জনৈক প্রেমিক পর্ব -০৮

#জনৈক_প্রেমিক
পর্ব- ০৮

শ্রাবণ পরদিনই আবার হাজির হলেন। একা নয়, সঙ্গে একটা ট্রাক নিয়ে। একাধারে অনেকক্ষন হর্নের আওয়াজ শুনে আমরা বাইরে বেরোই। ততক্ষনে আশেপাশের মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। ঘটনা জানতে সবাই-ই যেন উদগ্রীব। গিয়ে দেখি রাস্তায় শ্রাবণ একটা মিনি ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে। ওকে দেখেই বাবা অপ্রসন্ন হয়ে গেলেন।
একদিন এই শ্রাবণের ব্যক্তিত্বকে ভালোবেসেই বাবা ওনার হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দিয়েছিলেন। শ্রাবণের রাগ তার প্রতি বাবার সম্পূর্ণ ধারণাটাই হয়তো বদলে দিয়েছে। আমার এখনো চোখে ভাসছে, বিয়ের দিন অব্দিও বাবা কীভাবে শ্রাবণকে মাথায় তুলে রেখেছিলেন! এখনো হয়তো রাখতেন। যদি না উনি বাবার অতি আদরে লালিত মেয়েকে চড় না মারতেন। বাবা কোনোদিনই তার দুই মেয়ের গায়ে ফুলের টোকাটুকু পর্যন্ত লাগতে দেননি। নিজে তো কখনো গায়ে হাত তুলতেনই না। মাকেও তুলতে দিতেন না। ঘুনাক্ষরেও বাবা যদি টের পেতেন মা আমাকে কিংবা রিহাকে মেরেছে, সেদিন থেকে তিন দিন অব্দি তিনি মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন না। মাঝে মাঝে ভাতও খেতেন না এজন্যে।
তাই মা-ও আমাদের তেমন মারতেন না। তবে বকতো খুব! কিন্তু মায়ের বকুনি আমাদের গায়ে লাগত না একদম। অথচ যে বাবা আমাদের এত ভালোবাসেন তার সামান্য ক্রোধী মুখচ্ছবিও আমাদের অন্তর কাঁপিয়ে দিত। বাবা একবার নিষেধ করলে সে কাজ দ্বিতীয়বার করার স্পর্ধা আমরা কখনোই করতাম না। বাবাকে আমরা ভয় পেতাম, ভয় পাই। কিন্তু তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিমাণটা এত বেশি, যে সবকিছু অতিক্রমণ করে যায়।

বাবা ভ্রু কুঁচকে শ্রাবণকে বললেন, ‘তুমি আবার এখানে কেন এসেছো? আর পাড়ার রাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে অনবরত হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছ কেন? এটা একটা ভদ্র এলাকা। ‘

শ্রাবণ ট্রাকের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে চার জন লোক মিলে একটা বৃহদাকার শোকেস নামালো ট্রাক থেকে। শ্রাবণ বাবার দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম, বাবা। গতকালের ঘটনার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত! দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন! ‘
বলতে বলতে শ্রাবণ রাস্তাতেই হাটু গেড়ে বসে পরল। আশেপাশের মানুষজন কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে আছে এই দিকে। এলাকার লোকজন যারা উপস্থিত তাদের মধ্যে প্রায় সবাই-ই এসেছিল বিয়েতে। চড় মারার শো’টা তো উপভোগ করেছিলেনই তারা। এখন শ্রাবণের ক্ষমা চাওয়ার শো’টাও উপভোগ করছেন।

হাটু গেড়ে বসেই শ্রাবণ বললেন, ‘আমি অতি জঘন্য একটা কাজ করেছি। সামান্য একটা কারনে নিজের স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছি..!’

শ্রাবণকে থামিয়ে দিয়ে বাবা বললেন, ‘শুধুমাত্র তোমার চাচাতো ভাইকে জানোয়ার বলেছে বলে তুমি ওকে চড় মারবে? তোমার ভাইয়েরও তো দোষ ছিল। হৃদি যখন ফাজলামো করা পছন্দ করছিল না তবুও সে কেন বারবার ফাজলামোগুলো করছিল? ‘

এখন কি শ্রাবণ বলে দেবে ওনার চাচাতো ভাই যে আমার প্রাক্তন! বিয়ের আগে সে আমার প্রেমিক ছিল!
এখন আবার এই বাহানা দেবে না তো, প্রত্ন আর আমি একে অপরকে ভালোবাসতাম আর সেটা শ্রাবণ মেনে নিতে পারেননি। তাই জনসম্মুখে আমাকে চড় মেরেছে।
অবশ্য এই বাহানা দিলেই বা কী! আমি তো কোনো অন্যায় করিনি! কাউকে ভালোবাসাটা কী অন্যায়ের পর্যায়ে পড়ে? এমন তো না আমি বিয়ের পরও প্রত্নর সাথে যোগাযোগ রেখেছি! সমস্তটাই বিয়ের আগের ব্যাপার। তাহলে শ্রাবণ কেন অহেতুক একারনে আমাকে শাস্তি দেবে?

