নীলচে তারার আলো পর্ব -৩৫+৩৬

#নীলচে_তারার_আলো
#নবনী_নীলা
#পর্ব_৩৫

হিয়ার ঘুম ভাঙতেই নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করলো সে। সঙ্গে সঙ্গে হিয়া হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ল। সে ঘরে এলো কখন? কাল রাতে তো সে গানের আসরে সবার সাথে ছিলো। তারপর যদিও হালকা ঘুম ঘুম পেয়েছিল তার। তাহলে কি ঘুমের মাঝে হেঁটে হেঁটে নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়েছে সে? নাহ্ এটা আবার কি করে সম্ভব।

হিয়ার নিজের মাথার চুল শক্ত করে টেনে ধরলো। সে এই ঘরে এলো কি করে? শুভ্র তাকে এনেছে? শুভ্র কোথায়? নাহ্, তাহলে আশে পাশে তো শুভ্র থাকতো। কোথাও তো নেই? হিয়ার অস্থিরতা বাড়লো। দেওয়ালের ঘড়ির দিকে তাকাতেই চোখ কপালে উঠে গেলো। সাড়ে নয়টা বাজে..! হায় আল্লাহ! এতক্ষণ সে ঘুমিয়েছিল।

হিয়া গায়ের উপর থেকে চাদরটা সরাতেই দেখলো শাড়ির আঁচলটা জায়গায় নেই, সরে আছে একপাশে। হিয়ার বুকের ভিতরটা ধুক করে উঠলো। সে কি সারারাত এইভাবে ছিলো? শুভ্র কি তাকে এইভাবে….. ছি! ছি! কাল রাতে এসে তো সেফটিপিন গুলো খুলে রেখেছিল সে, নাহলে আজ এমন দিনের মুখোমুখি হতে হতো না।

হিয়া আঁচলটা ঠিক করে, বিছানা থেকে নেমে পড়লো। তারপর চট জলদি ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো। সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই খাবারের গন্ধে তার খিদে পেয়ে গেলো। মনে হচ্ছে ঘি ভাজা পরোটা বানাচ্ছে। কিন্তু খাওয়ার কথা পরক্ষনেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো কারণ যতক্ষণ না সে জানতে পারছে সে ঘরে গেলো কিভাবে ততক্ষন পর্যন্ত কোনো খাবারই তার হজম হবে না। হিয়া কিচেন ঘরে ঢুকতেই মোহনাকে দেখলো। সেখানে রিমি, নিধি আরো অনেকেই ছিলো। তারা সবাই কিছু একটার ফর্দ বানাচ্ছে মনে হলো।

হিয়া এগিয়ে আসতেই রিমি হেসে বললো,” রাতে ভালো ঘুম হয়েছে তো?” এই কথা শুনে উপস্থিত সবাই মূচকি হাসলেও মোহনা কড়া চোখে তাকালো। হিয়া হতবুদ্ধির মতো হা সূচক মাথা নাড়লো। কারণ রিমির প্রশ্নে তার মনে হয়েছে এরাই হয়তো তাকে রুমে রেখে এসেছে। এমনিতেও সে কুম্ভকর্ণের মতন ঘুমায় তার জন্যেই হয়তো এরা হাসছে। এর মাঝে আরেকজন বললো,” হুম সেটা তো আমরা কাল রাতেই বুঝেছি।”

হিয়া চোখ পিট পিট করে তাকালো। মানে? কাল রাতে কি বুঝে ফেলেছে…! এটাও কি কোনো রসিকতা ছিলো নাকি? হিয়া প্রসঙ্গ বদলে বললো,” তোমরা কি করছো? ”

মোহনা হেসে উঠে বললো,” আজ দুপুরের বাড়ির সব ছেলেরা মিলে রান্না করবে আমাদের জন্যে। বেড়াতে এসে প্রতি বেলা আমরা কেনো খেটে মরবো?” কথা শেষে নিধিকে ফর্দটা দিলো। নিধি ফর্দটা হাতে নিয়ে চোখ মেরে বললো,” সবাইকে আজ কাদিয়ে ছারবো, বুঝলে।”

মোহনা উঠে দাড়িয়ে বললো,” হিয়া আমার সাথে আয়। আর এইযে বাচ্চা পার্টি আমার পারমিশন ছাড়া যদি কোনো পাকনামি করেছো তো খবর আছে।”

