প্রণয়াসক্ত পূর্ণিমা পর্ব – ৫৬+৫৭+৫৮ ও শেষ

##প্রণয়াসক্ত_পূর্ণিমা
#Writer_Mahfuza_Akter
পর্ব-৫৬

সূর্য ডুবে আকাশ নিকষ কালোয় নিমজ্জিত হয়েছে সবেমাত্র। হোটেলের পার্কিং এরিয়ায় গাড়ি থামতেই অর্থী বের হয়ে গেল গাড়ি থেকে। ফোনে চটপট বাংলাদেশি একটা সিম কার্ড ইনসার্ট করেই ডক্টর ক্লারার নাম্বারে ডায়াল করলো। তিনি আগেই অর্থীকে নিজের নাম্বারটা দিয়ে রেখেছিলেন বাংলাদেশে এসে যোগাযোগ করার জন্য। অর্থী ডক্টর ক্লারাকে কল দিয়ে নিজের আগমন সম্পর্কে জানালো।

অরিত্রীর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে গাড়ির ভেতরে তাকালো অর্থী। অরিত্রী নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ির সিটে চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে বসে আছে। অর্থী অবাক হলো। বাংলাদেশে আসার জন্য বরাবরই লাফালাফি করে বেড়ানো মানুষটার এমন হোলদোলহীন অবস্থা দেখে অবাক হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই। অর্থী ওকে কিছু বলতে যাবে, এমনসময় ডক্টর ক্লারার গলার আওয়াজ ভেসে এলো, তিনি সাথে আরও দুজনকে নিয়ে ওদের দিকে আসছেন আর বলছেন,

“এসে গেছো তোমরা? কোনো সমস্যা হয়নি তো?”

অর্থী ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে বিরবির করে বললো,

“এখনো হয়নি কোনো সমস্যা! অর্ণব কোনো কান্ড ঘটালেই হলো। সেটার জন্যই ওয়েট করছি আমি।”

অরিত্রী নড়েচড়ে উঠে বসলো। গাড়ি থেকে বের হতেই ডক্টর ক্লারা ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বললো,

“তোমরা ভেতরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। তোমাদের সাথে কথা আছে আমার।”

অর্থী আর অরিত্রীকে ওদের রুম দেখিয়ে দিয়ে ডক্টর ক্লারা চলে গেলেন। একটা রুমে দুজনের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই হিসেবে অর্থী আর অরিত্রী দু’জন এক রুমেই থাকবে। অর্থী তড়িৎ গতিতে দুজনের জিনিসপত্র আলমারিতে গুছিয়ে রেখে ফ্রেশ হতে চলে গেল। অরিত্রী থম মেরে কিছুক্ষণ বেডে বসে রইলো। মাথার ভেতরটা কেমন যেন ভো ভো করছে! অনেকগুলো প্রশ্ন একসাথে মস্তিষ্ক দলা পেকে থাকলে এমনটাই অনুভূত হয় ওর।

অর্থী বেরিয়ে এসে অরিত্রী এমন চিন্তিত মুখ দেখে ভ্রু কুঁচকালো। মেয়েটা কেমন অদ্ভুত ভাবে বসে আছে! চুলগুলো এলোমেলো, মাথাটা নোয়ানো। সে এগিয়ে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালো। ভেজা চুলে তোয়ালে ডুবিয়ে বললো,

“টেনশান হচ্ছে? চিন্তা করিস না! আপাতত অর্ণব কিছু করতে পারবে না। এট লিস্ট এক সপ্তাহ এই দেশে থাকতে পারবি!”

“ওসব নিয়ে ভাবছি না!” অরিত্রীর নির্বিকার কন্ঠ।

অর্থী অবাক হয়ে বললো, “কেন ভাবছিস না? একমাসের জন্য এখানে এসেছি আমরা! তোর কি একমাস থাকার ইচ্ছেটাই নেই? অর্ণব আর মোহনা আন্টি জোরাজুরি করলে চলে যাবি?”

অরিত্রী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। রোষিত কন্ঠে বললো,

“কী সব আজে বাজে বকছো? এতো কাঠখড় পুড়িয়ে এখানে এলাম এতো তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার জন্য নাকি? আমি না চাইলে আমাকে কেউ এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবে না। তাই এসব চিন্তার বিষয় না।”

অর্থী অরিত্রীর কথার মানে না বুঝে অবুঝের মতো তাকিয়ে রইলো। ওর পাশে বসতে বসতে বললো ,

“তাহলে কী নিয়ে ভাবছিস?”

অরিত্রী আনমনে বললো, “ঐ বাচ্চা দু’টোকে নিয়ে ভাবছি। বিশ্বাস করো, আপি! ওদেরকে যখন থেকে দেখেছি, তারপর থেকে একটা মুহুর্তে আমি শান্তি পাচ্ছি না। ওদের দুজনের নিষ্পাপ মুখ দু’টো আমার চোখের সামনে ভাসছে বারবার। সেই মুখে কারো আবছায়া ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে যেন নিজেকে খুঁজে পাচ্ছি ওদের মাঝে আমি। এরকমটা কি শুধুই কো-ইন্সিডেন্স? নাকি ওদের মা নেই শোনার পর থেকে সিম্প্যাথির জন্য আমার এমনটা লাগছে? আমি বুঝতে পারছি না।”

অর্থী মনে মনে হাসলো। মাতৃত্ব হয়তো এমনটাই হয়! নিজের অস্তিত্বে ধারণ করা নিষ্পাপ সত্তাগুলোকে দেখে ভেতরে একটু আলোড়ন তো হবেই! বরং এটাই স্বাভাবিক। তবুও মুখে কিছু বললো না।

ডক্টর ক্লারা ট্রলিতে করে ওদের জন্য খাবার নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। অরিত্রীকে দেখে বললেন,

“এ কি! তুমি এখনো ফ্রেশ হওনি? ডিনার করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া উচিত তোমাদের। কাল থেকে কিন্তু খাওয়ার টাইমও ঠিকমতো পাবে না!”

“সরি, ম্যাম। একটু টায়ার্ড লাগছিল। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

অরিত্রী হকচকিয়ে গিয়ে নিজের কাপড়চোপড় নিয়ে তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে চলে গেল।

খাওয়ার পর্ব শেষ করার পর ডক্টর ক্লারা ওদের হাতে একটা লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে বললেন,

“এই লিস্টটা দেখে নাও। এখানে ঐ সব হসপিটালের নাম আছে যেখানে তোমাদের ডিউটি দিতে হবে। লেইট করে বসায় এই পাঁচটা হসপিটাল-ই বাকি আছে, অন্য গুলোর জন্য ডক্টর এসাইন করা হয়ে গেছে। এই পাঁচটার মধ্যে থেকে তিনটা হসপিটাল তোমরা নিজেদের ইচ্ছে মতো সিলেক্ট করে নিতে পারবে। একটা হসপিটালে এক সপ্তাহ সময় দিবে। টোটাল তিনসপ্তাহ পর যেই নয়দিন বাকি থাকবে, সেসময় মেডিক্যাল ক্যাম্পিং করা হবে। সেই বিষয়ে পরে জানিয়ে দিবো।”

অরিত্রী মাথা নাড়ালো। ডক্টর ক্লারা আলতো হেসে বিদায় নিতেই অর্থী একবার নিজের লিস্ট, আরেক বার অরিত্রীর হাতে থাকা লিস্টটায় চোখ বুলালো। কিন্তু অরিত্রীর হাতে থাকা কাগজটার দিকে চোখ পড়তেই অর্থীর মুখ জুড়ে বিস্ময় খেলে গেল। বিস্ফোরিত চোখে তাকালো সে। বললো,

“তুই এই হসপিটালটা সবার আগে কেন সিলেক্ট করলি?”

“নামটা ভালো লেগেছে, তাই! ”

অরিত্রীর কাটকাট জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারলো না অর্থী। অরিত্রী প্রথমেই সৌহার্দ্যের হসপিটালটাই বেছে নিলো কেন? আসলে কি অরিত্রীর মনেই কিছু একটা চলছে নাকি সে-ই বেশি বেশি ভাবছে? মাথার মধ্যে প্রশ্নটা ঘোরাফেরা করতে লাগলো অর্থীর!

৫০.

সৌহার্দ্য রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রণয়ের দিকে। প্রণয়ের হাতে ও পায়ে ব্যান্ডেজ দেখে ঠিক কী বলবে, সেটা বুঝে উঠতে পারছে না সে। সারাদিন হসপিটালে টানা ডিউটি দিয়ে এখন বাসায় এসে ছেলের এই অবস্থা দেখে দৃশ্যটা একদম কলিজায় আঘাত করলো তার। কিন্তু প্রণয়ের কাছে না গিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের জিনিসপত্র টেবিলে রাখতে রাখতে বললো,

“কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?”

প্রণয়ী প্রণয়ের পাশেই বসে ছিল। সে মিনমিন করে বললো,

“পার্কে গিয়েছিলাম, খেলতে।”

“এসব কীভাবে হলো?”

সৌহার্দ্যের থমথমে কন্ঠ শুনে প্রণয়ী ঢোক গিলে বললো,

“পাপা, ভাইয়ের কোনো দোষ নেই। আসলে….”

প্রণয়ী কী বলবে, বুঝতে পারলো না। সৌহার্দ্য এগিয়ে এসে ওদের দুজনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। দুজনের ভীতু মুখ দুটো পর্যবেক্ষণ করে বললো,

“আজকে আমারও হাত কেটে গেছে!”

প্রণয়-প্রণয়ীক চমকে উঠলো। এরকম কথা তারা আশা করেনি। ভেবেছিল, সৌহার্দ্য ওদের বকাবকি করবে। কিন্তু সৌহার্দ্যের হাত-কাটার কথা শুনে ওরা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সৌহার্দ্যের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো, সত্যি সত্যিই হাতের তালুর মাঝের দিকে বেশ মোটা ব্যান্ডেজ করা। প্রণয়-প্রণয়ী সৌহার্দ্য হাত টেনে ধরলো। সৌহার্দ্য একটু ব্যথা পেলেও সেটা প্রকাশ করলো না। প্রণয় সৌহার্দ্যের হাতটা নিজের কোলে নিলো। টলমলে চোখে তাকালো সৌহার্দ্যের দিকে। নাক টেনে বললো,

“অনেক ব্যথা লেগেছে, না?”

