ভালোবাসার উষ্ণতা পর্ব ৫+৬

#ভালোবাসার_উষ্ণতা
#৫ম_পর্ব

অচেনা ব্যাক্তিটি তখন প্রাপ্তির কাঁধ হাত রাখে। এতোদিন যা হচ্ছিলো তা প্রাপ্তির কল্পনা কিংবা স্বপ্ন ছিলো না। কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি সে। এখন যদি ব্যাক্তিটিকে না আটকাতে পারে, তবে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। অন্ধকার ঘরে কি হতে যাচ্ছে তার আভাষ পাওয়া এতো কঠিন কিছু না। বিছানার সাইড টেবিলের টেবিল ল্যাম্পের সুইচ প্রাপ্তির হাতের খুব কাছে। লোকটি যখন প্রাপ্তিকে গভীরভাবে স্পর্শ করার কাজে মেতে উঠে তখন ই সুইচটা লাগিয়ে দেয় প্রাপ্তি। দেরী না করে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লোকটিকে ধাক্কা মেরে বিছানা থেকে উঠে পড়ে। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় যা চোখে পড়লো তাতে খুব বড় ধাক্কা খায় প্রাপ্তি।
– এতো রাতে আমার রুমে কি করছেন আপনি?

ঘড়ির কাঁটা তিনটা ছুঁই ছুঁই, মুখোমুখি বসে আছে প্রাপ্তি আর অয়ন। হ্যা অচেনা ব্যক্তিটি আর কেউ নয় অয়ন। অয়ন ভেবেছিলো প্রতিদিনের মতো ঘুমের ঔষধের ডোজ কাজে দিবে এবং প্রাপ্তি ঘুমের অতল গভীরে থাকবে। কিন্তু আজকে প্রাপ্তি খাবারটা নিজে বানিয়ে খেয়েছে এটা অয়নের জানা ছিলো না। লাইটটা জ্বলতেই অয়ন খানিকটা ঘাবড়ে উঠে। প্রাপ্তি একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে চলছে। অয়ন কোনো কথা না বলে বিছানায় মাথা নিচু করেই বসে ছিলো।
– কি হলো? কিছু জিজ্ঞাসা করছি তো নাকি?? মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন কেন? আমি তো সম্পর্কে আপনার ভাবি হই, অন্তত আমার সম্মানের কথাটুকু না ভাবেন নিজের ভাইয়ের কথাটুকু তো ভাববেন। নাকি সেটা ভাবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না?

অয়ন শূন্য দৃষ্টিতে প্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে আছে। অয়নের শূন্যতা প্রাপ্তিকে ভাবাতে বারংবার বাধ্য করছে। কিন্তু পর মূহুর্তে অগ্নিরুপ ধারণ করে বলতে লাগলো,
– তিন মাস ধরে আপনাকে সহ্য করে যাচ্ছি, মুখ বুঝে আপনার অন্যায় গুলো মেনে নিচ্ছি বলে এটা ভাববেন না, যে সামনেও তাই হবে। এমন কিছু করার কথা চিন্তাতেও আনবেন না৷ যা আমার চরিত্রে কালিমা লেপে দেয়। আমি কিন্তু বরদাস্ত করবো না। আমার চোখের সামনে থেকে বের হয়ে যাবেন এবং এই মূহুর্তে।
-……
– আপনি নির্লজ্জ জানতাম, কিন্তু এতোটা নিচ কল্পনায় ও আসে নি। এতোদিন আমার সাথে যা যা হতো তার মানে তা আপনি করতেন। আমি নিজেকে পাগল ভাবতে লেগেছিলাম আপনার জন্য। আমি যে একটা কথাও ভুল বলছি না তা আপনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন। কি হলো মুখে কথা নেই কেনো আজ?
-…..
– আপনি আসলে সব লোকদেখানো করেন। এই যে ভাইকে ভালোবাসা এসব সব নাটক। আপনি আপনার ভাইকে ভালোবাসলে এই রাতের অন্ধকারে আমার রুমে এসে নিজের ভাইয়ের বিশ্বাসকে এভাবে ভাঙ্গতে দিতেন না।

