তুমিময় প্রেম পর্ব ৭

#তুমিময়_প্রেম🥀♥
#PART_07
#FABIYAH_MOMO🍁

রাতে খাওয়া শেষে রুমে এসে বিছানা ঠিক করছি ছোট ভাই এসে আমার পিছু গিয়ে দাড়ালো। ওর উপস্থিতি টের পেয়েও আমি বিছানা বালিশ জায়গামতো রাখছি। ও বিনয়ী সুরে বলল,

–আপু আপু…কথা আছে!!

আমি ব্যাগ গুছাচ্ছি, কাল ক্যাম্পাস, আবার ওই ছেলের ভাতিজিকে পড়াতে যাবো কিনা ফাইনাল না। আমি দুটো টিউশনি করছি, আরো একটা ঘাড়ে নিলে পড়াশুনাতে সময় পাবো কিনা খোদা জানে। ছোট ভাই আবার স্বরের নম্রতা নিচু টেনে এখন সে অনুনয় সুরে বলল,

–এই আপু শুনো না…আমার কথা কেউ শুনে না…আব্বু শুনে না…আম্মু বকে,

সব রেডি করে চুলে দুই বেনি করছি, আয়নায় ওর দিকে মুখ ফুলানো কুটুস চেহেরা আড়চোখে দেখে চলছি। আমি গম্ভীর করে বললাম,

–তোর কথা বল, তারপর রুম থেকে ফোট! আমি ঘুমাবো!
–আপু? আমার ব্যাট লাগবে, সাদির বাসায় ব্যাট আছে…আমার নেই,
–তোর ব্যাট লাগবে আব্বু শুনছে?
–আব্বু বলছে বেতন দিলে কিনে দিবে….বেতন দিতে দেরি আছে…আমার ব্যাট চাই! চাই! চাই! আমার ওই ব্যাট চাই! আমার ব্যাট চাই!

“ব্যাট” নিয়ে ও জেদ চেপে বসলো ওর ব্যাট চাই। আব্বু ওকে ব্যাট কিনে দিবে। উনার স্যালারি দিলেই ব্যাটটা হাতের মুঠোয় এনে দিবে। কিন্তু এই বান্দা বড় নাছোড়বান্দা! আব্বুকে খাপছাড়া বানিয়ে জ্বালাতন না করে শান্তি দিবে না। আম্মু তো চোখ ঘুরালেই চুপ! ফের আম্মু না থাকলে হুল্লোড়! ওকে কোনোরকম সান্ত্বনার বার্তা বুঝিয়ে ঘুমাতে যেতে বললাম। আমি রুমের লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। দুঃখিত!…ঘুম নেই আমার। অন্ধকারে আমার সাথে সাথেই শান্তির ঘুম আসেনা। আমার মাথায় প্রচুর চিন্তা। বস্তাভর্তি চিন্তা গাদাগাদা করে থাকে। বই কিনার টাকায় শর্ট, আব্বুর নতুন ফোন কিনে দেয়াতে আমার জমা টাকায় ব্যাঘাত, হাত-খরচা নেই, ক্যাম্পাসে টাকা বাচিয়ে যেতে হবে, রিকশা ভাড়া রোজ রোজ ইসরাত দিলেও কটু দেখাবে, পার্স ব্যাগ বলতে গেলে খালি। এত কিছুর পরেও ঘুম থাকবে? জানি না অন্য মানুষের ঘুম থাকে কিনা আমার চোখে ঘুমের ছিটেফোঁটা থাকেনা। টিউশনি করেও যদি টাকার হিসাব মিলাতে না পারি তখন বুক ফেটে কান্না চলে আসে…আমি দেখাতে পারিনা। মনের মধ্যে না চাইতেই তখন অভিযোগ চলে আসে, “আমরা বড়লোক হলাম না কেন?” কান্না ছাড়া আর কোনো জবাব আসেনা আমার….
.
.

সকাল আটটা। কালো কুর্তি পড়ে নিলাম। চুলে বামপাশ করে বেনি। ছোট চুলগুলো এলোথেলো হয়ে ডানপাশে এসে কাধ ছোয়াচ্ছে। ক্লিপ দিয়ে ছোট চুলগুলো কোনোরকমে আটকে নিলাম। মুখশ্রীতে বিশেষ কিছু মাখার ইচ্ছা নেই, হালকা পাউডার হাতে নিয়ে মুখে মিশিয়ে নিলাম। ব্যাগটা নিয়ে জুতা পড়তেই আম্মুকে জোর গলায় বললাম,

— আম্মু আসি। নতুন ছাত্রী পড়িয়ে দেরিতে আসবো। চিন্তা করো না। ব্যাগে মরিচের থেরাপি নিয়েছি। আসি…আসি!!

