নীলচে তারার আলো পর্ব -০৫+৬

#নীলচে_তারার_আলো
#নবনী_নীলা
#পর্ব_৫

হিয়া চাইলেই তার শাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরে টুক করে দু গালে দুটো চুমু দিয়ে বিভ্রান্ত করে দিতে পারে। কিন্তু যদি ইনিও ছেলের মতন বলে বসেন যে, এইসব করে তুমি আমাকে হাত করতে পারবে না।তাই আজ আর সে সেটা করলো না। মুচকি একটা হাসি দিয়ে সে বেড়িয়ে এলো। কিন্তু একদিন করবে, তারপর সাই মেরে দৌড় দিবে। শাশুড়িটার চেহারা দেখার মতন হবে। ইস ভাবতেই মজা লাগছে।

হিয়া ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে এসে বসলো। গাড়ি করে কলেজে যাওয়া ব্যাপারটা একটু অসস্তিকর। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যাওয়ার মধ্যেও একটা ভালো লাগা আছে।
আজ শুভ্রের ক্লাস সকাল সকাল। হাতে কিছু প্রেজেন্টেশনও রয়েছে। শুভ্র বেড়িয়ে এসে গাড়ীর দরজা খুলে ভিতরে তাকাতেই হিয়াকে দেখলো। গায়ের পোশাক দেখেই শুভ্রের বুঝতে বাকি রইলো না হিয়া কলেজে যাচ্ছে। আচ্ছা, বাবা তাহলে মেয়েটাকে কলেজে ভর্তি করিয়েছে।
শুভ্র হাতে থাকা প্রেজেন্টেশনের কাগজগুলো গাড়িতে রেখে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ড্রাইভারকে বললো,” নয়টার আগে গাড়ী নিয়ে মেডিক্যালের সামনে থাকবে। নয়টায় আমার ক্লাস।”

ড্রাইভার জানালা দিয়ে মাথা বার করে বললো,
” আপনি যাইবেন না? গাড়িতে উঠেন।”

“নাহ্ আমি বাস নিয়ে নিবো। তোমাকে যা বলেছি সেটা করো।”, বলেই পকেটে হাত ভরে শুভ্র হাঁটা শুরু করলো।

পুরো সময় হিয়া একটাও কথা বললো না। লোকটা তাকে এতোই অপছন্দ করে যে বাসে করে ভার্সিটিতে যাবে তবুও হিয়ার সাথে এক গাড়িতে যাবে না। লোকটা বড্ড জেদী। এতো জেদ কিসের ওনার?
সারা রাস্তা হিয়া গাড়ীর জানালা দিয়ে পুরো শহরটা দেখতে দেখতে গেলো। এই শহরটা তার চেনা, খুব চেনা।

গাড়ী এসে থামলো হিয়ার কলেজের সামনে। হিয়া ব্যাগটা নিয়ে নামার আগে তার পাশে থাকা প্রেজেন্টেশনের ফাইলটার দিকে তাকালো। তারপর ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে গাড়ী থেকে নামলো।
ব্যাগের ফিতেটা ঠিক করতে করতে সামনে তাকিয়ে দেখলো প্রভা দাড়িয়ে আছে। হিয়া একটু অবাক হলো, আবার একটু ভয়ও লাগছে তার? আজকেও কি তাকে কথা শুনাবে? কলেজের প্রথম দিনটা মাটি করে দিচ্ছে এরা। হিয়া মলিন চেহারায় এগিয়ে এলো।

প্রভার মুখে আজ অস্থিরতা নেই। সে স্বাভাবিক ভাবেই দাড়িয়ে আছে ভাবটা এমন যেনো হিয়ার জন্যেই অপেক্ষা করছিল। সত্যিই তাই প্রভা হিয়ার অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে।
প্রভা ভেবেছিল গাড়ি থেকে হয়তো শুভ্রও নামবে, দুজনের তো একসাথেই আসার কথা। কিন্তু কই শুভ্র তো নামছে না। তার মানে সে হিয়ার সাথে আসেনি।
হিয়া এগিয়ে আসতেই প্রভা হাসি মুখে তাকিয়ে বললো,” তোমাকে কিছু বলার ছিলো।”
হিয়ার বুকের ভিতরটা ধুক ধুক করছে। আবার কি বলতে চায়? উফফ অসস্তি লাগছে অনেক। হিয়া চোখ পিট পিট করে একবার প্রভার দিকে তাকালো। তার চেহারার বিবর্ণ হয়ে গেছে।