প্রণয়ী চোখ মুছলো। সৌহার্দ্যের ব্যান্ডেজে নিজের ছোট ছোট হাত আলতো করে ছুইয়ে দিয়ে বললো,

“অনেক গুলো রক্ত পড়েছে তোমার? অনেকগুলো ব্যথা হচ্ছে, তাই না?”

সৌহার্দ্য হাসি হাসি চোখে তাকালো। বললো, “আপনাদেরও কি অনেক ব্যথা লাগছে এখন?”

প্রণয়-প্রণয়ী কাঁদো কাঁদো চোখে তাকিয়ে রইলো। সৌহার্দ্য প্রণয়ের চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললো,

“আমারও এমনটাই লেগেছে, যখন আমি ঘরে ঢুকেই আপনার এই অবস্থা দেখেছি।”

“আ’ম সরি, পাপা! আমি সবসময় নিজের খেয়াল রাখার চেষ্টা করলো।”

“গুড বয়! মনে থাকে যেন!”

প্রণয়ী নিজের চোখের পানি মুছে ভাঙা গলায় বললো,

“তুমিও প্রমিস করো। তুমিও নিজের খেয়াল রাখবে। তোমার কোনো কষ্ট দেখলে আমার অনেক কান্না পায়!”

সৌহার্দ্য হেসে প্রণয়ীর নাক টেনে দিয়ে বললো,

“আচ্ছা? ঠিক আছে, প্রমিস! এবার আমাকে বলো, প্রণয়ের এই অবস্থা হলো কী করে?”

প্রণয়ী সৌহার্দ্যকে সব কিছু খুলে বললো। সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো প্রণয়ের দিকে। ছেলেটার সাহস দেখে সে অবাক না হয়ে পারে না! প্রণয়ী বললো,

“তারপর ঐ আন্টিটা-ই ভাইয়ের হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। আর জানো, পাপা? প্রণয় আন্টিটাকে থ্যাংকসও বলেনি!”

সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো, “ব্যাড ম্যানার’স! উনি তোমাকে হেল্প করেছে। তোমার উচিত ওনাকে ধন্যবাদ দেওয়া!”

প্রণয় বিরক্ত হয়ে বললো, “আন্টিটা দেখতে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল! প্রণয়ীর সাথে ওনার চেহারায় অনেক মিল পাচ্ছিলাম আমি। কেমন যেন শাসনের সুরে কথা বলছিল। আমার পাপা ছাড়া আমায় কেউ শাসন করুক, এটা আমার পছন্দ না।”

প্রণয়ী রাগী কন্ঠে বললো, “একদম আজেবাজে কথা বলবি না, ভাই। আন্টিটা অনেক ভালো, অনেক সুন্দর। অর্থী আন্টি এলে তোর নামে নালিশ করবো আমি, দেখিস!”

সৌহার্দ্য ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বললো,

“অনেক হয়েছে ঝগড়া। পাপা অনেক টায়ার্ড। এখন একটু রেস্ট নেবে। তারপর আমরা ডিনার করে অনেক গল্প করবো, ঠিক আছে?”

প্রণয়-প্রণয়ী একসাথে বললো, “ওকে, পাপা!”

৫১.

অর্ণব পাংশুটে মুখে বসে আছে মিস্টার আফনাদ আর মোহনার সামনে। মোহনা চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন,

“আমি জানতাম, মেয়েটা এমন কিছুই করবে! ওর তো কোনো দোষ নেই! ঐ অর্থী-ই আমার মেয়েটার কানে এসব ঢুকিয়ে ওকে এদেশে এনেই ছাড়লো। আমার মেয়ের সুখ কারো সহ্য হয় না!”

মিস্টার আফনাদ মনে মনে বেশ খুশি। কিন্তু সেটা প্রকাশ করলেন না। মোহনার প্রতি বিরক্তি দেখিয়ে বললেন,

“যা হবে, ভালোই হবে! তুমি অহেতুক মাথা ঘামিও না তো! এক মাসেরই তো ব্যাপার! এর মধ্যে যদি অরিত্রীর সব কিছু মনে পড়েও যায়, তাহলে সেটাই ওর জন্য ভালো।”

মোহনা রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “ভালো? তোমার আদৌ এমনটা মনে হয়? আমার মেয়ের অতীত কোনো দিন-ই ওর জন্য সুখকর ছিল না!”

“কিন্তু সেটাই ওর জীবন ছিল, সেটাই ওর ভাগ্য। তুমি এতো বছর ওকে সেসব থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ঠিক করোনি।”

মোহমা অবাক কন্ঠে বললেন,

“তোমার এখনো মনে হয় আমি বেঠিক কাজ করেছি? তুমি একবার অরিত্রীর দিকে তাকিয়ে দেখো! ও এখন একজন সফল ডক্টর। ওর জীবনে কোনো দুঃখের ছায়াও নেই। আমি চাই না, সেই অতীতের দুর্বিষহ দিনগুলো ওর জীবনে আবার ফিরে আসুক।”

মিস্টার রায়হান হতাশ হলেন। মোহনাকে কিছু বুঝিয়ে লাভ নেই। এতো বছরেও যে কিছু বুঝতে পারলো না, সে আজকেও বুঝবে না, এটাই স্বাভাবিক।

মোহনা অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“অরিত্রীকে খুঁজে বের করো। ওকে যত দ্রুত সম্ভব, আমি আমার সামনে চাই।”

অর্ণব চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো, “আমি অনেক বার জানতে চেয়েছি, ওরা কোন এরিয়ায় গেছে। কিন্তু হসপিটালের অথরিটি কিছু জানালোই না। আমি এখন নিজের পদ্ধতি ব্যবহার করে ওকে খুঁজে বের করবো।”

“সময় নষ্ট করা যাবে না, অর্ণব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ওকে নিয়ে কানাডা ফিরে যেতে চাই আমি।”

অর্ণব রহস্যের হাসি দিয়ে বললো, “চিন্তা করো না। এই সপ্তাহের মধ্যেই আমরা কানাডা ব্যাক করছি।”

-চলবে….

(ভুলত্রুটি মার্জনীয়!)প্রণয়াসক্ত_পূর্ণিমা
#Writer_Mahfuza_Akter
পর্ব-৫৭

“তরী ফিরে এসেছে, মধু! ওকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পেরেছি আমি।”

অর্থীর ফিসফিসে কন্ঠে বলা কথাটা শুনে মধু চমকে উঠলো। নড়েচড়ে উঠে বিস্ফোরিত চোখে তাকালো অর্থীর দিকে। অর্থী আশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো।

ঘরটায় আধো আধো আলো জ্বলছে। হলদেটে টিমটিমে আলোয় মধুর অবয়ব অর্থীর চোখে অনেকটাই স্পষ্ট। অর্থী যতবারই দেশে আসে, প্রহরের সাথে একবারের জন্য হলেও মধুর কাছে আসে। মেয়েটাকে দেখলে নিজের মধ্যে অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে ওঠে অর্থীর। কতটা স্বার্থহীন হলে একটা মানুষ কাছের মানুষগুলোর সুখের জন্য এমন মৃত্যুতুল্য জীবন আলিঙ্গন করে নিতে পারে, সেটা মধুকে না দেখলে জানতেই পারতো না সে। তার মনপ্রাণ জুড়ে এখনও নিজের জন্য কোনো প্রত্যাশা নেই। শুধু সৌহার্দ্যের জীবনে তরী ফিরে আসুক আর প্রহর তাকে ভুলে যাক- এই দুটো প্রার্থনা সর্বক্ষণ করে সে। প্রথম চাওয়া পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা থাকলেও দ্বিতীয় চাওয়াটা কোনোদিনও বাস্তবায়িত হবে না, এটা মধু জেনেও গেছে, বুঝেও গেছে।

মধুর একচোখ উন্মুক্ত, আরেক চোখ মাথায় ঘোমটা দেওয়া ওড়নার সাহায্যে ঢেকে রাখা। সেই দৃশ্যমান চোখটা জলে টইটুম্বুর হয়ে চিকচিক করছে। অর্থী কাঁপা কাঁপা হাতে মধুর চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,

“তরীকে দেখবে না তুমি?”

মধুর অবিশ্বাস্য দৃষ্টি! ক্রমাগত ঠোঁট দু’টো কাঁপছে তার। কম্পিত গলায় কোনোমতে বললো,

“তুমি সত্যি বলছো? তরী ফিরে এসেছে? ও কোথায় এখন? ভাইয়ার কাছে ফিরে গেছে ও?”

মধুর উত্তেজিত কন্ঠস্বরোে খানিকটা ভড়কে গেল অর্থী। নড়েচড়ে আশেপাশে তড়িৎ গতিতে একবার নজর বুলালো। নাহ্, প্রহর কোথাও নেই। ওদের কথা বলার সময় প্রহর এখানে কখনো থাকেও না। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো অর্থী। পূর্ণ দৃষ্টিতে মধুর দিকে তাকিয়ে বললো,

“তরীর ব্যাপারে এখনো কেউ কিছু জানে না, মধু। ভাইয়াও না, সৌহার্দ্য ভাইয়ারা কেউ কিছুই জানে না। তরী নিজেও কিছু জানে না ওর এখানের এতো বড় যোগসূত্রের ব্যাপারে। পরিস্থিতি কেমন যেন ঘোলাটে বর এলোমেলো হয়ে গেছে! ওকে এখানে আনা পর্যন্ত কাজটা বেশ ভালো করে সেরে ফেললেও এখন কী করা উচিত কিছু বুঝে উঠতে পারছি না আমি।”

মধু অর্থীর কথার আগামাথা কিছু বুঝতে পারলো না। অবুঝ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

“তরী কিছু জানে না মানে? কী বলতে চাইছো তুমি, আপু?”

অর্থী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

“খুলে বলছি সব! কিন্তু ভাইয়া যেন এ ব্যাপারে কিছু না জানতে পারে। বেশ ভেবেচিন্তে পরবর্তী স্টেপ নিতে হবে আমাদের।”

৫২.

