প্রেমোবর্ষণ পর্ব -০৮

#প্রেমোবর্ষণ

৮.
রোদ ঝলমলে দিনটা হুট করেই নীরদবরণ রূপ ধারণ করলো। রাতভর জলধারা অব্যহত ছিল তাই সকালের রোদটা বড় মিষ্টি মিষ্টি লাগছিল। কলেজ ক্যাম্পাসে ভেজা ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাটতে গিয়ে কলির পা কাঁদা মাটিতে মাখামাখি। এখন আবার আকাশে ছাইরঙা মেঘের আয়োজন দেখে মনে হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হলে সে এখানেই ভিজবে। ক্লাশ করার আজ একটুও মন নেই। মনে পড়ে আছে ওই আকাশ কোণে মেঘের ভাজে কাল্পনিক সেই ছবিটাতে। কলি অনেকটা সময় মাথা উঁচিয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। মেঘের ভেলায় আলগোছে আঁকা পরশ ভাইয়ের মুখটা। শৈল্পিক সে মুখাবয়ব প্রকৃতিরই যেন নিপুণ কারসাজি ওই শয়তান কিসিমের পাগলটাকে মনে করিয়ে দেবার, নাকি সে নিজেই যেচে কল্পনা করছে তাকে! ‘আজকে ক্লাশ যেহেতু করবেই না বৃষ্টিবিলাসটা আরামসে করা যেত অথচ দ্যাখো বৃষ্টি আসার নামই নেই’ স্বগোতক্তি করল কলি। আরেক পাগল আনিকা কত জোরজবরদস্তি করেও ভার্সিটিতে আনা গেল না তাকে। কি এক জরুরি কাজ আছে বলে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল কোথাও৷ আরও মিনিট বিশেক ক্যাম্পাসেই ঘুরেফিরে কলি পা বাড়ালো হলে ফেরার জন্য। বারংবার মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। আকাশ আগের চেয়েও কালো হয়ে দিনকে রাতেই যেন বদলে দিতে চাইছে। কলি এবার কাদামাখা পায়েই জুতোজোড়া গলিয়ে, ব্যাগ হাতে বের হলো ক্যাম্পাস থেকে আর তখনি বেজে উঠলো ফোনখানা তার। আনিকা কল করছে দেখে সাথে সাথেই রিসিভ করল। বাড়ির কিংবা পরশ ভাইয়ের কল দেখলেই কলি এড়িয়ে যাচ্ছে কাল থেকে কিন্তু আনিকার কলে সমস্যা নেই।

-হ্যালো

-কই তুই? উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলো আনিকা।

-ক্যাম্পাস থেকে বেরুচ্ছি।

-আচ্ছা গেইটের কাছে আয় জলদি আমি দাঁড়িয়ে আছি।

বান্ধবীর কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে ফেলল কলি। সে ন কোন জরুরি কাজে গেল তবে এখানে কেন? কলি আর কিছু না বলে কল কেটে আনিকার কাছে গেল।

-এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছিস তোর না কি কাজ ছিল?

-সে কাজেই যাব আবার। তোকে ছাড়া কাজ হচ্ছে না।

-কি এমন কাজ য আমি ছাড়া হয় না!

আনিকা আর জবাব দিলো না। তার ফোন বাজছে তাই তড়িঘড়ি রিকশা ডেকে একটা ঠিকানা বলল। রিকশাওয়ালা যাবে সোখানে তাই আর দেরি না করে আনিকা উঠে বসল। কলিও বসলো উঠে তবুও তার প্রশ্ন জারি রইলো গন্তব্যে পৌঁছানোর আজ পর্যন্ত।

-কোথায় যাব, কেন যাচ্ছি, না বললে যাব না, এই সেই আরও অনেক কথা বলল কলি আনিকা মুখ খুলল না।প্রায় বিশ মিনিট পর তারা এসে পৌঁছুলো একটা দোতলা বিল্ডিং এর সামনে। ছোটখাটো একটা মার্কেট তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আনিকা ভাড়া মিটিয়ে কলির হাত ধরে বলল, চল।

– তুই কিছু কিনবি? নিউমার্কেটে গেলেই তো হতো বিশ টাকা বাস ভাড়া আর কেনাকাটাও ভাল হতো।