মোহনা হিয়াকে নিয়ে বেড়িয়ে আসতে আসতে বললো,” তোমাদের মধ্যে সব ঠিক হয়ে গেছে?”
হিয়া চোখ পিট পিট করে তাকালো কিন্তু কিছু বললো না। হটাৎ এমন প্রশ্নের উত্তরে কি বলা যায়। সেটা নিয়েই সে ইতস্তত বোধ করলো। হিয়াকে চুপ করে থাকতে দেখে মোহনা হেসে উঠে বললো,” কালকে দেখে তো মনে হলো সব ঠিকই আছে। ঘুম ভাঙ্গবে দেখে কোলে করে রুমে নিয়ে গেলো। বাহ্ আমার ভাই দেখি তোমার ভালোই খেয়াল রাখছে।”

হিয়া চুপ করে আছে। মনে মনে ভালো লাগছে কিন্তু রুমে নিয়ে গেলো মানে কি? মেয়েগুলো কি তাহলে এই কারণে হাসছিলো? শুভ্র তার সাথে এক ঘরে ছিলো। তার মানে কি শুভ্র তাকে কোনো ভাবে তাকে ওই অবস্থায় দেখেছে? হিয়া একটা ঢোক গিললো।

বাহ্ হিয়া, কি ঘুম রে তোর..! একটা মানুষ সারারাত তোর সাথে এক ঘরে ছিলো অথচ তুই টেরই পেলি না! কুম্ভকর্ণও তো দেখি ফেইল তোর কাছে।

⭐ হিয়া রুমে বসে আছে। নিচে থাকতে ভালো লাগছে না, সবাই কিভাবে কিভাবে যেনো তার দিকে তাকাচ্ছে। হিয়ার বারে বারে খালি মনে হচ্ছে সকলের এই ঘটনা হয়তো তাদের জানা। এদিকে শাড়ী জিনিসটার প্রতি যত ভালোলাগা ছিলো তার সঙ্গে এখন ভয় জিনিসটাও যুক্ত হয়েছে। তার শাশুড়ি একটা শাড়ি দিয়ে গেছে। এতো পাতলা শাড়ি বানানোর কি দরকার ছিল? আজব। আর তার শাশুড়িই বা এমন শাড়ী পেলো কোথায়? হিয়া রুমে বসে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে শাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। এমন পাতলা শাড়ি সে কিভাবে পড়বে। এইটা পড়লে তো সবই বুঝা যাবে। কি যন্ত্রণা..!

হিয়া আর কোনো উপায় না পেয়ে শাওয়ারে ঢুকলো। মাথা থেকে সকালের ঘটনাটা সে কিছুতেই দূর করতে পারছে না। গোসল শেষে হিয়া দেখলো সে তোয়ালে আর শাড়ী দুটোই ভুলে গেছে আনতে। এইবার কি হবে? অন্যমন্ক ছিলো তাই হয়তো খেয়াল করেনি। এবার সে কি করবে? কি এক যন্ত্রণা! এইবার সে কি করবে? হিয়া আস্তে করে দরজাটা অল্প খুলে পুরো রুমটায় চোখ বুলিয়ে নিতেই দেখলো। শুভ্র বিছানায় ফোন হাতে বসে আছে। হিয়া সঙ্গে সঙ্গে সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিলো।

হটাৎ এমন আওয়াজে শুভ্র ভ্রু কুঁচকে ওয়াশরুমের দিকে তাকালো। ভিতরে কি যুদ্ধ চলছে? হিয়া মাথায় হাত দিলো। এইবার কি হবে? শুভ্র তো ঘরেই আছে। একবার বলে দেখবে? যদি না দেয়? কি হবে তার? এই ওয়াশরুমে কি জীবন পার করতে হবে তার? ঠান্ডায় তো হাত পা বরফ হয়ে গেছে তার। প্রচুর ঠান্ডা লাগছে। হিয়া উপায় না পেয়ে আস্তে করে দরজা খুলে মুখটা একটু বের করে আবার উকি দিলো।

শুভ্র হিয়াকে এমনভাবে উকি দিতে দেখে বললো,” কিছু কি লাগবে? এভাবে ভেজা বিড়াল হয়ে আছো কেনো?”

হিয়া কাপা কাপা গলায় বললো,” শাড়ি আর তোয়ালেটা একটু দিবেন?”

