বাসন্তী প্রেম পর্ব ১৫+১৬

#বাসন্তী_প্রেম 🌼🌼
#লেখনীতে: ইনায়াত আহসান ( ছদ্মনাম)
#পঞ্চদশ_পর্ব

সকালের প্রথম প্রহরে ঘুমের মধ্যে মুখশ্রী সহ পুরো শরীরে বরফ পানির স্পর্শ পেতেই ধড়ফড় করে উঠে পড়ে সিরাত। পুরো শরীর ঠান্ডায় কুপোকাত হয়ে গিয়েছে। কাঁপা কাঁপা শরীরে পাশের সোফা হাতড়ে হাতড়ে উঠে দাঁড়ায় সে। আর তার ঠিক সামনেই খালি গ্লাসের জগ হাতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সিরাতের দিকে তাকিয়ে আছেন সেলেনা চৌধুরী।
– ” কিরে নবাবজাদী‌ এতক্ষণ পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস। এতদিন আমার আর আমার ছেলের রাতের ঘুম হারাম করে এখন নিজে আরামে ঘুমোচ্ছিস!”
বলতে বলতেই পাশে জগটা রেখে হুট করে সিরাতের চুলের মুঠি ধরে ওঠে সেলেনা চৌধুরী। হঠাৎ এমন আক্রমণাত্মক আচরণে ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠে সিরাত।
– ” আহ্ চাচী লাগছে ছাড়ো আমাকে! আমি কি করেছি আমার সাথে এমন বিহেভ‌ করছো তুমি?”
– ” আবার মুখে মুখে তর্ক করছিস? তোর সাহস তো কম হয় নি সিরাত! দাঁড়া একবার শুধু রিয়ানের সাথে তোর বিয়েটা হোক আর এই সব সম্পত্তি রিয়ানের নামে ট্রান্সফার করা হোক, আমি নিজে তোকে এ বাড়ি থেকে বাইরে রাস্তায় ছুড়ে ফেলবো!
অপয়া কোথাকার! ”
বলেই সিরাতের বাম হাত পেছনের দিকে মুচড়ে ধরে সেলেনা চৌধুরী। এদিকে ব্যাথায় চোখের কোণ বেঁয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে সিরাতের।
– ” মা? তুমি এখানে কি করছো? ”
পেছন থেকে রিয়ানের কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে চকিতে সিরাতের হাত ছেড়ে দেয় সেলেনা চৌধুরী।
– ” কিছু না বাবা, শুধু এই নবাবজাদীর ডানা একটু ছেটে দিতে এসেছিলাম! দেখিস না কেমন উড়নচণ্ডী স্বভাবের হয়ে গিয়েছিল তাই একটু দেখিয়ে দিলাম ওর আসল জায়গা কোথায়!”
সিরাতের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলেন সেলেনা চৌধুরী। চোখে মুখে সিরাতের প্রতি বিরক্তি আর ক্ষোভের আভা স্পষ্ট।
– ” ঠিক আছে, তুমি এখন এসো আমার সাথে। তোমার সাথে আমার ইম্পর্ট্যান্ট কিছু কথা আছে!”
রিয়ানের কথা শুনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রিয়ানের পিছু পিছু বেরিয়ে পড়লেন সেলেনা চৌধুরী।
এদিকে সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর পরই সোফার উপর বসে পড়ল সিরাত। চুলে টান পড়ায় মাথা ব্যাথা হয়ে গিয়েছে অনেকাংশে। চোখ দিয়ে পানি মুক্তোর মত টপটপ করে চিবুক বেয়ে পড়ছে। ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে শরীর ও হিম হয়ে কাঁপুনি অনুভব হচ্ছে। তাই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতড়ে হাতড়ে আলমারির দিকটায় চলে যায় সে।

