#প্রাণের_চেয়েও_প্রিয়
#Part_41
#Writer_TanhaTonu
নুসাইফা ঠোঁট বাকিয়ে বলল…
—”আমার দশ বছরের বড় ভাই যখন আমার কাছে তার প্রেমঘটিত হেল্প নেয় সেটা নির্লজ্জতামি না।আমি বললেই দোষ..হুহ থাকো তুমি।বাই”
নুসাইফা ফোন কেটে দিলো।সিদ্রাত হাসল…
_______________________________________
পরের দিনই আরশি লাগেজ গুছিয়ে নুসাইফাকে নিয়ে বাসায় চলে যায়।বাসার গেইটের সামনে যেতেই অবাক হয়।পুরো বাড়ি আভিজাত্যপূর্ণ সাজে সজ্জিত।আরশি করুণচোখে নুসাইফার দিকে তাকিয়ে বলল…
—”বাড়ির এই সাজ-সজ্জাই বলে দিচ্ছে সবাই স্যারের বিয়ে নিয়ে কতটা খুশি।আমি মাঝখানে একটা কাঁটা…”
নুসাইফা ভ্রু কুচকে বলল…
—”এতো বেশি ভাবছিস কেন?চল ভিতরে যাই।আর বিয়েতে তো সবাই-ই বাসা সুন্দর করে সাজায়।আয় তো”
আরশি নুসাইফার সাথে বাসার ভিতরে যায়।সিদ্রাতদের দরজার দিকে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেদের রুমে যায়।দরজা খুলা থাকায় তেমন কষ্ট হয়নি ভিতরে ঢুকতে।আরশি কিচেনে উঁকি দিয়ে দেখে ওর আম্মু কাজের লোকদেরকে রান্নার সব বুঝিয়ে দিচ্ছে।আরশি দৌড়ে গিয়ে ওর আম্মুকে জড়িয়ে ধরে।তিনটা বছর পর নিজের মেয়েকে এতো কাছে পেয়ে আরশির আম্মুও আবেগ-আপ্লুত হয়ে যায়।কেঁদে বলে…
—”মায়ের কথা এতোদিনে মনে পড়েছে তোর তাইনা?কিভাবে পারলি এতো নিষ্ঠুর হতে?বাবা-মা,ভাইকে ফেলে এটুকু বয়সে তিনটা বছর কিভাবে দূরে থাকতে পারলি?পাষাণ মেয়ে কোথাকার!”
আরশিও হু হু করে কাঁদতে থাকে।মা-মেয়ের আবেগে জল ঢেলে নুসাইফা বলে…
—”আন্টি আমিও আছি কিন্তু।শুধু মেয়েকেই আদর করবেন?”
আরশির আম্মু মুচকি হেসে নুসাইফাকে কাছে ডাকে।তারপর নুসাইফার চিবুক টেনে চুমু খেয়ে বলে…
—”তোমাকে তো আমি বেশি আদর করব মা।আমার মেয়েটার খেয়াল রেখেছো পুরো দুটো বছর”
নুসাইফা মুচকি হাসে।তারপর আরশির আব্বু আর ভাই আসলে ওদেরকেও জড়িয়ে ধরে অনেক্ষণ কাঁদে আরশি।আদর-যত্ন শেষ হলে নুসাইফা সিদ্রাতদের রুমে যায় আর আরশি নিজের রুমে গিয়ে দরজাটা লাগিয়ে ফেলে।রুমটার দিকে তাকিয়ে আরশির মনের ভিতর তীব্র এক কষ্ট হচ্ছে।কতগুলো দিন নিজের হাতে সাজানো রুমটা থেকে,নিজের বাবা-মা থেকে দূরে ছিলো!আরশি ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো।তারপর হাত-মুখ মুছে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।নজর পড়ল সামনের বারান্দায় দাঁড়ানো ফোনে কারও সাথে কথায় মত্ত থাকা তার ভালোবাসার মানুষটার দিকে।গম্ভীর মুখে গম্ভীর চাহনী..কথাগুলো শুনা না গেলেও বুঝা যাচ্ছে তার কন্ঠটাও হয়ত এখন গম্ভীর।আরশি অপলক তাকিয়ে রইল মানুষটার দিকে।এ যেনো চোখের তৃষ্ণা মেটানোর প্রয়াস।হঠাৎ সিদ্রাতও আরশির দিকে তাকালো।আরশি সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিচের দিকে তাকালো।কেন যেনো চোখ দুটো অশ্রুতে ভরে আসছে মেয়েটার।সিদ্রাত ফোনটা রেখে গ্রিলের কাছে এগিয়ে এসে মৃদু কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল…
—”ভালো আছো?শরীর কেমন এখন?”
সিদ্রাতের কথায় আরশি খুব রাগ হলো।ও রাগ আর কষ্ট মিশ্রিত কন্ঠে সিদ্রাতের দিকে তাকিয়ে বলল…
—”আমার ভালো থাকায় আপনার কি আসে-যায়?কখনো আমার কথা ভাবলে এভাবে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারতেন? পারতেন না..আপনারা পুরুষ জাতটাই খারাপ…মায়া-মমতা,ভালোবাসা কিছু নেই এই জাতের ভিতরে।শুনে রাখুন লাস্ট বার তো আপনি সুইসাইড করতে গিয়েছিলেন কিন্তু কসম যদি আপনি ওই ইতি চুন্নিকে বিয়ে করেন আমি গলায় ফাঁস দিবো”
আরশি কথাগুলো শেষ করেই শব্দ করে কান্না করে দিলো।আর সিদ্রাত ভ্যাবেচেকা খেয়ে গেলো আরশির এমন থ্রেটে।বিড়বিড় করে বলল…
—”এমন ধানী লঙ্কা কবে হলো এই পিচ্চি মেয়ে?এবার তো মনে হচ্ছে একে বিয়ে করার পর আমাকেই ফাঁসিতে ঝুলতে হবে”
সিদ্রাতের কোনো জবাব না পেয়ে আরশি সিদ্রাতের দিকে একপলক তাকিয়ে দৌড়ে চলে গেলো….
