ভয়ংকর সে পর্ব -৩৪+৩৫+৩৬+৩৭

#ভয়ংকর_সে #পর্ব_৩৪
#M_Sonali

“কিরে চাঁদনী মা, এত সকাল সকাল কোথায় যাচ্ছিস তুই? এভাবে রেডি হয়ে?”

সবেমাত্র রেডি হয়ে বাসা থেকে বের হতে নিয়েছে চাঁদনী। তখনই পিছন থেকে ডেকে তার বাবা এ কথাটি বলে উঠল। সে স্বাভাবিক ভাবেই মৃদু হেসে উত্তর দিলো,

“তেমন কোথাও নয় বাবা। আসলে অনেকদিন হলো শিউলীর সাথে দেখা হয় না। তাই ওর কাছে যাচ্ছিলাম। একটু দেখা করে আসি।”

ওর কথার উত্তরে বেশ অবাক হলেন রতন মিয়া। ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“চাঁদনী তোর মাথাটা কি আসলেই গেছে নাকি? এসব কি আবোল তাবোল বলছিস। ভুলে গেছিস শিউলি অনেকদিন আগেই হারিয়ে গেছে। কার সাথে যেন বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে এক রাতে।”

ওর বাবার কথা শুনে মুখে হাসি ফুটে উঠল চাঁদনীর। কারণ সে ভালোভাবেই জানতো শিউলি সেখানে নেই। কারণ শিউলিকে তো অনেক আগেই শ্রাবণ রক্ত চুষে মেরে ফেলেছে। নিজের শক্তি হাসিলের জন্য। তাই ওর এটা স্বপ্ন নাকি বাস্তব এটা শিওর হওয়ার জন্যই ওদের বাসায় যেতে চেয়েছিল। কিন্তু যেতে হলো না তার আগেই তার বাবা সবকিছু বুঝিয়ে দিল তাকে।

চাঁদনীকে হাসতে দেখে বেশ অবাক হলেন রতন মিয়া। সে ওর কাছে এগিয়ে এসে গম্ভির গলায় বললেন,

“কিরে তুই আবার হাসছিস কেন? তোর সবচাইতে ভালো বান্ধবী হারিয়ে গেছে এটা শুনে হাসছিস? মা সত্যি করে বলতো তোর শরীর কি খারাপ লাগছে? আজ তুই এমন আজব ব্যবহার কেনো করছিস বলতো?”

“আমার কিছু হয়নি বাবা। আমি ঠিক আছি। তুমি চিন্তা করো না। আসলে শিউলি দের বাড়িতে এমনি একটু ঘুরতে যেতে চেয়েছিলাম। থাক আর যাব না। তুমি থাকো আমি একটু বাইরে দিয়ে হেটে আসছি। ঘরের মধ্যে থেকে আর ভালো লাগছে না। কিছুক্ষণের মাঝেই চলে আসব।”

কথাটি বলে রতন মিয়া কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল চাঁদনী। বাইরে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বড় করে নিঃশ্বাস টেনে সামনের দিকে হাটা শুরু করল। তার গন্তব্য তার আর এক বান্ধবীর বাড়ি।

গুটি গুটি পায়ে বেশ কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পরেই এক পাড়া-প্রতিবেশী চাচির সাথে দেখা হলো চাঁদনীর। ওকে দেখেই মহিলাটি বলে উঠলো,

“কে গো রতন ভাই এর মেয়ে চাঁদনী নাকি! অনেকদিন পর দেখলাম তোমায়। কবে আসছো?”

ওনার কথা শুনে চাঁদনীর মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে মুচকি হেসে বলল,

“এই তো চাচি ভালোই আছি। আপনি ভালো আছেন?”

ওর কথার উত্তরে মহিলাটি একগাল হেসে উত্তর দিলেন,

“ভালোই আছি। তা জামাইকে সাথে নিয়ে এসেছো নাকি একাই এসেছো? তোমার জামাইটাকে কিন্তু তোমার সাথে অনেক সুন্দর মানায়। এমন জামাই গোটা এলাকা খুঁজেও একটা পাওয়া যাবে না। সত্যি কপাল করে এত সুন্দর একটি জামাই পাইছো।”

চাঁদনী মৃদু হাসে, কোন উত্তর দেয় না। তারপর বেশ কিছুক্ষণ তার সাথে গল্প করে সামনে এগিয়ে যায়। মহিলাটি চোখের আড়াল হতেই চাঁদনীর মুখে ফুটে ওঠে বিশ্বজয় করা হাসি। তার মানে সে কোন কিছুই স্বপ্ন দেখেনি। তার বাবা এবং দাদি সব কিছু ভুলে গেলেও এলাকার সকলের মনে আছে তার বিয়ের কথা। তার মানে শ্রাবণ সত্যিই তার জীবনে ছিল। কোন কিছুই মিথ্যে নয়। যদিও এটা তার অনেক আগে থেকেই বিশ্বাস ছিল। কিন্তু চাঁদনী বুঝতে পারছে না সে এমন কেন করল? কেন তার বাবা এবং দাদির মন থেকে তার সকল স্মৃতি মুছে দিল। কেনই বা তাকে এখানে রেখে গেল?

এসব কথা ভাবতে ভাবতে যেন মাথা ধরে যাচ্ছে চাঁদনীর। যেভাবেই হোক এই সকল প্রশ্নের উত্তর তাকে জানতেই হবে। আর সে শ্রাবনকে ছেড়ে থাকতে পারবেনা। তার কাছে ফিরে যেতে চায় সে। রাগের মাথায় যত কিছুই বলুক না কেন। সে তো শ্রাবণকে ভালোবাসে। বড্ড বেশি ভালোবাসে। তাই যেভাবেই হোক সে আগের মত তার কাছে ফিরে যাবে। সব ভুলে তার সাথেই সংসার করবে।
,
,
,
৭ দিন পর,
বিকাল ৪:৫৫ মিনিট,
জঙ্গলের রাস্তা ধরে সোজা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে চাঁদনী। কোথায় যাচ্ছে বা কেন যাচ্ছে তার কোন হদিস নেই। সে একনাগাড়ে সামনে এগিয়ে চলেছে। সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে। কোথায় কি আছে সেটা হিসাব করছে না। আশেপাশে দেখার সময় নেই তার। তার মাথায় শুধু একটা চিন্তাই ঘুরছে। গত সাত দিনে সে হাজারবার শ্রাবনকে স্মরণ করেছে। ডেকেছে। কিন্তু সে একবারের জন্য আসেনি। বা তার কোনো অস্তিত্ব আশেপাশে টের পায়নি চাঁদনী। কিন্তু এমন কেন করছে শ্রাবণ? কেন তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না? কেনইবা আসছে না। এসব কিছুর উত্তর জানতে হবে তাকে।

