গোধুলী বেলায় পর্ব ১৭

#গোধূলি_বেলায়
#পর্ব_17

– আনন্দি একটা অনুরোধ করব তোমায় ?

আনন্দি চমকে তাকালো সমাপ্তর দিকে। রুমে ঢুকার পর থেকে এতোটা সময়েয় মধ্যে ও একবারও চোখ তুলে তাকায় নি সমাপ্তর দিকে। সমাপ্তর দিকে তাকিয়ে বড্ড মায়া হল ওর।
শুকিয়ে যেন কঙ্কালসার হয়ে গেছে দেহটা। এমনিতে সমাপ্ত কখনও সাস্থ্যবান পুরুষ ছিল না। প্রত্যেকদিন জিম করে একেবারে শক্ত সামর্থ্য একজন মানুষ ছিল। কিন্তু পূর্বের সে কিছুই আর নেই। শরীরটা প্রচন্ড রকমের ভেঙ্গে পড়েছে। চোখের কোনে অনেক কালী জমা পড়েছে। আজকের এই মানুষটাকে দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না একদা এককালে এই মানুষটা হাজার মেয়ের হার্টথ্রব ছিল।
আজও এই মুখটার দিকে তাকালে আনন্দি অজানা এক মায়ায় পড়ে যায়। কিন্তু আজ আর কোন মায়ায় নিজেকে জড়াতে চায় না আনন্দি। তাই কিছুটা সময় চোখগুলো বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিল। তারপর উত্তর দিল, অনুমতি নিচ্ছ যে বড়?

– অধিকার দেখানোর দিন অনেকদিন আগেই পেরিয়ে গেছে তাই।

আনন্দি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। তারপর স্বাভাবিক ভাবে বলল, বল কি বলতে চাও?

সমাপ্ত কিছুটা অনুনয়ের সুরে বলল, তুমি আনুসমিকে তোমার সাথেই নিয়ে যাও প্লিজ।

– আজ এতোদিন পর এই কথা বলছ যে?

– আগে বলার জন্য তোমাকে আর পেলাম কই!

– আনুসমিকে আমার দ্বায়িত্বে দেওয়ার কি এই একটাই কারন?

সমাপ্ত কিছুটা সময় চোখ বন্ধ করে কি যেন ভাবল। তবে সেই সময়টা ওর মুখটা প্রচন্ড রকমের শান্ত ছিল, কোন উত্তেজনা, বিতৃষ্ণা বা দ্বিধা ভেসে ওঠে নি মুখ অবয়বে। তারপর চোখ খুলে ঠান্ডা গলায় বলল, নাহ্। জনো আমি না অনেক সার্থপর। আগে যদি তোমাকে পেতাম তাহলে আনুসমিকে দিতাম কি না জানি না তবে আজ বলছি তুমি আনুসমির ভালোর জন্য ওকে নিয়ে যাও।

– কেন? আজ কি এমন কারন যে তুমি আনুসমিকে আমায় দিতে চাইছ?

– একজন মানুষ অনেক বেশী সার্থপর হলেও একজন বাবা কখনও সার্থপর হতে পারে না। সে নিজের জীবনের আগে তার সন্তানের জীবনের কথাটাই আগে ভাবে।

– মানে তুমি কি বলতে চাইছ আমি সত্যি বুঝতে পারছি না।

– আমি জানি আমার কি হয়েছে। তোমরা আসার আগে ডাক্তার আমার সাথে কথা বলেছে। আর আমাকে সবটা বলেছে,,

– তোমার একটা মাইনোর এ্যাটাক হয়েছে জাস্ট।
সমাপ্তকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আনন্দি বেশ বিচলিত হয়ে বলল।

সমাপ্ত খানিকটা হেসে বলল, হ্যা এটা মাইনোর ছিল কিন্তু মেজর হতে কতক্ষণ। ডাক্তার তো বলল এর পরে যদি আমার আর কোন এ্যাটাক হয় তাহলে আমি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে গিয়ে দাড়াব। আর আমার যা মনের অবস্থা তাতে নেক্সট কোন মেজর এ্যাটাক হতে বেশী সময় লাগবে না।

– আমি জানি না তুমি কি নিয়ে এতো চিন্তা কর। সেটা জানার কোন অধিকার আমার নেই। তবে সেটা এবার থেকে না করলেই হয় তাহলে তো এমনটা আর হবে না।

সমাপ্ত আবারও হাসল। তারপর আনন্দির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, যদি বলি সেটা তুমি?