সারাদিনে আর রুম থেকে বের হয়নি আরশি।শুধু এটাই ভাবতে থাকল কিভাবে এই বিয়ে ভাঙা যায়।রাতে নুসাইফা আরশির কাছে চলে এলো।আরশিকে মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে ঠোঁট চেপে হাসল।তারপর ইচ্ছে করে উষ্কানি দিয়ে বলল…
—”কিরে তুই কি বিয়ে ভাঙতে এসেছিস নাকি তোর জানের বিয়ের দাওয়াত খেতে এসেছিস?অবশ্য তোর দেবদাস রূপ দেখে আমি সিউর তুই দাওয়াত খেতেই এসেছিস”
আরশি চোখ গরম নুসাইফার দিকে তাকিয়ে ধপ করে পাতলা কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে পড়ল।নুসাইফাও হেসে আরশির কোমর জড়িয়ে ধরে পাশে শুয়ে পড়ল।আরশি রাগী কন্ঠে বলল….
—”আমাকে ধরবি না তুই কুত্তি”
—”আরে এতো রাগছিস কেন?আমি তো জাস্ট ফান করলাম।বাই দা ওয়ে এখন বল কি ভাবলি?কি করবি?আগামীকালই তো বিয়ে”
আরশি নুসাইফার দিকে কতক্ষণ ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।তারপর কিছু একটা ভেবে ওর মুখটা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠে।নুসাইফা ভ্রু কুচকে তাকায়।আরশি বলে….
—”এবার দেখ এই আরশি কি করে?”
আরশি এটা বলেই কাকে যেনো ফোন করে।নুসাইফা হা করে আরশির কাজ দেখে যাচ্ছে।ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই ওপাশের মানুষটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরশি গড়গড় করে বলতে লাগল…
—”ওই ইতি-পিতি..শাকচুন্নি,বান্দরনী,কুত্তার লেজ,হনুমানের বউ,জিরাফের বাচ্চা..শেওড়া গাছের পেত্নী..তোর অনেক শখ না আমার সিদ্রু বেবিকে বিয়ে করার!আগামীকাল তোকে শুধু বিয়ের আসরে দেখি!তোর চুলগুলো কেটে তাক বানাবো,তোকে খুন করে আমি জেলে যাবো চুন্নি কোনখানের..কত বড় সাহস পেত্নী তোর তুই আমার সিদ্রু বেবিকে বিয়ে করতে চাস?আর ভাবিস না আমি এসব এমনিই বলছি।তোক মারতে না পারলেও সুইসাইড করে তোর হবু জামাইরে জেলের ঘানি টানাবো আর তোকে দিয়ে জেলের টয়লেট পরিষ্কার করাবো।আর আমার কথাকে ভুলেও হেয়ালা পেয়ালা ভাবিস না।আমার এক মামা এস আই,আরেক মামা আইনমন্ত্রী,আরেক খালু সাব ইন্সপেক্টর..তোকে দিয়ে জেলের টয়লেট ক্লিন করানো কোনো ব্যাপারই না হুহ..”
আরশি ফোনটা কেটে দিয়ে নুসাইফার দিকে তাকালো।নুসাইফার চোখ দুটো গোলালু আর মুখটা মিষ্টি আলুর মতো গোল হয়ে আছে।আরশি চোখ টিপ মেরে বলল…
—”এতে তোরই এই অবস্থা?তাহলে তো আমি সিউর ওই ইতি চুন্নি ভুলেও বিয়ে করতে আসবে না”
নুসাইফা মুখটা মিষ্টি আলু আর চোখ দুটো গোলালুর মতো রেখেই জিজ্ঞাসা করল…
—”এগুলো কোন গ্রহের বকা ছিলো আরশি?আর তার থেকেও বড় কথা তোর নানু আরেকটা মামা কবে জন্ম দিলো আর সে সাব ইন্সপেক্টরই হলো কিভাবে?আর তোর খালা পয়দা হলো কোথা থেকে? আর খালুই বা আসল কোথা থেকে?তাছাড়া তোর না শুধু একটা মামা..সেটাও তো পুলিশের কিছু না..গ্রামে থাকে”
আরশি ফিক করে হেসে বলল…
—”আরে আবুল এই খালু,মামা তো আমি মাত্র বানালাম ওই ইতিকে ভয় দেখানোর জন্য।এরা কি বাস্তবে আছে নাকি?”
নুসাইফার এবার জ্ঞান হারানোর উপক্রম। ওর মনের মধ্যে বাজছে “আমি জ্ঞান হারাবো,মরেই যাবো..পারবে না বাঁচাতে কেউ”
নুসাইফা আরশিকে কিছু বলতে যাবে তখনি আরশির ফোন বেজে উঠল।আরশি ফোনের দিকে তাকিয়ে নুসাইফাকে বলল…
—”ইতি চুন্নি ফোন দিয়েছে নুসু।মনে হয় ভয় পেয়েছে তাই মাফ চাইবে”
কথাটা বলেই আরশি ফিক করে হেসে দিলো।নুসাইফা আবারও বিড়বিড় করে বলল…
—”ফোনটা ধর শুধু তুই।তুই আজ শেষ আরশি।ইতির বর আজ তোকে ধুয়ে দিবে।বেচারা বউকে সেরকম ভালোবাসে”
আরশি ফোন রিসিভ করে কানে রাখতেই ওপাশের চিৎকারে আরশির কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম..
