মুক্ত_পিঞ্জিরার_পাখি পর্ব ২৩

#মুক্ত_পিঞ্জিরার_পাখি
#Ipshita_Shikdar
#পর্বঃ২৩
৫৭।
বর্তমানে সময়টা এমন এক আবহাওয়ায় এসে পৌঁছিয়েছে যে না শীত লাগে না গরম, যাকে বাঙালিরা বলে মাতাল করা আবহাওয়া, আর বাঙালি দম্পতিদের নিকট এ হলো ‘প্রেমময় সময়’। এই সুন্দর আবহাওয়াতেই আরিজের সাথে কিছু কেনাকাটা করার উদ্দেশ্যে বাহিরে বের হচ্ছে পক্ষী।

মলে ঢুকতেই আরিজ কোনো কথা ছাড়াই বার্বি গাউনের দোকানের দিকে যেতে লাগলো। তা দেখে যুবতী অবাক, কারণ সে তো এসব পোশাক পড়ে না। তাছাড়া সে এসেছে প্রতিদিন পরার জন্য কিছু জামা-কাপড় কিনতে, অনুষ্ঠানে পরার ভারী পোশাক নয়।

“আরে! আরে! আপনি ঐদিকে ওয়েস্টার্ন বার্বি গাউনের শপে কেন যাচ্ছেন?”

“উফঃ মেয়ে এত কথা না বলে চলো তো। আমি তো পাগল বা বাচ্চা নই যে কোনো কিছু বুঝে না শুনেই এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করবো। সুতরাং, কথা না বলে আমার সাথে চলো।”

বলে পক্ষীকে কোনো কথা না বলার সুযোগ দিয়ে বড় বড় পা ফেলে দোকানটার দিকে যেতে লাগলো। এতে তরুণী রাগে নাক ফুলালেও চুপটি করে থাকলো।

তারা দুজন দোকানে ঢুকতেই বিক্রয়িনী এসে স্বাগতম জানায়। আরিজ হাসিমুখে নিজের চাহিদা ব্যক্ত করে তাকে।

“একটা বার্বি গাউন দেখান তো সাদা রংয়ের মাঝে। ”

“এখনই দেখাচ্ছি স্যার। আপনি আর ম্যাম আমার সাথে আসেন।”

প্রায় ডজন খাণেক গাউন দেখার পর আরিজ পছন্দ করে একটি, সেটি আবার পুরোটা শুভ্র না কিছুটা হালকা গোলাপি কাজও আছে। আরিজ উৎফুল্ল মুখে পক্ষীর গায়ে ধরে।

“দেখো পক্ষীরাণী, তোমাকে কী মানিয়েছে গাউনটা! তোমার পছন্দ হয়েছে তো?”

কথাটা জিজ্ঞেস করে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাতেই চুপ হয়ে যায় সে। কন্যা যে রাগে চোখমুখ শক্ত করে স্বয়ং এক অগ্নিকন্যা হয়ে বসে।

এর মাঝেই বিক্রয়িনী তার বাঁকা দন্ত দেখিয়ে হেসে বলে উঠে,

“ম্যামকে তো মনে হয় অনেক ভালোবাসেন স্যার। একবারে রূপকথার রাজকন্যা বানিয়ে ছাড়বে ভেবেই এসেছে। তা নাহলে কী আর সাত হাজার টাকার গাউনটা হাতে তোলে।”

আরিজ দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে উত্তর দেয়,

“তা কী আর বলতে! কিন্তু বউটা আর বুঝে না মোর ভালোবাসা, তার কাছে যেন আমার সবকিছুই রসিকতা। দেখেন না, এখনো কেমন মুখ করে রেখেছে!”

বিক্রয়িনী এমন কথায় হেসে দেয়।

“আচ্ছা, স্যার আপনি ক্যাশ কাউন্টার থেকে ড্রেসটা কালেক্ট করে নিন, আমি প্যাকেট করে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ”

আরিজের এসব কিছুতে অভ্যাস আছে, কপোত-কপোতি আসলে এভাবে রসিকতার সুরে কথা বলে কেনাকাটার জন্য উৎসাহিত করা দোকানে কাজ করা প্রতিটি মানুষের স্বভাবই বলা চলে। কিন্তু পক্ষী… সে তো এসব কিছুতে আর অভ্যস্ত নয় তাই লজ্জায় লাল হয়ে যায়। সেই সাথে কিছুটা বিচলিতও হয় এত দামী পোশাক শুনে।