পুরো এক সপ্তাহ একটানা ডিউটি দিয়ে অভ্যস্ত হলেও টানা চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করার মতো অভিজ্ঞতা এই প্রথম বার হলো অরিত্রীর। বেশ ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত দেহ নিয়ে নিজের চেম্বারে এসে বসলো সে। এই হসপিটালে আজকে তার শেষ দিন বলে প্রেশারটা একটু বেশিই পড়ে গেছে। কাল আবার আরেকটা হসপিটালে ডিউটি দিতে হবে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো অরিত্রী। হাতের গ্লাভস খুলে ওয়াশরুম থেকে একটু ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এলো। কিন্তু সামনে বসে থাকা মানুষটাকে দেখে অতিমাত্রায় চমকে উঠলো সে।

ভেজা মুখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে অরিত্রীর। মুখ মুছতে ভুলে গেল সে। হাত গলিয়ে তোয়ালেটা ফ্লোরে পড়ে গেল। বিস্ফোরিত চোখে তাকালো সামনের ব্যক্তিটার দিকে। মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো, “অর্ণব ভাই! তুমি?”

অর্ণব বসা থেকে উঠে এগিয়ে এলো অরিত্রীর দিকে। চোখে মুখে ধূর্ত হাসি খেলা করছে তার। ফ্লোরের তোয়ালেটার দিকে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। পকেট থেকে টিস্যু বের করে অরিত্রীর ভেজা মুখে স্পর্শ করাতেই বাঁধা দিলো অরিত্রী। সামনে থেকে সরে গিয়ে নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বললো,

“তুমি আমায় কখনো স্পর্শ কোরো না, অর্ণব ভাই। ব্যাপারটা আমার পছন্দ না।”

অর্ণব ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,

“কেন? আজ তো নতুন না! এতো গুলো বছর তো…. ”

“তখন আমি নিজের জীবন নিয়ে সচেতন ছিলাম না, অর্ণব ভাই। অবুঝ ছিলাম আমি! কিন্তু এখন আমি বুঝতে শিখেছি, আমার জীবনে কার প্রভাব ঠিক কতটুকু থাকা উচিত! আর সেই বোধশক্তি আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে, আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি অধিকার আমার নিজের। আমার নিজের কাছে নিজের ইচ্ছের মূল্য না থাকলে পৃথিবীর কারো কাছেই থাকবে না।”

অর্ণব আঙুল দিয়ে নাক ঘষে বললো, “এসব বলে ঠিক কী বুঝাতে চাইছিস তুই?”

অরিত্রী পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো। অকপটে বললো,

“এক মাসের আগে এ দেশ ছেড়ে আমি যাচ্ছি না। তুমি বা মা, কেউই আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবে না।”

“যদি জোর করি?”

অরিত্রী কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

“আমার ওপর জোর খাটানোর কোনো অধিকার তোমার নেই। তুমি আমার কাজিন। আর সেই হিসেবে তোমার ক্ষমতা শুধু আমাকে উপদেশ কিংবা সাজেশান দেওয়া পর্যন্ত-ই। অর্ডার দিতে পারোনা না তুমি আমায়!”

অর্ণব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। অরিত্রী সেটা দেখেও না দেখার ভান করে নিজের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললো,

“প্রচুর ক্লান্ত আমি আজ। আসছি। ভালো থেকো।”

অরিত্রী তড়িৎ গতিতে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। অর্ণব বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। বিমর্ষ ভঙ্গিতে হাসলো আপন মনেই। বুক চিরে বেরিয়ে এলো তপ্ত দীর্ঘশ্বাস। বিরবির করে বললো,

“তোমার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জুড়ে যে সত্তার বাস, তার স্থান নেওয়াটা একেবারেই অসম্ভব!”

৫৩.

সৌহার্দ্য চিন্তিত ভঙ্গিতে প্রণয়ের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। কনুইয়ের ক্ষততে বেশ কয়েকদিন ধরেই ব্যথা অনুভব করেছে প্রণয়। কিন্তু কাউকে সেটা মুখ ফুটে বলেনি। এতো দিনে যেকোনো ক্ষত-ই সেরে যাওয়ার কথা! কিন্তু প্রণয়ের হাত এখনো ঠিক না হওয়ায় সন্দেহ জাগে সৌহার্দ্যের মনে। তাই প্রহরকে বলেছে, স্কুল ছুটির পর প্রণয়-প্রণয়ীকে যেন নিজে গিয়ে নিয়ে আসে আর যাওয়ার পথে হসপিটালে একবার নিয়ে আসে।

“ইনফেকশন হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই পানি লাগার পর ভালোমতো শুকিয়ে নাওনি কখনো? অনেকক্ষণ ভেজা ছিল বলেই এই অবস্থা হয়েছে।”

প্রণয় পাংশুটে মুখে তাকালো সৌহার্দ্যের কথা শুনে। প্রণয়ী নিষ্প্রভ কন্ঠে বললো,

“ভাই তো ঠিক মতো ওষুধও লাগাতো না, জানো পাপা?”

প্রণয় বিস্ফোরিত চোখে তাকালো প্রণয়ীর দিকে। দাঁত কিড়মিড় করে কিছু বলার আগেই প্রণয়ী ছুটে পালিয়ে গেল প্রণয়ের চোখের সামনে থেকে। সৌহার্দ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রণয়ের হাত ড্রেসিং করতে লাগলো।

প্রহর এতক্ষণ চুপচাপ ওদের তিনজনের কাহিনী দেখছিল। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই ফোনে মনোনিবেশ করে বললো,

“অর্থীর সাথে দেখা হয়েছে তোর? ওর আজ থেকে এই হসপিটালে ডিউটি শুরু হবে বলছিলো।”

সৌহার্দ্য প্যাড থেকে তুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললো,

“এখনো দেখিনি! ওর কাজ তো প্যাথলজি ডিপার্টমেন্টে। আমার চেম্বারে এসে একবার দেখা করে যেতে বলিস!”

প্রহর হতাশ ভঙ্গিতে বললো, “এখানে যে কাজের প্রেশারে আছে ওরা! কথা বলার সুযোগ-ই পাচ্ছে না আমার সাথে।”

সৌহার্দ্য নিঃশব্দে হেসে বললো,

“কাজ শিখতে এসেছে। প্রেশার তো একটু হবেই! এই সুযোগ কি আর বারবার আসবে?”

“এজন্যই হয়তো! আচ্ছা, আমি একটু অর্থীর সাথে দেখা করে আসি।”

সৌহার্দ্য প্রহরের দিকে না তাকিয়েই মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানালো। প্রহর অর্থীর নাম্বারে ডায়াল করতে করতে বেরিয়ে গেল চেম্বার থেকে।

প্রণয়ী হসপিটালের করিডোর দিয়ে হাঁটছিল। এই হসপিটালের প্রতিটা অলিগলি ওর যেমন চেনা, তেমনি ওকেও এখানকার প্রতিটা ডক্টর এবং নার্সেরা চেনে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কারো সাথে ধাক্কা লাগতেই খানিকটা চমকে উঠলো প্রণয়ী। মাথা তুলে সামনের মানুষটার মুখের দিকে তাকালো। মুহুর্তেই আনন্দে চোখ দুটো চকচক করে উঠলো প্রণয়ীর। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো,

“সুন্দরী আন্টি! তুমি?”

অরিত্রী চোখ ছোট ছোট করে তাকালো প্রণয়ীর দিকে। ভ্রু নাচিয়ে বললো,

“কে সুন্দরী আন্টি?”

“কে আবার? তুমি। কিন্তু তুমি এই হসপিটালে কেন?”

অরিত্রী হেসে বললো, “ডক্টররা তো হসপিটালেই থাকবে, তাই না?”

প্রণয়ী চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো,

“কিন্তু এটা তো আমার পাপার হসপিটাল! তার মানে তুমি এখন থেকে এখানেই আমার পাপার সাথে কাজ করবে?”

মুহুর্তেই অরিত্রীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। মনে মনে কিছুক্ষণ নীরবে ভাবলো। প্রণয়ী উৎসাহ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। অরিত্রী ওর মাথায় হাত রেখে বললো,

“তুমি এখানে তোমার পাপার সাথে দেখা করতে এসেছো?”

“নাহ্! প্রণয়ের জন্য আসতে হলো। ওর হাতে ইনফেকশন হয়ে গেছে, জানো? তাই পাপা ড্রেসিং করিয়ে দিচ্ছে।”

অরিত্রী চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো, “আচ্ছা? তোমার পাপার চেম্বার কোনটা?”

প্রণয়ী আহ্লাদী হয়ে অরিত্রীর হাত ধরে বললো, “চলো তোমাকে নিয়ে যাই!”

দু’জনে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই হঠাৎ একজন নার্স অরিত্রীর সামনে এসে দাঁড়ালো। তাড়াহুড়ো করে বললো,

“ম্যাম, ওটি রেডি করা হয়েছে। এখনই অপারেশন স্টার্ট হবে। আপনারও সেখানে থাকতে হবে।”

অরিত্রী প্রণয়ীর দিকে হতাশ চোখে তাকালো। প্রণয়ী আলতো হেসে বললো,

“তুমি যাও, আন্টি। আমার পাপা বলে, ডক্টরদের জন্য তাদের প্রফেশনটা সবার আগে। আমাদের আবার দেখা হবে।”

অরিত্রী নিচু হয়ে প্রণয়ীর কপালে একটা চুমু দিলো। মেয়েটার প্রতি কেমন যেন অদ্ভুত টান অনুভব করে সে! এটা কি শুধুই কাকতালীয় হতে পারে? ভাবনায় মগ্ন হতে গিয়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো সে। দ্রুত পায়ে নিজের চেম্বারের দিকে চলে গেল অপারেশনের জন্য রেডি হতে।

অপারেশন থিয়েটারে বেশ দক্ষ হাতে সার্জারী করছে সৌহার্দ্য। সবুজ মাস্ক দিয়ে মুখটা ঢাকা থাকলেও ওর নিঃশ্বাসের শব্দ সবার কানেই পৌঁছাচ্ছে। চশমার আড়ালে থাকা চোখ দুটো নিজের হাতের কার্যপদ্ধতির সূক্ষ্মতা বজায় রাখাতে ব্যস্ত। কিন্তু একা একা একটা সার্জারী করাটা বেশ দুঃসাধ্য। তাই কাজে মনযোগ রেখেই নার্সকে বললো,

“কানাডা থেকে কি সত্যি সত্যিই কার্ডিওলজিস্ট এসেছে?”