—”এই বেয়াদ্দপ মেয়ে এই..তোমার সাহস কি করে হয় আমার কলিজার টুকরো ইতুকে বকার,ওকে কাঁদানোর..এই পাঁচ বছরে আমি ওকে কখনো কাঁদাইনি আর তুমি কিনা আমার ইতুকে কাঁদিয়ে দিলে!তাড়াতাড়ি এড্রেস দাও তোমার..আজই তোমাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাবো।দেখব তোমার কোন আইনমন্ত্রী খালু আর কোন পুলিশ মামা তোমাকে বাঁচায়।তাড়াতাড়ি রেডি থাকো মেয়ে..একটু পরই তোমার বাসায় পুলিশ আসবে..তোমাকে মানহানীর মামলায় এরেস্ট করতে..ফাজিল মেয়ে কোথাকার!,,,,”
আরশি কথা আর সব বলতে দিলো না।এটুকু শুনেই ওর সব খাবার হজম হয়ে গিয়েছে।ভয়ে সাথে সাথে ফোনটা কেটে দিলো।পারলে এক্ষুনি কেঁদে দিবে মুখটার এমন অবস্থা।নুসাইফারও একটু খারাপ লাগল মেয়েটা শুধু শুধু এতোগুলো কথা শুনল ইতির বরের কাছ থেকে।আরশি নুসাইফাকে কিছু বলল না।অসহায় মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে অন্যপাশে ফিরে শুয়ে পড়ল।শুধু নিম্ন স্বরে এটুকু বলল….
—”আমাকে এভাবে বাইরের একটা লোক দিয়ে এসব না শুনালেও পারতি।ইতি ম্যাম মেরিড..মেরিড একটা মেয়ে যে তোর ভাইকে বিয়ে করবে না সেটা তোর ভাই কি জানে না?”
আরশি এটুকু বলে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে রইল।নুসাইফার এবার খারাপ লাগছে আরশির জন্য।একটু পর পর আরশির লম্বা লম্বা নিশ্বাস শুনা যাচ্ছে যা প্রমাণ করে দিচ্ছে মেয়েটা কাঁদছে..রাতটা ওভাবেই পাড় হয়ে গেলো…
আরশি ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে নিলো।তারপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।মৃদু প্রাণ জুড়ানো বাতাস বইছে..এটাই বুঝি জান্নাতী বাতাস!কিছুক্ষণ বারান্দায় কাটিয়ে আরশি রুমে এসে আবারও ঘুমিয়ে পড়ল…বেলা নয়টায় কারও ডাকে আরশির ঘুম ভাঙল।চোখ খুলে বিছানায় তাকিয়ে দেখে নুসাইফা নেই।সামনে তাকাতেই অবাক হয়ে গেলো।বনী আর ফারহা।আরশি ঝাপটে ধরল ওদের দুজনকে।বনি আর ফারহাও আরশিকে জড়িয়ে ধরল।আরশি বলল….
—”কেমন আছিস তোরা?অনেক মিস করি তোদেরকে”
ফারহা মুখ ফুলিয়ে বলল…
—”এজন্যই তো ছেড়ে চলে গিয়েছিলি”
বনিও অভিমান করে তাকালো আরশির দিকে।আরশি বলল….
—”রাগ করিস কেন বনু?তোদের সাথে তো প্রতিদিনই চ্যাট করতাম,ফোনে কথা বলতাম।ইভেন ভিডিও কলেও কথা বলেছি কত!তোরা তো জানিস আমি কোন পরিস্থির মাঝ দিয়ে এমন স্টেপ নিয়েছি”
ফারহা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।বনি বলল…
—”হয়েছে হয়েছে..এসব আবেগ এখন বাদ।এখন বিয়ের কনেকে আগে খাইয়ে পার্লারে নিয়ে যাই।নাহলে আর বিয়েই হবে না”
আরশি অসহায় মুখ করে বলল…
—”বিয়ের কনেকে তোরা চিনিস?আমার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিবি?আমি মরে যাবো উনার অন্য কারও সাথে বিয়ে হলে।ইতি ম্যামের সাথে বিয়ে ভেবে আমি গতকাল ইতি ম্যামকে অনেক উল্টা-পাল্টা কথা বলেছি।কিন্তু পরে জানতে পেরেছি ইতি ম্যাম মেরিড।হয়ত অন্য কোনো ইতি উনার হবু বউ”
বনি ফিক করে হেসে দিয়ে বলল…
—”আরে বোকা তুই-ই বিয়ের কনে।তোর সাথেই স্যারের বিয়ে।ওসব ইতি-পিতি হচ্ছে ভাউতা তোকে ফিরিয়ে আনার জন্য”
আরশির চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেলো।ও চিল্লিয়ে বলে উঠল….
—”কিইহহ? তোরা সিউর?উনার বিয়ে আমার সাথে?তোরা আমায় আগে বললি না কেন?আমি এই দুটো দিন কত কষ্ট পেয়েছি জানিস?”