প্রাপ্তির কথাগুলো ছুরির মতো অয়নের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করছে। আজ সে কোনো খারাপ মতলবে আসে নি; শুধু প্রাপ্তিকে জড়িয়ে ঘুমোতে চেয়েছিলো। তার সে আজ বড্ড উষ্ণতার প্রয়োজন ছিলো। প্রাপ্তি এই তিনটি মাসে অয়নের নেশা কিংবা অভ্যাস যাই বলা হোক তাতে পরিণত হয়েছিলো। রোজ রাতে প্রাপ্তি যখন গভীর ঘুমে মগ্ন থাকতো, অয়নের কাছে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে সে লক খুলে এই রুমে আসতো। কখনো তাকে দেখতে তো কখনো তার পাশে ঘুমোতে। এই দুই সপ্তাহ প্রাপ্তির ঘুমের ঔষধের ডোজ বাড়িয়ে দিয়েছিলো যাতে প্রাপ্তির অজান্তেই তার সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে পারে। এতে এক দিকে যেমন সিকদার বাড়ির উত্তরাধিকার আসবে অপরদিকে প্রাপ্তির সম্মানহানির সাথে সাথে সে মানুষিকভাবে ভেঙে পড়বে। কিন্তু যতবার প্রাপ্তির কাছে এসেছে ততোবার বিবেকের তাড়নায় ব্যর্থ হয়েছে। প্রাপ্তির নিস্পাপ মুখ যে কোনো বারবার বাঁধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর আজ আবরারের সুস্থতার অগ্রগতি তাকে এই প্লান স্কিপ করতে বাধ্য করেছে। তবু আজ প্রাপ্তির কথাগুলো কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো কাজ করছে। নাক মুখ খিঁচে বললে লাগলো অয়ন,
– বড্ড বেশি বুলি ফুটেছে দেখি! জবান তো না যেনো কেঁচির মতো চলছে।
– এবার হাত চলতে বাধ্য হবে।

প্রাপ্তির সাহস আর কথার ভঙ্গিতে তড়িৎ গতিতে রেগে যায় অয়ন। আচমকা খুব কাছে চলে আসে প্রাপ্তির, কোমড় চেপে নিজের কাছে টেনে নেয় তাকে। কানের কাছে মুখ নিয়ে বলতে লাগে,
– চালাও হাত, আমিও দেখি তুমি কতোটা সাহসী।

অতর্কিত কাছে আসার কারণে প্রাপ্তি যেন জমে যায়, ফ্যালফ্যাল নয়নে অয়নের দিকে তাকিয়ে থাকে শুধু। প্রাপ্তির রেসপন্স না পেয়ে অয়ন পুনরায় বলতে লাগে,
– কি হলো? সাহস উবে গেলো। তোমাদের মতো মেয়েরা টাকার গন্ধে ছেলেদের বিছানায় যেতে দুবার ভাবে না। অথচ এখন সতী সেজে বসে আছো। আমার ভাই সিকদার বারির বড় ছেলে বলেই তুমি যে তাকে বিয়ে করেছো এটা আমার অজানা নয়। তাই চরিত্রে কালিমা লেপে দেয়ার কথাটা তোমার মুখে মানায় না। আরে তোমার চেয়ে সুন্দরী মেয়ে আমাকে পাওয়ার জন্য হাসফাস করে। আর আমি কিনা যাক গে। মদের নেশায় ভুলে এ রুমে চলে এসেছি। তোমার মতো নোংরা মস্তিষ্কের কাউকে আমার ঘরে আসতে ঢুকতে দেই না, মনের ঘরে কথাতো অনেক দূরের। আগে একবার বলেছি, তুমি নগ্ন আমার সামনে দাঁড়ালেও আমি ফিরে তাকাবো না। এই নারীর দেহে অয়ন সিকদারের না কোনোদিন মোহ ছিলো না হবেও না। নারীরা পারে শুধু ছলনা করতে, হয় দেহ নিয়ে নয় রুপ দিয়ে।