“ইয়েস, স্যার! ওনাকে জানিয়ে এসেছি।”

“ফরেইন ডক্টররা তো সবসময় টাইমলি কাজ করে! উনি না আসতে পারলে জুনিয়র কোনো ডক্টরকে নিয়ে আসুন ফাস্ট।”

“ওকে, স্যার।”

নার্স যাওয়ার উদ্যোগ নিতেই অরিত্রী অনেকটা ছুটে এসে সৌহার্দ্যের বিপরীতে দাঁড়ালো। জোরে শ্বাস ফেলে বললো,

“সরি ফর বিয়িং লেইট।”

গলার স্বর শুনে চমকে উঠলো সৌহার্দ্য। হাত থেকে সিজারটাও পড়ে গেল। চোখ তুলে তাকালো সামনে দাঁড়ানো মানবীটির দিকে। তার মাথা, মুখ, হাত সবকিছু আবৃত থাকলেও লো পাওয়ারের চশমার আড়ালে থাকা চোখ দুটো দৃশ্যমান। সেই টানা টানা মৃগাক্ষী দুটো সৌহার্দ্য কি কোনো দিন ভুলতে পারে? অসম্ভব!

সৌহার্দ্যের দৃশ্যমান চোখ দুটো দেখে অরিত্রী ভ্রু কুঁচকালো। মানুষটা কেমন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে! এভাবে একজন মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকাটা অদ্ভুত লাগলেও অরিত্রী ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামালো না। কয়েক সেকেন্ড তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো।

চশমার আড়ালে থাকলেও সৌহার্দ্যের টলমলে রক্তিম চোখ দুটো উপস্থিত অনেকেই খেয়াল করলো। যান্ত্রিক ভঙ্গিতে অরিত্রীর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সৌহার্দ্য। সার্জারীর বাকি কাজগুলো অরিত্রী বেশ দক্ষ ও মনযোগী ভঙ্গিতে সম্পন্ন করলো। সৌহার্দ্য কিছু বলতে চেয়েও সব কথা, অনুভূতি, আনন্দ, কান্না, সবকিছু গলায় আঁটকে গেল। সৌহার্দ্য জানতো, তার চাঁদ একদিন ঠিকই তার কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু এভাবে ডক্টর হয়ে তার সমপর্যায়ে এসে দাঁড়াবে, তার কল্পজগতেও আসেনি। আকস্মিকতায় নিজেকে পাথর মনে হচ্ছে সৌহার্দ্যের যে নড়তেও জানে না, কিছু বলতেও জানে না।

অপারেশনটা সাকসেসফুল হয়েছে। অরিত্রী নিজের হাত ধুয়ে চেম্বারে প্রবেশ করলো। একটা টিস্যু নিয়ে হাতটা মুছতে মুছতেই হঠাৎ পেছন থেকে দরজা খোলার শব্দ কানে ভেসে এলো। অরিত্রী চকিত দৃষ্টিতে পেছন ঘুরে তাকালো।

সৌহার্দ্য নিজের মুখের মাস্ক খুলে অরিত্রীর দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকালো। অরিত্রীর মুখ এখনো ঢাকা, চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। সৌহার্দ্য এগিয়ে আসতে আসতে বললো,

“আর পালিয়ে লাভ নেই, তরী। তুমি আবার আমার কাছে বাঁধা পড়ে গেছো!”

এমনসময়ই অর্থী অরিত্রীর চেম্বারে প্রবেশ করলো। সৌহার্দ্যকে দেখে চমকে উঠলো সে। হতভম্ব হয়ে বললো,

“সৌহার্দ্য ভাইয়া, তুমি এখানে?”

সৌহার্দ্য শুনেও শুনলো না যেন! একটানে অরিত্রীর মুখের ওপর থেকে মাস্কটা খুলে ফেললো। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ নিজের প্রিয়দর্শিনীর দিকে। অরিত্রী নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু। অর্থী অবাক হলো। অরিত্রী এমন যান্ত্রিক ভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন? ওর তো সৌহার্দ্যের সাথে ওর বিয়ের কথা কিছুই মনে নেই। সৌহার্দ্যের এমন অদ্ভুত কান্ড দেখে একটু তো রিয়েক্ট করার কথা অরিত্রীর!

অকস্মাৎ সৌহার্দ্য অরিত্রীকে ঝাপটে ধরলো। এতোক্ষণ চেপে থাকা আবেগগুলো ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো যেন! চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি ঝরতে লাগলো। অরিত্রী অনুভব করলো, সৌহার্দ্য কাঁদছে।

“তুমি আমার সাথে কথা বলছো না কেন, চাঁদ? এতো নিষ্ঠুর কীভাবে হলে?”

অরিত্রী ঢোক গিললো। সৌহার্দ্যের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। নির্বিকার কণ্ঠে বললো,

“বলার মতো তো কিছু বাকি নেই! আমাদের মধ্যে যা ছিল, সবটা তুমিই শেষ করে দিয়েছিলে। সেদিন কীভাবে তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলে, আমি ভুলে যাইনি।”

অর্থী অরিত্রীর কাটকাট জবাবে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইলো। বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে গেল ওর।

-চলবে…..

(গল্পের সমাপ্তি আসন্ন! ভুলত্রুটি মার্জনীয় 🖤)#প্রণয়াসক্ত_পূর্ণিমা
#Writer_Mahfuza_Akter
পর্ব – ৫৮

“তোর সবকিছু মনে ছিল, তরী? এতো দিন তুই অভিনয় করে গিয়েছিস আমাদের সাথে!!”

তরী নির্বিকার চোখে তাকালো। ওর এমন ভাবলেশহীন দৃষ্টি দেখে অর্থী গুরুতর ভঙ্গিতে বললো,

“সৌহার্দ্যের কথা না শুনে, না বুঝে এভাবে চলে আসার মানে কী, অরিত্রী? তুই……”

“তরী! আমাকে তরী বলে ডাকবে এখন থেকে। আমি কাগজে-কলমে অরিত্রী হলেও বাস্তবে অরিত্রী সেদিনই মরে গেছে, যেদিন ওকে মাটিচাপা দিয়ে ফেলা হয়েছিল। তরী নামটা আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে। সেদিনের পর থেকে আমি তরী ছিলাম, আর বাকি জীবনটাও থাকবো।”

অর্থীর অবাকতা সীমা পেরোলো। হতবাক কন্ঠে বললো,

“তো…তোর সবকিছু কখন মনে পড়লো?”

“আমি কোনো কিছু ভুলে গেলেই না নতুন করে মনে পড়ার প্রশ্ন আসবে!” তরীর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি।

অর্থী কিছু বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকালো। তরী মলিন মুখে বললো,

“ভুলিনি আমি কিছুই! হ্যাঁ, এটা ঠিক যে কোমা থেকে উঠার পর অনেক কিছুই মনে করতে পারছিলাম না আমি। কিন্তু মাসখানেকের মধ্যেই ধীরে ধীরে সবটা মনে পড়ে গেছে আমার।”

অর্থী নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। এতোগুলো বছর একসাথে থেকেও সে বুঝতে পারেনি, তরীর সবকিছু মনে ছিল! হতভম্ব কন্ঠেই প্রশ্ন করলো সে, “এতো বছর চুপ করে কেন ছিলি তাহলে? এসব নাটকের কারণ কী?”

“শান্তি খুজছিলাম আমি।”

অর্থী অবাক চোখে তাকিয়ে বললো, “শান্তি?”

“হ্যাঁ, মানসিক শান্তি। আমার অতীত জুড়ে শান্তির ছিটেফোঁটাও তো ছিল না! প্রতিটা মুহুর্তের বিষাক্ততা ভুলে বাঁচতে চেয়েছিলাম আমি। সৌহার্দ্য তো আমায় ফিরিয়ে দিয়েছিলো! ওর করা সেই অপমানের ঘা শুকাতেও বহুবছর লেগেছে আমার। এই দেশে কার কাছে আসতাম আমি? কার জন্য আসতাম? কেউ তো আমার নিজের মানুষ ছিল না! তাই ভেবেছিলাম, কানাডাতেই নিজের জীবনের মানে খুঁজি। ডাক্তার হয়ে গেলে অন্তত বেঁচে থাকার একটা কারণ তো থাকবে আমার!”

তরীর টলমলে চোখ দুটো অর্থীর নজরে বেশ ভালো করে ধরা খেল। কিন্তু ওর কথাগুলো পুরোপুরি ধরতে পারছে না সে। তাই বললো,

“তুই এভাবে কেন বলছিস বল তো? এ দেশে আসার একটা কারণই তো তোর জন্য যথেষ্ট! তুই তো একা নস। তোর…….”

হুট করে দরজা খুলে অর্ণব, মোহনা আর মিস্টার আফনাদ প্রবেশ করায় অর্থী কথা বন্ধ করে চমকে তাকালো তাদের দিকে। মোহনা এগিয়ে এসে তরীকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগপ্রবণ সুরে বললেন,

“এখানে কেন এসেছিস তুই? এখানে কেউ তোর ভালো চায় না! কেউ তোকে সুখে থাকতে দেবে না।”

মিস্টার আফনাদ বিরক্ত হলেন। চোখে মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বললেন,

“আহ্! মোহনা! ও এখানে প্রফেশনাল কারণে এসেছে। কে কী ক্ষতি করবে ওর? শুধু শুধু এসব বলছো কেন?”

তরী ওনাদের দিকে একবার তাকালো শুধু। কিন্তু তাদের সাথে কোনো কথা বললো না। সরাসরি অর্ণবের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালো। তরীর দৃষ্টি স্বাভাবিক। অর্ণব ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। তরী হঠাৎ মুখ খুললো,

“আমাকে পাওয়ার কোনো ইচ্ছে কি আজও তোমার মনে আছে, অর্ণব ভাই?”