ফারহা বলল…
—”কুল আরশি..আমরাও আগে জানতাম না।একটু আগে আন্টি ফোন করে আসতে বলল।পরে বাসায় আসার পর নুসু আমাদেরকে সব বলল”
—”ওই নুসুকে তো আমি ছাড়ব না..হারামি..মীর জাফর”
বনি হেসে বলল…
—”ঢং ছাড়..একটু পর তো স্যারের বউ হয়ে যাবি।তারপর দেখা যাবে একমাস পরই হুট করে শুনব আমাদের ফিউচার ডক্টর আরশি প্রেগনেন্ট..সিদ্রাত স্যারের বাচ্চার মা হতে যাচ্ছে”
বনির কথা শুনে আরশি লজ্জায় কুকড়ে গেলো..গাল দুটো একদম গরম হয়ে গেলো লজ্জায়।মেয়েটা দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো।আরশির ব্লাশড হওয়া দেখা বনি আর ফারহা হেসে দিলো….
ব্রেকফাস্ট করে আরশি বনি আর ফারহার সাথে পার্লারে চলে গেলো।নুসাইফাকে জোর করেছিলো কিন্তু নুসাইফা যায়নি।তার একটাই কথা..প্রিয় ভাইয়ের বিয়ে তার..তাই ও বরপক্ষে।এজন্য কনেদের সাথে নো কানেকশন।
পার্লারের সাজ শেষ করে ফারহা আর বনি আরশিকে নিয়ে বাসায় আসতে আসতে চারটা বেজে যায়।অবশ্য পার্লারে সিরিয়াল ছিলো।তাছাড়া ওরা বাসা থেকে বেরই হয়েছে এগারোটায়…
আরশিকে বাসায় এনে ওর রুমে বসিয়ে দেয়া হলো।দোপাট্টাটা থুতনী অব্দি টানা তাই মুখ দেখা যাচ্ছে না।কাছের আত্মীয় সজনদের দাওয়াত করার পরও পুরো বাড়ি মানুষে গিজ গিজ করছে।তাছাড়া বরপক্ষ-কনেপক্ষ তো এক বাড়িই….
সিদ্রাত ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মেরুন কালার পাগরীটা পড়ছিলো।নুসাইফা রুমে এসে হেসে বলল….
—”ভাইয়া এট লাস্ট তুমি বাচ্চার বাবা হতে যাচ্ছো”
সিদ্রাত হেসে দিলো।হেসে বলল…
—”বড় ভাইদের কিঞ্চিত লজ্জা পা বোন”
সিদ্রাতের চাচাতো ভাই রিহান আর মুন রুমে আসল।নুসাইফাকে জ্বালানোর জন্য রিহান বলল….
—”ভাই একে বলে আর কি লাভ?ও তোমাকে বাচ্চার কথা বলে সিগন্যাল দিচ্ছে।ওর বিয়েটাও যেনো তাড়াতাড়ি দিয়ে বাচ্চা পয়দা করার ব্যবস্থা করে দাও”
নুসাইফা দাঁত কটমট করে রিহানের দিকে তাকিয়ে বলল…
—”স্টপ ইউর মাউথ রিহান ব্রো।তুমি যে কোন সাধু তাও আমি জানি।সিদ্রাত ভাইয়াকে বলব তুমি যে ডুবে ডুবে তার ছাত্রী ফারহার সাথে জল খাচ্ছো?”
রিহান মাথায় হাত দিলো।মুন কিটকিটিয়ে হেসে বলল…
—”আর কি বলবি নুসু?বলেই তো দিলি”
নুসাইফা দাঁত কেলালো।রিহান আমতা আমতা করে সিদ্রাতের দিকে তাকালো।সিদ্রাত কিছু বলতে যাবে তখনি মৌরি এসে বলল…
—”সিদ্রাত ভাইয়া তুমি কিন্তু আমাদের রিহান ব্রোকে এ নিয়ে শাসন করতে পারবে না।কারণ তুমিও একি অপরাধের আসামী”
সিদ্রাত হালকা হেসে বলল…
—”শাসন করলাম না।কিন্তু মেয়েটার পড়াশুনার যেনো কোনো ক্ষতি না হয়।আর তোরা এভাবে আজ আড্ডা দিলে আমার আর বিয়ে করা লাগবে না।চিরকুমারই থাকব”
সবাই হেসে দিলো।তারপর বরযাত্রী কনের বাসায় গেলো যদিও এক ফ্লাট থেকে অন্য ফ্লাট মাত্র..বরযাত্রী হয়ে গিয়েছে সিদ্রাতের সব কাজিন অর্থাৎ পরী,প্রিয়া,রাহা.. ওদের হাজবেন্ড,মৌরি,মুন,নুসাইফা,মেসবাহ,রিহান,
রাজ,রিয়াদ,সিদ্রাতের বাবা,দুই চাচ্চু,মামা আর খালু..সবাইকে খুবই ভালোভাবে আপ্যায়ন করল আরশির পরিবার।অবশেষে কাজী আসলে বিয়ে পড়ানো শুরু হলো।সিদ্রাত তো ধীরে-সুস্থে ভালোভাবেই কবুল বলল।কিন্তু বিপত্তি বাঁধল আরশির ক্ষেত্রে।মেয়েটা কান্না করে সাগর বানিয়ে ফেলছে।সবাই এতো বুঝাচ্ছে তবুও কাজ করছে না।আরশির আম্মুরও কান্না পাচ্ছে খুব।তাই আরশির আন্টিরা ওর আম্মুকে আরশির কাছে যেতে দিচ্ছে না।আরশির নিতু আন্টি আরশিকে শান্ত করতে করতে বলল…
—”এই পাগলী এভাবে বোকার মতো কাঁদছো কেন হুম?তুমি তো সৌভাগ্যবতী। একই বাসায় বাবার বাড়ি,শ্বশুর বাড়ি..ইভেন একই ফ্লোরে..কষ্ট কিসের তোমার?ঝটপট কবুল বলে ফেলো তো।সিদ্রাত তো অপেক্ষা করছে তোমার কবুল বলার জন্য..আর কেঁদো না বাবা”