– ” মা তুমি খুব ভালো করেই জানো যে আমি সিরাতের ব্যাপারে একটু বেশিই পজেসিভ‌! তারপরও আমার বারণ করা সত্ত্বেও তুমি আবারো সিরাতের গায়ে হাত তুলেছো! ইউ নো মা আমি এই জিনিসটা একটুও পছন্দ করি না যে কেউ আমার পছন্দের জিনিসের ক্ষতি করুক!”
– ” তুই ঐ একটা অপয়া অন্ধ মেয়ের জন্য তোর নিজের মাকে কথা শুনাচ্ছিস‌ রিয়ান? কি এমন আছে ঐ মেয়ের মধ্যে যে তুই আমার সাথে তর্ক করছিস! ”
– ” আমি তর্ক করছি না আমি জাস্ট তোমাকে ওয়ার্ন‌ করছি মা! এরপর যদি আমার কথার খেলাপ হয় আমি কিন্তু তোমার আর আমার সম্পর্কটাও মাথায় রাখতে বাধ্য হব না।”
– ” তুই কিন্তু এবার নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস রিয়ান‌। আমি তোর মা! তুই তোর মাকে ওয়ার্ন দিচ্ছিস? এটা ভুলিস না তুই যদি আমার বিরুদ্ধে যেতে পারিস তাহলে তোর রহস্য ও কিন্তু ফাঁস করতে সময় লাগবে না আমার!”
– ” ভেবে বলছো তো? একটু মনে করার চেষ্টা করে দেখো তো, তুমি যেই রহস্যের কথা বলছো সেই রহস্যের অর্ধেক ভাগীদার কিন্তু তুমিও!”
রিয়ানের সোজাসাপ্টা কথায় কপালে দুশ্চিন্তার রেখা দেখা দিল সেলেনা চৌধুরীর।

——————
আহমেদ বাড়িতে,,
হাতে একটা জ্যাকেট ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বের হবে ফাইয়াজ তখনি পেছন থেকে কারো ডাক শুনে থেমে যায়।
– ” এক মিনিট মুগ্ধ! তুমি এই সময়ে কোথায় যাচ্ছো?”
– ” আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে! তাই একজনের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।”
– ” এখন তোমার কোথাও যাওয়া হবে না। তোমার এই কাজের চেয়ে আরো বেশি ইম্পর্ট্যান্ট কাজ তোমার সাথে আছে আমার।”
– ” কি বলতে চাইছো তুমি?”
– ” আমি তোমার আর রিয়ার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে চাচ্ছি মুগ্ধ! আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড!”
নির্বিকার ভঙ্গিমায় ফাইয়াজকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন জাফর সাহেব।
– ” বাবা আমি এই ব্যাপারে এখন কোনো কথা বলতে চাই না। আমার সাথে রিয়ার বিয়ের ব্যাপার ছাড়াও আরো ইম্পর্ট্যান্ট বিষয়েই আমাকে যেতে হবে। আর চিন্তা করো না আমি সময় আসলে নিজেই তোমাকে সবটা বলবো। শুধু এখন কোনো প্রকার প্রশ্ন করো না!”
বলেই গটগট করে বাইরের দিকে হাঁটা দিল ফাইয়াজ। এদিকে ফাইয়াজের যাওয়ার পানে জাফর সাহেব অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন যেন ফাইয়াজের এমন আচরণ তার কাছে একদম নতুন।
গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই ধ্রুব বলে উঠে,
– ” কি ব্যাপার এতক্ষণ কোথায় ছিলি? সেই কখন থেকে তোর জন্য ওয়েট করছি! ”
– ” তেমন কিছু না, একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম!”
– ” আচ্ছা ঠিক আছে। আর হ্যাঁ ভালো কথা তুই যেটার খোঁজ নিতে বলেছিলি সেটার খোঁজ নিয়েছি! আর সবচেয়ে বড় কথা হলো চৌধুরী বাড়ি এখান থেকে দুই ঘন্টার রাস্তা। তবে তুই যেটার প্ল্যান করেছিস সেটাতে কি আদৌ কাজ হবে?”
– ” কাজ তো হতেই হবে ধ্রুব! সিরাতকে ফিরিয়ে আনার জন্য তো রিস্ক নিতেই হবে। আচ্ছা চল যাওয়া যাক। বাকিটুকু রাস্তায় প্ল্যানিং করে নেয়া যাবে!”
– “ঠিক আছে।”
বলেই দুজনে গাড়িতে গিয়ে বসতে যাবে তখনই পেছন থেকে রিয়ার কন্ঠস্বর শুনে থমকে দাঁড়ায় ফাইয়াজ।
– ” মুগ্ধ প্লিজ ওয়েট!”
– ” রিয়া তুমি? তুমি এখানে কি করছো?”
– ” হোয়াট ইজ রং উইথ ইউ মুগ্ধ? আমি ইউকে থেকে ব্যাক করার পর থেকেই দেখছি তুমি আমার সাথে ঠিক মত করে কথাও বলছো না! হোয়াই আর ইউ ইগনোরিং মি ড্যাম ইট! আমি শুধুমাত্র তোমার জন্য এতদূর থেকে এসেছি তোমার সাথে টাইম স্পেন্ড করব বলে আর তুমিই আমাকে টাইম দিচ্ছো না।”
– ” লিসেন‌ রিয়া! আমি এখন এসব ম্যাটার নিয়ে একদমই তোমার সাথে তর্ক করতে চাচ্ছি না। আর হ্যাঁ একটা কথা তোমার কাছে তুমি আমাকে কি মনে করো আই ডোন্ট নো বাট আমার কাছে তুমি কি সেটা তুমিও ভালো করেই জানো। সো ডোন্ট ওয়েস্ট ইউর‌ টাইম, গট ইট?”
বলে কোনো প্রকার কথার উত্তর দেয়ার সুযোগ না দিয়ে গাড়িতে বসে পড়ে ফাইয়াজ। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে চাপ দিতেই গাড়ি চলা শুরু করে নিজ উদ্দেশ্যে। আর সে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রাগে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে রিয়া।

ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে আসে সিরাত। হাতের কব্জি এবং মাথা ব্যাথায় অবস্থা বেশ শোচনীয়। হাতে থাকা তোয়ালে টা পাশে রাখে সে হঠাৎ দরজা লাগানোর শব্দে চমকে উঠে সিরাত।
– ” ক,ক্,কে?”
– ” তোর উডবি‌ হাজবেন্ড!”
রিয়ানের কন্ঠে এমন ভয়ঙ্কর কথা শুনে আঁতকে উঠলো সিরাত‌। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
– ” এগুলো কি বলছেন? কিসের বিয়ে? আমি করবো না আপনাকে বিয়ে!”
– ” ভেবে বলছিস তো সিরাত পাখি? আমাকে বিয়ে করবি না? তোর বোন নিশাতের উপর কিন্তু আমার লোকেদের নজর এখনো আছে। আচ্ছা কেমন হবে যদি কলেজ ক্লাস শেষে হঠাৎ করে একদিন নিশাত আর বাড়ি ফিরল না। তখন কেমন হবে বল তো!”
রিয়ানের এমন উদ্ভট কথাবার্তা শুনে ভয়ে আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা সিরাতের।
– ” না না প্লিজ এমনটা করবেন না! আমি আপনার সব শর্তে রাজি। প্লিজ নিশাতের কোনো ক্ষতি করবেন না।”
– ” এইতো গুড গার্ল‌। এই নে এখানে একটা পেইনকিলার আছে। খেয়ে নে, হাতের ব্যাথা টা কমবে!”
বলেই একটা পেইনকিলারের প্যাকেট সিরাতের বাম হাতে ধরিয়ে দিয়ে রুমের বাইরের দিকে হাঁটা ধরে রিয়ান। আর সিরাত অনুভূতিশূন্য ভাবলেশহীন দেহ নিয়ে অসহায় ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকে।……….
#বাসন্তী_প্রেম 🌼🌼
#লেখনীতে: ইনায়াত আহসান ( ছদ্মনাম)
#ষোড়শ_পর্ব