পক্ষী স্বামীর কিছুটা কাছ ঘেঁষে ফিসফিস করে বলে,

“শুনুন না, আমার কাছে মাত্র তিন হাজার টাকাই আছে। আসলে এখানে আসার পর আর টিউশনি করতে যাইনি তো, আপনি প্লিজ ড্রেসটা ফিরিয়ে দিন।”

“এত বেশি বুঝো না তো। আমি তোমার স্বামী, তুমি আমার স্ত্রী, এটা আমার তোমার জন্য কিনতে মন চেয়েছে, টাকা আমিই দিবো। তোমার অবশ্যই ধর্মমতে এবং আইনমাফিক আমার টাকায় অধিকার আছে। তাই তুমি তোমার টাকায় অন্যকিছু কিনো, কেমন?”

স্বাভাবিক গলায় কথাগুলো বলে আরিজ কাউন্টারের দিকে চলে গেল, পিছনে তাকালেই দেখতে পেতো একজোড়া চোখ তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

গাউনের ব্যাগ হাতে দোকান থেকে বের হতে হতেই একজনের সাথে ধাক্কা লাগে পক্ষী। সামনে তাকাতেই অবাক সে, এতদিন পর সে প্রিয়াকে দেখছে, তাও এই বেশে। যে মেয়েটাকে এত বলে-কয়েও চাচী জীবনে মাথায় হিজাব বাঁধাতে পারেনি, তার মুখমণ্ডল ছাড়া পুরো দেহ আবৃত বোরখার দ্বারা, সত্যিই বিস্মিত হয় সে।

অস্পষ্ট গলায় বলে উঠে,

“প্রিয়া আপু…?”

“প্রিয়ু, তুমি উনাকে চিনো?”

অচেনা একটা মেয়ে স্ত্রীকে নাম ধরে ডাকায় কিছুটা অবাকই হয় মাহদি। সে আজ প্রিয়ার সাথে মলে এসেছিল শ্বশুরবাড়ির জন্য কিছু কেনাকাটা করতে, কিন্তু এসে প্রিয়ার পুতুলকে পরানো একটা গাউন পছন্দ হয়। আর তা কেনার উদ্দেশ্যে ঢুকতে যেতেই এই অবস্থায় পড়ে। এদিকে পক্ষী নিজেও অবাক হয় বোনের পাশে অচেনা পুরুষটিকে দেখে।

প্রিয়া সবার কৌতূহলের অবশান ঘটিয়ে উত্তর দেয়,

“পক্ষী, এটা তোর জিজু। কিছু মনে করিস না, এত তাড়াহুড়োয় বিয়ে হয়েছে যে কাউকে জানাতে পারিনি। আর মাহদি উনি হলেন তোমার বড় শালি, মানে আমার কাজিন।”

“বাহ! কী ইত্তেফাক! আসলাম কেনাকাটা করতে দেখা পেয়ে গেলাম আধা ঘরওয়ালির।”

বলেই হাসতে লাগলো। তা দেখে পক্ষীও জোরপূর্বক হাসলো সৌজন্যতা বজায় রাখতে। প্রিয়ার মাঝেও অস্বস্তি যদিও সে জানে না পক্ষী তার ও আরিজের মাঝের সম্পর্কের বিষয়ে জ্ঞাত, তবুও পুরোপুরি স্বাভাবিকও থাকতে পারছে না। এই সময়ে আরিজও বিল চুকিয়ে এসে পড়ে। প্রিয়া, অচেনা এক পুরুষ ও পক্ষীকে একসাথে দেখে সেও কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে।

কিন্তু তা কাটিয়েই জিজ্ঞেস করে,

“কেমন আছো প্রিয়া?”

