তুষ্ট হয়েছে।।

তাই মরিয়ম নিশান কে বললো মিনাল নিজেই এর ঝট খুলবে তাহলে। দুধ কলা দিয়ে কালসাপ হয়ে রয়েছে সে। কেন এতো বড় ঘাতকতা সে করেছে? কেন মেহমেতের নামে এমন রটনা সে করেছে তার উত্তর সে নিজেই মুখেই দিবে না হয়।।।।

চলবে______?????

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here