বলেই রুম থেকে গটগট করে বেরিয়ে গেলো অয়ন। প্রাপ্তির চোখ থেকে অশ্রুধারা যেনো থামতেই চাইছে না। বারবার চোখ মুছছে লাভ হচ্ছে না। লাল চোখগুলো বড্ড অবুঝ হয়ে পড়েছে। এর আগেও অয়ন তাকে অপমান করেছে। কিন্তু আজ যেন মাত্রা ছাড়িয়ে গেছিলো। এই লোকটা কি চায়! কি এমন করেছে সে, বারবার তাকে এভাবে হেনস্তা হতে হয়। অজান্তে আজ পর্যন্ত কাউকে কষ্ট দিয়েছে বলে জানা নেই তার। অথচ বারবার তার অপমানিত হতে হয়। পাশাপাশি দুটো রুমের দেয়ালে হেলান দিয়ে দুটো মানুষের নির্ঘুম রাত্রি যাপন। চোখে ঘুমের রেশটুকু নেই। একজনের চোখের পানি বাধ মানছে না, তো আরেকজনের সুপ্ত কষ্টগুলো এলকোহল আর নিকোটিনের আড়ালে মাটি চাপা দিচ্ছে।

সকাল ৮ টা,
ডাইনিং টেবিলে মুখোমুখি নারী ও পুরুষ। গতকালের ঘটনার পরে এখন অবধি তারা কেউ কারোর সাথে কথা বলে নি। সকালে আবরারের রুমে একবার ঢু দিয়েছিলো, লোকমান কাকা জানিয়েছেন উনি ঘুমোচ্ছে। তাই প্রাপ্তি কথা বাড়ায় নি। ডাইনিং টেবিলে আসতে না আসতেই অয়নের সাথে দেখা। মুখ খিঁচিয়ে নাস্তা করতে বসে প্রাপ্তি। অয়নের চোখের নিচের কালি আর লাল চোখ দুইটি নির্ঘুম রাত কাটানোর প্রমাণ দিচ্ছে। নাস্তা করার মাঝখানে অয়নের ফোন বেজে উঠে। নামটি দেখে মেজাজ বিগড়ে যায় অয়নের। না চাওয়া সত্ত্বেও ফোন রিসিভ করে সে। অপাশ থেকে কিছু বলতেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে যায় তার। ফোন রাখার পর প্রাপ্তিকে বলে উঠে,
– তুমি কাল থেকে ভার্সিটি যাওয়া শুরু করবে তুমি।
– আমি?
– হ্যা, কেনো কোনো অসুবিধা?
– না, তা নয় কিন্তু আমি পড়াশুনা ছেড়েছি বছর হবে। ইন্টারের পর আর সুযোগ হয়ে উঠে নি।
– সেটা সমস্যা নেই, আমি দেখে নিবো। ভাইয়ের বউ মূর্খ হলে তো সমস্যা। আর দাদীমা চাচ্ছিলেন তোমার নামে কিছু শেয়ার লিখে দিবেন।
– দাদীমা?
– আমাদের যিনি পেলেছেন। তিনি একেবারেই চান না ভাই এর পজিশন অন্যকারোর হাতে যাক। আমি কালকে এইটার ব্যবস্থা করে দিবো। রেডি হয়ে থাকা হয় যাতে।
– ঠিক আছে।
– তোমার কাকা বেশ কিছুদিন ধরে তোমাকে দেখতে চাইছিলেন। আমার মনে হয় তোমার যাওয়া উচিত।