এদিকে তার বাবা তাকে বিয়ে দিবে বলে উঠে পড়ে লেগেছে। চারিদিকে ঘটক লাগিয়েছে পাত্র খোঁজার জন্য। যেটা চাঁদনীকে ভীষণ রকম কষ্ট দিচ্ছে। তাই সে আজ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ভাবেই হোক আজকে সে শ্রাবনের সাথে দেখা করেই ছাড়বে।

এ সব কথা ভাবতে ভাবতে জঙ্গলের একদম ভিতরে চলে এসেছে চাঁদনী। হঠাৎ বেখেয়ালে কিছু একটার সাথে হোচট খেয়ে মুখ থুবরে আছড়ে পরে সে।

ওর পায়ের কাছেই একটি কাটাযুক্ত গাছের ডাল থাকায় সেই কাঁটাগুলো ওর হাটুতে ঢুকে যায়। যার কারণে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে সে। ব্যাথায় কোকিয়ে উঠে। ওর চিৎকারে কিছুটা দূরে জঙ্গলের মাঝে বসে থাকা বেশ কয়েকজন নেশাখোর ফিরে তাকায় ওদিকে। সবাই উঠে দাঁড়ায় একে অপরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“এই জঙ্গলের মাঝে কে এসেছে রে? চলতো গিয়ে দেখি। মনে তো হলো কোনো মেয়ে মানুষ।”

কথাটি বলেই তারা চিৎকার লক্ষ্য করে এগিয়ে আসতে থাকে। কিছু দূর আসতেই দেখতে পায় একটি সুন্দরী মেয়ে জঙ্গলের মাঝখানে শুয়ে থেকে পা ধরে ব্যথায় কোঁকাচ্ছে। ওকে দেখে লোকগুলোর মুখে বিশ্রি হাসি ফুটে ওঠে। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,

“আজকের দিনটা তো মজাই মজার। পাখি নিজেই এসে আমাদের মনোরঞ্জন করার জন্য ধরা দিয়েছে। তাহলে আর দেরি কেন চল ওকে নিয়ে যাই আমাদের ডেরায়। অনেকদিন হলো এমন সুন্দরী মেয়ের সাথে মজা করা হয় না।”

কথাগুলো বলেই আবারও বিশ্রি হাসি দিতে শুরু করে তারা। তারপর সবাই মিলে এগিয়ে আসতে থাকে চাঁদনীর দিকে। আশেপাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত আশেপাশে ফিরে তাকায় চাঁদনী। সে মনে করে হয়তো শ্রাবণ এসেছে। কিন্তু পাশে তাকাতেই তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। সে দেখে নেশাগ্রস্ত বেশ কয়েকজন লোক তার দিকে হেলেদুলে এগিয়ে আসছে। লোকগুলোর চোখে কি বিশ্রি চাহনি। তাদের ঢুলতে ঢুলতে এগিয়ে আসতে দেখে যেন গা ঘিন ঘিন করে উঠে চাঁদনীর। ভীষণরকম রাগ হয় তার। সেইসাথে বুক কেপে ওঠে ভয়ে।

সে পায়ে ব্যথা পাওয়া সত্বেও জোর করে কষ্ট করে উঠে দাড়ায়। দৌড়ে পালানোর জন্য একদিকে প্রাণপণে ছুটতে থাকে। কিন্তু বেশিদূর চলতে পারে না সে। তার আগে লোক গুলো তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এবার চাঁদনী বেশ ঘাবড়ে যায়। সে বুঝতে পারে সে কত বড় বিপদে পরতে যাচ্ছে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। চোখ বন্ধ করতেই শ্রাবণের মুখটা দেখতে পায়। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ওর হিংশ্র চেহারাটা। মুহুর্তেই তার সকল ভয় দূর হয়ে যায়। মনে মনে ভাবে সে এ জন্যই এসেছে এখানে। তাহলে ভয় কেন পাচ্ছে। সে বেশ ভালো করেই জানে তার কোন কিচ্ছু হবে না। শ্রাবণ তার বিপদে পড়া কখনোই সহ্য করতে পারবেনা। সে অবশ্যই ছুটে আসবে তাকে রক্ষা করতে।
#ভয়ংকর_সে #পর্ব_৩৫
#M_Sonali

চোখ বন্ধ করতেই শ্রাবণের মুখটা দেখতে পায়। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ওর হিংশ্র চেহারা। মুহুর্তেই তার সকল ভয় দূর হয়ে যায়। মনে মনে ভাবে সে তো এজন্যই এসেছিল এখানে। তাহলে ভয় কেন পাচ্ছে। সে বেশ ভালো করেই জানে তার কোন কিচ্ছু হবে না। শ্রাবণ তার বিপদে পড়া কখনোই সহ্য করতে পারবেনা। সে অবশ্যই ছুটে আসবে তাকে রক্ষা করতে।

কথাগুলো ভেবে নিশ্চিন্তে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে চাঁদনী। আর অপেক্ষা করতে থাকে শ্রাবণের জন্য। কিন্তু এটাই যেন তার সবচাইতে বড় ভুল ছিল। আশে পাশের নেশা-খোর লোকগুলো ওকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শয়-তানি হাসে। তাদের মধ্য থেকে একজন বলে ওঠে,

“আরে আমরা খামোখাই ওকে ধরার জন্য এত চিন্তা করছিলাম। পাখি তো নিজেই আমাদের ফাঁদে থাকতে চায়। সেও হয়তো মজা নিতে চাচ্ছে। আরে এত ব্যস্ত হয়ে লাভ নেই। ধীরে ধীরেই মজা নেওয়া যাবে।”

কথাগুলো বলেই লোকগুলো হাসতে হাসতে ওর এগিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু তবুও চাঁদনী এক পাও নরে না। চুপচাপ সেখানেই দাড়িয়ে থাকে। তার যে ভয় করছে না তেমনটা নয়। মনে মনে অসম্ভব রকম ভয় পাচ্ছে সে। কিন্তু তার সাথে আশা নিয়ে বসে আছে শ্রাবণ তাকে বাঁচাতে আসবে। তাকে আসতেই হবে। সে চারি দিকে তাকিয়ে দেখে লোক গুলো একদম তার কাছাকাছি চলে এসেছে। এই বুঝি ধরে ফেলবে তাকে। সাথে সাথে সে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। আর একমনে শ্রাবনকে ডাকতে থাকলো। মনে মনে বলতে শুরু করলো,

“শ্রাবণ আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না? শুনতে পাচ্ছেন না আমার মনের চিৎকার? কেন এভাবে দূরে সরে আছেন। আজ যদি আপনি আমাকে বাঁচাতে না আসেন তাহলে চিরদিনের মতো আমাকে হারিয়ে ফেলবেন। আর কখনোই হয়তো আমার জীবিত মুখ খানি দেখা হবে না। এরা যে আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে। নষ্ট করে ফেলবে আপনার চাঁদ পাখিকে। মেরে ফেলবে এখানেই। আমি আজকে দেখতে চাই আপনার ভালোবাসা কেমন। কিভাবে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে দূরে রেখে তার ক্ষতি দেখতে পারেন। আপনার আসার অপেক্ষা করছি। আপনি না আসা অব্দি আমি এখান থেকে এক পাও নরবো না।”