আনন্দি কিছুক্ষণ বিস্ময় নিয়ে সমাপ্তর দিকে তাকিয়ে রইল তারপর ও হেসে দিল। বেশ কিছুটা সময় হাসার পর বলল, ‘তুমি না বড্ড বোকা, আগে ছিলে না তবে আজকাল হয়েছ।’

সমাপ্ত বিরক্তি নিয়ে আনন্দির দিকে তাকালো। কারন আনন্দি হুট করে ওকে বোকা বলাটা সমাপ্তর মোটেও পছন্দ হয় নি। আনন্দি যাওয়ার পর জীবনটা খুব একটা সহজ ছিল না সমাপ্তর কাছে। নিজের জীবনের এমন ছিন্নছাড়া অবস্থা তার উপর মা হীন বাচ্চাটার ঠিকভাবে পালন। সব কিছু সে করেছে একা হাতে তখন পাশে সাহায্যের জন্য কাউকে পায় নি। সম্পূর্ণরুপে একাকীত্বে ডুবে ছিল ও। কিন্তু সে সময়টা ও খুব সুক্ষতার সাথে পার করেছে এবং পাশে মানুষগুলোকে কখনও বুঝতেও দেয় নি ওর মধ্যের অবস্থা। এটা নিশ্চয় কোন বোকা মানুষের কাজ হতে পারে না। বরং খুব বুদ্ধিমান মানুষরাই এমনটা করতে পারে।

আনন্দি কিছুটা সময় নিয়ে আবার বলতে শুরু করল, তোমার কি মনে হয় আমি আনুসমিকে আমার সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে এসেছি। তা হলে তো আর ও অনেক আগেই আসতে পারতাম। তার জন্য দশ বছর অপেক্ষার করার তো কোন প্রয়োজন ছিল না। আর আমাকে এখনও এতোটা নীচু মনের মানুষ মনে করার কোন কারন তো নেই।

এবার সমাপ্ত আনন্দির চোখের দিকে তাকাল। তারপর কড়া গলায় বলল, তাহলে এসেছ কেন? এতোদিন পর আমরা বাবা মেয়ে কেমন আছি দেখতে? বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি তার খোজ নিতে?

আনন্দি সহাস্যে বলল, বালাই ষাট তোমরা মরবে কেন? মরবে তোমাদের শত্রুরা।

সমাপ্ত আবারও কড়া চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, ড্রামা করবা না। এবয়সে এসে তোমার এসব বাচ্চামী ভাল লাগে না।

আনন্দি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমার বাচ্চামী আবার তোমার কখন পছন্দ ছিল সমাপ্ত। আফটার অল আমি ফুল প্যাকেজটাই তো তোমার পছন্দ ছিল না।

সমাপ্ত এবারও নিশ্চুপ থাকল। আনন্দি কিছুটা সময় চুপ থেকে গলা খাকরি দিয়ে বলল, জীবনে শেষ বারে জন্য নিজের মেয়েকে একটু দেখতে।

সমাপ্ত চমকালো তারপর বিস্ময় ভারা গলায় বলল, শেষ সময় মানে?