প্রিয়াও স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় জবাব দেয়।

“আলহামদুলিল্লাহ ভালোই আছি। মাহদি, ও হলো পক্ষীর হাজব্যান্ড আর আমার ভার্সিটির সিনিয়ার আরিজ। আর আরিজ উনি হলো আমার হাজব্যান্ড, মাহদি। ”

মাহদি প্রস্তাব দিয়ে উঠে,

“চলো তাহলে ফুডকোর্টে যেয়ে বসি। কিছুক্ষণ আড্ডা দেই।”

আরিজ শুধালো,

“না, না, তা আজ সম্ভব না। আসলে আমার আর পক্ষীর একটু ব্যস্ততা আছে আজ। অন্য কোনোদিন অবশ্যই।”

পক্ষীও আরিজকে সায় জানালে। পরিস্থিতি কাটাতে প্রিয়াও বলে উঠে,

“আচ্ছা, আচ্ছা, তাহলে তোমরা যাও। তবে বাড়িতে এসো একদিন। দাওয়াত রইলো।”

“হুম, তোমরাও এসেন।”

পক্ষী ও আরিজ সেদিক থেকে চলে যায়। প্রিয়াও স্বস্তির শ্বাস ফেলে স্বামীর হাতে হাত রেখে দোকানের ভিতরে প্রবেশ করে। আর মাহদির এই কথোপকথন কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগলেও সে আর তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। বউয়ের সাথে ঘুরাঘুরিতে ব্যস্ত হয়ে যায়, আজ প্রথম স্ত্রীর সাথে বাহিরে এসেছে বলে কথা।

৫৮।
আসলাম দেওয়ানের সাথে কথা বলার জন্য মনটা কুটকুট করছে নায়লা দেওয়ানের, আসলে স্বামীর সাথে কথা বলতে নয় বড় মেয়েকে দেখা পাওয়ার জন্যই তার অস্থিরতা। কতদিন দেখে না মেয়েটাকে! আগে যার মুখখানা আস্ত এক অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত লাগতো, আজ তার মুখখানা সোনামুখো লাগছে নায়লা দেওয়ানের, যেই মেয়েকে দেখলেই সারা দিন গায়ে কাটা বিঁধতো সেই মেয়ের একটি মাত্র সাক্ষাৎ পেতে কাতর সে। কথায় আছে না, দাঁত থাকতে মূল্য নেই।

সদ্য ঘামে নেয়ে কাজ থেকে ফিরতেই স্বামীকে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লেবুর শরবত এগিয়ে দিলেন। আসলাম দেওয়ান তো অবাক, কারণ এ তো তার স্ত্রীর স্বভাব নয়। কোনো ভণিতা ব্যতিতই সোফায় হেলান দিয়ে এক চুমুক শরবত পেটে নিয়ে বললেন,

“কী ব্যাপার আজ এত খাতিরদারি! কোনো দরকার ছাড়া তো হবেই না এত আদর-যত্ন। সুতরাং, বাঁকা পথে না যেয়ে সোজাসুজিই বলো কী চাই তোমার?”

স্ত্রী তার আমতা আমতা করতে শুরু করলেন। তা দেখে খাণিক রাগই উঠে গেল তার। এমনিতেই বয়সের ভারে ক্লান্ত দেহ, তার উপর কাজ-কারবার। পক্ষী যাও তাকে সাহায্য করতেন, ছোটো মেয়ে সেই কাজেরও না। সবকিছু মিলিয়ে আজকাল বেশ রাগচটাই হয়েছেন তিনি। খেটেখুটে এসে স্ত্রীর এমন আদিক্ষেতা তার মোটেই সহ্য হচ্ছে না।

কিছুটা ধমক দিয়েই উঠেন তিনি।

“কী হলো, বলছো না কেনো!”

“আসলে বলছিলাম কী, অনেকদিন তো হলো মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি, এবার নাহয় আপনি মেয়েকে কিছুদিনের জন্য নিয়ে আসুন। আর শ্বশুরবাড়ির সবাইকে দাওয়াতও দিয়ে আসুন।”

আসলাম দেওয়ান হাসলেন, তবে হাসিটা দিলেন মনের গহীনে এবং লোকচক্ষুর আড়ালে, একদম তাচ্ছিল্য মাখা এই হাসি। গম্ভীর গলায় বলতে লাগলেন,