কথাগুলো মনে মনে ভাবার সময় দু চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে চাঁদনীর। সে চোখের জল টুকু হাত দিয়ে মুছে নিয়ে ধীরে ধীরে তাকায়। কিন্তু তাকাতেই যেন অবাকের শীর্ষে পৌঁছে যায়। কারণ তার আশেপাশে যে নেশা-খোর লোক গুলো ছিল তাদের মাঝে এখন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। চারিদিকে শুধু গাছ আর গাছ। চাঁদনী ঘুরে ঘুরে চারদিকে তাকায় সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু তার পাশের লোক গুলো যেন ত্রিসীমানার কোথাও নেই। সে আবার এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে খুঁজতে থাকে লোকগুলোকে। কিন্তু তারা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

চারিদিকে একদম অন্ধকার হয়ে আসছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে। চারিদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। সেইসাথে জঙ্গলের করমর শব্দ যেন আরও ভয়ংকর করে তুলছে চারিদিকের পরিস্থিতি। চাঁদনী কি করবে ভেবে পায়না। কিছুতেই বুঝে আসেনা লোক গুলো হঠাৎ করে কোথায় মিলিয়ে গেল। সে তো কোনকিছু টেরও পেল না। তবে কি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো সে? এসব কথা ভেবেই যেন মাথা ধরে যাচ্ছে চাঁদনীর। সে এবার সিদ্ধান্ত নিল বাসায় ফিরে যাবে। তাই একমনে হাঁটা শুরু করল সামনের দিকে। কিন্তু সে ফিরে যাওয়ার বদলে পথ হারিয়ে আরও গভীর জঙ্গলে পৌঁছে গেল। যতক্ষণে তার খেয়াল হল ততক্ষণে অনেক রাত হয়ে গেছে। কোন দিকে বিন্দু পরিমান আলোর চিহ্নটুকুও নেই। নিজের হাতটাও নিজে দেখতে পাচ্ছে না।

চারিদিকে এমন অন্ধকার দেখে এবার যেন ভীষণ রকম কান্না পেতে লাগল চাঁদনীর। সে এমনিতেই অন্ধকার বেশ ভয় পায়। তার ওপর এমন ভয়ানক অন্ধকার সে জীবনে আর কখনো দেখেনি। নিজেকে ভীষণ রকম অসহায় লাগছে তার। তার মন বলছে শ্রাবণ আসবে না। সে হয়তো সত্যি হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে। সে নিজেই শ্রাবনকে নিজের জীবন থেকে বের করে দিয়েছে। তার নিজের কারণেই শ্রাবণ তাকে একটি বারের জন্যও বাঁচাতে আসছেনা। তাকে বিপদে পড়তে দেখেও কোন সহানুভুতি দেখাচ্ছেনা। কথাগুলো ভেবে দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে চাঁদনীর। সে ভীষণ রকম ভেঙে পড়ে। হাঁটু গেড়ে সেখানেই বসে পড়ে কান্না করতে শুরু করে। পুরো জঙ্গলে তার কান্নার শব্দ টা যেন ভৌতিক রকমের শব্দ হয়ে প্রতিধ্বনি হতে থাকে।

বেশ অনেকটা সময় এভাবে বসে থেকে কান্না করতে থাকে চাঁদনী। তারপর নিজের চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই দেখা যায় না। সে এবার যেভাবেই হোক জঙ্গল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু কিভাবে বের হবে সেটা ভেবেই যেন কুপোকাত অবস্থা। তবুও সে হাত দিয়ে হাতরিয়ে হাতরিয়ে নিচে পড়ে থাকা একটি গাছের মরা ডাল হাতে নেয়। সেটা দিয়ে কোনমতে গাছের অন্ধ মানুষের মত সামনের দিকে এগোতে থাকে।

বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতেই কিছু একটার সাথে হোচট খেয়ে মুখ থুবরে পড়ে চাঁদনী। সাথে সাথে সামনে পরে থাকা কিছু একটার সাথে ভীষণ রকম আঘাত পায় কপালে। কপাল ফেটে রক্ত বের হয়ে যায়। সে কপালে হাত দিতেই হাতটা ভিজে একাকার হয়ে যায় রক্তে। এবার যেন ভীষণ রকম কান্না পেতে থাকে চাঁদনীর। সে মনে মনে শ্রাবনের কথা ভাবতে থাকে। মনে মনে বলতে থাকে,

“আপনি সত্যিই অনেক বদলে গেছেন। আমাকে এত বিপদে দেখেও আপনি আমাকে বাঁচাতে আসছেন না। কোনরকম সাহায্য করছেন না। এই বুঝি ছিল আপনার ভালবাসা। ঠিক আছে আমি এখানেই পরে থাকবো। আপনার আসতে হবে না। আর কখনো দেখতে হবে না এই চাঁদনীর মুখ।”

কথাগুলো বলেই হু হু করে কান্না করে উঠল। ভীষণ রকম কষ্ট হচ্ছে তার। সাথে রাগও হচ্ছে প্রচুর। সেখানে বসেই আবারও কান্না করতে লাগল। এদিকে কপাল থেকে রক্ত গড়িয়ে থুতনিতে এসে চুইয়ে চুইয়ে পরতে লাগলো নিচে। এভাবে বেশ কিছুটা সময় চলার পর, চাঁদনীর চোখ দুটি বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। একসময় সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে রইল সে।
,
,
,
সকালে চারিপাশে পাখির কিচির-মিচির ডাকে ধীরে ধীরে জ্ঞান ফেরে চাঁদনীর। সেই সাথে সুর্যের আলো এসে মুখে পড়ায় কোনমতে চোখ মেলে তাকায় সে। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে সে জঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছে। চারিদিকে একদম নিরব নিস্তব্ধ। কেমন একটা থমথমে পরিবেশ। চাঁদনী উঠে বসে। তার মাথা অনেক ব্যথা করছে। মাথাটা যেন ফেটে যাচ্ছে। মাথায় হাত দিতেই দেখে তার কপালের রক্ত পরা বন্ধ হয়ে গেছে। একদম পরিষ্কার হয়ে আছে কপাল ও মুখ। কিন্তু মাথা ফাটা আগের মতোই রয়ে গেছে। তবে মনে হচ্ছে যেন ফাটা জায়গাটায় পরিস্কার করে কিছু লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।