প্রভা নিচু স্বরে বললো,” আসলে সেদিনের ব্যাবহারের জন্য আমি সত্যি লজ্জিত। সবটা জেনেও যে কেনো এমন করলাম আমি জানি না। অ্যাম রিয়েলি সরি,তুমি প্লীজ কিছু মনে করো না।”

হিয়া চোখ তুলে অবাক হয়ে তাকালো। মেয়েটা তাকে সরি বলছে। ঘটনাটা কি হলো? হিয়ার বিস্ময়ের সীমা রইল না।

প্রভা আরো বললো,” আজকে তোমার প্রথম ক্লাস না, হিয়া? দাড়াও তোমাকে একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।” বলেই হাতের ঈশারায় কাকে জানি ডাকলেন। কলেজ ড্রেসে একটা মেয়ে ছুটে এলো। প্রভা মেয়েটিকে দেখিয়ে দিয়ে বললো,”ও আমার বোন, দিবা। প্রথমদিনে একটা ফ্রেন্ড খুজে দিলাম। এবার নিশ্চই আমাকে ক্ষমা করা যায়।”

হিয়া মুগ্ধ হয়ে প্রভার দিকে তাকিয়ে আছে। সত্যি কি অসাধারণ এই মেয়েটি। অনায়াসে নিজের থেকে ছোট্ট একটা মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইছে। বনমানুষটার কপাল দেখি ভালো। হিয়ার আর কোনো ভয় নেই সস্থির একটা নিশ্বাস ফেলে, প্রভার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

প্রভাও কিছুটা অবাক হলো। সেদিন এতো কিছু শুনেও মেয়েটি চুপ ছিলো আর আজও মেয়েটি কোনো রাগ প্রকাশ করেনি, অবলীলায় হাসছে। প্রভার ভেবেই খারাপ লাগছে এই মিষ্টি একটা মেয়ে আজ এমন কঠিন একটা বাস্তবতার স্বীকার। প্রভা নিজের বনের দিকে তাকিয়ে বললো,” তোর মাথার দুষ্টু আর উল্টা পাল্টা বুদ্ধি দিয়ে ওকে বিরক্ত করবি না, বুঝেছিস?”

দিবা বোনের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিলের হাসি হাসলো।তারপর এগিয়ে এসে হিয়ার হাত ধরে নিয়ে যেতে যেতে বলল,” চলো তো, আমার বোনের জ্ঞান শুনতে গেলে আজ আমাদের আর ক্লাস করা লাগবে না।”

হিয়ার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা ভালোই ছিলো বলা যায়। দিবার সঙ্গো তার বেশ পছন্দ হয়েছে। মেয়েটা অনেক কথা বলে কিন্তু হিয়ার শুনতে খারাপ লাগে না। একটা খালি সমস্যা এই কলেজে ছেলে মেয়ে একসাথে। কিছু ছেলে মেয়ের অদ্ভুত আচরণ চোখেও পড়ে তার।

কলেজ শেষ হবার ঘণ্টা বাজতেই সবাই বই খাতা গুছাতে লাগলো। ব্যাগটা কাধে নিতেই হিয়ার মনে পড়লো শুভ্রের কথা। লোকটা কি ফেরার সময়েও বাসে করে ফিরবে? ভাবতে ভাবতে রুম থেকে বের হলো সে। গাড়ির সামনে এসে থমকে দাড়ালো। এই মুহূর্তে সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে গাড়ী করে ফিরবে না। এই শহরটা তার কাছে নতুন নয়। সে একাই একা যেতে পারবে। শুধু এই ড্রাইভার আংকেলটাকে ম্যানেজ করতে হবে।

হিয়া অনেক্ষন হলো ড্রাইভার আংকেলকে বোঝানোর চেস্টা করছে কিন্তু তিনি কিছুতেই মানছেন না। শেষে হিয়া রেগে বললো,” আপনি যদি আমার কথা না শুনেন তাহলে কিন্তু আমি এক্ষুণি গাড়ীর টায়ার ফুটো করে হাওয়া বের করে দিবো।”