শুভ্র এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো। বিছানার একপাশে তোয়ালে আর শাড়ী রাখা। শুভ্র শাড়িটা হাতে নিয়ে এগিয়ে এসে সেগুলো বাড়িয়ে দিতেই হিয়া হাত বের করে নিয়ে নিলো। শুভ্র এতো সহজে দিয়ে দিবে সেটা সে ভাবেনি। হিয়া চটজলদি তোয়ালে দিয়ে মাথা মুড়িয়ে নিলো। ব্লাউজ টা পড়ে যেই শাড়িটা হাত বাড়িয়ে নিতে যাবে পিচ্ছিল শাড়িটা গড়িয়ে পড়ে গেলো পানি ভর্তি বালতিতে। হিয়া সঙ্গে সঙ্গে একটা চিৎকার করলো।

হিয়ার হটাৎ এমন চিৎকারে শুভ্র ব্যাস্ত হয়ে উঠে দাড়ালো। তারপর একটু এগিয়ে এসে দরজায় নক করে বললো,” ঠিক আছো?” হিয়া উত্তর দিলো না। সে শাড়িটা তুলতে ব্যাস্ত। শুভ্র আবার নক করে হিয়াকে কয়েকবার ডাকলো। হিয়া কাদো কাদো গলায় বললো,” শাড়িটা একদম ভিজে গেছে…. এইবার আমি কি পড়বো?”

” তুমি ঠিক আছো?”, উত্তরে শুভ্র আবার প্রশ্ন করলো। কিন্তু ইতিমধ্যে হিয়া কাদো কাদো গলায় বলতে শুরু করেছে,” আমার সাথেই এইসব হতে হয়। সব কিছুতে একটা না একটা ঘাপলা থাকতেই হবেই? শাড়িটা তো পরে গেলো এইবার আমি কি করবো? আমার কি হবে।”

শুভ্র বাহির থেকে ধমক দিয়ে বললো,” হিয়া জাস্ট শাট আপ। দরজা খোলো।”

হিয়া ভ্রু কুঁচকে বিলাপ থামিয়ে বললো,” কেনো? দরজা খুলবো কেনো?”

” আমি খুলতে বলেছি। জলদি করো, আদার ওয়াইজ এই দরজা আমি একটা ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে। সো ডু ইট ফাস্ট।”, শুভ্রের এমন হুমকিতে হিয়া লাফিয়ে দাড়িয়ে পড়লো। এমন একটা অবস্থায় এই লোকটা হুমকি দিচ্ছে। অসভ্য একটা ডাক্তার।

হিয়া অল্প একটু দরজা খুলে মুখটা বের করতেই শুভ্র নিজের শার্টটা খুলে হিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,”এইটা পরে, জলদি বের হও।” হিয়া আড় চোখে একটু শুভ্রের দিকে তাকিয়ে শার্টটা নিয়ে নিলো। লোকটাকে যতটা খারাপ ভেবেছিল এতটা না। এমন হুট হাট হুমকি দিয়েই মেজাজ খারাপ করে দেয়।

হিয়া শার্টটা পড়ে আরো বিপদে পড়েছে মনে হচ্ছে। কাধ থেকে পড়ে যাচ্ছে বার বার। গলাটা এতো বড়। এইভাবে বের হবে? কথাটা ভাবতেই শুভ্র আবার নক করলো। হিয়ার কাছে আর কোনো উপায় নেই, এইভাবেই বের হতে হবে।

শুভ্র দরজা খোলার শব্দ পেয়ে তাকাতেই দেখলো হিয়া ভেজা শাড়িটা হাতে নিয়ে গুটিসুটি মেরে বের হয়েছে। হিয়া বের হয়ে শুভ্রকে এমন খালি গায়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। হিয়া বড় বড় পা ফেলে বারান্দায় চলে এলো। শাড়িটা শুকাতে দিতে হবে। শাড়িটা শুকিয়ে গেলেই সে বেচেঁ যায়। বারান্দার রেলিং গুলো অনেক উচু তাই নীচ থেকে তেমন কিছু দেখা যায় না এইটা একটা সস্থির বিষয় তাকে এমন অর্ধেক শার্ট আর অর্ধেক পেটিকোটে কেউ দেখবে না।

কিন্তু বিরক্তির ব্যাপার হচ্ছে দড়িটা একটু বেশিই উচুতে বলতে গেলে তার নাগালের বাহিরে। শতবার লাফিয়েও কাজ হয়নি। শুভ্র এমন ধুপ ধাপ লাফানোর শব্দ শুনে এগিয়ে আসলো। তারপর বুকের কাছে হাত ভাজ করে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। হিয়া কি সত্যি ভাবছে এইভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে সে দড়ির নাগাল পাবে?