চাঁদনী ভাবে এটা হয়তো তার মনের ভুল। হয়তো তেমন কিছুই হয়নি। তাই সে এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তাকে বাড়িতে ফিরতে হবে। উঠে দাঁড়াতেই যেন মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতে নেয় সে। তবুও একটি গাছের সাহায্যে নিজেকে সামলে নেয়। তারপর গাছ ধরে ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। সে বুঝতে পেরে গেছে শ্রাবণ আর কোনোদিনও ফিরবে না। সে শত বিপদে পড়লেও তাকে বাঁচাতে আসবে না। সে সত্যিই স্বার্থপরের মত চাঁদনীর জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে বললে ভুল হবে। চাঁদনী নিজেই তাকে নিজের জীবন থেকে বের করে দিয়েছে। শেষবার অনেক বাজে আচরণ করেছে তার সাথে। তাই হয়তো রাগ করেছে। চিরদিনের মত ওর জীবন থেকে চলে গেছে। চাঁদনী এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। দু চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে তার। সে তো সত্যি সত্যি শ্রাবনকে ভালোবাসে বড্ড বেশি ভালোবাসে।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে অনেকটা দূরে চলে এসেছে চাঁদনী। কিন্তু এখন পর্যন্ত সঠিক রাস্তা খুঁজে পায়নি সে। সে শুধু একই জায়গায় বারবার ঘুরেফিরে বেরোচ্ছে। যেন গোলকধাঁধায় আটকে গেছে সে। এবার তার প্রচণ্ড রকম খারাপ লাগতে থাকে। সে বুঝতে পারে তার বাবা এবং দাদি হয়ত তার চিন্তায় পাগল হয়ে গেছে। তাকে হয়তো খুঁজা খুঁজি শুরু হয়ে গেছে। সে এমন ভুল পদক্ষেপ কেন নিল এসব ভেবে নিজের উপর রাগ হতে থাকে প্রচুর। সে আবারও মনে সাহস যুগিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে সামনে। তখনই তার সামনে বিশাল বড় একটি পুকুর পরে। জঙ্গলের মাঝখানে এমন পুকুর দেখে বেশ ভয় পেয়ে যায় চাঁদনী। পুকুরে কোনো পানি নেই। শুধু একদম কুচকুচে কালো কাদা। যেন অনেক দিনের ময়লা জমা হয়ে কালো হয়ে গেছে কাদাগুলো। সেইসাথে কাদা থেকে উঠে আসছে বিশ্রী পঁচা গন্ধ।

এই গন্ধে চাঁদনীর যেন ভিতর থেকে সবকিছু উল্টে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চাঁদনী দ্রুত সেখান থেকে সরে যাওয়ার জন্য পিছন দিকে ঘুরতে নেয়। তখনই সে কিছু একটা দেখে থমকে দাঁড়ায়। ভয়ে ভয়ে আবারও ফিরে তাকায় পুকুরের দিকে। সে দেখতে পায় পুকুরের মাঝখানে কাদার মধ্যে পাঁচ জোড়া পা দেখা যাচ্ছে। যেন পাঁচজন মানুষ উল্টো হয়ে ঢুকে আছে কাদার মধ্যে। আর তাদের পা গুলো শুধু বের হয়ে আছে উপরে। বিষয়টা দেখতেই যেন অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে চাঁদনীর। সে আরো ভালো করে দেখার জন্য আরেকটু এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে দেখে। হ্যাঁ সে যেটা দেখছে সেটা সত্যি। সত্যি’ই পুকুরের মাঝখানে পাঁচটি মানুষের পা দেখা যাচ্ছে।

চাঁদনী ভয়ে সেখান থেকে দৌড়ে এক দিকে ছুটতে থাকে। ভীষণ রকম ভয় পেয়ে গেছে সে। যেন বুকের মাঝে একনাগাড়ে হাতুড়িপেটাচ্ছে তার। দৌড়াতে দৌড়াতে কোথায় যাচ্ছে তার কোনো দিক নেই। একসময় এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে আবারো মুখ থুবরে আছড়ে পরে চাঁদনী। আশে পাশে তাকাতেই দেখে সে লোকালয়ের খুব কাছে চলে এসেছে। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। তার মুখে ফুটে ওঠে জয়ের হাসি। কিন্তু ভিতরের ভয়টি এখনো যায়নি। সে আবারও উঠে দাঁড়ায়। পায়ে ব্যথা পাওয়ায় নেংড়িয়ে নেংরিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে লোকালয়ের দিকে। কিন্তু লোকালয়ে পৌছেই সে খেয়াল করে অন্য কোন গ্রামে চলে এসেছে। এটা তার নিজের গ্রাম নয়।

এখানে কোনদিন এসেছে বলে তার মনে হয় না। সবকিছুই কেমন অচেনা অপরিচিত। গ্রামের মানুষগুলো তাকে দেখে অদ্ভুত ভাবে তাকায়। কিন্তু কেউ কিছু বলে না। চাঁদনী সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। অন্ততপক্ষে জঙ্গল থেকে বের হতে পেরেছে এটাই অনেক। ঐ জঙ্গলে থাকলে হয়তো ওখানেই মরে পড়ে থাকতে হতো তার। সামনে এগিয়ে যেতেই একটি মধ্য বয়ষ্ক লোকের সামনাসামনি পরে সে। লোকটা তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। গম্ভির গলায় জিজ্ঞেস করে,

“এই মেয়ে কে তুমি? আর কোথা থেকে আসলে এখানে? তোমাকে এই গ্রামে এর আগে দেখেছি বলে তো মনে হয় না? তোমার শরীরে এত আঘাতের চিন্হ কিসের।”

উনার কথার উত্তরে চাঁদনী বেশ ঘাবড়ে যায়। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“আমি চাঁদনী। অমুক গ্রামে আমার বাড়ি। জঙ্গলে ঘুরতে এসে রাস্তা হাড়িয়ে এখানে চলে এসেছি। আপনি কি আমায় একটু বাড়ি ফিরতে সাহায্য করতে পারেন প্লিজ?”

ওর কথার উত্তরে লোকটি বেশ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভাল করে দেখে নিয়ে বিশ্মিত গলায় বলে,

“কি বলছো তুমি এসব? ওই জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছো। আর এক রাত থেকে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছো! এটা কিভাবে সম্ভব? ওই জঙ্গলে কেউ গেলে ফিরে আসে বলে তো জানা যায় না। আজ অব্দি জঙ্গলের মাঝে রাতের বেলায় যে গিয়েছে সে আর কখনো ফিরে আসেনি। তুমি ফিরে এলে কিভাবে?”
#ভয়ংকর_সে #পর্ব_৩৬
#M_Sonali

“কি বলছো তুমি এসব? ওই জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছো। আর এক রাত থেকে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছো! এটা কিভাবে সম্ভব? ওই জঙ্গলে কেউ গেলে ফিরে আসে বলে তো জানা যায় না। আজ অব্দি জঙ্গলের মাঝে রাতের বেলায় যে গিয়েছে সে আর কখনো ফিরে আসেনি। তুমি ফিরে এলে কিভাবে?”