অর্ণবের চোখ জুড়ে বিস্ময় খেলে গেল। কিন্তু তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মুহুর্তেই মলিনতা এসে ভর করলো দৃষ্টি জুড়ে। কন্ঠে অতিমাত্রায় বিষাদ নিয়ে সে বললো,

“পাওয়ার ইচ্ছে আছে কি না, জানি না! কিন্তু না পাওয়ার আক্ষেপ অন্তত আছে।”

“আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম, আমাকে নিয়ে ভাবা বন্ধ করো। আমার জীবন তো জন্মের পরপরই সৌহার্দ্যের সাথে জুড়ে গিয়েছিল! তোমার জীবনে পথচলার সঙ্গী আমি হতে পারবো না কোনোদিন।”

সৌহার্দ্যের নামটা শুনে মোহনা তরীর দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকালো। তার মানে তরীর সবকিছু মনে পড়ে গেছে! অর্ণব ততোটা অবাক হলো না। এমনটাই তো হওয়ার ছিল! তাই স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো,

“আমি সৌহার্দ্যকে বলেছিলাম, যদি তোর চোখের একফোঁটা জলের কারণ ও হয়, তবে তোকে ওর থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দেবো আমি। এতোটাই দূরত্ব সৃষ্টি হবে তোদের মাঝে যেন দুঃখের ছিটেফোঁটাও তোকে স্পর্শ করতে না পারে। আর আমি সেটাই করেছি!”

তরী দীর্ঘশ্বাস ফেললো অর্ণবের কথায়। অর্থী হা করে তাকিয়ে আছে অর্ণবের দিকে। এই ছেলে তরীকে এতোটা ভালোবাসে ও বুঝতেও পারেনি কখনো। একতরফা ভালোবাসার তীব্রতা হয়তো বরাবরই বেশি হয়!

“তোমরা এখন আমাকে একটু একা ছড়ে দাও। আজকের দিনটা অন্তত আমাকে কেউ ডিস্টার্ব কোরো না।”

তরী কথাটা বলে একমুহূর্তও দাড়ালো না। বারান্দায় দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো অপলক। সবাই কথা বলার আর কোনো সুযোগ না পেয়ে নিজেরাও চলে গেল। অর্থী কিছুক্ষণ হাসফাস করলো তরীর সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু ব্যর্থ মনে ফিরে এলো সেও।

৫৪.
আকাশে আজ বেশ বড়সড় চাঁদ দেখা যাচ্ছে। বারান্দার রকিং চেয়ারটায় বসে সেদিকেই তাকিয়ে আছে সৌহার্দ্য। প্রহর ওর পাশে দাঁড়িয়েই সিগারেটে একের পর এক টান দিচ্ছে। এতোক্ষণে সৌহার্দ্যের বলা কাহিনী শুনে বেশ গভীর ভবে ভাবছে সে।

“তরী এভাবে তোকে বলেছে? অবাক হচ্ছি আমি!”

প্রহরের কথায় সৌহার্দ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

“অন্তত প্রণয়-প্রণয়ীর কথা একবারও কি ভাবে না ও?”

প্রহর ফিচেল হাসি দিয়ে বললো, “সন্তানের দোহাই দিচ্ছিস? একদিন তরীর ভালোবাসাকেও সন্তানের দোহাই বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলি, মনে আছে?”

সৌহার্দ্য চোখ মুখ শক্ত করে বললো,

“ভালেবাসার কাছে ভালেবাসার চেয়ে বড় দোহাই আর কিছু নেই।”

“তাহলে তোর ঐ ভালোবাসার টানেই ফিরে আসবে তরী। নিশ্চিন্ত থাক!”

সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো, “তাহলে এখন হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবো আমি?”

“তোর ইচ্ছে! চাইলে হাত-পা মেলেও বসে থাকতে পারিস।”

সৌহার্দ্য বিরক্ত হলো। বিরস কন্ঠে বললো,

“মজা করিস না তো! আমাকে এটা বল যে, এতো বছর অর্থী তরীর ব্যাপারে সবটা জানতো! তবুও আমাদের কিছু জানায়নি কেন?”

“তরীর মা মিসেস মোহনা সব ঝামেলার কেন্দ্রবিন্দু। ওসব ছাড়! আমি এখন ঘুমাবো। কাল সকালে এমনিতেই ঢাকার বাইরে যেতে হবে।”

সৌহার্দ্য সন্দিগ্ধ চোখে তাকালো। বললো,

“দুই দিন পর পর শহরের বাইরে কী কাজ তোর? ঢাকার ভেতরে কাজকর্ম রাখলেই তো পারিস!”

প্রহর মলিন হাসলো। বললো,

“ব্যস্ততা বাড়লেই ভালো লাগে আমার। কাজের চাপে মনের অশান্তি একটু হলেও তো কমে!”

সৌহার্দ্য হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো। প্রহরের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কিছুটা স্বস্তি পেল মনে। ছেলেটা এতো বছর পর একটু স্বাভাবিক আচরণ করলো ওর সাথে। মধুর অনুপস্থিতি তো ওকে পাথরে পরিণত করেছিল!

৫৫.

মাঝরাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে তরী গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। শহরের শেষ প্রান্তের একটা গ্রামে থাকেন আজাদের স্ত্রী। আপাতত তার সাথেই দেখা করতে যাবে সে। ভবিষ্যতে আবার কবে দেখা হবে জানা নেই।

ভোরের আলো ফুঠতে শুরু করেছে, এমন সময় সেই গ্রামে পৌঁছালো তরী। রাস্তায় হাঁটছিল কয়েকজন লোক। তাদের থেকে ঠিকানা জেনে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে গেল সে। একটা ছোট কুঠুরির মতো বাড়ির সামনে গাড়ি থামালো। দরজার সামনে গিয়ে কড়া নাড়তেই বেশ সময় পর দরজা খুললো এক বৃদ্ধা। তরীর দিকে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বললো,

“তুমি কে গো? কাকে চাও?”

তরীর চোখ ছলছল করছে। সে ভাঙা কন্ঠে বললো,

“আমাকে চিনতে পারোনি, চাচী?”

তিনি চোখ ছোট ছোট করে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করলো। হয়তো চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে। তাই বললো,

“কে তুমি? এমন বিদেশীদের মতো দেখতে কাউকে তো আমি চিনি না!”

“আমি তরী। সেই তরী, যার জন্য আজাদ চাচা অকালে প্রাণ হারিয়েছিল।”

আজাদ চাচার স্ত্রী আবেগান্বিত চোখে তাকিয়ে রইলো তরীর দিকে। তরীর সারা মুখে হাত বুলিয়ে দিলো। বললো,

“তরী? তুই এতোবছর পর? আমাকে এতো বছরে মনে পড়লো তোর!”

“যোগাযোগ করেছিলাম তো একবার! তারপর থেকে তো তুমি আমার ফোনই ধরোনি আর! তোমার নাম্বার অফ বলছিল বারবার।”

“আমার ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছিলো রে! পরে আর কেনার সুযোগ হয়নি। তুইও তো শুধু নিজে বাচ্চাদের খবর নিয়েছিলি আমার থেকে। সৌহার্দ্য আমাকে বলেছিল তোর বাচ্চা দু’টো নাকি মরে গেছে! আমি ভেবেছি, তুই এই খবর শুনে বেশ কষ্ট পেয়েঢ়িস। তাই আর যোগাযোগ করবি না আমার সাথে।”

তরী মলিন হাসলো। বলল,

“যোগাযোগ কেন বন্ধ করবো, চাচী? আমার জীবন থেকে তো সবই হারিয়ে গেছে! যা অবশিষ্ট আছে, তা তো আর হারিয়ে ফেলতে চাই না আমি। আজই কানাডা ফিরে যাবো আমি। ভাবলাম, তোমার সাথে একবার দেখা করে যাই।”

বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে তরী বিদায় নিলো। এখন সে হোটেলে যাবে। আর আজ সন্ধ্যার ফ্লাইটেই সে চলে যাবে এদেশ ছেড়ে।

দুপুরের দিকে হোটেলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তরী৷ মোড় ঘুরাতেই সামনে কারো উপস্থিত দেখে চোখ খিঁচে সজোরে ব্রেক কষলো সে। গাড়ি থামানোর কিছু মুহুর্ত পর চোখ মেলে তাকালো সে। তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে বের হয়ে দেখলো, প্রণয় ওর গাড়ির সামনে বসে আছে। ওর হাঁটু থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে।

তরীর বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো। সে এগিয়ে গিয়ে প্রণয়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে বললো,

“আজকে আবারও আমার গাড়ির সামনে পড়ে গেছ তুমি? কতটুকু ছিঁলে গেছে দেখেছো?”

প্রণয় রাগী দৃষ্টিতে তরীর দিকে তাকিয়ে বললো,

“তোমার দোষ! তুমিই বারবার আমাকে নিজের গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করো।”

প্রণয়ের কথা শুনে তরী হা করে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। হঠাৎই সৌহার্দ্য আর প্রণয়ী ছুটে এলো প্রণয়ের কাছে। প্রণয়ের কাছে বসে সৌহার্দ্য ওর হাঁটুর ক্ষত পরখ করতে করতে বললো,

“তোমাকে বলেছিলাম না, রাস্তায় না বের হতে? গাড়িতে থেকে নামতে নিষেধ করেছিলাম। বারবার অবাধ্য হও কেন তুমি আমার? এখন দে…….”

তরীর দিকে চোখ পড়ার সাথে সাথে সৌহার্দ্যের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তরী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সৌহার্দ্য আর প্রণয়-প্রণয়ীর দিকে। এই বাচ্চা দু’টোর সাথে সৌহার্দ্যের কি সম্পর্ক?

-চলবে…..

[আজকেই শেষ পর্ব দিতে চেয়েও পারলাম না। কাল দেওয়ার চেষ্টা করবো।]#প্রণয়াসক্ত_পূর্ণিমা
#Writer_Mahfuza_Akter
#অন্তিম_পর্ব

“এই বাচ্চা দু’টো তোমার কে হয়?”

তরীর হতবিহ্বল দৃষ্টি আর এমন অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে সৌহার্দ্যের ভ্রুযুগল আপনাআপনি কুঁচকে গেল। কিছুক্ষণ একভাবেই তাকিয়ে রইলো সৌহার্দ্য। তরীর প্রশ্নটা হয়তো ওর হজম হচ্ছে না! ভ্রূকুটি করে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বললো,

“মাথায় কোনো প্রব্লেম হলে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাও। আর যদি এটা যদি তোমার নতুন কোনো নাটক বা অভিনয় হয়, তাহলে আমার পথ ছাড়ো। প্রণয়ের পায়ে বেশ আঘাত লেগেছে।”

তরী নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে। সৌহার্দ্য সেটা একবার দেখেও এড়িয়ে গেল। প্রণয়কে কোলে নিয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। প্রণয়ী তরীর কাছে এসে দাঁড়ালো। তরী রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসেছিল। প্রণয়ী ওর কাছে গিয়ে ওর মুখে নিজের ছোট ছোট হাত দু’টো ছুঁইয়ে দিলো। নিষ্পাপ হাসি মুখে ঝুলিয়ে বললো,

“তুমি অনেক সুন্দর, আন্টি!”