” আপনারে না লইয়া গেলে। বড় সাহেব আমারে বকবে।”, ওনার সেই এক কথা।

” উফফ, বললাম তো আপনার বড়ো সাহেবকে আমি ম্যানেজ করে নিবো। আপনি এখন চলে যাবেন কিনা বলুন? না হলে সবগুলো টায়ার পাঞ্চার করে দিয়ে আমি হেঁটে হেঁটে বা ফিরবো। ভেবে দেখুন তখন আপনার বড় সাহেবকে কিভাবে সামাল দিবেন?”, হিয়ার এমন কথায় এবার লোকটা সত্যি ভয় পেলো।

অবশেষে লোকটাকে চলে যাওয়ার জন্যে সে রাজি করাতে পারলো। যদিও মুখটা শুকনো হয়েগেছিল লোকটার।

হিয়া কলেজের সামনে দাড়িয়ে আছে। কিভাবে ফিরবে সে জানে না, হেটে হেটে ফিরবে? নাকি বাস নিবে? ভাবতে গিয়ে ডান দিকে তাকাতেই দেখলো দিবা এগিয়ে আসছে।

” তুমি গাড়ী করে গেলে না কেনো?”, কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলো দিবা। হিয়া কি বলবে ভেবে পেলো না। কারণ বলার জন্যে তার কাছে কোনো উত্তর নেই।
দিবা মুচকি হেসে বলল,” তোমার সাথে শুভ্র ভাইয়ার বিয়ে হয়েছে, তাই না?”

দিবার এমন প্রশ্নে হিয়া ভীষনভাবে চমকালো। কারণ বিয়ের কথাটা গোপন থাকার কথা ছিলো।
হিয়া এখনো চুপ করে আছে। হিয়াকে চুপ থাকতে দেখে দিবা বললো,” আরে তুমি ভয় পাচ্ছো কেনো? আমি কাউকে বলবো না। তোমাকে একটা কথা বলি শুভ্র ভাইয়ার সাথে তোমার বিয়েতে যদি কেউ সবচেয়ে বেশি খুশি হয় সেটা হয়েছি আমি । অবাক হচ্ছো তাই না। আমি কিন্তু জানি আমার বোন শুভ্র ভাইয়াকে ভালোবাসে। কিন্তু সত্যি কথা কি জানো শুভ্র ভাইয়া আপুকে ভালোবাসে না।”

প্রথমে অবাক হলেও শেষের কথা শুনে হিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেল। শেষের কথাটা বিশ্বাসযোগ্য হলো না তার কাছে। ” তোমার এমন মনে হলো কেনো?”, প্রশ্ন করলো হিয়া।

দিবার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো, সে বাকা হাসি দিয়ে বললো,” আমি ছোটো হতে পারি তবে কে কাকে ভালোবাসে অতটুকু বোঝার জ্ঞান আমার হয়েছে। সমস্যাটা কোথায় জানো? আমার বোনের। সে জ্ঞান তার হয় নি। সে ভালোবাসার অন্ধ চশমা পড়ে ঘুরছে আর নিজেকে প্রতি নিয়ত বোঝাচ্ছে যে শুভ্র ভাইয়া তাকে ভালোবাসে। আমি চাই আমার বোনের সে ভুল ধারণাটা ভাঙ্গুক।”

হিয়া কেমন একটা গোলক ধাঁধায় পড়ে গেলো। এই দিবা সবকিছু জটলা পাকিয়ে দিয়েছে। হিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলো কিন্তু তার মাথায় কিছুই ঢুকলো না। ধুর ওই বনমানুষ যাকে ইচ্ছা তাকে ভালোবাসুক এতে তার কি? সে কেনো এত ভাবছি। হুস হুস! বলেই জোরে মাথা দুবার ঝাকি দিলো হিয়া। মাথাটা আরেকটু হলেই ব্লাস্ট হয়ে যেতো তার। হিয়া চোখ খুলে দিবাকে বললো,” এগুলো আমাকে বললে কেনো? আমি এগুলো জেনে কি করবো?”

” হুম্,বুঝেছি তোমার অনেক ট্রেনিং প্রয়োজন। চিন্তা কোরো না আমি আছি, এক্সপার্ট বুঝেছো?”, বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো দিবা।

হিয়া বোকা বনে রইলো। দিবার একটা কথা যদি তার মাথায় ঢুকতো। মনে হচ্ছে মাথার উপর দিয়ে যেনো বড়সড় একটা সাইক্লোন বয়ে গেলো তার। হিয়া মাথায় হাত চালাতে চালাতে বললো,” ধুর এইসব বাদ দেও। আমি বাস কোথায় পাবো বলতো?”