লোকটার এমন কথায় চাঁদনী বেশ অবাক হলো। তার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললো,

“কিন্তু আমিতো জঙ্গলে এমন কোন কিছুই দেখিনি। যাতে কারো ক্ষতি হতে পারে। হ্যাঁ একরাত আমি জঙ্গলের মধ্যে ছিলাম আর সারারাত ঘুমিয়ে ছিলাম। আমার কোনো ক্ষতি হয়নি। আপনি হয়তো কোন ভুল শুনেছেন বা এই জঙ্গল নিয়ে কেউ মিথ্যা বানি রোটিয়েছে। আমার বাসায় পৌঁছানোর মতো রাস্তা বলে দিতে পারবেন। আমি এখানকার কিছুই চিনি না। আমাকে এইটুকু উপকার করুন দয়া করে।”

কথাগুলো বলেই করুন দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল চাঁদনী। ওর কথায় লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তীক্ষ্ণ নজরে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ওকে দেখে নিয়ে মুখে ক্রু হাসি ফুটিয়ে বললো,

“আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি টেনশন করো না। আমি তোমাকে তোমার বাড়িতে পৌছে দিব। কিন্তু তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে সারাদিন কিছুই খাওনি। অনেক ক্লান্ত লাগছে। এসো আমার সাথে। প্রথমে আমার বাড়িতে গিয়ে কিছু খেয়ে নাও। তারপর তোমাকে তোমার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবো।”

লোকটার কথায় চাঁদনী একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বাড়িতে পৌঁছাবে বলে মনের ভেতর বেশ কিছুটা খুশি অনুভব হল। পরক্ষণেই শ্রাবণের কথা মনে পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। যার জন্য এত কিছু করল তাকেই খুঁজে পেল না। শ্রাবণ হয়তো সত্যিই তাকে ছেড়ে চলে গেছে। আর কখনো ফিরে আসবে না তার জীবনে। কথাটি ভেবেই একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল চাঁদনী। চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু জল। সে দ্রুত সেটা মুছে নিয়ে লোকটার পিছু পিছু হাটা শুরু করল। লোকটা তাকে নিয়ে বেশ কিছুটা দূরে একটি টিনের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

চাঁদনী বাড়িটার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল বাড়িটার আশেপাশে তেমন কোন বাড়িঘর নেই। একদম নিরিবিলি বলা চলে। বারান্দায় এবং উঠানে অনেক ময়লা ও পাতা জড়ো হয়ে আছে। হয়তো অনেকদিন হলো কেউ ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে না। সে কিছুটা অবাক হল। কারণ এখানে দেখে মনে হচ্ছে না এখানে কোন মহিলা মানুষ আছে। ওকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে এদিক ওদিক তাকাতে দেখে লোকটা গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

“কি হল মেয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন! ভিতরে আসো। আমার বউ বাপের বাড়ি গেছে কয়েকদিন হলো। তাই এগুলো পরিষ্কার করা হয়নি। তাই এমন লাগছে।”

লোকটির কথার উত্তরে চাঁদনী না চাওয়া সত্ত্বেও মুখে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। তারপর লোকটার পিছুপিছু দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কেন যেনো তার মন চাইছে না রুমের মধ্যে প্রবেশ করতে। কিন্তু তবুও কোন উপায় নেই। এর ভরসাতেই আছে চাঁদনী। যদি সে সত্যি সত্যি তার বাবার কাছে পৌঁছে দেয়। তাই লোকটার সাথে ভিতরে ঢুকে গেল সে। কিন্তু রুমের মধ্যে ঢুকে বেশ বিরক্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেল সে। পুরো রুমটাতে বিশ্রী বিশ্রী সব মেয়েদের ছবি লাগানো। বাজে পোশাক পরা মেয়েদের ছবি লাগানো। দেখে মনে হচ্ছে এটা কোন খারাপ জায়গা।

ছবিগুলো দেখেই দরজার কাছেই থমকে দাঁড়াল চাঁদনী। আর ভিতরে যাওয়ার সাহস করলো না সে। সে বুঝতে পারল সে হয়তো বিপদের মধ্যে এগিয়ে এসেছে। ওকে দাড়াতে দেখে লোকটি দাঁত কিড়মিড় করে গম্ভীর গলায় বলল,

“আবার দাঁড়িয়ে গেলে কেন? এদিকে আসো। আর এসব দেখে ভয় পেওনা। আমার বউ এসব ছবি ভীষণ পছন্দ করে। তাই এগুলো লাগিয়ে রেখেছে। তুমি যদি নিজের বাবার কাছে ফিরে যেতে চাও তাহলে এখানে এসে বসো। তোমার খাওয়া হলে তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব তোমার বাবার কাছে। চিন্তা করো না। এখানে বস আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।”

লোকটার কথায় চাঁদনী কি বলবে ভেবে পাচ্ছেনা। তবে সে যতটা বুঝতে পেরেছে সে খুব বাজে একটি জায়গায় এসে ফেঁসে গেছে। এখান থেকে যেভাবেই হোক পালাতে হবে তাকে। তবে এই মুহূর্তে পালানো সম্ভব না। এমনিতেই পায়ে বেশ ব্যথা পেয়েছে সে। হাঁটুতে ব্যথা থাকায় দৌড়ে পালানো সম্ভব নয়। তাই সুযোগের অপেক্ষা করতে হবে।

ওকে চুপচাপ দাড়িয়ে থেকে কিছু ভাবতে দেখে লোকটি আবারো ধমকের সুরে বলে উঠল,

“এই মেয়ে সমস্যা কি তোমার? তোমাকে বলছি না এখানে এসে বসো। আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি। এত কি ভাবছো দাঁড়িয়ে থেকে?”

চাঁদনী এবার মুখে মৃদু হাসির রেখা টেনে বললো,

” কিছু না আমি এখানে বসছি আপনি খাবার নিয়ে আসেন। বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে আমার। তারপর বাড়িতে যাবো।”

ওর কথা শুনে লোকটা মৃদু হাসল। চাঁদনী গিয়ে বিছানার উপর বসলো। লোকটা পাশের রুমে চলে গেল ওর জন্য খাবার আনতে। লোকটা চলে যেতেই, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চাঁদনী যত দ্রুত সম্ভব বিছানা থেকে উঠে সেখান থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে আর কোন কিছু না ভেবে হাতের ডান দিকে এক নাগারে দৌড়াতে লাগল। পায়ে ব্যথা থাকায় জোরে দৌড়াতে না পারলেও শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগল সে। কিছুদূর যাওয়ার পরেই তার মনে হল সে যেন হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে। যদিও কোনো এক অজানা কারণে সে চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। কিন্তু তার মন বলছে সে যেন হাওয়ায় উড়ে কোথাও চলে যাচ্ছে। সে যেন হাওয়ায় ভেসে আছে। সে অনেক চেষ্টা করল চোখ মেলে তাকানোর। কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠলো না। এভাবে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট কেটে যাওয়ার পর চাঁদনী চোখ মেলে তাকাতে পারলো। পরক্ষণে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল সে নিজের বাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।