তরীর চোখ দুটো চকচক করছে। কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি তার মধ্যে কাজ করছে! নিজের প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে দ্বিধান্বিত হয়ে গেল সে।

প্রণয়ীকে নিজের সাথে হাঁটতে না দেখে থেমে গেল সৌহার্দ্য। পেছন ঘুরে তাকিয়ে দেখলো, প্রণয়ী তরীর সাথে কী যেন বলছে! সৌহার্দ্য গলা ঝেড়ে প্রণয়ীকে ডাক দিলো,

“প্রিন্সেস! এসো তাড়াতাড়ি। আমাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে।”

প্রণয়ী সৌহার্দ্যের দিকে একবার তাকিয়ে তরীর থেকে দূরে সরে আসতে আসতে বললো,

“আসছি, পাপা।”

প্রণয়ী ছুটে চলে গেল সৌহার্দ্যের পিছে পিছে। তরী বিস্ফোরিত চোখে তাকালো ওদের দিকে। সৌহার্দ্যকে ‘পাপা’ বলে ডাকলো? সে ঠিক শুনলো তো? পাপা বলে কেন ডাকলো? তরী সপ্রতিভ চোখে তাকাতেই দেখলো, সৌহার্দ্যের গাড়ি ইতোমধ্যে দৃষ্টিসীমা পেরিয়ে গেছে।

তরী যান্ত্রিক ভঙ্গিতে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। কোনো রকমে পা টেনে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। মস্তিষ্ক ক্রমেই সচল হতে থাকলো ওর।

প্রথমত, অর্থী প্রথম দিন প্রণয়-প্রণয়ীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় বলেছিল, ওরা অর্থীর ভাইয়ের বন্ধুর ছেলেমেয়ে। ভাইয়ের বন্ধু মানে প্রহরের বন্ধু! আর প্রহরের বন্ধু মানে তো সৌহার্দ্য-ই!

দ্বিতীয়ত, হসপিটালে প্রণয়ীর সাথে কাল হসপিটালে দেখা হওয়ার পর ও বলেছিল, ওর পাপাও সেই হসপিটালের ডক্টর। এই বিষয়গুলো ওর মস্তিষ্কে আগে কেন নাড়া দেয়নি? ভেবেই তরীর নিজের প্রতি ক্রোধ জমা হলো মনে। হতভম্ব দৃষ্টি ক্রমশ কুঞ্চিত হতে লাগলো। ঠোঁট ভেঙে এলো। ভয়ানক কান্নারা হানা দেওয়ায় তৎপর হতেই তরী একহাতে নিজের মুখের নিম্নভাগ চেপে ধরলো। তার সন্তান দু’টো আজও বেঁচে আছে। শুধুমাত্র একটা ভুল তথ্য তার জীবনের মোড় এভাবে ঘুরিয়ে দিলো! চোখের কোণ বেয়ে মোটা মোটা অশ্রু বিন্দু গড়িয়ে পড়তে লাগলো তরীর।

সৌহার্দ্য বেশ থমথমে মুখে প্রণয়ের পায়ে ব্যান্ডেজ করছে। প্রণয়-প্রণয়ী দুজনেই চুপচাপ বসে আছে। তবে ওদের দুজনের চোখে মুখে থাকা ভীতি সৌহার্দ্যের চোখে অনেক আগেই ধরা পড়েছে। তাই সে এখনো কিছু বলছে না।

হঠাৎ সৌহার্দ্যের চেম্বারে প্রহর প্রবেশ করলো। কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নিয়েও সেটা বলতে পারলো না। বরং অবাক হয়ে প্রণয়ের পায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

“এ কি? ওর হাঁটুতে কী হয়েছে?”

“ছিঁলে গেছে আবার! সারাদিন ছুটোছুটি করলে তো ব্যথা লাগবেই!” সৌহার্দ্যের ক্লান্ত ও হতাশ কন্ঠ।

প্রহর প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে কাতর কন্ঠে বললো,

“ইশ! অনেক ব্যথা হচ্ছে, তাই না?”

প্রণয় তড়িৎ গতিতে না বোধক মাথা নাড়িয়েও আবার মুখ ছোট করে হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ালো। সৌহার্দ্য সেটা দেখা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

“যাইহোক! তুই কিছু বলবি? এই সময়ে আমার সাথে দেখা করতে এলি যে!”

“আসলে আমি কয়েকদিনের জন্য শহরের বাইরে যাচ্ছি। তাই জানাতে এলাম!”

সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকালো। প্রহরের দিকে তাকিয়ে বললো,

“তো ফোনে জানিয়ে দিলেও তো পারতি!”

“ফোন দিয়েছিলাম। কিন্তু তুই রিসিভ করছিলি না। এছাড়া কেন যেন ইচ্ছে করছিল তোর সাথে একবার দেখা করে যেতে। তাই নিজের মনকে আর আটকালাম না। চলে এলাম।”

সৌহার্দ্য মলিন হাসলো। বললো, “কবে ফিরছিস তাহলে?”

“দু-এক সপ্তাহ পর।” বলেই প্রণয়-প্রণয়ীকে চুমু দিলো প্রহর।

সৌহার্দ্যকে জড়িয়ে ধরতেই সৌহার্দ্য হাসি হাসি মুখে বললো,

“বিদেশে যাওয়ার আগেও তো এতো ভালোবাসা দেখাতি না কখনো! আজ হঠাৎ এমন জড়াজড়ি করছিস যে?”

প্রহর ম্লান মুখে হেসে বললো,

“জানি না, ইয়ার! হঠাৎ খুব করে ইচ্ছে হলো। আসি।”

সৌহার্দ্য প্রহরকে বিদায় জানিয়ে প্রণয়-প্রণয়ীকে বাড়িতে দিয়ে আসার জন্য বেরিয়ে গেল।

৫৬.

তরী সৌহার্দ্যের বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামালো। নিজের কম্পিত হাতে স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরে থম মেরে বসে রইলো কিছুক্ষণ। এতোবছর নিজেকে মাত্রাতিরিক্ত সাহসী মনে হলেও আজ তরী বুঝতে পারছে, সে একটা জায়গায় অনেক দূর্বল। আর সেই দূর্বলতার নাম সৌহার্দ্য। প্রণয়-প্রণয়ীর আগমনে দূর্বলতার ভিত যেন আরো বেশি মজবুত হয়ে গেছে।

গাড়িটা পার্ক করে গেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো তরী। সৌহার্দ্যের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে কম্পিত হাতে কলিং বেল বাজালো। বুকের ভেতর কেমন ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে ওর। এই অদ্ভুত হৃদকম্পন কি অন্যরাও শুনে ফেলবে? সবাই কি বুঝে ফেলবে যে, তরী ভয় পাচ্ছে? সেই অতিমাত্রায় সাহসী তরী আজ ভীতসন্তস্ত্র! ব্যাপারটা হজম করতে পারবে তো সবাই?

ভাবনার মাঝেই দরজা খোলার আওয়াজে কেঁপে উঠল তরী। বুকের ভেতর লাফিয়ে উঠলো যেন! চকিত দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে দেখলো সেই বৃদ্ধা রমনীকে, যে একসময় চাঁদ বলতে অজ্ঞান ছিল। সে হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে। হয়তো চোখের জ্যোতি অনেক কমে গেছে বার্ধক্যের ভারে।

“কে? কেডা তুমি?”

হাতের লাঠি তরীর দিকে তাক করে প্রশ্ন করলো সৌহার্দ্যের দাদী। তরী অবাক চোখে তাকালো। চোখ দুটো টলমল করে উঠলো মুহুর্তেই! কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,

“আমায় তুমি চিনতে পারছো না, দাদী?”

অকস্মাৎ বিস্ফোরিত চোখে তাকালো দাদী। হতবিহ্বল হয়ে গেল ক্ষণিকের জন্য। কয়েক পা এগিয়ে তরীর বাহুতে হাত রেখে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। নিজের হাত দিয়ে তরীর মুখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে বললো,

“চাঁদ? তুই আমাদের তরী? নাকি আমি কানে ভুল শুনলাম?”

তরী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তার মানে দাদী এখন চোখে ঠিক মতো দেখতে পায় না? আর সৌহার্দ্যও এবাড়ির কাউকে ওর ব্যাপারে জানায়নি? এতো অভিমান! হয়তো অভিমান করাটাই স্বাভাবিক। দীর্ঘশ্বাস ফেললো চোখের পানি মুছলো তরী। নাক টেনে বললো,

“হ্যাঁ, দাদী! আমি এসেছি। তোমাদের তরী। আমাকে দেখতে পাচ্ছো না তুমি?”

দাদী নির্বাক হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বাড়ির সবাইকে ডাকা শুরু করে দিলেন,

“বউমা, রায়হান, সৌহার্দ্য রে! কে কোথায় আছিস? দেখ কে এসেছে? কই তোরা সবাই? দেইখা যা!”

“কে এসেছে, মা? এভাবে ডাকছেন….. ”

সুজাতা রান্নাঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে তরীর দিকে নজর পড়তেই তার কথা আটকে গেল। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তরীর মুখের দিকে। সৌহার্দ্যের বাবার হাত ঘড়ি পরতে পরতে এগিয়ে এসে বললেন,

“আমি একটু চেকআপের জন্য সৌহার্দ্যের হসপিটালে যাচ্ছি। বুঝলে, সুজাতা?”

সুজাতা কোনো উত্তর না দিয়ে একদৃষ্টিতে তরীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মিস্টার রায়হান বিরক্ত হয়ে বললেন,

“কিছু বলছি তোমাকে! ঐ দিকে তাকিয়ে আছো কেন এভাবে? কী আছে ঐ দি….”

মেইনডোরের দিকে তাকিয়ে মিস্টার রায়হানও বিস্মিত হলেন। হতভম্ব কন্ঠে বললেন,

“তরী?”