চাচাবাড়ির কথা শুনে ভয়ে জড়সড় হয়ে উঠে। প্রাপ্তির এ বছর বিশ বছর হতে চলেছে। প্রাপ্তির বাবা, সোলেমান শেখ ছিলেন খুব নামকরা ব্যাবসায়ীদের একজন। শেখ মার্কেন্টাইল এন্ড কো এর তখন রমরমা অবস্থা। একদিন স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। হাইওয়েতে আচমকা একটা ট্রাক সামনে চলে আসে। ব্রেক তৎক্ষনাৎ কাজ না করায় গাড়িটিকে পিছে ফেলে ট্রাক। শেখ সাহেব এবং তার স্ত্রী জায়গায় মারা যান। অবস্থার প্রতিকূলতার কারণে আগেই সোমা শেখ প্রাপ্তিকে গাড়ি থেকে বাইরে বের করে দেন। যার ফলে আজ প্রাপ্তি জীবিত। সোলেমান শেখের মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই খোকন শেখ তার কিছু সম্পত্তি নিজের নামে করিয়ে নেন। কিন্তু ঝামেলা বাধে অন্যখানে। সোলেমান শেখ তার অবর্তমানে সব সম্পত্তি প্রাপ্তির নামে দিয়ে যান, এবং প্রাপ্তি বিশ বছর হলেই এই এসেটগুলো তার নামে ট্রান্সফার হবে। এই কারণগুলোর কারণে বাধ্য হয়ে প্রাপ্তির দেখভাল খোকন শেখ করেন। কিন্তু ব্যবসা কিছুতেই অনুকূলে আনতে পারেন না। অসদ উপায়ে কোনো কিছুতে বরকত হয় না। শেষমেশ বাধ্য হয়ে তিনি আবরার সিকদারের বিয়ে দিতে রাজী হন টাকার লোভে। প্রাপ্তির ভালো করেই জানা কেনো তার চাচা তাকে দেখতে চাইছেন। যাতে ছলেবলে বাকি সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে পারেন।
– আমি ও বাড়িতে যাবো না।
– কেনো? তোমার চাচা তো তোমাকে মেয়ের মতন ভালোবাসেন। তো যেতে না চাওয়ার কারণ কি?
– আমি যাবো না ব্যস। অহেতুক জোর কেনো করছেন।

বলেই উঠে চলে যায় প্রাপ্তি। অয়নের খটকা লাগে কিন্তু কিছু বলে নি। অয়ন নাস্তা করে আবরারের রুমে যায়। আবরার তখন চোখ মেলে শুয়ে আছে। অয়ন আবরারের পাশের চেয়ারটা টেনে সেখানে বসে। আবরারের ক্যানোলা লাগানো হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নিয়ে বলে,
– ভাই, তুই ওই মেয়েটাকে খুব ভালোবাসিস তাই না? তাই তো আমার এতো ডাকেও তুই সাড়া দিস নি অথচ ওর কাছে আসাতেই তুই রেস্পন্স করতে লাগলি। ভাই আমাকে ক্ষমা করে দিস। একটা ভুল করে ফেলেছি আমি। তবে ভুলটা আদৌ ভুল কিনা সেটা জানি না। তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হ। অনেক হিসাব মিলার বাকি।

এই সময় অয়নের ফোনে কল আসে। মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকালে দেখতে পায় অয়নের এসিস্ট্যান্ট রিয়াদ ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করতেই বলে উঠে,
– স্যার একটা নিউজ ছিলো।
– হুম বলো, কি নিউজ?
– স্যার, আবীর স্যার বোর্ড অফ ডিরেক্টরদের হাত করতে শুরু করেছেন তাড়াতাড়ি কিছু না করলে সমস্যা হবে। আর ছোট ম্যাডামের ব্যাপারে কিছু বলার ছিলো, ছোট ম্যাডামের….
#ভালোবাসার_উষ্ণতা
#৬ষ্ঠ_পর্ব

– আর ছোট ম্যাডামের ব্যাপারে কিছু বলার ছিলো, ছোট ম্যাডামের আইডিটা আবার এক্টিভেট করা হয়েছে। এবং আগের মতোই ছেলেদের সাথে ফ্লার্ট করা হচ্ছে।
– তুমি কিভাবে জানলে?
– স্যার বিগত এক সপ্তাহে আমার সাথে প্রায় দিনে ৫-৬ ঘন্টা চ্যাট হয়েছে।
– আচ্ছা, আমি রাখছি।