সে দ্রুত এদিক ওদিক ফিরে তাকিয়ে কাউকে একটা খুঁজতে লাগলো। কিন্তু না তার আশেপাশে তো দুর। দূর দুরান্ত পর্যন্ত কেউই নেই। সবখানে একদম ফাঁকা। চাঁদনী সেখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চিৎকার করে বললো,

“আমি জানি শ্রাবণ এটা আপনি। আপনি আমাকে এখান অব্দি নিয়ে এসেছেন। কেন এভাবে লুকোচুরি খেলছেন আমার সাথে। কেন সামনে আসছেন না। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আমি জানি আমি যেসব করেছি সেগুলো ভুল ছিল। আপনার সাথে এমন আচরণ করা উচিত হয়নি আমার। কিন্তু আপনি কেন আমার সাথে এমন করছেন? এই কি তবে আপনার ভালোবাসা। কেন আমাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন শ্রাবণ। প্লিজ ফিরে আসুন। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আবারো আপনার কাছে ফিরে যেতে চাই। আপনি যা’ই হোন না কেন আমি শুধু আপনাকেই ভালোবাসি।”

কথাগুলো বলেই হাউমাউ করে কান্না করতে শুরু করলো চাঁদনী। ওর চিৎকারে বাড়ির মধ্য থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন রত্না বেগম। বাড়ির পিছনে এসে ওকে হাটু গেঁড়ে বসে থেকে কান্না করতে দেখে যেন দেহে প্রান ফিরে পেলেন তিনি। চিৎকার করে রতন মিয়া কে ডাকতে ডাকতে বললেন,

“ওরে রতন তুই কই গেলি। জলদি আয় দেখ আমাদের চাঁদনী ফিরে এসেছে।”

কথাটি বলেই তিনি দৌড়ে এসে চাঁদনী কে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে গালে চোখে কপালে চুমু খেতে খেতে বললেন,

“ও বুবু তুই এতদিন কোথায় ছিলি। তুই জানিস তোকে পাগলের মত খুঁজে এসেছি আমরা। কোথায় ছিলি তুই গত দুদিন হল? তোর কোন খোঁজ খবর নাই। কোথায় গেলি কি খেলি কার সাথে গেলি কিছুই জানতাম না। আমরা তো ভীষণ রকম ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কোথাও গেলে তো বলে যেতে পারতি। ও বুবু তোর কপালে কি হয়েছে? তোর শরীরের এমন অবস্থা কেন?”

একনাগাড়ে এভাবে প্রশ্ন করেই চলেছেন রত্না বেগম। চাঁদনী ওনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। তার আগেই ভীষণ ক্লান্ত শরীরে ঢুলে পরলো রত্না বেগমের কোলে। যদিও তার জ্ঞান হারায় নি। কিন্তু ক্লান্তির কারনে চোখ বন্ধ করে চুপ করে শুয়ে রইলো ওনার কোলের মাঝে। রত্না বেগমের চেঁচামেচিতে আশেপাশের লোক জড়ো হয়ে গেল। ততক্ষণে রতন মিয়া ও পৌঁছে গেছেন সেখানে। ওর এমন অবস্থা দেখে ওনার যেন দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। কয়েকজন মহিলার সাহায্যে চাঁদনীকে ধরে নিয়ে বাসার মধ্যে যাওয়া হল। তাকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হল। ওর মাথা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হলো। রত্না বেগম ওকে তুলে ওর জামা কাপড় চেঞ্জ করে দিল। তারপর রতন মিয়া এসে সামনে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কোথায় ছিলি এ দুদিন? তোর এ অবস্থা কি করে হলো মা?”

চাঁদনী ওর বাবার প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। হু হু করে কান্না করে উঠলো। চোখের জল নাকের জল একসাথে করে ফেলছে সে। কোনভাবেই যেন নিজের কান্না কে আটকে রাখতে পারছেনা। ওকে এভাবে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখে রতন মিয়া এবং রত্না বেগম এর মনটা যেন আরো বেশি খারাপ হয়ে গেল। তারা আরও বেশি টেনসনে পড়ে গেলেন। রতন মিয়া উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,

“এভাবে কাঁদিস না মা। সত্যি করে বল কি হয়েছে তোর সাথে? খারাপ কিছু হয়নি তো? তোর এমন অবস্থা কিভাবে হল। কোথায় ছিলি তুই। আমার আর সহ্য হচ্ছে না। টেনশনে এখনই যেন হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। বল মা তুই ঠিক আছিস তো।”

উনার কথা শুনে চাঁদনী নিজেকে সামলে নিল। চোখ মুছে কিছুটা শান্ত হয়ে বলল,

“আমি ঠিক আছি বাবা। আমার কিছু হয়নি।”

ওর উত্তর শুনে গম্ভীর গলায় রতন মিয়া বললেন,

“তাহলে গত দুদিন কোথায় ছিলি তুই? আর তোর এই অবস্থা কিভাবে হল? সত্যি করে বল আমার কাছে কিছু লুকাবি না।”

চাঁদনীর চোখ দিয়ে আবারো অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে চোখ মুছতে মুছতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,

“আমি শ্রাবণ কে খুঁজতে গিয়েছিলাম বাবা। সে কিভাবে পারলো আমাকে ছেড়ে এভাবে চলে যেতে। আমি জানি আমাকে সে’ই এখান অব্দি পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু কেন সে আমার সাথে এভাবে লুকোচুরি করছে। কেন আমার সামনে আসছে না। প্লিজ বাবা তোমরা ওনাকে ডাকো। ওনাকে আসতে বল। আমি ওনার কাছে প্রমিস করব আর কখনো ওনার কথার অমান্য করবো না। উনি যা বলবে তাই শুনবো। কখনোই ওনার সাথে বাজে আচরণ করব না। প্লিজ বাবা শ্রাবনকে এনে দাও। আমি ওনাকে বড্ড ভালোবাসি বাবা।”

কথাটা বলেই আবার হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল চাঁদনী। ওর কথা শুনে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন রতন মিয়া। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে মেয়ের অবস্থা দেখলেন। রত্না বেগমের দিতে তাকিয়ে বললেন,