শ্রাবণ নতিস্বীকার করে বললেন, ‘আমার বোঝায় ভুল ছিল বাবা। আমি ভুল করে ফেলেছি। এখন তো চাইলেও সেদিনের ঘটনা বদলাতে পারব না! কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি। এই ইহকালে আমি কোনোদিনও হৃদির ওপর রাগ দেখাব না, গায়ে হাত তোলা তো দূর। আপনি প্লিজ এই অধমকে ক্ষমা করে দিন!’

বাবা শ্রাবণকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ তোমার মনে হয় না আমার কাছে ক্ষমা না চেয়ে যার সাথে অন্যায়টা করেছ তার কাছেই তোমার ক্ষমা চাওয়া উচিত? ‘

শ্রাবণ ত্রস্ত কন্ঠে জবাব দিলেন, ‘ ওর কাছে তো অবশ্যই ক্ষমা চাইব বাবা। আগে প্লিজ আপনি অনুমতি দিন ওকে নিয়ে যাওয়ার!

বাবা নিশ্চল হয়ে বললেন, ‘আমার মেয়ের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত। ও যদি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়ে তোমার সাথে যেতে চায় আমি বাঁধা দেবো না। আবার ও যদি তোমার সাথে যেতে না চায় ওকে আমি জোরও করবো না।

শ্রাবণ আশান্বিত হয়ে তাকালেন আমার দিকে। নরম গলায় বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা করে দাও হৃদি! আমি ভুল করে ফেলেছি। আর কখনো এমন ভুল হবে না! প্রমিস!’

আমি নির্বাক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার সামনে হাটু গেড়ে বসে থাকা লোকটা কি সত্যিই অনুতপ্ত না-কি কেবলই ছল?

আমি তপ্ত শাস ফেললাম। ‘প্লিজ উঠুন! ‘

শ্রাবণ নাছোড় ভাব নিয়ে বললেন, ‘তুমি ক্ষমা না করলে আমি উঠব না।’

আমি নিঃস্পৃহ হয়ে বললাম, ‘ এখানে বসে আর তামাশা করবেন না। দয়া করে উঠুন।’

শ্রাবণ কি আশাহত হলেন? ওনার মুখের রঙ যেন বদলে গেল। নিরাশ কন্ঠে বললেন, ‘হৃদি তুমি কি সত্যিই ভাবছো আমি তামাশা করছি? তুমি সবসময়ই কেন আমার ভালোবাসাকে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য কর! আমি কি এতই ঘৃণ্য, এতই কুৎসিত, এতই বর্বর?’
কয়েক মুহূর্ত থেমে আবার বললেন, ‘হ্যা আমি ভুল করেছি নিশ্চয়ই। তাই বলে কি আমাকে একেবারেই ক্ষমা করা যায় না হৃদি! অন্তত একটাবার কি সুযোগ দেওয়া যায় না আমাকে!’

আমাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে শ্রাবণ বললেন, ‘আচ্ছা ঠিকাছে। তোমাকে এখনি ক্ষমা করতে হবে না। তুমি চলে যাও। কতক্ষণ এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে! আমি নাহয় অপেক্ষা করবো তোমার ক্ষমার। এখানে বসেই।’

রিহা চেঁচিয়ে উঠল ‘এখানে বসে অপেক্ষা করলে তো সিএনজি আপনাকে চাপা দিয়ে চলে যাবে দুলাভাই!’

রিহার গিরগিটির মতো রঙ বদলাতে দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। ও না-কি শ্রাবণকে কখনোই দুলাভাই বলে ডাকবে না? গতকাল পর্যন্তও ওই লোক, ওই লোক করছিল। আর আজ চোখের পলকে দুলাভাই হয়ে গেল!

রিহার কথার প্রতুত্তরে শ্রাবণ বললেন, ‘কী করব বল! আমিও তো নিরুপায়। তোমার বোন ক্ষমা না করলে আমরণ অনশন করা ছাড়া আমার তো আর কোনো উপায় নেই!’

মা, বাবা, রিহা, শ্রাবণ সকলেই আমার দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যার অর্থ হচ্ছে এই, ক্ষমা করেছ না-কি করনি?

রিহাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে ও চাইছে আমি শ্রাবণকে ক্ষমা করে দেই। মা’র দৃষ্টিতেও একই বচন। আর বাবা আমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

আমি আমার উত্তর জানালাম, ‘আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এবার উঠুন!’

আনন্দে শ্রাবণের চোখ চকমকিয়ে উঠল। উনি খুশিতে গদগদ হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। ওনার ভাব-ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে এখনি আমাকে জড়িয়ে ধরবেন। আমি শঙ্কায় আতকে উঠলাম। বাবা-মা সকলের সামনে উনি যদি এখন আমাকে জড়িয়ে ধরেন এর চাইতে লজ্জার আর কিছু হবে না।

কিন্তু না আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে উনি মায়ের দিকে এগিয়ে গেলেন। মা’কে বললেন, ‘মা কালকে আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। রাগের বশে আপনার প্রিয় একটা জিনিস ভেঙে ফেলেছি। ফার্নিচারের দোকানে হুবহু ওইরকমি অনেক খুঁজেছি, পাইনি। এটা আপনার পছন্দ হয়েছে তো মা?’