রিয়াদের ফোন রাখার পর থেকেই বিষয়টা অয়নকে প্রচন্ড ভাবাতে থাকে। এই এক সপ্তাহ প্রাপ্তির উপর তার কড়া নজর ছিলো। এমনকি প্রাপ্তির নিজস্ব কোনো হ্যান্ডসেট বা ল্যাপটপ ও নেই। তাহলে আইডি অন হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। কিছু একটা ভেবে আবার ফোনটা হাতে নেয় অয়ন। ফেসবুকে সার্চ করে “প্রাপ্তি শেখ” আইডিটি পেয়েও যায়। রিয়াদ মিথ্যে বলে নি। আইডিটি সব কিছু লক করা। সুতরাং ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট এক্সসেপ্ট না করলে কিছুই বোঝা যাবে না। কিছু একটা ভেবে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠালো অয়ন। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। হাতে নাতে প্রমাণ পেলে জ্যান্ত কবর দিতেও পিছ পা হবে না অয়ন, কিন্তু কেনো জানে মন বলছে প্রাপ্তি হয়তো নির্দোষ। আচ্ছা, এমন কি হতে পারে না যে প্রাপ্তির আইডি অন্য কেউ চালায়, হতেই পারে। কিন্তু সেটা হয়ে থাকলে, কে সে যে প্রাপ্তির আইডি দিয়ে ছেলেদের প্রেমের জালে জড়িয়ে হৃদয় ভাঙার মতো অপরাধ করে! আর এতোদিন প্রাপ্তিকে বিনা অপরাধের শাস্তি কি তবে অয়ন দিচ্ছিলো!! না আর ভাবতে পারছি না। ভাবতে কষ্ট হচ্ছে!!

সন্ধ্যা ৭ টা,
প্রাপ্তির ভর্তির সকল কাজ করে মাত্র হাত পা ঝাড়া দিলো অয়ন। আজ একই সাথে অনেক কাজ হয়েছে, একটু চা খেতে পারলে মন্দ হতো না। লোকমান কাকাকে খিবর দিতেই যাচ্ছিলো, অমনি দৌড়াতে দৌড়াতে লোকমান কাকা স্টাডিতে প্রবেশ করলো।
– কি হয়েছে? তুমি হাফাচ্ছো কেনো?
– ব..ড় বাবা, ব-বড় বাবা
– কি হয়েছে ভাইয়ের?

লোকমান কাকার মুখে আবরারের কথা শুনে প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায় অয়ন। লোকমান কাকা খানিকক্ষণ দম নিয়ে বলতে লাগে,
– বড় বাবা কথা বলছে
– কিহ!! সত্যি??
– হ্যা, অয়ন বাবা। আমি নিজের কানে শুনেছি।
– আপনি ডাক্তার কল করুন, আমি দেখছি।

বলেই আবরারের ঘরে ছুট লাগায় অয়ন। অয়নের যেনো বিঃশ্বাস ই হচ্ছে না! সত্যি আবরার কথা বলছে। আবরারের ঘরে প্রবেশ করতেই অয়ন খেয়াল করলো আবরার বিছানায় শুয়ে হাত ইশারা করছে। ধীর পায়ে কাছে যেতেই মৃদু স্বরে বলে উঠে,
– অ..য়..ন

আজ ছয় মাস পর আবরারের মুখে নিজের নাম শুনে অয়ন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে নি। এই একটাই তো ভাই তার সে একই সাথে তার বাবা এবং মা। নিজেকে সামলিয়ে আবরারের পাশে বসলো সে। আবরার শুধু মুচকি হেসে অয়নের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অয়নের চোখ ছলছল করছে। এখনই যেন অশ্রুধারা চোখ গুলোকে মুক্ত করে ঝরে পড়বে। নিজেকে সামলিয়ে বলে উঠলো,
– আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। আমার থেকে সুখী বোধহয় কেউ নেই, এখন ফাইনালি আমি রিলিভ পাবো ভাই।