আরশি কাঁদতে কাঁদতে বলল…
—”আমার তাও কষ্ট হচ্ছে আন্টি..অনেক কষ্ট হচ্ছে।আমি যে আজকের পর বাবার বাড়ির মেহমান হয়ে যাবো”
সনিয়া আন্টি আরশির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল…
—”বোকা মেয়ে কে বলেছে তুমি বাবার বাড়ির মেহমান হয়ে যাবে?তুমি তো তোমার বাবা-মায়ের রাজকন্যা।এতো ভাবনা বাদ দিয়ে কবুল বলো তো আম্মুটা”
আরশি কাঁদতে কাঁদতে কবুল বলল।অবশেষে সম্পন্ন হলো আরশি-সিদ্রাতের বিয়ে।শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়…
#প্রাণের_চেয়েও_প্রিয়
#Part_42
#Writer_TanhaTonu
আরশি কাঁদতে কাঁদতে বলল…
—”আমার তাও কষ্ট হচ্ছে আন্টি..অনেক কষ্ট হচ্ছে।আমি যে আজকের পর বাবার বাড়ির মেহমান হয়ে যাবো”
সনিয়া আন্টি আরশির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল…
—”বোকা মেয়ে কে বলেছে তুমি বাবার বাড়ির মেহমান হয়ে যাবে?তুমি তো তোমার বাবা-মায়ের রাজকন্যা।এতো ভাবনা বাদ দিয়ে কবুল বলো তো আম্মুটা”
আরশি কাঁদতে কাঁদতে কবুল বলল।অবশেষে সম্পন্ন হলো আরশি-সিদ্রাতের বিয়ে।শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়…
_____________________________
সব আয়োজন-রীতিনীতি শেষ করে আরশিকে সিদ্রাতদের বাসায় নিয়ে আসা হলো সন্ধ্যা সাতটায়।সিদ্রাতের আম্মু,দুই চাচী,আর খালামনি মিলে ওদের দুজনকে বরণ করে নিলো।লিভিং রুমে সোফায় আরশি আর সিদ্রাতকে পাশাপাশি বসানো হলো।এতোক্ষণ কান্না করলেও এখন আরশির বেশ লজ্জা লাগছে।আরশি নিচের দিকে তাকিয়ে আছে যদিও মুখ অর্ধেক ঢাকা।আজ থেকে এই চেনা পরিচিত বাড়ির বউ ও.. এসব ভাবতেই যেনো লজ্জা শতগুণ বেড়ে যাচ্ছে।সবার যে কি হৈ চৈ বউ এসেছে তাই..বউ চেনা জানা অথচ তারপরও কি আনন্দ সবার!সিদ্রাতের বড় চাচী বললেন…
—”আয়িশা এবার বউমার মাথার ঘুমটা তুলে দাও।বউটার চাঁদমুখটা তো আমরা দেখি”
সিদ্রাত মুচকি হাসল।এদিকে আরশি লজ্জায় শেষ।নিচের দিকে তাকিয়েই লজ্জায় মরে যাচ্ছে মেয়েটা।সিদ্রাতের খালামনি এসে আরশির ঘুমটাটা উঁচু করে উঠিয়ে দিলেন।সিদ্রাতের দুই চাচী একসাথে বলে উঠলেন…
—”মাশাল্লাহ..একদম পরী এনেছো তুমি আয়িশা..তোমার জীবন ধন্য”
সিদ্রাত চমকে আরশির দিকে তাকাতেই নিজেও হা হয়ে গেলো।বিয়ের পুরোটা সময় মুখ ঢাকা ছিলো বলে দেখতে পারেনি।এখন তো আরশির মুখ দেখে সিদ্রাতের হুশ উড়ে গিয়েছে।গাঢ় লাল কাতান বেনারসির উপর গোল্ডেন কাজ করা…শরীর ভর্তি গোল্ডের উপর রেড স্টোনের অর্নামেন্টস।চোখগুলোও অপরূপ লাগছে মেয়েটার।সিদ্রাতের মনে হচ্ছে ও চোখের সামনে মোহনীয় নজর কাড়া কোনো রূপসীকে দেখছে যে ওর মন-প্রাণ শুধু রূপ দিয়েই জুড়িয়ে দিয়েছে।রাহা সিদ্রাতের কাঁধে চাপর মেরে বলল…
—”বড়দেরকে লজ্জা কর ভাই।একটু পরই তো বাসর।তখন ইচ্ছে মতো দেখিস।এখন চোখটা নামা”
রাহার কথায় সিদ্রাত বিব্রতবোধ করল আর চোখ নামিয়ে ফেলল হালকা লজ্জা পেয়ে।এদিকে আরশির কানে রাহার কথা আসতেই মেয়েটার গাল দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করল…
এভাবে কাজিনদের হাসি-থাট্ট,বিয়ের কিছু রিচুয়ালস আর ডিনার সাড়তে সাড়তে রাত এগারোটা বাজল।নয়টার দিকেই সিদ্রাত ছাদে চলে গিয়েছিলো।বন্ধুদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ অাড্ডা দিয়েছে।তারপর ডিনারের সময় এসে ডিনার করে আবারও কোথাও একটা চলে গিয়েছিলো।আরও কিছুক্ষণ সিদ্রাতের সব কাজিনরা আরশির সাথে দুষ্টুমি করে পৌনে বারোটায় আরশিকে সিদ্রাতের বেডে বসিয়ে দিলো।রুমে আসতেই আরশির হার্ট-বিট বেড়ে গিয়েছে।আজ থেকে এ রুমটা তারও,এ রুমটার মালিকও আজ থেকে তার..ভাবতেই আরশির হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে।আরশিকে বেডে বসিয়ে দিয়ে সবাই চলে যেতে লাগল।যাওয়ার আগে সিদ্রাতের খালাতো ভাই রিয়াদের ওয়াইফ নূর হেসে বলল…