“মা তুমি ঠিকই বলেছ। এতবার বিয়ে ভাঙ্গার কারণে আমার মেয়েটা বুঝি সত্যিই পাগল হয়ে গেছে। ও এসব যা তা কি বলছে। ওকে তো এখন একা রাখাও উচিত না। তুই চিন্তা করিস না মা। আমি আজকে সারাদিনের মাঝেই তোর বিয়ে ঠিক করব। যেভাবেই হোক আজ সারাদিনের মাঝে তোকে বিয়ে দিব। তাও তুই এমন পাগলামি করিস না। তোর এমন পাগলামো দেখে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। তুই আমার মা মরা একমাত্র মেয়ে। তোর কিছু হলে আমি বাঁচব না মা। তুই চিন্তা করিস না দরকার হলে সারাদেশে ঘটক লাগিয়ে পাত্র খুঁজে বের করবো তোর জন্য। আজকের দিনের মাঝেই তোর বিয়ের ব্যবস্থা করব আমি। এটা তোর কাছে আমার প্রতিজ্ঞা রইলো।”

কথাটি বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন রতন মিয়া। উনার এমন কথা শুনে বেশ অবাক হলো চাঁদনী।
,
,
,
রাত ১০:৪৫ মিনিট,
শাড়ি পড়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসে আছে চাঁদনী। তার মুখে কোনো রকম সাজসজ্জা নেই। যেন পাথরের মূর্তি হয়ে বসে আছে সে। না আছে কোন অনুভূতি না আছে কোন মনের ভাব প্রকাশ করা বাক্য। চুপচাপ মুর্তি হয়ে বসে আছে সে। তার ঠিক সামনেই বসে আছেন কাজী সাহেব এবং তার বাবা। তার বিয়ে পড়ানোর জন্য অনেকক্ষণ হলো কবুল বলতে বলছেন তাকে। কিন্তু সে কোনভাবেই কবুল বলছে না। চুপচাপ মূর্তির মত বসে আছে। রতন মিয়া তার কথা রেখেছেন। একটি ভালো ছেলেকে পাত্র বানিয়ে নিয়ে এসেছেন তিনি। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। এমন সুপাত্র হঠাৎ করেই যেন পেয়ে গেছেন তিনি।

চাঁদনীকে অনেকবার বলার পরেও সে কিছুতেই কবুল বলছে না। ওকে এভাবে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে এবার বেশ রেগে গেলেন রতন মিয়া। তিনি উঠে এসে তার কাছে বসে ধমকের সুরে আস্তে করে বললেন,

“কি হচ্ছে কি চাঁদনী। আমার মান-সম্মান কি ডুবাবি নাকি। তাড়াতাড়ি কবুল বলে বিয়ের কাজ শেষ কর। এখন কিন্তু প্রচুর রাগ হচ্ছে আমার।”

বাবার ধমক খেয়ে আনমনেই তিনবার কবুল বলে দেয় চাঁদনী। বিয়ে পড়ানো হলে সবাই মোনাজাত ধরেন। সবাই যে যার মত সেখান থেকে চলে যায়। কিন্তু চাঁদনী যেন আগের মতোই মুর্তি হয়ে বসে আছে। সে কি করতে চাইল আর কি হয়ে গেল এসব তার সাথে। কার সাথে বিয়ে হল তার? শ্রাবন কি কখনোই আর তার জীবনে ফিরে আসবে না? সত্যিই কি তার জীবনটা এভাবেই বদলে যাবে? নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে এভাবেই হারিয়ে ফেলবে সে।
#ভয়ংকর_সে #পর্ব_৩৭
#M_Sonali

জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে চাঁদনী। রাগে যেন সারা শরীর জ্বলছে তার। দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাগে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে। এই মুহূর্তে শ্রাবণ কে সামনে পেলে হয়তো তাকে মেরেই ফেলতো সে। শ্রাবণ কিভাবে পারলো এভাবে তাকে ছেড়ে চলে যেতে। আজতো সে চিরদিনের মত অন্য কারো হয়ে গেল। আর তো কখনো শ্রাবণের কথা মনেও করতে পারবেনা সে। তবে কি ওর ভালোবাসা মিথ্যে ছিল। সব কিছুই মিথ্যে অভিনয় ছিল? এসব কথা ভেবে যেন আরো বেশি রাগ হচ্ছে চাঁদনীর। রাগে দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। হাতের মুঠো শক্ত করে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলে রাগ দমানোর চেষ্টা করছে। আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে।

হঠাৎ কারো কাশির শব্দে দরজার দিকে ফিরে তাকায় চাঁদনী। দেখে ওর দাদী রত্না বেগম দাঁড়িয়ে আছে। ওকে কাঁদতে দেখে তিনি কাছে এগিয়ে আসেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলেন,

“এভাবে কাঁদছিস কেন বুবু। আজ তোর খুশির দিন। দেখ তোর বিয়ে হয়ে গেছে। তোর জামাই টাকে দেখতে একদম রাজপুত্রের মতো। এমন সুন্দর ছেলে গোটা দেশে একটাও নাই। এর আগে যতগুলো বিয়ে এসেছিল সবগুলোর মধ্যে এটাই সেরা। পরিবারের কোন ঝামেলাও নেই। ছেলেটা এতিম। তবে বাড়ি ঘর টাকা পয়শা বেশ ভালোই আছে। তুই রাজরানী হয়ে থাকবি দেখিস। কপাল করে এমন বর পেয়েছিস।”

এতোটুকু একনাগাড়ে বলে থামলেন উনি। ওনার কথা শুনে বেশ কিছুটা অবাক হল চাঁদনী। কেন জানেনা ওর মনের ভেতর অজানা এক ভাবনা উঁকি দিতে লাগল। ও চট জলদি বলে উঠল,

“যার সাথে আমার বিয়ে হল তার নাম কি দাদি?”

ওর এমন প্রশ্নে দাঁত দিয়ে নিজের জিব্বাহ কেটে রত্না বেগম বললেন,

“ইস রে, দেখেছিস অতিরিক্ত খুশির কারণে জামাইয়ের নামটাই জিজ্ঞেস করা হয়নি। রতন জানে হয়তো। আমি অতটা জানিনা। তবে জামাইয়ের নাম যাই হোক না কেন। দেখতে কিন্তু রাজপুত্র কেও হার মানায়। আচ্ছা এখন কান্নাকাটি বাদ দিয়ে একটু হাত-মুখ ধুয়ে সুন্দর করে সেজেগুজে বসে থাক। একটু পর জামাই আসবে নিজেই নামটা জেনে নিস। আজ তোদের বাসররাত। দেখিস আবার কান্নাকাটি করে জামাইয়ের মনটা খারাপ করে দিস না। যা চাঁদনী বুড়ি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আয়। আমি বরং ঐদিক টা দেখি।”

কথাটি বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন রত্না বেগম। চাঁদনী সেখানেই দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতে লাগল উনার কথাগুলো। ওর বারবার মনে হচ্ছে ওর শ্রাবন ফিরে এসেছে। হয়তো শ্রাবণের সাথেই নতুন করে বিয়ে হলো ওর।