এতো বছর পর নিজের কাছের মানুষগুলোকে দেখে আবেগান্বিত হলো তরী। এক পা এগিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে কানে ভেসে এলো কারো গাম্ভীর্যপূর্ণ বাক্যস্রোত,

“কেন এখানে এসেছো তুমি?”

পেছন ঘুরে তাকালো তরী। সৌহার্দ্য এসেছে, সাথে প্রণয়-প্রণয়ী। দু’জনকে দুইহাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য। চোখে মুখে অদ্ভুত গম্ভীরতা, যা তরীর অচেনা, আবার অনেকটা চেনাও!

তরী টলমলে চোখে তাকিয়ে বললো,

“আমার বাচ্চারা!”

প্রণয়-প্রণয়ী অবুঝের মতো তাকিয়ে আছে। সৌহার্দ্য তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

“এতো বছরে মনে পড়লো? দেরীটা একটু বেশি-ই হয়ে গেল না?”

“তুমি আমায় ভুল বুঝছো, সৌহার্দ্য!”

তরীর বিমর্ষ দৃষ্টি মেলে তাকালো। সেই চোখে চোখ পড়তেই সৌহার্দ্য নিজের ভেতরে সেই চিরপরিচিত আলোড়ন অনুভব করলো। কেমন অদ্ভুত অনুভূতি! এই এক অনুভূতির সামনে রাজ্যের সব রাগ, দুঃখ, অভিমান যেন নিজেদের পরাজয় স্বীকার করে নেয়! একটা শ্বাস টেনে সৌহার্দ্য নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করলো। কোনোরকমে নিজের দৃঢ়তা বজায় রেখে বললো,

“যখন আমার জীবনে তোমার প্রয়োজন ছিল, তখন তুমি ছিলে না। তবুও আমার বিশ্বাস ছিল, একদিন তুমি আসবে। সেই দিনটা সম্ভবত আজ! কিন্তু একটা তিক্ততাপূর্ণ সত্য কি জানো? আজ তোমাকে ছাড়া বাঁচতে শিখে গেছি আমি।”

তরী বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। অস্ফুটস্বরে বললো,

“আমাকে ছাড়া?”

“হ্যাঁ, তোমাকে ছাড়া। দূরত্ব যেমন ভালোবাসা বাড়ায়, ঠিক তেমনি মানুষকে ভেতর থেকে পাথর বানিয়ে তোলে। একসময় ভাবতাম তোমাকে ছাড়া হয়তো বাঁচতেই পারবো না‌! হয়তো এমনটাই হতো যদি তুমি আমায় শূন্য করে দিয়ে চলে যেতে। কিন্তু না! তুমি আমাকে বেঁচে থাকার কারণ দিয়েছিলে। প্রণয়-প্রণয়ীকে রেখে গিয়েছিলে। ওদের জন্যই এতোবছর বেঁচে আছি আমি। আর বাকি জীবন ওদের জন্যই কাটিয়ে দিতে পারবো।”

সৌহার্দ্য প্রণয়-প্রণয়ীর দুই হাত ধরে তরীকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তরী কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলো না। কীভাবে আটকাবে সে ওদের? হঠাৎ পেছন থেকে সৌহার্দ্যের গলা শুনতে পেল তরী,

“কিন্তু আমার জীবনে তোমার প্রয়োজন না থাকলেও প্রণয়-প্রণয়ীর জীবনে ওদের মায়ের প্রয়োজন আছে। আমি চাই না, ওরা সারাজীবন মায়ের অভাব অনুভব করুক। কারণ আমি পৃথিবীর সেরা বাবা হলেও প্রণয়-প্রণয়ীর মায়ের অভাব পূরণ করতে পারবো না।”

সৌহার্দ্য প্রণয়-প্রণয়ীর হাত ছেড়ে দিলো। অগত্যা দৃপ্ত পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। একবারের জন্যও পেছন ঘুরে তাকালো না। প্রণয়-প্রণয়ী সৌহার্দ্যের যাওয়ার দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ঘুরিয়ে তরীর মুখের দিকে তাকালো।

তরী হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সৌহার্দ্যের যাওয়ার দিকে। হয়তো সে ভাবতেই পারেনি, সৌহার্দ্য এমন কোনো কথা বলবে! সৌহার্দ্যের কথাটা হজম হচ্ছে না ওর।

“তার মানে তুমিই আমার মা?”

হঠাৎ নিজের হাতে টান অনুভব করায় চোখ নামিয়ে সামনে তাকালো তরী। প্রণয়ী ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পাশেই প্রণয় এসে দাঁড়ালো। ওর চোখ দুটো পানিতে ছলছল করছে। প্রণয় কাঁদো কাঁদো চোখে তাকিয়ে বললো,

“তোমার কথায় কেমন যেন মায়ের শাসনের সুর ভেসে আসতো কানে! এজন্য তোমায় আমার একটুও ভালো লাগতো না। আমার মায়ের জায়গায় কেউ বসতে চাইলে সহ্য-ই হতো না আমার! তুমি কি সত্যি সত্যিই আমাদের মা? পাপা কি সত্যি বলে গেল আমাদের?”

তরী কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলো না। সব আবেগ গলায় এসে আটকে গেল। বুক ভার হয়ে এলো। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া নোনাপানির স্রোতে কোনো বাঁধা না দিয়েয় হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো তরী। মাথা নাড়িয়ে কোনোরকমে ‘হ্যাঁ’ বলে দু’হাতে নিজের বুকে আগলে নিলো প্রণয়-প্রণয়ী। ওদের সারা মুখে অগণিত চুমু এঁকে দিলো। জীবনে প্রথমবারের মতো মায়ের আদর পেয়ে চোখ-মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো প্রণয়-প্রণয়ীর। দূর থেকে আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখে মুখে হাসি ফুটলো সৌহার্দ্যেরও!

৫৭.
অর্থী হসপিটাল থেকে ফিরছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে প্রায়। গাড়ির জানালা ভেদ করে বাইরে চোখ পড়তেই অবাক হলো সে। পাশের পার্কে ঘাসের ওপর একা একা বসে আছে অর্ণব। দূর থেকে হলেও অর্ণবকে চিনতে অসুবিধা হলো না অর্থীর। হুট করে গাড়ি থামিয়ে চলে গেল অর্ণবের সাথে কথা বলতে।

“একা একা কী করছিস এখানে? কাউকে মিস করছিস?”

অর্থী এসে হুট করে অর্ণবের পাশে এসে বসলো। অর্ণব ভ্রু কুঁচকে অর্থীর দিকে তাকালো। বললো,

“তুই?”

“কেন? অন্য কাউকে এক্সপেক্ট করছিলি মনে হচ্ছে?” অর্থী ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো।

“মন-মেজাজ ভালো নেই। তোর খোঁচা মারা শেষ হলে যেতে পারিস!” অর্ণবের চোখে মুখে বিরক্তি। অর্থী কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। হঠাৎ হতাশার শ্বাস ফেলে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।

অর্থীকে পা ঘুরিয়ে চলে যেতে দেখে অর্ণব অবাক হলো। মেয়েটা ওর কথা শোনা শুরু করলো কবে থেকে? বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বললো,

“চলে যাচ্ছিস?”

“তুমিই তো চলে যেতে বললে!”

“আমি বললেই চলে যাবি?”

অর্থী থামলো। মুখ ঘুরিয়ে অর্ণবের দিকে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,

“তোমার প্রশ্ন বুঝিনি আমি।”

“বুঝতে হবে না। পাশে এসে বোস!”

অর্থী দ্বিধাদ্বন্দ নিয়ে পুনরায় পাশে গিয়ে বসলো। অর্ণব খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,

“তরীর সাথে কথা হয়েছে তোর?”

“হয়েছে। ভালো আছে ও। সৌহার্দ্য যদিও এখনও রেগে আছে। সব ঠিক হয়ে যাবে শীঘ্রই!”

“সৌহার্দ্য রেগে আছে কেন? তরীর তো কোনো দোষ নেই! ”

“সৌহার্দ্য ভাইয়া ভাবছে তরী সব জেনেও নিজের ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে ছিল। কিন্তু তরী জানতো, ওর বাচ্চারা মারা গেছে। আমরাও তো জানাইনি তরীকে কিছু। একটা মিসআন্ডার্স্ট্যান্ডিং হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু।”

“ও সুখে থাকলেই চলবে।”

অর্ণবের কথায় ওর দিকে ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকালো অর্থী। তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,

“তরীর জীবনে সুখের একমাত্র নাম হলো সৌহার্দ্য। ওকে ওর সুখ থেকে এতোবছর দূরে সরিয়ে রেখে এখন আবার তরীর সুখের আশা করছিস?”

অর্ণব গুরুতর ভঙ্গিতে বললো,

“সৌহার্দ্যের সঙ্গ ওর জীবনে শুধু দুঃখ-ই এনেছে। এজন্যই ওকে দূরে সরিয়েছিলাম আমরা।”

অর্থী মলিন হাসলো। ক্ষণিকের নীরবতা শেষে প্রশ্ন করলো,

“শুধু দুঃখ থেকে দূরে সরানোই উদ্দেশ্য ছিল। তরীকে পাওয়ার ইচ্ছে ছিল না তোর?”

“সেই অন্যায় ইচ্ছেকে তো সেদিনই মেরে ফেলেছিলাম, যেদিন তরীর চোখে সৌহার্দ্যের জন্য প্রেম দেখেছিলাম।” অর্ণবের মুখে দুর্বোধ্য হাসি। “ভালোবাসলেই পাওয়ার ইচ্ছে রাখতে নেই। ভালোবাসা মানে স্বার্থহীনতা, প্রিয়জনের সুখের জন্য ত্যাগ বরণ করা।”

“তুমি তো ত্যাগ করোনি!”

“করেছিলাম। আমি সবসময় চেয়েছি সৌহার্দ্যের সাথে তরী সুখে থাকুক। কিন্তু আমি এটাও প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তরীর একফোঁটা চলো জলের কারণ সৌহার্দ্য হলে সৌহার্দ্য তরীকে হারাবে। এটা সৌহার্দ্যও জানতো। এর ফলও ভোগ করেছে ও।”

অর্থী দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ছেলেটাকে আজীবন একটা নিকৃষ্ট মানুষের নজরে দেখেছে ও। কিন্তু ভাবেইনি যে, এই মানুষটা এতোটা স্বার্থহীন! ভাবনার মাঝে অর্ণবের হতাশ কন্ঠ শুনতে পেল অর্থী,

“তরী কোনোদিনও আমার হতো না। এক তরফা ভালোবেসেছি ওকে আমি। এই সত্যটা অনেক আগেই মেনে নিয়েছিলাম।”

“তাহলে বাকি জীবন কি একাই কাটাতে?”