” সোজা হাঁটতে থাকো হাঁটতে হাঁটতে সামনে একটা বাস স্টপ দেখবে ঐখান থেকেই একটা বাসে উঠে পড়লে হবে। আমার বাসা উল্টো দিকে না হলে আমি তোমাকে দিয়ে আসতাম।”,

দিবার কথামতন সামনের বাস স্টপে এসে হিয়া দারিয়ে পড়লো। জীবনে ফার্স্ট টাইম সে একা একা বাসে উঠবে। প্রচুর মানুষ দাড়িয়ে আছে বাসের জন্যে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই একটা বাস এসে থামতেই লোকজন একদম হুমড়ি খেয়ে পড়ল। হিয়া পা বাড়িয়ে এগিয়ে গেলো কিন্তু সাহস পেলো না। এতো রিস্ক নিয়ে বাসে উঠতে হয় তার জানা ছিল না। বাসে উঠার প্রথম সিড়িটাও এতো উচু একবার হাত ছুটলেই শেষ। প্রথম বাসটা সে মিস করলো।

বাস স্টপে আর মাত্র পাঁচ ছয় জন রয়ে গেছে। এর মধ্যে কালো হুডি মাথায় একটা ছেলে বেঞ্চে বসে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে। বাকি সবাই আগের বাসে উঠার চেষ্টা করলেও এই ছেলেটি করেনি।

হিয়া পরবর্তী বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।কিছুক্ষণ পরেই আরেকটি বাস এসে থামলো। তবে বেশিক্ষণ দাড়ালো না মুহূর্তেই বাসটা ছেড়ে দিলো। হিয়া অনেক সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছিলো উঠবে বলে এবারো পারলো না।

বাস স্ট্যান্ড বলতে গেলে খালি। শুধু হিয়া আর হুডি পড়া ছেলেটা ছাড়া আর কেউ নেই। হিয়ার রীতিমতন কান্না পাচ্ছে। পরের বাসটাও হয়তো তাকে ফেলে চলে যাবে। কি করবে এবার সে। মানুষজন কমে যাওয়ায় তার ভয় বাড়ছে।

অনেক্ষন হলো হিয়া দাড়িয়ে আছে আর কোনো বাস আসার নাম নেই। হটাৎ দূর থেকে একটা বাসকে আসতে দেখা গেলো। হিয়া ব্যাগের ফিতা দুটি শক্ত করে ধরলো। এই বাসে তাকে উঠতেই হবে।
বাসটা এগিয়ে আসতেই হুডি পড়া ছেলেটা এসে হিয়ার পাশে দাঁড়ালো। হিয়া একবার ছেলেটার দিকে তাকালো কেমন এলিয়েনের মতন লাগছে দেখতে। হুডির টুপিটা একদম মুখের সামনে এনে রেখেছে, চেহারাও দেখা যাচ্ছে না।

বাসটা সামনে এসে দাড়াতেই ছেলেটা হেটে গিয়ে বাসে উঠে দাড়ালো। হিয়া উঠতে যাবে হটাৎ কিছুর সাথে উষ্ঠা খেয়ে পড়ে গেলো। পায়ে ব্যাথা পেয়েছে বটে কিন্তু হিয়া উঠে দাড়ালো। ব্যাথা নিয়েও সে বাসে উঠার চেষ্টা করতেই সামনে থেকে হুডি পড়া ছেলেটা হাত বাড়িয়ে দিলো। অচেনা এই ছেলের হাত ধরতে সে মুহুর্তে হিয়া একটুও সংকোচ করলো না। ছেলেটা হিয়াকে টেনে বাসে তুলতেই বাসের দরজাটা লাগিয়ে দিল।

হিয়া বাসের দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে জোরে জোড়ে শ্বাস নিচ্ছে। পায়ে ভীষন যন্ত্রণা করছে তার কিন্তু সে বাসটা ধরতে পেরেছে ভেবেই কান্না পেলো তার বাচ্চাদের মতন একটু কেদেও ফেললো সে। তারপর সামনে তাকাতেই দেখলো হুডি পড়া ছেলেটা দরজার দুপাশে হাত রেখে দাড়িয়ে আছে। হিয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে ছেলেটা এক হাত দিয়ে মাথার হুডিটা পিছনে ফেলে কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো হাত দিয়ে পিছনে সরিয়ে এক দৃষ্টিতে হিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

ছেলেটার সামনে এভাবে কেঁদেছে বলে হিয়ার লজ্জা লাগছে। হিয়া চোখ নামিয়ে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো। ছেলেটা নীচের ঠোঁট ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করল,” কি নাম তোমার?”