রান্নাঘর থেকে ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে আম্মু কিছু বলবেন, তার আগেই বাইরে ছুট। দেরি হলে ঢাকাগামী বাস ধরতে পারবো না। বাস লেট করলে রিকশার জ্যামে আটকাবো। এরপর ক্যাম্পাসে লেট! লেকচার মিস! বাসার গলি পার করে রাস্তায় উঠে ফুটপাত অংশে দ্রুতগতিতে হাটছি। লেট করা চলবে না। ইসরাতের জ্বর এসেছে, ক্যাম্পাস আসবে না। একা ট্রাভেল করতে হবে। নিজের কেয়ার রাখতে হবে। হঠাৎ কেউ পূর্বের মতো ডাকলো,

–“এই দাড়াও দাড়াও…..দাড়াও প্লিজ…ওয়েট!!”

আমি এদিকে তাড়াহুড়ো করছি, উল্টো আমাকে কেউ পিছন থেকে ডাকছে। আমি থামলাম। দেখি তন্ময়! এই ফালতু কেন বারবার পিছন থেকে ডাকে! ফালতু! বিরক্তি নিয়ে ওর কাছে গিয়ে বললাম,

–কালকে মানা করছিলাম আমাকে পিছন থেকে ডাকবি না! তোর কানে কথা যায় না!
–তুমি আমায় ভুলছো মম, শুনো প্লিজ!! দরকার আছে…
–চুপ! রাস্তায় কি কথা হ্যাঁ ! রাস্তায় কথা কিসের! তোকে বারন করার পরও তুই ডাকাডাকি ছাড়লিনা! বারবার তুই একই কাজ করিস!
–তুমি আমার জুনিয়র মম। হোয়াই আর ইউ কলিং মি “তুই”?
–দেখ ভাই! আমার বাস চলে গেলে আমি ক্যাম্পাসে লেট করবো, ডাকিস না! তোরে “ভাই” বলতেছি…রাস্তায় ডাকিস না।

আমি মোর ঘুরে আসতে নিলে তন্ময় আমার সামনে এসে দাড়ায়। হাতের ঘড়িটা একটু নড়াচড়া করে ভাব বোঝালো যেন ভয় পাই। ও বলল,

–আমি ছেলে তুমি মেয়ে, রাস্তায় ডাকা ছাড়াও ইউনিক কিছু ফ্যাসিলিটিস দিতে পারি…জানো? চুপচাপ আমার কথা শুনো। তোমার জন্য ধানমন্ডি থেকে এখানে এসেছি, জাস্ট অনলি ফর ইউ! গুড গার্লের মতো আমার গাড়িতে উঠে বসো, পয়ত্রিশ মিনিটের মধ্যে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দিবো।
–আমি হাত পেতে বলেছি আমায় লিফট দেন? ভিক্ষা চেয়েছি? এতো দরদ কেন উতলিয়ে উতলিয়ে পড়তেছে! রাস্তা ছাড়ো! আমি বাসেই যাবো!
–লুক মিস মম! আমি রিকুয়েস্ট করা পছন্দ করিনা। আশাকরি তুমি আমাদের গ্যাংয়ের নেগেটিভ বিহেবিয়ার সম্পর্কে জানো! তোমার জন্য ভালো এটাই হবে রাস্তায় সিন ক্রিয়েট না করে গাড়িতে উঠে বসো।
–ড্রাইভার?
–ইয়েস? বুঝলাম না, বুঝিয়ে বলো।
–তোর গাড়িতে….আসলে মানে তোমার গাড়িতে ড্রাইভার আছে?
–ওহ্ হ্যাঁ আছে। বাট রিজন কি?
–তাইলে শোন! তুই তোর ড্রাইভারের সাথে বসবি! আমি তোর পিছনের সিটে! রাজি?
–হোয়াট…. দ্যা …… হ্যাল!
–রাজি? নট রাজি? জলদি জলদি বল!
–এই তু…
–তুমি তুমি করা ভুলে যাবি বুঝছিস! এলাকা আমার! একটা ডাক দিবো সব উড়ে এসে তোর পা ভেঙ্গে হাতে ধরিয়ে ফুটবলের মতো লাত্থি মেরে ধানমন্ডি লেকে পৌঁছে দিবে! বুঝা গেছে!
–ইউ আর……. ওফ! চলো। গাড়িতে বসো।

তন্ময় মুখ প্যাঁচার মতো করে কুজো হলো। তাতে কিছু যায় আসে না, আমি ওদের পা চেটে কামলা খাটি না! ওরা নিজে এসেছে, ওদের গ্যাং লিডার আমার হাত চেয়েছে। আমি শুধু মনুষ্যত্বের নামে সাহায্য করেছি, আর কিছু আয়ের জন্য। ক্যাম্পাস চলে এসেছে। ওদের দাপটের জোরে হেডস্যারের গাড়ি ছাড়াও গ্যাংস্টারের সবার গাড়ি ক্যাম্পাসের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে। তন্ময়ের গাড়িও ঢুকেছে। সব স্টুডেন্ট কিভাবে ভয়ভয় চোখে রাস্তা খালি করে দিচ্ছে গাড়ির জানালায় বাইরে দেখছি। গাড়ি থামলে তন্ময় পিছনে ফিরে তাকায়, আমি ওর দিকে শক্ত দৃষ্টি ছুড়ে দরজা খুলে বাইরে বের হলাম। কেমন তাজ্জব! আমার দিকে স্টুডেন্টগুলো সিনেমার নায়িকা দেখার মতো তাকিয়ে আছে। বোঝলাম…তন্ময়ের গাড়িতে আমাকে দেখে ওদের চাহনির এ অবস্থা। কি কি সমালোচনায় পড়া লাগে খোদা মালুম! আমি ব্যাগের ব্যান্ডেল চেপে ডিপার্টমেন্টের ক্লাসরুমে চলে গেলাম।

.
.