বিশালাকার হলরুমে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে বসে হাতে থাকা ফাইলটার‌ দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রিয়ান। হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশন এর শব্দ কর্নগোচর হতেই পাশ ফিরে ফোনটা হাতে তুলে নেয় সে।
– ” ইয়েস মিস্টার বসু, আপনার কাছে যে ফাইলের কপি পাঠিয়েছিলাম সেটার কি হলো? আই হোপ ইউ ডিড দ্যাট ওয়েল‌।”

– ” সরি মিস্টার রিয়ান চৌধুরী। আপনি যেই ফাইলটা পাঠিয়েছেন সেটা আমি ভালো করে দেখেছি। কেসটা‌ অনেকটাই ক্রিটিক্যাল। আপনি যত দ্রুত সম্ভব চাচ্ছেন সেটা পসিবল‌ না! সো আ’ম সরি!”

– ” হোয়াট ডু ইউ মিন বাই সরি! ইউ নো আপনি এই ঢাকা শহরের বেস্ট লয়ার‌ বলে আমি আপনাকে হায়ার‌ করেছি। আর আপনি এই সামান্য কাজ টুকু করতে পারছেন না! ইজ নট ইট ফানি মিস্টার বসু?”

– ” আমি বুঝতে পারছি মিস্টার রিয়ান চৌধুরী বাট আই হ্যাভ নো অপশন ফর ইউ।
বেসিকলি মিস সিরাতের আপনার বিয়ে হলেও ব্যাপারটা কনসিডার‌ করা যেত। আমি আমার দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব!”
বলেই অপর পাশে থাকা লোকটি কল কেটে দিলো। এতে করে বেশ খানিকটা বিরক্ত হয় রিয়ান। বিরক্তি নিয়ে উঠতে যাবে তখনই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির কথা কানে আসে তার।
– ” চৌধুরী বাড়ির মালিক কি আছেন? ”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের মধ্যে একজন মধ্যবয়স্ক লোক উক্ত কথাটি জিজ্ঞেস করে উঠে।
হঠাৎ কারো অচেনা কন্ঠ শুনতে পেয়ে আড়চোখে দরজার দিকে তাকালো রিয়ান।
– ” কারা আপনারা? এখানে কি চাই?”
– ” আমরা এই চৌধুরী বাড়ির মালিককে খুঁজছিলাম, আমাদের স্যার তার কাছে আমাদের পাঠিয়েছেন।”
– ” কি দরকার আমাকে বলুন, আমিই এই চৌধুরী বাড়ির মালিক!”
রিয়ানের বলা কথা ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারলো না সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোক দুজন।
রিয়ানকে একবার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত স্ক্যান‌ করে বলে উঠলো,
– ” লিসেন মিস্টার, আমরা এখানে টাইম ওয়েস্ট করতে আসিনি! এ বাড়ির রিয়েল মালিককে ডাকুন, আমরা তার সাথে কথা বলতে চাই!”
– ” হোয়াট ডু ইউ মিন বাই টাইম ওয়েস্ট? এম‌ আই এ জোক টু ইউ? আমি একবার বলেছি যে এই চৌধুরী বাড়ির ওয়ান এন্ড অনলি ওনার হচ্ছে রিয়ান চৌধুরী, এন্ড দ্যাটস্‌ মি!”
– ” ওহ্ সরি সরি স্যার! আমরা আপনাকে চিনতে পারিনি! ইটস্ আওয়ার ফল্ট স্যার!”
– ” ইটস্ ওকে। বাট আপনারা কারা তা কিন্তু আমি এখনো চিনতে পারিনি। ”
– ” আমি আবরার ধ্রুব এন্ড ইনি আমার এসিস্ট্যান্ট জুবায়ের করিম। আমরা দুজন আপনার সাথে চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ড্রাস্ট্রির সাথে একটা ডিলের বিষয়ে আলাপ করতে এসেছি।”
– ” কিন্তু সেটা তো অফিসেও হতে পারত, অ্যাম আই রাইট মিস্টার ধ্রুব?”
রিয়ানের সোজাসাপ্টা প্রশ্নোত্তরে‌ হালকা নড়েচড়ে উঠে ধ্রুব। গলা হালকা ভিজিয়ে বলে উঠলো,
– ” ইয়েস মিস্টার রিয়ান চৌধুরী, বাট আমাদের কোম্পানির ওনার আপনার কোম্পানীর সাথে অফিশিয়ালি ভাবে আলোচনা না করে সরাসরি আপনার সাথে কথা বলতে বলেছে!”
– ” ওহ্ ওকে! প্লিজ কাম ইন!”
রিয়ানের অনুমতি পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ধ্রুব।