রাত ১০টা,
অয়ন আবরারের রুম থেকে বের হয়েছে। ডাক্তার বলেছে, আবরারের ঔষধ কাজ করছে। কিন্তু একটা ছোট অপারেশন করতে হবে, তাহলে আগের মতো কথা বলতে পারবে। আবরার শুধু অয়নের নাম উচ্চারণ করার পর আর কোনো কথাই বলে নি। তবে, এখন সে তার হাত, পা হালকা নড়াতে পারছে। অয়ন চাচ্ছে আবরারকে এখনই ইউ.এস.এ পাঠিয়ে দিতে। তাহলে হয়তো, আরো ইম্প্রুভ করবে আবরার। ফোনে নোটিফিকেশনের আওয়াজ কানে আসতেই ফোনটা হাতে নিলো অয়ন। নোটিফিকেশনটা দেখে মুচকি হেসে প্রাপ্তির রুমের দিকে রওনা দিলো অয়ন। রুমে নক করার প্রায় দশ মিনিট পর প্রাপ্তি দরজা খুললো। এতো রাতে অয়নকে নিজের সামনে দেখে খানিকটা ঘাবড়ে যায় প্রাপ্তি। কালরাতে যা হয়েছে তার পরে অয়নের সাথে জরুরি কোনো ব্যাপার বাদে কথা হয় নি। আমতা আমতা করে বলে উঠে,
– এতো রাতে?
– ভেতরে আসতে পারি?
– কেনো?
– কিছু কথা ছিলো, ভয় নেই কিছু করবো না
– আচ্ছা, আসুন।
– কিছু ফর্ম এনেছি, নাম পূরণ করা লাগবে। কালকে ভর্তি। আর একটা কথা, তুমি নাকি আঁকা উকি ভালো করো তাই ফাইন আর্টস এর ফর্ম তুলেছি। তোমার ভালো না লাগলে অন্য কিছু চুজ করতে পারো।

প্রাপ্তির ছোটবেলা থেকেই আর্ট খুব ভালো লাগে, শুধু তাই নয় রুমে সারাদিন বসে বসে কিছু না কিছু আঁকা উকি ই করতে থাকে। অয়ন এই তিন মাসে বেশ কয়েকবার তা লক্ষ্য করেছে। প্রাপ্তি অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে অয়নের দিকে। এই লোকের তার পছন্দ অপছন্দ জানার কথা না, তাহলে কিভাবে জেনেছে?
– আপনি কিভাবে জানলেন? আমি আঁকাউকি ভালোবাসি!
– ইচ্ছে থাকলে সব জানা যায়। আচ্ছা, তোমার মোবাইল নেই তাই না?
– আমার তো কারোর সাথে যোগাযোগের প্রয়োজন হয় না তাই আমি মোবাইল রাখি না কাছে। একটা ছিলো হারিয়ে গেছে।
– আচ্ছা আমি কাল তোমাকে মোবাইল কিনে দিবো।
– লাগবে না, আমার জন্য অহেতুক।
– এখন তো আর বাসায় থাকা হবে না, তাই বলছিলাম। এতে আমারও টেনশন কম হবে।
– আচ্ছা আবরার কেমন আছেন?
– ভাইকে আমি কিছুদিনের জন্য ইউ.এস.এ।পাঠিয়ে দিবো।
– ওমা, কেনো?
– ভাইয়ের কিছু অপারেশন করা লাগবে।
– ওখানে একা?
– সেটা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি। সামি আমার বন্ধু ও যাচ্ছে। আচ্ছা একটা কথা ছিলো।
– জ্বী বলেন।
– কোনো সময় যদি জানতে পারো, তোমার সাথে কেউ খুব বড় অন্যায় করেছে, ধোকাবাজি করেছে, তুমি তাকে ক্ষমা করবে তো?
– জ্বী?? হঠাৎ এই কথা!
– এমনি জানতে ইচ্ছে হলো, করবে ক্ষমা?
– আমি ক্ষমা করার কেউ না, আর সত্যি বলতে এখন আর কিছু যায় আসে না। জীবনে কম ছলনার স্বীকার তো হই নি। আমি এ ফর্ম পূরণ করে রাখবো। আপনি আসতে পারেন