হিয়া রীতিমত হাপিয়ে গেছে, এতো উচুঁতে দড়ি টাঙিয়েছে কে? ঐটা নির্ঘাৎ মইয়ের সমান লোক ছিল। হিয়ার বিরক্তি আরো বাড়লো যখন দেখলো শুভ্র একপাশে দাড়িয়ে মজা নিচ্ছে। হিয়া ভ্রু কুঁচকে বলেই ফেললো,” এইভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে কি দেখছেন? একটু হেল্প করতে পারছেন না?”

শুভ্র কোনো জবাব দিলো না। হিয়া আড় চোখে তাকিয়ে আবার দড়িটা ধরার জন্যে চেস্টা করতে লাগলো। শুভ্র এগিয়ে এসে হিয়ার কোমড় ধরে উপরে তুলতেই হিয়া হকচকিয়ে তাকালো। হিয়াকে এইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শুভ্র বললো,” কি হলো তাকিয়ে আছো কেনো?”

” আপনি আমাকে নামান। আমি এইভাবে কাপড় দিতে পারবো না। নামান আমাকে আমি পড়ে যাবো।”,বলেই নামতে চেষ্টা করলো। শুভ্র আরো শক্ত করে ধরতেই শিউরে উঠলো হিয়া। হিয়া চোখ মুখ খিচে অপ্রস্তুত হয়ে বললো,” নামান আমাকে, লোকে দেখবে তো।”

” সেটা আমি বুঝবো। তোমাকে যেটা করতে বলেছি করো।”,কঠিন গলায় বললো শুভ্র। শুভ্রের কণ্ঠ শুনেই মনে হচ্ছে শুভ্র তাকে নামবে না। হিয়া চটজলদি শাড়িটা মেলে দিয়ে বললো,” হয়েছে, হয়েছে এবার নামান আমাকে।”

শুভ্র হিয়াকে আস্তে করে নামিয়ে নিজের সামনে দাড়করাতে হিয়া খেয়াল করলো তার কাঁধের দিকে শার্টটা সরে গিয়েছে। হিয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে গলার কাছে শার্ট শক্ত চেপে ধরলো। তারপর শুভ্রের দিকে তাকিয়ে দেখলো শুভ্র ঠোঁট চেপে হাসছে। শুভ্র হিয়ার কোমড় ধরে আরেকটু কাছে আনতেই। হিয়ার বুকের ভিতরটায় ধুক ধুক শুরু হয়েছে। শুভ্র হিয়ার মুখের সামনে এসে ফিসফিসিয়ে বললো,” আই থিঙ্ক আজকের দিনটা বড্ড বেশামাল, সব কিছু তো আমারই ফেবারে। ইভেন তোমার পড়ে থাকা আমার এই শার্টটাও।”
#নীলচে_তারার_আলো
#নবনী_নীলা
#পর্ব_৩৬

শুভ্র হিয়ার মুখের সামনে এসে ফিসফিসিয়ে বললো,” আই থিঙ্ক আজকের দিনটা বড্ড বেশামাল, সব কিছু তো দেখছি আমারই ফেবারে। ইভেন তোমার পড়ে থাকা আমার এই শার্টটাও।”

হিয়ার গায়ে এক হিম শীতল স্রোত বয়ে গেলো। দুজনের মাঝে দূরত্ব খুব অল্প। এমনভাবে শুভ্রের এতটা কাছে আসায় হিয়ার অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। লোকটার গায়ে শার্ট পর্যন্ত নেই। তাই শুভ্রের দিকে তাকাতেও লজ্জা লাগছে। কি অদ্ভূত এক নিরবতা…! শুভ্র দূরত্ব কিছুটা কমিয়ে আনতেই দরজার শব্দ হিয়া ছিটকে সরে দাঁড়ালো। তার আত্মাটা এক্ষুনি বেড়িয়ে আসবে। কেউ কি তাদের এইভাবে দেখে নিয়েছে!

