বিলম্বিত বাসর পর্ব ১৮

#বিলম্বিত_বাসর
#পর্ব_১৮
#Saji_Afroz
.
.
.
ঘুম ভাঙতেই আদুরে নিজেকে আবিষ্কার করলো আবেশের বুকের মাঝে। একেবারে আষ্টেপৃষ্টে আবেশ জড়িয়ে ধরে আছে তাকে। এভাবে যেনো শত জনম পার করা যাবে! ভাবতেই মুখে হাসি ফুটলো আদুরের।
খুব সাবধানে আবেশের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে উঠে বসলো সে। আবেশের ঘুম নষ্ট করার কোনো ইচ্ছে তার নেই।
তবে তার বুকের মাঝ থেকে উঠার ইচ্ছেও তার ছিলোনা। কিন্তু বাড়িতে নতুন বউ এসেছে, এভাবে এতক্ষণ রুমের ভেতরে থাকাটা ভালো দেখায় না। সকাল ৮টা বেজে গেলো, এমনিতেই অনেকটায় দেরী হয়ে গিয়েছে। রান্নাঘরের দিকে যাওয়া দরকার। আপনমনে এসব ভেবে উঠে পড়লো বিছানা ছেড়ে আদুরে।

.
.
.
মোবাইলের এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলো লামিয়ার। আড়মোড়া ভেঙে সে উঠে বসে এলার্ম বন্ধ করে একটা হাই তুললো। পাশে চোখে পড়তেই আয়ানকে দেখতে পেলো সে। তাকে দেখেই মনে পড়লো সে এখন নিজের বাসায় নয়, আয়ানের বাসায়!
আয়ানের দিকে চোখ পড়তেই লোমে ঢাকা বুকের উপরে নজর গেলো লামিয়ার। রাতে এই বুকে কত শত চুমু এঁকেছে ভাবতেই লজ্জায় মুখে লালচে রঙ ঘিরে ধরেছে তার।
পাশে চাঁদরটা টেনে নিলো লামিয়া, আয়ানের বুকটা ঢেকে দেবার জন্য। কিন্তু তার খুব করে ইচ্ছে করছে এই বুকে আরেকটু ঠোঁটের ছোঁয়া দিতে।
এতো সংকোচ করার কি আছে! আয়ান এখন তার স্বামী। সে যা খুশি করতেই পারে।
আর না ভেবে আয়ানের বুকের উপরে ঠোঁটের ছোঁয়া বসিয়ে দিয়ে চাঁদর দিয়ে বুকটা ঢেকে দিলো লামিয়া।
মৃদু হেসে ফিসফিস করে বললো-
আমি আয়ানের বউ, মিসেস আয়ান!
.
.
.
রান্নাঘরে এসেই ফাতেমা বেগমকে দেখতে পেয়ে একটু লজ্জাবোধ করলো আদুরে। তার আগেই শ্বাশুড়ী ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে। কেমন না ব্যাপারটা!
মাথা নিচু করে শান্ত স্বরে আদুরে বললো-
আমি দুঃখিত মা।
.
রুটি বেলতে বেলতে ফাতেমা বেগম বললেন-
কেনো?
-ঘুম থেকে দেরীতে উঠার জন্য।
-কাল অনেক খাটনি হয়েছে তোমার। আরেকটু ঘুমোতে! মোরশেদা আর আমার এসবের অভ্যেস আছে। তুমি ছোট মানুষ। দুঃখিত বলার কিছু নেই।
.
মৃদু হাসলো আদুরে। ফাতেমা বেগমের মতো শ্বাশুড়ি পাওয়া আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার। আসলেই সে লাকি!
.
.
.
গোসল সেরে বের হতেই আয়ানকে বিছানার উপরে বসে থাকতে দেখলো লামিয়া।
শরীরে তোয়ালে প্যাচানো লামিয়াকে দেখে দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে আয়ান বলে উঠলো-
ঘুমোতে যাবার আগে রোমান্স, ঘুম থেকেও উঠেও রোমান্স। সারাদিন শুধু এভাবে কাটবে নাকি?
-ঘুম থেকে উঠে রোমান্স মানে?
.
বিছানা ছেড়ে উঠে লামিয়ার দিকে আসতে আসতে আয়ান বললো-
এই যে… এভাবে তোয়ালে পরে সামনে থাকলে রোমান্স করতে মন চাইবেনা বলো?
-না চাইবেনা। মাত্র গোসল সেরে আসলাম। আমি এখন ওসব রোমান্স টোমান্স করতে পারবোনা।
-কিন্তু…
-বললাম না! যাও সেরে নাও গোসল তুমিও।
.
মুখটা ফুলিয়ে আয়ান বললো-
হু।
.
.
হালকা গোলাপি রঙের একটা সুতি শাড়ি পরে তোয়ালে দিয়ে চুলগুলো মুছে নিচ্ছে লামিয়া।
হঠাৎ দরজায় শব্দ হতেই দরজার দিকে এগিয়ে এসে খুলে দিতেই আদুরের দেখা পেলো সে।
-ভাবী আপনি! আসেন ভেতরে।
.
ভেতরে এসে হাতে থাকা নাস্তার ট্রে টেবিলের উপর রেখে আদুরে বললো-
ভালো আছো?
-হুম। আপনি?
-আছি। আয়ান কোথায়?
-ওয়াশরুমে।
.
আদুরে খেয়াল করলো লামিয়ার চুল বেয়ে পানি পড়ছে।
লামিয়ার উদ্দেশ্যে সে বললো-
সাজ গোজে অস্বস্তি লাগছে বলে সকাল সকাল গোসল করলে বুঝি?
.