ক্লাস শেষ, দুপুর দুইটা। সিড়ি দিয়ে নেমে গেটের কাছে যাচ্ছি…জোড়ায় জোড়ায়, গুচ্ছাকারে আমার দিকে নিশানা করে কানাঘুসো করছে। আমি ব্যাপারটা আড়চোখে লক্ষ করলেও গায়ে মেখে নিচ্ছি না। গ্রীষ্মের রোদ্রে আমার মাথার তালু গরম হয়ে ঘেমে গেছে। জেনি, রিমিকে ওদের আড্ডাস্থল ‘নজরুল চত্বরে’ দেখলাম। কিন্তু কারো কোনো ব্যাঙ্গ প্রতিক্রিয়া নেই। যে যার যার মতো হাসিতামাশা করছে। গেট দিয়ে বাইরে বের হলাম। কি রোদ! গরমে চান্দি চ্যালা লোকদের মাথা ঘেমে তেলতেলে হয়ে যাবে। অবশ্য হয়েছে হয়তো। হাত ঘড়িটায় দ্বিতীয়বার দেখে নিলাম। দুইটার ত্রিশ। সবাই নিজ গন্তব্যে চলে যাচ্ছে, আমি বাইরে খাম্বার মতো ওই বিলাতি কুত্তার অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছি। কেউ বলে উঠল-

–” চলো “।

সঙ্গে সঙ্গে পিছনে ঘুরে তাকালাম। মুগ্ধ গাড়ি থেকে নেমে “চলো” বলেই চলে যাচ্ছে। ওর গাড়ি ভেতরে কোথায় পার্ক করা ছিলো চোখে পড়েনি। আবার দলের সাথেও বসতে দেখিনি। ভূতের মতো গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতর থেকেই গেট দিয়ে বেরুলো…বিষয়টা নেওয়ার মতো ঠেকলো না। ড্রাইভার দরজা খুলে দিয়ে আমার বসার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি কাধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে গাড়িতে উঠলাম। মুগ্ধ ড্রাইভারের সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। ড্রাইভার গাড়িতে উঠলো। আমি কৌতুহল হয়ে জিজ্ঞেস করে বসলাম,

–ড্রাইভারকে সাথে নেওয়া হচ্ছে না?

সে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গাড়ির হুইল চেপে চালানো শুরু করে দিলো।

–নো।
–কেন? উনি কীভাবে আসবেন? আজব তো! ড্রাইভারকে একা ফেলে যাচ্ছেন!
–ড্রাইভার কি তোমার? সে কি নাদান বাচ্চা?আমার ফ্যাক্টস আমি বুঝবো! স্টে আউট অফ হেয়ার!
–তুমি নিজেও মানুষ! উনিও একটা মানুষ! ড্রাইভার তো তোমার! তো রিসপন্সলিব্লিটি কি তোমার না??
–জাস্ট শাট আপ! তোমার কথা শোনার জন্য আমি বসে বসে টাকা পাচ্ছি না! সো..ভালো খারাপের নলেজ তুমি না দিলে বেটার হবে!
–তুই আমার চুল কাটছিস! তোর আবার নলেজ আছে নাকি!! নলেজ বানান শিখছোস তাও কতো লাল থাবড়া খাইয়া! তোরে বেটার কেউ নলেজ দিবো! কুত্তা কি কামড়ায়!
–তুমি টিউটর হও কি করে…জাস্ট সে ইট ! নো সিরিয়াসলি…টিউটর এমন হয়? স্ল্যাগ, ল্যাংগুয়েজ এতো ক্রিটিক্যাল?
–তোর ধারনা না থাকলে গাড়ি থেকে নাম্, আর বাপের টাকায় পকেট না দেখিয়ে নিজে রোজগার কর! আমি কেন টিউটর হইছি পাই পাই বুঝবি! আর আমার মুখের ভাষা? শোন একটা কথা বলি? আমি ক্ষেত্রবিশেষে কথা বলি। কে কোন স্ট্যান্ডার্ডের ভাষা বুঝে আই নো ইট ভেরি কেয়ারফুলি! ডোন্ট ট্রায় টু জাজ মি! ইউ আর নট এ্যা ক্যাপিব্যাল পার্সন অফ ইট!ইউ শুড স্টে আউট!

-চলবে 🍁

-Fabiyah_Momo🍁

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here