শুভ্র আড় চোখে হিয়ার দিকে তাকালো। তারপর তপ্ত নিশ্বাস ফেলে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। এক হাত দেওয়ালে রেখে দরজাটা ধরে দাড়ালো শুভ্র। নিধি এসেছে, হিয়ার খোঁজে। শুভ্র মিথ্যে বলাটা একদমই পছন্দ করে না কিন্তু আজ বাধ্য হয়েই বললো,” হিয়ার মাথা ব্যাথা করছে।” কথাটা বলতেও সে বেশ অসস্তি বোধ করলো।

নিধি ঠোঁট চেপে বললো,” ও আচ্ছা। তুমি তাহলে, কি ভাবির সেবা করছো?” বলেই শুভ্রের এমন খালি গায়ের দিকে তাকালো।

শুভ্র কঠিন চোখে তাকাতেই নিধি হেসে উঠে বললো,” আচ্ছা আমি। গেলাম।” বলেই দৌড় দিলো।

⭐হিয়া বিছানার একপাশে বসে আছে। সে বুঝতে পারছে না শুভ্র তার সাথে এই ঘরে বসে আছে কেনো? হিয়া কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। তার বুকের ধুকপুকানি তো বেড়েই চলেছে। হিয়া একটু কেশে বললো,” আপনি এই ঘরে বসে আছেন কেনো?”

শুভ্র আড় চোখে তাকিয়ে উঠে দাড়ালো। তারপর হিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। হিয়া জড়সড় হয়ে বসে রইলো। এখন মনে হচ্ছে,কথাটা বলেই ভুল করেছে। হিয়া আমতা আমতা করে বলল,” আসলে আমি বলতে চাচ্ছিলাম, এইভাবে খালি গায়ে আছেন কেনো? শীত করছে না।”

” এতো চিন্তা আমার জন্যে? তাহলে শার্টটা আমাকে খুলে দিলেই পারো।”, শুভ্রের কথাটা শুনে হিয়ার বুকের ভিতরে ধুক করে উঠলো। হিয়া সঙ্গে সঙ্গে শার্টের কলার চেপে ধরে বিস্ফোরিত চোখে তাকালো তারপর ভয়ার্ত গলায় বলল,” থাক, থাক আপনি এইভাবেই থাকুন। ঠাণ্ডা লাগলেও এইভাবে থাকুন।”

শুভ্র বিরক্তির নিশ্বাস ফেললো। এইভাবে সে বের হতেও পারছে না। বাড়ির যা অবস্থা, বের হলেই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। শুভ্র হিয়ার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে বললো,” তোমার এই শাড়ী শুকাতে আর কতক্ষন লাগবে?”

হিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো,” আমি কি করে জানবো? এক দুই ঘণ্টা তো লাগবেই।”

শুভ্র বিছানার একপাশে রাখা বালিশটা নিয়ে শুয়ে পড়লো। ফোন আর চশমাটা একপাশে রাখতে রাখতে বললো,” তোমার শাড়ী শুকিয়ে গেলে আমাকে ডাকবে, বুঝতে পেরেছো?” বলেই দৃষ্টি সামনে রেখে শুয়ে পড়লো।

হিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো,” আপনি এখন ঘুমাবেন?”

” হ্যা,” বলেই হিয়ার দিকে তাকালো তারপর বললো,” কেনো তোমার কি কিছু করতে ইচ্ছে করছে?” হিয়া আড় চোখে তাকিয়ে রইলো।

অসভ্য ডাক্তার মনে মনে বললো হিয়া।বলেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো। শুভ্র পুনরায় দৃষ্টি সামনে রেখে চোখ বন্ধ করলো।

হিয়া আস্তে করে বিছানায় থেকে নেমে পড়লো। শাড়িটা যে কখন শুকাবে? লোকটা এতো খারাপ কাউকে ডেকেও দিচ্ছে না আরেকটা আনার শাড়ির জন্যে। অবশ্য ডাকলেও সমস্যা, বাড়িভর্তি লোক। সবাই গুরুজন আর বাকিরা তাদের দুজনকে এইভাবে দেখলে রসিকতা করবে। ভয়াবহ রকমের রসিকতা। সেইসব রসিকতা শোনার চেয়ে এই বদমাশ ডাক্তারের সাথে এক ঘরে থাকাও ভালো। শাড়িটা হালকা হালকা শুকিয়ে গেছে তবুও মনে হচ্ছে ঘণ্টাখানেক লাগবে।

হিয়া বারান্দার একপাশে নিজেকে আড়াল করে দাড়ালো। ইস নিচে সবাই কি মজাই না করছে? বাবা পিয়াজ কাটছে…! বড় চাচা কিছুক্ষণ পর পর টিসু দিয়ে বাবার চোখের পানি মুছে দিচ্ছেন। মা বেশ বিরক্তি নিয়ে বাবার এই কাদুনে চেহারার দিকে তাকিয়ে আছেন। বাকিদের কি নাজেহাল!