“একা কেন কাটাবো? সারাজীবন ব্যর্থ-প্রেমিকের মতো কাটায় কেউ? বিয়ে তো করতামই!”

“কাকে?” অর্থী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো।

“তোকে!” অর্ণবের ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি। অর্থী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো।

অর্ণব চিন্তিত মুখে বললো,

“মেডিক্যাল স্টুডেন্ট থাকাকালীন সময় থেকে আমায় ভালোবাসিস! সেই ভালোবাসার কারণে পড়াশোনা শেষ করার পরও দেশে ফিরিসনি। এতো বছর আমার জন্য কুমারী থেকে গেলি? এখন কি আমায় রিজেক্ট করবি? করলেও সমস্যা নেই! তুলে নিয়ে বিয়ে করবো। কিন্তু বিয়ে তো আমি তোকেই করছি! প্রেমটা না-হয় তোর সাথে বিয়ের পড়েই হবে!”

৫৮.
কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে অরুণী চট্টগ্রামে চলে এসেছে। এখানকার গ্রামীণ এলাকার একটা ক্লিনিকে রোজ বসে সে। ডক্টর নামক ব্যক্তি এখানে দূর্লভ-ই বলা চলে! সকল হাতুড়ে চিকিৎসকদের ভীড়ে নিজের অবস্থান বেশ শক্ত করে ফেলেছে সে ইতোমধ্যে। তবুও নিজেকে নিকৃষ্ট মনে হয় নিজের চোখে। জীবনে কম অপকর্ম তো সে করেনি! নিজের স্বার্থের কথা ভেবে একাধিক খু*ন করেছে সে। ভাবনার মাঝেই কেউ এসে বললো,

“ম্যাম, পাশেই একজনের বাসায় গিয়ে একটা পেশেন্ট দেখে আসতে হবে!”

“এ আর নতুন কী? চলো!”

অরুণী বেরিয়ে গেল ক্লিনিক থেকে। এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে আজ। কাল রাতে ঝড় হয়েছিল। এরপর থেকে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে আছে। অরুণী যখন গন্তব্যে পৌঁছালো, তখন চারপাশে অন্ধকার। ফোনের আলো জ্বালিয়ে কোনোরকমে বাড়িতে প্রবেশ করলো সে। একতলা আলিশান বাড়ি। চার-পাঁচজন সার্ভেন্ট আছে, তবে সবাই-ই মেয়ে। ব্যাপারটায় কিছুটা অবাক হলো অরুণী। ভেতরে প্রবেশ করতেই অন্ধকারে কারো গম্ভীর কন্ঠ ভেসে এলো,

“ডক্টর এসেছে?”

গলাটা পরিচিত লাগলো অরুণীর। কিন্তু হঠাৎ শোনায় ধরতে পারলো না কার গলা। পাশের মহিলাটা বললো,

“জ্বি, স্যার। ভেতরে নিয়ে যাবো?”

“মেয়ে নাকি ছেলে?”

“মেয়ে!”

লোক হাত তুলে ইশারায় অনুমতি দিলো। অরুণী ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো। সার্ভেন্ট মোমের আলো নিয়ে এলো। একটা মেয়ে মুখ গলা পর্যন্ত ঘোমটা টেনে বসে আছে। অরুণী গিয়ে মেয়েটার পাশে বসে বললো,

“অনেক কনজার্ভেটিভ পরিবার মনে হচ্ছে। আমার সামনে এভাবে বসতে হবে না। দেখি, তাকাও আমার দিকে!”

মেয়েটা একচোখ উন্মুক্ত করে অরুণীর দিকে তাকালো। কিন্তু তার ঝাপসা দৃষ্টি দিয়ে অরুণীর মুখ স্পষ্ট দেখতে পেল না। বললো,

“তোমার কন্ঠটা এতো পরিচিত লাগছে কেন? কে তুমি?”

অরুণী ভ্রু কুঁচকে বললো, “পরিচিত তো আমারও লাগছে! তুমি কে বলো তো!”

“ও যে-ই হোক! তোর জানতে হবে না। চলে যা আমার বাড়ি থেকে।”

অরুণী অবাক হয়ে পেছন ঘুরে তাকালো। প্রহরকে দেখে বিস্মিত চোখে একবার প্রহরের দিকে, আরেকবার বিছানায় বসা মেয়েটার দিকে তাকালো।

“তার মানে এটা মধু? ও মারা যায়নি! তুই ওকে লুকিয়ে রেখেছিস?”

“তুই এটা জেনেছিস! আর কেউ যেন এসব জানে!”

অরুণী অতিমাত্রায় অবাক হয়ে বললো,

“মানে? তুই কীভাবে করেছিস এসব? মধু কীভাবে তোর কাছে এলো? এসব কীভাবে সম্ভব?”

প্রহর অরুণীকে টেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে এনে চাপা কন্ঠে বললো,

“সব রহস্যের গভীরে ঢুকতে নেই। তোরও এতো প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে না।”

অরুণী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

“তাহলে কি তুই ওকে সারাজীবন লুকিয়ে রাখবি?”

“যেদিন ও পৃথিবীর বুকে স্বনির্ভর হয়ে দাঁড়াতে পারবে, সেদিনই ওর পরিচয় প্রকাশ করবো আমি।”

অরুণী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো প্রহরের দিকে। এতো বড় একটা সত্য এতো বছর সবার চোখ থেকে কীভাবে আড়াল করে রেখেছে প্রহর?

★পরিশিষ্ট★

একবছর পর……..

নিজের চেম্বারে বসে কয়েকটা কেইসের ফাইল ঘাঁটছে মধু। চোখে মোটা চশমা আর মুখের একপাশ ওড়নায় ঢাকা। হঠাৎ তরী ভেতরে এসে প্রবেশ করলো। বিনা অনুমতিতেই চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো,

“উকিল সাহেবা, আপনার ব্যস্ততা কাটলে আমার কথা একটু শুনবেন?”

মধু ভ্রু কুঁচকে বললো,

“তুই নিজেই তো ব্যস্ত মানুষ! তোর সময় আছে আমার কথা শোনার?”

তরী আফসোসের সুরে বললো,

“আমি তো এতো বছরেও নিজের নাম বিখ্যাত করতে পারলাম না। আর তুই? বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সমাজের সবার মুখে সুপরিচিত একটা ব্যক্তি হয়ে গেলি! অসহায়, নির্যাতিত মেয়েদের একটা বিশ্বস্ত অবলম্বন আপনি।”

মধু ভ্রু কুঁচকে বললো,

“আচ্ছা? এখানে এসব কথা বলতে এসেছিস?”

“নাহ্, প্রহর ভাইয়ার সাথে এসেছি। ভাইয়া গাড়িতে বসে বসে বলছিলো, কত জোর খাঁটিয়ে এতো বছর তোকে পড়াশোনা করিয়েছে!”

মধু আনমনে হেসে বললো,

“আমার মনের জোর তো ও-ই ছিল! যত দূরে ঠেলেছি, সে তত কাছে এসেছি। যতবার ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছি, ততবার আমায় জুড়ে দিয়েছে। এক চোখের অন্ধত্বে সেই চোখের দৃষ্টি হয়েছে প্রহর। যাইহোক, তুই কেন এসেছিস? সেটা বল!

তরী হতাশ গলায় বললো, “ভুলে গেলি? আজ প্রণয়-প্রণয়ীর জন্মদিন।”

“আরেহ্, আমি তো ভুলেই গেছি! কিন্তু আমি এখন…..”

“সরি, ম্যাম! ডিস্টার্ব করার জন্য। আসলে একজন নতুন এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে। সেটার ফাইল জমা দিতে এলাম!”

মধু পিএ-এর দিকে তাকিয়ে বললো, “রেখে যাও!”

পিএ ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল। তরী উৎসুক হয়ে ফাইলটা হাতে নিয়ে বললো,

“আমি একটু দেখি, হ্যা? আমার এসব কেইস নিয়ে জানার ইচ্ছে অনেক!”

মধু হেসে বললো, “আচ্ছা, পড়!”

তরী ফাইলটা হাতে নিলো৷ একটা ষোড়শী মেয়ের কেইস। মেয়েটার চোখের সামনে তার মায়ের মৃত্যু হয়েছে আর সেই মৃত্যুর কারণ হলো মেয়েটার বাবা। মেয়েটা নিজের বাবার বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে আইনের আশ্রয় নিয়েছে। সাক্ষ্য থাকলেও যথেষ্ট প্রমাণ নেই এখানে। মেয়েটার মধ্যে নিজের সত্তাকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারলো তরী। তরী মনেপ্রাণে চায়, মেয়েটা সৌহার্দ্যের চাঁদের মতো হোক, তবে প্রণয়াসক্ত_পূর্ণিমার ‘তরী’ না হোক। কে জানে? তার এই ইচ্ছে পূরণ হবে কি না! হয়তো এজন্যই লোকে বলে, “ইতিহাস বারবার ফিরে আসে!”

🖤সমাপ্ত🖤

[আসসালামু আলাইকুম! গুছিয়ে ইতি টানার চেষ্টা করেছি। যদিও কতটুকু সফল হয়েছি, জানি না! মস্তিষ্ক সচলভাবে কাজ করছে না এখনও। একসপ্তাহ ধরে একটু একটু করে লিখেছি। নানা-ভাইয়ের মৃত্যু আমার জীবনের প্রথম শক, স্বাভাবিক হতে বেশ সময় লাগবে। পরবর্তী গল্প শুরু করার আগে জানিয়ে দিবো। নিয়মিত গল্প দেওয়া প্রস্তুতি নিয়েই আবার গল্প লেখা শুরু করবো। আর অবশ্যই সৌহার্দ্য-তরী, প্রহর-মধুকে নিয়েই আসবে পরবর্তী গল্প। সবার দোয়া কাম্য!
ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ভালোবাসা ও দোয়া রইলো, পাঠকমহল♥️।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here