হিয়া হকচকিয়ে তাকালো। ছেলেটা নাম জিজ্ঞেস করছে কেনো? কী মতলব এর? হিয়া সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,” না…নাম জানতে চাইছেন কেনো?”

” থ্যাংক ইউ তো তুমি বললে না, এট লিস্ট নিজের নামটা তো বলো। থ্যাংক ইউ না হয় আমি পরেই নিয়ে নিবো।”, বলেই ছেলেটা হালকা রহস্যময় হাসি হাসলো।
#নীলচে_তারার_আলো
#নবনী_নীলা
#পর্ব_৬

“থ্যাংক ইউ তো তুমি বললে না এট লিস্ট নিজের নামটা তো বলো। থ্যাংক ইউ না হয় আমি পরেই নিয়ে নিবো।”, বলেই ছেলেটা হালকা রহস্যময় হাসি হাসলো।ছেলেটার হাসি দেখে হিয়ার কেমন যেনো লাগলো। হিয়া নিজের নাম বলতে চাইছে না। কে না কে? আবার এতো ভাব নিয়ে নাম জানতে চাইছে, চুপ করে থাকাই ভালো।

হিয়াকে চুপ থাকতে দেখে ছেলেটা বললো,” চুপ থেকে লাভ নেই নাম বলো নয়তো এক্ষুনি বাস থেকে ফেলে দিবো।” হিয়া রীতিমতন চমকে তাকালো।
আয়হায় এই ছেলে কি পাগল নাকি? চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিবে বলছে। হিয়ার রাগ হলো ভীষন, কি আশ্চর্য! সে চুপ থাকে বলে সবাই তাকে এভাবে আতঙ্কের মধ্যে রাখবে। ওই বনমানুষটাও একি কাজ করে।

হিয়া প্রায় রেগে বললো,” দিন, ফেলে দিন। পড়লে আমি একা পড়বো না আপনাকে নিয়েই পড়বো।” বাসের বাকি মানুষগুলো অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। রাগের মাথায় কথাগুলো জোরেই বলে ফেলেছে সে। তখন না বুঝলেও এখন ঠিক বুঝেছে। পাশে বাস হেল্পার বলে উঠলো,” মনে হয় প্রথম প্রথম ঝগড়া।”বলেই ফিক করে হেসে উঠলো সে।

লোকটার কথা শুনে হিয়ার সামনের এলিয়েনটাও হেসে ফেললো। হিয়া ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো। প্রথম প্রথম ঝগড়া আবার কি? হিয়ার কেনো জানি প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। বার বার শুভ্রের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার। সব হয়েছে ঐ লোকটার জন্যে, লোকটাকে হাতের কাছে পেলে হয়।

বাসটা নেক্সট স্টপে এসে দাড়াতেই ছেলেটা নেমে গেলো আর যাওয়ার আগে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,” আবার দেখা হচ্ছে কিন্তু।”ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসি।

আবার দেখা হচ্ছে মানে কি? কাল থেকে সে আর বাসে করে যাবে না দরকার প্রয়োজনে হেঁটে হেঁটে যাবে।

শুভ্র মেডিকেলের সামনে গাড়ি দেখে মনে মনে খুশী হলো কারণ এই অফিস টাইমে বাসে করে যেতে হলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হতো। গাড়ির দরজা খুলে পিছনে বসতে বসতে বললো,” এসেছ ভালো করেছো। এবার চলো।”

ফিরতে ফিরতে শুভ্রের মাথায় মেয়েটির কথা এলো। এতো তাড়াতাড়ি মেয়েটা বাসায় পৌছে গেছে। ভেরি স্ট্রেঞ্জ! ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করলো না সে। বাসায় গেলেই দেখা যাবে।

শুভ্র নিজের ঘরে এলো, বাড়িটা কেমন শান্ত হয়ে আছে। আগে যেমনটা থাকতো। হটাৎ এমন শান্তিময় পরিবেশের কারণ…..? শুভ্র রুম থেকে বেরিয়ে একবার এদিক ওদিক তাকালো। ডান দিকে হিয়ার ঘর, ওদিকে তাকাতেই দেখলো ঘরটা খালি। আচ্ছা, বাঁদরটা ফেরেনি তাহলে। তাই তো বলি এতো নিঝুম লাগছে কেনো? এসেই তো উৎপাত শুরু করবে। শুভ্র টাওয়াল নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।

হিয়া বাড়িতে ফিরেই প্রথমে রবীউল সাহেবকে খুঁজলো। করিডোরে চা হাতে চিন্তিত মুখে তিনি দাড়িয়ে আছেন। হিয়াকে এগিয়ে আসতে দেখে সস্থির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,” এতো দেরী হলো কেনো তোর?”