খাটের সাথে হেলান দিয়ে চুপচাপ বিষন্ন মনে বসে আছে সিরাত‌। চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরতে পরতে নিচের চিবুকের অংশে পানির দাগ বসে গিয়েছে। আজ প্রায় তিন দিন হতে চললো কারোর সাথেই তেমন কোনো যোগাযোগ নেই তার। চার দেয়ালে বন্দী একটা ঘরের মধ্যেই থেকে সারাদিন কাটিয়ে দিতে হচ্ছে। তার উপর রিয়ানের এমন অদ্ভুত আচরণ আর নিশাতের জীবনের আশংকা ক্রমশ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে সিরাতকে।
তার ভাবনার সুতো কাটে ব্যালকনি থেকে আসা শব্দ শুনে। রুমের সাথে থাকা এডজাস্ট ব্যালকনিতে কেউ যেন ধপ করে লাফ দিয়েছে মনে হতেই ভেতরে ভেতরে আঁতকে উঠে সিরাত। ধীর পায়ে বিছানা থেকে নেমে খানিকটা সামনের দিকে পা বাড়ায় সে।
– ” ক,ক্,কে এখানে? ”
সিরাতের কথায় কোনো প্রত্যুত্তর ফিরে আসলো না। মিনিট পাঁচেক পিনপতন নীরবতা থাকার কারণে কানে ভুল শুনেছে ভেবেই পুনরায় পেছনের দিকে পা বাড়ায় সে। কিন্তু পেছন ফিরে এগোতে নিলেই ঘটে আরেক বিপত্তি।
কোনো এক বিশালাকার পুরুষালি দেহের বক্ষ দেশে তার মাথা যেন ঠেকে গিয়েছে। সাথে কড়া পারফিউমের সুগন্ধ নাকে এসে জড়ো হতেই দু কদম পিছিয়ে যায় সিরাত।
– ” ক,ক্, কে আপনি? এখানে আমার রুমে কি চাই আপনার!”
কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে একপ্রকার ভয় পেয়ে যায় সিরাত। এখন এ অসময়ে তার রুমে কে আসবে ভেবেই মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়ে যাচ্ছে।

– ” কে এখানে? দেখুন ভালো হচ্ছে না কিন্তু! আমার রুম থেকে বের হয়ে যান। নাহলে কিন্তু আমি চিৎকার করে সবাইকে ডাকা শুরু করব।”
বলেই ঠোঁট দুটো প্রসারিত করতে নিলেই কারো হাতের শীতল আঙুলের স্পর্শ সিরাতের ঠোঁট জোড়া ছুঁয়ে দেয়।
– ” হুসস! একদম চুপ, কোনো কথা না!”
কানের কাছে কোনো পুরুষালী কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বলা কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই সমস্ত শরীর হিমের‌ ন্যায় জমতে শুরু করে। কিন্তু পরমুহূর্তেই কন্ঠস্বর কেমন যেন চেনা চেনা লাগে। যার ফলস্বরূপ মস্তিষ্ক ফাইয়াজের উপস্থিতি জানান দিতেই চোখে মুখে একরাশ বিস্ময়ের ছাপ প্রকাশ পায়।
– ” মিস্টার ফাইয়াজ আপনি!!”
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে সিরাত।