এমন ভাবনা থেকে মুহূর্তেই চাঁদনীর মনটা খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। সকল রাগ অভিমান কাটিয়ে মুখটা হাসিতে ভরে গেল। সে দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে ভালো করে মুখ ধুয়ে এলো। কিছুটা সুন্দর হবার জন্য হালকা করে সাজগোজ করলো। তারপর বিছানার উপর বসে অপেক্ষা করতে লাগলো তার সদ্য বিবাহিত বর শ্রাবণের জন্য। তার মন যেন বারবার বলছে তার শ্রাবণের সাথেই বিয়ে হয়েছে। অন্য কারো সাথে নয়। তার দাদী যেভাবে তার বরের কথা বলেছে তাতে চাঁদনী ১০০% শিউর ওটা শ্রাবণই হবে। হয়তো এতদিন ওর কারণেই ওকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এমন করেছে সে। কিন্তু আজ সে ঠিকই ফিরে এসেছে। চাঁদনী তাকে ক্ষমা করে দিবে। সে যা’ই করে থাকুক না কেন। কারণ বিচ্ছেদ হওয়ার দোষটা তার নিজেরি ছিলো।

তার ভাবনায় ছেদ কাটিয়ে দরজায় টোকা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে কেউ। চাঁদনী লজ্জা শরম ভুলে ঘুমটা ফেলে তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকায়। মুহূর্তে যেন পায়ের তলার মাটি সরে যায় তার। মুখটা অন্ধকারে ছেয়ে যায়। সেই সাথে অনেক বেশি ভয় বাসা বাঁধে মনে। তার সকল আশায় জল ঢেলে দিয়ে রুমের মাঝে যে প্রবেশ করেছে সে অন্য কেউ। শ্রাবন নয়। লোকটি ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকায়। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“আপনি এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? আপনার তো ঘুমটা দিয়ে বসে থাকা উচিত ছিল।”

লোকটির এমন কথায় কি উত্তর দিবে সেটা যেন এই মুহূর্তে কোনভাবেই মাথায় আসছে না চাঁদনীর। তার মাথাটা ভীষণ রকম আউলাঝাউলা হয়ে যাচ্ছে। আর রাগে সারা শরীর পুড়ে যাচ্ছে। তার এতক্ষণের সব রকম আশা যেনো জলে ডুবে গেল। তবে কি সত্যি শ্রাবন সারা জীবনের মতো হারিয়ে গেল তার জীবন থেকে। অপরিচিত লোক কি হলো তার সারা জীবনের সঙ্গী। চাঁদনী এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তার দু চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পরল। সে কোন উত্তর দিল না। তাকে চুপচাপ সেখানে বসে থাকতে দেখে কিছু বলল না লোকটা। আস্তে করে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে তার কাছে এগিয়ে এলো। তার পাশে বসে তার দিকে এক নজরে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। হালকা গলা খাকারি দিয়ে বললো,

“এভাবে কাঁদছেন কেন? আপনার কি বিয়েতে মত ছিল না?”

লোকটার কথার উত্তর দেওয়ার মতো কোনো রকম মনোভাব নেই এখন চাঁদনীর। তার এখন একটা কথাই মাথার মধ্যে ঘুরছে। তার সাথে এসব কি হচ্ছে। সে তো কোন কিছুই মেনে নিতে পারছে না। এ লোকটাকে কখনোই স্বামী বলে মেনে নেবে না সে। তার বিয়ে তো আগেই হয়ে গেছে। আর ইসলাম ধর্মে একটি মেয়ের বিয়ে হওয়া অবস্থায় অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারে না। তার বাবা এবং দাদি না হয় সব ভুলে গেছে। কিন্তু সে তো ভোলেনি সে বিবাহিত। তাহলে কিভাবে মেনে নেবে সে এই লোকটাকে।

সে কোন উত্তর না দিয়ে বিছানা থেকে নিচে নেমে দাঁড়ালো। কোন রকম কথা না বলে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। তখনই লোকটা আচমকা তার হাত ধরে ফেলল। গম্ভীর গলায় বলল,

“এটা কোন ধরণের অসভ্যতা? আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে এভাবে কোথায় যাচ্ছ তুমি? আমি তোমার নব বিবাহিত স্বামী। আজ আমাদের ফুলসজ্জা রাত। তাকি ভুলে গেছো?”

ওনার এমন কথা এবং হাত ধরাতে ভীষণ রকম রেগে গেল চাঁদনী। সে নিজের হাতটা ঝাড়ি মেরে ছাড়িয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করে বললো,

“কে আপনি, আপনাকে আমি চিনি না। আর না আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। এ বিয়ে কখনোই সত্যিকারে বিয়ে নয়। আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে বাবা আপনার সাথে। কিন্তু আপনার সাথে বিয়ে আমার হয়নি। কারণ আমি আগে থেকেই বিবাহিত। আমার স্বামী আছে। আর একটি মেয়ের প্রথম স্বামী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে কখনোই করতে পারে না। আপনি আমার স্বামী নন। আমার স্বামী অন্য কেউ।”

কথাটি বলেই ওর কাছ থেকে সরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল চাঁদনী। ওর চিৎকার চেঁচামেচিতে অলরেডি পাশের রুম থেকে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন রতন মিয়া এবং রত্না বেগম। ওকে রুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে বের হতে দেখে রতন মিয়া গম্ভির গলায় বলে উঠলেন,

“এসব কি হচ্ছে কি চাঁদনী? তুই এভাবে বাইরে বেরিয়ে এলি কেন? আর এভাবে জামাইয়ের সাথে চেচামেচি করছিলি কেন?”

চাঁদনী সোজা গিয়ে ওর বাবার সামনে দাঁড়ালো। চিৎকার করে দাঁত কিড়মিড় করে বললো,

“বাবা তোমরা আমাকে গলা টিপে মে-রে ফেলো। অথবা বিষ খাইয়ে মা-রো। নয় তো বলো আমি নিজেই গলায় দড়ি দিয়ে মা-রা যাচ্ছি। কিন্তু তবু আমার সাথে এত বড় পাপ করো না। তোমরা ভুলে গেছো কিন্তু আমি তো ভুলিনি। আমারতো বিয়ে হয়েছে বাবা। প্রথম স্বামী থাকা সত্ত্বেও আমি কিভাবে অন্য একটি পুরুষকে নিজের স্বামী হিসেবে মেনে নেই। প্লিজ বাবা আমার ওপরে এত বড় পাপ তোমরা চাপিয়ে দিও না। তোমরা প্লিজ মনে করার চেষ্টা করো শ্রাবনের কথা। ওর সাথে আমার বিয়ে হয়েছে বাবা। আমি তো শ্রাবনের বিয়ে করা বউ। তোমরা কেন সবকিছু ভুলে গেলে।”

কথাগুলো একনাগাড়ে বলে কান্না করতে করতে মেঝেতে বসে পরল চাঁদনী। ওর কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। পিছনে লোকটি অলরেডি এসে দাড়িয়ে আছে।

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here