হিয়া রবীউল সাহেবকে খুঁজছেন দুটি কথা বলবেন বলে। প্রথমটি হলো সে আর গাড়ী করে কলেজে যাবে না। দ্বিতীয়টি হলো আজ থেকে সে আর ডাইনিং টেবিলে খাবে না। কিভাবে বলবে হিয়া বুঝে উঠতে পারছে না। রবীউল সাহেবের দিকে তাকিয়ে হিয়া হালকা হাসলো। তারপর অনেক সাহস করে কথাগুলো বলতেই রবীউল সাহেব গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ভারি গলায় বললেন,” দুটোর একটাতেও আমার অনুমতি নেই।”

হিয়া পড়েছে মহা বিপদে যে করেই হোক রবীউল সাহেবকে তার রাজি করাতেই হবে। না হলে সব সময় হিয়াকে একটা সস্থির মধ্যে থাকতে হয়। যেটা সে চায় না।


শুভ্র ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে এলো, কালো রঙের শার্ট আর ট্রাউজার পড়ে। সামনে তাদের একটা মেডিকেল ক্যাম্পিং আছে। পাহাড়ি এলাকার মানুষদের জন্য সে ক্যাম্পিং এ বিনামূল্যে সেবা প্রদান করবে তারা। সেটা নিয়েই শুভ্র ভীষন স্ট্রেসে আছে। তার মতে কোনো প্ল্যান সাকসেসফুল হতে হলে অবশ্যই সেটা ভালো ভাবে অর্গানাইজড করতে হবে। কিন্তু এই ক্যাম্পিং এর অবস্থা নাজেহাল। কয়দিন পর ক্যাম্প আর এখনো এমন খাপছাড়া ব্যাপার।

শুভ্র কাউচে বসে চোখ বন্ধ করে কিছু একটা ভাবছিল। হটাৎ নূপুরের অস্পষ্ট আওয়াজ তার কানে ভেসে এলো। ধীরে ধীরে সে আওয়াজ আরো স্পষ্ট হতে লাগলো। খুব কাছাকাছি কেউ নূপুর পায়ে হেঁটে আসছে। শব্দটা একদম কাছে আসতেই শুভ্র চোখ খুলে তাকালো। সামনে তাকাতেই দেখলো হিয়াকে।ব্যাগ কাধে সে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছে। শুভ্র কিছুক্ষনের জন্যে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তারপর ভ্রূ কুচকে ডান পাশের দেওয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকালো। মেয়েটা এতো দেরিতে বাড়ি ফিরছে কেনো?
কোন কলেজে আবার এতক্ষণ ক্লাস হয়।
আর এই মেয়ের নূপুরের আওয়াজ ভেবেই শুভ্র দু আঙ্গুলে কপাল ডলতে লাগলো। বিরক্তি নিঃশ্বাস ফেলে বির বির করে বললো,” আচ্ছা, এইজন্যে বাড়িটা এতক্ষণ নিঝুম লাগছিল।”

হিয়া ব্যাগটা টেবিলে রেখেই বিছানায় গা হেলিয়ে দিলো। আহ! অবশেষে এই লম্বা দিনটা শেষ হলো। কালকে থেকে নো চিন্তা ডু ফুর্তি। অনেক কষ্টে রবীউল সাহেবকে সে রাজী করিয়েছে। বাপরে এক দিনে কি কি ঘটলো? প্রথমে প্রভা তারপর ড্রাইভারকে তাড়ানো, বাসে ওঠার যুদ্ধ, তারপর মঙ্গলগ্রহের সেই এলিয়েন শেষমেশ রবীউল সাহেবকে রাজি করানো। কালকে থেকে আর কোনো ঝামেলায় পড়বে না সে। মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করবে। ভাবতে ভাবতে উঠে বসলো। তার উফফ পা টাও অসহ্য ব্যাথা করছে। হিয়া পা থেকে মোজা জোড়া খুলে বিছানায় রাখলো। তারপর তোয়ালে আর জামা নিয়ে শাওয়ার গেলো। আজ সে অনেক্ষন আরাম করে গোসল করবে।