– হুম তুমি ঠিক শুনেছ। আমি হয়তো আর বেশী দিন বাঁচব না। আমার ব্রেন টিউমার আছে। আর টিউমারটা এমন জায়গায় আছে যে তা অপারেট করাও যাবে না। যদি অপারেশ করা হয় তাহলে অপারেশন টেবিলেই আমার মারা যাওয়ার সম্ভাবনা শতাধিক।
আমার অবশ্য আর বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু বিদেশের কোন ডাক্তারই এই রিস্ক নিয়ে আমার অপারেশন করতে রাজি না। ঔষধ দিয়েছে যে কটা দিন বেঁচে আছি সে কটা দিন যেন সুস্থ থাকি। আর এও বলেছিল যে আমার জীবনের আর কোন অপূর্ণ ইচ্ছা থাকলে যেন তা পুরণ করে নেই অতি শীঘ্রই। জীবনটা তো আর বেশী দিন বাকী নেই।
তাই জীবনের এই শেষ সময়ে নিজের মেয়ের সাথে একবার দেখা করার বড় সাধ জেগেছিল। ভাবি নি তুমি এতো সহজে আমার সাথে ওর দেখা করতে দেবে। ধন্যবাদ তোমাকে তোমার জন্য আমার কাজটা সহজ হয়ে গেল। আর কোন অক্ষেপ নেই আমার জীবনে।

সমাপ্ত ধরা গলায় বলল, এর কি কোন প্রতিকার নেই?

– নাহ্ কোন প্রতিকার নেই। টিউমারটা ধীরে ধীরে বড় হবে তারপর যখন সেটা ব্লাস্ট হবে তখন আমার মৃত্যু ঘটবে তবে সেটা হতে ঠিক কত সময় লাগবে তা ডাক্তার বলতে পারে নি। এখনই হতে পারে আবার দশ বছর পরও হতে পারে।

না তোমার কিছু হবে না। ভারী আতঙ্কিত কন্ঠে বলল সমাপ্ত।

আনন্দি চোখ কুচকে সমাপ্তর দিকে তাকাল তারপর বলল, কেন?

সমাপ্ত নিজেকে সামলে নিলো খুব দ্রুত তারপর বলল, না তোমার কিছু হলে আনুসমির কি হবে? ও কীভাবে থাকবে তোমাকে ছাড়া?

– এতোদিন যেভাবে ছিল তোমার সাথে! ভাল কথা তুমি আর বিয়ে করো নি কেন? যদিও এটা তোমার পার্সোনাল বিষয় তবুও আনুসমির কথা ভেবে বললাম। তুমি বিয়ে করলে ও একটা মা পেত আর তুমিও একটা জীবনসঙ্গী।

– সব মানুষের ভাগ্যে সঙ্গী জোটে না। যাকে ভালবাসলাম সে আমার সাথ দিতে চাইলো না তারপর আর ইচ্ছে হয় নি। আর আনুসমিকে আমি বাবা মা দুজনেরই ভালবাসা দেওয়ার চেষ্টা করেছি কোন অভাব তো রাখি নি।

– এতোটা ভালবাসতে টিয়াকে?

সমাপ্ত সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। আনন্দির কথা শুনে প্রচন্ড চমকালো। আনন্দির দিকে তাকিয়ে দেখল ওর চোখে মুখে প্রচন্ড খোভ স্পষ্ট। সমাপ্ত খানিকটা হাসল তারপর বলল, হয়তো।

আনন্দি মাথাটা নিচু করে রাখল। আজ এতোদিন পর হয়তো এই উত্তরটা ও আশা করে নি। সমাপ্ত বলল, অনেকগুলো দিন তো তুমিও একা ছিলে। তুমি কেন বিয়ে কর নি?

আনন্দি নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে সমাপ্তর দিকে তাকিয়ে বলল, আমি! আমার মতো অনাথকে কে নিজের জীবন সঙ্গী করবে? আমি তো সবার কাছে বোঝা।

আনন্দি চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে ওর মনের মধ্যে কতোটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। চোখদুটো সেই ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করতে করতে পরাস্ত এখন শুধু চোখ দিয়ে বৃষ্টি নামার অপেক্ষা মাত্র।