“জানো রূপবান যখন নদী পাড়ি দেওয়ার বিনিময়ে মাঝিকে বখশিশ স্বরূপ রূপা দিয়েছিল তখন মাঝি খুব রেগে যান, তিনি ভাবেন তা মূল্যহীন পিতল। বেশ অবজ্ঞাই করেন রূপবান এবং তার উপহারকে। এই অবজ্ঞার্থেই কয়েক পয়সার বিনিময়ে তা আরেকজনকে দিয়ে দেন, পরে বুঝতে পারেন বখশিশটা কতটুকু মূল্যবান ছিল। অথচ, তখন আর তা হাতে পাওয়ার উপায় নেই। বর্তমানে তোমার অবস্থাও তা-ই, তোমার কাছে আল্লাহর কোহিনুর ছিল, তুমি তা কয়লা ভেবে ফেলে দিয়ে এসেছো। এখন আফসোস করা বৈকী উপায় নেই তোমার নিকট।”

এমন ভারী বাণীগুলো শুনে নায়লা দেওয়ানের উৎসাহিত মুখশ্রীতে ছেয়ে গেল অন্ধকার। কিন্তু এতে কিছুই আসে যায় না আসলাম দেওয়ানের। তিনি কিছু না বলেই আধ পান করা শরবতটা টেবিলে রেখে বেডরুমের দিকে চলে যেতে লাগলেন।

অতীত,
নায়লা দেওয়ান আসলাম দেওয়ানের প্রথম স্ত্রী হলেও, আসলাম দেওয়ান নায়লা দেওয়ানের প্রথম স্বামী নয়। নায়লা দেওয়ানের প্রথম বিয়ে হয় যখন সে সদ্য পনেরোতে পা দিয়েছেল, স্বামী-সংসার তো দূরে থাক নারীত্ব কী না বুঝতেই বিয়ে নামক দায়িত্ব-কর্তব্যের থলি তার কাঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। তবুও তিনি সেই ধাক্কা সামলে নিয়েছিলেন, যদি লোকচক্ষুর আড়ালে মনের কান্না জীবনসঙ্গী তথা তার চাইতে তিনগুণ বয়সী প্রথম স্বামীও দেখেননি। সেই বিয়ের স্থায়ীকাল ছিল মাত্র বছর তিনেক, বিধবা বেশে আবার ফিরেছিল বাপের বাড়ি।

লোকজন তাকে আর তার কপালকেই দুষেছিল। পাড়া-পড়শির বাণীগুলো ছিল কিছুটা এমন,

“কে রাখবে এই মেয়েকে? এখন তো সারা জীবন বাপের গলায় কাটা হয়ে থাকবে!”

“আরে মেয়েটার কপালে নাই স্বামীর সুখ বেশিদিন, তাহলে এটা ছাড়া কী হওয়ার ছিল!”

কেউ কেউ তো বলেছিল,

“কেমন অপয়া মেয়ে মাত্র আঠারো বছরে জামাই খেয়ে বসে আছে। ইশ! বেচারা পরিবারটা এমন মেয়ে নিয়া নিজের মানিক হারালো।”

“তা আর বলতে কেমন মেয়ে হলে তিনটা বছর পাড় হতে না হতেই স্বামীর মরণ নিয়ে আসে! এই মেয়ে যেখানে যাবে সেখানেই অন্ধকার হয়ে যাবো।”

“এই মেয়েকে কাছ ঘেঁষতে দেওয়া যাবে না। আবার না আমাদের বিপদ ডেকে আনে।”

এমন বুলি আওড়ানো মানুষগুলো একবারও মৃত মানুষটির বয়সের ভার হওয়া নানা রোগ আক্রান্ত দেহটির দিকে তাকালো না। পঞ্চাশ উর্ধ্ব নানা রোগে জর্জরিত মানুষের মৃত্যু আমাদের দেশে অস্বাভাবিক নয়, তবে সেই লোকের স্ত্রী যদি হয় সদ্য যুবতী কিংবা নববিবাহিতা তাহলে অবশ্যই অস্বাভাবিক ব্যাপারস্যাপার তা।

সদ্য যৌবনে পা রেখে নারীটি তখন ভেবেছিল এই বুঝি জীবন শেষ; এই সাদা রঙ, এই সমাজের তিরস্কার, এই রংহীন জীবনই বোধহয় আপন হয়ে রবে তার শেষ শ্বাস ত্যাগ করা অবধি। কিন্তু আল্লাহ হয়তো তাকে সুখী করতে চেয়েছিলেন খুব দ্রুতোই। কোনো এক গৌধূলীর সময় তাকে মাঠে কাজ করতে দেখেছিলেন দেওয়ান বাড়ির ছোট ছেলে, এক দেখাতেই প্রেমে পড়েন নাকি করুণা থেকেই দিন দুয়েকের মাঝেই কোনো কথাবার্তা ছাড়াই বিধবা হওয়ার পনেরোদিনের মাথায় বিয়ে করে দেওয়ান বাড়িতে উপস্থিত হন তারা।