শুভ্র অনেক্ষন ভেবে একটা প্ল্যান বের করলো। কিন্তু ক্যাম্প ইন্সট্রাক্টরের সাথে তার কথা বলা প্রয়োজন। নাম্বার কি তার কাছে আছে? শুভ্র বিছানার উপর থেকে ফোনটা নিয়ে চেক করলো কিন্তু না, তার কাছে নাম্বার নেই। কার কাছে নাম্বার থাকতে পারে? প্রভা! হ্যা থাকতেই পারে, ওর কাছে থাকবে না এমন কোনো জিনিস আছে! শুভ্র প্রভাকে কল করতেই দিবা কল রিসিভ করলো।

শুভ্র কিছু বলার আগেই দিবা বললো,” শুভ্র ভাইয়া, হিয়াকে একটু ফোনটা দিবেন কথা বলবো। ওর নাম্বারটা নিতে ভুলে গেছি। ফোনটা একটু দিন না।”

” হোয়াট? কাকে দিবো?”, যেই মেয়েটিকে নিয়ে শুভ্রের এতো সমস্যা তার নামটাই শুভ্রের জানা নেই।

দিবা কিছু বলার আগেই প্রভা এসে দিবার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বললো,” দিবা তুই বড্ড বেয়াদব হয়েছিস।” বলেই ফোন হাতে বারান্দায় চলে গেলো প্রভা ফোন কানে দিয়ে বললো,” কি ব্যাপার তুই রাতে ফোন করেছিস? তা জনাব এতো রাতে ফোন করার কারণ?”

শুভ্র সোজাসুজি কথা না বাড়িয়ে নাম্বারটা চাইলো। প্রভা ওপাশ থেকে বললো,” দাড়া! খুঁজে দিচ্ছি। ওয়েট কর।”

শুভ্র কান থেকে ফোনটা নামিয়ে বারান্দায় এলো। হটাৎ বৃষ্টি শুরু হয়েছে, বৃষ্টির ঝুম ঝুম শব্দ কানে ভাসছে। আসলে শুধু ঝুম শব্দই কানে ভাসছে না সঙ্গে নূপুরের শব্দটা আবারো কানে ভাসছে তার। শুভ্র বারান্দায় দাড়িয়ে সে শব্দ শুনছে। বৃষ্টির কয়েকটি বিন্দু এসে ভিড়েছে তার বাম গালে। কেনো জানি আজ তার বৃষ্টি ভালো লাগছে ভালো লাগার কারণ কি সেই নূপুরের আওয়াজ। সে আওয়াজ হটাৎ আজ নেশার মতন তাকে গ্রাস করছে। শুভ্র হাত দিয়ে কপালের চুলগুলো পিছনে সরিয়ে নিয়ে আকাশের দিকে তাকালো। ফোনটা রেখে দিয়েছে বারান্দার টুলটার উপর। ফোনটাও ভ্রাইভ্রেট করছে কিন্তু শুভ্রের সে দিকে খেয়াল নেই।

শুভ্র তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে রুমে এলো। হটাৎ তার ফোনের কথা মনে পড়লো। ফোনটা সে টুলে ফেলে এসেছে। ফোনটা হাতে নিয়ে অন করতেই দেখলো প্রভার মিসড কল উঠে আছে। শুভ্র তোয়ালেটা একপাশে রেখে হাত দিয়ে ভেজা চুলগুলো এলো মেলো করে প্রভাকে কল দিলো।
ফোন ধরে প্রভা রাগী গলায় বলল,” ফোন রেখে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি?”