সমাপ্ত আনন্দির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আমাকে জালাতে এসেছিলে না। নাও এবার নিজে জ্বলো। আজ এতোদিন পর টিয়ার নাম তোমার মুখে শোনার কোন ইচ্ছা আমার ছিল না। তবুও তুমি টিয়ার নাম নিয়ে আমাকে পরাস্ত করতে চেয়েছ কিন্তু তুমি ভুলে গেছ আমার কাছে তোমাকে সোজা করার অনেক মন্ত্র আছে। কারন আমি তোমার স্বামী, তোমাকে আমার থেকে ভাল কেউ চিনে না আর চিনবেও না।

সমাপ্তর ধ্যান ভাঙ্গে দরজা খোলার শব্দে। আনন্দিও চোখ তুলে তাকালো। দরজায় খুলে আনুসমি ঢুকছে। আর শুধু আনুসমি নয় আনুসমির পিছনে আছে সমাপ্তর বাবা সহ পুরো পরিবার।
আনন্দি সবাইকে দেখে কেপে উঠলো। একবারও ওর মাথায় আসে নি সমাপ্তকে দেখতে ওর পরিবার আসতে পারে। কিন্তু এখন ওদের সবাইকে দেখে আনন্দি দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা হয়েছে।
এই পরিবারটা একসময় ওর ছিল। কিন্তু এখন এরা আর ওর কেউ হয় না এখন সবাই কেবল প্রাক্তন। সেদিন আনুসমিকে নিয়ে বেড়িয়ে আসার পর আর কোনদিনও কারও সাথে দেখা হয় নি ওর। আসলে আনন্দি কারও সাথে আর কখনও দেখা করতে চাই নি। আজ আবার সবার সাথে এতোদিন পর দেখা।

আনন্দি সরে গিয়ে রুমের এক কোনায় দাড়াল। কেউ মনে হয় আনন্দিকে খেয়াল করে নি। সবাই গিয়ে সমাপ্তর সাথে কথা বলতে শুরু করে। মনোয়ারা বেগম সমাপ্ত পাশে বসে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। বাকীরা ডাক্তারের সাথে কথা বলছে। ডাক্তারও এসেছে সমাপ্তর চেকাপ করতে।

এতোগুলো লোককে একসাথে সমাপ্তর রুমে থাকার অনুমতি দেয় না ডাক্তার। সবাই একে একে ঘর থেকে বের হতে থাকে। আনন্দি সবার আগচরে কেবিন থেকে বেড়িয়ে চলে আসে। একে একে সবাই কেবিন থেকে বেড়িয়ে আসে।

আনুসমি হঠাৎ মা বলে ডেকে ওঠে। তারপর বেশ চিন্তিত গলায় বলে, আম্মু কোথায় গোল? এখানেই তো ছিল। আম্মু!!
সবাই বেশ অবাক হয় আনুসমি কাকে মা বলে ডাকছে। আনুসমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে আনন্দি করিডোরের শেষমাথায়। চলে যাচ্ছে হয়তো।
আনুসমি দৌড়ে যায় আনন্দির কাছে। এতক্ষণে সবাই দেখে আনন্দিকে। আনন্দিকে এখানে কেউ এক্সপেক্ট করে নি। কেই ভাবতেও পারে নি এতো বছর পর এভাবে এই অবস্থায় আনন্দিকে দেখবে।

আনুসমি দৌড়ে গিয়ে আনন্দিকে জড়িয়ে ধরে। তারপর কান্না করতে করতে বলে, তুমি কোথায় যাচ্ছ আম্মু। তুমি কোথাও যেও না প্লিজ। i need you,,,,,

আনন্দি আনুসমিকে জড়িয়ে ধরে দাড়িয়ে থাকল। সবাই সন্দিহান চোখে আনন্দির দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের মধ্যে থেকে মনোয়ারা বেগম এগিয়ে যায় আনন্দির দিকে। কিন্তু তার দিকে তাকিয়ে আনন্দির ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে কারন তার চোখে মুখে স্পষ্টত রাগের ছায়া দেখা যাচ্ছে আর চোখ দুটো যেন রক্ত লাল বর্ণ ধারণ করেছে।

আনন্দি ভয়ে একটু পিছিয়ে যায়,,

চলবে,,,,

জাকিয়া সুলতানা

বি দ্রঃ ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here