টাউনের বড় ব্যবসায়ী পরিবার হলো দেওয়ান বাড়ি, তারা কি মেনে নিতে পারে এক বিধবাকে ছোট ছেলের বউ! একে একে সবাই কটূ কথা বলতে শুরু করে।

“মেয়েটা নিশ্চিত জাদুটনা করেছে আসলাম ভাই রে। নাহইলে এমন সুন্দর ট্যাকাওয়ালা পোলা কী আর বিয়াইত্তা মাইয়া বিয়া করে!”

“অপয়া মাইয়ালোক ঘরে আনতাসে। কী না ক্ষতি কইরা বসে!”

স্বামীর সঙ্গ থাকায় সে এই বিপত্তিও কাটিয়ে উঠেছিল। কিন্তু একমাস পরই তার জন্য কাল হয়ে আসে সন্তানের আবির্ভাব। বিয়ের এক মাস পাড় হতে না হতেই গর্ভবতী হয়ে পড়ে নায়লা, সব নারীর জন্য মাতৃত্ব আশীর্বাদ হয়ে এলেও নায়লার জন্য এসেছিল ধ্বংসিকা হয়ে। একেক জনের মুখ দিয়ে সন্তানের পিতৃপরিচয় নিয়ে একেক রকম মন্তব্য বের হয়।

“কে জানে বাচ্চা আগেরতেই প্যাটে ছিল নাকি? হইতেও তো পারে এহন নাটক করতাসে না জানার।”

“এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা প্যাটে আসেনি! কার না কার বাচ্চা আসলাম ভাইরে সোজা মানুষ পায়া তার গলায় ঝুলাইতাসে।”

এই সময়ও পাশে পেয়েছিলেন স্বামীকে। তার যুক্তিতে হার মেনে ছিল সকলে, কিন্তু যারে লাগে না ভালো তার চলনও বাঁকা, তা-ই হয় নায়লা দেওয়ানের সাথে। এবার থেকে আসলাম দেওয়ানের অগোচরেই খোঁচা দিয়ে কথা বলা হতো তাকে। আর যখন দেখা গেল মেয়ে পক্ষীর গায়ের রং তার ও আসলাম দেওয়ানের মতো ধবধবে সাদা নয়, বরং বেশ চাপা রংয়েরই হয়েছিল। তখন তো সব বাড়লো দ্বিগুন পরিসরে।

পাড়ার এক মহিলা তখন আসলাম দেওয়ানের অনুপস্থিতিতে চড়া গলায়ই বলেছিলেন,

“দেখলি তো এবার, এই মেয়ে জীবনেও আসলাম ভাইয়ের না। কেমন কালা হইসে, নিশ্চিত আগের ঘরের বীজ বয়ে বিয়া বইসিল।”

অথচ, এসব বলার পূর্বে একবারও ভাবলো না নবজাতকের দাদীই স্বল্প উচ্চতার কালো বর্ণের নারী।নায়লা দেওয়ান তখন সদ্য প্রসব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি প্রাপ্ত। কাঁপা গলায় বলেন,

“ভাবি, এ কথা আপনি কেমনে বলতে পারেন? আপনার লজ্জা করে না!”

মহিলাটি তখন মুখ বাঁকিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন,

“ও আমার খোদা! যেই মাইয়া শরীরের যন্ত্রণা সইতে না পাইরা স্বামীর মৃত্যুর পনেরো দিনের মাথায় আবার বিয়া করে, তাও কাউরে না জানায়া। সে আবার আইসে আমারে লজ্জা শিখাইতে!”

নায়লা দেওয়ানের মুখে সেই যে তালা লেগেছিল পরের কটূক্তির প্রতিবাদ করার, আর সেই তালা খুলেনি। দিন যেতে লাগে, পক্ষী বড় হতে শুরু করে, তাকে নিয়ে লোকের কটূক্তিও কম নয়, তা যেন সব তাকে উদ্দেশ্য করেই। ধীরেধীরে তার মনে হতে শুরু করে এই বড় সন্তানই তার সুখী না হওয়ার কারণ। ধীরেধীরে পক্ষীকে নিয়ে তার হৃদয়ে তিক্ততার স্তূপ জমতে শুরু করে, এতোটাই জমে যায় যে সম্পর্কের মমতা ও ভালোবাসাই আড়াল হয়ে পড়ে। যার ফলাফল হয় পক্ষীর প্রতি তার করা সব অন্যায়, অবহেলা, অত্যাচার।

বর্তমানে,

“মা! মা!”