—”আরশি বেস্ট অফ লাক।সারা রাত ক্রিকেট খেলো দুজন..দোয়া করে দিলাম যেনো খুব শীঘ্রই একটা ক্রিকেট টিম আসে বাসায়”
আরশি লজ্জায় একদম কুকড়ে গেলো।সব দেবর-ভাসুর আর ননদদের সামনে নূরের এই কথাটা আরশি হজম করতে পারল না।সাথে সাথে একটা কাশি দিলো।সবাই হেসে উঠল।মৌরিও দুষ্টুমি করে বলল…
—”যাক মাত্র একটা কাশি দিয়েছো..আমি তো ভাবলাম বিষম খেলে কিনা”
মৌরির কথার বিরুদ্ধে রিহান বলল…
—”এই তোরা সবগুলো এবার আমার সাথে চল।জানিস না ভাবী মায়ের সমান..ছিহ কি শিক্ষা..মায়ের সাথে মশকরা করছে গাধাগুলো..তোদেরকে আবারও কিন্ডার্গার্টেনে প্লে-তে ভর্তি করাতে হবে।চল চল সবাই”
রিহানের কথা শুনে আরশি ঘোমটার আড়ালেই মুচকি হাসল আর মনে মনে রিহানকে ধন্যবাদ জানালো এমন বিব্রতকর অবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য।সবাই চলে গেলো।আরশি ঘোমটা হালকা তুলে রুমটায় একবার চোখ বুলালো..ফুলের ঘ্রাণে পাগল হওয়ার মতো অবস্থা..চেরি পার্ফাইট রোজ,হ্যানসা রোজ,মেইডেন’স ব্লাশ রোজ,সুগার বেবি,হানি মিল্ক রোজসহ বাহারি রকমের গোলাপ,গাজরা,অর্কিড,বেলি আর রজনী গন্ধ্যার সমন্বয়ে ইউনিকভাবে পুরো রুমটা আর বেডটা সাজানো হয়েছে।আরশি সবকিছু দেখে লাজুক হেসে আবারও ঘোমটার আড়ালে নিজেকে আবৃত করে নিলো।কিছুক্ষণ পর সিদ্রাত রুমে প্রবেশ করল।রুমটা ভেতর থেকে লক করে আরশির কাছে এগিয়ে গেলো।আরশি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে সালাম দিলো….
—”আসসালামু আলাইকুম”
সিদ্রাত মুচকি হেসে সালামের জবাব নিয়ে আরশির পাশে বসে ওর ঘোমটাটা উঁচু করল।প্রথমেই সিদ্রাতের চোখে পড়ল আরশির রক্তলাল গাল দুটো।সিদ্রাত আরশির এমন লজ্জা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসল।আলতো স্পর্শে সময় নিয়ে আরশির কপালে চুমু খেলো।আরশি চোখ বন্ধ করে নিজের শাড়িটাই খামচে ধরল।সিদ্রাত হালকা সরে এসে বসল যদিও দুজনের মাঝে এক ইঞ্চির মতো ফাঁকা মাত্র।মুচকি হেসে বলল….
—”এট লাস্ট তুমি মিসেস সিদ্রাত আজওয়াদ হয়েই গেলে।হোয়াটেভার…আজ মিসেস সিদ্রাত আজওয়াদকে কিন্তু খুবই মোহনীয় লাগছে…একদম রূপমোহিনী..”
আরশি লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে ধরল।ও যেনো নিশ্বাস নিতেই ভুলে গিয়েছে।এতোটা লজ্জা কখনো লাগেনি।কিন্তু আজ যেনো সব লজ্জা,জড়তা,ভয়,দ্বিধা একসাথে ওর উপর আক্রমণ করছে।যতই হোক মানুষটা তো তার টিচার ছিলো..তারপর আবার বয়সেও কত বড়,,সব মেয়েদের ক্রাশ..সেই মানুষটাই আজ ওর হাজবেন্ড..আরশি যেনো লজ্জার সাগরে ডুব দিচ্ছে।আর ভয়ও লাগছে এটা ভেবে যে একটু পরই হয়ত এই মানুষটাই তার শরীরে নিজের শরীরের স্পর্শ এঁকে দিবে…
—”আরশি…”
সিদ্রাতের মৃদু কন্ঠের ডাকে আরশি কেঁপে উঠল।কাঁপা কাঁপা কন্ঠেই বলল…
—”জ্বি?”
—”যাও ফ্রেশ হয়ে আসো।নামাজ পড়তে হবে না?এশার নামাজও তো পড়া হয়নি..এখন তো রেগুলার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে”
আরশি হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে নিলেই সিদ্রাতের ডাকে থেমে যায়।সিদ্রাত বলে….
—”অর্নামেন্টসগুলো খুলে যাও।নাহলে ওয়াশরুমে গিয়ে খুলতে অসুবিধা হবে”
আরশি আস্তে করে বলল…
—”ওহ..”
তারপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে সব অর্নামেন্টস খুলে ফেলল।উঠে ওয়াশরুমের দরজা অব্দি গিয়ে আবারও কি যেনো ভেবে সিদ্রাতের কাছে ফিরে এলো আর আমতা আমতা করতে লাগল।সিদ্রাত বলল…
—”কিছু বলবে?প্লিজ বি ফ্রি..কোনো প্রবলেম হলে বলো আমায়”
—”না মানে..শাড়িটাও রুমে,,চেইঞ্জ করতে পারলে,,ভালো হতো,,অনেক ভারী তো,,আপনি একটু বারান্দায়,,,যাবেন?”
সিদ্রাত দুষ্টুমির স্বরে বলল…
—”আমি তো তোমার জন্য বৈধই..সো ইউ ক্যান চেইঞ্জ ইনফ্রন্ট অফ মি,,,ইভেন হেল্প লাগলে বলো আমিই না হয় চেইঞ্জ করিয়ে দেই,,,”
আরশি বেশ লজ্জা পেলো সিদ্রাতের কথায়।বিড়বিড় করে বলল…
—”লুচু ছেলে”
সিদ্রাতের আরশির বিড়বিড় করে বলা কথা শুনে হালকা হাসল।তারপর বারান্দায় চলে গেলো।আরশিও লাইট অফ করে শুধু ডিম লাইট জ্বালিয়ে শাড়টা চেইঞ্জ করে একটা সুতি কাতানের পার্পল কালার শাড়ি পড়ে নিলো।তারপর সিদ্রাতকে রুমে আসতে বলে ওয়াশরুমে গিয়ে ওযু করে নিলো।এর মধ্যে সিদ্রাতও শেরোয়ানী চেইঞ্জ করে পাতলা একটা প্রিন্টের শার্ট আর শর্টস পড়ে নিলো
আরশি বের হলে এক পলক আরশির দিলে তাকিয়ে রইল।আরশি লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে চলে গেলো।সিদ্রাত মুচকি হেসে ওযু করতে চলে গেলো।তারপর সিদ্রাতের ইমামতিতে দুজন একসাথে এশার নামাজ আর দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিলো।মোনাজাত শেষ করে সিদ্রাত বলল…
—”বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ো।আমি জায়নামাজ ভাজ করে আসি”
শুয়ার কথা শুনেই আরশির বুকটা কেঁপে উঠল।শরীরের লোমগুলোও যেনো দাঁড়িয়ে গেলো।শরীর জুড়ে শিহরণ বয়ে গেলো।তবে কি এটাই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ?আরশি গুটি গুটি পায়ে বেডে গিয়ে একপাশে শুলো।বুকের ভিতরটা হাজারো ভাবনায় টালমাটাল। সিদ্রাত জায়নামাজ গুছিয়ে ডিম লাইটগুলোও অফ করে দিলো।আরশির পেটটা যেনো মোচর দিয়ে উঠল।সিদ্রাত আরশির পাশে এসে শুয়ে আরশিকে নিজের কাছে টেনে এনে জড়িয়ে ধরল।আরশি আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল।সিদ্রাত আরশির কানের লতিতে ঠোঁট স্পর্শ করালো।আরশি সিদ্রাতের শার্টের কলার খামচে ধরল।সিদ্রাত নিশব্দে হাসল।তারপর ফিসফিস করে বলল…
—”এবার খুশি তো তুমি তোমার সিদ্রাত স্যারের সহধর্মিণী হতে পেরে?”
আরশি লজ্জায় সিদ্রাতের বুকে মুখ লুকালো।এমন প্রশ্নের জবাব কি দেয়া যায়?সিদ্রাত মৃদু হাসল।আরশির গরম নিশ্বাস সিদ্রাতের বুকে পড়ছে আর সিদ্রাতের নিশ্বাস আরশির ঘাড়ে পড়ছে।এতে যেনো আরশির নিশ্বাসের গতি আরও বেড়ে যাচ্ছে।সিদ্রাত ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল….
—”তুমি কি সবসময়ই ঘুমানোর সময় এমন জোরে জোড়ে নিশ্বাস ফেলো নাকি এর পেছনেও কারণ আছে?”
আরশির লজ্জায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।ও ভালো করেই বুঝতে পারল লোকটা তাকে ইচ্ছে করে হেনেস্তা করছে।কিন্তু বাসর রাতে এমন হেনেস্তার মানেটা কী?আরশি নাক ফুলিয়ে সরে আসতে চাইলে সিদ্রাত চেপে ধরে রাখল।তারপর বলল….