আদুরের কথা শুনে হেসে উঠলো লামিয়া। হাসতে হাসতেই সে বললো-
শুধু সাজগোজের জন্য নাকি! সারা রাত যা করেছি তার জন্যও করতে হয়েছে।
-যা করেছি মানে?
-আরে ভাবী রোমান্স আরকি। তোমার দেবরের আদর খেলাম না…
.
বলেই আবারো হেসে উঠলো লামিয়া।
তবে আদুরের হাসি পেলোনা। বরং মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। তার ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে লামিয়া বললো-
যেভাবে লুকটা দিয়েছো মনে হচ্ছে তোমাদের বাসর হয়নি?
.
লামিয়ার প্রশ্ন শুনে কোনো কিছু না ভেবেই আদুরে বলে উঠলো-
আমাদের বাসর হয়নি।
.
অবাক চোখে তাকিয়ে লামিয়া বললো-
এসব কি বলছো! প্রেমের বিয়ে তোমাদের।
-প্রেমের বিয়ে মানেই যে বাসর করতে হবে কোনো কথা আছে?
-অবিশ্বাস্য লাগছে তোমার কথা! বিয়ে মানেই তো বাসর হওয়া স্বাভাবিক, তার উপর তোমাদের প্রেমের বিয়ে। আমার কেনো যেনো তোমার কথা বিশ্বাসই হচ্ছেনা। মিথ্যে বলছো তুমি তাইনা?
.
আদুরে কিছু বলার আগেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলো আয়ান। আয়ানকে দেখে আদুরে বললো-
নাস্তা সেরে নাও, পরে কথা হবে।
.
.
.
দুপুর ৩টা….
আয়ানের কাছে পড়তে এসে লামিয়ার দেখা পেলো পরী।
লামিয়ার সাথে পরী ভাব জমাতে চাইলেও লামিয়া তার কাছ থেকে দুরুত্ব বজায় রেখে চলছে।
এতো সুন্দর একটা মেয়ে আয়ানের কাছে পড়ে এটা সে জানেনা!
পরীকে পড়াতে ব্যস্ত আয়ান। আজকের দিনটা না পড়ালে কি এমন ক্ষতি হতো! কালকেই চলে যাবে লামিয়া। ১টা মিনিটও তার কাছে অনেক কিছু।
রাগে গিজগিজ করে রুম থেকে বেরিয়ে পড়লো লামিয়া। ড্রয়িংরুমের দিকে যেতেই দেখা পেলো আদুরের।
আদুরেকে দেখেই লামিয়া বললো-
পরী কতোদিন হচ্ছে আয়ানের কাছে পড়ে?
-এইতো কয়েকদিন হচ্ছে।
কেনো বলো তো?
-ইয়ে মানে আমি চাচ্ছিনা আয়ান আর পরীকে পড়াক। আসলে ছেলে মানুষকে একটু দেখেশুনে রাখতে হয়। পরী অনেক সুন্দরী একটা মেয়ে। কি দরকার আয়ানের ওকে পড়ানোর?
.
লামিয়ার কথা শুনে হেসে ফেললো আদুরে।
লামিয়া তার দিকে তাকিয়ে বললো-
হাসছো যে?
-ভালোবাসায় বিশ্বাসও থাকতে হয় লামিয়া। পিচ্চি একটা মেয়ে পরী। এতো কিছু ভাবা ঠিক হচ্ছে তোমার?
.
কিছুক্ষণ চুপ থেকে লামিয়া বললো-
ওহ! আয়ান কিছুদিন পরই চলে যাবে। ওর ফাইনাল এক্সাম বলে কথা। ততদিন পরীকে পড়াতেই পারে।
-হু। এর পর থেকে নাহয় আমিই পড়াবো।
.
.
.
দেখতে দেখতে সারাটা দিন পার হয়ে রাত এসে গেলো।
আবেশ আজ পাড়ার বন্ধুদের সাথে বাইরে আছে।
রাত ১০টা হতে চললো। এখনো বাসায় ফিরেনি।
একা একা সোফার উপরে বসে আছে নিজের রুমে আদুরে।
একা থাকলে বুঝি নানারকমের প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে মনের মাঝে?
তার মনেও নানা ধরনের প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
আবেশ কেনো তার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকে?
যেখানে আয়ান আকদের পরেই লামিয়ার সাথে শারীরিক সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পেরেছে সেখানে আবেশ কেনো ধুমধামভাবে বিয়ে করেও পারেনি?
শুধুমাত্র ম্যান্দামার্কা বলে? নাকি অন্য কিছু?
না, এভাবে চলতে পারেনা। আজ তার জানতেই হবে এর কারণ!
.
.
টকটকে লাল রঙের সিল্কের একটা শাড়ি পড়লো আদুরে হাত কাটা ব্লাউজের সাথে। ঠোঁটে গাড়ো লাল রঙের লিপস্টিক দিয়ে, চুলগুলো খোলা রাখলো সে। লাল স্টোনের নাকফুল ছাড়া কোনো গহনা সে পরিধান করেনি। আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিলো আদুরে। যতটুক সম্ভব নিজেকে আকর্ষণীয় করার মতো সেজেছে সে। আজ সে নিজ থেকেই যাবে আবেশের কাছে, স্ত্রীর অধিকার দাবি করবে। আজ আবেশকে আদুরের প্রাপ্য ভালোবাসা দিতেই হবে। সাড়া দিতে হবে তার ডাকে। হারিয়ে যাবে তারা অন্য জগতে। ভাবতেই মুখটাও লাল হয়ে গেলো আদুরের।
সারা ঘরে পায়চারি শুরু করে দিয়েছে সে। কবে আসবে আবেশ!
.
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here