অতীতের বিতৃষ্ণাময় স্মৃতিগুচ্ছ ভাবতে ভাবতে কোনো এক ঘোরেই চলে গিয়েছিলেন মধ্যবয়স্ক নারীটি। ছোটো মেয়ের ডাকে সেই ঘোর থেকে বের হয়ে আসেন।

ডান চোখের কোণে জমা একবিন্দু নোনাজল হাতের পিঠে মুছে ভেজা গলায় জবাব দেন,

“হ্যা, কী হয়েছে বল?”

মায়ের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পর্যবেক্ষণ করে নিতু। সন্দিহান গলায় বলে,

“তেমন বিশেষ কিছু নয়, কিন্তু তোমার চোখমুখ এমন দেখাচ্ছে কেন?”

নায়লা দেওয়ান নিঃশ্চুপ। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে কথা বলে এবার নিতু।

“মা, প্লিজ বোলো না তুমি ঐ মেয়ের জন্য কাঁদছো! বরং, তোমার তো খুশি হওয়া উচিত তোমার তথাকথিত আপদ বিদায় হয়েছে।”

বাক্যটি শেষ হতেই চড়ের শব্দে মুখরিত হয় সারা ঘর। মা এবার শাসিয়ে উঠেন তার কন্যাকে।

“জবান সামলা নিতু! পক্ষী তোর বড় বোন হয়, বারবার ভুলে যাস কী করে! বেয়াদপ মেয়ে কোথাকার!”

নিতু কী আর পক্ষীর মতো মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা মেয়ে! তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে সে মায়ের এমন কাণ্ডে। রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে,

“সারা বছর তো আপদ, শয়তান, অভিশাপ, অপয়া বলতা, এখন এত দরদ হইসে কইথ থেকে? তুমি আসলে মানুষটাই গিরগিটি, ক্ষণণ ক্ষণে রং বদলাও।”

বলে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যায় সে। আর সেখানেই নায়লা দেওয়ান ধপ করে বসে পড়েন। মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে শুরু করেন,

“আমি নিজের অজ্ঞতায় শুধু বড় সন্তানটার জীবনই শেষ করিনি, তাকে অপদস্থ করতে করতে ছোট মেয়েটার মাথাও খেয়ে ফেলেছি। এখন কাউকেই গণায় ধরে না মেয়েটা!”

৫৯।
দুদিন পর,
সকাল সকাল বেডরুমের দরজায় নক করার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় পক্ষীর, উঠতে যেয়ে দেখে তার গায়ে শক্তভাবে জড়িয়ে আছে আরিজের পুরুষালি হাত। মাথাটা একটু বালিশ থেকে উঠিয়ে ঘড়ির দিকে তাকায়, সবেমাত্র সাড়ে ছয়টা বাজে, একটু অবাকই হয় সে। আস্তে আস্তে আরিজের হাত নিজের দেহ থেকে সরিয়ে বিছানা থেকে উঠে যায়। মাথা ও শরীরে ওড়না জড়িয়ে দরজা খুলতেই দেখে তার শাশুড়ি নয়ন্তিনী দাঁড়িয়ে।

“মা, আপনি এত সকাল সকাল আসলেন যে… কিছু লাগবে?”

“না, তুমি ড্রইংরুমে যাও। আমি আরিজকে নিয়ে আসছি।”

নয়ন্তিনীর কথায় আর কিছু না বলেই ড্রইংরুমে চলে যায়। সেখানে পৌঁছাতেই দেখে একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা গায়ে মাথা নত করে বসে আছেন। খুব বেশি ঝুঁকে থাকায় চেহারা বুঝা যাচ্ছে না, তবুও কেন যেন যুবতীর তাকে বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে। লোকটা মাথা উঠাতেই পক্ষী বিস্মিত হয়।

অস্ফুট স্বরে বলে উঠে,

“বাবা, তুমি…? ”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here