কপাল কুঁচকে নিজের মত বলে চলছে কলি। আনিকা একবার গাঢ় দৃষ্টিতে তাকালো কলির দিকে। সে আজ যা করছে এর জন্য হয়ত কলি তার ওপর খুব রেগে যাবে। কিন্তু এই রাগটা নিশ্চয়ই বেশিদিন থাকবে না! পরশ ভাই ভালো ছেলে, আঙ্কেলও রাজী হয়ে গেছেন এরপর আর তার এইটুকু সাহায্যতে কলির রেগে থাকার মানে হয় না।

– কেনাকাটা করতে আসিনি কলি। আমরা কাজী অফিসে এসেছি।

আনিকার কথাটা শুনতেই কলির শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল এক শিহরণ বয়ে গেল। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল পরশ ভাই আছে এখানে৷ কলির রাগ হওয়া উচিত ছিল কিন্তু কেন হচ্ছে না সে বুঝতে পারছে না। আনিকা আবারও বলল, ‘ভুল বুঝিস না আমাকে পরশ ভাইয়ের অনুরোধ ফেলতে পারিনি আমি আর আঙ্কেল….’

-চল

গম্ভীর স্বরে কলি কথাটা বলেই সামনে আগালো। দোতলার ঠিক মাঝামাঝি কয়েকটা ইলেকট্রনিকস শপের পরই কাজী অফিসটা। কলি নিজের মত করে খুঁজে খুঁজে আগাতে থাকলে আনিকা মেসেজ করলো পরশের নম্বরে।

-‘আমরা এসে গেছি দোতলায় আছি।’

পরশ মেসেজ টোন পেয়ে দ্রুত চেক করলো। মেসেজটা পড়েই সে কাজী অফিস থেকে বেরিয়ে সামনে আগালো। খুব আগাতে হয়নি মাত্রই চার কদম ফেলতেই মুখোমুখি হলো কলির পেছনে আনিকা।

-কলি….

-বিয়ে করবে তাই না! আচ্ছা ঠিক আছে তাই হবে কিন্তু এভাবে কেন? আমি রাস্তার কোন মেয়ে নাকি জ্বালা উঠেছে আমার যা নেভানোর জন্য এখানে এভাবে এসে বিয়ে করতে হবে?

-কলি মুখ সামলে বল..

প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত শোনালো পরশের কণ্ঠ। কলি মোটেও ভয় পেলো না সে বলেই চলল, ‘বাপ-মা ফেলে বিয়ে করার কোন কারণ আছে আমার? দু চার বছরের প্রেম ছিল তোমার সাথে? তোমার সাথে বিয়ে না হলে মরে যাব আমি?নাকি আমাকে না পেলে তোমার চলবে না তোমার হৃৎপিণ্ড থমকে যাবে বেলুন ফাটার মত করে ফেটে দুনিয়া ত্যাগ করবে! এমন কিছু তো নয়। তবে এভাবে লুকিয়ে বিয়ের আয়োজন কেন? তুমি কি……

কলির কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সামনে এসে দাঁড়ালো তার বাবা। কলি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। কিছুই সে বুঝে উঠতে পারছে না।

– তুই পরশকে ভালোবাসিস?

বাবার প্রশ্ন শুনে শিউরে উঠলো কলি। পরশ নির্বাক দর্শক এ মুহূর্তে মনে মনে শুধু দোয়া করে চলছে যেন কলি মিথ্যে না বলে। ফুপাকে সে নিজেই এনেছে এখানে অনেকটা হাতে পড়ে আকুতি করে। শুধু পায়ে ধরাটা বাকি ছিল। কলির বাবাও তার কথা মেনে নিয়েছেন শুধু শর্ত ছিল তিনি নিজে কলিকে জিজ্ঞেস করবেন সে কি চায়! কলি এখনো স্থবির দাঁড়িয়ে আছে যেন বাবার ভয়ংকর প্রশ্নের জবাব সে জানেই না। কলির বাবা আবারও প্রশ্ন করলেন, তুই কি পরশকে বিয়ে করতে চাস?

পরশের এবার শ্বাসে টান পড়লো যেন৷ কলি কি তবে তাকে ভালোবাসেনি?

কলির বাবা এবার হুংকার ছাড়লেন, তুই কি এই ছেলেটাকে ভালোবাসিস, বিয়ে করতে চাস? হ্যা বা না তো জবাব দে কলি।

-রূবাইবা মেহউইশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here