মা বলল, ‘এসবের কোনো দরকার ছিল না, বাবা!’

শ্রাবণ জোর করলেন, ‘অবশ্যই ছিল! আপনার অতো প্রিয় ছিল ওটা! আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি মা। এখন থেকে আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করব নিজের রাগকে দমানোর।’

বাবাও চাইলেন না শ্রাবণের আনা শোকেসটা রাখতে। প্রথমত, ওটা আমার শ্বশুর বাড়ি থেকে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, তাও আবার আমাদের আগেরটার ডাবল।
শ্রাবণ মা-বাবার সাথে জোরাজোরি করতে লাগলেন। বলতে লাগলেন, সে ক্ষতি করেছে তাই ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে তো এটা গ্রহন করলে তাতে দোষ কোথায়?
অবশেষে শ্রাবণ বিজয়ী হলেন। শোকেসটা নিয়ে মা’র ঘরে রাখা হল।

মিস্ত্রিদের সাথে শ্রাবণও ঘরে এলেন। মা ওনাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে চা-নাস্তা খেতে দিলেন। এবারও শ্রাবণ রিহাকে দিয়ে খবর পাঠালেন। আমি ওনার সামনে গিয়ে না বসলে উনি খাবেন না। গতকালকে এভাবেই রাগ করে না খেয়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি। উপায় শূন্য হয়ে তাই ওনার সামনে গিয়ে বসলাম। মা আমাদের একা ছেড়ে চলে গেল। শ্রাবণ আমাকে একটা বিস্কুট সাধলেন। কথা না বাড়ানোর জন্য বিস্কুটটা নিয়ে কামড় বসালাম। আচমকা ছো মেরে বাকি অর্ধেকটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিলেন উনি। তারপর নিজে খেতে লাগলেন। আমি বিরক্তি চোখে তাকালাম ওনার দিকে। উনি দাঁত বের করে হাসলেন।

আমি বললাম, ‘আপনি গতকাল থেকে এমন আচরণ করছেন যেন আমাদের প্রেমের বিয়ে! আর আমাকে কতোই না ভালোবাসেন।’

শ্রাবণের দৃষ্টি পরিবর্তিত হয়ে গেল। অদ্ভূত চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘প্রেমের বিয়ে না। কিন্তু এটা তো ঠিক, আমি তোমাকে প্রবলভাবে ভালোবাসি।’

আমি বললাম, ‘আপনি আমাকে যেহেতু ভালোবাসেন, সেহেতু আপনার তো আমাকে বোঝার দরকার!’

শ্রাবণ ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘বুঝবো।’

‘আমি আপনার সঙ্গে যেতে চাই না।’

বিস্ময়ের ঝলকানি দেখা গেল শ্রাবণের চোখে-মুখে। ‘কেন যাবেনা হৃদি? তুমি কি এখনো আমাকে ক্ষমা করতে পারো নি? ‘

আমি জবাব দিলাম, ‘ব্যাপারটা এমন নয় যে আমি আপনাকে ক্ষমা করিনি। আমি জাস্ট আপনার সাথে যেতে চাইছি না।’

শ্রাবণ হঠাৎ মন খারাপ করে বললেন, ‘আমাকে অপছন্দ বলে?’

‘আমি জানিনা কেন! কিন্তু আমার আপনার সাথে যেতে ইচ্ছে করছে না। ‘

শ্রাবণ আচমকা উঠে দাঁড়ালেন। সামান্য হেসে বললেন, ‘আচ্ছা ঠিকাছে। তুমি কিছুদিন সময় নাও। আমি নাহয় ততদিন তোমার জন্য অপেক্ষাই করি! কিন্তু একলা ছাড়বো না কিছুতেই। প্রতিদিনই তোমাকে বিরক্ত করতে এই বান্দা হাজির হয়ে যাবে। ‘ বলেই দুষ্টু হাসি হাসলেন। তারপর আবার বললেন, ‘আচ্ছা তোমাদের বাড়ির আশেপাশে কোনো বাসা ভাড়া পাওয়া যাবে?’

আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, ‘আপনি কি নিজের বাড়ি ছেড়ে এখন আমাদের এলাকায় এসে ভাড়া থাকবেন?’

শ্রাবণ চলে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। মুখে বললেন, ‘অবশ্যই!’
এরপর চলে যেতে যেতে অকস্মাৎ পিছু ফিরে তাকিয়ে বললেন, ‘আমাদের প্রেমের বিয়ে না ঠিক। কিন্তু তুমি চাইলে কি হতে পারতো না?’

আমি বিস্মিত হলাম। আমি চাইলেই বা কীভাবে হতে পারতো! ওনাকে চিনতে-জানতে পারলামই তো বিয়ে ঠিক হবার পর! সবে মাত্র দশ দিন হলো ওনার সঙ্গে আমার পরিচয়ের।

(

চলবে…

লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here