আচ্ছা এই ডাক্তার সাহেব কি রান্না করতে পারে? রান্না না করতে পারলেও ডাক্তার সাহেব কাটাকুটি তো ঠিক পারবে। মনে মনে ভেবেই হিয়া মজা পাচ্ছে।

শুভ্রের এই শার্ট গায়ে দিয়ে অদ্ভূত এক অনুভূতি হচ্ছে তার। মনে হচ্ছে শুভ্র যেনো তাকে নিজের সাথে আস্টে পিষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। অসভ্য ডাক্তার কিভাবে মুখের উপর তখন বললো তুমি কি কিছু করতে চাও? মুখে কোনো লাগাম নেই।

হিয়া কিছুক্ষণ পর বারান্দা থেকে রুমে এলো। শুভ্রর দিকে তাকাতেই মনে হলে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। হিয়া আবার বারান্দায় ফিরে এসেছে। শুভ্রের ঘুম ভাঙ্গানোর কোনো ইচ্ছে নেই তার। হিয়া পুরো সময়টা বারান্দার মিষ্টি রোদে কাটিয়ে দিলো।

শাড়িটা শুকোতেই হিয়া শাড়ী হাতে নিশব্দে পা ফেলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। তারপর একদম ঠিক মতন শাড়িটা পড়ে শুভ্রের শার্টটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো।

হিয়া খুব আস্তে আস্তে পা ফেলে এগিয়ে এসে শুভ্রের মাথার পাশে বসলো। উদ্দেশ্য ছিলো শুভ্রকে একটু জ্বালাতন করবে কিন্তু তারপর মুগ্ধতা ভরা চোখে তাকিয়ে রইলো ঘুমন্ত শুভ্রনীল আহমেদের দিকে।

কত পার্থক্য এই ঘুমন্ত আর জাগ্রত শুভ্রের মাঝে। বসন্তের এই মিষ্টি রোদের আলোয় কতটা সুন্দর লাগছে তার এই মুখটা। ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে ইচ্ছে করছে না তার। হিয়ার মনের কোন সুপ্ত এক বাসনা জাগলো। হিয়া কিছু না ভেবেই আস্তে আস্তে মুখটা এগিয়ে আনলো ঘুমন্ত শুভ্রের দিকে। খুব কাছে এসে পড়তেই এক মুহূর্তের জন্যে থমকালো। সে এটা কি করতে যাচ্ছে? এই হনুমানটার এইভাবে কাছে চলে আসাটা কি ঠিক হচ্ছে? লোকটা যদি জেগে যায়? কিন্তু বদমাশ মনটা যে মানছে না। আচ্ছা একবার দেখে নিলেই তো হয় বিপদ কতটা আছে?

হিয়া ফিসফিসিয়ে শুভ্রের কানের কাছে বললো,” এই যে বদমাশ ডাক্তার? আপনি কি ঘুমিয়ে…..আছেন?” বলেই মুখটা উপরে তুলে শুভ্রের দিকে তাকালো। খুব হাসি পাচ্ছে হিয়ার তাও হাসিটা থামিয়ে শুভ্রের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। হিয়ার ইচ্ছে করছে টুপ করে লোকটার গালে একটা কিস বসিয়ে দেয়। থাক পরে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। হিয়া শুভ্রের কপালের সামনের চুলগুলো ফু দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে সরে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে শুভ্র চোখ মেলে তাকালো। শুভ্রকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হিয়ার বুকের ভিতরটা ধুক করে উঠলো।

শুভ্র তাহলে এতক্ষণ ঘুমের ভান ধরে ছিলো। হায় আল্লাহ, শুভ্র সবটা শুনেছে তাহলে? হিয়া একটা ঢোক গিলে কোনো ভাবে উঠে যেতে চাইলো কিন্তু শুভ্র শক্ত করে হিয়ার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। হিয়া বিস্ফোরিত চোখে তাকাতেই শুভ্র বললো,” তুমি ঠিক কি করতে চাইছিলে আমার সাথে? আর কে বদমাশ ডাক্তার?”, বলেই শুভ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। হিয়ার ঘাম ছুটছে রীতিমত। নাউজবিল্লাহ সব শুনে ফেলেছে। হিয়া অনেক সাহস জুগিয়ে বললো,” আসলে আমি চেক করছিলাম আপনি ঘুমিয়ে আছেন কিনা ?”