—”আজ থেকে আমাদের একসাথে পথ চলার শুরু।একসাথে জীবনটা কাটাতে হলে হাজবেন্ড-ওয়াইফ দুজনকেই অনেক কিছু আপোষ করতে হয়,স্যাক্রিফাইস করতে হয়,মেনে চলতে হয়।আমিও তোমায় আজ কিছু বলব..আশা করি তুমি মেনে চলবে”
আরশি সিদ্রাতের কথা শুনে ভয় পেলো।কি এমন বলবে আল্লাহ জানে।আরশি ধৈর্য ধারণ করল সিদ্রাতের বলার অপেক্ষায়।সিদ্রাত আবারও বলল…
—”প্রথমেই আমি যেটা বলব সেটা হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া..কোনো ক্রমেই নামাজ বাদ দেয়া যাবে না।অসুস্থ হলেও নামাজ পড়তেই হবে।সেক্ষেত্রে ছাড় আছে..কিন্তু বাদ দেয়ার নির্দেশ নেই।যে ঘরে সবাই নামাজ পড়ে সে ঘরে শয়তান প্রবেশ করতে পারে না..সংসার জীবনে হয়ত আমাদের মাঝে মান-অভিমান হবে..এটাই স্বাভাবিক..কিন্তু কখনো তুমি অন্য বিছানায় গিয়ে শুবে না।এতে শয়তান আমাদের বিছানায় আশ্রয় নিবে আর বিচ্ছেদ ঘটাবে আমাদের।আমি তো তোমার হাজবেন্ড..তোমাকে কখনো বকলেও শেষ পর্যন্ত কিন্তু আমিই ভালোবাসব।তোমার আম্মু বকলে কি তুমি রাগ করে কোথাও চলে যাও?যাও না..কারণ জানো একটু পরই মায়ের রাগ ভেঙে যাবে।আশা করি আমাকেও এভাবে বুঝবে।আর পর্দা করতে হবে মাস্ট..তোমার স্বামী ছাড়া অন্য কাউকে তোমার একটা চুল দেখানোরও জায়েজ নেই..আমি বলব না আজ থেকেই হাত মোজা-পা মোজা পড়ো..বরং বলব একটু একটু করে আল্লাহর সব নির্দেশগুলো রপ্ত করে নাও..নিজেকে পরিপূর্ণ মুমিনে পরিণত করো।বাসর রাতে আমার এই কথাগুলো তোমার কাছে অবাঞ্চিত মনে হতে পারে।কিন্তু আমি তোমাকে দুনিয়াতেও চাই আর আখিরাতেও..তাই তোমাকে সেভাবেই গড়ে তুলতে চাই যেভাবে গড়ে তুললে আমরা দুজন জান্নাতেও একসাথে থাকতে পারব…”
আরশি খুবই মনোযোগ দিয়ে এতক্ষণ সিদ্রাতের কথাগুলো শুনছিলো।প্রতিটি কথাই তাৎপর্যপূর্ণ। সিদ্রাত আবারও বলল…
—”তুমি কি রাগ করলে আমার এসব কথা শুনে?”
আরশি নিম্নস্বরে জবাব দিলো…
—”উহু..আপনার কথাগুলো সঠিক।তাছাড়া আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিই করেছেন তার ইবাদতের জন্য।কিন্তু দুনিয়ার মোহে আমরা সে কথা ভুলে যাই”
সিদ্রাত মুচকি হাসল।তারপর আবারও বলল…
—”আচ্ছা অনেক রাত হয়েছে।এবার আসো ঘুমিয়ে পড়ি”
আরশি সিদ্রাতের কথায় অবাক হয়ে গেলো।সে অবস্থাতেই বলল…
—”ঘুমিয়ে যাবো?আজ কি কিছু হবে না?”
এটুকু বলেই আরশি জিহবায় কামড় দিয়ে একহাত দিয়ে নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরল।সিদ্রাত হেসে উঠল।টেডি হেসে বলল…
—”বাহ একদম প্রিপেরাশন নিয়েই এসেছো দেখছি।তা কি কি হবে শুনি?”
আরশি লজ্জায় পারেনা সিদ্রাতের বুকের ভিতর ঢুকে যায়।সিদ্রাত মুচকি হেসে বলল…
—”ইটস ওকে আর লজ্জা পেতে হবে না।এন্ড তোমার মেডিকেলে পড়া শেষ হওয়ার আগে কিছুই হবে না।মন দিয়ে পড়াশুনা করো,ডক্টর হও..তারপর দেখা যাবে”
আরশির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেলো।মাত্র মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে..ডক্টর হতে হতে জীবনের অর্ধেক শেষ..তখন নাকি সব হবে।আরশি পারলে সিদ্রাতকে এখুনি চিবিয়ে খেতো।কিন্তু লজ্জার কারণে কিছুই পারল না।শুধু মুখটা ঘুরিয়ে অন্যপাশে ফিরে শুলো।অন্ধকারের আরশির মুখটা দেখতে না পারলেও সিদ্রাত ভালো করেই বুঝল মেয়েটা রাগ করেছে।সিদ্রাত মুচকি হাসল।তারপর আরশিকে পেছন থেকেই জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে একটা দোয়া পড়ল।আরশি চমকে উঠল
আর বলল…
—”এখন না কিছু হবে না?তাহলে আপনি এই দোয়া পড়লেন কেন?”
সিদ্রাত হেসে উঠল আরশির রিয়েকশন দেখে আর বলল….
—”তোমার রিয়েকশন দেখতে মন চাইলে।বাই দা ওয়ে অন্য দোয়া যিকর বেশি না পারলেও এটা দেখি ভালোই পারো”
আরশি এবার সবচেয়ে বেশি লজ্জা পেলো।লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার মতো অবস্থা।আরশি সিদ্রাতের দিকে ফিরে ওর বুকে মুখ লুকালো আর লাজুক কন্ঠে বলল…
—”প্লিজ আর লজ্জা দিয়েন না..আমি মরে যাবো..”
সিদ্রাত মুচকি হেসে আরশির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।আরশিও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সিদ্রাতের বুকের ধুকপুকানি অনুভব করতে লাগল,,সেই সাথে অনুভব করতে লাগল একটা রাতকে সুন্দর করতে সবসময় শরীরটাই জরুরী না।লজ্জা লাগলেও সিদ্রাতের খুনশুটিময় ভালোবাসাগুলোই আরশির কাছে এই রাতটাকে স্মরণীয় করে রাখবে..স্মৃতির পাতায় অমর থাকবে আজকের রাতটা তার..
চলবে…
চলবে…
অসুস্থ শরীর নিয়ে দুটো গল্প দেয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
আশা করি সবাই বুঝবে আমাকে। “এলোমেলো_অনুভূতিরা” আগামীকাল সকাল এগারোটার দিকে দেয়ার চেষ্টা করব ইনশা আল্লাহ