” তেমন কিছু না। তুই নাম্বার পেলি?”, হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করতে করতে বললো।

” হ্যা পেয়েছি।” ওপাশ থেকে বলল।

শুভ্র ফোন হাতে রুম থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে বললো,” ওকে, আমাকে ইনবক্স কর।”কথাটা বলে শেষ করতেই অজস্র পানির ছিটে শুভ্রের মুখে এসে পড়লো। শুভ্র সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেললো। সবে সে চুলের পানি মুছে বেরিয়েছে এখন আবার….!
শুভ্র চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় রাগে প্রভার কল কেটে দিলো। তারপর চোখ খুলে তাকাতেই সামনে যাকে দেখলো তাকে দেখে শুভ্র একটুও অবাক হয় নি। এইসব কাজ একজনের দ্বারাই সম্ভব।

বৃষ্টিতে ভেজার কারণে হিয়ার চুল থেকে টপ টপ করে পানি পরছে। তার তোয়ালেটা ভেজা তাই মোহনা আপুর কাছে আরেকটা তোয়ালে চাইতে যাচ্ছিল। যাওয়ার পথে চুলগুলো পিছনে ফেলতেই যে পানির ছিটে শুভ্রের মুখে গিয়ে পড়বে কে জানতো। উফফ!
এই লোকের যা রাগ আবার তার চুল গুলোও না কেটে ফেলতে বলে।
হিয়া ভীত চেহারায় শুভ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। কি করবে সে? দৌড়ে পালাবে…? কিন্তু পালানোর আগেই শুভ্র হিয়ার টেনে এনে দেওয়ালের সামনে দাড় করিয়ে দুপাশে হাত রাখলো।

হিয়া চোখ পিট পিট করে তাকিয়ে আছে শুভ্রের দিকে। লোকটা সবকিছুতে এমন রেগে যায় কেনো। মুখে সামান্য পানি পরেছে এতে এতো রাগের কি আছে।
শুভ্র নিজের রাগ সামলে শান্ত গলায় বললো,” তোমার আর কোনো কাজ নেই আমাকে বিরক্ত করা ছাড়া? বিরক্ত করারও তো একটা লিমিট থাকে। সারাদিন নূপুর পরে সাড়া বাড়িতে শব্দ করেও শান্তি পাওনি তাই না? এখন আবার এইসব শুরু করেছো?”

শুরু করেছি বেশ করেছি দরকার হলে ঢাক ঢোল পিটিয়ে সারাদিন আপনার রূমের সামনে ঘুরে বেড়াবো, যত্তসব। ইস কথাগুলো লোকটার মুখের উপর বলতে পারলে ভালো হয়। যা হবার হবে। আমাকে কাচা গিলে ফেললে ফেলবে। আজ আমিও বলবো, সবসময় কেনো শুনবো।

” দেখুন আমি কিছু শুরু করিনি। আমার পা তাই আমি নূপুর পরে যেখানে খুশী হাটবো আমার ইচ্ছে। আপনার এতো সমস্যা কিসের? এতো সমস্যা হলে কানে তুলো দিয়ে রাখুন।”, একটু থেমে থেমে বললো কারণ শুভ্র চোয়াল শক্ত করে হিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্র ভেবে পায় না মাঝে মাঝে এই মেয়ে চুপ করে থাকে একটা কথাও বলে না আবার মাঝে ট্রেনের মতোন ছুটে আর থামে না।

কিন্তু শুভ্রও কম যায় না।
শুভ্র আস্তে আস্তে হিয়ার আরো কাছে আসতে থাকে। দূরত্ব কমে আসায় হিয়া একটা ঢোক গিললো। লোকটা এভাবে এগিয়ে আসছে কেনো? কি করতে চায় সে?

এইবার একদম কাছে চলে এসেছে শুভ্র। হিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে সে। হিয়া চোখ নামিয়ে এদিক সেদিন তাকাতে লাগলো। শুভ্রের এমন চাহিনির সাথে সে পরিচিত নয়। শুভ্রের নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে হিয়ার গলায়। সাড়া শরীর যেনো শিউরে উঠলো তার। বুকের ভিতর ড্রাম বাজতে লাগলো। হিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগে শুভ্র টান মেরে হিয়ার ওড়নাটা নিজের হাতে নিয়ে নিতেই হিয়া ভয়ে চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে ফেললো।

শুভ্র হিয়ার চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে ফেলতেই নিঃশব্দে হাসলো। তারপর ওড়নাটা দিয়ে নিজের মুখের পানি মুছতে মুছতে বললো,” আশা করছি নেক্সট টাইম থেকে চুলের পানি দিয়ে বন্যা ভাসানোর ইচ্ছে বা শখ কোনোটাই তোমার হবে না।”শুভ্রের এমন উক্তিতে হিয়া পিট পিট করে চোখ খুলে তাকাতেই হতভম্ব হয়ে গেলো।

[ #চলবে ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here