অয়ন কথা বাড়ালো না, আজ নিজের ভূলের কারণে নিজেকেই পশ্চাতে হচ্ছে। নিজের রুমে এসে গা এলিয়ে দিলো সে। ফোনটা অন করে ফেসবুকে লগ ইন করতেই ম্যাসেজ গুলো চোখে পড়লো। এর মধ্যে প্রাপ্তি শেখের ম্যাসেজ ও চোখে পড়লো। ম্যাসেজটা চোখে পড়তেই চোখ কুচকে ফেললো অয়ন। সারারাত বেশ চ্যাট করে ফজরের দিকে ঘুমাতে যায় অয়ন।

এক সপ্তাহ পর,
আজ প্রাপ্তির প্রথম ক্লাস, এতোদিন পর পড়াশুনা করতে যাচ্ছে খুশি যেন ধরছে না। এই সপ্তাহ অয়নের অন্যরকম রুপ চোখে পড়েছে। শান্ত, ভদ্র এমন অয়ন কল্পনার বাহিরে। সকালে নাস্তার টেবিলে বসে এ কথাই ভাবছিলো। অয়নের তুড়িতে বাস্তবে ফিরে প্রাপ্তি। সামনে তাকাতেই দেখে সাদা শার্ট, নীল জিন্স পড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। চুলগুলো কপালে পড়ে রয়েছে। ফর্সা মুখে খোচাখোচা দাড়ি যেন আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে তাকে।
– কি ভাবছো?
– আপনি কোথাও বের হবেন?
– তোমাকে পৌঁছে দিবো। খাচ্ছো না কেন?
– ও তাহলে গেটেই নামিয়ে দিয়েন, নয়তো
– নয়তো কি? গেটে নামাবোই বা কেন? তোমাকে ক্লাসে দিয়ে আসবো
– কি দরকার বলুন?
– তুমি খাও এসব নিয়ে তোমার ভাবা লাগবে না।

প্রাপ্তি আর কথা বাড়ালো না, এই লোকের সামনে কথা বলা আর উলো বনে মুক্তো ছড়ানো এক। খাওয়া দাওয়া শেষে কলেজের দিকে রওনা দিলো তারা।

দুপুর ২ টা,
ক্যাফের একটি চেয়ারে বসে আসে অয়ন। অপেক্ষা প্রাপ্তির শেখের আগমনের, ফেসবুকের প্রাপ্তি শেখ। এক ঘন্টা যাবৎ বসে আছে, কিন্তু এখনো আসে নি। অয়নের ধৈর্যের বাধ যেন ভাঙ্গতে লাগলো। ব্যাক্তিটি আসবে না বোঝা যাচ্ছে। এখন আইপি এড্রেস ট্রাক করা ছাড়া উপায় নেই। অয়নের বুঝতে বাকি নেই যে, আবরারের সাথে ধাপ্পাবাজি করা মানুষটি আর যে হোক প্রাপ্তি নয়। প্রাপ্তির ঘরে সি.সি টিভি ক্যামেরা লাগিয়ে ২৪ ঘন্টা অভসারভ করেছে অয়ন। যখন প্রাপ্তি শেখ আইডিটির সাথে চ্যাট করতো তখন প্রাপ্তি ঘরে হয় ঘুমাতো নয় কোনো কাজ করতো। অয়নের সব বিষয়ে খোঁজ নিতেও ভুল হয়েছে। তা না হলে হয়তো আজ প্রাপ্তির চোখে নিজের জন্য ঘৃণা দেখতে পেতো না। চেয়ার থেকে উঠতেই যাবে তখন এক জন রমনী তার সামনে এসে দাঁড়ালো। রমনীটিকে দেখে যেন মাটি থেকে জমি খসে গেছে, রমনীটি আর কেউ নয়….

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি
চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here