– ” আরে আস্তে আস্তে! এত জোরে চিৎকার করে শুনিয়ে দিলে নিচ থেকে তোমার প্রাণপ্রিয় ভয়ঙ্কর রিয়ান এসে আমাকে জানে মেরে দিবে।”
– ” কিন্তু আপনি এখানে কি করছেন? আর এখানে আসলেনই বা কি করে!”
অতি উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করে সিরাত।
– ” সেসব অনেক কাহিনী! পরে ধীরে সুস্থে সবটা বলবো। আচ্ছা আমি এখন যা যা বলছি তা মন দিয়ে শুনো!”
বলেই কিছু একটা বলা শুরু করে ফাইয়াজ। আর সেগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে কর্ণপাত করতে থাকে সিরাত।

এদিকে নিচে হলরুমে ধ্রুবের মুখোমুখি বসে আছে রিয়ান। টেবিলের উপর থাকা একটা এগ্রিমেন্টের পেপার হাতে নিয়ে সেটার উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চোখ বুলাচ্ছে‌ সে।
– ” এক্সকিউজ মি মিস্টার রিয়ান চৌধুরী। আই উইল বি ব্যাক!”
বলেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ধ্রুব। খানিকটা সামনে এগিয়ে গিয়ে স্বচ্ছ চশমার গ্লাসের আড়ালে একবার আড়চোখে রিয়ানের দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে নিল সে। অতঃপর ফাইয়াজের নম্বরে ছোট একটা টেক্সট পাঠিয়ে দিয়ে আবারো উল্টো দিকে হাটা শুরু করে ধ্রুব।
– ” তাহলে কি ডিলটা ফাইনাল মনে করব মিস্টার রিয়ান চৌধুরী? ডিল ফাইনাল হলে কিন্তু ৫০% বেনেফিট‌ আপনার কোম্পানীর ই!”

– ” আই নিড মোর টাইম মিস্টার ধ্রুব। এট লিস্ট তিন দিন। তারপরেই আমি ডিলটা সম্পর্কে কিছু বলতে পারবো।”

———————-
– ” অসম্ভব! এটা কখনোই পসিবল না মিস্টার ফাইয়াজ। আমি এখান থেকে আপনার সাথে পালিয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা করলে রিয়ান ভাইয়া নিশাতের কোনো একটা ক্ষতি করে দিবে, যেটা আমি কখনোই পারব না! ”
– ” তার মানে কি বলতে চাইছো? রিয়ানের সাথে তুমি বিয়েতে রাজি হয়ে যাবে! লাইক সিরিয়াসলি সিরাত? জেনেশুনে নিজেকে কেন নরকের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছো!”
– ” আমি জানি আমি কাজটা ঠিক করছি না, কিন্তু কি করবো বলুন, নিশাতের উপর রিয়ান ভাইয়ার লোকজন সবসময় নজর রাখছে! আর আমিও চাই না এই বিয়ে হোক। কিন্তু ঐ যে বললাম নিশাত! নিশাত ছাড়া এ পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই। ”
– ” হুসস! আর কোনো কথা না!
আমি যেটা বলেছি তোমাকে সেটাই করতে হবে আর নিশাতের বিন্দু পরিমাণ ক্ষতি আমি হতে দিব না! আই প্রমিজ্‌ড ইউ!”
– ” কিন্তু কি করে?”
কথা বলার মাঝে অসাবধানতাবশত পাশের টেবিলের উপর থাকা কাঁচের ফুলদানিতে সিরাতের হাতের স্পর্শ লেগে পড়ে যায় নিচে।
হঠাৎ উপরের রুম থেকে কোনো কিছু পড়ার আওয়াজ কানে যেতেই দোতলায় থাকা সিরাতের রুমের দিকে সরু দৃষ্টে তাকায় রিয়ান।
– ” ওকে মিস্টার রিয়ান চৌধুরী! আজ আমরা উঠি। আশা করি খুব শীঘ্রই আবারো দেখা হচ্ছে। ”
– ” ইয়েস, হ্যাভ এ নাইস ডে!”
ধ্রুব আর জুবায়ের সাহেব বাসা থেকে বের হয়ে যেতেই রিয়ান দ্রুত পায়ে উপরের দিকে হাঁটা ধরে।…………..

#চলবে 🍂

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here