” এইভাবে আমার মুখের উপর ফু দিয়ে চেক করছিলে?”, পাল্টা প্রশ্ন করলো শুভ্র। শুভ্রের এই প্রশ্নে হিয়া চোখ পিট পিট করে তাকালো। কি বলবে এইবার সে? নিচের ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে একটা ঢোক গিললো তারপর এলোমেলো দৃষ্টিতে বললো,” আমি ভেবেছিলাম আপনার গরম লাগছে, তাই।”

“কিন্তু,গরম তো আমার এখন লাগছে।”, শুভ্রের গলায় অন্য সুর শুনতেই হিয়া শুভ্রের দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলো। শুভ্র এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হিয়ার দিকে তারপর হালকা হেসে উঠে হিয়ার হাত ছেড়ে দিয়ে বললো,” আমি ভীতু দেখেছি কিন্তু তোমার মত ভীতু দেখিনি।”

হিয়া ছাড়া পেয়ে হুড়মুড়িয়ে উঠে আড় চোখে শুভ্রের দিকে তাকালো। শুভ্র উঠে বসে হাত বাড়িয়ে খাটের পাশ থেকে শার্টটা হাতে নিলো। হিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো,” আমি ভীতু মানে?”

” এইযে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম দেখে আমার কাছে আসার চেষ্টা করলে। তাও আবার ব্যার্থ চেষ্টা। আর ধরা পরার পর ভুলভাল কিছু মিথ্যে কথা।”, বলেই তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো শুভ্র। ব্যাপারটায় সে বেশ মজা পেয়েছে বোঝাই যাচ্ছে।

হিয়া মুখ বাঁকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। তাকে ভীতু বলেছে..! ভয় পাওয়ার কি আছে? নিজের বরের কাছে যেতে আবার কিসের ভয়? সে মোটেও এতটা ভীতু না। শুধু ওই লোকটার কাছে একবার ধরা পড়লে যে সে আর ছাড়া পাবে না সেটা সে জানে। সেই ভয়েই ধারে কাছে ঘেঁষে না সে। কিন্তু লোকটা হাসলো কেনো তার উপর? ভেবেই রাগ লাগছে।

শুভ্র শার্টটা গায়ে দিয়ে সবে উঠে দাঁড়িয়েছে। হিয়াকে দরজার ওপাশ থেকে শুধু মুখ বের করে থাকতে দেখে বললো,” কি ব্যাপার! নিজের সাহসের পরিচয় দিতে ফিরে এসেছ?”

হিয়া এসেছিলো অন্য কারণে কিন্তু এইবার সত্যি ভীষন রাগ লাগছে লোকটা তাকে এতো ভীতু মনে করে? হিয়া আড় চোখে তাকিয়ে বললো,” একটু এইদিকে আসুন তো।”

শুভ্র ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলো। হিয়ার সামনে আসতেই হিয়া চোখ দিয়ে ঈশারা দিয়ে বললো,” একটু ঝুঁকে আসুন।”

” কেনো?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করতেই হিয়া কড়া গলায় বললো,” কথা আছে।”

” ওকে।”,বলে শুভ্র ঝুকে আসতেই শুভ্রকে অবাক করে হিয়া শুভ্রের গলায় কামড় বসিয়ে দিয়ে বললো,” এইবার বুঝলেন? আমার কতো সাহস।” বলেই ঝড়ের গতিতে দরজার ওপাশ থেকে মুখ বের করে দৌড়ে পালিয়ে গেলো। শুভ্র চোখ বন্ধ করে ব্যাথা সহ্য করলো কিন্তু চোখ মেলতেই সাহসী হিয়া উধাও। হুঁ, খুব সাহস। বাঁদর থেকে আবার বিড়ালে প্রমোশন হয়েছে।

[ #চলবে ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here